Golpo ডিফেন্স রিলেটেড মেজর ওয়াসিফ

মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৩০


#মেজর_ওয়াসিফ

#লেখনীতে_ঐশী_রহমান

পর্ব (৩০)

মাঝে কেটে গেলো সপ্তাহ খানেকের ও বেশি সময়। এই সময়টুকুতে ওয়াসিফ থেকেছে ভারি ব্যস্ত। ঠিকমতো না নিয়েছে নিজের প্রতি খেয়াল, না নিয়েছে সময় করে বাড়ির খবরাখবর। মাঝে মধ্যে মায়ের হুটহাট কলে সেকেন্ড কয়েক কথা বলে কেটেছে লাইন। এতো এতো সব ব্যস্ততা সামলে উঠতে গিয়ে কখনো কখনো মেজাজ হারিয়েছে বারবার। চরম বিরক্ত হয়েছে কয়েকবার।

মানুষ যখন লাইফের কোনো চূড়ান্ত লক্ষ্য ঠিক রেখে এগোতে চায় এবং বারবার, প্রতিবারই সেই লক্ষ্য থেকে সরে যায় বা ছুটে যায় তখন মানুষ তার বিরক্তির চরম লেভেল অতিক্রম করে যায়। ওয়াসিফের ব্যাপারটাও এখন ঠিক তেমনই।

ঘড়ির কাটা তখন রাত পৌনে একটার কাছাকাছি। ঘর্মাক্ত শরীরে এখনো ছাপিয়ে আছে সেনাবাহিনীর জলছাপার ইউনিফর্ম ও উজ্জ্বল ব্যাচগুলো। সারাদিনের ক্লান্ত শরীরখানা টেনে নিয়ে ঢুকলো নিজস্ব কটেজে। কটেজের পুরো ঘরগুলো তখন ঘুটঘুটে অন্ধকারে তলিয়ে আছে। সেই যে ভোরবেলায় বেরিয়েছিলো আর ফিরলো সবে। ওয়াসিফের আর ইচ্ছে করে না ঘরের বাতিগুলো জ্বালিয়ে আলো দিতে।চেনা-পরিচিত কটেজ ওর। অন্ধকারের মধ্যেও বুঝতে পারে কোথায় কি। ভেতরে ঢুকে খট করে দরজা বন্ধ করে হেঁটে গিয়ে দাড়ায় কটেজের বারান্দায়। বারান্দার দরজা খুলতেই এক ফালি চাঁদের আলো এসে হুমড়ে পরলো কটেজের রুম জুড়ে। ওয়াসিফ তা উপেক্ষা করে চুপচাপ বসলো ইজি চেয়ারটাতে। ইউনিফর্মের গলার কাছের দু’টো বোতাম খুলে শরীরটা এলিয়ে দিয়ে রাখলো চেয়ারে। চার তালার দক্ষিণের বারান্দায় হৈ হৈ করে ভারি রাতের হাওয়ায় সারাদিনের ক্লান্তি ভরা শরীরটা যেনো একটু সস্তির দিশা ফেলো।

মিনিট দশেক পর ভাইব্রেট করে রাখা ফোনটা বেজে উঠতেই লেগে যাওয়া চোখ দুটো ঝাপটে হেলিয়ে রাখা শরীরটা উঠে বসে ফোনের স্কিনে রাখতেই দেখলো

‘ শশী( জুনিয়র অফিসার)’ লিখে সেইভ করা নাম্বার থেকে কল। এতোরাতে ফোনকল পেয়ে কপালের স্তরে ভাজ ফেলে তাকিয়ে থেকে, যেই মুহূর্তে কল শেষ হবে ঠিক ঐ মুহুর্তে কলটা রিসিভ করলো ওয়াসিফ। ফোন কানে ঠেকাতেই ওপাশ থেকে মোলায়েম মেয়েলি কন্ঠ ভেসে এলো।

‘ স্যার কি কটেজে ফিরেছেন’?

‘ জি, মাত্র ‘

‘ ফ্রী আছেন’?

‘ কেনো জরুরি কিছু ‘?

‘ জি, মানে, জরুরি ই। স্যার ঐ ডকুমেন্টস বিষয় একটু আলাপ ছিলো ‘

ওয়াসিফের স্পষ্ট জবাব, ‘ কাল করবো’

‘ স্যার দেরি হয়ে যাবে, এখন করলে কি সমস্যা ‘?

‘ আমি ক্লান্ত ‘ এই কথাটুকু ওকে বলতে গিয়েও ওয়াসিফ বলেনা। ও কে? তাকে ক্লান্ত না ভালো এসব বুঝিয়ে বলতে হবে? ওয়াসিফ বলে।

‘ আপাতত আমি অন্য কিছু ভাবছি শশী, এই বিষয় কাল আলোচনা, রাখছি’

ওয়াসিফের তরফ হতে কল যে কেটে যাবে বিষয়টা বুঝতে পেরে শশী তাড়াহুড়ো করে বলে।

‘ স্যার! আমি কি কটেজে আসতে পারি? আসলে আমার কাছে একটা ইনফরমেশন আছে, বিষয়টা নিয়ে আপনার সঙ্গে আলোচনা খুব জরুরি ‘

এই মুহূর্তে ওয়াসিফের মেজাজ নিয়ন্ত্রণ ওর হাতে নেই। তবুও চেষ্টা চালিয়ে কড়া গলায় বলে।

‘ নো। তুমি কটেজে আসতে পারোনা। আগামীকাল অফিশিয়াল আলোচনা হবে এই বিষয় ‘

কথা শেষ করেই ওয়াসিফ নিজে ফোনকল কাটে। বিপরীত পাশের আর কোনো কথা শোনার অপেক্ষায় থাকে না। ফোনটা সেন্টার টেবিলের উপর ছুড়ে ফেলার মতো করে রেখে পুনরায় গা এলিয়ে দেয় ইজি চেয়ারে। মস্তিষ্ক জুড়ে ভাবনারা ঝেকে ধরে। দুইয়ে দুইয়ে যদি চার মিলেও যায় তবে এই কাহিনি এখানে শেষ হবে আবার হবে না। ধারণা করা যায়, ডকুমেন্টস চুরির পেছনে কাছের কারো হাত নিশ্চয় আছে। এরই মধ্যে ফোনটা আবারও বেজে উঠতেই ওয়াসিফ বিরক্ত নিয়ে ফোনটা হাতে তুলতেই দেখে সামিরের কল। ফোনটা রিসিভ করলো ওয়াসিফ।

‘ কিছু বলবে সামির’?

‘ স্যার, কি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন? আসলে সরি স্যার, এতোরাতে কল করার জন্য ‘

‘ ফর্মালিটি সাইডে রেখে সোজাসাপটা বলো, জরুরি কিছু ‘?

‘ জি স্যার’

‘ বলে ফেলো’

‘ বলছিলাম স্যার, ডকুমেন্টস যদি সত্যি ই চুরি হয় তবে তারা এখনো কেনো চুপচাপ আছে, আমাদের উপর এটেম* টু মা*র্ডা*র স্টেপ কেনো নিচ্ছে না?’

‘ তোমার কি মরার অনেক শখ হয়েছে সামির’?

‘ নো স্যার’

‘ ডকুমেন্টস কিভাবে চুরি হলো, কে করলো এ-সব কিছু না ভেবে এই মাঝরাতে তুমি আমাকে কল করে জিজ্ঞেস করছো ওরা কেনো আমাদের মা*র্ডা*র করছেনা’?

সামির কিছু বলতে যাবে তার আগেই ওয়াসিফ ওকে থামিয়ে দিয়ে বলে।

‘ তুমি আর আরিয়ান কাল থেকে জোড়া ভেঙে আলাদা থাকবে। তোমাদের কাজও আলাদা আলাদা সেক্টরে করে দেবো আমি। দুটো একসঙ্গে থেকে থেকে যার যে টুকু বুদ্ধি, জ্ঞান ছিলো সব গিলে ফেলেছো’

ওয়াসিফের ধমক খেয়ে সামির মৃদুস্বরে ডাকে।

‘ স্যার’!

‘ আবার কি’?

‘ আমার মনে হয় ডকুমেন্টস চুরি হয়নি, ডকুমেন্টস হারিয়ে গেছে। আপনি বলেন স্যার, ডকুমেন্টস যদি চুরি হতো তবে ওরা কি এতোদিন আমাদের জান নিয়ে ঘুরতে দিতো, যে ডকুমেন্টস চুরি করবে সে কি এতোদিন ওসব নিয়ে বসে থাকবে? পাবলিশ করে দেবেনা সবকিছু ‘?

ওয়াসিফ মনোযোগ দিয়ে শুনলো কথা গুলো। নিরব দম ফেলে বললো।

‘ যদি এমন হয়, ডকুমেন্টস গুলো চোর চুরি করে তাদের ই হাতে তুলে দিয়েছে, তারা এখন নিশ্চিত, তাদের কোনোকিছু ই প্রকাশ্যে আসবেনা। আবার শুরু করেছে তাদের পাপ কাজ। যদি ব্যাপারটা এমন হয় সামির? তখন কি বলবে তুমি ‘?

‘ এরকমটা তো কখনো ভেবে দেখিনি স্যার’?

ওয়াসিফ সামান্য হেঁসে বলে।

‘ তোমাদের ভাবনা চিন্তা যেখানে শেষ হয়, মেজর শাহেদ ওয়াসিফের চিন্তা ভাবনা ঠিক সেখান থেকে শুরু হয়। এবং খুব গভীরে গিয়ে ঠ্যাক খায় সেসব চিন্তারা। ‘

সামির কিছু বলতে যাবে তার আগেই ওয়াসিফ বলে।

‘ রাখছি এখন, আগামীকাল কথা হবে’

‘ ওকে স্যার’

__________

এদিকে ধারা’রও বেড়েছে ভীষণ চাপ। এতোদিন পড়াশোনা সেভাবে না করার ফলাফল মেয়েটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। গত পরশু হুট করেই নোটিশের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছে টেস্ট পরীক্ষা তারিখ সমূহ। মাথার উপর এখন পাহাড়সম ভার। কবে? কিভাবে এতো এতো বইয়ের সিলেবাস ও এই কয়দিনে শেষ করবে? সাবজেক্ট গুলো ও মারাত্মক। ফিজিক্স, হায়ার ম্যাথ, রসায়নের জৈব যৌগের চ্যাপটার। টেনশনে টেনশনে মেয়েটা প্রায় পাগল হতে বসেছে।

সমস্ত বিছানায় বই,খাতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে ধারা চার হাত পা মেলে চিত হয়ে শুয়ে আছে। চোখ সিলিং এর দিকে।

সন্ধ্যায় বেশ ঝাল ঝাল করে মুড়ি,চানাচুর একসঙ্গে মেখেছিলো বড়োমা। ধারাকে কতবার ডাকার পরও গেলোনা মেয়েটা। লুইপা একবাটি মুড়ি-চানাচুরসমেত নিয়ে ঘরে ঢুকেই দেখে বোনের ঐ অবস্থা। লুইপা কোমরে হাত চেপে ভীষণ বিরক্ত হয়ে ওকে দেখতে দেখতে বলে।

‘ কতবার বলেছি, তুই একটু পড়, পড়তে বোস, ইন্টারমিডিয়েটের সাইন্স খুব কঠিন। তখন শুনিসনি কথা, পড়া তো দূরে থাক। দুদিন বাদে সাতদিনের মাথায় তোর পরীক্ষা তুই এখন টেনশন করবি না পড়া মুখস্থ করবি’?

ধারা শোয়া থেকে উঠে বসে, মুখটা ভার রেখেই বলে।

‘ আস্তে বল আপা, মা শুনতে পেলে পিঠের চামড়া তুলে ফেলবে’

লুইপা মুড়ির বাটির ওর সামনে রেখে ধমকে বলে।

‘ চামড়া তুলে ফেলাই উচিত, ইদানীং তুই খুব বেড়েছিস কারো কথাই শুনিস না’

‘ তুই ও আমাকে এভাবে বকছিস আপা’?

‘ বকি কি আর সাধে, তোর ভালোর জন্য ই তো…’

লুইপার কথা শেষ হয়না, ধারা ধুপধাপ বইগুলো গুছিয়ে শোশো গতিতে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলে।

‘ আমি খারাপ, তাই তোরা সবাই বকিস, আমি আসলেই খারাপ, আমিই সত্যি ই খারাপ ‘

লুইপা বুঝতে পারেনি মেয়েটা এভাবে চ্যেতে যাবে। ইশ! ও কি একটু বেশিই বকাঝকা করে ফেললো? এমনিতেই মেয়েটা পরীক্ষার টেনশনে শেষ হয়ে যাচ্ছে। লুইপা সঙ্গে সঙ্গে মুড়িমাখার বাটি হাতে ছোটে পেছন পেছন।

‘ এই ধারা শোন! আরে আমি ওতো বকিনি তো’

‘ ও ধারা, বোন আমার শোনা না বাবু’

কে শোনে কার কথা, ধারা সোজা হেঁটে গিয়ে ওয়াসিফের ঘরের দরজা আঁটকে দেয়। ওয়াসিফ চলে যাওয়ার পর থেকে ধারা এঘরে একবারের জন্য ও আসেনি। তবে আজ আসতে বাধ্য হয়েছে, নিজের রাগ ধরে রাখতে। এবাড়িতে আপাতত এ ঘরটাই ওর জন্য নিরিবিলি। এখানে কেউ এসে বলবে না, সাইডে ঘুরে বোস, ওপাশে সরে ঘুমা। আস্তে পড়, জোরে পড়। লুইপা মিনিট দুই বন্ধ দরজার সামনে ডাকাডাকি করলেও লাভ হয়না, ধারা ডাকের সাড়াশব্দ দেয়নি।

#চলবে

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply