নূরএসাহাবাদ
jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
২৭ এর শেষাংশ
অশ্ববহর খুব দ্রুত এগোচ্ছিল। ঘোড়ার খুরের শব্দে ধুলা উড়ছিল পথে। সামনে জমিদারি পতাকা, পেছনে অস্ত্রধারী সওয়ারিরা, পুরো কাফেলাটাই যেন এক অদম্য ক্ষমতার প্রতীক।
সাহাবাদের শেষ প্রান্তে এসে দেখা দিলো মেহেরুন্নেসাদের পৈতৃক ভিটে। দূর থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, বাড়ির সামনে আজ অস্বাভাবিক ভিড়। গ্রামের মানুষজন, আশেপাশের কৌতূহলী লোক সবাই ভিড় করে আছে। কানাঘুষা, চাপা স্বরে ফিসফাস, আর মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে দীর্ঘশ্বাসের শব্দ।
কিন্তু অশ্ববহরের প্রথম সারির ঘোড়াটা যখন বাড়ির গেটের সামনে এসে থামলো, তখন যেন এক মুহূর্তে সবকিছু থমকে গেল। সামনে থাকা লোকেরা প্রথমে কিছু বুঝতে পারেনি। তারপর যখন রাজকীয় নিশানটা চোখে পড়লো, মুহূর্তেই গুঞ্জন ছড়িয়ে গেল।
“শাহজাদা…!”
কেউ ফিসফিস করে বললো। তারপর যেন এক অদৃশ্য ঢেউ বয়ে গেল ভিড়ের মধ্যে। লোকজন দ্রুত সরে গিয়ে পথ করে দিল। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো সবাই। কেউ সাহস করলো না চোখ তুলে সরাসরি তাকাতে। অশ্ববহর ধীরে ধীরে বাড়ির ভেতরে ঢুকলো। ঘোড়ার রাজকীয় গাড়িটা থামতেই সামনে এগিয়ে এলো কয়েকজন বৃদ্ধ। তাদের চোখে ভয়, শ্রদ্ধা, আর অস্বস্তির মিশ্রণ।
গাড়ির দরজা খুললো। প্রথমে নামলো এক দাসী, তারপর ধীরে ধীরে পা নামালো মেহেরুন্নেসা।
কালো বোরখায় ঢাকা। মাথা নিচু। পা কাঁপছে। তবু ভঙ্গিতে এখন আর সেই আগের গ্রামের মেয়ে নেই। তার হাঁটায় এখন জমিদার পরিবারের বউয়ের মৃদু ভার।মাটিতে পা রাখতেই চারপাশে চাপা গুঞ্জন উঠলো।
“ও তো মেহেরুন্নেসা…”
“এখন জমিদার বাড়ির বউ…”
“ভাগ্য দেখেছো মেয়েটার…”
কেউ ফিসফিস করে বললো। কেউ দীর্ঘশ্বাস ফেললো। কেউ আবার কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে রইলো। মেহেরুন্নেসার কানে সবকিছু আসছে, অথচ যেন কিছুই ঠিকমতো শুনতে পাচ্ছে না। তার চোখ শুধু এক জায়গাতেই আটকে আছে বাড়ির দরজার দিকে। উঠানের সামনেটাতেই সাদা কাপড়ে ঢাকা মাহবুব এর লাশ। তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো। এই সেই বাড়ি। যেখানে তার শৈশব কেটেছে। যেখান থেকে সে একদিন কাঁদতে কাঁদতে বিদায় নিয়েছিল।
আর আজ… আজ সে ফিরেছে অন্য পরিচয়ে। তবে ফিরে এমন দৃশ্য দেখতে হবে তা ভাবনাতেও ছিল না তার।
পেছন থেকে ঘোড়ার খুরের শব্দ থামলো। বাইজিদও নেমে এলো। তার উপস্থিতি যেন পুরো উঠোনের বাতাসটাকেই ভারী করে দিল।
লোকজন আরো সরে গেল।নীরবতা আরো ঘন হলো। শোকের ভারে ডুবে থাকা উঠোনটায় যেন হাওয়া পর্যন্ত ভারী হয়ে আছে। তবু সেই ভারী পরিবেশের মাঝেও এক অদ্ভুত নীরব বিস্ময় ছড়িয়ে পড়েছে। কারণ উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার দিকে না তাকিয়ে থাকা কারও পক্ষেই সম্ভব হচ্ছিল না।
বাইজিদ দাঁড়িয়ে আছে পাথরের মতো স্থির হয়ে। দু’হাত পেছনে মুষ্টিবদ্ধ, চোয়াল শক্ত, চোখে কোনো আবেগ নেই। অথচ সেই কঠিন মুখ, সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভঙ্গি, আর তার গায়ের আভিজাত্য সব মিলিয়ে তাকে যেন আরও ভয়ংকর, আরও প্রভাবশালী করে তুলেছে।
লোকজনের মধ্যে চাপা ফিসফাস চলছে। কেউ ভয়ে মাথা নিচু করে আছে, কেউ আবার আড়চোখে তাকাচ্ছে। কিন্তু বাইজিদের চোখ একবারও চারপাশে যায়নি। সে স্থির দাঁড়িয়ে আছে, যেন এই বাড়ির প্রতিটি ইটের সঙ্গে তার কোনো অদৃশ্য হিসাব জড়িয়ে আছে। ঠিক তখনই মেহেরুন্নেসা ধীরে ধীরে ভেতরে পা রাখলো।
বাড়ির উঠোনে পা পড়তেই তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। চারপাশের সবকিছু যেন একই আছে, অথচ কিছুই আগের মতো নেই। সুপরিচিত ঘরটা তার কাছে অপরিচিত বলে মনে হচ্ছে। ঠিক সেই সময় ভিড়ের ভেতর থেকে একটা কাঁপা কণ্ঠ ভেসে এলো
“মেহের…?”
মেহেরুন্নেসা মুখ তুলে তাকালো। শামসুর হাওলাদার দাঁড়িয়ে আছে একটু দূরে। মুখে অবিশ্বাস, চোখে জল টলমল করছে। তার দাড়ি আরও সাদা হয়ে গেছে, চোখের কোলে গভীর কালি। এক মুহূর্তের জন্য সে যেন স্থির হয়ে গেল।
তারপর হঠাৎ দৌড়ে এসে মেহেরুন্নেসাকে জড়িয়ে ধরলো।
“আমার মেয়ে…!”
কণ্ঠ ভেঙে গেল তার।
“আল্লাহ তোকে ফিরিয়ে দিল…”
মেহেরুন্নেসার বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠলো। সে বাবার বুকে মুখ লুকিয়ে ফেললো। এতদিনের চাপা কান্না যেন একসঙ্গে বেরিয়ে এলো।
শামসুর হাওলাদারের কাঁধ কাঁপছে। সে মেয়েকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।
“আমি ভেবেছিলাম তোকে আর কোনোদিন দেখতে পাবো না… সেদিন… সেদিন যখন শাহজাদা তোকে নিয়ে গেল… সবাই বলছিল… তোর ভাইয়ের অপরাধের জন্য… তোকে মেরে ফেলেছে হয়তো…”
তার গলা ভেঙে গেল।
“আমি প্রতিদিন দোয়া করেছি… শুধু একবার যেন তোকে দেখি…”
মেহেরুন্নেসার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো।
সে বাবার বুকের ভেতরেই কেঁদে উঠলো। চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন কেউ মুখ ফিরিয়ে নিল, কেউ চোখ মুছলো চুপিচুপি।
আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা বাইজিদ, সেই একই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইলো। তার মুখে কোনো ভাব নেই। কিন্তু তার মুষ্টিবদ্ধ হাতের আঙুলের গাঁটগুলো আরও সাদা হয়ে উঠলো। শামসুর হাওলাদারের বুক থেকে সবে মুখ তুলেছে মেহেরুন্নেসা, এমন সময় ভিড়ের ভেতর থেকে তড়িঘড়ি এগিয়ে এলো তার ফুপু মল্লিকা।
মল্লিকার চোখে পানি, কিন্তু সেই পানির আড়ালে কেমন যেন হিসেবি ঝিলিক। সে এসে এক টানে মেহেরুন্নেসার গলা জড়িয়ে ধরলো।
“ওরে আমার মেয়ে… বেঁচে আছিস… আল্লাহ্র কী দয়া!”
তার কণ্ঠে কান্না, কিন্তু সেই কান্নার ভেতরেই যেন এক ধরনের তৃপ্তি লুকানো। জমিদারবাড়ির বউ, এ পরিচয়টা যে তার ভেতরে অন্যরকম আনন্দ জাগিয়েছে, সেটা বোঝা কঠিন নয়।
মেহেরুন্নেসা বুঝলো। তবুও সে কিছু বললো না।
ধীরে ধীরে ফুপুর পিঠে হাত রেখে শুধু বললো,
“কেঁদো না ফুপু… আমি ভালো আছি।”
মল্লিকা আরও আঁকড়ে ধরলো তাকে। দূরে মিরাজ আর শিমু থমথমে মুখে বসে আছে।
চারপাশের মানুষজন কেউ চোখ মুছছে, কেউ ফিসফিস করছে, আবার কেউ কৌতূহলী চোখে দৃশ্যটা দেখছে। এইসব ভিড়, কান্না, ফিসফাস সবকিছু বাইজিদের চোখে ধরা পড়ছিল। তার চোয়াল আরও শক্ত হয়ে উঠলো। এই পরিবেশে সে স্পষ্টই অস্বস্তিতে।
এত লোকের ভিড়, এত কান্না, এত চোখের নজর সবকিছু যেন তাকে বিরক্ত করছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষুন্ন হচ্ছে মেহেরুন্নেসা কে মানুষ দেখছে। যদিও সে সম্পূর্ণ পর্দার আড়ালে। সে একবার চারপাশে চোখ বুলালো, তারপর গম্ভীর গলায় বললো,
“মেহের।”
মেহেরুন্নেসা চমকে তার দিকে তাকালো। বাইজিদের চোখে তখন বিরক্তির ছায়া।
“চলো”
মেহেরুন্নেসা বুঝলো, বাইজিদ এই ভিড় আর আবেগের ভেতর এক মুহূর্তও থাকতে চাইছে না।
সে চুপচাপ মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। মল্লিকার হাত আলতো করে ছাড়িয়ে নিল। তারপর আর একবার বাবার দিকে তাকালো। শামসুর হাওলাদারের চোখে তখনও অশ্রু। কিন্তু সে কিছু বললো না। শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো।
বাইজিদ এক পা ঘুরে দাঁড়ালো। তার চলার ভঙ্গিতে সেই আগের মতোই দৃঢ়তা। মেহেরুন্নেসা ধীরে ধীরে তার পিছু নিল। কারণ এত কিছুর পরও যে বাইজিদ তার ভাইকে চোখের দেখা টুকু দেখতে এনেছে এই ঢের। মেহেরুন্নেসা সবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, এমন সময় শামসুর হাওলাদার ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলেন। তাঁর হাঁটা কাঁপা, তবু পা থামলো না। একেবারে বাইজিদের সামনে এসে তিনি দু’হাত জোড় করলেন। চোখদুটো লাল হয়ে আছে। মুখে অদ্ভুত এক অসহায়তা।
“শাহজাদা…”
তার গলা কেঁপে উঠলো।
“আমার ছেলের পাপের শাস্তি সে পেয়েছে। আল্লাহ তার বিচার করেছে। কিন্তু দয়া করে, দয়া করে এর ভার আমার মেয়ের ওপর ফেলবেন না। সে কিছু জানতো না। সে নির্দোষ।”
কথা বলতে বলতে তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো। একজন পিতার অসহায় মিনতি যেন নিঃশব্দে পুরো উঠোন জুড়ে ছড়িয়ে পড়লো।
চারপাশের মানুষজন নিঃশব্দ। কেউ মাথা নিচু করেছে, কেউ দূরে সরে দাঁড়িয়েছে।
বাইজিদ স্থির দাঁড়িয়ে রইলো। মুখে কোনো আবেগ নেই, শুধু সেই চেনা কঠিন রেখা। তবু তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য নরম একটা ছায়া ভেসে উঠলো।
সে ধীরে ধীরে বললো
“আমার স্ত্রীর কোনো দোষ নেই।”
তারপর একটু থেমে আরও নিচু গলায় যোগ করলো
“মেহেরুন্নেসা আমার ঘরের মানুষ। সে ভালো আছে… আমার কাছে।”
শামসুর হাওলাদার মাথা নিচু করলেন। তাঁর কাঁধ কাঁপছিল। তিনি আর কিছু বলতে পারলেন না।
মেহেরুন্নেসার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। দূর থেকে বাবার কাঁপা হাত আর ভেজা চোখ দেখে তার চোখও ঝাপসা হয়ে গেল।
বাইজিদ আর এক মুহূর্ত দাঁড়ালো না। সে ঘুরে দাঁড়ালো, আর ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল সামনের দিকে। মেহেরুন্নেসা একবার বাবার দিকে তাকালো। তারপর নিঃশব্দে বাইজিদের পিছু নিল। শামসুর হাওলাদারের মাথা নিচু। কাঁধ কাঁপছে এখনও।
উঠোনের বাতাসে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এসেছে। সেই নীরবতায় বাইজিদের নিঃশ্বাসের শব্দও যেন স্পষ্ট শোনা যায়। কথাগুলো বুকের ভেতর গুমরে উঠছিল
“আমি শুধু আপনার মেয়েকে রক্ষা করতে চাই না,
আমি তাকে দুনিয়ার সবচেয়ে নিরাপদ, সবচেয়ে সুখী মানুষটা করতে চাই।
আমি তাকে ভালোবাসি… ভয়ংকর রকম ভালোবাসি…”
কিন্তু ঠোঁট নড়লো না।
কথাগুলো বুকেই আটকে রইলো।
সে শুধু একবার গভীর শ্বাস নিলো, তারপর ঘুরে দাঁড়ালো।
“কি হলো? চলো”
কণ্ঠ আগের মতোই সংযত, নিরাসক্ত। মেহেরুন্নেসা নিঃশব্দে তার পিছু নিল। তাদের দু’জনের পদশব্দ উঠোন পেরিয়ে গেটের দিকে এগোতে লাগলো। ঠিক তখনই মেহেরুন্নেসা থেমে গেল। একটা টান যেন পেছন থেকে তাকে ধরে রাখলো। তার বুকের ভেতর হঠাৎ কেঁপে উঠলো একটা চিন্তা, আম্মা।
সে ধীরে বললো
“আমি একবার আম্মার সাথে দেখা করতে চাই।”
বাইজিদের পা থেমে গেল। কিছুক্ষণ সে নীরব দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর খুব ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকালো মেহেরুন্নেসার দিকে। মেহেরুন্নেসার চোখে তখন একসাথে ভয়, আশা আর আকুতি মিশে আছে।
“শুধু একবার… দেখা করে আসি?”
বাইজিদ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলো।
তার মুখ শক্ত, কিন্তু চোখের গভীরে অদ্ভুত এক কোমলতা ভেসে উঠলো। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, সে কিছু বলতে চায়। কিন্তু কিছুই বললো না। শুধু খুব ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। মেহেরুন্নেসা অনুমতি পেয়ে ছুটলো ভিতরের দিকে। রমলা দেওয়াল হেলান দিয়ে থ মেরে বসে আছে। কি বিধ্বস্ত লাগছে তাকে। এক মূহুর্তের জন্য মেহেরুন্নেসার মনে হলো, আল্লাহ ছাড় দেয়, ছেড়ে দেয় না। কাছে গিয়ে বসতেই রমলা হুহু করে কেঁদে দিল মেয়েকে জড়িয়ে ধরে। মেহেরুন্নেসাও জন্মদাত্রীর কান্না দেখে নিজেকে আটকাতে পারলো না। রমলা কেঁদে কেঁদে বলল
“কি আজাব পড়লো রে মা আমার সংসারে? ক’দিন আগে বউটাকে কে মেরে দিল। আজ আমার সোনার টুকরো টাকে”
মেহেরুন্নেসা চোখের পানি মুছলো। তার সময় অল্প। নয়তো বাইজিদ রেগে যাবে। সে উঠতে নিলে রমলা আরো জাপটে ধরলো। শাহজাদার সাথে নিজ কন্যার বিয়ের খবর সেই বিয়ের দিনই পেয়েছিল। গোটা রাজ্যে উৎসব হয়েছিল কিনা? মেয়েকে বুকে নিয়ে বলল
“আজকের রাতটা আমার কাছে থেকে যা না মা। শাহজাদা কে বল, কাল চলে যাস। তোর মা যে বড্ড একা হয়ে গেছে রে মা”
মেহেরুন্নেসা মৃদু মাথা ঝাকালো।
“থাকার জো নেই আম্মা। আমি আবার আসবো। আজ বিদায় দাও”
মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে মেহেরুন্নেসা বাইরে আসে। বাইজিদ প্রহরী কে ইশারা দিতেই, প্রহরী একটা লাল পুটলা এনে শামসুর হাওলাদার কে দিলো। শামসুর হাওলাদার অবাক হয়ে বাইজিদ এর দিকে তাকাতেই বাইজিদ বলল
“কিছু স্বর্নমুদ্রা আছে ওতে। এটা দিয়ে ওর দাফন কার্য এবং মিলাদ-দোয়া খয়রাত শেষ করবেন”
শামসুর হাওলাদার আর কোনো কথা বলল না। মেহেরুন্নেসার যাওয়ার দিকে ছলছল চোখে তাকিয়ে রইলো। শাহজাদা কে বলার সাহস হয় না মেয়েটাকে আজ রেখে যান। কতদিন দেখিনি মেয়েটাকে। যদি আবার রেগে গিয়ে গর্দান নেন। তবে জমিদার পুত্র বড় বিচক্ষণ পুরুষ। তার বুঝতে বাকি নেই শামসুর এর অশ্রুসিক্ত চোখের ভাষা। তবে সে এটা করতে পারবে না। মেহেরুন্নেসা কে ছাড়া তার একটা রাতও চলবে না। মেহেরুন্নেসার সাথে নিজেও ঘোড়ার গাড়িতে উঠে বসলো। চাকার ওপর লোহার বানানো খোলস টার দুই পাশে জানালা। তাতে ঝুলছে দুইটা ছোট্ট হারিকেন। ভিতরে লাল মখমলের কার্পেট বিছানো। তার দুইপাশে গোল দুইটা কুশন। দুজনে উঠে বসলো। সামনে দুইটা কালো ঘোড়া। আর ঘোড়া চালনা কারির বসার জায়গা টুকুও লোহার ইস্পাতে করা।
অশ্ববহরটা আবার ধীরে ধীরে বাড়ির উঠোন ছেড়ে বেরিয়ে এলো। ঘোড়ার গাড়ির চাকা যখন মাটির পথ ধরে গড়াতে লাগলো, তখন মেহেরুন্নেসা জানালার পাশে বসে নিঃশব্দে বাইরে তাকিয়ে রইলো। চোখের সামনে ভেসে উঠছিল শৈশবের উঠোন, আমগাছের ছায়া, মায়ের হাসি সবকিছু। তার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো।
সে ঠোঁট চেপে ধরে কান্না আটকে রাখার চেষ্টা করলো। কিন্তু পারলো না। ধীরে ধীরে চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো। মুহূর্তের মধ্যেই সে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে উঠলো।
কাঁধ কাঁপছে। বুকের ভেতরটা হাহাকার করছে।
বাইজিদ চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে ছিল। প্রথমে কিছু বললো না। তারপর খুব ধীরে হাত বাড়িয়ে মেহেরুন্নেসার মাথাটা নিজের কাঁধের দিকে টেনে নিল। তার হাতটা নরম, অথচ দৃঢ়।
“কেঁদো না…”
গলায় অদ্ভুত কোমলতা। মেহেরুন্নেসা আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। সে মুখ গুঁজে দিল বাইজিদের বুকে। দু’হাত দিয়ে তার জামা আঁকড়ে ধরলো, যেন কোনোভাবে নিজেকে ধরে রাখতে চাইছে।
“আমার খুব কষ্ট হচ্ছে…”
তার গলা ভেঙে যাচ্ছে কান্নায়।
“ আমার বাড়ি… আব্বু… সবকিছু… আমি…”
কথাগুলো ঠিকমতো বেরোচ্ছে না। শুধু কাঁপা কাঁপা শব্দ। বাইজিদ তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। চুলের ওপর আঙুল থেমে থেমে ঘুরতে লাগলো। তার দৃষ্টি জানালার বাইরে, কিন্তু মন যেন পুরোপুরি মেহেরুন্নেসার কান্নায় ডুবে আছে।
মেহেরুন্নেসা মাথা না তুলেই ফিসফিস করে বললো,
“আবার… আবার আমাকে নিয়ে আসবেন এখানে?”
কথাটার ভেতর অনুরোধ আছে, ভয় আছে, আর অদ্ভুত এক ভরসাও। বাইজিদ নিচের দিকে তাকালো। তার চোখে কঠিনতা নেই আর। শুধু একটা নরম ছায়া। সে খুব ধীরে বললো,
“আনবো।”
তারপর মাথায় চুমু খেয়ে আরও নিচু স্বরে যোগ করলো,
“যতবার তুমি চাইবে, ততবারই আনবো। তাও কেঁদো না”
কথাটা শুনেই মেহেরুন্নেসার বুকের ভেতরটা আরও ভেঙে গেল। সে বাইজিদের বুকে আরও শক্ত করে মুখ লুকিয়ে রাখলো। গাড়ির বাইরে তখন ধুলোমাখা পথ এগিয়ে যাচ্ছে সামনে। বাইজিদ এখনো বুকের সাথে জাপটে ধরে আছে মেহের কে। যা তাদের দু’জনকেই আরও গভীরভাবে জড়িয়ে দিচ্ছে।
মহলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সূর্যের আলো ঢলে পড়েছে পশ্চিম আকাশে। লম্বা ছায়া পড়ে আছে উঠোন জুড়ে। অশ্ববহর থামতেই নিস্তব্ধতা যেন আরও ভারী হয়ে উঠলো। গাড়ি থেকে নামার সময় মেহেরুন্নেসার পা কাঁপছিল। সারা দিনের মানসিক ধাক্কা, কান্না আর ক্লান্তি সব মিলিয়ে শরীরটা ভেঙে পড়ার উপক্রম। তবু নিজেকে সামলে ধীরে ধীরে অন্দরমহলের দিকে পা বাড়ালো সে।
অন্দরে ঢুকতেই বুকটা হঠাৎ থমকে গেল। সামনের দিকের বারান্দায় রত্নপ্রভা বসে আছে।
চুল বাঁধা, পরনে সাদামাটা পোশাক, মুখে কোনো কান্নার ছাপ নেই। চোখে না শোক, না আতঙ্ক যেন কিছুই ঘটেনি। বরং তার মুখে অদ্ভুত এক স্থিরতা, যেন অনেক ভেবে নেওয়া এক নিঃশব্দ সিদ্ধান্ত।
মেহেরুন্নেসার ভেতরটা কেঁপে উঠলো।
যতই হোক… রত্নপ্রভা তো মাহবুবের স্ত্রী ছিল।
তার স্বামী মারা গেছে অথচ তার চোখে জল নেই, মুখে শোকের ছায়া নেই, বুক ভেঙে যাওয়ার কোনো চিহ্ন নেই। এই অস্বাভাবিক শান্ত মুখটাই যেন আরও বেশি ভয়ংকর লাগলো মেহেরুন্নেসার কাছে।
তার বুকের ভেতর একটা চিন্তা ধীরে ধীরে শক্ত হতে লাগলো। গত রাতে জঙ্গলে… সে নিজ চোখে দেখেছে মাহবুব আর রত্নপ্রভাকে একসাথে দাঁড়িয়ে থাকতে। তাদের গলায় নিচু স্বরে কথা… সেই গোপন সাক্ষাৎ… আর আজ মাহবুব নেই।
মেহেরুন্নেসার আঙুলগুলো অনিচ্ছায় মুঠো হয়ে গেল।
মনে মনে সে নিশ্চিত হয়ে গেল, এটা কাকতালীয় নয়। মাহবুবকে কেউ হত্যা করেছে…আর সেই ‘কেউ’ রত্নপ্রভা ছাড়া আর কেউ নয়। রত্নপ্রভার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মেহেরুন্নেসার বুকের ভেতর জমাট বাঁধা সন্দেহটা আরও ভারী হয়ে উঠলো। কিন্তু মুখে সে কিছুই বললো না।
শুধু নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলো, আর মনে মনে ভাবলো, সত্যিটা একদিন তাকে জানতেই হবে।
গোসল সেরে বেরোনোর পরও মনটা যেন পাথরের মতো ভার হয়ে আছে মেহেরুন্নেসার। চোখ লাল, মাথা নিচু, পা দুটো টেনে টেনে সে হেঁশেলের দিকে এগোল। হেঁশেলের ভেতর তখন আধো-আলো। কোণের প্রদীপের আলোয় ধোঁয়া আর বাষ্প মিশে একধরনের কুয়াশা তৈরি করেছে। রান্নার হাঁড়িগুলো এখনো গরম। মেঝেতে তামার থালা সাজানো। মেহেরুন্নেসা চুপচাপ বাইজিদের জন্য খাবার নিতে এগোল। হাত বাড়িয়ে পোলাওয়ের বড় হাঁড়িটা টানতেই তার চোখ আটকে গেল। পোলাওয়ের ওপর, চালের ফাঁকে যেন কিছু একটা আটকে আছে। ভাজ করা ছোট্ট একটা কাগজ। মেহেরুন্নেসার চোখ সরু হয়ে গেল। সে খুব ধীরে চারপাশে তাকালো। হেঁশেলে এই মুহূর্তে আর কেউ নেই। কেউ নেই।
তবু মনে হলো কেউ যেন কোথাও থেকে তাকে দেখছে। সে কাঁপা হাতে কাগজটা তুলে নিল। ধীরে ধীরে ভাঁজ খুললো।
ভেতরে কয়েকটা শব্দ
“রাতে সিঁড়িঘরে অপেক্ষা করো।
সব কিছু বলবো তোমায়, বেগম।
— মিরান।”
মুহূর্তের জন্য মেহেরুন্নেসার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল।
মিরান? কিভাবে? কখন? সে তাড়াতাড়ি মাথা তুলে চারপাশে তাকালো। হেঁশেলের দরজা, জানালা, মেঝের কোণ, ছায়া কোথাও কাউকে দেখা গেল না। মিরান তো কারাগারে। এই কাগজটা হাওয়ায় আসেনি। কেউ রেখে গেছে।
খুব কাছ থেকে।
মেহেরুন্নেসা চট করে কাগজের টুকরা টা লুকিয়ে ফেলল। খাবারের থালা তুলে হাঁটা দিল কক্ষের দিকে। রোজ রোজ বাইজিদ এর চোখ ফাঁকি দিয়ে গেলে সন্দেহ করবে সে। আজ যাওয়া সম্ভব নয় কোনো ভাবেই। দরজা টা খোলাই ছিল। খাবার নিয়ে ঢুকতেই মেহেরুন্নেসার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো। বাইজিদ দামী শেরওয়ানি-পায়জামা পরে আয়নার সামনে চুল ঠিক করছে। যেন দূরে কোথাও ভ্রমণে যাবে। মেহেরুন্নেসা থালা টা রেখে এগিয়ে গেলো বাইজিদ এর কাছে। বাইজিদ মৃদু হেসে বলল
“আগামী কাল প্রতিবেশি রাজ্যে বণিক সভা। সেখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বণিক, শেখ, সুফিগণ থাকবে। এখন রওনা না হলে সকালের মধ্যে পৌঁছানো যাবে না”
মেহেরুন্নেসার কপাল কুচকে আসে
“কিন্তু রাতে তো….”
বাইজিদ মেহেরুন্নেসার নরম গাল আগলে নেয় নিজের পুরুষালী হাতে
“হ্যা জানি আমি, তবে জরুরি ভ্রমণে আমরা গোপন সুড়ঙ্গ পথ ব্যাবহার করি। যেটা বিপদ সীমার বাইরে গিয়ে ঠেকেছে। তুমি চিন্তা করো না। আমি একা নয়, সৈনিক দল সহ ইংরেজ বণিকদের দল ও যাচ্ছে আমাদের সাথে।”
মেহেরুন্নেসা মাথা নিচু করে বলল
“খেয়ে যান”
বাইজিদ এর ইচ্ছা ছিল না খাওয়ার। তবে মেহেরুন্নেসা সারাদিন কিছু খায়নি। ওকে খাওয়াতেই বসলো মূলত। হাত ধুয়ে প্রথম লোকমা তুলে বাড়িয়ে দিল মেহের এর দিকে। মেহেরুন্নেসা বাচ্চাদের মতো তাকালো তার দিকে। মুখে নিলো খাবার টুকু। বাইজিদ বুঝলো আজ রাতটা তার স্ত্রীর পাশে থাকা উচিত ছিল। যতই খারাপ হোক, মাহবুব তার ভাই ছিল। এমন কি তার কথা চিন্তা করে ও বাড়িতে থাকার আবদার ও করেনি মেহের। কিন্তু কিছু করার নেই। মেহেরুন্নেসা কে খাইয়ে, পাতে থাকা অবশিষ্ট টুকু নিজে খেয়ে নিল বাইজিদ। স্ত্রীর থেকে বিদায় নিয়ে বেড়িয়ে গেল।
মেহেরুন্নেসা গভীর ভাবনায়। এত নিশ্চয়তা দিয়ে মিরান তাকে যেতে বলল। অর্থাৎ সে জানতো বাইজিদ আজ প্রাসাদে থাকবে না। বিলম্ব না করে বোরখা জড়িয়ে, নিকাব ভালো করে বেধে চলে গেলো সিঁড়িঘরে। মহলের বড় সিঁড়ি টার নিচের ঘর হওয়ায় ঘরটার নাম সিড়িঘর রাখা হয়েছে। দরজা টা কড়কড় শব্দে খুলতেই মেহেরুন্নেসা দেখলো পাশে ছোট্ট একটা হারিকেন জ্বালিয়ে মিরান বসে আছে। প্রথম দেখাতেই বুকটা ধক করে উঠলো মেহেরুন্নেসার। মিরান হাসলো
“ভয় পেলে বেগম?”
মেহেরুন্নেসা উত্তর দিল না। মিরান এর গায়ে আজ কারাগারের ময়লা পোষাক নেই। পরিষ্কার কালো পোষাক তার গায়ে। গায়েও ধুলোবালি লোগে নেই। মেহেরুন্নেসা আপাদমস্তক দেখে বলল
“কারাগারে তোমায় দেখে বোঝাই যায়নি তুমি এত সুন্দর”
হাসলো মিরান।
“বেগম! তোমার রুপের কাছে তা নেহাৎ নস্যি। তবে আমি হলফ করে বলতে পারি। আমি কখনো খু’ন করতে রুপ ব্যাবহার করিনি। তোমার মত”
মেহেরুন্নেসা চকিতে তাকালো মিরান এর দিকে। মিরান হো হো করে হেসে বলল
“তোমায় আশ্চর্য করে দিতে আমার বড় ভালো লাগে। চলো, তোমাকে আজ একটা জায়গা নিয়ে যাই। সব উত্তর দিব আজ তোমায়। আহহ আফসোস”
বলেই ঠোঁট সরু করে চুক চুল শব্দ করলো মিরান। মেহেরুন্নেসা বলল
“আফসোস কেন?”
“মহলের কত দরদী লোকের মুখোশ বেড়িয়ে আসবে তোমার সামনে। যা কল্পনাও করোনি জিবনে। চলো। এই জায়গা নিরাপদ নয়।”
পরবর্তী পর্বে বহু রহস্য ক্লিয়ার হবে। জানতে পারবেন অনেক কিছু। আপাতত এটায় ৩k+ রিয়্যাক্ট করে দিন। আর কেমন হয়েছে বলিয়েন।
Share On:
TAGS: জান্নাতুল ফেরদৌস, নূর এ সাহাবাদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ২
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১৮
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৩
-
খাঁচায় বন্দী ফুল ৪২ এর প্রথমাংশ
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৮
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৫৪
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৮ এর প্রথমাংশ
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৯
-
খাঁচায় বন্দী ফুল ৩৮ এর শেষাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৫