Golpo romantic golpo নূর এ সাহাবাদ

নূর এ সাহাবাদ ২৭ এর প্রথমাংশ


নূরসাহাবাদ

jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

২৭ এর প্রথমাংশ

ঠান্ডা পানির ঝাপটা মুখে পড়তেই মেহেরুন্নেসার পুরো শরীরটা কেঁপে উঠলো। সে হঠাৎ করেই হাঁপাতে হাঁপাতে চোখ খুললো। প্রথমে সবকিছু ঝাপসা লাগছিল। মাথার ভেতরটা এখনও ঝনঝন করছে। কপালে যেন আগুনের মতো ব্যথা। ল কয়েক মুহূর্ত সে বুঝতেই পারলো না সে কোথায়।
তারপর ধীরে ধীরে চোখের সামনে একটা মুখ স্পষ্ট হলো। আর সেই মুখটা দেখেই মেহেরুন্নেসার বুকের ভেতরটা যেন এক মুহূর্তে খালি হয়ে গেল।

তার একদম সামনে বসে আছে মিরান। মশালের দপদপে আলোয় মেয়েটার মুখটা আরো অদ্ভুত, আরো ভয়ংকর লাগছে। ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা রহস্যময় হাসি ফুটে উঠলো, ঠিক তখনই যখন মেহেরুন্নেসা চোখ খুলেছে। এমন একটা হাসি যা দেখে ভয়ে তার গলা শুকিয়ে গেল।
সে তড়িঘড়ি করে উঠে বসতে গেল, কিন্তু মাথার যন্ত্রণায় আবার কেঁপে উঠলো। হাত দিয়ে ভর দিয়ে বসতেই খেয়াল করলো মেঝেটা ঠান্ডা। শক্ত। পাথরের।
সে এবার ভালো করে মিরানের দিকে তাকালো।
মিরানের গায়ের সেই সাদা-কালো ডোরাকাটা পোশাকটা আরো ছেঁড়া। কাপড়ের কয়েক জায়গায় শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ। তার ফর্সা হাতের কব্জিতে গাঢ় লালচে দাগ পড়ে আছে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে অনেকক্ষণ ধরে শক্ত করে হাতকড়া বাঁধা ছিল। কব্জির চারপাশে চামড়া ঘষে উঠে গেছে।
কপালের ডান পাশে নীলচে রক্ত জমে আছে। মনে হচ্ছে কোথাও খুব জোরে আঘাত পেয়েছে। তার রুক্ষ, এলোমেলো চুলগুলো কাঁধের উপর ছড়িয়ে আছে। কয়েকটা চুল মুখের উপর এসে পড়েছে। কিন্তু সে সেগুলো সরানোরও চেষ্টা করছে না। বরং সে স্থির চোখে শুধু মেহেরুন্নেসার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখদুটো দেখে মেহেরুন্নেসার গা শিউরে উঠলো। এমন চোখ সে কখনও দেখেনি। ওই চোখে ভয় নেই। কষ্টও নেই।
আছে শুধু এমন এক শীতলতা, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর জিনিসগুলোও তাকে আর নড়াতে পারে না।

মিরান ধীরে ধীরে মাথা কাত করলো।
“জ্ঞান ফিরেছে তাহলে? আমি তো ভেবেছিলাম মরেই গেছো”
তার গলাটা অদ্ভুত শান্ত। যেন সে কোনো পুরোনো পরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বলছে। মেহেরুন্নেসা কিছু বলার আগেই চারপাশে চোখ বুলালো।
আর তাতেই তার ভেতরটা আরো অদ্ভুত হয়ে উঠলো। ঘরটা ছোট। চারদিকে স্যাঁতসেঁতে পাথরের দেয়াল। দেয়ালের কিছু অংশে শেওলা জমে গেছে। উপরের দিকে একটা সরু জানালা আছে, কিন্তু সেখানে মোটা লোহার শিক। জানালা দিয়ে কোনো আলো আসছে না, শুধু দূরের বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ। এক কোণে একটা মশাল জ্বলছে। সেই আলোয় দেয়ালের উপর ছায়াগুলো কেমন বিকৃত হয়ে নড়ছে।
দরজাটা মোটা লোহার। দরজার মাঝখানে একটা ছোট ফাঁক। ফাঁক দিয়ে বাইরের অন্ধকার করিডোর দেখা যাচ্ছে। কোথাও দূরে খুব ক্ষীণ একটা গোঙানির শব্দ ভেসে এলো। মেহেরুন্নেসার বুক কেঁপে উঠলো। এ জায়গাটা কেমন যেন বিভীষিকার আস্তানা মনে হলো।
তার মনে হলো সে যেন অনেক নিচে কোথাও আছে। মাটির তলায়। সে শুকনো গলায় বললো,
“আমি… আমি কোথায়?”
মিরানের ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরেকটু গাঢ় হলো। সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। তারপর মশালের আলোয় এগিয়ে গিয়ে লোহার দরজাটার উপর আঙুল বুলিয়ে দিল।
টং…ধাতব একটা শব্দ হলো। তারপর সে ঘুরে দাঁড়িয়ে মেহেরুন্নেসার দিকে তাকালো।
“এটা সাহাবাদের কারাগার।”
কথাটা শুনে মেহেরুন্নেসার সারা শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। সাহাবাদের কারাগার? না… এটা হতে পারে না। সে তো জঙ্গলে ছিল। তাহলে এখানে এলো কীভাবে? তার বুকের ভেতরটা ধকধক করতে লাগলো। আর মিরান তখনও দাঁড়িয়ে আছে, সেই অদ্ভুত, ভয়ংকর হাসিটা মুখে নিয়ে। যেন মেহেরুন্নেসার ভয় পাওয়া তাকে আনন্দ দিচ্ছে।

মেহেরুন্নেসা এখনও দেয়ালের সঙ্গে ঠেস দিয়ে বসে আছে। তার বুকের ভেতরটা এত জোরে ধড়ফড় করছে যে মনে হচ্ছে মিরানও শুনতে পাচ্ছে। মিরান কিছুক্ষণ চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে মাটিতে বসে পড়লো, ঠিক মেহেরুন্নেসার সামনাসামনি। মশালের আলোয় তার মুখের অর্ধেকটা আলোকিত, বাকি অর্ধেক অন্ধকারে ডুবে আছে। ফলে তাকে আরও ভয়ংকর লাগছে। সে নিচু গলায় বললো,
“আজ খুব কষ্টে তোমায় বাঁচিয়েছি।”
মেহেরুন্নেসা কেঁপে উঠলো।
“কি??”
“আর একটু দেরি হলেই ওদের হাতে পড়ে যেতে। আর ওদের হাতে পড়লে…
মিরান থামলো। ঠোঁটের কোণে আবার সেই অদ্ভুত হাসিটা ফুটে উঠলো।
“আজই মারা পড়তে।”
মেহেরুন্নেসার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
তার মাথায় আবার জঙ্গলের সেই দৃশ্যটা ভেসে উঠলো।
কিন্তু পরমুহূর্তেই তার চোখ গিয়ে আটকে গেল মিরানের কব্জির দাগে, কপালের আঘাতে।
এই মেয়েটাকেই তো সবাই খুনি বলে।
এই মেয়েটার নাম শুনলেই সবাই ভয় পায়।
সে ধীরে ধীরে বললো,
“তুমি… তুমি তো খুনি।”
মিরানের চোখের দৃষ্টি বদলালো না।
“হ্যাঁ।”
“তাহলে তুমি আমায় বাঁচালে কেন?”
এক মুহূর্তের জন্য ঘরটা পুরো নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর হঠাৎ মিরান হেসে উঠলো। কিন্তু সেটা কোনো স্বাভাবিক হাসি না। ওই হাসিতে কেমন একটা ঠান্ডা, ভয়ংকর ব্যাপার আছে। যেন অনেক রাতের অন্ধকার একসাথে হাসছে। সে একটু ঝুঁকে এলো মেহেরুন্নেসার দিকে।
“আমি কেবল অপরাধীদের জন্য খুনি।”
তার গলাটা এবার আগের চেয়েও নিচু। আরও শীতল।
“তবে কোনো নির্দোষ মানুষের জন্য, নিজে খুন হয়ে যেতেও আমি দুইবার ভাববো না।”
মেহেরুন্নেসা স্তব্ধ হয়ে গেল। খুব আস্তে বললো,
“ওখানে… কি হয়?”
মিরান চুপ।
“জঙ্গলে… ওরা সবাই কি করতে যায়?”
মিরানের মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে নিল। কিছুক্ষণ শুধু মশালের আগুনের শব্দ শোনা গেল।
টুক… টুক…
মিরান অনেকক্ষণ কিছু বললো না।
এমন নীরবতা, যেন সে নিজের ভেতরের কোনো স্মৃতির সঙ্গে লড়ছে। তারপর খুব ধীরে, প্রায় ফিসফিস করে বললো
“জঙ্গল হলো অপরাধের ময়দান বেগম জান। সেখানে কেউ যায় অপরাধ করতে, তো কেউ যায় অপরাধ এর চিহ্ন লোপাট করতে।”

“তোমরা তারমধ্যে কোনটা করো?”

“দুটোই। তোমার যাওয়া উচিত হয়নি।”
মেহেরুন্নেসা কিছু বুঝলো না।
“ কি?”
মিরান এবার তার দিকে তাকালো।
তার চোখদুটো এত গভীর, এত অদ্ভুত লাগছিল যে মেহেরুন্নেসার মনে হলো সে যেন কোনো অন্ধকার কুয়োর দিকে তাকিয়ে আছে।
“কিছু জায়গা আছে, যেগুলোর সত্যি মানুষ জেনে ফেললে আর আগের মতো থাকতে পারে না।
সে উঠে দাঁড়ালো।”
কিছুটা থেমে সে বলল
“তুমি জানো তোমাদের মহলে কত অজানা শত্রু রয়েছে তোমার? নিজেদের মধ্যেই, যারা তোমাকে প্রতিনিয়ত হত্যার পরিকল্পনা করে”
মেহেরুন্নেসা ঘামতে লাগলো দরদর করে ভয়ার্ত গলায় বলল
“তুমি কারাগারে থেকেও মহলের এত খবর জানো কি করে?”
মিরান ফিচেল হাসলো
“শুধু মহল কেন? গোটা সাহাবাদের কোন অঞ্চলের খবর লাগবে তোমার”

মেহেরুন্নেসা শুকনো ঢোক গিলে বলল
“আপাতত তোমার কাছে শুধু একটাই জানার বিষয়, জঙ্গলে কি হচ্ছিল? কি পরিকল্পনা করছিলে তোমরা? নিশ্চয়ই তোমাদের কোন অসৎ উদ্দেশ্য ছিল। আর আমার মনে আছে শেষবার আমি কোন পুরুষের অবয়ব দেখেছিলাম। সে কে ছিল? আমি এখানে এলাম কি করে?”

মিরান এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে নিঃশব্দে শুনছে মেহেরুন্নেসার সব কথা। মেহেরুন্নেসা মিরানের দিকে তাকাতেই কথা গুলিয়ে ফেলল। আমতা আমতা করতে শুরু করল।
“আ..আমি স্পষ্ট দেখেছি। সেই জাহাজে থাকা লোকটাও ছিল ওখানে। সব কিছুর উত্তর তুমি জানো। দয়া করে বলো আমায়”

মিরান একটু নড়েচড়ে বসলো। তার ছায়াটা দেয়ালের উপর লম্বা হয়ে উঠলো।
“তুমি যা দেখেছো, সেটাই যথেষ্ট।”
“না, যথেষ্ট না। আমার ভাইজান কেন সেখানে ছিল? রত্নপ্রভা কেন? আর তুমি…?
“থামো!”
হঠাৎ মিরানের গলা এত তীক্ষ্ণ হয়ে উঠলো যে মেহেরুন্নেসা চমকে উঠলো। মিরান দ্রুত দরজার দিকে তাকালো। যেন কেউ শুনে ফেলবে এই ভয়।
তারপর অনেক নিচু গলায় বললো,
“চুপ, শব্দ করো না”
দূরের করিডোর থেকে আচমকা একটা ধাতব শব্দ ভেসে এলো। ঝনঝন। মেহেরুন্নেসার বুক কেঁপে উঠলো। মিরানের মুখ মুহূর্তে সাদা হয়ে গেল। সে ফিসফিস করে বললো,
“ওরা আসছে।”

কারাগারের করিডোরজুড়ে ধাতব জুতোর শব্দ ধীরে ধীরে কাছে আসছে।ঠক… ঠক… ঠক…
মিরান মুহূর্তের মধ্যে মশালটা নিভিয়ে দিল। ঘরটা অন্ধকারে ডুবে গেল। মেহেরুন্নেসার বুকের ভেতরটা ধকধক করছে। অন্ধকারে সে শুধু অনুভব করলো, মিরান তার হাত শক্ত করে ধরে টেনে তুলেছে।
“একদম শব্দ করবে না।”
মিরানের গলা এত নিচু যে প্রায় শোনা যায় না।
লোহার দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে ক্ষীণ আলো ভেসে আসছে। সেই আলোয় দেখা গেল মিরান নিজের কোমরের কাপড়ের ভাঁজ থেকে একটা সরু লোহার টুকরো বের করলো। তারপর খুব দ্রুত হাত চালিয়ে দরজার তালার ভেতর ঢুকিয়ে দিল।টিক। একটা ক্ষীণ শব্দ হলো। তারপর ধীরে ধীরে দরজাটা খুলে গেল। বাইরের করিডোরটা ফাঁকা। দুই পাশে সারি সারি অন্ধকার কক্ষ। কোথাও থেকে গোঙানির শব্দ আসছে, কোথাও আবার অদ্ভুত নিস্তব্ধতা।

মিরান মেহেরুন্নেসাকে দেয়ালের সঙ্গে লাগিয়ে হাঁটতে বললো। তারা এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষের ছায়া ধরে এগোতে লাগলো। করিডোরের শেষ মাথায় একটা মশাল জ্বলছে। তার নিচে দাঁড়িয়ে দুজন রক্ষী কথা বলছে।
“চুপ। দেয়ালেরও কান আছে।”

মেহেরুন্নেসার গা শিউরে উঠলো। মিরান হাত তুলে তাকে থামালো। তারপর পাশের একটা সরু, অন্ধকার গলির দিকে ইশারা করলো। গলিটা এত সরু যে একজন মানুষ কষ্টে যেতে পারে।
“এদিকে।”
ওরা গলিটা ধরে এগিয়ে গেল। বাতাসে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। মাথার উপর দিয়ে কোথাও পানি পড়ছে।
টুপ…টুপ…
অনেকটা এগিয়ে যাওয়ার পর সামনে একটা পাথরের সিঁড়ি দেখা গেল। সিঁড়িটা উপরের দিকে উঠেছে। মিরান ফিসফিস করে বললো,
“এই পথটা কেউ জানে না। পুরনো সময় জমিদার পরিবার পালানোর জন্য বানিয়েছিল।”
মেহেরুন্নেসা হাঁপাতে হাঁপাতে তার পিছু নিল।
সিঁড়িটা যেন শেষই হচ্ছে না। অনেকক্ষণ পর ওপরে একটা কাঠের দরজা দেখা গেল। দরজার ফাঁক দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঢুকছে। মিরান খুব আস্তে দরজাটা ঠেলে খুললো। সঙ্গে সঙ্গে মেহেরুন্নেসার মুখে রাতের হাওয়া এসে লাগলো। সে বাইরে বেরিয়ে এসে থমকে দাঁড়ালো। ওরা মহলের পেছনের পুরনো বাগানে এসে উঠেছে।

চারপাশে শুকনো গাছ, ভাঙা ফোয়ারা, আগাছায় ভরা পথ। দূরে মহলের উঁচু মিনার দেখা যাচ্ছে। কয়েকটা জানালায় মিটমিট করে আলো জ্বলছে।
মেহেরুন্নেসার মনে হলো, এতক্ষণ যেন সে অন্য এক দুনিয়ায় ছিল। মিরান বাগানের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইলো। চাঁদের ফ্যাকাশে আলোয় তার মুখটা আরো অদ্ভুত লাগছে।
মেহেরুন্নেসা কাঁপা গলায় বললো,
“ তুমি… তুমি আমার সঙ্গে চলবে না?”
মিরান খুব ধীরে মাথা নাড়লো।
“আমার জায়গা ওখানেই।”
“কিন্তু তুমি তো পালাতে পারতে!”
মিরান কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলো। তারপর এমন একটা হাসি দিল, যেটা দেখে মেহেরুন্নেসার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। ওই হাসিতে কষ্ট আছে। তাচ্ছিল্য আছে। আর আছে এমন এক গোপন রহস্য, যেটা সে কাউকে বলবে না।
“সবাই চাইলেই পালাতে পারে না, বেগমজান”
দূরে হঠাৎ কারাগরের দিক থেকে শিঙার শব্দ ভেসে এলো। মিরানের চোখ মুহূর্তেই বদলে গেল।
সে দ্রুত মেহেরুন্নেসার কাঁধ ধরে মহলের দিকে ঘুরিয়ে দিল।
“দৌড়াও। আমাদের আবার দেখা হবে। সেদিন তোমার সব প্রশ্নের উত্তর দিব”
“ কিন্তু…”
“দৌড়াও! দৌড়াও বেগম দৌড়াও”
মেহেরুন্নেসা আর কিছু বললো না। সে দৌড়াতে শুরু করলো। মহলের পেছনের পথ ধরে ছুটতে ছুটতে একবার পিছনে তাকালো। মিরান এখনও দাঁড়িয়ে আছে। চাঁদের আলোয় তার সাদা-কালো পোশাকটা বাতাসে উড়ছে। এলোমেলো চুল মুখের উপর এসে পড়েছে। আর তার পিছনে অন্ধকারের ভেতর থেকে কয়েকটা মশালের আলো ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। পরের মুহূর্তেই মিরান ঘুরে দাঁড়ালো। তারপর অন্ধকারের ভেতর মিলিয়ে গেল।নমেহেরুন্নেসা কাঁপতে কাঁপতে মহলের করিডোর পেরিয়ে নিজের কক্ষের সামনে এসে দাঁড়ালো।
তার হাত এখনও ঠান্ডায় জমে আছে। মনে হচ্ছে বুকের ভেতরটা এখনও ঠিকমতো ধুকপুক করছে না। বারবার মনে পড়ছে মিরানের চোখ, কারাগারের অন্ধকার, আর সেই মশালের আলো।

কক্ষের দরজাটা আধখোলা। মেহেরুন্নেসার বুক ধক করে উঠলো। সে ধীরে ধীরে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো। আর ঢুকেই থমকে গেল। পালঙ্কের ধারে বসে আছে বাইজিদ। ঘরের এক কোণে রাখা প্রদীপের হলদে আলোয় তার মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। চোয়াল শক্ত। চোখদুটো অস্বাভাবিক রকম স্থির। মনে হচ্ছে অনেকক্ষণ ধরে সে এইভাবেই বসে আছে। মেহেরুন্নেসার গলা শুকিয়ে গেল। বাইজিদ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো।
তারপর খুব ধীর পায়ে সামনে এসে দাঁড়ালো মেহেরুন্নেসার।
!কোথায় ছিলে সারারাত?”
গলাটা শান্ত। কিন্তু সেই শান্ত স্বরের নিচে এমন কিছু আছে, যেটা শুনে মেহেরুন্নেসার বুক কেঁপে উঠলো। সে চোখ নামিয়ে নিল।
“ আ… আমি…”
তার গলা কেঁপে উঠলো।
“ছোট আম্মার ঘরে ছিলাম। ওনার পায়ে খুব ব্যথা করছিল… তাই… তাই মালিশ করে দিচ্ছিলাম।”
কথাগুলো বলতে বলতে সে বুঝতে পারছিল, তার কণ্ঠস্বর কেমন কাঁপছে। কয়েক মুহূর্ত বাইজিদ কিছু বললো না। শুধু তার দিকে তাকিয়ে রইলো।
এমনভাবে, যেন চোখের ভেতর দিয়ে সত্যিটা খুঁজে বের করতে চাইছে। মেহেরুন্নেসার মনে হলো, সে হয়তো সব বুঝে ফেলেছে। হয়তো এই মুহূর্তেই জিজ্ঞেস করবে
“জঙ্গলে কেন গিয়েছিলে? মিরানের সঙ্গে কি কথা হয়েছে?”
কিন্তু না। বাইজিদ ধীরে ধীরে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো। ফোঁস করে। তারপর গম্ভীর গলায় বললো,
“শুয়ে পড়ো এখন।”
মেহেরুন্নেসা বিস্ময়ে মাথা তুললো।
বাইজিদের চোখে এখনও সেই কঠিন ভাব। কিন্তু তার দৃষ্টি এবার মেহেরুন্নেসার কপালের দিকে আটকে গেল। জঙ্গলে পড়ে গিয়ে কপালের একপাশে হালকা কেটে গেছে। চুলের ফাঁক দিয়ে লালচে দাগ দেখা যাচ্ছে।বাইজিদের ভ্রু কুঁচকে গেল।সে নিচু গলায় বললো
“আঘাত লাগলো কি করে মেহের?”
“পড়ে গেছিলাম। কোমরে খুব লেগেছে”

বাইজিদ কোমর জড়িয়ে কাছে টেনে বলল
“আমি মালিশ দিই তোমায়। শোও পালঙ্কে”
মেহেরুন্নেসা কিছু বলার আগেই বাইজিদ তার পাশ কাটিয়ে পালঙ্কের দিকে এগিয়ে গেল।
তার চলার ভঙ্গি এখনও গম্ভীর, শক্ত।
কিন্তু মেহেরুন্নেসার হঠাৎ মনে হলো, বাইজিদ তাকে বিশ্বাস করেছে কি না, সেটা যতটা না ভয়ংকর। তার চেয়েও বেশি ভয়ংকর হলো, হয়তো সে বিশ্বাস করেনি। তবু কিছু বুঝলো না তার ভাবগতি।

সকাল গড়িয়ে অনেকটা বেলা হয়ে গেছে।
ঘরের জানালার ফাঁক দিয়ে রোদের সরু রেখা এসে পড়েছে পালঙ্কের উপর। সারা রাতের ক্লান্তি আর ভয় মিলে মেহেরুন্নেসা এত গভীর ঘুমে ডুবে ছিল যে সূর্য অনেকটা উপরে ওঠার পরও তার ঘুম ভাঙেনি। হঠাৎ খুব নরম একটা স্পর্শে তার কপালের পাশে চুল সরে গেল।
“মেহের…
বাইজিদের গলা। কিন্তু সেই গলায় গত রাতের মতো কঠিনতা নেই। বরং অদ্ভুত এক কোমলতা।
মেহেরুন্নেসা আধোঘুমের ঘোরে চোখ মেললো। প্রথমে কিছুই বুঝতে পারলো না। তারপর দেখলো, বাইজিদ তার পাশে বসে আছে। গোসল করে তৈরি হয়ে নিয়েছে। হালকা রঙের পোশাক, চোখে অদ্ভুত শান্ত একটা দৃষ্টি।
সে আলতো করে আবার ডাকলো,
“ওঠো। আমাদের বেরোতে হবে।”
মেহেরুন্নেসা ধীরে ধীরে উঠে বসল। মাথাটা এখনও ভার লাগছে। গত রাতের সবকিছু মনে পড়তেই তার বুকের ভেতরটা আবার হালকা কেঁপে উঠলো। সে অবাক হয়ে বললো,
“কোথায় যাবো?”
বাইজিদ তার মুখের দিকে তাকিয়ে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলো। তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বললো,
“তোমাদের বাড়িতে।”
মেহেরুন্নেসা যেন ঠিক শুনতে পেল না।
“ কি?”
“ তোমাদের বাড়ি। আজই যাবো।”
মেহেরুন্নেসা স্থির হয়ে গেল। তার চোখের পাতা পর্যন্ত নড়লো না কয়েক মুহূর্ত। তাদের বাড়ি? রত্নপ্রভার শশুড় বাড়ি? যেই বাড়িতে বাইজিদের নিজের বোনকে দিনের পর দিন অপমান করা হয়েছে, অত্যাচার করা হয়েছে… যেই বাড়ির নাম শুনলেই এতদিন বাইজিদের চোখ শক্ত হয়ে যেত, চোয়াল শক্ত হয়ে উঠতো…
সেই বাড়িতেই এখন সে নিজে যেতে চাইছে?
মেহেরুন্নেসা বিস্মিত গলায় বললো,
“আপনি… সেখানে যাবেন?”
বাইজিদ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। তারপর জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। বাইরে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর খুব নিচু গলায় বললো,
“তৈরি হয়ে নাও”
কথাটা বলার সময় তার কণ্ঠস্বর শান্ত ছিল।
খুব শান্ত। কিন্তু সেই শান্ত স্বরের নিচে এমন কিছু ছিল, যেটা শুনে মেহেরুন্নেসার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো। সে বুঝলো না, বাইজিদ আসলে কি করতে যাচ্ছে। শুধু এটুকু বুঝলো—আজকের এই যাওয়া কোনো সাধারণ যাওয়া না। মেহেরুন্নেসার হাত কাঁপছিল। ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অস্বস্তি জমে আছে। যেন কিছু একটা ঠিক নেই। বাইজিদের মুখের সেই শান্ত ভাবটা যতই মনে পড়ছে, ততই তার ভয় বাড়ছে।

সে ধীরে ধীরে হাতমুখ ধুয়ে নিল। ঠান্ডা পানি কপালে লাগতেই গত রাতের আঘাতটা আবার চিনচিন করে উঠলো। আয়নায় নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে তার বুকটা কেঁপে উঠলো।
চোখের নিচে কালচে দাগ। মুখটা ফ্যাকাশে।
মনে হচ্ছে এক রাতেই সে অনেকটা বদলে গেছে।
সে তাড়াতাড়ি মুখ ঘুরিয়ে নিল। তারপর আলমারি খুলে কালো বোরখাটা বের করলো। হাত কাঁপতে কাঁপতেই পরে নিল। ওড়নাটা শক্ত করে মাথার উপর টেনে দিল।
তার মাথায় বারবার একই প্রশ্ন ঘুরছে।
বাইজিদ কি কিছু জেনে গেছে? সে কি বুঝে ফেলেছে গত রাতে সে কোথায় গিয়েছিল?
তাই কি তাকে বাড়িতে রেখে আসতে চাইছে?
তাই কি আজ এত হঠাৎ করে পাঠিয়ে দিচ্ছে?
এই চিন্তায় তার গলা শুকিয়ে এলো।
ঠিক তখনই কক্ষের দরজা খুলে বাইজিদ ভেতরে ঢুকলো।
মেহেরুন্নেসা এক ঝটকায় তার দিকে তাকালো।
আজও তার মুখটা কেমন শক্ত। চোখের নিচে হালকা কালচে ছাপ। মনে হচ্ছে সেও সারারাত ঘুমায়নি।
বাইজিদ কিছু বলার আগেই মেহেরুন্নেসা দ্রুত এগিয়ে এলো।
“বলুন না…”
তার গলাটা কেঁপে উঠলো।
“ হঠাৎ কেন যাচ্ছি আমরা? বাড়িতে কেন নিয়ে যাচ্ছেন আমায়?”
বাইজিদ থেমে গেল।
তারপর ধীরে ধীরে মেহেরুন্নেসার দিকে তাকালো।
কয়েক মুহূর্ত সে কিছু বললো না। এমন নীরবতা, যেন কথাগুলো বলতে তারও কষ্ট হচ্ছে।
তারপর খুব ধীরে, থমথমে গলায় বললো,
“ কেউ তোমার বড় ভাই মাহবুবকে হত্যা করেছে।”

মেহেরুন্নেসার মনে হলো, পুরো পৃথিবীটা এক মুহূর্তে থেমে গেছে। সে বাইজিদের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। কিন্তু কথাগুলোর মানে যেন মাথায় ঢুকছে না। না, এটা হতে পারে না।
গত রাতেই তো সে তাকে দেখেছে। জঙ্গলে।
সে কথা বলছিল। দাঁড়িয়ে ছিল। তার মুখে ভয়ও ছিল না। তাহলে মেহেরুন্নেসার ঠোঁট কাঁপতে লাগলো।
“না…”
তারপর আরো নিচু গলায়,
“ না… এটা মিথ্যে…”
বাইজিদ চোখ সরিয়ে নিল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো।
“শেষবারের মতো দেখাতে নিয়ে যাচ্ছি তোমায়। আমার বোনের সাথে সে যাই করুক। তোমার তো ভাই। তোমার দিকটা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত টা নিয়েছি। চলো”

কতগুলো দিন যাবৎ রিয়্যাক্ট এর কি দশা 🙂
কাদের জন্য লিখি আমি? ভেবে পাই না একদমই। ৩k না হলে কাল সত্যিই গল্প দিব না।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply