Golpo romantic golpo নবরূপা

নবরূপা পর্ব ৩১


নবরূপা

পর্ব_৩১

কলমেঅনামিকাতাহসিন_রোজা

বৃষ্টির মাত্র বেড়েই চলেছে। নীহারিকার অস্বস্তি হচ্ছে ভীষণ। এইযে লোকটা ব্যাগট্যাগ নিয়ে এসে ড্রাইভিং সিটে বসেছে তো বসেই রয়েছে। নিয়েই যখন এসেছে তখন যাচ্ছে না কেনো? গাড়ি স্টার্ট করছে না কেনো? অকারণেই অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে নীহারিকার দিকে। গত বিশ মিনিট ধরে তারা রাস্তার পাশে গাড়ির ভেতরে এভাবেই রয়েছে। নীহারিকা আড়চোখে তাকালো একবার ইরফানের দিকে। কি আশ্চর্য! এখনো তাকিয়ে আছে। শেষমেশ নীহারিকা বিরক্ত হয়ে জানালার বাইরে দৃষ্টি রেখে বলল,
—” কী সমস্যা? “

ইরফান ভ্রু কুঁচকালো। নীহারিকা আবারো বলল,
—” এভাবে তাকিয়ে আছেন কেনো?”

ইরফান নির্বিকার ভঙ্গিতে জবাব দিল,
—” দেখছি।”
—” ক..কী দেখছেন?”
—” দেখছি কাঁচা মরিচ মনে করে আমি কত বড় বোম্বাই মরিচ নিয়ে এসেছি।”

নীহারিকা চোখমুখ কুঁচকে তাকালো,
—” মানে?”
—” মানে, তুমি যে এত রাগও করতে পারো তা তো জানা ছিল না। ভেবেছিলাম শান্তশিষ্ট একটা কিউট বউ এনেছি। ভেবেছিলাম মিষ্টি করে হাসা আর সরল চোখে তাকানো ছাড়া কিছুই পারে না।”

নীহারিকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালার দিয়ে বাইরে তাকালো। মুখ ঘুরিয়ে নিল। কিছু বলল না। কিন্তু এখন আবার কান্না পাচ্ছে তার। মনে হচ্ছে অনেক বাচ্চামো করে ফেলেছে সে। এখন যদি ইরফান তার রাগের কারন জিজ্ঞেস করে সেটাও বলতে পারবেনা বেচারি। এর থেকে লজ্জার কিছু হতেই পারে না। তাকে হিংসুটে ভাববে ইরফান! নীহারিকা আঙুল কচলাতে কচলাতে শুকনো ঢোক গিলে বলল,
—” গাড়ি স্টার্ট করছেন না কেনো?”

ইরফান কিছু না বলে তাকিয়ে রইলো। নীহারিকা এবারে মুখ কুঁচকে বলল,
—” যেতে না চাইলে লক খুলে দিন। আমি যাব না আপনার সাথে। শুধু শুধু বসিয়ে রেখেছেন কেনো আজব!”

ইরফান এবারে একটু এগিয়ে এসে বলল,
—” আগে জবাব দেবে তারপর যাব। কী হয়েছে? কেনো তুমি এমন করলে? সবকিছু বলো। এরপর গাড়ি স্টার্ট করছি। আমি তোমার এই মুখ নিয়ে বাড়িতে নিয়ে যাব না। সবকিছুর সমাধান করে নিয়ে যাব। বলো এবার।”

নীহারিকা হুট করে ঘামতে শুরু করল। ঠোঁট কাঁমড়ে মাথা নিচু করে চিন্তিত হয়ে গেলো। সে আসলে কীভাবে কি বলবে। এটা কি আসলেই বলার জিনিস? সে কি এটা বলতে পারে যে আপনার প্রথম স্ত্রীর ছবি ফোনে দেখে আমার হিংসে হয়েছে, অভিমান হয়েছে। আপনি তাকে এত ভালোবাসেন এটা দেখে কষ্ট হয়েছে। ছিহ! এসব কি বলা যায়? আর এটা কি আসলেই কোনো স্বাভাবিক কিছু? নীহারিকা তো নিজেই এসব আগে থেকে জানে। সবকিছু জেনেই তো এ সংসারে এসেছে। এখন এসব বললে কি ইরফান তাকে নিচু মনমানসিকতার মেয়ে ভাববে না? নীহারিকার এসব ভাবনা যে অযৌক্তিক ও অনুচিত তা সে নিজেও জানে। কিন্তু মানুষের মন তো বেজায় জটিল। কখনো কোনো বাঁধা মানে না। কোনো সমীকরণে চলে না।

একটা সময় নীহারিকার মনে হয়েছিল কিছুই লাগবে না তার। ইরফান কে বিয়ে করতে পারলেই সে হয়তো তার পরিবারকে স্বস্তি দিতে পারবে। তার আগে মনে হয়েছিল ইরফানের ভালোবাসা তার জন্য জরুরি নয়। যতটুকু পাবে ততটুকু নিয়েই সে সন্তুষ্ট থাকবে। কিন্তু মানুষের মন তো আর অল্পতে তুষ্ট হয় না। যখন নীহারিকা প্রত্যাশার থেকেও বেশি ইরফানের কাছ থেকে যত্ন পেল, তখন মনটা আরও বেশি উতলা হয়ে উঠলো। ভালোবাসা পাওয়ার জন্য আকুল হয়ে রইল। শুধুমাত্র ইনায়ার মা হয়ে আর পারছে না সে। ইরফানের স্ত্রী হতে মন চাইছে তার। এসব সে নিজেও বিরক্ত। নীহারিকা নিজেও বুঝতে পারছে এসব একদম ঠিক নয়। বিয়ের আগে ইরফানের সাথে সেই বারান্দায় দাঁড়িয়ে হওয়া কথোপকথনে সে নিজেই বলেছিল সে শুধু মা হয়েই থাকবে। কারন ইরফানও তেমনটাই বলেছিল তাকে। কিন্তু মনটাকে তো সামলাতে ভীষণ কঠিন।

নীহারিকাকে মাথা নিচু করে গভীর চিন্তায় দেখে ইরফান অধৈর্য্য হয়ে গেল। তারও ভালো লাগছে না। কথা বলছে না কেনো মেয়েটা। ইরফান শেষে অধৈর্য্য হয়ে নীহারিকার বাহু ধরে হ্যাঁচকা টান দিল। নিজেও ঝুঁকে পড়ল তার উপর। হুট করে এমন টান দেয়ায় নীহারিকা চমকে থমকে বড় চোখে তাকালো ইরফানের দিকে। তাদের মধ্যকার দূরত্ব খুবই কম এখন। নীহারিকার চোখ সরাসরি ইরফানের চোখের সাথে মিলিত হচ্ছে। ইরফান নীহারিকার হাতের বাঁধন শক্ত করে বলল,
—” তোমাকে আমি এক্সপ্লেইন করতে বলেছি নীহা।”

নীহারিকা শুকনো ঢোক গিলল। খুব কাছাকাছি এসেছে ইরফান। এতটা কাছাকাছি শুধুমাত্র কয়েকবারই এসেছে সে। তাও এভাবে এমন ভাবে কখনো নয়। মেয়েটা হুট করে কাঁপতে থাকলো। ঘামতে থাকলো তার হাতের তালু। ইরফান আরো কাছে এলো। ধারনারও বাইরে ছিল নীহারিকার- এতটাই কাছে এসে নীহারিকার চোখে চোখ রেখে বলল,
—” একটা কথা বলব নীহা?”

নীহারিকা কোনোমতে কাঁপা ঠোঁটে বলল,
—”ব..বলুন।”

ইরফান ডান হাতটা উঠিয়ে নীহারিকার কপাল থেকে চুল সরিয়ে কানে গুঁজে দিয়ে বলল,
—” মানুষ দ্বিতীয়বারও প্রেমে পড়তে পারে। কখনো কখনো প্রথম ভালোবাসার থেকে দ্বিতীয় ভালোবাসাটা একটু বেশিই তীব্র হতে পারে।”

নীহারিকার শ্বাস যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। বৃষ্টির শব্দ আরও জোরে কানে বাজতে লাগল। গাড়ির কাঁচ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে, আর সেই শব্দের মাঝেই ইরফানের কণ্ঠটা যেন অদ্ভুতভাবে স্পষ্ট। ইরফান ধীরে ধীরে বলল,
—” কখনো কখনো দ্বিতীয় ভালোবাসাটা দ্বিতীয় মনেও হয়না। তা একটু বেশি গভীর হয়, কারণ তখন মানুষ জানে, কাকে হারালে কেমন লাগে।”

নীহারিকার চোখ কেঁপে উঠল। ইরফান তার চোখের দিকে তাকিয়েই বলল,
—”আর তখন মানুষ আগের ভুলগুলো আর করতে চায় না।”

একটু থামল ইরফান। নীহারিকার থুতনিতে আঙুল বুলিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—” তুমি কি আসলেই বলবেনা তোমার রাগের কারন।”

নীহারিকা হুঁশ ফিরে পেয়ে দ্রুত গতিতে দুদিকে মাথা নাড়ালো,
—” না।”

ইরফান হাসলো। ঠোঁট কাঁমড়ে দুষ্টু হেসে ফট করে চুমু খেলো নীহারিকার ঠোঁটে। নীহারিকা চোখ বড় করে তাকালে ইরফান আবারো একই কাজ করল,
—” বলো।”

নীহারিকা তোতলানো শুরু করল,
—” এ..এসব কী হচ্ছে? “

ইরফান আবারো গালে চুমু খেলো,
—” তাড়াতাড়ি বলো।”

—”মানে?”

ইরফান এবারে নীহারিকাকে টেনে সিট থেকেই উঠিয়ে নিজের কাছে নিয়ে এলো। কোঁমড়ে হাত জড়িয়ে নিয়ে চুমু খেলো নীহারিকার ঠোঁটের কোণে। নীহারিকা নিজেকে সামলাতে না পেরে এক হাতে ইরফানের কলার শক্ত করে চেপে ধরল। আরেক হাত দিয়ে ইরফানের বাহু ধরল। ইরফান দুষ্টু হেসে বলল,
—” যতক্ষণ পর্যন্ত না বলবে ততক্ষণ পর্যন্ত এমন চলতেই থাকবে। ইওর চয়েস!”

বলে আবারো চুমু খেতে চাইলে নীহারিকা ইরফানের ঠোঁটে হাত রেখে বলে,
—” এসব কি ধরনের অশভ্যতা? দূরে সরুন। কোমর থেকে হাত সরান। ছাড়ুন!”

ইরফান ছাড়লো না। বরং আরো জোরে চেপে ধরে নীহারিকার মুখের দিকে ঝুঁকে এলো। ফিসফিস করে বলল,
—” একটা কথা বলব? কথা দাও অজ্ঞান হয়ে যাবেনা।”

নীহারিকা ভ্রু কুঁচকে তাকালো। তার এমন দৃষ্টি দেখে হেসে ফেলল ইরফান। নীহারিকার ঘাড়ে হাত গলিয়ে তাকে কাছে টেনে বলল,
—” আই লাভ ইউ।”

নীহারিকা প্রস্তুত ছিল না। শুনতেও পায়নি ঠিকমত। আকাশে বৃষ্টির গতির সাথে বিদ্যুৎ চমকেছে একই সময়। তাই চোখ বড় করে নীহারিকা বলল,
—” কীহহ?”

ইরফান ভ্রু কুঁচকে বলল,
—” কয়বার শুনতে চাও হুম?”

নীহারিকা পিটপিট করে তাকালে ইরফান নিজে এবারে অপ্রস্তুত হলো। নীহারিকার হাতটা উঠিয়ে ঠোঁটের কাছে এনে চুমু খেয়ে কাতর স্বরে বলল,
—” আমি হয়তো বুঝতে পেরেছি তোমার রাগের কারন। আর তুমি যদি ভেবে থাকো এটা জেনে আমি তোমায় ভুল বুঝব তাহলে সেটাও ভুল। তোমার কি মনে হয়, একটা মানুষ এতগুলো দিন কারো ভালোবাসা গোপনে পেয়ে গেছে আর অনুভব করতে পারেনি? আমি কি জানি না আমার বউ আমায় ভালোবাসে? আমি যদি এটা অনুভব করতে পারি, তুমি কেনো পারছো না নীহা?”

ইরফানের কলার ধরে থাকা নীহারিকার আঙুলগুলো কেঁপে উঠলো। চোখের কোণে পানি জমে উঠলো অজান্তে। একটু থেমে ইরফান আবারো বলল,
—’ এতদিন আমি তোমায় অবহেলা করেছি নীহা। আমার জীবনে জায়গা দিলেও মনে হয়তো জায়গা দিইনি। তখন তো তুমি আমায় ছেড়ে গেলে না। কোনো অভিযোগও করলে না। ঠিকই তো নিজের মত করে আমায় মনে মনেই ভালোবেসে গেলে। আর আজ যখন আমি তোমাকে নিজের থেকেও বেশি ভালোবেসে ফেলেছি, তখন তুমি আমায় দূরে সরিয়ে দিচ্ছ? আমায় ছেড়ে চলে যাচ্ছ?”

নীহারিকার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। চোখের পানিরা আর বাঁধা মানল না। টপটপ করে গাল বেয়ে নামতে থাকলো। ইরফান মাথা নিচু করে বলল,
—” আমি ভেবেছিলাম, তুমি শুধু ইনায়ার জন্য এসেছো। আমিও তোমাকে সেই জায়গাতেই রেখেছি…রাখতে চেয়েছি।”
কথাগুলো বলতে গিয়ে ইরফান নিজেই যেন একটু থেমে গেল।
—”কিন্তু আমি ভুল ছিলাম।”
নীহারিকার চোখ ভিজে উঠছে ধীরে ধীরে। ইরফান আরও একটু ঝুঁকে এলো,
—” তুমি শুধু ওর মা না নীহা। তুমি তো আমারও স্ত্রী। কবুল বলে কি কারো মা হওয়া যায়? আগে তো স্ত্রী হতে হয়। তুমি আমার না হলে, আমার সন্তান তোমার হবে কী করে?”

কথাগুলো বজ্রপাতের মত আঘাত করল নীহারিকার মনে। তার ঠোঁট কাঁপতে লাগল। চোখ খিঁচে বন্ধ করল মেয়েটা। ইরফান আবার বলল,
—”আর এই জায়গাটা, আমি তোমাকে ঠিকমতো দিতে পারিনি। আমি নিজেই নিজেকে আটকে রেখেছিলাম। একটা অদ্ভুত দায়বদ্ধতা, একটা পুরোনো অভ্যাস, একটা ভয়…
সে চোখ নামিয়ে আবার তুলল,
—” কিন্তু তোমাকে এভাবে কষ্ট দেওয়ার কোনো অধিকার আমার নেই। তোমাকে কষ্ট দেয়ার জন্য আমি আনিনি।”

নীহারিকা কিছু বলতে পারছে না। ইরফান তার হাতটা একটু আলতো করে ধরল, আগের সেই শক্ত করে ধরা নয়, এবারটা নরম। বলল,
—” একজন তো পৃথিবীতেই নেই, তাকে তো মনে মনে আমি অতীতে ধামা চাপা অনেকদিন আগেই দিয়েছি। কিন্তু তাই বলে তো ভুলে যেতেও পারছি না। তুমি কি চাও আমি তাহিয়াকে ভুলে যাই। তুমি বললে আমি ওকে আর কখনো মনে করবনা। তুমি কি চাও আমি ওকে নিশ্চিহ্ন করে দিই?”

নীহারিকা চোখে পানি নিয়েই চমকে তাকালো। আঁতকে উঠে বলল,
—'” নাহ। নাহ। কখনোই না। একজনের হক কেনো নষ্ট করব? তারও হক আছে আপনার উপর।”

ইরফান একটু থেমে বলল,
—” তাহলে রাগ করলে কেনো? আমি যে তোমায় ভালোবাসিনা এটা কেনো মনে করলে? সেই আগের কথা ধরে বসে থাকলে কি চলবে? পরে কি আর কখনো তোমায় ওই কথা বলেছি? আর ভালোবাসলেই বলতে হবে কেনো? তুমি না অনেক বুঝদার!”

নীহারিকা মাথা নিচু করে চোখের পানি মুছলো। দেখে মনে হলো খুব অপরাধবোধ অনুভব করছে সে। ইরফান সাথে সাথে আবারো নীহারিকার মুখটা হাতের মুঠোয় নিয়ে চোখে চোখ রেখে বলল,
—” তোমার অনুপস্থিতিতে একটা জিনিস উপলব্ধি করেছি।”

নীহারিকা ভ্রু কুঁচকে তাকালো,
—” কী?”

—” তোমার সাথে থাকার অভ্যাসটা শুধু ইনায়ার না, আমারও হয়ে গেছে।”

নীহারিকা অপরাধবোধে শেষ হয়ে গেলো৷ সামলাতে না পেরে ঝড়ের গতিতে আঁছড়ে পড়ল ইরফানের বুকে৷ শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বুক ফাটিয়ে কান্না করতে করতে বলতে থাকলো,
—” আ’ম সরি মিস্টার কবির। আমারই ভুল হয়েছে। আমি বুঝতে পারিনি। আমি একদমই বুঝতে পারিনি। আমি ভীষণ খারাপ, খুব লোভী। আপনার ফোনে তাহিয়া আপুর ছবি দেখে ভীষণ হিংসা হয়েছিল। অনেক কষ্ট লেগেছে, খারাপ লেগেছে। এটা ভেবে খারাপ লেগেছিল যে আমি আপনার ভালবাসা অর্জন করতে পারিনি। তার জায়গাটা আমি নিতে চাইনি কখনো। তার জায়গাটা আমি চাইও না বিশ্বাস করুন। শুধুমাত্র আপনার মনে আরো একটা নতুন করে জায়গা চেয়েছিলাম। কিন্তু ওই দিন এমনিতেই মন খারাপ ছিল, তার উপর ওই ছবিটা আপনার ফোনে দেখার পর থেকে মনে হলো আমি কোনদিনও আপনার কাছ থেকে ভালোবাসা পাবো না। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ম’রে যেতে মন চাইলো। যখন ভাবলাম কোনদিনও আপনার কাছ থেকে ভালোবাসা পাবো না, কোনদিন আপনার মনে জায়গা অর্জন করতে পারবোনা, তখন বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাই হারিয়ে ফেললাম। আমি মোটেই ইনায়াকে শুধুমাত্র আপনার মেয়ে হিসেবে দেখিনা। ও আমারো মেয়ে, ও আমার সন্তান। আমি ওকে নিজের সন্তান হিসেবেই দেখি। কিন্তু তাই বলে আমি আপনার উপর অধিকার ছেড়ে দেবো- এটাও ভাবা ভুল। আমি আপনাকে ছাড়তে পারছি না। আমি আপনার উপর আমার অধিকার ছাড়তে পারছি না। কোন ভাবেই মানতে পারছিলাম না, ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। তখন মাথা কাজ করেনি। অভিমান করে চলে আসতে হয়েছে। কিন্তু বিশ্বাস করুন আমি কখনোই চাই না আপনি ইনায়ার মাকে ভুলে যান। তারও হক আছে, তারও অধিকার আছে আপনার স্মৃতিতে থাকার। আমি এতটাও নিচু মন মানসিকতার একজন মেয়ে নই যে একজনের অধিকার কেড়ে নেব, একজনের হক নষ্ট করবো। এতে আল্লাহ যে আমাকে অনেক ভালো কিছু দেবে তাও তো নয়। কিন্তু আমি যে আপনার কথা রাখতে পারিনি ইরফান। বিয়ের আগে আপনি আমায় বলেছিলেন আপনি শুধুমাত্র আপনার মেয়ের জন্য মা চান, আপনার জন্য স্ত্রী চান না। তখন তো আমিও আপনাকে কথা দিয়েছিলাম আমি শুধুমাত্র মা হিসেবেই থাকবো। কিন্তু আমি তো পারলাম না। বিশ্বাস করুন, চেষ্টা করেছি। কিন্তু পারলাম না। আমি অনেক চেষ্টা করেও পারিনি আপনার প্রতি অনুভূতি দমন করতে। ঠিকই ভালোবেসে ফেললাম। কত লোভী আমি দেখেছেন? কতটা খারাপ আমি। কথা রাখতে পারিনি। ভীষণ বাজেভাবে ভালোবেসে ফেললাম।”

বলেই আরো অস্থির হয়ে ইরফানের বুকে মাথা ঠেকিয়ে কাঁদতে থাকলো নীহারিকা। ইরফানের বুকের কাছের শার্ট ভিজে যেতে শুরু করলো তার চোখের পানিতে। দীর্ঘশ্বাস ফেলল ইরফান। এক হাত উঠিয়ে নীহারিকার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
—” শশশ, হয়েছে। কেঁদো না।”

নীহারিকা চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য। তারপর খুব কষ্ট করে বলল,
—” আপনি আমায় ভুল বুঝবেন না।”

বাইরে বৃষ্টি ঝরছে। ভেতরে জমে থাকা অভিমান ধীরে ধীরে গলছে। ইরফান খুব আস্তে বলল,
—” এত কিছু বললে, এত কিছু ভাবলে, আমি যে তোমায় একটু আগে আই লাভ ইউ বললাম, এটা নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নিলে? জবাব টা কি দুটো চুমু বেশি দেয়ার পর দেবে?”

নীহারিকা ওভাবে থেকেই কিল বসালো ইরফানের বুকে। ফিসফিস করে বলল,
—” আই লাভ ইউ… “

ইরফান মুচকি হাসলো। নীহারিকা কে বুক থেকে সরিয়ে নিজের দিকে তাকাতে বাধ্য করলো। চোখে চোখ রেখে বলল,
—” আবার বলো।”

নীহারিকা চোখের পানি মুছে বলল,
—” পারব না।”

ইরফান নীহারিকার কপালে টোকা দিল। নাকে নাক ঘষে গালে চুমু খেয়ে বলল,
—” ইংরেজিতে শুনে মজা পেলাম না। এবার বাংলায় বলো।”

নীহারিকা কাঁদতে কাঁদতেও হেসে ফেলল। ইরফান নিজের কপালের সাথে নীহারিকার কপাল ঠেকিয়ে চোখ বুঁজে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তবে শ্বাসটা ছিল প্রশান্তির। চোখজোড়া বন্ধ রেখেই বলল,
—” ভালোবাসি, নীহা।”

নীহারিকা ইরফানের বুকে আঙুল বুলিয়ে বলল,
—” আমিও।”

ইরফান ভ্রু কুঁচকে সেভাবেই বলল,
—” আমিও কী?”
—” ভালোবাসি।”
—” কাকে?”

ফিক করে হাসলো নীহারিকা,
—” ইনায়ার বাবাকে।”

চলবে…

🙂 আজকে অনেক কষ্টে লিখেছি। জ্বরের ঘোরে কি লিখেছি জানিনা। মানিয়ে নেবেন পাঠকমহল। এবং আগামী দিনে সমাপ্তি পর্ব আসবে। সো রেডি টু সে গুডবাই।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply