প্রণয়ের_মায়াতৃষ্ণা ||৪১||
ফারজানারহমানসেতু
ভোরের নরম আলো পর্দার ফাঁক গলে রুমে ঢুকছে। হালকা ঠান্ডা বাতাসে পর্দা দুলছে আস্তে আস্তে। তূর্জানের ঘুম ভেঙেছে অনেক আগেই, শুধু একপলকে তাকিয়ে দেখছে তার নিজস্ব, একান্ত ঘুমপরীকে। কি আদুরে লাগছে দেখতে। তূর্জান আর একটু শক্ত করে যেন নিজের সাথে মিশিয়ে নিতে চায়ছে।
রোজার ঘুম ভাঙল ধীরে ধীরে। প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না।কোথায় আছে, চারিপাশে চোখ বুলাতেই দেখল তূর্জানের রুম। কীভাবে এখানে এলো? আর রাতে তো সে রাহেলা নেওয়াজের রুমে ছিল। তাহলে? হঠাৎ ধীরে ধীরে অনুভব করল, তার এক হাত কারো বুকের উপর রাখা… আর মাথাটাও কারো শক্তপোক্ত বুকে রেখেছে। সাথে কপালে তপ্ত নিশ্বাস আছড়ে পড়ছে।
চোখ মেলে তাকাতেই বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।তূর্জান! এখানে কিভাবে? আর রোজা?
তূর্জানের বুকে মাথা দিয়ে ঘুমিয়ে আছে সে!
এক মুহূর্তে যেন সব মনে পড়ে গেল। গত রাতে সে তূর্জানের বাড়ি ফেরার কথা শুনে ভয়ে রাহেলা নেওয়াজের রুমে ঘুমিয়েছিলো, ভেবেছিলো তূর্জান হয়তো রাগ করবে তার রুমে থাকতে দেখলে। বোকা মেয়ে, এটা বোঝেনি, তূর্জান যেখানে নিজের হৃদপিন্ড দিয়ে দিয়েছে, সেখানে সামান্য রুম শেয়ার করতে পারবে না।বিড়বিড় করল রোজা,“ইয়া আল্লাহ…”
তড়িঘড়ি করে সরে যেতে গেলেই তূর্জানের হাত শক্ত হয়ে তার কোমর জড়িয়ে ধরল।ঘুম জড়ানো কণ্ঠ, কিন্তু স্পষ্ট দুষ্টুমি মাখানো। “কোথায় যাচ্ছো বউ,? তিনদিন ঘুমাইনি আমি!”
রোজা থমকে গেল।তিনদিন ঘুমায়নি বললো কেন? তারপর বলল,“ছাড়ুন!আমি এখানে এলাম কিভাবে? আমি তো..“
“ উড়ে উড়ে এসেছো। “
“ এ্যাহ!”
“ এ্যাহ না হ্যাঁ। মাটিতে পা না দিয়ে এসেছো। তো সেই একই তো হলো।বউ তোমার যে আমার কোলে ওঠার এত শখ জানতাম না।“
“ মানে? “
“ পুরো তিনরাত আমার বেডে ঘুমিয়েছো। অথচ আমি আজকে আসবো শুনে, গ্ৰানির রুমে চলে গেলে। “
রোজা আহম্বক বনে ঘুরতে লাগলো। এর সাথে কথা বলা মানে, বিরক্ত। নিজের মতো লজিক দিয়ে যা নয় তাই বলছে। প্রসঙ্গ পাল্টে বলল, “ ছাড়ুন তো, অশুদ্ধ পুরুষ ! কেউ দেখে ফেললে কি ভাববে…”
তূর্জান চোখ না খুলেই বলল, “দেখলে দেখুক। নিজের বউকে ধরে রেখেছি, অপরাধ না-কি? আর আমি অশুদ্ধ হলাম কিভাবে?”
রোজা এবার বিরক্ত হয়ে বলল,“আবার শুরু করেছেন! বলেছি না, এসব অসভ্য কথাবার্তা বলবেন না!”
তারপর প্রসঙ্গ পাল্টে আবার বলল, “ বাড়িতে সবাই জেনে গেছে কিভাবে? আপনি বলেছেন? “
“ কেন জেনেছে তুমি খুশি না? “
“ তেমনটা না, সবাই অদ্ভুত আচরণ করছে। এতটা শান্ত সবাই, যেন কিছুই হয়নি। “
“ তেমনটা না, তারমানে তুমি এই বিয়েতে খুশি? “
“ আমি তা কখন বললাম? “
“ মানে তুমি খুশি না। “
“ ধ্যাৎ! ভালো লাগছে না। “
তূর্জান চোখ খুলল এবার। গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রোজার দিকে। রোজার চিবুক তখন তূর্জানের বুকে। তূর্জান চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,“ কেন কিছু হয়েছে কি?বউ। “
“ আবার এসব বলছেন? “
“তাহলে কী বলব? অপরিচিতা মেয়ে? নাকি অন্য কিছু সুইটনেস রোজ।”
রোজা চুপ। চোখ সরিয়ে নিল।এই চুপ করাটাই তূর্জানের ভালো লাগে না।শান্ত বউয়ের থেকে ঝগড়ুটে বউ ভালো। অনন্ত দিনরাত দুষ্ট মিষ্টি আলাপনে পার করা যায়।
গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করল তূর্জান, “কতদিন এভাবে দূরে দূরে থাকবি?”
রোজা কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীরে বলল,“আমি দূরে থাকছি না। আমি আগের মতোই থাকছি … আপনি কাছাকাছি আসছেন বেশি।”
তূর্জান হালকা হেসে উঠল,“ ওহ! তাহলে আমি দূরে থাকি?”
এইবার রোজা তাকালো তার দিকে। চোখে একরাশ দ্বিধা, ভয়, আর অজানা কিছু অনুভূতি।
“থাকতে পারলে থাকেন! আমাকে কেন জিজ্ঞাসা করছেন ?”
প্রশ্নটা শুনে তূর্জান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল,“ এইজন্যই কেউ একজন বলেছিলো, কাউকে দুর্বলতা দেখাতে নেই। “
এক শব্দ। কিন্তু এত দৃঢ়, এত স্পষ্ট,রোজা কিছু বলার মতো শব্দ খুঁজে পেল না। তূর্জান হেসে বলল, “ পারমানেন্ট এই রুমে সিফট হয়ে যাবেন আজকে। ভার্সিটি থেকে এসে যেন দেখি রুমে আছেন। আপনার সাথে আজকে জরুরি মানে অতি জরুরি কথা আছে। “
“ পারবো না। “
“ কেন? “
“কারণ আমি চাই না।”
“ তারপর? “
তূর্জানের এই ঘুরিয়ে কথা বলায় রোজার বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। পরিস্থিতি সামলাতে তাড়াতাড়ি উঠতে গিয়ে বাধা পেল হাতের মধ্যে, “ ছাড়ুন,,
“ যদি না ছাড়ি? “
“ এভাবে ধরার অধিকার এখনো দেয়নি। “
“ তূর্জান নেওয়াজ অধিকারের পরোয়া করে না, তবুও অধিকারবোধ, এই তূর্জান নেওয়াজ বহুবছর আগেই পেয়েছে। ।তবে আপনি আমার উপর বিরক্ত হচ্ছেন বোধহয়।“
বলেই রোজাকে ছেড়ে দিলো। মুখ ঘুরিয়ে বালিশ মাথার উপর নিয়ে মুখ ঢেকে শুয়ে পড়ল। রোজা দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, “ ভার্সিটি যাবেন না। সাতটা তো বেজেই গেলো প্রায়।উঠে রেডি হয়ে নিন।“
“ নাহ, যাবো না। আমি ঘুমাবো? “
তূর্জানের কান্ডকারখানা পুরোটা বাচ্চাদের মতো লাগছে রোজার কাছে। পুরুষ মানুষ অভিমানও করতে জানে। রোজা তূর্জানের মুখের উপর থেকে বালিশ সরিয়ে নিতে চাইলো। কিন্তু তূর্জান জোর করে বালিশ চেপে ধরে আছে। রোজা বলল,
“ আচ্ছা তখন বললেন, আপনি তিনদিন ঘুমাননি, কেন? “
“ এমনি, ঘুম আসেনি, তাই ঘুমাইনি। আমার বিষয়ে কাউকে জানতে হবে না। কেউ আবার এইসব রাইটস নেয়নি নিশ্চয় যে আমার ব্যাপারে জানতে চাইবে। “
রোজা তূর্জানের মুখের মুখের উপর থেকে এবার জোর করে বালিশ নিয়ে বলল, “ আমার রাইটস আছে জানার। “
“ কোনদিক থেকে? “
রোজা কথাখানা বলে নিজেই লজ্জায় আড়ষ্ট হচ্ছে। ইশ কথার পরিপেক্ষিতে কথা বলতে গিয়ে কি বলছে। তড়িঘড়ি করে বলল,“আমি… আমি যাচ্ছি।”
“ বিকেলে রুমে পাই যেন। বহুবছরের হিসাব মিটাবো। “
তূর্জান আর কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল।
নিচে নেমে রোজা দেখল, সকালের ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে। রান্না শেষ। রান্নাঘরে রাফিয়া, তুবা টুকিটাকি করছে, আর গল্প করছে।
রোজা ঢুকতেই তুবা মুচকি হেসে বলল,
“ঘুম কেমন হলো ভাবি ?”
রোজা একটু থমকে গেল,“ আমাকে ভাবি ডাকা বন্ধ কর।”
“ কেন ভাবি? ভাবি ডাক শুনতে ভালো লাগছে না? তাহলে ভাবি এককাজ করেন, আমাকে ফুপ্পি বানিয়ে দেন ভাবি , তারপর সেই বাবুর নাম নিয়ে আপনাকে ডাকবো ভাবি। যেভাবে রাফিয়া ভাবিকে ডাকি ভাবিইই।“
রোজা অবাক, এই মেয়ে এমন ভন্ড হয়ে গেছে। ভাবি বলবে না বলে, একবার কথা বলতে গিয়ে ছয়বার ভাবি বলে বলছে, ভাবি বলবে না। তুবা আবার বলল, “ ভাবি কিছু ভাবছেন? “
“ তুবা ভালো লাগছে না। কিসব আলতু-ফালতু কথাবার্তা বলছিস। আরিয়ান জিজুকে বল, তোর এইসব উগ্র চিন্তাভাবনা। “
নিজের কথা কে না এড়িয়ে যায়। তুবাও এড়িয়ে গিয়ে বলল, “ আচ্ছা বল, ঘুম কেমন হলো?”
“ভালো।”
রাফিয়া হেসে বলল,“ভালোই হওয়ার কথা।”
রোজা সন্দেহের চোখে তাকালো,“মানে?”
তুবা বলল,“কিছু না… আমরা কিছুই জানি না। সব রুম বন্ধ, একটামাত্র রুম খোলা…”
তাদের হাসি দেখে রোজার মনে হলো মাথা ফাটাতে ওই তূর্জান নেওয়াজের। এই অস্বস্তিটা তাকে আরও বেশি অস্থির করে তুলছে।
.
:
:
সকালের ব্রেকফাস্ট করে যে যে তার কাজে চলে গেল। মোস্তফা নেওয়াজ যাওয়ার আগে একবার রোজাকে নিজের রুমে ডাকলেন। যেহেতু রোজার রুম বন্ধ, সাথে অন্যগুলোও। রোজাকে বললেন, “ আম্মু। “
“ হুমম, বাবা। কিছু বলবা? “
“ নাহ, আমি তো ভেবেছিলাম কাকামনি ডাকবে! যাইহোক বাবা থেকে কাকাশশুর হওয়ায় বেশ ভালোই লাগছে। “
“ বাবা তুমিও? “
“ না আম্মু, এদিকে এগিয়ে এসো। “
রোজা এগিয়ে যেতেই মাথায় আদুরে হাত রাখলো, বললেন, “ জানো আম্মু, সৃষ্টিকর্তা যা আমাদের ভাগ্যে রাখেন, তা সযত্নে গ্ৰহণ করতে হয়। তূর্জান ছেলে হিসাবে বেস্ট, ভাই হিসাবে বেস্ট,একজন বাবা-মায়ের সন্তান হিসাবে বেস্ট, পরিবারের রক্ষক হিসাবেও বেস্ট, আমার মনে হয়, এতো বেস্টের মধ্যে ও একজন হাজবেন্ড হিসাবেও বেস্ট। তুমি হয়তো ভাবছো, হঠাৎ এমন কিছু হওয়ায় আমরা কেউ খুশি না। কিন্তু বিশ্বাস করো, সবাই ভীষণ খুশি, আর আমার খুশি তো আকাশ ছোয়া। আমার মেয়ে আমার কাছেই থাকবে। দেখছি তুমি মনমরা হয়ে আছো, স্বাভাবিক হও আম্মু, যা হওয়ার তা হবেই। শুধু শুধু বারতি চিন্তা করে কি লাভ? তার থেকে যা হচ্ছে, তা নিয়েই সুখে থাকা শ্রেয়। “
রোজা মাথা নাড়ল। মানে সে চেষ্টা করবে। মোস্তফা নেওয়াজ যখন মেয়ের সাথে আদুরে আলাপে মেতেছেন। তখন দরজার বাইরে থেকে তাজারুল নেওয়াজ বললেন, “ এইযে বেয়াই-মশাই এতদিন ভাই ছিলেন, তাই অফিসে ডেকে নিয়ে গেছি। এবার টাইম সেন্স আনুন নিজের ভিতরে। ভাইকে ছেড়ে দিয়েছি জন্য বেয়াই কেও ছাড়বো না নিশ্চয়? “
তাজারুল নেওয়াজের কথার উত্তর দিলেন মোস্তফা নেওয়াজ, “ বেয়াই, মাথা ঠান্ডা করুন। অফিস টাইমে ঠিক পৌঁছে যাবো। “
দুইভাই হেসে ফেললেন। রোজার লজ্জায় মাটির নিচে যেতে ইচ্ছে করছে। তাজারুল নেওয়াজ মোস্তফা নেওয়াজকে ডেকে নিয়ে যাওযার সময় রোজাকে বলল, “ তোমার জন্য কিছু আনতে হবে বৌমা? “
রোজা মাথা নাড়ল, নিচু হয়েই। তার কিছু লাগবে না। দুইভাই বেয়াই-বেয়াই করে গল্প করতে করতে অফিসে গেল। রোজার হঠাৎ এই ডাকটা যদিও খারাপ লাগছে না। তবে লজ্জা লজ্জা লাগছে ভীষণ। তূর্জান নেওয়াজ হঠাৎ কয়েক মিনিটে তার পুরো পরিচয় পাল্টে ফেলল। ততক্ষনে তানিয়া নেওয়াজ ডেকে উঠলেন, “ ছোট বৌমা, শুনছো?“
ডেকেই তিনি রেহেনা নেওয়াজের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। সবাই ভীষণ খুশি। যদিও তূর্জান কিভাবে ওই ঘাড়ত্যাড়া মেয়েকে রাজি করিয়েছে তা কেউই জানে না। একটা কাজ সম্পূর্ণ, আরেকটা হলেই হয়। তূর্জানকে পুরোপুরি মেনে নেওয়া। বা আগের স্মৃতিগুলো মস্তিস্কে ফিরে আসা। তুবা আবার ডাকলো, “ ছোট ভাবি, আম্মু তোমাকে ডাকে!”
আরাজ দৌড়ে এসে বললো, “ ফুপ্পিকে তোমরা এসব বলছো কেন? “
তুবা আরাজের গাল টেনে দিয়ে বলল, “ হেই কে তোর ফুপ্পি? মেজো কাকিমনি ডাকবি। “
আরাজের আর কি? সে যা শোনে তাই। রাফিয়া কি যেন ছেলেকে শিখিয়ে দিল। আরাজ দৌড়ে রোজার কোলে উঠতে চেয়ে বললো, “ কাকিমনি, কোলে নাও। “
রোজার আর কি করার, বড়রা যেখানে পাগল হয়েছে, সেখানে ছোটরা কি করবে? রোজা আরাজকে কোলে নিতেই আরাজ বলল, “ আচ্ছা কাকিমনি। “
“ হুমম। “
“ আমি যে তোমার মেয়েকে বিয়ে করতে চাইলাম, তুমি আমাকে জামাই ডাকলে। এখন সে আমার কি হবে? ফুপ্পির মেয়ে, নাকি কাকামনির মেয়ে? “
রোজার ইচ্ছে করছে আরাজকে কোল থেকে ফেলে দিতে। মানে এইসব রাফিয়ার কাজ। একটা পরিবার কতটা পাগল, তারছেড়া, মাতাল হলে এইসব বলে? রোজা নামিয়ে দিতে চাইলেই, আরাজ বলল, “ সরি কাকিমনি। আর কিছু বলবো না। আম্মু পাগল তাই এইসব বলেছে, সে তো আমার কাজিন বউ হবে, তাইনা। তোমার আর কাকামনির মতো।“
“ আছাড় মেরে ফ্লোরে ফেলে দিবো কিন্তু আরাজ! ফালতু বকা কোথা থেকে শিখেছিস? “
:
:
:
বেলা একটু গড়াতেই রাহেলা নেওয়াজ ডাকলেন রোজাকে,“এই নাতবৌ , এদিকে আয়। সকালের খাবার তো খেলি না। এখন দুপুরের খাবার খেয়ে যা। ”
রোজা পড়েছে এক বিপদে। সবাই এত স্বাভাবিক ভাবে বিষয়টাকে মেনে নিচ্ছে। রোজা বাধ্য হয়ে গিয়ে চুপচাপ বসলো তার পাশে। রাহেলা নেওয়াজ কিছুক্ষণ চুপ করে রোজার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর বললেন,“খেয়ে আসতে বললাম তো, এখানে এলি কেন? “
“ খেতে মন চাচ্ছে না। “
“ বরের অপেক্ষায়, বুঝি, বুঝি। “
“ গ্ৰানি আমি আগেও না খেয়ে থেকেছি।আচ্ছা সেসব বাদ দাও, ও গ্ৰানি আমার রুমের তালা খুলে দাও। নয়তো তুবার রুমে থাকতে দাও।“
“ তুই জানিস না, দেশে জ্বালানি সংকট দেখা দিছে, দুইটা ফ্যান, এসি চললে আরো সংকট বেড়ে যাবে।অপচয়কারী শয়তানের ভাই।তার থেকে বরং তোর বরের রুমে থাক। একটা এসি, একটা বাল্ব,একটা বেড, একটা তূর্জান.. সব একটা একটাতে হয়ে যাবে।খরচা কমনো শিখছি বুঝেছিস? “
“ এই বুড়ো বয়সে মিতব্যায়ী হয়ে কি করবা? খুলে দাও না, দরজা। তুমিই বলো, একটা রুমে কেউ জন্মের পর থেকে থাকলে সেই রুমের প্রতি কতটা মায়া জন্মে। হঠাৎ করেই তাকে ছাড়া যায়? “
রাহেলা নেওয়াজ মুচকি হেসে বিরবির করলেন, “ যদি একটা রুম না ছাড়তে পারিস, সামান্য থেকেছিস বলে! তাহলে আমার নাতি তোকে ছাড়বে কিভাবে? যেখানে তার সমস্তটা জুড়েই তোর বিচরণ। “
তারপর রোজাকে বলল, “ভয় পাচ্ছিস?”
রোজা চমকে উঠে বলল,,“কিসে গ্ৰানি?”
“সবকিছুর, মানে হঠাৎ এই পরিবর্তনের জন্য ।”
রোজা উত্তর দিল না।রাহেলা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন,
“দেখ, বিয়ে মানে শুধু সম্পর্ক না। এটা একটা ভরসা। তুই যদি ভয় পেয়ে সবসময় পালিয়ে থাকিস, তাহলে নিজের কাছ থেকেই পালাবি। বিয়ে হয়ে গেছে, এটা অটল রেখে স্বাভাবিক হয়ে যা। আর যেখানে সবাই মেনে নিয়েছে, সেখানে তুই এমন রোবোটিক আচরণ করছিস কেন?ভালো লাগছে না।তূর্জান খারাপ ছেলে না। সে প্রচন্ড জেদি, যা করেছে কিছু ভেবেই করেছে। পরিবার খুশি, অনন্ত তাদের কথা ভেবে স্বাভাবিক সংসার কর। বলছি না, কোমড়ে কাপড় বেধে সংসার কর, কিন্তু স্বাভাবিক আচরণ তো করাই যায়। “
রোজার চোখে পানি চলে এলো, কিন্তু সে মাথা নিচু করে রাখল।এই কথাটা শুনে, রোজা ধীরে বলল,“আমি বলিনি সে খারাপ।”
“তাহলে?”
“ গ্ৰানি তুমিই বলো,আমি, আমি এসবে অভ্যস্ত না। হঠাৎ এভাবে হয়না।আমি মেয়ে হয়ে থাকতে চাই। বউমা হিসেবে না।”
রাহেলা মৃদু হেসে তার মাথায় হাত রাখলেন,
“ চেষ্টা কর হয়ে যাবি। তূর্জান নেওয়াজের বউ, এসব দুর্বলতা রাখা ঠিক না। তুই হবি, পালয়ানের মতো, কিছু বললেই তূর্জানের নাক-মুখ ফাটিয়ে দিবি।”
রাহেলা নেওয়াজের কথা শুনে রোজা আর কিছু বলল না। শুধু মাথা নিচু করে বসে রইল। ভেতরে ভেতরে যেন কিছু একটা বদলাতে শুরু করেছে, হঠাৎ করেই। কিন্তু সে নিজেও বুঝতে পারছে না,এটা ভয়, নাকি অন্য কিছু।
:
:
:
দুপুর গড়িয়ে বিকেল। রোজা যখন রাহেলা নেওয়াজের রুমে ছিলো, ওই সুযোগে তুবা, রাফিয়া মিলে তূর্জানের সবকিছু রেখে গেছে। আবার রুমে তালা ঝুলিয়েছে। মানে বাড়ির প্রত্যেকটা সদস্য তাকে বোকা বানিয়েই যাচ্ছে। সেইজন্যই রোজাকে তখন রুমের বাইরে আসতে দেয়নি রাহেলা নেওয়াজ।আর সেই সুযোগে দুই কর্মী নিজেদের কাজ সেরেছে।
এখন আর কি করার, সবাই যেহেতু চায়, তার উচিত সব মেনে নেওয়া। এখন থেকে এই রুম রোজারও, রোজা নিজের রুমে বসে আছে। বই খুলে রেখেছে সামনে, কিন্তু এক লাইনও পড়া হচ্ছে না। বারবার মনে পড়ছে তূর্জানের কথা,
“বিকেলে রুমে পাই যেন, বহুবছরের হিসাব মিটাবো…”
হৃদপিণ্ডটা অকারণে একটু জোরেই ধুকপুক করছে। কি এমন বলবে তূ্র্জান।নিজেকেই প্রশ্ন করল রোজা,“আমি কেন টেনশন নিচ্ছি?”
ঠিক তখনই দরজার বাইরে পায়ের শব্দ।
ধীরে ধীরে দরজা দিয়ে তূর্জান রুমে ঢুকল।
তূর্জান ভার্সিটি থেকে ফিরেছে। শার্টের বোতাম দুটো খোলা, হাতা একটু গুটানো, চুলগুলো এলোমেলো, ক্লান্ত, কিন্তু চোখে সেই চিরচেনা কিছু পাওয়ার ঝিলিক।দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,“ওয়াও… কথা রাখছো দেখছি। গ্ৰেট sweetness rose.”
রোজা একটু চমকে তাকাল।“আমি… এমনিতেই ছিলাম। আমার রুম বন্ধ তাই।”
তূর্জান হেসে ভেতরে ঢুকল,“ হুমম,জানি।”
বলেই ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে হাত থেকে ঘড়ি খুলতে খুলতে বলল, “আমি কপাল করে একটা বউ পেয়েছি। এইটুকু জানে না, হাজবেন্ড বাসায় আসলে, একটু হেল্প করতে হয়। বউ তুই এত নির্দয় কেন? “
“ তুমি, তুই, এখন আপনিটা বাদ আছে। “
তূর্জান টাইয়ের নট’টা খুলে, ওটা দিয়েই পেচিয়ে রোজাকে টেনে নিজের কাছে আনলো,মাঝে যথেষ্ট দুরুত্ব তাও রোজা তূর্জানের দিকে তাকানোর সাহস পাচ্ছে না। তূর্জান বললো, “ খেয়েছেন ম্যাডাম? “
“ না। “
“ আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন? “
“ না, এমনিতেই। “
“ একটু মিথ্যা বলেও তো খুশি করতে পারতেন।”
“ মিথ্যা বলার চেয়ে অমোঘ কুৎসিত সত্য শোনাও ভালো। “
রোজা চোখ তুলতেই তূর্জানের দৃষ্টি তার চোখে আটকে গেল।কিছুক্ষণ কেউ কিছু বলল না। তারপর তূর্জান খুব আস্তে করে বলল,“তিনদিন… একবারও ফোন করিসনি কেন?”
রোজা থমকে গেল। হঠাৎ এই প্রশ্নটা সে আশা করেনি।মুখ ঘুরিয়ে বলল,“আমি কেন করব?”
তূর্জান হালকা হাসল না এবার। গম্ভীর হয়ে বলল,
“কারণ আমি অপেক্ষা করছিলাম। হয়তো আমার অবোধ বউটা আমার একটু খোজ নিবে।”
একটা সাধারণ কথা,কিন্তু এতটা গভীরভাবে বলল, যে রোজার বুকটা কেঁপে উঠল। তাই খুব আস্তে করে বলল,“আপনি তো ব্যস্ত ছিলেন…”
“হ্যাঁ… ব্যস্ত ছিলাম। কিন্তু কারো জন্য ব্যস্ততার মাঝেও সময় বের করা যায়।”
“ তো এত প্রয়োরিটি যখন, তখন আমার ফোনেও কিন্তু কল বা ম্যাসেজ আসেনি। কেউ কোথায় গিয়েছে, তাও বলে যায়নি। কতদিনের জন্য…
রোজা চুপ হয়ে গেলো অভিমান করা সব কথা বলে দিচ্ছে সে। ইশ, এই মুখটাও না, যখন তখন ফসকে যায়। তূর্জান আর একটু ঝুঁকে এসে বলল,
“তুই কি আমাকে মিস করছিলি?
রোজার চোখে দ্বিধা, লজ্জা আর অজানা একটা স্বীকারোক্তি লুকানো।কিন্তু গলায় দৃঢ়তা নিয়ে বলল“না…”
তূর্জান মুচকি হাসল।”একটুও মিস করিসনি আমাকে?”
রোজা চোখ তুলে তাকাল না। তূর্জান রোজাকে ছেড়ে মিররের সামনে গিয়ে বলল,“ ভালো,কিন্তু কেউ একজন বলছিলো একটু আগে,,মিথ্যা বলার চেয়ে অমোঘ কুৎসিত সত্য শোনাও ভালো। কিন্তু সেও মিথ্যা বললো। এখন ক্ষিদে পেয়েছে। খাবার রুমে নিয়ে আয়। “
রোজা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তূর্জানের কথার ধরনটাই এমন আদেশ না, আবার অনুরোধও না… মাঝামাঝি কোথাও একটা অধিকারবোধ, যেখানে না বলা যায় না। তাও ধীরে বলল,“আমি কেন আনবো? নিচে গিয়ে খেয়ে আসুন।”
তূর্জান ভ্রু তুলল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের হাতার বোতাম খুলতে খুলতে বলল,“কারণ আপনি আমার বউ। স্মৃতিশক্তি দিন দিন বিলুপ্ত হয়েই যাচ্ছে।”
“এই এক কথা! সবকিছুর উত্তর এটা হতে পারে না। যাই বলি, উত্তর ওই একটাই দেন কেন? “
তূর্জান এবার পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো রোজার দিকে। তার প্রতিটা পদক্ষেপে রোজার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠছে।
একেবারে সামনে এসে থামল। নিচু হয়ে মুখটা একটু রোজার কানের কাছে এনে ফিসফিস করে বলল,“তাহলে কী হতে পারে ? বলুন… আমি শুনছি। তারপর সেই কথাই আপনাকে বলবো।”
রোজা চোখ সরিয়ে নিল। এত কাছে তূর্জান থাকলে তার মাথা ঠিকমতো কাজ করে না ইদানিং। কেমন নিজেকেই উদ্ভট মনে হয়।
কথা ঘুরিয়ে বলল, “ কি বলতে চেয়েছিলেন? “
“ শুনতে খুব আগ্ৰহী, গ্ৰেট,শাওয়ার নিয়ে এসে ওটাও শুনাচ্ছি ম্যাডাম। ততক্ষনে ভাবুন আপনি বলবেন, নাকি আমি বলাবো আপনাকে দিয়ে! দুটোর পার্থক্য নিশ্চয় বুঝেছেন? সো বি রেডি। “
ইনশাআল্লাহ চলমান…
গল্পটা তোমাদের ভালো লাগে,, তাই রিয়েক্ট, কমেন্টের পরোয়া না করে,, পর্ব দিয়ে দিলাম। ইদানিং বড় পর্ব ছাড়া লিখতেই পারছিনা। অনুভূতি সব প্রকাশ হচ্ছে না গল্পে এমনটা মনে হচ্ছে।
একটু বড় বড় মন্তব্য করে ফেলো। আর পারলে রিভিউ দিও তো পাখিরা 😁। গল্প নাকি সবার ফিডে যাচ্ছে না। ইনবক্সে সবাই লিংক চাচ্ছে।
আমার পেইজ লিংক Farzana Rahman Setu
Share On:
TAGS: প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা, ফারজানা রহমান সেতু
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৩৬
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৪০
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১৩
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৬
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১৬
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৮
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১৯
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৩৮
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ২৩
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৫