জলতরঙ্গেরপ্রেম
পর্ব সংখ্যা;১৭
লেখনীতেনবনীতাচৌধুরি
রাত বাড়ার সাথে সাথে প্রকৃতির রূপ পরিবর্তন হচ্ছে। সিগন্ধ বাতাস টালমাটালে রূপ নিয়েছে। বাতাসের তালে ডাল – পালা ভেঙে পড়ছে টিনের চালে।
পাশাপাশি দু’জন দুজনের দিকে পিঠ দিয়ে বিছানায় শুয়ে আছে তরী আর তরঙ্গ। তরী ঘুমিয়েছে কি-না তা তরঙ্গের অজানা। ঘাড় বাঁকিয়ে পাশে শোয়া তরীর দিকে তাকালো সে। ক্ষণে ক্ষণে মৃদ্যু ভাবে বার বার মেয়েটার পিঠ কেঁপে উঠছে। তার মানে সে এখনো কাঁদছে? তরঙ্গ ঠোঁট কামড়ে বিস্তর হাসলো। কাঁদুক তার তরী জান। সারা রাত কাঁদুক। প্রয়োজনে এক মাস ধরে কাঁদুক। তার কাছে সস্থির বিষয় হচ্ছে তরী তার। সম্পূর্ণটাই তার। দূরে পালাতে চাইলে অধিকার দাবী করে আটকাতে পারবে। এর থেকে আনন্দের কি হতে পারে তরঙ্গের জন্য?
লম্বা শ্বাস টেনে, বিছানায় টান টান হয়ে শুয়ে চোখ বন্ধ করলো সে। সারাদিনে প্রচুর ধকল গেছে। কাল সকালে ও তার কাজ আছে। সকালে উঠেই মাছের অর্ডার দিতে ঘাটে ছুটতে হবে।
তারপর কাঁচা বাজার আর মাংসের বায়না ও দিতে হবে। এইবারে একটু ঘুমানোর প্রয়োজন। শরীর যেন আর চলছে না।
ঘড়ির কাঁটা আটটা পেরিয়েছে। সূর্যের তীর্যক আলো তরীর চোখে মুখে ঠিকরে পড়তেই তার ঘুম হালকা হয়ে এলো।
কোমর ছড়ানো লম্বা চুল গুলো এলোমেলো হয়ে পিঠের নিচে ছড়িয়ে আছে। চুল সামলে উঠে বসলো তরী। পাশ ফিরে তাকালো সে। তরঙ্গ নেই। ইতিমধ্যে সে উঠে পড়েছে? বাড়িতে থাকলে তো দশটায় ও ঘুম থেকে ডেকে তোলা যায় না। ভার্সিটি মিস দিতে ও ছেলেটা ভাবে না। অবশ্য মেধাবী তরঙ্গের তাতে সমস্যা ও হয় না। নোট কালেক্ট করে সপ্তাহের পড়া এক রাতেই কাভার করে ফেলে।
ভাবনা রেখে ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে ঝুমার ঘরে আসলো তরী। তিন্নি এখনো ঘুমাচ্ছে। কয়েক বার ডাকতেই তার ঘুমের রেশ কেটে এলো। বোনকে বিছানা থেকে তুলে দিয়ে ফ্রেশ হতে পাঠালো তরী। তিন্নি ফ্রেশ হয়ে এসে তরীর পাশে দাঁড়ালো। তরী কাঁথা- বিছানা ভাঁজ করছে। প্রতিদিনের তুলনায় তার ব্যবহার বেশ শীতল। কেমন অশান্ত, অশান্ত লাগছে বোনকে। কৌতূহল না দমিয়ে প্রশ্ন করে বসলো তিন্নি।
–” তোমার কি হয়েছে আপু?”
বোনের প্রশ্নে হাত থেমে গেলো তরীর। ঘাড় বাঁকিয়ে তিন্নির দিকে তাকালো সে। ঘুম জড়ানো চোখে তাকিয়ে আছে তিন্নি। অনেকক্ষণ ঘুমানোর কারণে মুখটা হালকা ফুলে আছে, গাল দুটো গুলুমুলু হয়ে আর ও গোল লাগছে তাকে। চোখে কৌতূহল, যেন কি হয়েছে তা না জানলে সে শান্তি পাবে না। তরী ধীরে কাঁথাটা গুছিয়ে বোনের পাশে বসে পড়লো। কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো সে। তারপর মৃদু একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল;-
–” কিছু হয়নি রে… মাঝে মধ্যে এমনিই মনটা খারাপ হয়ে যায়। বুঝবি না তুই এখন।”
তিন্নি ভ্রু কুঁচকে তাকালো, যেন বোনের কথা বিশ্বাস হলো না একটু ও।
–” মিথ্যা বলছো! তাহলে তোমার চোখ লাল কেনো? আমি জানি, কাঁদলে চোখ ওমন লাল হয়। টিভিতে দেখেছিলাম।”
তরী হালকা হেসে বোনের গাল টিপে দিলো।
–” তুই তো দেখি একে বারে গোয়েন্দা হয়ে গেছিস!”
তিন্নি মুখ ফোলালো।
–” বয়সে ছোটো হতে পারি। কিন্তু বুদ্ধি তে না।”
নিজের কথায় নিজেই খিলখিলিয়ে হেসে ফেললো তিন্নি। তরীর বুকটা হালকা কেঁপে উঠলো। সে একটু ঝুঁকে তিন্নিকে বুকে টেনে নিলো।
–” মানলাম তুই সব বুঝিস। কিন্তু এখন ই সব কিছু জানার দরকার নেই।”
তিন্নি চুপ করে রইলো। ছোট্ট হাত দিয়ে তরীর জামা আঁকড়ে ধরলো সে। তরী চোখ বন্ধ করে রইলো কিছুক্ষণ। এই ছোট্ট মানুষটার কাছে সে পৃথিবীর সব তিক্ততা লুকাতে চায়, আবার কষ্ট গুলো বলতে ও ইচ্ছে করে। কিন্তু সব ইচ্ছে তো আর পূরণ হয় না সব সময়।
তিন্নিকে নাশতা করিয়ে একবারে শাওয়ার নিয়ে মাত্র রুমার ঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে তরী।
ভেজিয়ে রাখা দরজা টা ঢেলে রুমে প্রবেশ করলো সে। রুমাকে সাজাতে পার্লার থেকে দুটো মেয়ে এসেছে। এরই মধ্যে রুমার সাজ অর্ধেক শেষ। চুলে ফুল গোঁজা হলেই পুরো সাজ কমপ্লিট। তরী কে আসতে দেখে তাকে নিজের পাশে হাত টেনে বসালো তিন্নি।
–” এতো দেরী করলে যে এই ঘরে আসতে? বসো, সাজবে না তুমি?”
–” না।”
–” কি বলো, সবার জন্য শাড়ি আনিয়েছি। তুমি পরবে না বললেই হলো। ওই ড্রয়ারে শাড়ি রাখা আছে। একটা নিয়ে নাও।”
ইতস্তত মুখে বসে রইলো তরী। এসব সাজ – পোশাকে তার আগ্রহ নেই। মানুষের তখনি কিছুতে আগ্রহ জন্মায়, যখন সে সেই জায়গাতে ভালোবাসা বা প্রংশসা পায়। কিন্তু কোনোদিন তরী তেমন কিছু পায়নি কারো থেকে। ছোটো বেলা থেকে আঠারো অব্দি সে টুকটাক সাজতো। মানুষের কটু কথা উপেক্ষা করে ও সাজতো। কিন্তু বুঝ বাড়তে ই সাজা কমিয়ে দিয়ে ছিলো। কিন্তু তারপর, ও মানুষের কথা থামেনি। গায়ের রঙ নিয়ে অপমান করা ও কেউ বাদ দেয়নি।
কালো, লাল, নীল রঙ গুলো যেনো তরীর জন্য হারাম। নিজের পছন্দের কেনা কালো জামাটা ও সে কোনো দিন শখ করে পরতে পারেনি। কালো রঙ পরলে নাকি তাকে আরো কালো লাগে। মানুষ অন্ধকারে দেখলে ভয় পাবে। লিপস্টিকের সেড নিয়ে ও বেশ কথা শুনেছে। কটকটে লাল রঙ নাকি কালোদের মানায় না। অথচ সে পুরোপুরি কালো না। এই গায়ের রঙ কে শ্যামলা ধরা হয়। এরপর থেকেই সাজ-সজ্জার পাঠ টা পুরোপুরি চুকেছে তার জীবনে। তরী কে এখনো চুপ করে বসে থাকতে দেখে রুমা বললো;-
–” চুপ করে বসে আছো কেনো আপু? দাঁড়াও আমি ই নিয়ে দিচ্ছি।”
সাজা ছেড়ে উঠে, ওয়ারড্রব থেকে বটল গ্রিন কালারের শাড়ি আর বেবি পিঙ্কের মধ্যে ব্লাউজ এনে তরীর হাতে ধরিয়ে দিলো সে।
–” গিয়ে শাড়িটা পরে এসো।”
রুমা বহু বার বলার পর; তরী গিয়ে শাড়ি পাল্টে এলো। তরীকে আসতে দেখে আয়নার সামনের থেকে সরে এলো রুমা। পার্লারের মেয়ে দুটো চলে গেছে। তরীর শ্যামবর্ণের সাথে শাড়ির রঙটা বেশ মানিয়েছে। অবাক চোখে তাকে কিছুক্ষণ দেখে পিক করে হেসে দিলো রুমা।
–” এদিকে আসো। তোমাকে সামান্য সাজিয়ে দেই।”
–” না, আমি শাড়ি পরেছি তো।”
–” একদম নিষেধ শুনবো না আপু।”
তরীর অনিচ্ছা শর্তে ও রুমা জোর করে তাকে সামান্য সাজিয়ে দিলো। মুখে সল্প ক্রিম দিয়ে ঠোঁটে একটু ন্যুড লিপস্টিক পরিয়ে দিলো। সব শেষে তরীর কোমর ছাড়ানো চুল গুলোতে একটা বেণি পাকিয়ে থামলো রুমা। তরীকে বসিয়ে দিয়ে তার সামনে দাঁড়ালো রুমা। অবাক চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে বিস্মিত কন্ঠে বললো।
–” তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে আপু। ভাইয়া আজ চোখ ফেরাতে পারবে না।”
রুমার কথায় অস্বস্তিরা ছড়িয়ে পড়লো তরীর রন্ধে রন্ধে। শ্যামবর্ণের মুখে ছড়িয়ে পড়লো ভয়ের ছাপ। চাচি আর বুসরার সামনে পড়লে এক গাদা কথা শুনতে হবে তাকে। কাঁচুমাচু মুখে তাকিয়ে রইলো তরী। তরঙ্গের সাথে তার সকাল থেকে একবার ও দেখা হয়নি। সে কোথায় গেছে তাও অজানা তরীর। রুমা বোধ হয় তরীর মুখ দেখেই তার মন পড়ে ফেললো। মুখ টিপে হেসে বললো;-
–” ভাইয়া ঘাটে গেছে ভাবি।”
রুমার মুখে ভাবি ডাক শুনতে; জড়োসড়ো হয়ে বসলো তরী। মিইয়ে যাওয়া কন্ঠে জবাব দিলো সে।
–” আমি জানতে চাইনি।”
–” বুঝেছি তো।”
উঠোনের এক কোণায় মেহেদী অনুষ্ঠানের জন্য স্টেজ করা হয়েছে। স্টেজের মাঝ বরাবর রুমা বসে আছে।
তার চারপাশে ভাবি – বোনেরা ভীড় জমিয়েছে। সবাই হাসি ঠাট্টা করছে আর একে অপরের হাতে মেহেদি পরিয়ে দিচ্ছে। তরী ও দু’জন কে এতক্ষণ মেহেদি পরিয়ে দিয়েছিলো। এখন আরেকজন এসে বসেছে সামনে। এর মধ্যেই তার পিঠের রগে টান পড়েছে। তার মেহেদী দেওয়া শেষ হতে উঠতে নিতেই পাশের বাড়ির এক ভাবি আটকে দিলেন। হাত টেনে নিজের পাশে বসিয়ে দিলেন তাকে।
–” তুমি কোথায় যাচ্ছো? মেহেদী পরবে না? বসো আমি দিয়ে দিচ্ছি।”
–” না না, আমি মেহেদী পরবো না ভাবি।”
–” চুপ করো তো মেয়ে। আমি পরিয়ে দিচ্ছি বসো। অর্গানিক মেহেদী, দেখি তো তোমার হাতে কেমন রঙ হয়।”
তরী মুখ বেজার করে নিলো। নিজের কোলের মধ্যে হাত টেনে নিলো সে।
–” আমার হাতে রঙ হবে না ভাবি। কালো গায়ে মেহেদীর রঙ ভালো লাগবে না।”
–” বেশি বুঝো তুমি? বসো তো চুপটি করে।”
তরীকে জোর করে ধরে তার দু’হাতের তালুতে মেহেদী পরিয়ে দিলো ভাবিটি। মেহেদী হাতে শাড়ি সামলে এক কোণে বসে রইলো সে।
তরঙ্গ সবে বাড়ি ফিরেছে। কাল রাতে বাতাস হলে ও বৃষ্টি আসেনি। সেই অনুযায়ী এখন রোদ ছড়া হয়েছে। বাতাসের চিহ্ন ও নেই প্রকৃতিতে।
তার মধ্যে মাছের বাজারে গিয়ে হাঁটু পর্যন্ত কাঁদায় মাখামাখি হয়ে গেছে। পারফিউমের স্মেল চাপিয়ে, নোংরা আঁশটে গন্ধ ছাড়ছে শরীর থেকে। মাংসের র*ক্ত লেগে গেছে র্টি-শার্টে।
ঘামে সারা শরীর ছিপছিপে হয়ে আছে। বিরক্তিতে তরঙ্গের কপাল সংকুচিত হয়ে আছে। স্টেজের এই দিকে একবার তাকিয়ে ফের উপরে চলে এলো তরঙ্গ। এই একবার তাকানোতে তরীকে দেখেনি সে। ঘরে ফিরে তরীকে না দেখতে পেয়ে মুচকি হাসলো তরঙ্গ। মেয়েটা তার কাছ থেকে পালাতে পারলেই যেনো বাঁচে। এতো কীসের অস্বস্তি তার? অবশ্য ঘাড় ত্যাড়া বউ বিয়ে করেছে। এতোটুকু তো সহ্য করতেই হবে। রাগ, জেদ সবটুকু ঝেরে ফেলতে পারলেই তরী পুরোটাই তার। ব্যাগ থেকে টাওয়াল আর র্টি-শার্ট নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়লো তরঙ্গ। বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে রেইন শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে থাকলো সে। শরীরে ঠান্ডা পানির স্রোত বইতেই মন, মস্তিষ্ক শীতল হয়ে উঠলো।
চলবে
( প্রিয় চড়ুই মহল,
কেমন হয়েছে জানাবেন কিন্তু! কাল লেখা কেটে যাওয়াতে দিতে পারিনি। আজ পড়া শেষে মন্তব্য জানাতে ভুলবেন না। মনে বোম পড়েছে। তাই লিখতে ইচ্ছে করে না। মন্তব্য জানালে যদি একটু আগ্রহ পাই। হাতের ব্যথা নিয়ে এতোটাই লিখতে পেরেছি। আর কাল/ পরশুর দিকে শি ইজ মাই অবসেশন পাবেন।)
Share On:
TAGS: জল তরঙ্গের প্রেম, নবনীতা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ৮
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ৭
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ৯
-
She is my Obsession পর্ব ১৬
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ১০
-
নবরূপা পর্ব ২৮
-
She is my Obsession পর্ব ২২
-
She is my Obsession পর্ব ১২
-
She is my Obsession পর্ব ১৪
-
She is my Obsession পর্ব ২৩