#মেজর_ওয়াসিফ
#লেখনীতে_ঐশী_রহমান
পর্ব (৩২)
যা ধারণা করেছিলো ঠিক তাই-ই হলো। দোতলায় নিজের ঘর থেকে উচ্চ শব্দের চেচামেচির আওয়াজে ওয়াসিফ ছুটে যায় ঘরের দিকে । শাহেনূর, সামিরা, লুইপা কেউ পারছেনা ওর ধারে কাছে ঘিষতে। মেঝেতে কাঁচের টুকরো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে, প্লেট, গ্লাস ভেঙেছে বোধ-হয়। লুইপার হাত কেটেছে সামান্য ঠেকাতে গিয়ে। মেয়ের এই ধরনের অবাধ্যতায় এক প্রকার অধৈর্য্য হয়ে সামিরা ধমকে বলে ওঠে।
‘ তুই সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিস, অকারণে প্লেট গ্লাস ছুঁড়লি কেনো’?
মায়ের কথার জবাব ধারা ভীষণ কঠিন গলায় দেয়।
‘ আপনারা কেনো এসেছেন আমার কাছে? ডেকেছি আপনাদের? কেনো আসেন বারবার আমার কাছে? কি চাই আমার কাছে?’
সামিরা হতবাক হয়ে শাহেনূরের দিকে তাকায়, ‘ দেখেছো আপা, আমরা কি পর? ও আমাদের সঙ্গে আপনাআপনি করে কথা বলে, আমরা কি ওর খারাপ চাই কখনো ‘?
ওকথা ধারা শুনতে পেয়ে বলে ওঠে ‘ আমি খারাপ, আপনারা আমার মতো খারাপের কাছে আসবেন না, চলে যান’
শাহেনূর গলা নরম করে খাটের দিকে এগোতে গেলেই ধারা সরে বসে হাত উঁচিয়ে মানা করে।
‘ খবরদার আমার কাছে আসবেন না, বললাম না এঘর থেকে চলে যেতে ‘
ধারা মানুষ সহ্য করতে পারে না, যে মেয়ে একসময় মানুষ ছাড়া একা এক ঘরে ঘুমাতে পারতোনা এখন সেই মেয়ে মানুষ এড়িয়ে চলে। কাউকে ঘেঁষতে দেয়না পাশে। কিন্তু ওয়াসিফের কড়া হুকুম, মুমতাহিনা ঘুম থাকুক বা জেগে থাকুক, ওয়াসিফ না থাকলে কেউ না কেউ যেনো ওর আশেপাশে থাকে। এর পেছনের কারণ হলো, ধারা একা থাকলেই নিজেকে আঘাত করে। এই তো গত পরশুর কথা, আচমকা ঘুম ভেঙেছিলো ধারার, ওয়াসিফ বাড়িতে ছিলোনা।শাহেনূর জোহরের নামাজের জন্য ওজু করতে গিয়েছিলো কলপাড়ে, তারমধ্যে ছোটখাটো এক অঘটন ঘটিয়ে ফেললো ধারা, কাচের টুকরো দিয়ে হাত কাটলো,পায়ের পাতার চামড়া কাটলো। ওয়াসিফ ফিরে সেদিন রাগারাগি ও করেছিলো। হাতে পায়ে এখনো ক্ষত দগদগ করছে। ওয়াসিফ ব্যাতীত ওখানে কাউকে ঔষধপত্র লাগাতে দেয়না।
শাহেনূর আর এগোলোনা, ওখানে দাঁড়িয়ে থেকেই বললো।
‘ অল্প কয়টা ভাত খাইয়ে দি মা? তুমি সেই সকাল থেকে তো কিছু ই খেলেনা। তোমার পছন্দের ইলিশ মাছ ভেজেছি’
ধারা পটাপট জবাব দেয়।
‘ না খাবোনা, আপনারা খান’
‘ কেনো খাবেনা মা’?
ধারা চেতে উঠে বালিশ দুটো ছুড়ে মারে ফ্লোরে, গর্জে উঠে বলে।
‘ আমার কথা বলতে ভালো লাগছেনা, বের হন ঘর থেকে’
খাটের পাশের বেডসাইড টেবিল থেকে কাঁচের গ্লাস উঠিয়ে বলে।
‘ এটা এখন যার তার মাথায় মেরে দেবো, ভালো ভালোয় বেরিয়ে যান’
সামিরা এগিয়ে গিয়ে দাড়ায় মেয়ের সামনে, আজ উনি নিজের ধৈর্য্য ধরে রাখতে পারছেনা।
‘ আর কত? আর কত পাগলামি করবি তুই? এক তোর জন্য ছেলেটার মানসিক অবস্থাও ভালো নেই। নাওয়া খাওয়া, নিজের চাকরি, সুখ, শান্তি সব বিসর্জন দিয়ে ফেলেছে, সেই সাথে আমরাও বাড়ি শুদ্ধ লোক পাগল হতে বসেছি। তুই একটু সুস্থ হ মা, তুই একটু সুস্থ হ, ‘
ধারা রাগে ফোঁস ফোঁস করছে, ওর সহ্য হচ্ছে না এদের। রাগের বশে গ্লাস মুঠোয় চেপে ধরতেই ওয়াসিফ ঢোকে ঘরে। ঘরের পরিস্থিতি দেখার আগে ছুটে গিয়ে খপ করে ধারার হাত থেকে কাঁচের গ্লাস কেড়ে নেয়। তাকায় সামিরার দিকে, ঘেমে একাকার অবস্থা চোখ মুখের। বললো।
‘ ওকে সুস্থ হয়ে যেতে বললেই কি ও নিজে থেকে সুস্থ হয়ে যাবে চাচি আম্মা? তোমরা এতো অবুঝ কেনো? আমি কতগুলো অবুঝ একা সামলাবো’?
মায়ের দিকে তাকিয়ে ওয়াসিফ বলে।
‘ আম্মা, তোমাদের তো বলিনি ওকে নিয়ম করে খাওয়া দাওয়া করাও, শুধু বলেছি ওকে একটু চোখে চোখে রেখো যেনো আমি না থাকাতে ঐটুকু সময় নিজের সঙ্গে খারাপ কিছু না করে। তোমারা এতো বেশি বোঝো কেনো? পরিস্থিতি এমন করে ওকে বিগড়ে দিচ্ছো কেনো’?
শাহেনূর আস্তে করে বলে ‘ ও তো সকাল থেকে কিছুই খেলোনা ওয়াসিফ’
‘ সেটা আমি বুঝবো আম্মা, আমি খাওয়াবো, ও যে সকাল থেকে না খাওয়া সেই খেয়াল আমার আছে ‘
ওয়াসিফ দেখে লুইপা, কে। ভাইজান ওর দিকে তাকাতেই শাড়ির আঁচলে কাটা হাত লুকিয়ে ফেলে। তবে ওয়াসিফের চোখ এড়ায়না। বলে।
‘ বোধ বুদ্ধি তোরও কমে গেছে, মায়েদের মানা করতে পারিসনা, ওর সঙ্গে এখন জোরজারি খাটেনা, এটা তুই ও ভুলে বসেছিস’
‘ সরি, ভাইজান’
‘ কাটা হাত ওভাবে শাড়িতে পেঁচাচ্ছিস কেনো? যা গিয়ে ওখানে পরিষ্কার করে মলম লাগা’
‘ আম্মা, তোমরাও যাও এখন, ফরিদা আপা কে বলবে ঘরটা পরিষ্কার করে দিয়ে যেতে। না থাক দরকার নেই, আমিই করবো, তাকে দেখলেও চেতে যাবে’
একে একে ঘর ফাঁকা হতেই ওয়াসিফ তাকায় ধারার মুখের দিকে। চেহারার অবস্থা এমন যে, ওয়াসিফ সামান্য কিছু বললেও কেঁদে ভাসাবে। ঐ কাঁদুনে অবস্থার চেহারার দিকে তাকিয়ে থেকে সামান্য হেঁসে ফেলে ওয়াসিফ। কিভাবে যে বোঝায় ওয়াসিফ ওর এতো শতো অস্থিরতার মাঝে এতটুকু মুখটাই সস্তির বিশাল জায়গা। ওয়াসিফ দু-হাত প্রসারিত করে চওড়া বুকটা পেতে ইশারা করতেই ধারা ঝাপটে পড়ে সেই চওড়া বুকে মাথা গোজে, হাউমাউ করে কেঁদে উঠতেই ওয়াসিফ উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চায় কান্নার কারণ। কান্না জড়ানো অস্ফুটস্বরে বলে। ‘ আমি এবাড়িতে থাকবোনা, ওরা এইবাড়ি চেনে, আবার যদি কখনো আমাকে তুলে নিয়ে যায় ‘
সেই ভয়াবহ আতংক মেয়েটা এখনো হজম করে উঠতে পারেনি, আদৌও কি কখনো পারবে? যদি পারতো তবে ওয়াসিফের জন্য সবটা সহজ হতো। ওয়াসিফ ওকে আরো একটু নিজের সঙ্গে মিশিয়ে রেখে বলে।
‘ ওরা আর আসবেনা মুমতাহিনা, ওরা কেউ জেলে, কাউকে আমি নিজের হাতে মেরে ফেলেছি। ওরা কখনো আর আসতে পারবেনা’
‘ না, ওরা আবার আসবে’
‘ আসবেনা’
আচমকা ধারা চেচিয়ে উঠে ওয়াসিফের বুকের উপর থেকে সরে গিয়ে বলে।
‘ বললাম তো আসবে, আমাকে মেরেও ফেলবে। আপনি বাঁচাতে পারবেননা আমাকে এবার। আমি সত্যি সত্যি এবার মরে যাবো। এখান থেকে সরিয়ে অন্য কোথাও নিয়ে আমাকে লুকিয়ে রাখুন। আমি মরতে চাইনা, আমি বাঁচতে চাই’
শেষ কথাটুকু বলে ধারা পুনরায় কেঁদে ওঠে। ওয়াসিফ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে ধীর কন্ঠে বলে।
‘ বাঁচতেই যদি চাস তবে এভাবে নিজের হাত পা কাটিস কেনো’?
ধারা দু’হাতে নিজের চোখের পানি মুছে নিতে নিতে বলে।
‘ কতবার বলবো আপনাকে? কতবার বলতে হবে এককথা আপনাকে, বলেছি না ওরা আমার হাত, পা, গলা বিশ্রি করে ছুঁয়ে ছিলো ‘
ওয়াসিফ নিরাশ গলায় বলে।
‘ আমিও তো এরপর কতবার সেখানে চুমু খেয়েছি, আমার চুমুতে কি সেসব ছোঁয়া মুছেনি মুমতাহিনা? ‘
‘ না মুছেনি, মুছবেনা কোনোদিন, আপনি আমাকে ছেড়ে দিন, আমি অপবিত্র হয়ে গেছি, আমার মতো অপবিত্র মেয়েলোক আপনার জন্য না’
ধারা যদি সুস্থ মস্তিষ্কে এই কথাগুলো বলতো তবে এই মুহূর্তে কড়াসড়া একটা ধমক খেতো ওয়াসিফের তরফ থেকে। কিন্তু পরিস্থিতি তেমন নেই তাই ওয়াসিফ কথা গুলো হজম করে চুপচাপ বসে থাকে কতক্ষণ। ধারা নিজের হাত,পা ঢলে মুছতে গেলে পরশুর সেই কাটা দাগ গুলো থেকে আধা কাঁচা জায়গাগুলো থেকে রক্ত বের হতেই ওয়াসিফ মৃদু ধমকে উঠে বলে।
‘ তুই কি মানুষ? নিজেকে মানুষ এভাবে শাস্তি দেয় কিভাবে? ‘
ধারা চট চট করে উত্তর দেয়।
‘ আমি অপবিত্র তাই আমি এখন আর মানুষ নেই, জা*নো*য়া*র হয়ে গেছি’
ওয়াসিফ চোখ মুখ শক্ত করে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। খপ করে ওর হাত দু’টো শক্ত করে নিজের মুঠোয় চেপে রেখে বলে।
‘ অপবিত্রতার সঙ্গা জানিস মুমতাহিনা ‘?
‘ জানি’
‘ বল কি’?
‘ কতগুলো পরপুরুষ একটা যুবতী মেয়ের সম্ভ্রমহানি করার চেষ্টা কে অপবিত্রতা বলে, সেদিনের পর থেকে ই সেই মেয়েটা অপবিত্র হয়ে যায়। ‘
‘ তুই যদি এই মুহূর্তে সুস্থ থাকতি তবে দু গালে মোট চারটে চড় আমার তরফ থেকে পেতি, চেষ্টা আর করা দুটোর তফাত অনেক।’
ধারা ছিটকে সরে যায় ওয়াসিফের থেকে। চেচিয়ে উঠে বলে।
‘ আমার থেকে দূরে থাকুন, আমি বলেছিনা আমি অপবিত্র। আমার মরে যাওয়া উচিত ‘
‘ মাত্রই তো বললি, তুই বাঁচতে চাস’?
‘ না, আমি মরতে চাই’
‘ মরা কি ওতোই সহজ মুমতাহিনা ‘?
‘ সহজ তো, এঘর থেকে আপনি বেরিয়ে যান, পাঁচ মিনিট পর এসে দেখবেন আমি মরে গেছি’
নিজের হাঁটুতে মাথা ঠেকিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ধারা বলে।
‘ ইশ! কি বিচ্ছিরি চোখের চাহনি, কি নোংরা দেখতে ছিলো ওরা, মুখ থেকে আসা মদের গন্ধে আমি বমি করেছিলাম কয়েকবার। জানেন, যে দু’দিন ওরা আমাকে আঁটকে রেখেছিলো আমাকে একটা ওড়নাও দেয়নি গায়ে রাখার জন্য। আমার ওড়নাটা কোথায় যেনো পড়েছিলো রাস্তা… ‘
ওয়াসিফ উঠে গিয়ে শক্ত করে ওকে জড়িয়ে নিয়ে বলে।
‘ এই মুমতাহিনা, চুপ, চুপ, ওসব স্বপ্ন ছিলো, বাস্তবে কিচ্ছু নেই ‘
‘ সব আমার সঙ্গে বাস্তব হয়েছে। আমি জানি, সব জানি, সব সব সব। আমার জীবন শেষ হয়ে গেছে, আমার জীবনের আর কিচ্ছু বাকি নেই ‘
ওয়াসিফ ওকে বুকে আগলে রেখে মাথায় হাত বুলায়, কবে? ঠিক কবে এই মেয়েটার মস্তিষ্ক ওকে আরেকটিবার শান্তি ফিরিয়ে দেবে?
ধারার কড়া ডোজের ঘুমের ঔষধ চলে, লম্বা ঘুমের পর ঘুম ভাঙে, কিছুসময় পর আবার ও ঘুমে নেতিয়ে যায়। কেবলও ঘুমিয়ে গেলো। নিজ মনে বিড়বিড় করতে করতে মাথার চুলে একটু আরাম পেতেই দু’চোখ ঘুমে মুদে এলো।
Share On:
TAGS: ঐশী রহমান, মেজর ওয়াসিফ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১৫
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব পর্ব ২৭
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৩
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ২৬
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১৩
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ২২
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৬
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৩০
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ২৯
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১১