Golpo ডার্ক রোমান্স ডিজায়ার আনলিশড

ডিজায়ার আনলিশড পর্ব- ৪১ (শেষাংশ)


ডিজায়ার_আনলিশড

✍️ সাবিলা সাবি
পর্ব- ৪১ (শেষাংশ)
.
.
ফারহানের চোখের মণি দুটো রাগে টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। তার ভেতরের আগ্নেয়গিরি এখনই ফেটে পড়র উপক্রম। ক্লাবের নীলচে আলোতে লুসিয়াকে দেখে তার অসস্থি হচ্ছিলো। লুসিয়ার পরনে একটা অতি আধুনিক সিল্কের ড্রেস, যা এই অবস্থায় কোনোভাবেই মানানসই নয়। তার ওপর মাথায় সাদা ব্যান্ডেজ আর ভাঙা পা নিয়ে এই রাতে ক্লাবে বসে তাস খেলা আর অন্য ছেলেমেয়েদের সাথে এমন মাখামাখি যা ফারহানের সহ্যক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল।ওর প্রচণ্ড ইচ্ছে হচ্ছিল লুসিয়াকে কয়েকটা কড়া কথা শুনিয়ে দিতে, ইচ্ছে হচ্ছিল অকথ্য ভাষায় গালি দিয়ে ওকে চরম অপমান করতে। কিন্তু ফারহান জানে, এখন রাগ দেখালে হিতে বিপরীত হবে। লুসিয়া এখন যে জেদি আর বেপরোয়া মোডে আছে, ফারহান একটু বেশি বাড়াবাড়ি করলে সে হয়তো রাগের মাথায় আরও ভয়ংকর কিছু করে বসবে, হয়তোবা কোনো অপরিচিত ছেলের হাত ধরে সোজা ওর রুমেই চলে যাবে।
নিজের ভেতরের সেই ভয়ংকর রাগটা কোনোরকমে গিলে ফেলে ফারহান একদম শান্ত হয়ে উঠল। তবে সেই শান্ত ভাবটা ছিল ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতার মতো ভয়ংকর। সে কোনো কথা না বলে, কোনো সতর্কতা না দিয়ে এক ঝটকায় তাসের টেবিল থেকে লুসিয়াকে পাজাকোলে তুলে নিল।

লুসিয়া স্তব্ধ হয়ে গেল ফারহানের এই হুট করে করা আক্রমণে। সে মুহূর্তকাল থমকে থেকে পরক্ষণেই চেঁচিয়ে উঠল,”ফারহান!কী করছেন আপনি? নামান বলছি,আমার বন্ধুদের সাথে ইনজয় করছিলাম আমি, আপনি মাঝখানে আসার কে?”

লুসিয়ার তথাকথিত বিদেশি বন্ধুরা যখন দেখল এক অপরিচিত বাঙালি যুবক তাদের বান্ধবীকে এভাবে তুলে নিয়ে যাচ্ছে, তারা তেড়ে এল বাধা দিতে। কিন্তু মার্তা দ্রুত এগিয়ে গিয়ে হাত বাড়িয়ে তাদের পথ আগলে দাঁড়াল। মার্তা নিচু স্বরে কিন্তু দৃঢ়ভাবে বলল,
“লেট দেম গো। এটা ওদের পার্সোনাল ব্যাপার। তোমরা মাঝখানে পড়ো না।”

লুসিয়া নিজেকে ছাড়ানোর জন্য পাগল হয়ে হাত-পা ছোঁড়াছুড়ি করার চেষ্টা করল। কিন্তু বাম পা-টা নাড়াতেই ওর হাড়ের ভেতর এক তীক্ষ্ণ বিষাক্ত যন্ত্রণা মোচড় দিয়ে উঠল। সে ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়ে অজান্তেই ফারহানের শার্টের কলার শক্ত করে খামচে ধরল। ওর দুই চোখ দিয়ে যন্ত্রণার নোনা জল গড়িয়ে পড়ল।

ফারহান ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে বরফশীতল গলায় ফিসফিস করে বলল,”পা ছোঁড়াছুড়ি করে লাভ নেই লুসিয়া। তোমার এই ভাঙা পা নিয়ে আমি তোমাকে আজ এক চুলও নড়তে দেব না। কাল আমাকে অনেক তাচ্ছিল্য করেছ, অনেক ইগনোর করেছ আমি সব সহ্য করেছি। কিন্তু আজ রাতে তোমার কোনো পাগলামি চলবে না।”

ফারহান গটগট করে ক্লাবের ভিড় ঠেলে বেরিয়ে এল। বাইরে মেক্সিকোর ঠান্ডা বাতাস ওদের তপ্ত শরীরে আছড়ে পড়ল। ফারহান ওকে কোলে তুলেই নিজের বাইকের দিকে এগিয়ে গেল।

ফারহান যখন লুসিয়াকে পাজাকোলে তুলে নিয়ে নিজের বাইকের সামনে দাঁড় করাল, লুসিয়া তখন রাগে আর অপমানে কাঁপছে। ফারহান ওকে নামিয়ে দিতেই লুসিয়া কোনো কথা না বলে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে পাশে পার্ক করা তার নিজের ব্র্যান্ড নিউ ল্যাম্বরগিনিটার দিকে এগিয়ে গেল। বাম পায়ের তীব্র যন্ত্রণা ওকে দমিয়ে রাখতে পারছিল না, জেদ তখন ওর মাথায় চড়ে বসেছে।সে কোনোমতে টলতে টলতে ড্রাইভিং সিটে বসে পড়ল এবং ইঞ্জিন স্টার্ট দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই ফারহান এক ঝটকায় পাশের দরজা খুলে ঝড়ের গতিতে ভেতরে ঢুকে পড়ল। লুসিয়া হাত বাড়ানোর আগেই ফারহান ওর হাত থেকে গাড়ির চাবিটা ছোঁ মেরে কেড়ে নিল।

“ফারহান! আমার চাবি দিন বলছি! আপনি আমার পার্সোনাল স্পেসে ঢোকার সাহস পান কোত্থেকে?” লুসিয়া চিৎকার করে উঠল। রাগে ওর সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে, দুই চোখ দিয়ে আগুন ঝরছে।

ফারহান চাবিটা নিজের পকেটে ঢুকিয়ে সিটে আরাম করে হেলান দিয়ে বসল। ওর চোখেমুখে এখন এক অদ্ভুত ভয়ংকর স্থিরতা। সে শান্ত কিন্তু শীতল গলায় বলল, “এক পা ভাঙা আর মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়ে তুমি এই রাতে স্পোর্টস কার ড্রাইভ করবে লুসিয়া? আমি বেঁচে থাকতে অন্তত সেটা হচ্ছে না।”

“আপনি বেঁচে আছেন কি মরে গেছেন তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না!” লুসিয়া স্টিয়ারিং হুইলে সজোরে থাপ্পড় মেরে চেঁচিয়ে উঠল। “গাড়ি থেকে নামুন! নাহলে আমি এখনই পুলিশ ডাকব, নয়তো ভাইয়াকে ফোন করব। মেইলস্ট্রোম জানলে আপনার লাশও খুঁজে পাওয়া যাবে না।”

ফারহান এবার একটা বাঁকা হাসি হাসল। সে জানালার বাইরে তাকিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল, “মেইলস্ট্রোম ভাইয়াকে ডাকবে? ডাকো। উনি নিজেই চান যে আমি সবসময় তোমার ছায়ার মতো আশেপাশে থাকি। আর পুলিশ? তাদের বলবে তোমার বয়ফ্রেন্ড তোমাকে ড্রাঙ্ক অবস্থায় ইনজুরি নিয়ে গাড়ি চালাতে দিচ্ছে না? সেটা শুনলে তারা আমাকেই স্যালুট দেবে।”

লুসিয়া এবার চরম অসহায় বোধ করতে শুরু করল। যন্ত্রণায় ওর বাম পা-টা ঝিনঝিন করছে, মনে হচ্ছে হাড়ের ভেতর কেউ হাজারটা সুঁচ ফোটাচ্ছে। সে সিটের ওপর মাথা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করল। ফারহান দেখল লুসিয়ার ফর্সা গাল বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। ওর সেই উদ্ধত আর দাম্ভিক চেহারাটা এখন ব্যথায় নীল হয়ে গেছে।

ফারহান এবার ওর গলার স্বর কিছুটা নরম করল, কিন্তু তাতে কর্তৃত্ব কমল না। সে লুসিয়ার দিকে ঝুঁকে এসে বলল, “লুসিয়া, জেদ করো না। আমি জানি তুমি এখন আমাকে ঘৃণা করছো। সেই অধিকার তোমার আছে। কিন্তু নিজেকে এভাবে কষ্ট দিও না। চাবি আমার কাছেই থাকবে। হয় তুমি শান্ত হয়ে বসে থাকবে আর আমি ড্রাইভ করে তোমাকে বাড়ি নিয়ে যাব, নাহলে আমরা সারারাত এই পার্কিং লটেই এভাবে বসে থাকব। কোনটা চাও?”

লুসিয়া কোনো উত্তর দিল না, শুধু মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে রাখলো।

ফারহান চাবিটা হাতে রেখেই লুসিয়ার দিকে এক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে তাকাল। ওর চোখে তখন এক রহস্যময় দৃঢ়তা। ও হঠাতই গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল, “লুসিয়া, তোমার ব্যাগে কি আইডি কার্ড বা প্রয়োজনীয় সব ডকুমেন্ট আছে?”

লুসিয়া চোখের কোণের জল মুছে অবাক হয়ে তাকাল। যন্ত্রণার মাঝেই ভ্রু কুঁচকে ও বলল, “আইডি কার্ড দিয়ে তুমি এখন কী করবে? আমি বাড়ি যেতে চাই ফারহান, ভালো লাগছে না আমার!”

“আমি যা জিজ্ঞেস করছি তার উত্তর দাও। সব পেপার্স কি সাথে আছে?” ফারহানের কণ্ঠস্বরে এক অদ্ভুত কর্তৃত্ব ছিলো যা লুসিয়াকে বাধ্য করল উত্তর দিতে।

লুসিয়া ওর ব্যাগটা হাতড়ে বিরক্তির সাথে বলল, “হ্যাঁ, সব আছে। আমার পাসপোর্ট, আইডি এগুলা সব সময় ব্যাগেই থাকে। কিন্তু হঠাৎ এগুলো নিয়ে কেন টানাটানি করছ?”

ফারহান কোনো উত্তর দিল না। সে লুসিয়াকে নামিয়ে দিয়ে নিজে ড্রাইভিং সিটে বসে পড়লো আর লুসিয়া তার পাশের সিটে। ফারহান গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে গিয়ার শিফট করল। ল্যাম্বরগিনিটা ক্লাবের পার্কিং লট থেকে বিদ্যুদ্বেগে বেরিয়ে এল মেক্সিকোর মেইন রোডে। লুসিয়া অবাক হয়ে দেখল ফারহান বাড়ির দিকে না গিয়ে শহরের মূল কেন্দ্রের দিকে যাচ্ছে। ও আতঙ্কিত হয়ে বলল, “ফারহান! তুমি কি পাগল হয়ে গেছ? এই রাস্তা তো বাড়ির দিকে যায় না! তুমি আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?”

ফারহান স্টিয়ারিংয়ে শক্ত হাত রেখে সামনের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “মেক্সিকোতে কি রাতে কোর্ট বা ম্যারেজ রেজিস্ট্রি অফিস খোলা থাকে লুসিয়া? কিংবা এমন কোনো জায়গা যেখানে এখনই লিগ্যাল কোনো কাজ করা যায়?”

লুসিয়া থতমত খেয়ে গেল। ওর হৃদপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। “তুমি… তুমি এসব কী বলছ? কোর্ট কেন? বিয়ে? তোমার কি মাথা ঠিক আছে?”

ফারহান একবার আড়চোখে লুসিয়ার দিকে তাকাল। ওর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি, তবে সেটা উপহাসের নয়। সে বলল, “আমি কোনো ডন নই লুসিয়া, তোমার ভাই মেইলস্ট্রোম এর মতো ক্ষমতাও আমার নেই। কিন্তু তোমাকে নিজের করে নেওয়ার জন্য আমার কাছে একটাই পথ আছে। আমি চাই না কাল সকালে তুমি আবার আমাকে অন্য কারো বাহানায় অপমান করো। আজ রাতেই আমি তোমাকে লিগ্যালি নিজের করে নিতে চাই, যাতে কেউ চাইলেও আমাদের আলাদা করতে না পারে।”

কথা বলতে বলতেই ফারহান এক হাতে মোবাইল বের করল। সে দ্রুত সার্চ দিয়ে দেখতে লাগল মেক্সিকো সিটির কোন কোন ‘ম্যারেজ রেজিস্ট্রেশন অফিস’ বা ‘লিগ্যাল সার্ভিস’ এই মধ্যরাতে খোলা আছে। মেক্সিকোর মতো শহরে এমন কিছু বিশেষ অফিস থাকে যারা ২৪ ঘণ্টা জরুরি আইনি সেবা দেয়।
স্ক্রিনে একটা লোকেশন ভেসে উঠতেই ফারহান সেদিকে গাড়ি ঘোরাল। লুসিয়া পাথর হয়ে বসে রইল। ফারহানের এই হুট করে নেওয়া চরম সিদ্ধান্ত ও কল্পনাও করেনি। একদিকে ওর ভাঙা পায়ের তীব্র যন্ত্রণা, অন্যদিকে ফারহানের এই অবিশ্বাস্য পদক্ষেপ।
“কিন্তু ফারহান… ভাইয়া জানতে পারলে তোমাকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারবে!” লুসিয়া ফিসফিস করে বলল।

“মরতে তো একদিন হবেই লুসিয়া। তবে তোমার থেকে আলাদা হয়ে তিলে তিলে মরার চেয়ে, তোমার স্বামী হয়ে মরাটা বেশি ভালো হবে।” ফারহান গাড়িটা দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিয়ে চলল শহরের একটি নির্দিষ্ট ব্লকের দিকে, যেখানে লাল-নীল নিয়ন আলোয় একটি ছোট লিগ্যাল অফিসের সাইনবোর্ড জ্বলছে। ফারহান জানে, আজ রাতটা তাদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে—হয় তারা চিরতরে এক হবে, নয়তো এক ভয়ংকর বিপদে পড়বে।
.
.
.

রেজিস্ট্রি অফিসের ধোঁয়াটে আলোয় লুসিয়া তখনও গাল ফুলিয়ে ফারহানের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার মনে জেদ আর অপমানের জ্বালা। ফারহান তাকে সেদিন যেভাবে অপমান করেছিলো এই রাগ সে কোনোভাবেই ভুলতে পারছিল না। তার ওপর ফারহান যখন বিয়ের কাগজটা সামনে এগিয়ে দিল, লুসিয়া তখন তাচ্ছিল্যের সাথে হেসে উঠল।
লুসিয়া ত্যক্ত গলায় বলল, “আপনি ভাবলেন কী করে আমি এখানে সাইন করব? আপনি কে আমাকে জবরদস্তি করার? আমার জীবন, আমার চয়েস! আমি এই মুহূর্তে বাড়ি যেতে চাই।”

ফারহান এতক্ষণ শান্ত থাকার চেষ্টা করছিল, কিন্তু লুসিয়ার এই ক্রমাগত অপমান আর অবাধ্যতা ওর ধৈর্যের শেষ সীমা পার করে দিল। সে এক ঝটকায় লুসিয়ার কবজি চেপে ধরে ওকে নিজের খুব কাছে টেনে আনল। ওর চোখের মণি দুটো রাগে আর প্রচণ্ড জেদে জ্বলছে।

ফারহান বরফশীতল কিন্তু চূড়ান্ত ভয়ের এক স্বরে বলল, “অনেক নাটক করেছ লুসিয়া, আর না। এই কাগজটায় এখনই সাইন করো, নাহলে আমাকে আর কোনোদিন পাবে না। আমি মেক্সিকো ছেড়ে এমন জায়গায় চলে যাব যেখানে কেউ আমাকে খুঁজে পাবে না। চিরতরে হারিয়ে যাব তোমার জীবন থেকে। চয়েস ইজ ইয়োরস!”

‘কোনোদিনও পাবে না’—এই কথাগুলো লুসিয়ার কানে বিষের মতো বিঁধল। সে ফারহানের চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, ফারহান এবার মজা করছে না। এই মানুষটা চলে গেলে তার পৃথিবীটা যে আস্ত একটা শ্মশান হয়ে যাবে, সেটা সে কয়েক সেকেন্ডেই টের পেল। ফারহানের এই রুদ্রমূর্তি আর হারিয়ে যাওয়ার হুমকি লুসিয়ার সব জেদ এক মুহূর্তে গুঁড়িয়ে দিল।
সে কাঁপতে কাঁপতে কলমটা তুলে নিল। রাগে আর অভিমানে ওর চোখ দিয়ে আবার জল গড়িয়ে পড়ল, কিন্তু এবার সে আর দ্বিমত করল না। সার্টিফিকেটের পাতায় নিজের নামটা সই করে সে কলমটা ছুঁড়ে ফেলে দিল।

ফারহান এক মুহূর্ত দেরি না করে লুসিয়াকে আবার পাঁজাকোলে তুলে নিল। এবার আর সে লুসিয়াকে তার বাড়িতে ফেরাল না। সোজা নিজের অ্যাপার্টমেন্টের ফ্লাটে নিয়ে এসে ওকে বিছানায় বসিয়ে দিল। ঠিক তখনই লুসিয়ার ফোনে সেই কাঙ্ক্ষিত কিন্তু ভীতিজনক কলটা এল— ‘জাভিয়ান ব্রো’।

লুসিয়া ফারহানের নির্দেশে ফোনটা ধরে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, “ব্রো… আমি মার্তার বাসায় আছি। আমার শরীরটা হঠাৎ খুব খারাপ লাগছিল, তাই আজ রাতটা এখানেই থাকছি।”

জাভিয়ান ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ চুপ থেকে শুধু বলল, “আচ্ছা, সকালে ড্রাইভার পাঠিয়ে দেব। সাবধানে থাকিস।”

কলটা কাটার পর ঘরে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এল। লুসিয়া বিছানায় ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়ল। আজ রাতটা অন্তত তারা এক ছাদের নিচে, দাপ্তরিকভাবে স্বামী-স্ত্রী।

ফারহানের অ্যাপার্টমেন্টের ভেতর তখনো এক থমথমে নীরবতা। জানালার বাইরে মেক্সিকো সিটির নিয়ন আলো এসে পড়ছে ঘরে, যা আবছা এক মায়ার সৃষ্টি করেছে। লুসিয়া বিছানায় দেয়ালের দিকে মুখ করে নিস্পন্দ হয়ে শুয়ে আছে। আইনিভাবে সই হয়ে গেলেও ওর মনের ওপর জমে থাকা সেই অপমানের মেঘগুলো এখনো কাটেনি। ফারহান বুঝতে পারছিল, শুধু কাগজ-কলমের বিয়েতে লুসিয়ার হৃদয়ের ক্ষত শুকাবে না; সেই ক্ষতে এখন মমতার প্রলেপ দেওয়া খুব প্রয়োজন।

ফারহান ধীরপায়ে লুসিয়ার পাশে গিয়ে মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসল। লুসিয়া বুঝতে পেরেও চোখ ফিরিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু ফারহান আলতো করে ওর দুটো হাত নিজের শক্ত হাতের মুঠোয় নিল। এরপর নিজের দুই কান ধরে একদম ছোট বাচ্চার মতো করুণ মুখে তাকিয়ে রইল লুসিয়ার দিকে।

“লুসিয়া, আমি জানি আমি অনেক বড় অপরাধ করেছি,” ফারহান খুব নিচু আর ধরা গলায় বলতে শুরু করল। “সেদিন তোমাকে যা যা বলেছি, বা আজ যেভাবে সবার সামনে আচরণ করেছি—সেগুলো করার কোনো অধিকার আমার ছিল না। আমি শুধু তোমার জেদটুকুই দেখেছিলাম, কিন্তু তোমার ভেতরের অবুঝ ভালোবাসাটা বুঝতে পারিনি। প্লিজ, আমাকে শেষবারের মতো ক্ষমা করে দাও।”

লুসিয়া এবারও কোনো কথা বলল না, কিন্তু ওর চোখের কঠোর দৃষ্টিটা কিছুটা নরম হয়ে এল। ফারহান আবার কান ধরে একটু মাথা ঝুঁকিয়ে আদুরে ভঙ্গিতে বলল—”আমি প্রমিজ করছি লুসিয়া, আজ থেকে আর কোনোদিন তোমার সাথে বাজে ব্যবহার করব না। তোমার ওপর আর কখনো ওইভাবে চিৎকার করব না। তুমি আজ আমায় যে শাস্তি দেবে আমি মাথা পেতে নেব, কিন্তু এভাবে রাগ করে মুখ ফিরিয়ে থেকো না। তোমাকে হারানোর ভয়েই আজ আমি এই চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছি।”

ফারহানের এই অভূতপূর্ব নমনীয় রূপ আর আকুতি দেখে লুসিয়ার পাষাণ হওয়া মনটা মুহূর্তেই গলে জল হয়ে গেল। সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে ফারহানের কান থেকে হাত দুটো সরিয়ে দিল।

“তুমি কেন বারবার এমন করো?” লুসিয়া কাঁদতে কাঁদতে ওর বুকে ঝাপিয়ে পড়ল। “একবার আকাশ সমান কষ্ট দাও, আবার পরক্ষণেই সব ভেঙে চুরমার করে মায়া দেখাও! জানো আমার মনে কতটা লেগেছিল তোমার ওই কথাগুলো শুনে?”

ফারহান এবার লুসিয়ার চোখের জল নিজের আঙুল দিয়ে মুছে দিয়ে ওর কপালে আলতো করে নিজের কপাল ছোঁয়াল। “আর কখনো লাগবে না লুসিয়া। এখন থেকে তোমার সব যন্ত্রণার ভাগীদার আমি। তুমি ক্লান্ত অনেক ধকল গেছে শরীরের ওপর দিয়ে এবার একটু চোখ বন্ধ করো। আমি এখানেই আছি, তোমার পাশে।”

ফারহান সোফায় শুতে যাওয়ার জন্য বালিশ হাতে নিতেই লুসিয়া ঝাপসা চোখে ওর দিকে তাকাল। যন্ত্রণায় কাতর স্বরে সে বলল, “তুমি ওখানে কেন যাচ্ছ? বিছানায় এসে ঘুমাও।”

ফারহান মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বলল, “না লুসিয়া, তোমার শরীর এখন খুব দুর্বল। তোমার প্রোপার রেস্ট দরকার, আর পাটাও সাবধানে রাখতে হবে। আমি সোফায় ঠিক আছি।” ফারহান ওর ফোনটা হাতে নিয়ে মেক্সিকোর একটি ফুড ডেলিভারি অ্যাপ ওপেন করল। “আমি বরং আমাদের জন্য কিছু খাবারের অর্ডার দিচ্ছি, খাবারটা চলে আসতে আসতে আমি একটু শাওয়ার নিয়ে নিই। তুমি ঘুমানোর চেষ্টা করো।”

লুসিয়া এবার জেদ ধরে ফারহানের হাতটা টেনে ধরল। নিজের পাশে বিছানায় বসিয়ে সে ফারহানের খুব কাছে এগিয়ে এল। ওর চোখের কোণে তখনো পানি, কিন্তু ঠোঁটে এক ম্লান হাসি। সে নিচু স্বরে আবদার মেশানো গলায় বলল, “ফারহান, এখন তো আমাদের মাঝখানে আর কোনো বাধা নেই, তাই না? আমরা তো লিগ্যালি বিয়ে করে ফেলেছি…”

লুসিয়া যখন আরও একটু ঘনিষ্ঠ হতে চাইল, ফারহান মুহূর্তেই নিজের হাতের তালু দিয়ে লুসিয়ার মুখটা আলতো করে চেপে ধরল। ও মাথা নেড়ে গম্ভীর কিন্তু শান্ত গলায় বলল, “একদম না লুসিয়া। নিজেকে কন্ট্রোল করো।”

লুসিয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। ফারহান ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝিয়ে বলল, “এখনো আমাদের বিয়েটা ইসলামিক রীতিনীতি অনুযায়ী সম্পন্ন হয়নি। আমরা শুধু কয়েকটা কাগজে সই করেছি মেক্সিকোর আইন মানার জন্য। কিন্তু আল্লাহর কাছে এখনো তুমি আমার পূর্ণাঙ্গ স্ত্রী নও। আর যতক্ষণ না ইসলামিক ভাবে ‘নিকাহ’ হচ্ছে, ততক্ষণ তোমার পবিত্রতায় হাত দেওয়ার কোনো অধিকার আমার নেই। আমি তোমাকে মন থেকে ভালোবাসি লুসিয়া, আর সেই ভালোবাসার মর্যাদা আমি নষ্ট করতে চাইনা।”

লুসিয়া কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে ফারহানের দিকে তাকিয়ে রইল। এই ছেলেটা ওকে কতটা সম্মান করে সেটা ভেবে ওর মনের কোণে এক গভীর ভালো লাগা কাজ করতে লাগল। ফারহান ওর কপাল থেকে চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে বলল, “কাল সকালে যখন আমরা ‘কবুল’ বলব, তখন থেকে তুমি পুরোপুরি আমার হবে। তার আগে আমি কোনো ভুল করতে চাই না। এবার শান্ত হয়ে ঘুমাও তো!”

লুসিয়া আর তর্ক করল না। সে ফারহানের হাতটা নিজের গালের নিচে চেপে ধরলো। ফারহান উঠে গিয়ে আলমারি থেকে নিজের একটা ঢিলেঢালা সাদা টি-শার্ট বের করে বিছানার ওপর রাখল। হালকা হেসে বলল, “তুমি বরং এই ক্লাবের ড্রেসটা ছেড়ে আমার এই টিশার্টটা পরে নাও, কমফোর্ট ফিল করবে। আমি শাওয়ার নিয়ে আসছি, এর মধ্যে খাবারও চলে আসবে।”

ফারহান তোয়ালে নিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেল। লুসিয়া কিছুক্ষণ বিছানায় পড়ে থাকা টি-শার্টটার দিকে তাকিয়ে রইল। এই সাধারণ একটা কাপড়ের মাঝেও সে যেন ফারহানের অস্তিত্ব খুঁজে পাচ্ছে। সে খুব কষ্টে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে উঠে ফারহানের টিশার্টটা পরে নিল। ফারহানের শরীরের পারফিউমের ঘ্রাণটা নাকে আসতেই ওর মনের সব ক্লান্তি যেন নিমেষেই উধাও হয়ে গেল।

বাথরুম থেকে শাওয়ারের পানির শব্দ আসছে। লুসিয়া ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নিজের মাথার ব্যান্ডেজ আর ফ্যাকাসে মুখটার দিকে তাকিয়ে ও ভাবল, কাল সকালেই ও ফারহানের পাকাপোক্ত জীবনসঙ্গিনী হতে যাচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর ফারহান চুল মুছতে মুছতে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এল।পরনে শুধু একটা ট্রাউজার, উন্মুক্ত সুঠাম দেহ থেকে তখনও পানির কণাগুলো হিরের মতো ঝিলিক দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে। ফারহানের ভেজা চুল আর কপাল বেয়ে কয়েক ফোঁটা পানি ওর গলার নিচে নেমে যাচ্ছে। ফারহান আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে শুরু করল।

বিছানায় আধশোয়া হয়ে লুসিয়া অপলক দৃষ্টিতে ফারহানের দিকে তাকিয়ে আছে। নিজের বড় সাইজের সাদা টি-শার্টে লুসিয়াকে খুব মায়াবী আর ছোট বাচ্চার মতো লাগছে। কিন্তু লুসিয়ার চোখে তখন এক অন্যরকম নেশা আর মুগ্ধতা। ফারহানের এই পৌরুষদীপ্ত রূপটা সে আগে কখনো এভাবে দেখার সুযোগ পায়নি।

ফারহান আয়নার প্রতিবিম্বে খেয়াল করল লুসিয়া একদৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। সে চুল মোছা থামিয়ে দিয়ে একটু বাঁকা হেসে পেছন ফিরে তাকাল।
“লুসিয়া, তুমি ওভাবে আমার দিকে বাজে নজরে তাকাচ্ছ কেন?” ফারহান দুষ্টুমি ভরা গলায় প্রশ্ন করল।

লুসিয়া অপ্রস্তুত হয়ে তড়িৎ গতিতে চোখ সরিয়ে নিল। ওর ফ্যাকাশে গালে মুহূর্তেই লাজুক একটা আভা ছড়িয়ে পড়ল। সে আমতা আমতা করে বলল, “কই… আমি তো তাকাচ্ছিলাম না! আমি জাস্ট দেখছিলাম তোমার চুল থেকে পানি পড়ে ফ্লোর ভিজে যাচ্ছে কি না।”

ফারহান হো হো করে হেসে উঠল। সে লুসিয়ার আরও কাছে গিয়ে খাটের পাশে বসল। “মিথ্যেটা ধরা পড়ে যাচ্ছে।তোমার চোখ বলছিল অন্য কথা। কিন্তু মনে রেখো ম্যাডাম, কালকের আগে কিন্তু কোনো অ্যাডভান্স নজর দেওয়া চলবে না!”

লুসিয়া এবার বালিশ থেকে মুখ তুলে সরাসরি ফারহানের চোখের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসল। তারপর একদম সোজাসুজি বোল্ড গলায় বলল, “নজর তো দিচ্ছিই, শুধু পারমিশন দিয়ে দেখো একদম খেয়ে ফেলব তোমাকে!”

লুসিয়ার এমন সাহসী কথা শুনে ফারহান এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে ভাবতেও পারেনি যে এই শারীরিক যন্ত্রণার মাঝেও লুসিয়া এতখানি রসিকতা করতে পারবে। ফারহান এবার সত্যি সত্যি লাজুক একটা হাসি দিল। সে চিরকালই একটু গম্ভীর আর সংযত থাকতে পছন্দ করে, কিন্তু লুসিয়ার এই বেপরোয়া ধরন তাকে সবসময়ই অপ্রস্তুত করে দেয়। সে এক হাত দিয়ে নিজের কপাল মুছল। “লুসিয়া! তুমি কি কোনোদিন ভালো হবে না?” ফারহান কৃত্রিম শাসন করে বলল। “এত বড় এক্সিডেন্ট হলো, পা ভেঙেছে, মাথায় ব্যান্ডেজ তাও তোমার শয়তানি কমছে না? এখন এসব কথা বন্ধ করে ঘুমাও।”

লুসিয়া এবার একটু শব্দ করে হেসে উঠল। সে ফারহানের হাতের একটা আঙুল টেনে ধরে বলল, “আরে, তুমি ভয় পাচ্ছো নাকি মিস্টার ফারহান? আমার পা ভেঙেছে বলে ভাবছো আমি কিছু করতে পারব না? মনে রাখবে, বাঘিনী আহত হলেও কিন্তু শিকার ভুলে যায় না।”

ফারহান মাথা নেড়ে হাসতে হাসতে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। সে জানত, লুসিয়াকে এখন কথা দিয়ে হারানো অসম্ভব। ঠিক তখনই ডোরবেলের শব্দ হলো। ফারহান দ্রুত নিজের একটা শার্ট পরে নিয়ে বলল, “খাবার চলে এসেছে বোধহয়। আমি ওটা নিয়ে আসছি। তোমার বাঘিনী গিরি কালকের জন্য জমিয়ে রাখো।”

পরেরদিন সকালে পুরো ঘরজুড়ে তখন এক পবিত্র নিস্তব্ধতা। ফারহান আর লুসিয়া মুখোমুখি বসল। সকালের নরম আলো যখন জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরে এসে পড়ল, লাল শাড়িতে লুসিয়াকে অপার্থিব সুন্দর লাগছিল। শাড়িটা সকালেই কিনে এনেছে ফারহান। লুসিয়ার ভাঙা পা আর শরীরের দুর্বলতা ছাপিয়ে মুখে এক স্বর্গীয় আভা ফুটে উঠেছে। মার্তা আর ইসলামিক সেন্টারের সেই খাদেম সাক্ষী হিসেবে পাশে দাঁড়িয়েছেন। কাজি সাহেব গম্ভীর ও শান্ত গলায় বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করলেন।

ফারহান লুসিয়ার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে রাখল। কাজি সাহেব মোহরানা নির্ধারণ করে ফারহানের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ফারহান আহমেদ, আপনি কি লুসিয়া চৌধুরীকে নিজের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি আছেন?”

ফারহান লুসিয়ার চোখের দিকে গভীর বিশ্বাস নিয়ে তাকাল। বুক ভরে এক লম্বা নিশ্বাস নিয়ে সে স্পষ্ট স্বরে বলল, “আলহামদুলিল্লাহ, কবুল।”

এরপর কাজি সাহেব লুসিয়ার দিকে ফিরলেন। লুসিয়ার চোখের কোনে তখন আনন্দের আভা। যন্ত্রণাময় রাতটার পর এই মুহূর্তটা ওর কাছে স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। কাজি সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, “লুসিয়া চৌধুরী, আপনি কি ফারহান আহমেদকে নিজের স্বামী হিসেবে গ্রহণ করছেন?”

লুসিয়া একবার ফারহানের দিকে তাকাল, যেখানে শুধু মায়া আর নিরাপত্তা। সে কাঁপা গলায় কিন্তু দৃঢ়তার সাথে বলল, “কবুল।”

পরপর তিনবার ‘কবুল’ বলার পর যখন দুজনে নিকাহনামায় সই করল, তখন মার্তা আনন্দের আতিশয্যে তালি দিয়ে উঠল। কাজি সাহেব মোনাজাত ধরলেন। ফারহান আর লুসিয়া দুজনে হাত তুলে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করল। মোনাজাত শেষ হতেই ফারহান লুসিয়ার দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসল। আজ থেকে সব লুকোচুরি আর সামাজিক বাধার দেয়াল ভেঙে তারা একে অপরের হয়ে গেল। লুসিয়া ফারহানের কাঁধে মাথা রেখে ফিসফিস করে বলল, “এখন তো আমাকে ছোঁয়ার অধিকার হয়েছে তোমার, তাই না?”

ফারহান এবার আর নিজেকে সরিয়ে নিল না। সে পরম মমতায় লুসিয়াকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। ওর চুলে আলতো করে চুমু খেয়ে বলল, “এখন থেকে তুমি শুধু আমার, লুসিয়া রেহমান। পৃথিবীর কোনো শক্তিই আর আমাদের আলাদা করতে পারবে না।”

বিয়ের পর সারাটা দিন কেটে গেল এক মায়াবী ঘোরের মধ্যে। মার্তা সারাক্ষণ ওদের আগলে রাখল, কারণ সে জানত লুসিয়ার এই অসুস্থ শরীরে ফারহানের একার পক্ষে সব সামলানো কঠিন। কিন্তু দিনের আলো ফুরিয়ে যখন মেক্সিকোর আকাশে চাঁদের দেখা মিলল, তখন মার্তার মাথায় এক দারুণ বুদ্ধি খেলে গেল। সে মনে মনে ঠিক করল, আজকের রাতটা এই নতুন দম্পতির জন্য স্মরণীয় করে রাখতে হবে।

মার্তা ফারহানকে এক ফাঁকে ড্রয়িংরুমে ডেকে নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “ফারহান ভাইয়া আমি কিছু তাজা লাল গোলাপ আর সুগন্ধি মোমবাতি আনিয়েছি। তোমরা একটু বাইরে বসো, আমি তোমাদের রুমটা গুছিয়ে দিচ্ছি। এটা আমার পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য ছোট একটা সারপ্রাইজ গিফট।”

ফারহান লজ্জিত হয়ে হাসল, আর মার্তা ব্যস্ত হয়ে পড়ল বাসর ঘর সাজাতে। সাদা চাদরের ওপর লাল গোলাপের পাপড়ি আর মোমবাতির মৃদু আলোয় ঘরটা এক মায়াবী রূপ নিল। গোলাপের তীব্র সুবাস আর চন্দন কাঠের ধূপের ধোঁয়া ঘরটাকে এক অপার্থিব স্বর্গে পরিণত করল।

রাত তখন ১১টা। ফারহানের ফ্লাটের চারপাশ নিঝুম হয়ে এসেছে। ফারহান আর লুসিয়া রুমের দরজায় এসে দাঁড়াল। লুসিয়া যদিও খুঁড়িয়ে হাঁটছিল, কিন্তু ফারহানের শক্ত হাতের সাপোর্ট আর মনের ভেতরের উত্তেজনা ওকে এক অন্যরকম শক্তি জোগাচ্ছিল।
ফারহান ধীর পায়ে দরজাটা খুলতেই লুসিয়ার চোখ ছানাবড়া!পুরো ঘরটা মার্তা লাল গোলাপ আর সাদা রজনীগন্ধা দিয়ে এক মায়াবী অরণ্য বানিয়ে ফেলেছে। বিছানার ওপর ফুলের পাপড়ি দিয়ে বড় একটা হৃদপিণ্ড তৈরি করা। চারপাশটা কৃত্রিম আলো নয়, বরং ছোট ছোট সুগন্ধি মোমবাতির স্নিগ্ধ আলোয় ঝলমল করছে। পুরো ঘরে এক তীব্র মাদকতাময় সুবাস ছড়িয়ে আছে।
লুসিয়া মুগ্ধ হয়ে চারপাশটা দেখে মার্তার দিকে তাকাল। মার্তা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে এক গাল হেসে বলল, “কেমন সারপ্রাইজ দিলাম বল? তোদের এই স্পেশাল রাতটা কি এভাবে সাদামাটাভাবে কাটানো যায়?”

লুসিয়া শাড়ির আঁচলটা একটু ঠিক করে নিয়ে বাঁকা হেসে মার্তাকে বলল, “এত সুন্দর করে রুমটা সাজিয়েছিস মার্তা খামোখা এত কষ্ট করলি কেন বল তো? একটুপরেই তো এই বিছানা, ফুল সবই নষ্ট হয়ে যাবে! তখন তো এই সাজানো গোছানোর কোনো চিহ্নই থাকবে না।”

লুসিয়ার এমন বেপরোয়া আর বোল্ড কথা শুনে মার্তা হচকচিয়ে গেল, আর বেচারা ফারহান তো লজ্জায় একেবারে লাল হয়ে গেছে। সে ভাবতেই পারেনি মার্তার সামনে লুসিয়া এমন সোজাসুজি কথা বলে দেবে!
ফারহান অপ্রস্তুত হয়ে কৃত্রিমভাবে একটা জোরে কাশি দিল, যেন কাশির আড়ালে নিজের লজ্জাটা ঢাকতে চাইছে। সে অন্যদিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলল, “লুসিয়া! কী সব বলছ এসব? মার্তা কত কষ্ট করে সাজালো…”

লুসিয়া ফারহানের এই লাজুক অবস্থা দেখে আরও মজা পেল। সে মার্তার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে হাসল। মার্তা প্রথমে একটু থমত খেলেও পরক্ষণেই হেসে কুটি কুটি হয়ে গেল। সে ফারহানকে উদ্দেশ্য করে হাসতে হাসতে বলল,”তোরা এখন যা খুশি কর, আমি চললাম। গুড লাক!”

মার্তা হাসতে হাসতে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় ফারহান একবার কপালে হাত দিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “হে খোদা, এই মেয়েকে নিয়ে আমি কোথায় যাব!”

মার্তা চলে যাওয়ার পর ফারহান ধীর পায়ে গিয়ে রুমের দরজাটা ডবল লক করে দিল। তারপর ফিরে তাকাল লুসিয়ার দিকে। লুসিয়া তখন বিছানায় আধশোয়া হয়ে এক দুষ্টুমি ভরা হাসি নিয়ে ফারহানের দিকেই তাকিয়ে আছে। মোমবাতির কাঁপা আলোয় ওর লাল শাড়ির জমিনটা আগুনের মতো জ্বলছে।

ফারহান ধীর পায়ে বিছানার কাছে এগিয়ে এসে বলল, “তুমি কি সবসময় সবাইকে এভাবেই এমব্যারেসড করো? মার্তা কী ভাবল বলো তো?”

লুসিয়া ফারহানের হাতটা হ্যাঁচকা টান দিয়ে নিজের কাছে নিয়ে এল। ফারহান ভারসাম্য সামলাতে না পেরে লুসিয়ার খুব কাছে ঝুঁকে পড়ল। লুসিয়া ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে তপ্ত নিশ্বাসে ফিসফিস করে বলল, “মার্তা যা ভাবার ভেবেছে, এখন আপনি কী ভাবছেন সেটা বলুন মিস্টার হাজব্যান্ড ষ! বাঘিনী আহত হলেও শিকার ভোলে না—মনে আছে তো?

ফারহান এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। লুসিয়ার এই মায়াবী আর সাহসী আহ্বানে ওর সব গাম্ভীর্য কর্পূরের মতো উড়ে গেল। ও এক হাত দিয়ে লুসিয়ার কোমর জড়িয়ে ধরল আর অন্য হাতটা ওর ঘাড়ের কাছে নিয়ে এল।

ফারহান লুসিয়ার চোখের গভীরে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল, “আজ রাতে শিকারি আমি হতে চাই লুসিয়া। তোমার সব জেদ আর সব অভিমান আজ এই ভালোবাসার জোয়ারে ভেসে যাবে।”

বাসর ঘরের সেই মায়াবী পরিবেশটা হুট করেই যেন এক পশলা তপ্ত বাতাসে তছনছ হয়ে গেল। ফারহান যখন লুসিয়াকে কাছে টানতে চাইল, লুসিয়া তখন এক ঝটকায় ফারহানের শার্টের কলারটা খামচে ধরল। ওর চোখের মণি দুটো ঈর্ষায় আর রাগে দাউদাউ করে জ্বলছে। মোমবাতির আলোয় সেই অগ্নিনজর দেখে ফারহান এক মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেল।
লুসিয়া দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “ফারহান আহমেদ, আমার মাথায় ব্যান্ডেজ আর পায়ে প্লাস্টার দেখে কি আপনি ভেবেছেন আমি সব ভুলে যাবো? ওই ফারিহা নামের মেয়েটার সাথে আপনার ওই সেলফিটার মানে কী? আপনার কাঁধের ওপর ও অত ঘনিষ্ট হয়ে কেন দাঁড়িয়ে ছিল?”

ফারহান পরিস্থিতি হালকা করার জন্য একটু হাসার চেষ্টা করে বলল, “তুমি ওটাও দেখেছো? আরে লুসিয়া, ও তো জাস্ট একটা ছবি ছিল! ফারিহা আমার স্কুল লাইফের ফ্রেন্ড।ও আবদার করল তাই একটা সেলফি তুলেছি, এতে রাগ করার কী আছে?”

লুসিয়া ফারহানের কলারটা আরও শক্ত করে টেনে ধরে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে তপ্ত কণ্ঠে উত্তর দিল, “রাগ করার কী আছে মানে? আপনার লজ্জা থাকা উচিত! ওই মেয়ে আপনার দিকে তাকিয়ে যেভাবে হাসছিল, সেটা আমার একদম পছন্দ হয়নি। আমি ওর আইডিটা রিপোর্ট করে উড়িয়ে দিয়েছি! ফারহান আহমেদ, একটা কথা কান খুলে শুনে রাখুন যেটা আমার, সেটা শুধু আমারই। সেখানে অন্য কোনো মেয়ের ছায়া পড়লেও আমি সহ্য করব না। শুধু আইডি না, এরপর ওরকম কাউকে আপনার আশেপাশে দেখলে আমি আরও ভয়ংকর কিছু করে বসব!”

ফারহান এবার বুঝতে পারল লুসিয়া ওকে কতটা পাগলের মতো ভালোবাসে আর কতটা পজেসিভ। সে আলতো করে লুসিয়ার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে কলার থেকে সরাল। তারপর ওর চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত ও গভীর স্বরে বলল “এত ভয় পাও কেন আমাকে হারানোর? আমি তো এখন অফিশিয়ালি তোমার। আর ফারিহা বা অন্য কেউ আমার জীবনে তোমার জায়গা নেওয়ার ক্ষমতা পৃথিবীর কারো নেই। আমার প্রতিটি নিশ্বাস এখন তোমার নামে লেখা হয়ে গেছে লুসিয়া।”

লুসিয়া একটু গুম হয়ে থেকে অভিমানী স্বরে বলল, “ভয় পাই না, আমি আমার অধিকার নিয়ে খুব সচেতন। অন্য কারো দিকে নজর দিলে কিন্তু আপনার খবর আছে।”

ফারহান এবার হোহো করে হেসে ফেলল। সে লুসিয়াকে নিজের আরও কাছে টেনে নিয়ে ওর কপালে নিজের মাথা ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “ঠিক আছে বাবা, কান ধরছি! আর কারো সাথে ছবি তুলব না, এমনকি কারো দিকে তাকাবও না। এবার অন্তত শান্ত হও? আমাদের বাসর রাতটা কি এই সেলফি নিয়ে ঝগড়া করেই কাটিয়ে দেবে?”

লুসিয়া এবার একটু লজ্জা পেল। ফারহানের শরীরের সেই পরিচিত উষ্ণতা আর পারফিউমের ঘ্রাণে ওর সব রাগ জল হয়ে গেল। সে ফারহানের বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে ধরা গলায় ফিসফিস করে বলল, “ওটা ঝগড়া নয়, ওটা আমার সাবধানবাণী ছিল। এখন বাকি সময়টা শুধু আমার হয়ে থাকো… সবটুকু দিয়ে।”

বাসর ঘরের সেই নিস্তব্ধতায় এখন কেবল দুই হৃদপিণ্ডের দ্রুত ধুকপুকানি শোনা যাচ্ছে। মোমবাতিগুলো নিঃশেষ হয়ে আসছে, ঘরজুড়ে এখন রজনীগন্ধার মায়াবী সুবাস আর চাঁদের রুপালি আলো। লুসিয়া ফারহানের বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে তার সবটুকু হাহাকার এক নিমেষে বিসর্জন দিল।

লুসিয়া এবার ফারহানের চোখের দিকে এক অন্যরকম নেশাভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে ধরা গলায় বলল, “তা, আর কোনো সার্টিফিকেট নেওয়া বাকি আছে কি তোমাকে ছোঁয়ার জন্য? নাকি এখনো সেই নিয়ম-কানুনের দোহাই দিয়ে দূরে থাকবে?”

ফারহান লুসিয়ার এই অকপট আর সাহসী কথা শুনে একটু অবাক হলো। সে লুসিয়ার কোমরে হাত রেখে তাকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের দিকে টেনে নিল। ফারহান খুব নিচু আর গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করল, “ভয় পাচ্ছ না লুসিয়া? তোমার এই ছোট্ট শরীরটা কি আমার সবটুকু পাগলামি সহ্য করতে পারবে?”

লুসিয়া একটু হেসে ফারহানের গলার ওপর নিজের দুহাত রেখে বলল, “ওমা! ভালোবাসার মানুষের আদর পেতে ভয় পাব কেন? যে মানুষটার জন্য আমি মরতে বসেছিলাম, আজ তার কাছে নিজেকে সেক্রিফাইস করে দিতে আমার কিসের ভয়?”

ফারহান এবার লুসিয়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে তপ্ত নিশ্বাস ছেড়ে বলল, “একবার শুরু করলে কিন্তু আর ফেরার পথ নেই। পরে যদি ব্যথায় বা আবেগে কান্না করো, তখন কিন্তু আমি একটুও ছাড়ব না। নিজেকে সামলাতে পারবে তো?”

লুসিয়া এবার ফারহানের চোখে চোখ রেখে খুব দৃঢ়ভাবে বলল, “আমি কান্না করতে চাই ফারহান… তবে সেই কান্না হবে তোমার স্পর্শ পাওয়ার সুখে। আমি চাই তোমার প্রতিটা ছোঁয়ায় আজ আমার সব পুরনো ক্ষত মুছে যাক। তুমি শুধু আমাকে নিজের করে নাও।”

ফারহান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। জানালার ফাঁক দিয়ে আসা চাঁদের একটুখানি আলো লুসিয়ার লাল শাড়ির ওপর পড়ে তাকে এক অপার্থিব রূপ দিয়েছে। ফারহান পরম আবেশে লুসিয়াকে সেই পুষ্পশয্যায় শুইয়ে দিয়ে ওর ওপর ঝুঁকে পড়ল।
লুসিয়া চোখ বুজে ফারহানের প্রতিটি স্পর্শ অনুভব করতে লাগল। ফারহানের ঠোঁট যখন ওর কপালে, চোখে আর গালে বিচরণ করছিল, লুসিয়া এক তীব্র আবেশে ফারহানের পিঠে খামচে ধরল।

বিছানায় শুয়ে লুসিয়া যখন ফারহানের চোখের দিকে তাকাল, তখন ওর বুকের ভেতরটা হঠাৎ অজানা এক শিহরণে কেঁপে উঠল। যে ফারহান সবসময় শান্ত আর সংযত থাকত, আজকের এই রাতে তার চোখের দৃষ্টি একদম বদলে গেছে। সেখানে আর সেই চিরচেনা মায়া নেই, বরং তার বদলে জমা হয়েছে এক তৃষ্ণা আর তীব্র নেশা। লুসিয়া স্বভাবত বোল্ড হলেও ফারহানের এই রুদ্রমূর্তি দেখে মুহূর্তেই থমকে গেল।

ফারহান লুসিয়ার দুই হাতের কবজি বিছানার সাথে শক্ত করে চেপে ধরে আরও ঝুঁকে এল। ওর তপ্ত নিশ্বাস লুসিয়ার গলার খাঁজে আছড়ে পড়ছে। ফারহান খুব নিচু আর গম্ভীর গলায় বলল, “আমার ছোঁয়া পাওয়ার জন্য এতো দিন কত চেষ্টা করেছো লুসিয়া, তাই না? আজকে দেখবো কতটা সহ্য করতে পারো তুমি। আমি আজ মোটেও দয়া দেখাব না।”

লুসিয়া কিছু বলতে চাইল, কিন্তু ফারহানের চোখের সেই তীব্রতা দেখে ওর গলা দিয়ে কোনো স্বর বের হলো না। ফারহান ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে আবার বলল—”সারারাতেও ছাড়বো না তোমাকে। আজ আমি তোমাকে পাগল করে ছাড়বো। এমন এক ঘোর তৈরি করব যে তুমি নিজেই তখন রিকোয়েস্ট করবে তোমাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য।”

ফারহান আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না। সে লুসিয়ার ওপর ঝুঁকে এসে ওর ঠোঁট দুটো নিজের দখলে নিয়ে নিল। ফারহানের ঠোঁটের সেই স্পর্শে কোনো নমনীয়তা ছিল না, ছিল এক তৃষ্ণার্ত ব্যাকুলতা। সে খুব গভীরভাবে লুসিয়ার ঠোঁট আস্বাদন শুরু করল, মনে হচ্ছে দীর্ঘদিনের জমানো সব হাহাকার আর তৃষ্ণা আজ এক নিমিষেই মিটিয়ে নিতে চায়।

ফারহান শুধু আস্বাদনে ক্ষান্ত হলো না, সে দন্ত দিয়ে লুসিয়ার নিচের অধরে কামড় বসাতে শুরু করল। ব্যথায় লুসিয়ার মুখ দিয়ে এক অদ্ভুত গোঙানি বেরিয়ে এল, কিন্তু সেই ব্যথার মাঝেও ছিল এক অপার্থিব সুখ। ফারহানের কামড় আর আস্বাদনের তীব্রতায় লুসিয়ার পুরো শরীর ধনুকের মতো বেঁকে উঠল।

ওর হাতের আঙুলগুলো ফারহানের চুলের ভেতর শক্ত করে গেঁথে গেল। ফারহানের শরীরের ভার আর ওর ঠোঁটের সেই তীব্র উন্মাদনা লুসিয়াকে এক অচেনা জগতের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। ফারহান ওর ঠোঁট ছেড়ে দিয়ে যখন ওর গলার দিকে এগিয়ে গেল, তখন লুসিয়ার ঠোঁট দুটো ফুলে লাল হয়ে আছে, সেখানে ফারহানের দংশনের চিহ্নগুলো স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।

ফারহান আর কোনো দ্বিধা রাখল না; সে অত্যন্ত নিপুণ আর ধীর হাতে লুসিয়ার শরীরের লাল শাড়িটা খুলে ঘরের এক কোণে ছুঁড়ে ফেলল। লুসিয়া আজ এক অচেনা জগতে বিচরণ করতে লাগলো। দীর্ঘ জীবনে এই প্রথম কোনো পুরুষের এত গভীর, এত নিবিড় আর এত বন্য ছোঁয়া ওর তৃষ্ণার্ত শরীরে এসে পড়েছে। আর সেই পুরুষটি অন্য কেউ নয়, স্বয়ং ওর প্রাণের চেয়েও প্রিয় মানুষ ফারহান।

ফারহানের হাত যখন লুসিয়ার শরীরের ভাঁজে ভাঁজে তার আধিপত্য বিস্তার করছিল, লুসিয়া তখন এক অপার্থিব সুখের সাগরে ডুব দিচ্ছিল। ফারহান ওর ঘাড়ে আর কাঁধে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াতেই লুসিয়া এক গভীর আবেশে চোখ বন্ধ করে ফেলল। ও ফারহানকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ওর পিঠে নিজের নখ গেঁথে দিল।

বাসর ঘরের সেই নিবিড় নিস্তব্ধতায় কেবল দুই তৃষ্ণার্ত হৃদয়ের দ্রুত ধুকপুকানি শোনা যাচ্ছিল। তীব্র উন্মাদনা যখন চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছাল, লুসিয়ার সহনক্ষমতা এক মুহূর্তের জন্য হার মেনে গেল। ফারহানের সেই বন্য আর গভীর অনুরাগের প্রাবল্যে লুসিয়ার চোখের কোণ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। যন্ত্রণায় ওর মুখটা কুঁচকে গেল, বুক চিরে বেরিয়ে এল এক পশলা অস্ফুট কান্না। ফারহানের শরীরের নিচে ওকে তখন বড় বেশি কোমল আর অসহায় লাগছিল।

লুসিয়ার কান্নার শব্দ কানে যেতেই ফারহানের ভেতরের সেই সত্তাটা মুহূর্তেই থমকে গেল। ওর নেশাভরা চোখে ফিরে এল গভীর মায়া আর অপরাধবোধ। সে দ্রুত নিজেকে কিছুটা সরিয়ে নিয়ে অস্থির হয়ে উঠল।
“লুসিয়া! তুমি কাঁদছ?” ফারহানের কণ্ঠে ধরা পড়ল তীব্র উদ্বেগ। “আই অ্যাম সো সরি জান! আমি বোধহয় খুব বেশি রূঢ় হয়ে গিয়েছিলাম। আমি বুঝতে পারিনি তোমার এতটা কষ্ট হবে।”

ফারহান অনুতপ্ত হয়ে বিছানা থেকে উঠে যেতে চাইল, যাতে লুসিয়া নিজেকে সামলে নেওয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু সে সরে যাওয়ার আগেই লুসিয়া ওর হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। ভেজা চোখে আর আরক্ত মুখে সে মাথা নেড়ে ফারহানকে বাধা দিল।”যেও না…” লুসিয়া ভাঙা গলায় ফিসফিস করে বলল। “কোথায় যাচ্ছ তুমি? আমাকে এইভাবে রেখে যেও না ফারহান।”

ফারহান ওর গাল বেয়ে পড়া অশ্রু মুছে দিয়ে বলল, “কিন্তু তোমার তো অনেক কষ্ট হচ্ছে লুসিয়া। আমি তোমাকে আর একটুও কষ্ট দিতে চাই না। আমি ড্রয়িংরুমে গিয়ে বসছি, তুমি বরং শান্ত হয়ে একটু ঘুমাও।”

লুসিয়া এবার আরও জোরালোভাবে ফারহানের হাত নিজের বুকের কাছে টেনে নিল। ও ফারহানের চোখে চোখ রেখে ধরা গলায় বলল, “না ফারহান, এটা কষ্টের কান্না নয়। এই আদুরে ব্যথার মাঝে যে কী পরিমাণ সুখ আছে, সেটা আমি সারা জীবন ধরে পেতে চাই। তুমি আমার স্বামী, আমার সবটুকু অধিকার আজ তোমার। তোমার ছোঁয়ায় আমি যদি আজ নিঃশেষও হয়ে যাই, তবুও চাই তুমি আমার সবচেয়ে কাছে থাকো। প্লিজ, দূরে যেও না।”

লুসিয়ার এই আকুতি ফারহানের হৃদপিণ্ড কাঁপিয়ে দিল। সে বুঝতে পারল, লুসিয়া এই যন্ত্রণাময় পূর্ণতার মাঝেই তার দীর্ঘদিনের হাহাকারের অবসান খুঁজছে। ফারহান আর দূরে গেল না; বরং পরম মমতায় লুসিয়াকে আবার নিজের বাহুবন্দি করে নিল। এবার তার ছোঁয়ায় রুক্ষতা ছিল না, ছিল এক সমুদ্র সমান প্রেম আর মমতা।

তবে একটা পর্যায়ে সারাটা রাত ফারহান যতটা না ব্যাকুল ছিল, তার চেয়েও বেশি বেপরোয়া ছিল লুসিয়া। দীর্ঘদিনের অবদমিত আকাঙ্ক্ষা আর ফারহানকে চিরতরে নিজের করে পাওয়ার তৃষ্ণা ওকে একদম উন্মাদ করে তুলেছিল। ফারহান যখন ক্লান্ত হয়ে একটু বিরাম নিতে চেয়েছে, লুসিয়া তখন আরও শক্ত করে ওকে জড়িয়ে ধরেছে। ওর দুচোখে ছিল এক নেশা—ফারহানের শরীরের প্রতিটি ইঞ্চিতে নিজের মালিকানা প্রতিষ্ঠা করার তীব্র জেদ।

লুসিয়া সারারাত ফারহানকে এক মুহূর্তের জন্যও কাছছাড়া হতে দেয়নি। ফারহানের প্রতিটি ছোঁয়া, প্রতিটি দংশন আর প্রতিটি দহন সে পরম সুখে বরণ করে নিয়েছে। ফারহান অবাক হয়ে দেখছিল, এই জেদি মেয়েটার ভেতরে কতটা আগ্নেয়গিরি লুকিয়ে ছিল। লুসিয়া বারবার ফারহানকে নিজের দিকে টেনে নিয়েছে, ওর ঘাড় আর বুকে নিজের নখের আঁচড় বসিয়ে দিয়েছে।

ভোরের নরম আলো যখন জানালার পর্দা চুইয়ে ঘরে প্রবেশ করল, লুসিয়া তখনো ফারহানের প্রশস্ত বুকের ওপর মাথা রেখে ওর বাহুডোরে শান্ত হয়ে পড়ে আছে। সারা রাতের সেই রুদ্ধশ্বাস আর উন্মত্ত মিলনের পর লুসিয়ার ঠোঁটে এখন এক অদ্ভুত বিজয়ীর হাসি। ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে পড়লেও ওর মনের তৃপ্তি ছিল আকাশচুম্বী।

ফারহান ওর চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে অবাক হয়ে বলল, “তুমি তো আস্ত একটা পাগল লুসিয়া! আমি ভেবেছিলাম যন্ত্রণায় তুমি হয়তো ভয়ে পালিয়ে যাবে, কিন্তু তুমি তো আজ আমাকেই পুরোপুরি কাবু করে ফেললে।”

লুসিয়া ফারহানের বুকে একটা ছোট্ট কামড় দিয়ে আদুরে গলায় বলল, “বলেছিলাম না মিস্টার হাজব্যান্ড, আমি তোমাকে খেয়ে ফেলব? সারারাত তো শুধু ট্রেলার ছিল ফারহান, পুরো সিনেমা তো সারাজীবন ধরে চলবে।”

ফারহান হোহো করে হেসে উঠে লুসিয়াকে আবার নিজের নিচে চেপে ধরল। “পাগলি একটা! এখন অন্তত একটু ঘুমাও। শরীর তো একদম শেষ করে ফেলেছ।”

লুসিয়া ফারহানের গলার খাঁজে মুখ লুকিয়ে তৃপ্তির এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মেক্সিকোর সেই ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টে তখন এক পরম শান্তির নীরবতা, যা কেবল এক নবদম্পতির প্রথম মিলনের পূর্ণতা বয়ে আনে।

সকালের মিষ্টি রোদ যখন জানালার সিল্কের পর্দা ভেদ করে ঘরে ঢুকল, ফারহান তখন ধীর পায়ে বিছানার কাছে গিয়ে বসল। সারা রাতের সেই রুদ্ধশ্বাস আর বন্য ভালোবাসার ছাপ তখনো সারা ঘরে ছড়িয়ে আছে—বিছানার চাদরটা দুমড়ে-মুচড়ে একাকার, ফুরিয়ে যাওয়া মোমবাতির শেষ অবশেষ আর বাতাসে ছড়ানো রজনীগন্ধার ম্লান সুবাস। সে পরম মমতায় লুসিয়ার কপালে হাত রেখে আলতো করে ডাকল, “লুসিয়া, ওঠো। অনেক বেলা হলো তো, গোসল করতে হবে এবার ওঠো।”

লুসিয়া ঘুমের ঘোরেই বিরক্তি নিয়ে ফারহানের শার্টের হাতা খামচে ধরল। সে চোখ না খুলেই আধো-আধো আর নেশা জড়ানো গলায় বলল, “উহ, এত সকালে কে গোসল করে? আমার খুব শরীর ব্যথা করছে ফারহান, প্লিজ আর একটু ঘুমাতে দাও না…”

ফারহান একটু অপ্রস্তুত হয়ে এদিক-ওদিক তাকাল। মার্তা যেকোনো সময় ঘরে চলে আসতে পারে, আর লুসিয়া যেভাবে একদম অগোছালো হয়ে শুয়ে আছে, সেটা অন্য কেউ দেখলে লজ্জার সীমা থাকবে না। সে লুসিয়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে সতর্ক কিন্তু নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল, “লুসিয়া ওঠো, ছি! আমাদের ফরজ গোসল করতে হবে। সারা রাত যা হয়েছে তারপর এভাবে শুয়ে থাকা ঠিক নয়। ওঠো বলছি!”

‘ফরজ গোসল’ শব্দটা আর ফারহানের গলার গম্ভীর স্বর শুনে লুসিয়া ঝটপট চোখ মেলল। সে ফারহানের দিকে একপলক ভালো করে তাকিয়ে একটা দুষ্টুমি ভরা হাসি দিয়ে বলল, “ওহ তাই তো! আজকে তো পবিত্র হতে হবে। কিন্তু তার আগে আর একবার…”

বলেই লুসিয়া ফারহানের হাত ধরে এক হ্যাঁচকা টান দিয়ে তাকে নিজের শরীরের ওপর ফেলে দিল। ফারহান অপ্রস্তুত হয়ে নিজেকে সামলাতে সামলাতে বলল, “লুসিয়া, কী করছো? তোমার এনার্জি কি এখনো শেষ হয়নি? একটু আগেই তো বললে শরীর ব্যাথা!”

লুসিয়া এবার ঠোঁট উল্টে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল, “কেন, তোমার কি এনার্জি শেষ নাকি? ছি ছি ফারহান! এই তোমার পুরুষত্ব? কয়েক ঘণ্টায় এত দ্রুত টায়ার্ড হয়ে গেলে?”

নিজের পুরুষত্ব নিয়ে এমন সরাসরি খোঁচা আর চ্যালেঞ্জ শুনে ফারহানের মেজাজ এবার একদম চড়ে গেল। যে ফারহান সবসময় নিজেকে সংযত রাখে, লুসিয়ার এই বেপরোয়া আহ্বানে তার সব বাঁধ ভেঙে গেল। সে মুহূর্তের মধ্যে সব গাম্ভীর্য ভুলে গিয়ে কম্বলটা এক ঝটকায় টেনে সরিয়ে দিয়ে লুসিয়ার ওপর রাজকীয় ভঙ্গিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

ফারহান দাঁতে দাঁত চেপে বাঁকা হেসে বলল, “বুঝছি লুসিয়া, তোমার জন্য আমার অকাল মৃত্যু হবে, নয়তো ভবিষ্যতে আমাকে নির্ঘাত হারবাল ওষুধ খেয়ে টিকে থাকতে হবে! দাঁড়াও, তোমার ওই অহংকার আজ আমি চিরতরে ভেঙেই ছাড়ব।”

ফারহান আর কোনো সুযোগ দিল না। সকালের সেই স্নিগ্ধ রোদে বাসর ঘরের নিস্তব্ধতা আবার ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। লুসিয়ার হাসি আর ফারহানের মত্ত ভালোবাসা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। ভোরের আলোয় দুই তৃষ্ণার্ত হৃদয় আবারও এক নিষিদ্ধ আর পবিত্র খেলায় মেতে উঠল।

চলবে…..
এখানে ৬ হাজার শব্দ আছে তাই আজকেই ওদের কাহিনী দিয়েই শেষ হলো। আপনারা সবাই রিয়েক্ট দিবেন পর্যাপ্ত রিয়েক্ট না আসলে আমি গল্প আর ফেসবুকে দিবো না। তখন ইবুক আনবো তখন বুঝবেন 😑

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply