মেজর_ওয়াসিফ
লেখনীতেঐশীরহমান
পর্ব_২৩
[ 🚫 কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫]
পরিচিত উঁচু গলার চিকন মেয়েলি কন্ঠে কদম জোড়া থামিয়ে পেছন ঘোরে ওয়াসিফ। ওয়াসিফ থামতেই ধারা ছুটে গিয়ে থামে তার মুখোমুখি। এক প্রকার হাঁপিয়ে গিয়ে লম্বা করে টেনে দম নিয়ে বলে।
‘ আপার একটা বন্দোবস্ত না করে এভাবে পালিয়ে যাচ্ছেন কেনো’?
ওয়াসিফ ভ্রু যুগল কুঁচকে ফেলে জিজ্ঞেস করে।
‘ কে পালিয়ে যাচ্ছে? আমি’?
‘ তা নয়তো কি? সেদিন না আপনি মুনিব ভাই কে খুব দম্ভ করে বলেছিলেন, মুনিব ভাই যদি আপনার বোন নিতে পরিবারসহ আসে তবে আপনি শাহেদ ওয়াসিফ ওদের চারহাত এক করে দিবেন? তাহলে এখন পালিয়ে যাচ্ছেন কেনো? তবে কি আমারা বুঝে নেবো আপনার কথার কোনো দাম নেই? ‘
কড়কড়া রোদের এক ছটাক এসে পড়েছে ঐ শ্যাম রঙের গম্ভীর মুখটার উপর। কপাল ঘেমে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে ঐ চওড়া কপালে। এই পাঁচ ফুট উচ্চতার মেয়েটির তাচ্ছিল্য করে বলা কথাগুলো খুব শান্ত ভঙ্গিতে উড়িয়ে দিয়ে ওয়াসিফ এক হাত উঠিয়ে তালু দিয়ে কপালের ঘাম টুকু মুছে নিতে নিতে বলে।
‘ এই গরমে ঘর থেকে বেরিয়েছিস কেনো পাগলে কামড় দিয়েছে? বাড়ি যা’
কথা শেষ করেই ওয়াসিফ সামনে এগোনোর জন্য পা বাড়াতেই ধারা দু’হাতে খপ করে টেনে ধরে ওয়াসিফের একটা হাত। ওয়াসিফ আবার ঘুরে দাড়িয়ে তাকায় ওর নিজের হাতটার দিকে, যে হাতটা ধারা পেচিয়ে ধরে রেখেছে। এরপর তাকায় ধারার মুখের দিকে। ইতিমধ্যে মেয়েটার চোখে পানি জমেছে। ওয়াসিফ বুঝতে পারে না হঠাৎ হলোটা কি? কান্না চেপে ধরা গলায় ধারা বলে।
‘ আপা মরে যাবে, আপনি এভাবে চলে যাবেন না প্লিজ। সেজো চাচুকে একটু বোঝান। এই ঝিম ধরে থাকা আপাকে আমার সহ্য হচ্ছে না। আপনার কাছে আমার অনুরোধ, আপনি চাচুকে বুঝিয়ে বলুন, প্লিজ কঠিন হবেন না। ঐ মেয়েটা এবার সত্যি সত্যি ই মরে যাবে ‘
ওর এভাবে আকুতি মিনতি কতটুকু এই লোকের মন গলাতে পারলো তা কে জানে। তবে মিনিট খানেক ওয়াসিফ কে চুপচাপ ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ধারা জিজ্ঞেস করে।
‘ আপনি কি সত্যি ই চলে যাবেন? রাখবেন না আমার কথা ‘?
ওয়াসিফ কোনো কথা বলে না, শুধু তাকিয়ে থেকে কিছু একটা ভাবে, এরমধ্যে ধারা আবার ও জিজ্ঞেস করে।
‘ কথা বলেন না কেনো আপনি? কিছু বলেন’?
ওয়াসিফ তাকায় ধারার দিকে, বলে।
‘ যে ঝামেলাটা আমি চাচ্ছিলাম না তুই টেনে এনে সেটা আমার কাঁধে রাখলি। আচ্ছাহ রাখলাম তোর কথা, তোর আপাকে বিয়ে দিয়ে তবেই যাবো। চল’
ওয়াসিফ উল্টো ঘুরে বাড়ির পথে হাঁটা ধরতেই ধারার মুখে এক চিলতে হাসি ফোটে। ওয়াসিফ যখন ওর কিছুটা পথ সামনে এগিয়ে গেছে ধারা ছুটতে ছুটতে ওয়াসিফের পেছন পেছন বাড়ির দিকে এগোয়। হঠাৎ থেমে গিয়ে পেছন ফিরে ওয়াসিফ, দেখে ধারাকে। আদেশের সুরে বলে।
‘ কোমরে পেচিয়ে রাখা ওড়নার ঐ অংশটা খুলে মাথা তোল। এখনি তুলবি!’
ধারার মন আপাতত ভীষণ ভালো, ও বিনাবাক্যে ওয়াসিফের আদেশ মেনে ওড়না সুন্দর মতো মাথায় তুললো। পরপর আবার ওয়াসিফ বলে।
‘ এবার রাস্তা দিয়ে সুন্দর মতো হাঁটবি, দৌড়ঝাঁপ তো দূরে থাক জুতার শব্দ যেনো না হয়’
ধারা সম্মতি জানিয়ে মাথা কাত করতেই ওয়াসিফ আবার হাঁটা ধরলো। ওর দু-হাত পেছনে ধারা হাঁটছে।
মিনিট পাঁচেকের রাস্তা পেরিয়ে যখন বাড়ির ফটকে পা রাখলো ওয়াসিফ তখন আরেকবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় ওর থেকে কিছুটা দূরত্বে থাকা ধারাকে। ওয়াসিফ এবার পুরোপুরি পেছনে ঘুরে চোখ মুখ কুঁচকে ফেলে। ধারা নিকটে এগোতেই বলে।
‘ দাড়িয়ে পরলেন কেনো? চলুন ভেতরে’
ওয়াসিফ ওর হাতের দিকে দৃষ্টি রেখে বলে।
‘ পায়ের জুতা হাতে নিয়েছিস কেনো’?
এমন প্রশ্নে ধারা মোটেও অবাক হলোনা বরং সাহসের সাথে বললো।
‘ কেনো? আপনি ই তো তখন বললেন দৌড়ঝাঁপ তো দূরে থাক জুতার শব্দও যেনো না হয়। তাই খুলে হাতে নিয়েছি। কোনো শব্দ তো হয়নি’
এরপর ওয়াসিফ কয়েক সেকেন্ড হতাশ চোখে তাকিয়ে থেকে বলে।
‘ আর কবে মানুষ হবি তুই ‘?
‘ কেনো? মানুষ ই তো আছি আমি’
‘ চেহারা বেশে শুধু মানুষ হলে হয়না, ভেতর থেকে মানুষ হতে হয়’
‘ হবো হবো। আমার এখনো মানুষ হওয়ার সময় আছে। সবে বয়স মাত্র উনিশ, এখনো অনেক সময় আছে ‘
কথা শেষ করেই ধারা জুতা হাতে ওয়াসিফের পাশ কাটিয়ে কল পাড়ে ঢোকে। আর ওয়াসিফ ঢোকে বাড়ির ভেতরে।
যে ছেলেটা সবে মাত্র রওনা হয়ে গেলো সেই ওয়াসিফ আবার বাড়িতে ফিরে এলো, শাহেনূর সহ বাকিরা কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করার আগেই গোটা বিষয়টা এখন পরিষ্কার হলো সকলের কাছেই। বাড়িতে তখন দুই কর্তা সহ মহিলারা বসার ঘরটাতে বসেছে। ওয়াসিফ ধারাকে পাঠিয়েছে লুইপা কে ডেকে আনার জন্য।
লুইপা বাবা, ভদ্রলোক চোখ মুখ শক্ত করে চেয়ে আছে ওয়াসিফের দিকে। ওয়াসিফ চাচার সেই শক্ত চাহনিকে খুব একটা পাত্তা দিলোনা। শাহেনূর চেয়ে চেয়ে দেখছে ছেলেকে। লুইপার পা পারুল ছোট জা কে ফিসফিস করে বলে।
‘ বাতাস ভালো ঠেকছেনা আমার, আমার ভয় করছে ছোট ভাবি। কোনো ঝামেলা না হয়’
‘ আমারও চিন্তা হচ্ছে, দাঁড়া একটু অপেক্ষা কর, কি হয় না হয় দেখতে দে’
লুইপার আসতে দেরি হওয়াতে উঁচু গলায় এবার হাক ছাড়ে ওয়াসিফ।
‘ মুমতাহিনা! এতো সময় লাগে?’
কক্ষের ভেতর থেকে ধারা চেচিয়ে জবাব দেয়।
‘ আসি’
মিনিট দুই এর মধ্যে ধারা এক প্রকার টানতে টানতে লুইপাকে টেনে এনে দাঁড় করায় সিড়ির কাছে। লুইপা ওখানে শক্ত হয়ে দাড়িয়ে থাকে। ওর আর এগোবেনা সামনে। বসবে না বাপ চাচা ভাইদের মুখোমুখি। ধারা ও ওকে আর টেনে এগোতে পারেনা। ঐখানেই আপার পাশে চুপচাপ দাড়িয়ে থাকে। গত তিনদিনের টানাপোড়েনে মেয়েটার চেহারা ভেঙে রোগ কাতুরে দেখাচ্ছে।
ওয়াসিফ বসা থেকে উঠে গিয়ে সোজা সম্মুখ বরাবর দাঁড়ায় বোনের। কথায় কোনোরকম জটিলতা না রেখেই স্পষ্ট করে জিজ্ঞেস করে।
‘ মুনিবকে ই বিয়ে করতে চাস? ঝটপট জবাব দিবি’
লুইপা মাথা নিচু করে দাড়িয়ে থাকে। ধারা টের পায় ওর আপা ঠকঠক করে কাঁপছে। পেছন থেকে আরো শক্ত করে পেচিয়ে ধরে রাখে ধারা। লুইপা মুখ খুলে জবাব দেয় না দেখে ওয়াসিফ কঠোর গলায় বলে।
‘ নাটক কম করবি, স্পষ্ট বল! ‘
‘ কি হলো কথা বল’! এবার ওয়াসিফ চেচিয়ে ওঠে। লুইপা আচমকা ওমন গর্জনে কেঁপে উঠে দুপাশে কেবল মাথা নাড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে অস্ফুটস্বরে বলে।
‘ ওদের পরিবার কে যেদিন তোমারা ফিরিয়ে দিয়েছো মুনিব সেদিনের পর থেকে আমার সঙ্গে সব যোগাযোগ শেষ করেছে। বলেছে আমি আর আমার পরিবার নাকি ওকে আর ওর পরিবার কে অপমান করেছি। ওর মা আর কখনোই আমাকে মেনে নেবেনা। আমরা নাকি লোভী আর দাম্ভিক। আমাদের সব সম্পর্কের ইতি টেনেছে ও সেদিন ‘
লুইপার কথায় চকমকেছে ধারা, বিগত তিনদিন ও শুধু দেখেছে আপাকে ঘরে মরার মতো পরে থাকতে। নিজ থেকে বুঝে নিয়েছিলো হয়তো চাচুর উপর রাগ থেকে এমন দূর্ঘটনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো। মুনিব ভাইয়ের সঙ্গে যে আপার যোগাযোগ শেষ একথা জানা ছিলো না।
ওয়াসিফ বোনের কথা সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে শোনার সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে।
‘ ওর লাস্ট নাম্বার 67390’
লুইপা মাথা নাড়িয়ে জানায় ‘ হ্যা’
ওয়াসিফ ফোনটা বের করে সঙ্গে সঙ্গে মুনিবের নাম্বারে কল দেয়। পরপর দুবার কল হলো, কিন্তু ওপাশ থেকে রিসিভ হলোনা। তৃতীয়বারের মতো কল দেওয়ার আগেই কলটা ব্যাক এলো। ওয়াসিফ কলটা রিসিভ করে লাউডে দিতেই ওপাশের পুরুষটি সালাম দেয়।
‘ আসসালামু আলাইকুম। কে বলছেন’?
ওয়াসিফের নাম্বার মুনিব চেনে না। ওদের আগে পরে কখনো ফোনালাপ হয়নি। তবে ওয়াসিফ যখন জেনেছিলো তার বোনের সঙ্গে এই ছেলের সম্পর্ক, খোঁজে খোঁজে ফোন নাম্বারটাও কালেক্ট করে রেখেছিলো।
‘ ওয়ালাইকুম আসসালাম। শাহেদ ওয়াসিফ বলছি’
ওয়াসিফের গলা আর নামটা শোনা মাত্র কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে মুনিব বলে।
‘ আমি একটু ব্যস্ত, পরে কল করুন’
ওয়াসিফের চোখ মুখ শক্ত হয়, মেজাজটা ভেতরে দমিয়ে রেখে বলে।
‘ আমি তোমার সঙ্গে খোশগল্প করতে ফোন করিনি মুনিব…’
ওয়াসিফের কথা শেষ করার আগেই মুনিব বলে।
‘ তাহলে কি জন্য ফোন করেছেন? কি দরকার আমাকে’?
ওয়াসিফ এবার আর কোনো প্রসঙ্গে না গিয়ে সরাসরি জানতে চায়।
‘ লুইপার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছো ‘?
‘ জি করেছি। আর কখনো কল দিবেন না আপনি বা আপনার ঐ চাচাতো বোন। একটা লোভী, জঘন্য ফ্যামিলি আপনারা.. ‘
শেষ কথাটা কানে যেতেই ওয়াসিফ গর্জে ওঠে।
‘ তোকে হাতের কাছে ফেলে থাপড়িয়ে সোজা করে ফেলতাম, তোর ভাগ্য ভালো তুই আমার হাতের কাছে নেই। মেরুদণ্ডহীন পুরুষ কোথাকার ‘
‘ তুই খুব মেরুদণ্ড সোজা পুরুষ বুঝি? তাহলে চাচাতো বোনকে জোর করে বিয়ে করেছিলি কেনো? ‘
কথাটা পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই ওয়াসিফ কল কেটে দেয়। শেষ কথাটা উপস্থিত সবার পুরোপুরি বুঝতে সমস্যা হলেও ওর হলোনা। এই হিসাব ও পরে চুকাবে। ফোনটা পকেটে গুঁজে সেজো চাচার দিকে তাকাতেই দেখে ভদ্রলোক ওর দিকে তাকিয়ে আছে স্থির চোখে। ঐ চাহনি যেনো ওয়াসিফ কে তিরস্কার করে বলছে।
‘ বাপের আগে কখনো বেশি বুঝতে হয়না’
তবে ওয়াসিফ গুরুত্ব দিয়ে পাত্তা দেয়না সেই তিরস্কার কে। বরং স্পষ্ট করে জানায়।
‘ আজ হবে লুইপার বিয়ে। ছেলে যোগ্য, শিক্ষিত এবং আপনার মেয়ের উপযোগ্য। বাবা হিসেবে যতটুকু কূলায় তৌফেকে মেয়ের বিয়ের আয়োজন করুন। ‘
বোনের দিকে আগুন চোখে তাকিয়ে ওয়াসিফ বলে।
‘ জানে মেরে ফেলে ফেলবো এই কুলঙ্গারের জন্য এক ফোঁটা চোখের পানি ফেললে। তোকে সাপোর্ট দিয়ে পছন্দ কে মানতে চেয়েছিলাম, কিন্তু কে জানতো তোর চয়েজ এমন, তোর সুযোগ শেষ। এবার যেখানে বিয়ে দেবো সেখানে হেঁসে খেলে সংসার করবি’
চলবে
মাত্রই লেখা শেষ করে আপলোড দিলাম। নিয়মিত হওয়ার চেষ্টা করছি। গল্প পড়ে অবশ্যই রেসপন্স করে যাবেন। গঠন মূলক মন্তব্যের অপেক্ষায় রইলাম।
Share On:
TAGS: ঐশী রহমান, মেজর ওয়াসিফ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১৩
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৯
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৪
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১৭
-
মেজর ওয়াসিফ গল্পের লিংক
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১২[ ১ম অংশ ]
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ২
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১৪
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৫