Golpo romantic golpo নবরূপা

নবরূপা পর্ব ৩০


নবরূপা

পর্ব_৩০

কলমেঅনামিকাতাহসিন_রোজা

আকাশে মেঘেরা নিদারুণ ভিড় করেছে। তুলোর মত কালো মেঘে ঢেকে গেছে পুরো আকাশ। হুট করে এমন আবহাওয়ার কোনো কারনই খুঁজে পেলো না নীহারিকা। এই তো দুপুরে একদম কাঠফাটা রোদে পুড়ে যাচ্ছিল সব। হুট করে বিকেলে এমন অবস্থা কি মানা যায়? তবে এই ঋতুতে এমনই হয়। মেঘলা আকাশের সাথে বেশ হাওয়াও বইছে। রাবেয়া বানুর তড়িঘড়িতে নীহারিকা এক দৌঁড়ে গিয়ে ছাদ থেকে সব কাপড় নিয়ে আসে। এরপর নিজের ঘরে গিয়ে বারান্দার দরজা লাগিয়ে দেয়। পর্দা সরিয়ে ঘরের কৃত্রিম আলো নিভিয়ে অনেকদিন পর নিজের বুকশেলফ থেকে একটা বই হাতে নেয়। তার সবচেয়ে পছন্দের বই “পরিণীতা”- আর তাই বোধহয় মন খারাপ হলে এই বই ছুঁতেই প্রশান্তি বিরাজ করে বুক জুড়ে৷ নীহারিকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালার পাশে বসে পড়ল। টিপটিপ করে বৃষ্টি আসা শুরু করেছে। শীতল আবেশে পুরো ঘরটা সুবাসিত হতেই নীহারিকা বুকভরে শ্বাস নেয়। খুব যত্ন করে পড়তে শুরু করে বইটা। টিপটিপ বৃষ্টির কারনে জানালার কাঁচে পানির বিন্দুকণা জমে যাচ্ছে।

সেই সারাটা দিন ফোনের দিকে আকুল হয়ে তাকিয়ে থেকে নিরাশ ও হতাশ হয়ে ফোনটা বিছানায় অবহেলায় ফেলে রেখেছিল নীহারিকা। অথচ এত এত আকাঙ্ক্ষার শেষে প্রায় ১১ ঘন্টা পর নিষ্ঠুর ফোনটায় মেসেজ নোটিফিকেশনের শব্দ আসে। মনোযোগ দিয়ে বইয়ে চোখ রাখা নীহারিকা চমকে বিছানার দিকে তাকায়। মেসেজ এসেছে নাকি? অবাধ্য বেপরোয়া নির্লজ্জ মনটা অভিমান ভুলেটুলে দৌঁড়ে বিছানায় গিয়ে বসতে বাধ্য করল নীহারিকা কে। তড়িঘড়ি করে ফোন নিয়ে সে দেখলো আসলেই মেসেজ এসেছে। ইরফানের কাছ থেকে মেসেজ এসেছে। সকালের সেই মেসেজ গুলো খু্ব বাজেভাবে কষ্ট দিয়েছে নীহারিকা কে। নইলে ফোনের স্ক্রিনে চোখের পানি টপটপ করে পড়তো না। তাই অভিমানে নীহারিকার মন চাইলো না এখন মেসেজটা ওপেন করে দেখতে। হয়তো আবারো তেমনই নিষ্ঠুর কথাবার্তা লিখে পাঠিয়েছে সেই লোক!

আবার বেহায়া মনটা চাইছে মেসেজটা ওপেন করে পড়তে। মনের কথা শুনলো নীহারিকা। আস্তেধীরে মেসেজটা ওপেন করে পড়তে শুরু করলো। যেখানে প্রথমেই বোল্ড করে লেখা,
—” সরি নীহা। আ’ম সরি। আমার বাজে আচরণের জন্য মাফ চাই। যদিও আমি জানি না তুমি কেনো অভিমান করেছো। আমি সত্যিই বুঝতে পারিনি, এখনো পারছি না। আন্দাজ করেছি কিছু একটা। তবে সেটা বলব না। কারন সেটা হলে তুমি মস্ত বড় বোকা। তবে আমিও কম বোকা নই, নইলে এত সময় নিতাম না উপলব্ধি করতে। আমাকে কি কোনোভাবে ক্ষমাটমা করা যায় না? বিশ্বাস করো, এরপর থেকে আর কখনো এভাবে কথা বলব না। প্রমিজ। তুমি যা চাইবে, তাই দেব। সব দোষ আমার। যা খুশি তাই শাস্তি দিও। চলবে না?”

প্রথম মেসেজটা পড়ার সাথে সাথে নীহারিকার মন চাইলো আবেগে আপ্লূত হয়ে কান্নাকাটি করতে। বেহায়া মনটা আসলেই বেশ ছলচাতুরী করে। নইলে এটুকুতেই সে কি গলে যেতে পারে? বারবার মেসেজটা পড়লো নীহারিকা। ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ফুটে উঠলো, তবে চোখের কোণে পানিও জ্বলজ্বল করছে। বার্তা প্রেরণকারী বোধহয় পছন্দ করেনি বিষয়টা। আবারো আরেকটা মেসেজ এলো। এবারে হয়তো অন্য ভাবভঙ্গিতে বলেছে লোকটা,
—” আমি সকাল থেকে কিছু খাইনি। সারাদিনে খিদেও লাগেনি। অস্থিরতায় দুদণ্ড বসে থাকতে পারছি না। মাথা ব্যাথা করছে। বুক দুরুদুরু করছে বাজেভাবে। ভেবেছিলাম হার্টের সমস্যা হচ্ছে নাকি। পরে উপলব্ধি করলাম একজনকে কষ্ট দেয়ার কারনে আমারো খারাপ লাগছে। বিষয়টা অস্বাভাবিক না। আমি বেশ ভালো ও দয়ালু মানুষ, তুমি তো জানোই। তাই এখন ক্ষমা চেয়ে বিষয়টা মিটমাট না করা পর্যন্ত আমি নিঃশ্বাস নিতেও পারছি না। একটু মার্জনা করে যদি আপনি মাফ করে দিতেন, তাহলে ইরফান কবির বেঁচে যেতো।”

ফিক করে হেসে ফেলল নীহারিকা। চোখের পানি মুছে হেলান দিল বিছানায়। এই মেসেজেরও কোনো জবাব দিল না। আর প্রেরণকারী কোনো জবাব না পেয়ে আবারো মেসেজ করে বলল,
—” আর কতক্ষণ ভিজতে হবে আমাকে? একটু বারান্দায় আসা যায় না? পরে ঠান্ডাটান্ডা লেগে গেলে কিন্তু তোমাকেই সেবা করতে হবে।”

চমকে থমকে গিয়ে বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেলো নীহারিকা। অবাক নয়নে ফোন থেকে চোখ সরিয়ে বারান্দার বদ্ধ দরজার দিকে তাকালো। ইরফান কবির কি এসেছে? বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে? মস্তিষ্ক না চাইলেও আবারো সেই মনের প্ররোচনায় সব ফেলে দৌঁড়ে বারান্দায় চলে এলো নীহারিকা। রেলিঙে ভর দিয়ে আশেপাশে অস্থির দৃষ্টিতে তাকালো। বেশ ভালোই জোরে বৃষ্টি আসা শুরু হয়েছে। নীহারিকাও ভিজে গেলো অনেকখানি। সে তবুও দৃষ্টি এপাশ-ওপাশ করে কাঙ্খিত জিনিসটা খুঁজলো এবং পেয়েও গেলো। সারাটা দিন মানুষটা কে না দেখায় ক্ষয়ে যাওয়া মনটুকু দিয়ে প্রাণভরে তাকে দেখলো নীহারিকা। অভিমানে চোখ দিয়ে পানি গড়ালো, বৃষ্টির পানিতে তা বোঝা গেলো না।

গাড়ি নিয়ে এসেছে ইরফান। গাড়িতে হেলান দিয়ে সে তাকিয়ে রয়েছে নীহারিকার ঘরের বারান্দার দিকে। সাদা শার্ট টা ভিজে একাকার। বৃষ্টিতে পুরোই ভিজে যাওয়ায় বেশ দুর্বল ও অসহায় দেখালো তাকে। নীহারিকা কিছুই বলল না। সেও তাকিয়ে রইলো। ইরফান এবারে গাড়ি থেকে একটু সরে দেয়ালের কোণায় গিয়ে ফোন হাতে নিয়ে কল করল নীহারিকা কে। নীহারিকা আবারো ছুটে এলো ঘরে, ফোনটা হাতে নিয়ে কল ধরতে গিয়েও ধরলো না। সেভাবেই বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। ইরফান ভ্রু কুঁচকে আবারো কল দিল। নীহারিকা এবারে শুকনো ঢোক গিলে কল ধরে ফোন কানে গুঁজলো। ইরফান কাতর স্বরে বলে উঠলো,
—” বাসায় চলো প্লিজ।”

নীহারিকা চোখ কুঁচকে তাকিয়ে রইলো বৃষ্টিতে সিক্ত ইরফানের দিকে। বিরক্তি নিয়ে রাগ অভিমান মিশিয়ে জোর গলায় বলল,
—” কেনো? আমার মত স্বার্থপর কেনো আপনার বাসায় যাবে? আপনার বাসায় আপনিই যান।”

ইরফান ক্লান্ত ভঙ্গিতে বলল,
—” খালি হাতে শ্বশুর বাড়িতে পা রাখতে চাচ্ছিলাম না। কিন্তু তুমি বাধ্য করছো। আমি ভেতরে গেলে কিন্তু তোমাকে যেকোনো ভাবেই আনতে পারি।”

নীহারিকা অবাক গলায় বলল,
—” জোরজবরদস্তি করবেন?”

—” প্রয়োজন পড়লে অবশ্যই। “

—” মগের মুল্লুক নাকি? যখন যা মন চায় তখন তা করবেন? মন চাইলো আমাকে অপমান করতে, করলেন। আবার মন চাইলো আমাকে নিয়ে যেতে, এখন নিয়ে যাবেন?’

ইরফান কিছুক্ষণ চুপ রইল। এরপর বলল
—” কেও একজন কথা দিয়েছিল সারাজীবন আমার পাশে থাকবে। অথচ বেইমানি করছে এখন। তাকে কী করা উচিত বলোতো?”

ইরফানের এখনো জোর গলা ও গর্বিত কন্ঠস্বর শুনে নীহারিকা জেদ ধরে ফোন কেটে দিল। মায়া হচ্ছিল একটু! বেচারা লোকটা বৃষ্টিতে ভিজছে। কিন্তু পরে মায়াও পালিয়ে গেলো। জল্লাদ লোক! ভিজুক! আরো ভিজুক! পিছলে পড়ে কাঁদায় গড়াগড়ি করুক! নীহারিকা ঘরে চলে এসে বালিশে মুখ গুঁজে রইলো।

একটু পর বাসার কলিং বেলের আওয়াজ শুনতেই আবারো সজাগ হয়ে মাথা তুলে তাকালো নীহারিকা। ভাবলো কিছুক্ষণ। নিলয় বাড়িতে রয়েছে। সে ভার্সিটি থেকে আসার পর নীহারিকার মুখ দেখেই আন্দাজ করেছিল কিছু একটা হয়েছে। পরবর্তীতে বড় ভাইয়ের ধমক ও জোরজবরদস্তিতে তাকে সব ঘটনা খুলে বলতে হয়েছে। আর সব শোনার পর থেকেই নিলয়ের মেজাজ সর্বোচ্চ তাপমাত্রায় গরম হয়ে রয়েছে। এই মুহুর্তে ইরফানকে দেখলে বোধহয় মেরেই ফেলবে।

নাইমুল ইসলাম বাড়িতে নেই, রাবেয়া বেগম বোধহয় কোঁমর ব্যাথায় বিশ্রাম নিতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন। তাহলে তো কলিং বেল বাজলে দরজা নিলয়ই খুলে দিবে। আর তা হলে তো দুজনই মুখোমুখি হয়ে যাবে। আয়হায়! কি সর্বনাশ! পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে নীহারিকা দ্রুত দৌঁড় দিল বসার ঘরের দিকে। কিন্তু ততক্ষণে নিলয় দরজা খুলে দিয়েছে, সেই দৃশ্য দেখে বসার ঘরে এসেই থমকে দাঁড়ালো নীহারিকা। ঠোঁট ভিজিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করল।

দরজা খুলতেই ইরফানকে বৃষ্টিতে ভেজা অবস্থায় দেখে নিলয় অবাক হলো। এরপর আদরের ছোট বোনের সাথে হওয়া অন্যায়ের কথা স্মরণ করতেই গম্ভীর কন্ঠে বলল,
—” আপনি?”

ইরফান নিলয়ের পেছনে গুটিসুটি মেরে দাঁড়িয়ে থাকা নীহারিকা কে একবার দেখে নিল। এক দেখাতেই পরখ করে বুঝলো ভারি দুর্বল লাগছে মেয়েটাকে। খাওয়াদাওয়া করেনি নাকি! নিলয় আবারো প্রশ্ন করল,
—” আপনি এখানে হঠাৎ?”

ইরফান ভ্রু কুঁচকে তাকালো,
—” ভেতরে আসতে বলবে না?”

গলা খাঁকারি দিল নিলয়। যতই হোক, বয়সে বড়, বোনের স্বামী। সে অসম্মান করতে পারেনা ইরফানকে। পারিবারিক শিক্ষা বলতেও কিছু রয়েছে। তাই নিলয় সরে দাঁড়িয়ে ভেতরে আসার জায়গা করে দিয়ে বলল,
—” জ্বি আসুন আসুন।”

ইরফান দুপা ফেলে ভেতরে ঢুকতেই নীহারিকা এক দৌঁড়ে গিয়ে তোয়ালে এনে ইরফানের দিকে এগিয়ে দেয়। কিন্তু দৃষ্টি অন্যদিকে ফিরিয়ে রাখে। মুচকি হেসে তোয়ালেটা গ্রহণ করে ইরফান। নিলয় সোফায় বসতে বলে ইরফানকে,
—” হুট করে এলেন। তাও আবার এই বৃষ্টিতে।”

ইরফান না বসেই বলল,
—” বৃষ্টি হবে আঁচ করিনি। তবে আমার তো আসারই কথা তাই না?”

নীহারিকা মাথা নিচু করেও ভ্রু কুঁচকে তাকালো। নিলয় দুজনের দিকে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এরপর বলল,
—” রাতের খাবারটা খেয়ে যাবেন তাহলে।”

ইরফান নিজের শরীর ও চুল মোছার পর তোয়ালে নীহারিকার হাতে দিয়ে বলল,
—” না শালাবাবু, বেশিক্ষণ থাকতে পারছি না। মেয়েকে বাড়িতে রেখে এসেছি। এখনি চলে যাব।”

নীহারিকা মনে মনে মুখ ভেঙচাতেই ইরফান ফট করে ওর দিকে তাকিয়ে নিচু কন্ঠে বলল,
—” যাও, ব্যাগ নিয়ে এসো। বের হবো এখনি।”

নীহারিকা নিলয়ের দিকে একবার তাকিয়ে চেঁচানোর ইচ্ছে দমিয়ে ফেলল। নিচু কিন্তু জেদি কন্ঠে বলল,
—” আমি যাব না।”

ইরফান ঠান্ডা দৃষ্টিতে তাকালো নীহারিকার দিকে। হুট করে এমন দৃষ্টি দেখে ভয় পেলো নীহারিকা। এভাবে ভয় দেখিয়ে কি জোর করবে নাকি! তবে ইরফানের চেহারা ও চোখ সিরিয়াস! মুখভঙ্গি অস্বাভাবিক শীতল। নীহারিকা মাথা নামিয়ে শুকনো ঢোক গিলল। ছোট বোনের দিকে এভাবে ভয়ানক নীরব হুমকি দিতে দেখে নিলয় বলল,
—” ও তো সকালেই এলো। দুদিন থেকে যাক। এত তাড়া তো নেই।”

ইরফান নীহারিকার দিক থেকে দৃষ্টি না সরিয়েই জবাব দিল।
—” শুধু দুদিন কেনো? সাতদিনও থাকতে পারে। তবে এভাবে আজ না। পরে নিয়ে আসব আবার। আজ যেতেই হবে।”

ইরফানের কথার ভাঁজে হুমকি খুঁজে পেলো নীহারিকা। তবুও ইরফানের শীতল দৃষ্টি সরছে না। মেয়েটা যে এত জেদি তা তো জানা ছিল না তার। নিলয় ধপ করে সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে না পেরেই শক্ত কন্ঠে বলল,
—” দেখুন ভাইয়া, আপনি এভাবে জোর করতে পারেন না। আর ও তো নিজের ইচ্ছেতেই এসেছে। যখন থাকতেই দেবেন না, তবে আসতে দিলেন কেনো? আটকাতে পারেন নি?”

ইরফান নিলয়ের প্রশ্নের জবাব দেয়ার প্রয়োজনবোধ করল নাম ফোঁস করে শ্বাস ফেলে জিজ্ঞেস করল নীহারিকা কে,
—” কথা শুনছো না কেনো?”
—” আপনার কথা শুনবো কেনো?”

নীহারিকার ত্যাড়া জবাবে আবারো ভ্রু কুঁচকে তাকালো ইরফান।
—” অবাধ্য হবে না নীহা। ইনায়া কান্নাকাটি করছে বাড়িতে।”

নীহারিকা অন্যদিকে তাকিয়ে জবাব দিল,
—” আমি জানি। ওকে রেখে আসতে আমারো কষ্ট হয়েছে। কিন্তু ওকে নিয়ে এলে তো এমনও হতে পারতো যে আপনি তখন উল্টো আমায়….

নীহারিকার কথা শেষ হওয়ার আগেই ইরফান এবারে জোরগলায় বলে উঠলো,
—” বাপের বাড়ি এসেছো খুব ভালো কথা। নিজের মেয়েকে নিয়ে আসো নি কেনো?”

নীহারিকা সহ নিলয়ও থমকে তাকালো। অবাক দৃষ্টিতে স্তব্ধ হয়ে তাকালো নীহারিকা। গলায় সব কথা আটকে গেলো তার। ইরফান আবারো বিরক্ত হয়ে বলল,
—” আমি কখনো দেখিনি কোনো বউ ঝগড়া করে বাপের বাড়ি আসার সময় বাচ্চাও রেখে আসে। ওকেও নিয়ে আসতে পারতে। তাহলে তোমাকে নিয়ে যেতাম না। নিজের বদলে ওটাকে রেখে এসেছো আমায় জ্বালানোর জন্য? ওকে কি আমি দেখব? সারাদিন আম্মু আম্মু করছে। ডিজগাস্টিং!”

নিলয়ের হাসি পেল ভীষণ। কিন্তু কান্না পেল নীহারিকার। কোনোমতে অভিমানী দৃষ্টিটা ধরে রেখে সে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো। নিলয়ও নিজের গম্ভীর ভাবটা ধরে রেখে নীহারিকা কে বলল,
—”নীহা তুই চাপ নিস না। ইচ্ছে না থাকলে যাস না। থেকে যা আজ। আর ভাইয়া আপনার সমস্যা হলে আমার ভাগ্নিকেও দিয়ে যান এখানে।”

ইরফান একবার নিজের বিশ্বাসঘাতক শালার দিকে তীক্ষ্ণ নজর দিয়ে নীহারিকার দিকে তাকিয়ে বলল,
—” তুমি তাহলে ফিরে যাবে না?”

নীহারিকা কোনোমতে ভাঙা কন্ঠে বলল,
—” না।”

ইরফান ভ্রু কুঁচকে বুকে দুহাত বেঁধে বলল,
—” শিওর?”

নীহারিকা আবারো এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে বলল,
—” হ্যাঁ একদম শিওর।”

ইরফান কিছুক্ষণ ঠোঁট কাঁমড়ে তাকিয়ে রইলো। এরপর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নিলয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
—” একটু চোখ বন্ধ করো তো! “

নিলয়ের এমনিতেই মেজাজ ভালো না। তার একমাত্র ছোট বোনের সাথে ঝগড়া করেছে ইরফান। তাই খ্যাঁক করে উঠে বলল,
—” চোখ বন্ধ করব কেনো আজব তো!”

ইরফান নিলয়ের কাঁধে হাত রেখে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
—” ভাবছি তোমার বোনকে ফট করে কোলে নিয়ে দুই মিনিটের মধ্যে চট করে পগারপার হব। তুমি কি নির্লজ্জের মত এসব দেখতে চাইছো?”

নিলয় সাথে সাথে মাথা নাড়লো, যার অর্থ সে দেখতে চাইছে না। কি আশ্চর্য! লোক তো ভালোই বেহায়া। মুখের তো কোনো লাইসেন্স নেই। অথচ এটাকে ভদ্র লোক ভেবেছিল নিলয়, ভাবতেই তার কাশি আসছে। নীহারিকা দুজনের কথোপকথন শুনে নিজের সম্মান হারানোর আশঙ্কা করল, দেরি না করে এক পা দুপা করে পেছাতে থাকলো সে। ইরফান স্ত্রীর হাবভাব লক্ষ্য করে নিলয়কে ধাক্কা মেরে পিছনে ঘুরিয়ে দিল, আর সেকেন্ডের মধ্যে নীহারিকা কে টেনে কোলে তুলে নিল।
—” লেটস গো হোম ওয়াইফি। তোমাকে শায়েস্তা করার বাকি ব্যবস্থা আমি পার্সোনালি বেডরুমে করব, ওকে?”

কোনো কিছু বলার আগেই নীহারিকা কে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল ইরফান। নীহারিকা চেঁচানোরও সুযোগ পেলো না। নিলয় আস্তেধীরে আবারো সামনে ঘুরে খোলা দরজার দিকে তাকিয়ে রইলো। অবিশ্বাস্য দৃষ্টি তার। কোনোমতে যখন বিষয়টা সে ধাতস্থ করার চেষ্টা করল, তখনই আবারো ফিরে এলো ইরফান। তবে তার কোলে নীহারিকা নেই। আশেপাশে কোথাও নেই। বেটা কি নিলয়ের বোনটাকে কাদায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে এসেছে নাকি। নিলয় আঁতকে উঠে বলল,
—” আমার বোন কোথায়?”

ভ্রু কুঁচকে তাকালো ইরফান,
—” তুলে নিয়ে গেলাম যে, দেখোনি?”

—” তা ঠিক আছে। কিন্তু কোথায়? আপনি তো এখানে।”

—” বেশি ফটফট করছিল। গাড়িতে বসিয়ে লক করে রেখে এসেছি।”

নিলয় চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে বলল,
—”তো আপনি আবার এলেন কেনো?”

ইরফান নীহারিকার ঘরের দিকে ইশারা করে বলল,
—” আমার বউ যেসব তল্পিতল্পা নিয়ে এসেছিল, সেগুলো এনে দাও, যাও।”

নিলয় এবারে ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলল,
—” তল্পিতল্পা নিশ্চয়ই খুলে ছড়িয়েছে। ওসব গুছিয়ে আনব কীভাবে?”

ইরফান ঠোঁট কাঁমড়ে ভেবে বলল,
—” আমার দৃঢ় বিশ্বাস যেভাবে ব্যাগ এনেছে, সেভাবেই পড়ে আছে। কিছু বের করেনি। ব্যাগটা এনে দাও, আর ওর ফোনটা।’

নিলয় সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকেই নীহারিকার ঘরে গেলো। সত্যি সত্যি নীহারিকার ব্যাগ একদম সকালে আসার সময় যেমন ছিল তেমনই দেখে নিলয় নিজেকেই গালি দিল, সাথে মনে মনে ধুয়ে দিল নীহারিকা কে। ওর তাহলে এতই বিশ্বাস ছিল যে তাকে নিতে আসবেই। বাহ! বেশ পিরিত চলছে। শুধু শুধু সে কাবাবে হাড্ডি হতে যাচ্ছিল। সুন্দর করে ব্যাগটা নিয়ে এসে কালো মুখ করে ইরফানের হাতে দিল নিলয়। ইরফান এবারে নিলয়ের কাঁধে হাত রেখে বলল,
—” ভালো হয়ে যাও শালাবাবু। মেয়েদের মত কুটনামি করছো। অথচ তোমার উচিত ছিল তোমার বোনকে আমি আসার আগেই সযত্নে বাড়িতে ফিরিয়ে দেয়া। ভেরি ব্যাড! এরপর থেকে ও এখানে আসলে আমায় কল করে বলবে, নিজের জিনিস নিয়ে যান, এই ঝামেলা রাখতে পারবনা। ওকে?”

নিলয় কিছু বলতে চেয়েছিল, কিন্তু ইরফান তা শুনেই গটগট করে বেরিয়ে গেলো। নিলয় ধপ করে বসে পড়লো সোফায়। কিছুক্ষণ ভ্রু কুঁচকে ইরফানের যাওয়ার পথে তাকিয়ে থেকে ফিক করে হেসে ফেলল। নাহ, যতটা খারাপ ভেবেছিল, তার জামাইবাবু ততটাও খারাপ নয়।

চলবে…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply