Golpo ডিফেন্স রিলেটেড মেজর ওয়াসিফ

মেজর ওয়াসিফ পর্ব ২৫


মেজর_ওয়াসিফ

লেখনীতেঐশীরহমান

পর্ব_২৫

[ 🚫 কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫]

লাল খয়েরী রঙের একটা অরজিনাল জামদানি শাড়ি গায়ে উঠেছে লুইপার। শাড়িটা ওর হবু স্বামীর তরফ হতেই এসেছে ওর নিকট। গহনা হিসেবে সামিরের আম্মার এক জোড়া বালা, একটা মোটা চেইন এক জোড়া কানের দুল ওকে পড়ানো হয়েছে।

সাজানোর হাত ওতো পাকা না হলেও যথেষ্ট সাজিয়েছে আপা ধারাকে। লুইপার চোখের পানি শুকিয়েছে সেই কখন। কিন্তু মুখটাতে নেই কোনো সজীবতার রেশ। মলিন মুখটার দিকে তাকিয়ে থেকে ধারা বলে।

‘ আমার আপার সব দুঃখ ফুরিয়ে যাক, আমার আপার জীবন সুখে ভরে যাক’

লুইপা মাথা তুলে চাইলো বোনের দিকে, হুট করেই কেঁদে উঠে জড়িয়ে ধরে বোনকে। ধারাও শক্ত করে আগলে নেই তার আপাকে। একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে কতক্ষণ ওরা। আজকের এই সময়টুকুর পর ওদের দু’টো বোনের জীবন দুটো পথে হাঁটবে। আর থাকা হবেনা একই বাড়ির ছাদের নিচে একই রুমের বিছানায়। আর কখনো কথা-কাটাকাটি হবেনা ওদের দুবোনের। আর হবেনা রাত জেগে গল্পের ঝুড়ি মেলা। হুট করে দৌড়ে এসে এক বুক উল্লাস নিয়ে ছুটে এসে পাওয়া যাবে না আপাকে এই ঘরে। এতটুকু ভেবেই ধারার মন শূন্য হয়। ওকে সব থেকে যে মানুষটা বেশি বুঝতো সেই মানুষটার বিদায় ঘন্টা বেজে যাবে আর কিছু সময় পরই।

চোখের পানিটুকু মুছে নাক টেনে নিজেকে সামলে নেয় লুইপা। দু’হাতে বোনের মুখটা আগলে রেখে বলে।

‘ আমিও তোকে অনেক অনেক দোয়া করি, ভাইজানের সঙ্গে তোরও একটা সুন্দর, সুখের সংসার হোক। তুই ভালো থাক, তোর সঙ্গে ঐ মানুষটাকে ভালো রাখ’

ধারা কিছু বলেনা, চুপচাপ আপার কাঁধে মাথা এলিয়ে রেখে শুনতে থাকে কথা গুলো।


রাত যতো ভারি হচ্ছে বাইরের ঝড়ো হাওয়া সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টির ফোটাও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। আপাকে ছেড়ে ধারা গিয়ে ছুটে ছুটে দোতালার ঘরের সব জানালা গুলো এঁটে দেয়। আপার ঘরে ওর পাশে তার মামিকে বসিয়ে রেখে ধারা ছুটে একবার নিচে আসতেই সামিরা মেয়েকে ধমকে বলে।

‘ এই তোর জামা কাপড়ের ছিরি কি? কামলার মতো মেহমানদের সামনে না ঘুরে জামা কাপড় পাল্টে আয়, নয়তো ওরা মনে মনে ভাববে ওয়াসিফের অনেক অভাব বৌকে জামা কাপড় দেয়না,কোনোরকম পেটে কয়টা খেতে দেয়’

ধারা ও কথা শুনে মুখে ভেঙেছি কেটে বলে।

‘ আজ অব্ধি কয়টা জামা কাপড় কিনে দিয়েছে তোমাদের ঐ ওয়াসিফ? এই ধারা এখনো বুক ফুলিয়ে বলতে পারে ও এখনো বাপের দেওয়া যে জামাকাপড় আছে তা দিয়ে এক যুগ চলে যাবে’

সামিরা হাতের কাজ থামিয়ে মেয়ের দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে থেকে বলে।

‘ তোর চোপার উপর আমি একটা কঠিন থাপ্পড় মারবো বেয়াদব মেয়ে। হিসেব ছাড়া বেয়াদব হচ্ছিস, স্বামীর নাম মুখে নিতেও চোয়াল আঁটকায় না’

ধারা চুপসে যায় মায়ের ধমক খেয়ে, বিড়বিড় করে কিসব বলতে বলতে দোতালায় ওঠে। পেছন থেকে সামিরা মেয়েকে ডেকে বলে।

‘ এই তুই কিন্তু এই বেশে আর নিচে নামবি না, তোকে এভাবে ফকিন্নি বেশে দেখা যাচ্ছে না ‘


দোতলার এপাশে অন্ধকার, এখানে আলো দেওয়া হয়নি, ঘরগুলো থেকে আবছা যতটুকু আসছে এই যা। ধারা ঐটুকু আলোতে হাঁটছে আর বিড়বিড় করছে।
ঐ লোক কে নিয়ে মায়ের সামনে একটা কথাও বলা যায় না। তার মেয়ে কে বিয়ে করেছে বলে যে সামিরার ওয়াসিফের প্রতি এতো দরদ তা না, বহু আগে থেকেই ধারা বিষয়টা খেয়াল করেছে। একদম নিজের পেটের বড়ো ছেলের মতো করে ওয়াসিফ কে ট্রিট করে সামিরা। ছুটিতে বাড়িতে এলে তার পাতে বড়ো মাছের মাথা থেকে শুরু করে ভালো জিনিস গুলো বেছে বেছে দেয়। এই বিষয় গুলো ধারার মোটেও পছন্দ না। ও হিংসে করে ঐ লোকটাকে। কেনো? তার কেনো এতো ভালো ভালো জিনিস পেতে হবে সবার থেকে?

আপন মনে বকতে বকতে ধারা হাঁটছিলো, উদ্দেশ্য আপার কাছে গিয়ে বসে থাকা। আচমকা হাতের কব্জিতে টান পড়তে পিলে চমকে ওঠে ধারার। মুখ দিয়ে যে শব্দ বেরুবে সেই উপায়ও নেই। একটা পুরুষালি শক্ত পোক্ত হাত ওর মুখটা চেপে রেখে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। অন্ধকারের তাড়নায় ও স্পষ্ট করে দেখতে পাচ্ছে না লোকটাকে। মিনিট খানেক পর আলোর ছটায় স্পষ্ট দেখে ওয়াসিফ কে, ততক্ষণে ওয়াসিফ নিজের ঘরে ঢুকে দরজা আঁটকেছে, ধারার মুখ থেকে হাত সরিয়ে তাকায় ওর দিকে ওয়াসিফ। ধারা হাফ ছেড়ে উঠে বুকে থুথু দিয়ে বলে।

‘ এভাবে টেনে আনলেন কেনো? ভয়ে পেয়েছি না আমি’?

ওয়াসিফ অবাক ভঙ্গিতে শুধায়।

‘ তুই ভয় পেতেও জানিস’?

‘ তা ভয় পাবো না? ওভাবে টেনে আনলে যে কেউ ই ভয় পাবে? আপনি ও পেতেন’

ওয়াসিফ ওর কথার জবাব না দিয়ে, খাটের উপর ইশারা করে দেখিয়ে বলে।

‘ ছয়টা শাড়ি, চারটে থ্রি-পিচ, ঐগুলো তোর। রেডি হয়ে নিচে আয়’

বলেই ওয়াসিফ দরজা খুলতে হাত বাড়াতেই পেছন থেকে ধারা বলে।

‘ আপনার দেওয়া জামাকাপড় আমি পরবো না। কিনেছেন কেনো ওসব? আমি ওসব নেবো না’

ধারার মুখ থেকে বের হওয়া এই তিনটে বাক্য ওয়াসিফের মেজাজ তুঙ্গে তুলতে যথেষ্ট ছিলো। কথা গুলো কানে যেতেই ওয়াসিফের চোয়াল শক্ত হয়। ও ঘুরে দাড়িয়ে হাত বাড়িয়ে আচমকা এক টানে টেনে এনে হাতদুটোকে পেছনে ধরে চেপে ধরে ভরাট গলায় বলে।

‘ আরেকবার বল! কি বলেছিস আরেকবার বল’

এতো কাছ থেকে ওয়াসিফের এমন চাহনিতে মিইয়ে যায় ধারা। শক্ত হাতে বাঁধা পড়া হাত দু’টো ছুটিয়ে নিতে চেয়েও পারেনা। অযথাই মোচড়ামুচড়ি করতে থাকে। মিনমিন করে বলে।

‘ কি বলেছি শোনেন নি’?

ওয়াসিফ দৃষ্টি ওর ডাগর চোখের দৃষ্টির দিকে স্থির রেখেই বলে।

‘ আরেকবার শুনতে চেয়েছি’!

‘ এই শুনতে চেয়েছি’ বলাটার বিপরীতে ধারা আন্দাজ করে নিলো ‘ তুই আরেকবার উপেক্ষা কর আমার তরফ থেকে দেওয়া জিনিস গুলো কে, তোকেও আমি তুলে ধরে একটা আছাড় মারি কায়দা মতো’

ধারা কতক্ষণ ঐ দৃঢ় চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে।

‘ আমার হাতে ব্যথা পাচ্ছি, ছাড়ুন’

ওয়াসিফ হাতের বাঁধন সামান্য ঢিলে করে, কিন্তু ছাড়েনা, ধারা হাত ছোটাতে চাইলে ধমকে বলে।

‘ নড়ছিস কি জন্য? আগে কথার জবাব দে’

‘ কি কথা? আর কি জবাব দেবো’?

‘ আমার দেওয়া শাড়ি পরবি না কেনো? কি দোষ ওতে’?

‘ শাড়ির কোনো দোষ নেই ‘?

‘ তাহলে দোষ কার’?

‘ আপনার ‘?

‘ যেমন’?

‘ চার বছর হঠাৎ এতো দয়া আপনার মধ্যে কোথা থেকে এলো? দয়া করে আমাকে বিয়ে করেছেন তাই না’?

ওয়াসিফ স্থির চোখে তাকিয়ে আছে ঐ দুটো চোখের দিকে। এই মুহূর্তে এক নিমিষেই ধাউ করে ওঠা রাগটুকু নিভে গেলো ওয়াসিফের, বরং নরম হলো ও, নরম হলো ভেতর থেকে ও। হাত দুটো ছেড়ে দিলো ধারার চিকন হাত দু’টোকে। খসখসে হাত দু’টো উঠে এসে গাল ছুলো ধারা। ধারা কিছু বলেনা, শুধু তাকিয়ে রয় নিরব। ওয়াসিফ বলে।

‘ আমি তোকে কোনো দয়া করিনি মুমতাহিনা, যা করেছি, যা যা সবকিছু আমার মন বলেছে তাই করেছি।’

‘ মিথ্যে কথা ‘

‘ সত্যি, সব সত্যি ‘

কথাগুলো বলতে বলতে ওয়াসিফ কপালে কপাল ঠেকিয়ে দেয়, ধারা শক্ত হয়ে দাড়িয়ে থাকে ওভাবে। এই মুহূর্তে ওর চোখে পানি জমে। ধরা গলায় বলে ওঠে।

‘ চার বছর আগে তবে আপনার মন কি বলেছিলো মুমতাহিনা নামের মেয়েটাকে উপেক্ষা করে ভেঙে চুরে ফেলতে’?

ওয়াসিফ ওভাবেই কপাল ঠেকিয়ে নিভু গলায় বলে।

‘ তুই তখন খুব ছোট ছিলি, ঐ সময় ঐ মুহূর্তে তোর থেকে পাওয়া ঐসব কথা গুলো আমার ঠিক হজম হয়নি, বরং মনে হয়েছিল ওটা বয়সের গড়মিল। আর তুই খুব ভালো করেই জানিস আবেগে গা ভাসিয়ে চলা ছেলেটি আমি নই’

ধারা ফুপে কেঁদে উঠে এবার জানতে চায়।

‘ তা ঠিক চারবছর পর আপনার কেনো মনে হলো যে আমাকে বিয়ে করা উচিত আপনার ‘?

‘ সে অনেক হিসাব’

‘ আমাকে বলুন, আমি শুনতে চাই’

‘ পরে কখনো ‘

ধারার জেদ বাড়ে

‘ না আপনি এখন বলবেন, আমি এখনই শুনতে চাই ‘

ওয়াসিফ ওর থেকে সরে গিয়ে দাঁড়ায় এবার, গায়ের পানজাবির কলার ঠিক করে নিতে নিতে বলে।

‘ সবসময় জেদ ভালো না, যখন বলেছি বলবো, সময় বের করে বলবো একদিন ‘

‘ আর কবে বলবেন? আমি মরে কবরে গেলে? তখন বলে কাকে শোনাবেন’?

ওয়াসিফ তাকায় ওর দিকে, ধারা কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে ওয়াসিফের দিকে। ওয়াসিফ বলে।

‘ এমন একটা থাপ্পড় খাবি, তোর মুখ এ পাশে বেঁকে যাবে এই উল্টা পাল্টা কথার জন্য ‘

এবার ধারা রাগে চিড়বিড় করে উঠে বলে।

‘ হ্যা হ্যা, থাপ্পড় ই মারুন। আপনি থাপ্পড় মারুন, আমার মা ও আমাকে একটু আগে থাপ্পড় মারতে চাইলো। আপনারা সবাই মিলে আমাকে থাপ্পড় মারুন। আমার জন্ম ই হয়েছে আপনাদের থাপ্পড় খাওয়ার….’

পুরোপুরি কথা শেষ হয়না ধারার, তার আগেই ওর ডান গালে পরপর বাম গালে এক জোড়া উষ্ণ ঠোঁটের ছোঁয়া পেতেই সঙ্গে সঙ্গে বরফের ন্যায় জমে যায় ধারা। ও অনুভূতি সামলে চৈতন্য ফিরতেই ওয়াসিফ ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলে।

‘ জলদি তৈরি হয়ে লুইপার ঘরে যা’


লুইপার ঘরে জড়ো হয়েছে ওর চাচীরা, মামি, আর ধারা। কাজীর সঙ্গে ঘরে ঢুকেছে ওয়াসিফ আর লুইপার বাবা।
ধারা কাঁধ পেচিয়ে রাখা শাড়ির আঁচলটা আরেকটু খানি টেনে এনে আড়চোখে তাকায় ওয়াসিফের দিকে। ধারা আজ ইচ্ছেতে হোক বা কারো কথা শুনে হোক একটা কাতান শাড়ি গায়ে জড়িয়েছে। কিন্তু ও পড়েছে মসিবতে, খসখসে শাড়ি এদিক দিয়ে টানলে ওদিক দিয়ে সরে যাচ্ছে। এমনিতেই ও শাড়ি সামলাতে ভীষণ অদক্ষ। ওয়াসিফের দিকে চাইতেই দেখে ওয়াসিফ সবার দৃষ্টি উপেক্ষা করে ঠান্ডা চোখে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। এই মুহূর্তে ভীষণ লজ্জা করছে ধারার, ও চাইছে ওয়াসিফের দৃষ্টি থেকে বাঁচতে। ও সরে বসে আরেকটু লুইপার সঙ্গে চেপে বসে উশখুশ করে তবুও ওয়াসিফের দৃষ্টি সরেনা।

ইতিমধ্যে, কাজী সব কিছু রেডি করে যখন ই কনেকে কবুল বলতে তাড়া দেয়, লুইপার ভেতরটা কেঁপে ওঠে বারবার। ধারা নিজের সংকোচ কাটিয়ে আপার হাতটা শক্ত করে চেপে রেখে বলে।

‘ আপা, কবুল বলে দে, কবুল বল আপা’

অতঃপর,
লুইপার মুখ থেকে তিনবার পবিত্র শব্দটি উচ্চারিত হতেই অজানা, অপরিচিত দুটি মানুষ এক রহমাতের সুতোয় বাঁধা পড়ে গেলো গোটা একটা জীবনের। কাজী সমেত বাকিরা বেরিয়ে যেতেই লুইপা, বোনকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্না করে। ধারা সামলে উঠতে পারছেনা নিজেকে, শক্ত করে আপাকে বুঝ দেওয়ার সব ক্ষমতা হারিয়ে ও কাঁদে ভীষণ।

চলবে

গল্প পড়ে অবশ্যই লাইক কমেন্ট করে যাবেন। আমার পেজটি ফলো করবেন।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply