Golpo romantic golpo প্রেমবসন্ত প্রেমবসন্ত সিজন ২

প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৫৬


প্রেমবসন্ত_২ ।৫৬।

হামিদাআক্তারইভা_Hayat

আব্দুর চৌধুরীর ঘরে বসে আছে কায়নাত। সেই যে অর্ণর ঘর থেকে বাবা নিয়ে এলেন আর সেদিকে যাওয়া হয়নি। কাঁদতে কাঁদতে চোখ-মুখ ফুলে একাকার অবস্থা। আব্দুর চৌধুরী বলেছিলেন বাড়িতে সবাই ফিরলে এ নিয়ে আলোচনা হবে। কায়নাত ক্লান্ত হয়ে বিছানায় মাথা রাখল। ঘুমিয়েও গেল কিছু সময়ের মধ্যে। আব্দুর চৌধুরী বারান্দায় ইজি চেয়ারে বসে আড়চোখে ঘুমন্ত কায়নাতের দিকে তাকালেন। ঘরে এসে শরীরের উপর চাদর টেনে দিয়ে আবার চেয়ারে গিয়ে বসলেন। লতা এসেছিল। এসে মেয়ের পা পরিষ্কার করে দিয়ে গেছে। অর্ণ দুপুর থেকে কিছু খায়নি। রাগ ঝেড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে তখনই।

তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। চোখের চশমা খুলে ঝাঁপসা দুটো চোখ মুছে লম্বা করে শ্বাস টানলেন। কী করবেন তিনি এখন? গুরুত্ব বোঝাতে এখন দূরুত্ব প্রয়োজন।
তিনি বাইরে তাকালেন। অন্ধকারে চারপাশটা বড্ড নীরব। আশেপাশের বড় বড় বিল্ডিং থেকে আলোর ছটা দেখা যাচ্ছে। সবার জীবনটা কেন এই আলোর মতো হয় না? কেন ফুলের মতো স্বচ্ছ নয়? এর উত্তর হয়তো তিনি জানেন।

দরজায় হঠাৎ শব্দ হলো। কেউ ডাকছে। কায়নাতের নাম ধরে ডাকছে। কিন্তু দরজা তো খোলা। তিনি ভেতর থেকে অনুমতি দিলে ঘরে কয়েক জোড়া পায়ের শব্দ হলো। ভেতরে এলেন বেহরুজ বেগম, আতিয়া বেগম, জয়া এবং রেখা বেগম। আতিয়া বেগম, বৃদ্ধা হতভম্ব হয়ে ঘরে ঢুকলেন। বিছানার দিকে চোখ যেতেই পরাণ অস্থির হলো। আব্দুর চৌধুরী শান্ত হয়ে বসে আছেন। আতিয়া বেগম এসেই ছেলেকে ডাকলেন,
“কী করে হলো এসব? ওর শরীর ঠিক আছে? অর্ণ কই?”

আব্দুর চৌধুরী মুখ ফিরিয়ে নিলেন।
“জ্বর এসেছে গায়ে। ঔষুধ দিয়েছি।”

আতিয়া বেগম বিছানার কাছে বসে কায়নাতের কপালে হাত রাখলেন। গভীর দৃষ্টি মেলে তাকালেন মেয়েটার মুখের দিকে। চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে চোখের অবাধ্য পানি। ঘুমের মধ্যেও কি মেয়েটা কাঁদছে? কী এমন হলো, যার জন্য অর্ণ এমন ব্যবহার করেছে মেয়েটার সাথে! বেহরুজ বেগম শুকনো ঢোক গিললেন। মাশফিক চৌধুরী তার সাথে অনেক রাগা-রাগী করেছেন খানিক আগে। ছেলেকে বিগড়েছেন তিনি, এই নিয়ে সে-কি ঝামেলা। অর্ণকে কল করা হয়েছে অনেক গুলো। ধরেনি সে। বাড়ির প্রত্যেক পুরুষের মুখ গম্ভীর। কিন্তু আব্দুর চৌধুরী যেন আজ একটু বেশি-ই ঠান্ডা। তিনি কী কিছু ভাবছেন? সবাইকে উপেক্ষা করে আব্দুর চৌধুরী ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। সোজা ঢুকলেন বাবার ঘরে। আজগর চৌধুরী বসেছিলেন পালঙ্কে। খবরের কাগজ পড়ছিলেন। ছোট ছেলেকে দেখে সেটা পাশে রেখে দিলেন।

“আব্বা, তোমার সাথে আমার কিছু কথা ছিল।”

আজগর চৌধুরী ছেলের কথা শুনে খানিক অবাক হলেও কিছু বললেন না।
“বসো।”

তিনি পাশে বসে বলেন,
“মিলির ফোন নাম্বার আছে তোমার কাছে?”

“কেন?”

“আমি কথা বলতে চাই।”

“কী নিয়ে আলোচনা করবে?”

“কায়নাত লতার মেয়ে হলেও আমি মনে করি মিলি-ই ওর আসল মা। ওর ব্যপারে কোনও সিদ্ধান্ত নিলে মিলির সাথেই আলোচনা করা উচিত।”

ছেলের ইঙ্গিত যেন বুঝতে পারলেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে চোখ গরম করলেন,
“কী বলছ এসব? অর্ণ আমাদের বংশের সন্তান।”

আব্দুর চৌধুরীর কণ্ঠস্বর শান্ত আগের মতোই।
“আমার উপর বিশ্বাস নেই তোমার?”

“তাই বলে ঘটনা এতদূর যায়নি। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কী ঝামেলা হয় না? তোমার কী কোনোদিন হয়নি? এই সামান্য ব্যাপার নিয়ে তুমি এত বড় সিদ্ধান্ত নিতে পারো না।”

“আমি কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছি না। তুমি মিলির নাম্বার টা আমাকে দাও।”

আজগর চৌধুরী নাম্বার দিলেন। এবং বললেন নতুন করে যেন আবার ঝামেলা না তৈরি করেন তিনি।

আগামীকাল নুসরাতের গায়ে হলুদ। বিয়ে বাড়ি থেকেই দেয়া হবে। এত বড় বাড়ি রেখে কেন অন্যথায় এত ঝামেলা করতে যাবেন? বাড়ির বাগান পরিষ্কার করা হচ্ছে। মানুষ-জন বাড়ি সাজাতে শুরু করেছে। আজ পার্লার থেকে মেয়েরা আসবে মেহেদী দিয়ে দিতে। বাড়ির ছাদে মেয়েদের জন্য আয়োজন করা হয়েছে। কত আত্মীয় যে এসেছে, তার ইয়াত্তা নেই। বাড়ি পুরো মেতে আছে মানুষ-জন দিয়ে। গতকাল রাতে অর্ণ বাড়ি ফেরেনি। কায়নাত ছিল দাদির কাছে। সকাল বেলা আর বের হয়নি। জ্বর খানিকটা কমেছে বটে। আতিয়া বেগম ওর মাথা আঁচড়ে দিচ্ছেন। লম্বা চুল গুলোতে জট বেঁধেছে এক রাতেই। মেয়েটার সেই যে কাল রাতে দাদিকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদল, রাত পেরোতেই বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেল। ওকে এত শান্ত দেখতে ভালো লাগছে না দাদির।
তিনি ডাকলেন,
“এত বড় চুল গুলোর কী হাল করেছিস বুড়ি? “

কায়নাত অনেকক্ষণ পর উত্তরে বলল,
“অনেকদিন আগে আঁচড়ে ছিলাম।”

“কেন?”

“বাড়িতে এত মানুষ, শুধু কোনরকম গোসল করেছি এই কয়েকদিন।”

দাদি শুকনো ঢোক গিললেন। কেমন যেন অপরাধী অপরাধী মনে হচ্ছে নিজেদের।
“একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”

“করো।”

তিনি চুলে বেণী গাঁথতে গাঁথতে বলেন,
“তোর সাথে অন্যায় করেছি আমরা? তুই…মানে সুখী এই সংসার নিয়ে?”

কায়নাত কী উত্তর দেবে বুঝে উঠল পারল না। সে তো সুখী-ই ছিল। সংসারটা মধুর মতো মিষ্টি ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই কী যেন হলো, বুঝতেই পারল না সে। কায়নাত উত্তর দিল না। চুল বেণী করা শেষ হলে বলল,
“বাড়িতে কত মানুষ এসেছে। এত কাজ রেখে আমি ঘরে বসে আছি। আমি যাই, নিচে গিয়ে কিছু কাজ করি।”

দাদি বাঁধা দিলেন।
“তোর কোনো কাজ নেই। নিচে গেলে সবাই রেগে যাবে। তোর শ্বশুর ঝামেলা করবে।”

“ওমাহ! তিনি কেন ঝামেলা করবেন?”

দাদি কিছুটা ফিসফিস গলায় বলেন,
“কাল রাতে অর্ণর সাথে কলে ওর কথা হয়েছিল একবার। খুব ঝামেলা হয়েছে। অর্ণ বাড়ি ফেরেনি আর।”

কায়নাতের বুক কেঁপে উঠল। তবু ওকে নিয়ে একটা প্রশ্নও করল না। কিচ্ছু বলল না। ঘরে নিশা এলো ওর কাজিনদের নিয়ে। দাদি তখন ওদের রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। রুশা আর আরশি বেহরুজ বেগমের চাচাতো ভাইয়ের মেয়ে। নিশার বয়সী রুশা আর আরশি প্রেমের বয়সী। কোলে একটা আড়াই বছরের বাচ্চা মেয়ে। নাম আলো। কায়নাত মাথায় কাপড় টেনে বসে আছে আলোকে কোলে নিয়ে। খুব পাঁকা বাবু। কী মিষ্টি মিষ্টি করে কথা বলে! কায়নাত ছলছল চোখে আলোর দিকে তাকিয়ে আছে অনেকক্ষণ ধরে। বুকে ব্যথা হচ্ছে। অর্ণ তার কাছে এমন একটা বাচ্চা আবদার করেছিল। বলেছিল তার একটা বাচ্চা চাই।

আরশি খুব মজার মানুষ। এর আগেও এই বাড়িতে আসা হয়েছে। প্রায়ই আসা হয়। প্রত্যেকবারই কায়নাত খুব বকবক করেছে, কিন্তু আজ বড্ড চুপচাপ। মুখটাও কেমন শুকিয়ে গেছে। ও বলল,
“ভাবির কী কিছু হয়েছে? আজ এত চুপচাপ কেন?”

কায়নাত মুচকি হেসে বলল,
“তেমন কিছু নয়। জ্বর এসেছিল তো, শরীরটা একটু খারাপ লাগছে।”

“তাই তো বলি, এমন চুপ থাকার মানুষ তো তুমি নও। সে যাইহোক, আমাদের ভাইজান কই? সুন্দরী বউ রেখে কোথায় ঘুরছে? কাল রাতে এসেছি অথচ এখনও তার দেখা নেই।”

নিশা তাড়াতাড়ি বলল,
“ভাইয়া তো বাড়িতে নেই। কাজে বের হয়েছে।”

“বোনের বিয়ে আর সে এখনও কাজ করছে?”

নিশা শুধু মুচকি হাসল। দুপুর বেলা বাড়ির সকলেই যখন খাওয়া দাওয়া সেরে বিশ্রাম নিতে উঠেছেন, তখন মাশফিক চৌধুরী নিজের ঘরে ডাকলেন স্ত্রীকে। বেহরুজ বেগম জানেন স্বামী কী বলবেন,তবু প্রস্তুত করলেন নিজেকে।

“তোমার ছেলে কী শুরু করেছে? বাড়ির মেয়ের বিয়ে আর তার কোনো খবর নেই। এসব কী মানুষের নজরে পড়ছে না?”

বেহরুজ বেগম বলেন,
“ও তো ছোট বাচ্চা নয় যে শাসন করব মেরে-ধরে।”

“এটা তো তোমার ভুল। ছেলেকে মানুষ বানাতে পারলে না।”

“নিজেদের ঝামেলা আমার উপর দিয়ে গড়াবে না বলে দিলাম।”

মাশফিক চৌধুরী ঢকঢক করে কয়েক গ্লাস পানি পান করলেন। অর্ণর খবর নেই—ব্যাপারটা এখন সবার নজরেই এসেছে। বাড়ি ভর্তি এত মানুষ, সবাইকে তো আর দমিয়ে রাখা যায় না। সবাই বোনের বড় ভাইয়ের কথা জিজ্ঞেস করবে এটাই তো স্বাভাবিক। সন্ধ্যার একটু পর পর পার্লার থেকে মেয়েরা আসলো। নুসরাত গাঢ় সবুজ রঙের লেহেঙ্গা পরেছে। বাকিরা পরেছে গাঢ় সবুজ রঙের শাড়ি। জারা শাড়ি তেমন একটা পরে না, কিন্তু আজ পরেছে। শাড়ির কুঁচি বারবার এলোমেলো হয়ে যাওয়ায় বেশ বিরক্ত সে। এই সময় সবাই ছাদে চলে গেছে। সে নেমেছিল নিজের ফোন নিতে, কিন্তু এখন মেজাজ খারাপ হচ্ছে কুঁচি ঠিক করতে গিয়ে। আশেপাশে কেউ নেই। সবাই নিচে কাজে ব্যস্ত। জারা ভাবল ঘরে গিয়ে শাড়ি পাল্টে জামা পরবে সে। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় কোত্থেকে যেন আদাল হুড়মুড়িয়ে সামনে এসে হাজির হলো। বড্ড হাপাচ্ছে ছেলেটা। জারা আশ্চর্য নয়নে তাকাল। বলল,

“তুমি এমন করে দৌঁড়াচ্ছ কেন? কিছু হয়েছে?”

আদাল শুকনো ঢোক গিলে সোজা হয়ে দাঁড়াল। বার কয়েক লম্বা শ্বাস টেনে জারার কাজল রাঙা চোখে চোখ রাখল। মৃদু গলায় ডাকল,
“শুনছো?”

এমন সম্বোধন জারা একটু অপ্রস্তুত হলো। আদাল বলল,
“তোমায় আজ চড়ুই পাখির মতো লাগছে। না সাজলে আরও বেশি সুন্দর লাগে।”

লজ্জায় লাল হলো মেয়েটার গাল। অস্থির চোখ জোড়া ছুটে পালাল এদিক-ওদিক। দুরু দুরু বুক নিয়ে ফটাফট বলল,
“আমি ঘরে যাব আদাল। শাড়িটা চেঞ্জ করব।”

“কেন?”

“শাড়ি খুলে যাচ্ছে।”

“আমি পরিয়ে দিব?”

বিস্ময়ে দুপা পিছিয়ে গেল জারা। আদাল মাথা চুলকে ঠোঁট কামড়ে হাসল। হাঁটু গেড়ে বসল জারার সামনে। শাড়ির কুঁচি ঠিক করে দিতে দিতে বলল,
“দায়িত্বটা আমায় দিলে মন্দ হয় না। যত্ন করে পরিয়ে দেব।”

জারার শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি। এমন ভয়ঙ্কর মুহূর্ত থেকে বাঁচতে খালি পায়ে দৌঁড়ে গেল ছাদের দিকে। খোঁপা করা চুল গুলো ততক্ষণে খুলে পিঠ ছড়িয়ে গেছে। আদাল গাল ভরে হাসল। দু চোখের পাতায় হাত রেখে বিড়বিড় করে বলল,
“লাজুক চড়ুই।”

ছাদের এক কিনারায় মোটা চাদর বিছিয়ে দিয়েছে প্রেম। নিশার পা মোটামোটি ঠিক হলেও কিছুটা ব্যথা রয়েই গেছে। বেশি সময় দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। তাই সেখানে ওর জন্য আলাদা করে জায়গা করে দিয়েছে। নুসরাতের চারপাশে অনেক মানুষ। সবাই মিলে ঘিরে ধরেছে ওকে। মেহেদী দিয়ে দিচ্ছে দুই হাত রাঙিয়ে। নিশা ফুপাচ্ছে। সামনেই বসে আছে স্বার্থ। খানিকক্ষণ আগেই এসেছে সে। নিশার রাগ ভাঙাতে পারছে না বলে মুখটা একটু বানিয়ে বসে আছে। বাড়িতে ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে বাবার সাথে বেশ ঝামেলা হয়েছে তার। অর্ণর সাথে সাথে তারও একটি ডিল হাত-ছাড়া হয়েছে। এই খবর চৌধুরী বাড়ির কেউ জানেন না। এখন যদি ঈশার বাবার প্রজেক্টটা ছুটে যায় তাহলে বড় সমস্যা হবে। স্বার্থ একটু একা থাকতে চেয়েছিল এই কদিন। মেন্টালিটি খুব ডিস্টার্বড থাকার কারণে সবার সাথে যোগাযোগ ছিন্ন করেছিল। বহুবার নিশার কাছে আসতে চেয়েছে, কিন্তু বিবেক বলেছে যাওয়ার দরকার নেই। বাড়িতে এখন এত বড় একটা অনুষ্ঠান আর এর মধ্যেই মাশফিক চৌধুরী ঝামেলা করলে পরিস্থিতি বিগড়ে যাবে। যেই লোক! একচুল পরিমাণ ছাড় দেবেন না।

স্বার্থ অপরাধীর ন্যায় আবার নিশার দিকে তাকাল। কেঁদে-কুটে মুখ লাল বানিয়ে ফেলেছে মেয়েটা। ও হাত বাড়িয়ে চোখের পানি মুছতে গেলে নিশা ধমকে উঠল,
“একদম ছুঁবে না আমায়। হাত সরাও।”

স্বার্থ থমথমে খেয়ে হাত সরিয়ে নিল।
“বলছি তো সরি। এমন করছিস কেন? হবু জামাইকে এভাবে কে ধমকায় বল তো সোনা?”

“তুমি আমার চোখের সামনে থেকে যাও।”

“অন্য মেয়েদের লাইন মারব?”

নিশা চোখ গরম করে তাকাল। স্বার্থ পাত্তা দিল না। নিশাকে জ্বালাতন করতে হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। সাদা শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে নুসরাতদের দিকে এগিয়ে গিয়ে গলা তুলে বলল,
“নাচ-গান বন্ধ করেছে কে? শুরু করো নাচ-গান।”

নিশার এক কাজিন চটজলদি উঠে দাঁড়াল। শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে বলল,
“আপনি নাচবেন?”

স্বার্থ আড়চোখে নিশাকে দেখে মাথা নাড়ল। ছাদে তখন নাজনীন, জয়া, প্রেম এবং বাড়ির সব ছোট সদস্য অব্দি হাজির। আদি মায়ের পাশে বসেছিল, স্বার্থর কথা শুনে সে-ও উঠে এলো। চারপাশ গানে গানে মেতে উঠল। কয়েকজন মেয়ে নাচ শুরু করেছে। সামনে স্বার্থ আর আদি কোনরকম মিউজিকের সাথে তাল মেলাচ্ছে। এক সময় কোত্থেকে যেন একটা মেয়ে নাজনীন আর প্রেমের হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল সেখানে। জয়া চোখ বড় বড় করে তাকাল। অন্যদিকে প্রেম আর নাজনীন দুজনেই হতভম্ব। নিশা দূর থেকে শুধু ফুঁসে যাচ্ছে। নিধি শান্ত চোখে তাকিয়ে আছে। কিন্তু জয়া ধৈর্য ধরে থাকতে পারল না। এক চিৎকার দিয়ে নাজনীনকে টেনে বের করল সেখান থেকে। বেচারা নাজনীন ভয় পেয়েছে বউয়ের কাণ্ড দেখে। জয়া ওকে টানতে টানতে অন্যপাশে নিয়ে এলো। বুকে ধাক্কা মেরে দাঁত চেপে বলল,

“কয়টা লাগে তোমার? তুমি ওই মেয়েদের সাথে ডলাডলি করছিলে কেন?”

নাজনীন শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে মিনমিন করে বলল,
“আমি আমার বউ ছাড়া কারোর সাথে ডলাডলি করি না।”

“একদম বাজে কথা বলবে না। ওই মেয়ে তোমার কী লাগে? কোন সাহস তোমার হাত ধরল সে?”

“আমি কী করে জানব? ওকে আমি চিনি? দেখেছি কোনোদিন?”

“ও যখন হাত ধরল কেন তুমি ঠাটিয়ে দুটো চড় মারলে না গায়ে?”

নাজনীন ওর রাগ কমাতে বুকে জড়িয়ে ধরল। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
“এত রেগে গেলে হয়? এটা বিয়ে বাড়ি না? এত আত্মীয় মানুষ—তাদের সাথে হঠাৎ খারাপ আচরণ করা মানায় না। ঝামেলা হবে।”

জয়া যেন বুঝল। নাজনীনের বুকে নাক ঘোষল। পর-মুহূর্তে কী মনে করে যেন নাজনীনের হাত ধরে সবার মাঝে উপস্থিত হলো। সবার নাচ থেমেছে সবে। জয়া সবার মাঝে নাজনীনকে নিয়ে বসল। হ্যান্ডহেল্ড ডাইনামিক মাইক্রোফোন হাতে দিয়ে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমি আমার জামাইয়ের জন্য একটা গান গাইব। শুনবে সবাই?”

সবাই ভাবল জয়া হয়তো ভালো গান গাইতে পারে। নাজনীনও কখনও ওকে গান গাইতে শোনেনি, তাই খুশি হলো মনে মনে। তবে প্রকাশ করল না। সবাই একসাথে হাত-তালি দিয়ে উঠল। উৎসাহিত করল গান গাওয়ার জন্য। দূর থেকে নিধি, মাহি আর সুহা আগেই কান চেপে ধরেছে। জয়া গাল ভরে হেসে খুঁকখুঁক করে কেঁশে নিল প্রথমে। স্বর তুলে শুরু করল গাওয়া,

   “বন্ধুরে তুই কাছে থাকলে মনে থাকে সুখ
 তোরে ছাড়া চাইনা দেখতে অন্য কারোর মুখ।

        বন্ধুরে…বন্ধু তুই প্রথম তুই শেষ,
  তোরে আমি ভালোবাসি জানে সারা দেশ 
                           বন্ধু রে…।”

সঙ্গে সঙ্গে নাজনীন হতভম্ব হয়ে ওর হাত থেকে মাইক্রোফোন ছিনিয়ে নিল। উপস্থিত সবাই হতবাক, হকচকিয়ে জয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। পার্লারের মেয়ে গুলো অব্দি বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে রেখেছে। কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধতার পর হঠাৎ ছাদ জুড়ে হাসির রোল পড়ে গেল। এক একজন হাসতে হাসতে মাটিতে বসেও পড়েছে। জয়া মুখ কালো করল সবার অবস্থা দেখে। চোখ পাকিয়ে তাকাল নাজনীনের দিকে। নাজনীন না পারছে কিছু বলতে আর না পারছে সইতে। সে লম্বা শ্বাস টেনে জয়াকে টেনে উঠাল। নিচে যাওয়ার আগে সবাইকে আবার এনজয় করতে বলল।

শেহের ভিডিও কল করেছিল বেশ কয়েকবার। নুসরাত ধরেনি। কেটে দিয়েছে প্রত্যেকবার। শেষে উপায় না পেয়ে নিশার ফোন কল করেছে। আদি মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে নিশার ফোন দিয়ে দেখাচ্ছে মায়ের হাতের মেহেদি। আর কুটকুট করে কথা বলছে তার সাথে। লজ্জায় জোড়সরো হয়ে বসে আছে নুসরাত। অন্যদিকে নিশা রেগে আগুন। এতে অবশ্য স্বার্থ বেশ মজা পাচ্ছে। মজা নিচ্ছেও। নিশা রেগে বেশ কয়েকবার চলে যেতে চেয়েছে, স্বার্থর জন্য পারেনি। স্বার্থ মেহেদী হাতে নিয়ে ভীষণ ভাবুক গলায় বলল,
“সোনা, তোর হাত খালি রেখেছিস কেন? জামাইয়ের জন্য খালি রেখেছিস?”

নিশা দাঁত চেপে বলল,
“তুমি আমার সাথে কথা বলবে না। যাও তো এখন থেকে!”

স্বার্থ ঠোঁট টিপে সোজা হয়ে বসল। নিশার হাত ধরে টেনে সামনে এনে সেখানে মেহেদী ছোঁয়াতে ছোঁয়াতে বলল,
“তুই রাগলে খুব সুন্দর লাগে। মনে হয় এখনই তুলে নিয়ে যাই।”

নিশা কিছু বলল না। রাগ চেপে কপাল কুঁচকে রাখল।
রাত তখন অনেক হয়েছে। অনুষ্ঠান বন্ধ হয়েছে আপাতত। কায়নাত সবে খেতে বসেছিল দাদি, শাশুড়ির সাথে। হঠাৎ হিনান দৌঁড়ে এলো সদর দরজা দিয়ে। ওকে দৌঁড়ে আসতে দেখে বেহরুজ বেগম কপাল কুঁচকে ফেললেন। হিনান বলল,
“বড় ভাই আইছে ম্যাডাম। নেশা কইরা আইছে।”

চলবে…?

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply