Golpo romantic golpo প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা

প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৪৪


প্রণয়ের_মায়াতৃষ্ণা ||৪৪||

ফারজানারহমানসেতু

রোজাকে না পেয়ে তূর্জানের হাত-পা অলরেডি কাপা শুরু হয়ে গেছে। এমনিতেই রোজাকে নিয়ে সাবধানে থাকতে বলেছেন তাজারুল নেওয়াজ। রেজাউল মির্জা আর তার স্ত্রী যে খু’ন হয়েছিলো এটা অনেক আগেই নিশ্চিত ছিলেন । ইনভেস্টিগেশন টিমকে লাগিয়েছিলেন, রহস্য খুজে বের করার জন্য। অবশেষে ধরা পড়ল, কেউ একজন হয়তো শত্রুতা মেটাতে রেজাউল মির্জার বাড়িতে আগুন লাগায়। যেন পরে ছলেবলে সম্পত্তি হাতাতে পারে। কিন্তু সেদিন রোজা আর রাফিয়া বেচে যায়। একথা ওদের কানে পৌঁছে গেছে।

এত ভাবনার মাঝেও মস্তিস্ক রোজাকে খুজে যাচ্ছে। কি অদ্ভুত তাইনা? ভালোবাসা বুঝি একেই বলে। তোমার মস্তিস্কে হাজার ভাবনার মাঝেও তার ভাবনার সক্রিয়শীল। এদিকে রোজাকে না পেয়েই মিরান কে কল করে বলে দিয়েছে। মিরান ও হয়তো চলে আসবে। রোজাকে না পেয়ে যখনি বেহালদশায় পরেছে, চিৎকার করে বিধাতার কাছে আর্জি জানাতে ইচ্ছা করছে, ওমনি চোখ গেলো সামনে থাকা এক মেয়ের পানে। গায়ে গোলাপি একখানা শাড়ি জড়ানো। উহু মেয়ে নয়, তূর্জান নেওয়াজের কলিজা। যার কথা ভেবেই তূর্জানের এই অবস্থা হয়ে গেছে।

তূর্জানের হৃদপিন্ড যেন আগের থেকে স্বাভাবিক হচ্ছে। হয়তো, আরেকটু হলে কি হতো তূর্জান নিজেও জানে না। অথচ রোজা দিব্বি ওখানে দাড়িয়ে বাচ্চাদের হাওয়াই মিঠাই খাওয়াচ্ছে। নিজের হাতেও দুটো রেখে দিয়েছে। হাসিখুশি মুখ নিয়ে হেলছে-দুলছে।

তূর্জানের আর তড় সইলো না। যদি হৃদপিন্ড আবার অস্বাভাবিক হয়ে যায়। উহু, মানুষ নিজের চিন্তা আগে করে। তাইতো দৌড়ে গিয়ে একঝাটকায় রোজাকে নিজের দিকে ফেরালো। রোজা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার ঠাই হলো তূর্জান নেওয়াজের বক্ষস্থলে। হঠাৎ এমন আগমনে ভয় পেলেও রোজা নিজেকে সামলে নিয়েছে; প্রিয় পুরুষের চেনা গন্ধ পেয়ে। তূর্জান যেন রোজাকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিতে উদ্দত হয়েছে। যদি হারিয়ে যায়? রোজাও কিছু বলছে না। এতদিন পর প্রিয় পুরুষের আলিঙ্গনে থাকতে তারও ভালোই লাগছে। তবে ভালো লাগা বেশিক্ষন স্থায়ী হলো না। রোজা নিজের কাধে ঠান্ডা অনুভব করল। তূর্জানের চোখের পানি। তূর্জান কাদছে! কিন্তু কেন? হঠাৎ কি হলো?

রোজা তূর্জানকে সোজা করে দাড় করাতে গেলেও। তূর্জান রোজাকে একচুল পরিমান ছাড়লো না। রোজা উদিগ্ন হয়ে তূর্জানের পিঠে হাত দিয়ে বলল, “ ক, কি হয়েছে, আপনার? কাদছেন কেন? “

অপরপাশের উত্তর নেই। কিন্তু রোজার কাধে ছোট্ট জলকণা পরেই যাচ্ছে। রোজা তূর্জানের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চেয়ে বলল, “ কি হয়েছে বলুন? এমন করছেন কেন? “

“ ভীষণ কষ্ট হচ্ছে! একটু এভাবে থাকি। একটু আগে মনে হচ্ছিলো মরে যাবো। “

“ কি বলছেন এসব? এমন কথাই বা বলছেন কেন? “

“ আমার থেকে দূরে যাওয়ার আগে, আমাকে শেষ করে যাবি। নয়তো আমি বাচবো না। একদম বাচতে চাইবো না। “

“ আমি কোথাও যাচ্ছি না। আমি তো আজীবন আপনার বুকে ঘুমাতে চাই। আমি যে আপনার মায়ায় পরে গেছি, কিভাবে ছেড়ে যাবো বলুন ? মানুষ মায়াকে কখনো ছাড়তে পারে? পারে না তো। তাহলে আমি পুরো আপনাকে কিভাবে ছেড়ে যাবো? আমার তো ওই দিন শেষে একটু তূর্জান নেওয়াজের বক্ষস্থলে ঠাই হলেই যথেষ্ট।আর কিছুই চাইনা। লাগবে না আর কিছু। “ তবে একথা আর বলা হলো না।

তার আগেই কেউ একজন চেচিয়ে বলে উঠল, “ভাইয়া সাবধান। রোজা…

বলার সাথে সাথেই তূর্জান চোখ তুলে তাকালো। রোজাকে একঝাটকায় অন্য পাশে ঘুরিয়ে দিল। নিজে রোজার পাশে দাড়াল। ধারালো কোনো এক অস্ত্রের আঘাতে তূর্জানের ডান হাতের কিছু অংশ কেটে ফিনকি দিয়ে রক্তপাত হতে লাগল। তাও এখনো রোজা তূর্জানের বাহুডোরে আবদ্ধ হয়ে আছে। তূর্জানের হাতে চোখ পরতেই জীবন যায় যায় অবস্থা। কোনো রকম উচ্চারণ করল,
” র রক্ত। “

মিরান দৌড়ে আসতেই তূর্জান রোজাকে মিরানের কাছে দিয়ে দৌড়ে গেলো। রোজা তূর্জানের হাতে রক্ত দেখেই কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। রক্তে ফোবিয়া থাকায় কেমন চারিপাশ অদ্ভুত লাগছে।নিজেকে আর আশেপাশে বোধগম্য হচ্ছে না। ততক্ষনে তূর্জান ভিড়ের মাঝেই লোকটাকে বেধম মারছে। লোকটার বেগতিক অবস্থা দেখে মিরান দৌড়ে গেল। সাথে রোজাও গেল। মিরান সিক্রেট অফ ইনভেস্টিগেশন টিমের একজন সদস্য।

সেই রোজার বাবার মৃত্যুর রহস্য বের করছিল। মিরান সব জেনে গেছে, একথা লোকটা জেনে যাওয়ায় আজকেই রোজার উপর আক্রমণ করেছে। রাফিয়া শক্ত ধাচের জানায়, আর রোজা’ই এখন বাড়িতে সকলের চোখের মনি হওয়ায় আঘাত টা রোজার উপর করেছে। তূর্জানের হাত থেকে রক্ত এখনো পরছে। শার্টের হাতা রক্তে জবজবে। মিরানের টিম থেকে লোক
চলে আসবে। কিন্তু তূর্জানকে থামাতে হবে।

তূর্জানও নেতিয়ে পড়ছে ততক্ষনে। হয়তো সেন্সলেস হয়ে যাবে। তার আগেই রোজা ধপাস করে রাস্তায় নেতিয়ে পড়ল। একবার উচ্চারণ করার চেষ্টা করল, “ ভালোবাসি আপনাকে। ভীষণ ভালোবাসি….

তবে অবচেতন মানুষের কথা কি আর শোনা যায়। নেতিয়ে পড়তেই মিরান দৌড়ে গেল বোনের কাছে। কাকে রেখে কাকে ধরবে। এই টিমের লোকগুলোও না, বিরক্তিকর। সময় মতো এরা জীবনেও পৌছায় না। তবে রোজাকে ধরেই তূর্জানকে ডাক দিলো মিরান। “ ভাইয়া বনু…

শব্দ কানে পৌছাতেই লোকটাকে ছেড়ে দিয়ে দৌড়ে রোজার কাছে আসার চেষ্টা করল। লোকটাকে আর একটু মারলে আজকেই হয়তো তার শেষদিন হতো। তূর্জান রোজার কাছে হয়তো আসতে পারতো। কিন্তু তার আগেই মস্তিষ্ক দুর্বল হয়ে গেলো। রোজার পর্যন্ত আর আসা হলো না।


হসপিটালের করিডোরে এমনিতেই জনমানবের ভীড়। চারিপাশে রোগীদের হাড় কাপানো কাহিনী। তার মাঝেই অপরেশন থিয়েটারে চলছে তূর্জান নেওয়াজের চিকিৎসা। হাতে অস্ত্রের আঘাত, তারউপর লোকটাকে মারায় হাতের পুরো ব্যালেন্স শেষ।
অন্যদিকে এখনো রোজা সেন্সলেস হয়ে আছে। হঠাৎ এমন ঘটনায় পুরো নেওয়াজ বাড়ি ছুটে এসেছে। তানিয়া নেওয়াজ যেন পাথর হয়ে গেছেন। কান্না করার শক্তি ফুরিয়েছে তার। পাশেই রাফিয়া তুবা রেহেনা নেওয়াজ বসে আছেন।

তাজারুল নেওয়াজ আর মোস্তফা নেওয়াজ দুদিকে ছুটছে। মিরান আর রাফেজ এখনো হসপিটালে আসেনি। বাড়ির লোক আসার পরেই চলে গেছে।

একজন নার্স এসে জানালো রোজার জ্ঞান ফিরেছে। তবে কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে। তানিয়া নেওয়াজ দৌড়ে গেলেন, যেতেই রোজাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দিলেন। রোজাও ফুফিয়ে উঠল। এইতো মা হারা মেয়ে মা পেয়েছে। রোজা কান্নাভেজা কণ্ঠে আওড়াল, “ আম্মু, উনি কোথায়? “

“ আছে তো আম্মু। “

রোজা হয়তো কিছু বলতে চাইলো, কিন্তু বললো না। একেএকে সবাই এসে রোজার সঙ্গে দেখা করে গেল। এলোনা কেবল তূর্জান। দিন গড়িয়ে রাত হলো, রাত গড়িয়ে ধরনীতে আবার সূর্যের দেখা মিলল। এতক্ষনে তূর্জান একবারও রোজার সাথে দেখা করেনি। দেখা করবেই বা কিভাবে? সে যে এখনো অবচেতন। যদিও ডাক্তার বলেছে, আউট অফ ডেঞ্জার। তবে জ্ঞান ফেরেনি । আজকে সকালে জ্ঞান ফিরেছে , সবাই দেখা করলেও রোজাকে তূর্জানের কাছে কেউ যেতে দেয়নি।

যদি তাকে দেখে আবার অসুস্থ হয়ে পড়ে। তূর্জানকেও বলেছে, রোজার কন্ডিশন। যদিও বলেনি, জোর করে শুনেছে। জ্ঞান ফেরার পরেই তার প্রথম বাক্য ছিল প্রেয়সীকে নিয়ে। তবে রোজার কথা ভেবে নিজের বুকেই পাথর বেধে রেখেছে। বড্ডো ভালোবাসে যে তাকে ; রোজার অসুস্থতার কথা ভেবেই আর একবারও দেখা করতে চায়নি।

রোজা যেতে চাইলেও রাফিয়া আর তুবা এটা ওটা বুঝিয়ে রেখেছে। তবে রোজা যে আর থাকতে পারছে না। অভ্যাসগত কিছু রেখে থাকা কি যায়?

রোজা ধীর পায়ে নিজের কেবিন থেকে বেরোলো। গন্তব্য তূর্জানের কেবিন। ভিআইপি কেবিনে রাখা হয়েছে তাকে। কাচের দরজার এপাশ থেকে একবার তাকালো, কেমন ফ্যাকাশে হয়ে আছে। রোজাকে বাচাতে নিজের জানের পরোয়া করে নি একবার। রোজা নিশ্চয় জীবনে কোনো পূর্ণের কাজ করেছে, নয়তো এমন মানুষ কয়জন পায়।

রোজা কেবিনের ভিতরে গিয়ে আস্তে করে দরজা বন্ধ করে দিল। মন চাইছে দৌড়ে গিয়ে তূর্জানের বুকে হামলে পরে কান্না করতে। কেন এতো ভালোবাসে রোজাকে? কেন এতো ভালোবাসতে হবে? একটু কি কম ভালোবাসা যায় না? কেবিনে ঢুকেই ফুফিয়ে উঠল। তবে অতিসর্পনে, নিজের কান্নাটুকু গিলে নিলো। যদি উঠে পরে ঘুম থেকে।

বড্ডো অভিমানী রোজা, কেন জ্ঞান ফেরার পর রোজার সাথে দেখা করতে চায়নি? রোজাকে ভালোবাসে না। একটুও না। নয়তো রোজা থাকতে পারছে না, অথচ তূর্জান হাই পাওয়ারের ঘুমের ওষুধ খেয়ে দিব্বি ঘুমাচ্ছে। রোজাও দেখা করে চলে যাবে ঘুমের মধ্যে। জানতে দেবে না, সে এসেছিলো। অথচ মন বলছে, সামনে গিয়ে একবার ছুঁয়ে দেখতে। যদি ভালো নাই বাসে তবে জীবনের পরোয়া করল না কেন?

মনের ইচ্ছেতেই সামনে পা বাড়ালো। বেডের একপাশে বসে পড়ল।অতি যত্নে একবার ছুঁয়ে দিল, তূর্জানের কপাল। এই এসির মধ্যে থেকেও ঘেমে কেমন জবজবে হয়ে আছে। উঠে আসতে গিয়েও কি ভেবে সত্যিই হামলে পরলো তূর্জানের বুকে। দুহাতে অতিযত্নে আলিঙ্গন করল তূর্জানকে।

বুকের উপর মাথা রেখে আওড়াতে লাগল,
“ ভালোবাসি তো আপনাকে, ভীষণ ভালোবাসি। আপনার ঘুম কে আমার বড্ডো হিংসা হচ্ছে, ঘুমের ঘোরে নিশ্চই আপনার মস্তিস্কে আমি নেই।
ওঠুন না, বলছি তো ভালোবাসি, দশবছর আগেও ভালোবাসতাম এখনো বাসি, আজীবন ভালোবেসে যাবো। আমার মস্তিস্কে তূর্জান নেওয়াজ ছিলো তো, শুধু চিনতে পারিনি। ওই ঝাপসা হয়ে আমার স্বপ্নে একজন আমার পিছু নিয়েছিলো। জানেন তো এখন সে আমার পিছু নেয় না। আমার সাথে চলে।

একটু থেমে আবার বলল, “ আপনি যেদিন বাড়িতে আসলেন, জানেন আপনাকে খুব চেনা চেনা লাগছিলো, মনে হচ্ছিলো কাছের কেউ। আপনাকে সেইদিনই ভালোবেসে ফেলেছিলাম। কিন্তু প্রকাশ করিনি, আমি তো আমার ডাইরিতে লিখে রাখা ওই পুরুষের খোজ করছিলাম। কিন্তু কে জানতো, আপনি সেই পুরুষ? আমি আমার অজান্তেই বারবার ভালোবেসেছি, কিন্তু প্রত্যেকবার ওই তূর্জান নেওয়াজ কেই। আমি তো চেয়েছিলাম আপনি আমায় বুঝে নিন, আমি আগের রোজায় ফিরেছি। আপনি বুঝেও নিলেন, অথচ আমাকে বুঝতে দিলেন না। সেদিন আমি ইচ্ছেতেই আপনাকে বিয়ে করেছি। ভালোবাসি তো, মানুষ সুযোগ কি বারবার পায়? পায় না তো, তাই আমি সুযোগ হাতছাড়া করিনি। আপনি তো এখন জানেন, আপনি আমার অভ্যাস, তাহলে এখন কেন, জ্ঞান ফেরার পরেও আমার সাথে দেখা করলেন না। আমিও আপনার সাথে কথা বলবো না। আমার আরও কথা বলার আছে, কিন্তু বলবো না। আমি অবচেতন ঘুমের মানুষের সাথে কথা বলতে পারছি না। যে আমার কথা শুনছে না। আমার তূর্জান নেওয়াজকে লাগবে, যে আমার প্রতিটা কথা, আমার চোখের দিকে তাকিয়ে শুনবে, আমার কথাতে বিরক্ত হবে না। ফিরে আসুন না তূর্জান নেওয়াজ হয়ে, আপনাকে আমার ভালো লাগছে না। একটুও না। “

বলেই তূর্জানের কপালে নিজের অধর ছুইয়ে দিল। তারপরে নাকে,ততক্ষনে নার্স কেবিনে চলে এসেছে। আসতেই তিনি বললো, “ আরে কি করছেন? রোগীকে এভাবে ঝাপটে আছেন কেন?”

নার্সের কথায় রোজা নিজের জ্ঞানে ফিরতেই লজ্জায় পড়ে গেল। ইশ এক্ষুনি আবেগে পরে তূর্জানে অধর ছুইয়ে দিচ্ছিলো। বেহায়া পুরুষ, ঘুমের মাঝেও রোজাকে নেশায় ফেলে দেয়। রোজা ওঠার আগেই পরিচিত কণ্ঠের কেউ বলল, “ ধূর, আপনি আসার আর সময় পেলেন না? এখনই আসতে হলো? আপনার টাইম সেন্স বড্ডো খারাপ। “

কণ্ঠের মালিক তূর্জান নেওয়াজ। রোজা তূর্জানের দিকে চোখ তুলে তাকাতেই দেখল, রোজার দিকে তাকিয়ে আছে। রোজার লজ্জায় মরিমরি অবস্থা। এই লোক এতক্ষন সব কথা শুনছিলো। রোজা উঠে যেতে চেয়ে বলল, “ আমি আসছি। “

তবে ওঠার আগেই বা হাতে কোমড়ে পেচিয়ে ধরল । একবার তাকাতেই যেতে নিষেধ করল।
তূর্জানের দিকে তাকাতে পারছে না রোজা। কতকথা বলে ফেলেছে নিজেও জানে না। রোজা বুকে মাথা রেখেই অন্য পাশে তাকিয়ে রইলো। নার্স বা তূর্জানের দিকে তাকানোর মতো পরিস্থিতিই নেই ওর কাছে।

নার্স যেন বিরাট একটা সুযোগ পেয়েছে, এ্যাহ তাকে আনপানচুয়াল বলা, আর এদিকে বউ পাশের কেবিনে রেখে অন্য মেয়েকে বুকে নিয়ে ঘুমানো। বাংলাদেশ পরকীয়ায় শেষ!

আর এই সুযোগে কথা না শুনালে হয়। বাংলাদেশ মানেই অন্যের পিছনে লাগা। যা ভাবা তাই কাজ,
এগিয়ে এসে তূর্জানকে বলল, “ এতক্ষন তো মিসেস নেওয়াজের জন্য পাগল হয়ে যাচ্ছিলেন, এই মেয়ে আবার কোথা থেকে আসলো। আর এই মেয়ে কেমন অন্যের হাজবেন্ডের বুকে মাথা রেখে পরে আছে। পরকীয়া করবেন ভালো কথা, হসপিটালে কেন? পুরুষ মানুষ, একবার বউ বউ করবে, আবার পরকীয়া করে বেড়াবে! “

বলতেই রোজা যেন আকাশ থেকে পরল। ইশ রোজা ভেবেছিলো, তূর্জান তার কথা ভুলে গেছে। আর এখন শুনছে, জ্ঞান ফিরেই তার কথা বলেছে। তূর্জান কিছু বলতে যাবে তার আগেই

নার্স আবার বলল, “ এই মেয়ে, ওঠো। পরকীয়া করো বলে কি মানুষের প্রতি দয়াও নেই? অসুস্থ লোকের বুকে মাথা রেখেছো কেন? শুনেছি, হাজবেন্ডের চেয়ে পরকীয়ার লোকের প্রতি মানুষ বেশি যত্নশীল হয়, তো তুমি তো মনে হচ্ছে কোনোদিকই না। দাড়াও মিসেস নেওয়াজকে ডাকছি। “

রোজা এবার লজ্জা আর তূর্জানকে ঠেলে উঠে বসল। নয়তো আরো কি কি শুনতে হবে কে জানে? উঠে বসতেই, নার্স বলল, “আপনি যত সম্ভব মিসেস নেওয়াজ তাইতো? “

রোজা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল। লজ্জা এবার নার্সই যেন বেশি পেল। কোনোমতে একটা হাসি দিলো। রোজা মাথা নিচু করে আছে দেখে তূর্জান বলল, “ আপনার হাসি হচ্ছে না। তাই জোর করে হাসার প্রয়োজন নেই। যা করতে এসেছেন, ফাস্ট করে বের হন। আমার বউ লজ্জা পাচ্ছে। “

নার্স এমনিতেই তো ভুলভাল বকে ফেলেছে। আবার কা বলবে? তূর্জানের স্যালাইন চেঞ্জ করে দিয়ে চলে গেল। যাওয়ার আগে নিজেই বিরবির করলো, “ আমি যে ভুলভাল বকি, এইটার প্রমান আবার পেলাম। নিজের হাজবেন্ডের পরকীয়া দেখে এখন সবাইকেই তাই মনে হয়। মানুষ যা দেখে অভ্যস্ত সবাইকেই তাই মনে করে। অথচ পৃথিবীতে ভালো মানুষ আছে, তা ভুলেই যাই আমরা। ভালোবাসা সুন্দর, নিজের টা না-হোক, আর অন্যের টা দেখতে সুন্দর । “

নার্স যেতেই রোজাও পা বাড়াতে চাইলো। তবে তূর্জান নেওয়াজ কি আর ছেড়ে দেওয়ার বান্দা। বা হাতে রোজার শাড়ির আচল ধরে টেনে আনল। নিজের কপালের উপর আচল রেখে, রোজাকে বলল ঘামবিন্দু মুছে দিতে। রোজা বাধ্য স্ত্রীর মতোই হাজবেন্ডের হুকুম পালন করতে গেল। তবে কে জানতো, সুযোগ সন্ধানী তূর্জান নেওয়াজ রোজাকে বিপাকে ফেলবে। রোজা নিচু হয়ে কপাল মুছে দেওয়ার আগেই আবার নিজের বুকে এনে ফেলল, বা হাতে কোমড় জড়িয়ে বলল, “ বউ। “

রোজা নিশ্চুপ। মনে হচ্ছে কতদিন পর এই ডাক শুনছে। “ বউ, শোনো। আমার দিকে তাকাও। “

রোজা চোখ বন্ধ করে ঠোঁট কামড়ে তূর্জানের বুকে মুখ গুজে পরে রইলো। আবার একই কণ্ঠ ধ্বনিত হলো, “ তাকাতে বলছি না। এভাবে এত লজ্জা পাওয়ার কি আছে?না-কি পরকীয়া করতে এখন লজ্জা লাগছে? “

রোজা আরও কুকড়ে গেল। লজ্জায় গালদুটো লালচে হয়ে যাচ্ছে। তূর্জান রোজার কপালে ঠোঁটে ছুইয়ে দিতেই রোজা তড়িৎ গতিতে তাকালো, তূর্জান ভ্রু কুচকে বলল, “ তখন যে কাজটা সম্পূর্ণ হয়নি, এখন ফাস্ট ওটাকে সম্পূর্ণ কর। “

“ কোন কাজ? “

তূর্জান আবার রোজার ললাটে, তারপর নাকের ডগায় অধর ছুইয়ে যেই না অধরের কাছে নিজের অধর নিবে, তখনি রোজা দুহাতে ঠোঁটে ঢেকে নিলো। তূর্জান মুচকি হেসে বলল, “ কেন তখন তো….
কথা শেষ করার আগেই রোজা নিজের দুহাতে তূর্জানের ঠোঁট চেপে ধরল। “ চুপ করুন, বেহায়া লোক। অশুদ্ধ পুরুষ।”

“ বউয়ের কাছে কে শুদ্ধ থাকে। আমাকে দেখা কে এতো শুদ্ধ লোক। “

“ কেউ না হলো, আপনি হবেন শুদ্ধ। “

“ আচ্ছা যা, তোর ইচ্ছা। কিন্তু এখন ঘুমাবো, ঘুম হয়নি। “

“ আপনি তো ঘুমের মেডিসিন নিয়ে ঘুমিয়েছেন, তাও বলছেন ঘুম হয়নি? “

“ মেডিসিন নেয়নি। “

“ কেন? “

“ আমার যে ঘুমে, বুকে তুই নেই । ওই ঘুম আমার প্রচন্ড অপছন্দের।”

“ আমি তাহলে যাই? আপনি ঘুমান। “

“ উহু, যতক্ষণ ঘুমাবো, ততক্ষন এভাবেই থাকবি।”

“ আপনার শরীর ইনজুর, ব্যাথা লাগবে। “

“ লাগবে না।

তূর্জানের কথাটা শুনেই রোজার বুকটা হালকা কেঁপে উঠল। এতক্ষণ যে লজ্জা, অভিমান, ভালোবাসা মিলেমিশে ছিল,সেগুলোর মাঝেই হঠাৎ করে ভয়টা আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠল।
রোজা ধীরে ধীরে তূর্জানের ডান হাতটার দিকে তাকালো। সাদা ব্যান্ডেজে মোড়ানো, তবুও কিছু জায়গায় লালচে দাগ ফুটে আছে। মনে হচ্ছে একটু নড়াচড়া হলেই আবার রক্ত বের হবে।রোজা কাঁপা গলায় বলল,“খু-খুব ব্যাথা করছে?”

তূর্জান একটু মুখ বাঁকিয়ে বলল,“হুম…, তবে এখন করছে না।”

রোজা ভ্রু কুচকে তাকাল,“আমি সিরিয়াসলি জিজ্ঞেস করছি।”

“আমিও তো সিরিয়াসলি বললাম,” তূর্জান মুচকি হেসে বলল, “তুই কাছে থাকলে ব্যাথা পালিয়ে যায়। ব্যাথারাও আমার বউকে ভয় পায়। “

রোজা এবার সত্যিই কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেলল। এই মানুষটা এমন কেন? এতটা ভালোবাসা কেউ কিভাবে দিতে পারে?
ধীরে ধীরে সে তূর্জানের হাতের কাছে এগিয়ে গেল। খুব সাবধানে, যেন কাছের কিছু ছুঁয়ে দেখছে,এমনভাবে আঙুল দিয়ে ব্যান্ডেজের উপর হাত রাখল।

তূর্জান হালকা কেঁপে উঠল।রোজা আঁতকে উঠে বলল,“সরি! ব্যাথা লাগলো?”

“না… তোর ছোঁয়ায় ব্যাথা না, অন্য কিছু লাগছে।”

রোজা অজান্তেই জিজ্ঞেস করে ফেলল,“কি লাগছে?”

তূর্জান চোখ বন্ধ করে বলল,” হাজার জনম তোকে বুকে নিয়ে বাঁচতে ইচ্ছা করছে।”

এক মুহূর্তের জন্য পুরো কেবিনটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। রোজার চোখে পানি এসে গেছে । সে আস্তে করে তূর্জানের পাশে উঠে বসল, তারপর নিজের শাড়ির আচল দিয়ে খুব যত্ন করে তূর্জানের কপালের ঘাম মুছতে লাগল।রোজার গলা ভেঙে গেল,“এত কষ্ট কেন করেন আমার জন্য?”

তূর্জান চোখ খুলে তাকাল,“কারণ তুই আমার। আর নিজের জিনিসের জন্য মানুষ কষ্ট করে না?”

রোজা একটু অভিমান করে বলল,“আমি মোটেও কোনো জিনিস নই!,”

তূর্জান ধীরে বলল, “না, তুই জিনিস না… তুই আমার নিশ্বাস। নিশ্বাস না থাকলে মানুষ বাঁচে? বাচে না!”

রোজা এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। চোখের পানি গড়িয়ে পড়ল।সে তূর্জানের বুকে মাথা রেখে ফিসফিস করে বলল,“আমি ভয় পেয়ে গেছিলাম… মনে হচ্ছিলো আপনাকে হারিয়ে ফেলবো।”

তূর্জান বাঁ হাত দিয়ে যতটা পারে তাকে জড়িয়ে ধরল,“আমি তোকে ছেড়ে কোথাও যাবো না। কিন্তু তুই যদি আবার এমন করে হারিয়ে যাস… আমি সত্যিই পাগল হয়ে যাবো।”

রোজা শক্ত করে ধরে বলল,“আমি আর কোথাও যাবো না,” “আপনার কাছেই থাকবো।”

“প্রমিস?”

“প্রমিস।”

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ। শুধু হার্টবিটের শব্দ… যেন একটার সাথে আরেকটা মিশে গেছে।হঠাৎ তূর্জান বলল,“একটা কাজ কর।”

“কি?”

“এখানে এভাবেই শুয়ে থাক। ঘুম পাচ্ছে আমার।”

রোজা অবাক,“কি বলছেন! এটা হসপিটাল।”

তূর্জান দুষ্টুমি করে বলল,“তো কি হয়েছে? আমি পেশেন্ট, আমার ইচ্ছা।”

“না, কেউ দেখে ফেললে কি ভাববে?“

“দেখলে বলবি, হাজবেন্ডের পাশে শুয়েছি। সমস্যা কোথায়?”

রোজা লজ্জায় লাল হয়ে গেল,“আপনি একদমই ভালো না।”

“হুম, শুধু তোর জন্যই খারাপ,” তূর্জান মুচকি হাসল।
শেষ পর্যন্ত রোজা আর না করতে পারল না। ধীরে ধীরে তূর্জানের পাশে একটু জায়গা করে শুয়ে পড়ল। মাথাটা সাবধানে তূর্জানের কাঁধে রাখল।
তূর্জান গভীর একটা নিশ্বাস নিল,“এইটা… এইটাই আমার ঘুমের মেডিসিন।”

রোজা মৃদু স্বরে বলল,“এখন ঘুমান।”

“ঘুমাবো… কিন্তু একটা শর্ত আছে।”

“কি?”

“ঘুম থেকে উঠলে তুই সামনে থাকবি।”

রোজা চোখ বন্ধ করে হেসে বলল,“আমি থাকবো… কোথাও যাচ্ছি না।”

তূর্জানের ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। কিছুক্ষণ পরেই তার শ্বাস ধীর হয়ে এলো,ঘুমিয়ে পড়েছে।
রোজা তার দিকে তাকিয়ে রইল। আঙুল দিয়ে আলতো করে তূর্জানের চুল সরিয়ে দিল।
তারপর খুব আস্তে করে তূর্জানের বুকে মুখ গুঁজে দিল।

মনে মনে বলল,“এত ভালোবাসা দিয়ে আমায় বেঁধে ফেলেছেন… এখন আর চাইলেও যেতে পারবো না।”

ইনশাআল্লাহ চলমান….

হাহহ, আমার কষ্ট কেউ বুঝে না। কালকে এই পর্বের খানিক অংশ লিখে আমি ডিপ্রেশনে চলে গেছি। এতো কষ্ট কেমনে দিবো? তাও দিলাম,, জানিনা কেমন হয়েছে,?

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply