যেখানেপ্রেমনিষিদ্ধ
ইশরাতজাহানজেরিন
পর্ব_১৫
সাঁঝের কান্না পাচ্ছে। আরযান ভাই একটা অভিশাপ! সে সাঁঝকে খালি কষ্ট দেয়। কাল রাতের ঘটনা মনে পড়ছে তার। ফাজিল লোকটা কি থেরাপিটাই না দিলো। নিজের রুমের বাথরুমটা তাকে দিয়ে ৪৭ বার পরিষ্কার করালো। সাঁঝের কোমর থেকে শুরু করে সারা শরীর ব্যথা করছে। রাতে কিছু খেতেও দেয়নি। কেবল তাই করেনি, মশা মারার স্প্রেটা তার মুখে মেরে তাকে গায়ে বিলাই চিমটি লাগিয়ে দিয়েছে। ওমা তারপর কি চুলকানি। সেই চুলকানি আর জ্বলে পুড়ে শেষ হওয়া চোখ দুটো নিয়ে ৪৭ বার কি বাথরুম পরিষ্কার করা মুখের কথা? সাঁঝ ভোরের দিকে একবার জিজ্ঞেস করেছিল, “এটা ছিল আপনার থেরাপি? এটার থেকে বেটার ডিম থেরাপি দিতেন। বিপদের কালে খাদ্য সংকটে অন্তত পেছন থেকে সেই ডিম বের করে তো ভাজি করে খেয়ে বাঁচতে তো পারতাম।” আরযান জবাব দিলো না। কেবল একটা পেইন কিলার দিয়ে বলল, “খেয়ে নে। তোর আবার বেশি শরীর খারাপ করলে বিয়ের পর তো সেই আমাদেরই তোর স্বামী কথা শুনাবে।”
সাঁঝ মাঝে মাঝে আরযান ভাইয়ের এইসব কথার মানে খুঁজে পায়না। এতোসব তার মাথায় ঢুকেও না। কেন জানি খুব, খুব বেশি কঠিন লাগে শুনতে।
এখন ভোর। বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে সাঁঝ। আকাশটা ধূসর, ভারী। হাওয়ায় কেমন ঠান্ডা একটা শিরশির ভাব। যেন বৃষ্টির আগাম বার্তা। দূরে কোথাও মেঘ গর্জে উঠলো হালকা করে। সাঁঝের চোখ দুটো লাল। শরীর এখনো ব্যথায় ভরা, কিন্তু তার থেকেও বেশি জ্বালা করছে অপমানটা। ঠিক তখনই পেছন থেকে দরজা খুলে কারো ঢোকার শব্দ। “এত সকালে দাঁড়িয়ে নাটক করছিস কেন?” সাঁঝ মুখ ঘুরাল না। গলার স্বর শুনেই বুঝে গেছে—আরযান।
“নাটক না। দাঁড়িয়ে আছি।”
“ও, দাঁড়িয়ে আছিস। মনে হচ্ছিলো কোনো কুকুর খাবারের জন্য অপেক্ষা করছে।”
সাঁঝ এবার ধীরে ঘুরে তাকাল। চোখে একরাশ বিরক্তি।
“আপনার তো সবকিছুই মজা লাগে, তাই না?”
আরযান কোনো উত্তর দিল না। বরং হাতটা সামনে বাড়িয়ে দিল। তার হাতে ছোট্ট একটা শালিক পাখির বাচ্চা। ভেজা, কাঁপছে। সাঁঝ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
“এটা…?”
“পড়েছিল নিচে। বাসা থেকে পড়ে গেছে মনে হয়। মরে যেত, তাই তুলে আনলাম।”
“আপনি…?” সাঁঝের কণ্ঠে অবিশ্বাস স্পষ্ট।
আরযান ভ্রু কুঁচকে বলল, “আমি মানুষ না নাকি?”
সাঁঝ কিছু বলল না। ধীরে হাত বাড়িয়ে পাখিটাকে নিল। ছোট্ট বুকটা কাঁপছে ঠিক তার নিজের মতো। কিছুক্ষণ চুপচাপ। তারপর সাঁঝ আস্তে বলল, “কাল যা করেছেন… ওটার কি দরকার ছিল?”
আরযান দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়াল।
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
“কারণ তুই সীমা ভুলে যাচ্ছিলি।”
সাঁঝের চোখে আবার জল চলে এলো। “সীমা শেখানোর জন্য মানুষকে মেরে ফেলতে হয়?”
“মরিসনি তো। দাঁড়িয়ে আছিস, কথা বলছিস।”
“আপনার কাছে সবকিছু এত সহজ মনে হয় কেন?”
আরযান একটু চুপ করল। তারপর শান্ত গলায় বলল,
“সহজ না। আমি শুধু কঠিনটা আগে শিখে গেছি।”
সাঁঝ মাথা নিচু করল।
“আপনি… মাঝে মাঝে খুব খারাপ।”
“মাঝে মাঝে?”
সাঁঝ চোখ তুলে তাকাল রাগ নিয়ে, “সিরিয়াসলি বলছি।”
সাঁঝ পাখিটাকে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরল।
“এটা বাঁচবে?”
আরযান তাকিয়ে বলল, “যদি ঠিকভাবে দেখাশোনা করিস, বাঁচবে।”
“আর যদি না পারি?”
“তাহলে মরে যাবে।”
সাঁঝ বিরক্ত হয়ে বলল, “সব কথায় এত কড়া হতে হয়?”
“বাস্তবতা কড়া।”
সাঁঝ ঠোঁট কামড়ে চুপ করে রইল। তারপর হঠাৎ বলল, “আপনি আমাকে এত কষ্ট দেন কেন?”
প্রশ্নটা শুনে আরযান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল।
তারপর খুব শান্ত গলায় বলল, “কারণ তুই সহ্য করতে পারিস।”
সাঁঝ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। “এটা কোনো কারণ হলো?”
“হ্যাঁ। যারা ভেঙে পড়ে, তাদের আমি এভাবে ট্রিট করি না।” বৃষ্টির শব্দ বাড়ছে ধীরে ধীরে। সাঁঝের চোখ আবার ভিজে উঠল, কিন্তু এবার কান্নাটা একটু আলাদা।
“আপনি খুব খারাপ মানুষ…”
আরযান হালকা মাথা নাড়ল, “জানি।”
“তবুও… পাখিটা এনে দিলেন কেন?”
আরযান একটু তাকিয়ে রইল তার দিকে। “সব খারাপ মানুষ পুরোটা খারাপ না।”
সাঁঝ কিছু বলল না। শুধু পাখিটার দিকে তাকিয়ে রইল।
আরযান ঘুরে চলে যেতে লাগল। দরজার কাছে গিয়ে থামল। “ওষুধটা খেয়েছিস?” সাঁঝ চুপ।
“না খেলে আবার আজকেও ‘থেরাপি’ দিবো কিন্তু ।”
সাঁঝ চোখ বড় করে তাকাল, “আপনি—!”
আরযান হালকা হাসল, “মজা করলাম। খেয়ে নিস।”
বৃষ্টিটা নেমেছে। একটু জোরে নেমেছে এখন। টুপটাপ শব্দে বারান্দাটা ভরে গেছে। সাঁঝ এখনও দাঁড়িয়ে। হাতে শালিকের বাচ্চা। আরযান ভাই চলে গিয়েছে অনেকক্ষণ হলো। তবে হঠাৎ আবার দরজাটা কিঞ্চিত খুলে গেল। সাঁঝ বিরক্ত হয়ে বলল, “ আবার কি?” আরযান দরজার ফ্রেমে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে, “চেক করতে এলাম পাখিটা এখনো বেঁচে আছে, না তোর আদরে অলরেডি শহীদ হয়ে গেছে।”
সাঁঝ চোখ কুঁচকে তাকাল, “আপনার সমস্যা কি?সবসময় খোঁচা না দিলে চলে না?”
“না। তোর সাথে তো একদমই না।”
“তাহলে অন্য কাউকে গিয়ে জ্বালান!”
“তুই এত স্পেশাল, অন্য কাউকে কেন?”
সাঁঝ থমকে গেল, তারপর ঠুস করে বলল, “স্পেশাল না, আপনার টার্গেট প্র্যাকটিস।”
আরযান এগিয়ে এল, “ভালো বলেছিস। কিন্তু টার্গেটটা বেশ শক্ত। এখনো ভাঙেনি ।”
সাঁঝ গম্ভীর মুখে, “ভাঙলে আপনার শান্তি লাগবে?”
“না। তখন আর মজা থাকবে না।”
“আপনি একদম অসুস্থ!”
“ডায়াগনোসিস করলি? প্রেসক্রিপশন দিবি নাকি?”
“দিবো দূরে থাকুন।”
আরযান হেসে মাথা নাড়ল, “ওটা আমার রোগের ওষুধ না।”
সাঁঝ বিরক্ত হয়ে অন্যদিকে তাকাল। বৃষ্টি একটু এসে গায়ে লাগছে। আরযান হঠাৎ বলল, “পাখিটার নাম কি রাখছিস?”
“আপনার মতো কোনো আজব নাম রাখব না।”
“মানে ‘আরযান জুনিয়র’ রাখছিস না?”
“ধুর! ওটা হলে পাখিটাও অত্যাচারী হয়ে যাবে।”
“তোর কাছেই তো আছে। ট্রেনিং পেয়ে যাবে।”
সাঁঝ এবার সরাসরি তাকাল, “আপনি আমাকে আবার কিছু করানোর প্ল্যান করছেন?”
আরযান ভ্রু তুলল, “কেন? ভয় পাচ্ছিস?”
“না! কিন্তু আপনি থাকলে ভয় না পেয়ে উপায় আছে?”
“ভালো। ভয় থাকা দরকার। না হলে আবার সীমা ছাড়াবি।”
সাঁঝ দাঁত চেপে বলল, “কাল যেটা করেছেন, ওটা সীমা শেখানো না—অত্যাচার।”
“শিখেছিস তো?”
“কি শিখেছি?”
“আমার সাথে লাগতে নেই।”
“আমি লাগি? আপনি নিজেই এসে লাগেন!”
আরযান একটু এগিয়ে এল, “তুই না লাগলে আমি আসতাম না।”
সাঁঝ হতভম্ব, “মানে?”
“মানে তুই সমস্যা। আমি শুধু রিঅ্যাকশন।”
সাঁঝ ঠুস করে বলল, “ওহ! নিজের দোষ নেই, সব আমার?”
“এক্সাক্টলি।”
“আপনি আনবিলিভেবাল।”
“যা বলেছিস তার স্পেলিং বল তো।”
সাঁঝ থতমত খেয়ে গেল। ওইসব বানান ফানান সে পারে না। আরযান শান্ত গলায় বলল, “তবুও আমার সাথেই থাকিস।”
“থাকি? কে থাকে? আপনি জোর করে থাকান!”
আরযান হাসল, “পালিয়ে যা দেখি। দরজা তো খোলা।”
সাঁঝ এক সেকেন্ড চুপ করে রইল… তারপর মুখ ঘুরিয়ে বলল, “যাবো।”
“যা।”
“যাবো বললাম তো!”
“তাহলে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”
সাঁঝ গম্ভীর হয়ে, “কারণ… বৃষ্টি হচ্ছে।”
আরযান ঠোঁট চেপে হাসল, “ওহ, বৃষ্টি থামলে পালাবি?”
“হ্যাঁ!”
“ঠিক আছে। আমি তখন ছাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকব।”
“কেন?”
“ধরার জন্য।”
সাঁঝ চোখ বড় বড়, “আপনি সিরিয়াস?”
“পুরা সিরিয়াস। পালালে ধরে এনে আবার থেরাপি দিব।”
সাঁঝ পাখিটাকে আরও শক্ত করে ধরে বলল, “আপনি মানুষ না, ভয়ংকর কিছু!”
“ধন্যবাদ। কমপ্লিমেন্ট নিলাম।”
“এটা কমপ্লিমেন্ট না!”
“আমার কাছে সবই কমপ্লিমেন্ট।”
সাঁঝ বিরক্ত হয়ে চুপ করে গেল।
বৃষ্টি আরও জোরে নামছে।
আরযান ধীরে বলল, “ওষুধটা খাসনি এখনো, তাই না?”
সাঁঝ গম্ভীর, “না।”
“কেন?”
“মরে গেলে শান্তি পাবেন, তাই না?”
আরযান একটু থেমে গেল। তারপর ঠান্ডা গলায়, “না। তুই মরলে ঝামেলা বাড়বে।”
সাঁঝ চোখ কুঁচকে, “কি ধরনের মানুষ আপনি!”
“প্র্যাকটিক্যাল।”
“নির্দয়!”
“কারেক্ট। ওষুধ খেয়ে নিস। না হলে আজ রাতে বোনাস থেরাপি আছে।”
সাঁঝ চোখ কপালে তুলে, “আবার?!”
আরযান দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল, “এইবার ৪৭ না… ১০০ বার।”
হঠাৎ সাঁঝ শালিক পাখিটির দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোর নাম কি রাখি হুম?” সাঁঝ আস্তে বলল।
পাখিটা ছোট্ট করে “চিক… চিক…” শব্দ করল।
সাঁঝের চোখ একটু উজ্জ্বল হয়ে উঠল, “ওহ! বুঝেছি তোর নাম হবে চিকু!”
“ভালোই তো। নাম রাখার ক্ষেত্রেও তোর লেভেল খুব হাই।”
সাঁঝ ঘুরে তাকাল, “আপনার আর কোনো কাজ নাই?”
“অভাব নেই। তোর মতো আজাইরা নাকি? তাও যে তোকে মানুষ করার জন্য সময় দিচ্ছি শুকরিয়া আদায় কর।” আরযান এগিয়ে এসে পাখিটার দিকে তাকাল, “এটা দেখতে তোর মতোই। দুর্বল, আর সবসময় কাঁদে।”
সাঁঝ কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই চিকু হালকা করে ডানা ঝাপটিয়ে উঠল… আর সোজা গিয়ে বসলো সাঁঝের মাথার ওপর। “এই এই! আরে নাম!”
এর আগেই পচাৎ! সাঁঝ একদম জমে গেল।
দুই সেকেন্ড নিস্তব্ধতা… তারপর
“ইসসসসসস!!!” আরযান হেসে ফেটে পড়ল, “এই তো! সাব্বাস!”
সাঁঝ চিৎকার করে, “আআআ! এটা কি হলো!!”
“চিকু তোর প্রতি তার ভালোবাসা প্রকাশ করলো।”
“এটা ভালোবাসা?”
সাঁঝ তাড়াহুড়া করে মাথা ঝাড়ছে, এক হাতে চিকুকে নামানোর চেষ্টা করছে। চিকু আবার “চিক চিক” করছে নির্দোষ মুখে। “দেখছেন? হাসছেন কেন?! কিছু করেন!”
“কি করবো? ওর ফ্রিডম বন্ধ করবো? দেখ আমি এত খারাপ না কেউ তার জরুরি কাজ করছে আর আমি গিয়ে বাঁধা দিব।”
“ও আমার মাথায় হাগু করছে!”
“উপযুক্ত জায়গা। পাখিও জানে তোর মাথায় যে গু, তাই ওখানেই হাগু করেচে।”
সাঁঝ রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল, “চিকু, তুইও বিশ্বাসঘাতক!”
চিকু আবার “চিক!” করে উঠল।
“এই যা মাথা ধুয়ে আয়, ওয়াক কি গন্ধ যাহ।” সাঁঝ রেগে আরযানের দিকে তাকাল। সময় আসুক চিকুকে যদি ওনার মাথার ওপর বসিয়ে পটি না করিয়েছে সে।
–
বেলা ভালোই হয়েছে। ক্ষনিকালয়ে এমন বেলায় পুরুষ মানুষ খুব একটা বাসায় থাকে না। বিশেষ করে কর্তারা। তারা কাজে চলে যায়। আরযান, রাজ, প্রাণ ওরা তো কাজে চলে গিয়েছে। তবে আব্রাজ, রাত ঘুমাচ্ছে এখনো। শেষ রাতের দিকে বাড়ি ফিরেছিল এই ২ জন। আর আরভিদ তো মাত্রই ঘুম থেকে উঠল। সে বিবাহিত পুরুষ, তাই একটু এখন দেরি করেই ঘুম ভাঙবে। এটাই স্বাভাবিক। আজকে তাজও বাসায় আছে। তার ফ্লাইট রাতের দিকে। বাড়ির সবার নাস্তা হয়ে গেছে। বাকি আছে আরভিদ আর আর্যা। আরভিদের মা ছেলের বউকে নাস্তা খেয়ে নিতে বলেছিল কিন্তু আর্যা খেল না। স্বামীকে ছাড়া সে খাবে না। একথা শুনে আরভিদের মায়ের মনটা খুশিতে ভরে গেল।
টেবিলে পরিপাটি করে সাজানো নাস্তা। আরভিদ চুপচাপ প্লেটের দিকে তাকিয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। তারপর ভ্রু কুঁচকে তাকাল আর্যার দিকে।
“এটাই নাস্তা? নাকি আজকাল ‘সংযম’ নামের কোনো নতুন রীতি শুরু করেছ?”
আর্যা ধীরভাবে চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল। চোখে সরাসরি তাকাল না “অপচয় না করাটাকে যদি তুমি সংযম বলো, তাহলে হ্যাঁ আমি সেটা মানি।”
আরভিদের ঠোঁট বাঁকলো, “অপচয় আর কৃপণতার মাঝে একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। সবাই সেটা বোঝে না, অবশ্য।”
আর্যা এবার তাকাল। চোখে সরাসরি বিরক্তি।
“সবাই আবার অকারণে বিলাসিতাকেও প্রয়োজন মনে করে না।”
কিছুক্ষণ দু’জনের চোখে চোখ আটকে রইল। আরভিদ কাঁটাচামচটা নামিয়ে রাখল, একটু ঝুঁকে এল সামনে।
“তোমার এই হিসেবি স্বভাবটা তোমার পরিবারের কাছ থেকেই পাওয়া, তাই না?”
আর্যা এক মুহূর্ত থামল। তারপর খুব মাপা গলায় বলল,
“আমার পরিবার অন্তত টেবিলে বসে অযথা খরচ বাড়ায় না।”
“ইঙ্গিতটা বুঝলাম। তবে শুনো পাগলের গুষ্টি, এটা আমার বাড়ি সো যা হবে আমার নিয়মই।”
আর্যা হাসল, “নিয়ম মানতে আপত্তি নেই… যদি সেটা যুক্তিসঙ্গত হয়।”
আরভিদ সোজা হয়ে বসল, “যুক্তি শেখানোর দরকার নেই আমাকে।”
আর্যা শান্ত গলায় জবাব দিল, “আমি শেখাচ্ছি না স্বামীজান। শুধু মনে করিয়ে দিচ্ছি সব সিদ্ধান্তই একতরফা হয় না।”
“তোর সিদ্ধান্ত নিয়ে তুই কবরে যাহ।”
আর্যা চুপ করে গেল। এখানে চেঁচামেচি করা যাবে না। বাড়ির মানুষ কি ভাববে?
ঠিক তখনই ডোরবেলের শব্দ হলো। কাজের মেয়ে দৌড়ে গেল। আরভিদ বিরক্ত হয়ে মাথা তুলল, “এই সকালে আবার কে মরল!”
কাজের লোক দরজা খুলতেই বাইরে থেকে চেনা গলা ভেসে এলো, “এই যে, জামাইবাবু আছেন?”
আর্যার শরীর এক ঝটকায় শক্ত হয়ে গেল। আরভিদের চোখ সরু হয়ে এলো। এটা তার ছোট শালাটা না? জাউরায় এখানে কেমনে এলো? সে দরজার কাছে তাকাতেই দেখল তার শশুর, শাশুড়ী দাঁড়িয়ে আছে। তাদের আসার খবর পেতেই বাড়ির মহিলাদের তুলুতুলু শুরু হয়ে গেল। ন্যাকা যত্তসব। সকাল সকাল এমন করে কে কার বাড়িতে আসে? তাও আবার ঝুলিয়ে দেওয়া মেয়ের শশুরবাড়িতে। আরভিদের খাওয়ার রুচি মরে গেছে। আরভিদ ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে উঠল। “বাহ… সার্কাস তো নিজে থেকেই এসে গেছে।”
আর্যা তীক্ষ্ণ গলায় বলল, “ভদ্রভাবে কথা বলো।”
“ভদ্রতা?” আরভিদ হেসে উঠল, “যাদের দেখে আমার সকালের নাস্তা হজম হয় না, তাদের সাথে?”
এদিকে ড্রয়িংরুমে ঢুকেই শশুর গলা চড়াল, “কই, আমার মেয়ে? এত বড় বাড়িতে থাকে, আর বাবাকে দরজায় দাঁড় করিয়ে রাখে?”
আরভিদ ধীরে ধীরে ড্রয়িংরুমে ঢুকল। “দেখুন, এটা হোটেল না… আর আপনারা অতিথিও না।”
আর্যা তাড়াতাড়ি এগিয়ে এল, “ওরা আমার বাবা-মা।”
আরভিদ ঠান্ডা গলায় বলল, “তাই তো সমস্যা।”
শশুর হেসে উঠল, “জামাইবাবু, একটু মুখ সামলে কথা বলো। আমরা গরিব হতে পারি, কিন্তু ”
“কিন্তু অভ্যাসগুলো খুবই দামি,” আরভিদ কেটে দিল,
“অন্যের বাড়িতে এসে বসে পড়া, হিসেব করা, আর সুবিধা নেওয়া এসব তো ফ্রি না, তাই না?”
শালাটা উঠে দাঁড়াল, “এই এই আমি কিন্তু ক্যারাটি জানি।”
আরভিদ এক পা এগিয়ে গেল। চোখে সরাসরি হুমকি। “শালার ঘরের শালা।”
“কী আরভিদ, খবর তো ভালোই। ভাবলাম, একটু সময় নিয়ে মেয়েটাকে দেখি। সারাদিন থাকবো।”
“সারাদিন? মেয়ে দেখার জন্য এতটা সময় প্রয়োজন এটা আমার জানা ছিল না।”
শাশুড়ি তৎক্ষণাৎ কথা জুড়ে দিলেন, “এই তো, মেয়ের বাড়ি—আসা-যাওয়া তো থাকবেই। আর তাছাড়া, আত্মীয়তা বলে একটা ব্যাপার আছে।”
আরভিদ ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে সামনে চেয়ারে বসল।
“আত্মীয়তা অবশ্যই আছে। তবে আত্মীয়তার নামে অযথা দীর্ঘ অবস্থান তা একটু ভিন্ন ব্যাপার।”
শালা হালকা হেসে বলল “দুলাভাই, আপনি তো দেখছি খুব হিসাবি মানুষ!”
আরভিদ এবার সরাসরি তাকাল তার দিকে, “হিসাবি নই, সচেতন। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় এবং সময় দুটোকেই আমি এড়িয়ে চলি। কিগো অপচয় নিয়ে তা জ্ঞান দিলে মাত্র? তো কিছু বলছো না কেন?”
আর্যা চুপ করে গেল। শশুর গলা পরিষ্কার করে বললেন,
“তুমি কি বলতে চাইছো, আমাদের আসাটা অপ্রয়োজনীয়?”
আরভিদ এবার সামান্য ঝুঁকে বসে বলল, “আমি শুধু এটুকুই বলতে চাইছি যে কাজ অল্প সময়ে সম্পন্ন করা যায়, সেটাকে অযথা দীর্ঘায়িত করার প্রয়োজন দেখি না। আপনারা এসেছেন, সম্মান করেছি। কিন্তু সারাদিন থাকা এটা আমার দৃষ্টিতে অযৌক্তিক।”
শাশুড়ির মুখের হাসি মুছে গেল। শালা চোখ নামিয়ে নিল। আরভিদ শেষবারের মতো স্পষ্ট করে বলল,
“আশা করি, আপনারা বিষয়টা বুঝবেন। সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎ যেমন মর্যাদা বজায় রাখে, তেমনি অযথা দীর্ঘ উপস্থিতি অনেক সময় সেই মর্যাদাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।”
হঠাৎই ভেতর দিক থেকে দ্রুত পায়ের শব্দ শোনা গেল।
“এই এই, আরভিদ! এভাবে কথা বলছিস কেন?” আরভিদের মা তড়িঘড়ি করে এসে দাঁড়ালেন সামনে। তাঁর চোখে স্পষ্ট অসন্তোষ। পেছন পেছন চাচিরাও এসে যোগ দিলেন। “আরে, মানুষজন এসেছে মেয়ের বাবা-মা! এভাবে কেউ কথা বলে নাকি?”
আরভিদ চুপচাপ বসে আছে, “আমি তো শুধু যুক্তির কথা বললাম, মা।”
“যুক্তি সব জায়গায় দেখাতে হয় না!” মা এবার গলা একটু উঁচু করলেন, “সম্মান বলে একটা জিনিস আছে। ওরা তোর শ্বশুর-শাশুড়ি!”
চাচি পাশে থেকে যোগ করলেন, “তোর নিজের বোনের বাসায় গেলে কেউ যদি এভাবে বলত, কেমন লাগত বল তো?”
এই কথায় কয়েক সেকেন্ডের জন্য থেমে গেল আরভিদ। মুখ শক্ত হয়ে গেল, কিন্তু কিছু বলল না। শাশুড়ি একটু গলা নরম করে বললেন, “না না, থাক… আমরা কেউ মন খারাপ করিনি। ছেলেমানুষ, একটু রাগ হয়েছে বুঝি…”
শালা বাবু হেসে বলল, “হ্যাঁ দুলাভাই তো সিরিয়াস টাইপ মানুষ, আমরা বুঝে গেছি!”
আরভিদ এবার ধীরে মাথা তুলল। ঠোঁটের কোণে হালকা বাঁকা হাসি। “বোঝা ভালো… ভুল বোঝার চেয়ে।”
আর্যা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তার চোখ বারবার আরভিদের দিকে যাচ্ছে। সে বুঝতে পারছে এই চুপ থাকা মানেই ঝড় থেমে যায়নি। মা এবার আর্যার হাত ধরে বসালেন, “এই যে মা, তুমি কিছু মনে কোরো না। ওর স্বভাবই একটু এমন।”
আর্যা মৃদু হেসে বলল, “আমি কিছু মনে করিনি, মা।”
আরভিদ উঠে দাঁড়াল ধীরে। “ঠিক আছে, যেহেতু সবাই এত অনুরোধ করছে… থাকুন।” সবাই একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। কিন্তু পরের কথাটাতেই আবার থমকে গেল পরিবেশ। “তবে একটা কথা পরিষ্কার করে দিচ্ছি”
সে হাতঘড়ির দিকে তাকাল, “আমি সময় অপচয় পছন্দ করি না। তাই আজকের দিনটা কীভাবে ‘কার্যকর’ করা যায়, সেটা আশা করি সবাই মাথায় রাখবেন।” চাচিরা একে অন্যের দিকে তাকালেন। এই ছেলেকে বুঝানো মুশকিল। শশুর এবার কাশলেন হালকা করে, “হ্যাঁ হ্যাঁ, আমরা তো এমনিতেই বেশি সময় নেব না…” আরভিদের চোখে তখন স্পষ্ট একরোখা জেদ। সে কিছু না বললেও, তার ভেতরে সিদ্ধান্ত পাকা আজই… যেভাবেই হোক… এদের বিদায় করবে। আরভিদ ভালো করেই আলাউদ্দিন তালুকদারকে চিনে। নির্গাত ভাষার চাল-ডাল শেষ হয়ে গেছে তা কিনতে হবে বলে মেয়ের শশুরবাড়ি হনহনিয়ে চলে এসেছে।
দুপুরের খাবারের টেবিল জমে উঠেছে বেশ। নানা রকম পদ। মাংস, ভুনা, ডাল, ভর্তা সবকিছুই সাজানো। সবাই বসেছে। আব্রাজ উঠে খেতে বসেছে। তাজও আর রাতও একসাথে বসেছে। সাঁঝ এখনো ঘুমাচ্ছে। তাকে ডাকার জন্য লোক পাঠানো হলে ওই লোকই ভয়ে দৌড়ে আসে। আসুক আরযান তারপর ঠিকই বিচার হবে। কাজের লোক জামাল চুপচাপ পাশে দাঁড়িয়ে আছে। আরভিদ একবার তাকাল তার দিকে। জামাল বুঝে গেল। আলাউদ্দিন তালুকদার খুব আরাম করে খেতে শুরু করলেন, “ওহো! রান্না তো বেশ হয়েছে!”
আরভিদ ভদ্র মুখে বলল, “আপনার জন্যই স্পেশাল ব্যবস্থা।”
খাওয়ার মাঝখানে শশুর বললেন, “এই মাংসটা তো দারুণ! আর একটু দাও তো—”
জামাল তৎক্ষণাৎ এগিয়ে দিয়ে বলল, “এইটা খান স্যার, এইটা সবচেয়ে নরম।”
খাওয়া শেষ হতেই আলাউদ্দিন তালুকদার বললেন, “উফ… পেটটা কেমন যেন লাগছে…”
শশুর কপালে হাত দিলেন। দশ সেকেন্ডও যায়নি।
“এই… বাথরুমটা কোনদিকে?”
চাচি তাড়াতাড়ি দেখিয়ে দিলেন, “ওইদিকে, ডান পাশে!”
একবার গেলেন… পাঁচ মিনিট পর আবার বের হলেন…তারপর আবার দৌড়! আরভিদ ফিসফিস করে বলল,
“বাবা, কী হয়েছে ?”
আলাউদ্দিন তালুকদার হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,, “চুপ… পরে বলি…” আরেক দফা দৌড়! চাচিরা একে অন্যের দিকে তাকাচ্ছেন। শাশুড়ি চিন্তিত, “এই হঠাৎ এমন হলো কেন?” আর্যা এবার সরাসরি তাকাল আরভিদের দিকে। তার চোখ সরু হয়ে এলো।
“তুমি কিছু করেছো?” আরভিদ একদম শান্ত, গ্লাসে পানি ঢালছে। “আমি? আমি তো অতিথি আপ্যায়ন করছি।” ঠিক তখনই আবার ভেতর থেকে আওয়াজ,
“আরে আরেকবার যেতে হবে!”
আরভিদ মুখ চেপে হাসি আটকাচ্ছে। তাজ পাশে বসে ধীরে বলল, “ভাই… একটু বেশি ‘আপ্যায়ন’ হয়ে গেল না?”
আরভিদ নিচু গলায় উত্তর দিল, “কিছু কিছু মানুষকে দ্রুত বিদায় দিতে বিশেষ ব্যবস্থার দরকার হয়। আচ্ছা আমি গিয়ে দেখে আসি শশুর মশাইয়ের কি অবস্থা।” সে উঠে বাথরুমের দিকে গেল। সেখানে গিয়ে সে দেখল দরজা খুলে বের হয়েছে আলাউদ্দিন তালুকদার। মুখ লাল, চোখে অস্বস্তি। আরভিদ ভ্রু তুলে তাকাল,
“আরে! কী অবস্থা? ম্যারাথন দৌড়াচ্ছেন নাকি?”
আলাউদ্দিন অস্বস্তিতে হেসে বললেন, “না না… পেটটা একটু… সমস্যা করছে…”
আরভিদ মাথা নেড়ে বলল, “ওহ, বুঝলাম। আমাদের রান্না হয়তো একটু ‘রিচ’ হয়ে গেছে আপনার জন্য।” ভেতরে ভেতরে সে হাসছে, কিন্তু মুখে একদম সিরিয়াস ভাব। ভালোই হয়েছে এই লোকের খাবারে সে জামালগোটা মিলিয়ে দিয়েছিল। আলাউদ্দিন কিছু বলার আগেই আবার মুখ কুঁচকে ফেললেন, “আরে… আবার লাগছে!”
তিনি তাড়াতাড়ি ঘুরে দাঁড়াতেই হঠাৎ করেই তার লুঙ্গিটা একটু ঢিলা হয়ে নিচের দিকে সরে গেল। এক সেকেন্ডের জন্য জমে গেল সময়। আরভিদ চোখ সরিয়ে নিল তৎক্ষণাৎ। আলাউদ্দিন একদম লজ্জায় লাল হয়ে গেলেন, “আরে আরে—” তাড়াহুড়ো করে লুঙ্গিটা তুলে নিলেন, চারপাশে তাকালেন কেউ দেখেছে কিনা।
আরভিদ গম্ভীর গলায় বলল, “মেয়ের জামাইয়ের বাড়িতে লুঙ্গি পড়ে আসলে এমনই হবে।” আলাউদ্দিন তালুকদার আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। সরাসরি লুঙ্গি চেপে ধরে আবার বাথরুমে ঢুকে পড়লেন। দরজা বন্ধ হতেই আরভিদ ধীরে মাথা নিচু করল…
তার কাঁধ হালকা কেঁপে উঠছে হাসি আটকাতে কষ্ট হচ্ছে। সে নিজেকে সামলে নিয়ে আবার আগের মতো ঠান্ডা মুখ করে দাঁড়াল। “খুবই দুঃখজনক…” সে আস্তে বলল, “শরীর ঠিক না থাকলে আসা উচিত না।” সে কিছুক্ষণের মধ্যেই বের হলো। তার অবস্থা ক্রমেই খারাপ। শেষমেশ তিনি হাঁপাতে হাঁপাতে বের হয়ে বললেন, “না… আজকে আর থাকা যাবে না… শরীরটা একদম ভালো লাগছে না…”
শাশুড়ি তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালেন, “চলো চলো, বাসায় যাই!”
সবাই থাকতে বলল। কিন্তু সে রাজি হলো না। এখন একটু পেটে চাপ কম লাগছে। কোনোমতো সবার থেকে বিদায় নিলো। সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল তাদের বিদায় দিতে। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আরভিদ খুব ভদ্র গলায় বলল,
“আরে, এত তাড়াহুড়া কেন? আরেকটু থাকতেন…”
শশুর কষ্টের হাসি দিলেন, “না না… আবার আসবো…” বলতে না বলতেই তার পেট আবাট মোচর দিলো। “এই চলো চলো বাসায় চলো।”
আরভিদ আলাউদ্দিন তালুকদারের দিকে তাকিয়ে বলল, “বাবা একটা ডায়াপার পড়লে ভালো হতো না? রাস্তায় যদি লুঙ্গি নষ্ট করে দেন?”
চলবে?
( আপনারা কমেন্ট করে কেমন হয়েছে সেইসব না বললে কেমনে কি? সবাই কমেন্ট করবেন।)
Share On:
TAGS: ইশরাত জাহান জেরিন, যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৬
-
প্রেমতৃষা সারপ্রাইজ পর্ব
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৩
-
প্রেম আসবে এভাবে পর্ব ১৩
-
পরগাছা পর্ব ৯
-
প্রেমতৃষা পর্ব ২৫+২৬
-
প্রেমতৃষা পর্ব ২৮
-
প্রেমতৃষা পর্ব ২১+২২
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪১
-
পরগাছা পর্ব ২৪