Golpo ডিফেন্স রিলেটেড ডেসটেনি

ডেসটেনি পর্ব ১৯


ডেসটেনি [ ১৯]

সুহাসিনি_মিমি

বিশাল জায়গায় জুড়ে বানানো আর্লিশান কক্ষ। কক্ষের চারপাশের দেয়ালজুড়ে টানানো ছোট ছোট প্রিন্ট, কাগজে ছাপানো,ফ্রেমবন্দি অনেক ছবি। ছবিগুলোর মুখ একই,একই মানুষের।তবে কাল, ক্ষণ ভেদে ভিন্ন ভিন্ন মুহূর্তে, ভিন্ন ভিন্ন অভিব্যক্তিতে তোলা। ইউনিফর্মে, ক্যাজুয়াল, নরমাল পোশাক আসাক কোনোটাই বাদ যায়নি সেখানে। কোনোটা দূর থেকে তোলা, কোনোটা খুব কাছ থেকে। দেখে মনে হয় এই লোকের জন্য সবসময় ট্রেনিং প্রাপ্ত কোনো ইস্পেশাল ফটোগ্রাফার বুকিং করে রেখেছে কেউ। যার প্রতিদিনের কাজই হলো ভিন্ন ভিন্ন স্টাইলে ছবি সংগ্রহ করা।

আলো বলতে শুধু এক কোণে জ্বলছে মৃদু, হলদেটে একটা ল্যাম্প। অন্ধকারকে পুরো ভেদ করতে না পারলেও মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার চোখে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না সেসব দেখতে। মেয়েটা এগোচ্ছে ধীরে ধীরে। দেয়ালের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে এসে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছে সেসব কাগজে মুড়ানো ছবিগুলো। থামছে এসে প্রতিটা ছবির সামনেই। অত্যন্ত, একনিষ্ঠ মনোযোগে দেখছে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। ওই চোখে মুগ্ধতা দেখা গেলোনা তেমন। রিহাবে থাকা প্রথম দিনে মাদকা শক্ত কোনো ব্যক্তির চোখে যেরকম ভয়ঙ্কর নেশা দেখা যায়, সেই নেশা কেও হাড় মানাবে সেই দৃষ্টি। অবশেষে একটা ছবির সামনে গিয়ে থামল সে। আলগোছেই উঠে এলো ডান হাতটা। নেভির ইউনিফর্মে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক বলিষ্ঠদেহি মানব। মেয়েটার আঙুল ছুঁয়ে গেল সেই মানবের গালেতে।স্পর্শটা একদম আলতো, নিখুঁত। আস্তে ধীরে স্লাইড করে নামল নিচের দিক। হাবভাব এমন যেন, তার সামনেই সশরীরে দাঁড়িয়ে আছে সেই মানব। খানিকটা ঝুকে বুড়ো আঙুলের সাহায্য ছুঁয়ে দিলো পুরুষালি ঠোঁট দুটো।এরপর শব্দ করে সেখানে চুমুও খেল। পরম আশ্লেষে শ্রাব্য চুম্বন খেল। সরে গিয়ে দাঁড়ালো কয়েক কদম। পাশে থাকা দেয়ালে লাগওয়া একটা সুইচ টিপল এরপর। অমনি
সাথে সাথে দেয়ালের একপাশ অটোমেটিক দুই ভাগ হয়ে সরে গেল দুই পাশে। ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো গোপন কেবিনেটের মতো কয়েকটা ভাজ।সবগুলো থকথকে কাচ দাড়া আবৃত।প্রতিটা ধাপ সাজানোও খুব নিখুঁতভাবে। সেখানে রাখা শার্ট, টি-শার্ট, ট্রাউজার সবই কোনো পুরুষের পোশাক। মেয়েটা এগিয়ে গেল।
হাত বুলিয়ে বুলিয়ে একটার পর একটা কাপড় ছুতে লাগল। অতঃপর খুঁজে খুঁজে বের করল সাদা রঙা একটা শার্ট। শার্টটা তুলে নিল বুকে।মিশালো নিজের সঙ্গে। বন্ধ করল চোখের পাতা দুটো। তাতেই সন্তুষ্ট হলোনা যেন। নাকের কাছে কাপড়টা ধরে টেনে টেনে শ্বাস টানল। অনেকবার। যেন এই কাপড়ের ভেতরেই লুকিয়ে আছে সেই মানুষটার অস্তিত্ব। তার গায়ের গন্ধ। মেয়েটার ঠোঁটে ভেসে উঠল তৃপ্তির রেখা। নিজের পরা টি-শার্টের উপরেই শার্টটা জড়িয়ে নিল সে। ঢিলেঢালা কাপড়টা মেয়েলি শরীরটা ঢেকে দিল পুরোপুরি। চরম আশ্লেষে ধপ করে গিয়ে শুয়ে পড়ল মাঝামাঝি থাকা আরামদায়ক নরম বেডটায়।
সিলিংয়ে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর দু চোখ বন্ধ করে অস্পষ্ট, ভাঙা ভাঙা স্বরে বলতে লাগল,

“তিন বছর! থ্রি ইয়ার্স! পুরো তিনটা বছর নিজের সাথে নিজেই লড়েছি আমি। নিজেকেই বুঝিয়েছি এটা, এটা কেবল এক ধরনের আসক্তি, মোহ। এরবেশি কিছুই না। নাথিং। বাট আই ওয়াজ টোটাললি রং।”

একটু থামল সে। গলার কাছের শার্ট এর অংশটা টেনে ধরে নাকের কাছে এনে ঘ্রান নিতে নিতে পুনরায় বলল,

“আসক্তি, মোহ সবকিছু ছাড়িয়ে গেছে। নিজের মন মস্তিষ্কের সঙ্গেই এতটা দিন লড়াই করে গেছি আমি। নাউ আই ক্যান রিয়েলইজ ! মোহ, আসক্তি, নেশা সবকিছুর উর্ধে গিয়ে একটা কথাই বারবার ঘুরেফিরে আসছে। ভালোবাসা। আমি আড্ডিক্টেড নিজের ভালোবাসার উপরই । বিলিভ মি! এটা যদি নেশা হয়, তাহলে এই নেশা প্রতিদিন, প্রতি প্রহরে নিতে চাই আমি। আর যদি এটাই ভালোবাসা হয়, দেন আমি তোমায় আমার নিজের চাইতেই বেশি ভালোবাসি।এন্ড ইউ নো হোয়াট? জ্যানিফার রাজ পৃথিবীর সবকিছুর উর্ধে নিজেকে ভালোবাসে। আর সেই ভালোবাসার চাদরে তোমায়ও খুব শীগ্রই মুড়িয়ে নেবো। খুব শীগ্রই দেখা হবে আমাদের। আবার, আবারও, আরও একবার!”
:
:
:
সারা রাত ধুমসে বৃষ্টি হওয়ার সোডা মাটির গন্ধ এখনো বাতাসে মিশে আছে। আকাশটা ফকফকে পরিষ্কার। সকালি পাখিদের কিচিরমিচির থেমে গেছে বহু আগেই। শান্ত নিরিবিলি জায়গাটায় মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা “সিদ্দিক কুঞ্জ” নিত্যদিনের তুলনায় আজ একটু বেশিই শান্ত যেন। ড্রয়িং রুমে বসে আছেন মোহনা বেগম। সামনে টেবিলে ছড়ানো কিছু কাগজপত্র। মনোযোগ দিয়ে সেসব খুঁজে খুঁজে দরকারি কিছু পেপারের সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছিলেন ভদ্রমহিলা। সকালের নাস্তা সেরেছে ঘন্টা খানেক আগে। রুটিনমতো কাজের মেয়েটার হাতে ঔষুধ ও গিলেছেন নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে। ছেলের আদেশ! অমান্য করার সাধ্যি নেই তার। হাতে একটা পেপার নিয়ে উল্টে পাল্টে দেখছিলেন তিনি। অমনি দরজায় টিং টাং শব্দে একবার তাকালেন রান্নাঘরে। মেয়েটা ছাদে গেছে কাপড় মেলতে। তাই বাধ্য হয়ে অগত্যা উঠে দাঁড়ালেন নিজেই। এর মধ্যে বেল বাজলো আবারও। গিয়ে খুললেন দরজাটা। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে লম্বা, চওড়া কাঁধের, সুঠাম দেহের এক যুবক। পরনে নেভি ব্লু শার্ট, সাথে সাদা জিন্স। চোখের পাওয়াড়ি চশমাটা খুলে ঠিকঠাক করলেন তিনি। আশ্চর্য! ছেলেটা তো দেখতে হুবহু একদম তার আযানের মত। না,না শুধু “মতো” না। এ তো তারই ছেলে। মোহনা বেগমের চোখ বড় হয়ে উঠল অতিমাত্রায় বিস্ময়ে। প্রচন্ড অবিশ্বাসে হতবিহুল গলায় অস্পষ্ট বলে উঠেন ত্রস্ত,

“আযান?বাবা আযান এটা কি সত্যি তুমি তো ?”

কপাল কুঁচকে সংশয়ে বলে উঠেন মোহনা।দিন দুপুরে নিশ্চই তার মতিভ্রম হবেনা। কিন্ত তার ছেলে এই অসময়ে এখানে কি করবে? ছেলেকে অতিমাত্রায় মিস করার ফলে ভুলভাল দেখছেন নাতো চোখের সামনে? দরজা হতে এক পা-ও সরলেন না মোহনা। পুরোটা পথ রোধ করেই দাঁড়িয়ে আছেন তখনো। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন ছেলেটার দিকে। মাথা থেকে পা পর্যন্ত পরখ করলেন আবারও। তার ছেলে তো সেদিনই গেল। মাস না গড়াতেই আবার ফিরে এলো? যে ছেলে বছর পার হয়ে গেলেও বাড়ির পথ খুঁজে পায় না সে হঠাৎ এমন করে দরজায় এসে দাঁড়াবে? অসম্ভব! মোহনা বেগম আরও একবার চোখ কুঁচকে তাকালেন। হাতটা আস্তে করে বাড়িয়ে দিলেন সামনে। ততোধিক চিন্তিত হয়ে হাত রাখলেন ছেলের কুচকানো কপালে।অন্যদিকে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা তাজধীরের বিরক্তি তখন আকাশ ছুলো। ভ্রু কুঁচকে নিরবে তাকিয়ে রইল মায়ের দিকে। মায়ের এমন আচরণে বিরক্তিটা তরফর করেই বাড়ছে তার। একেতো একটানা লম্বা দীর্ঘক্ষণের জার্নি শেষে ফিরেছে। তারপর আবার গত ষোলো দিনের অপারেশনে শরীরটাও তার ক্লান্ত বেশ।মোহনা বেগম এখনো অবিশ্বাসের ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারছেনা না।
এক পা এগিয়েও আবার থেমে গেলেন। তারপর কাঁপা কণ্ঠে বললেন,

“বাবা তোর শরীর ঠিক আছে তো? কপাল তো ঠান্ডাই। হুট্ করে চলে এলি যে এভাবে?”

“ভিতরে যেতে দিবে না?”

মোহনা বেগম এতক্ষনে হুঁশে ফিরলেন। সরে দাঁড়ালেন ত্রস্ত। বললেন,

“ওমা! আয় আয়—দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”

তাজধীর ঠাণ্ডা চোখে তাকিয়ে বলল,

“না সরে দাঁড়ালে ঢুকবো কীভাবে?”

বিষয়টা বুঝতে পেরে তড়িঘড়ি সরে দাঁড়ালেন তিনি।
তাজধীর ভেতরে ঢুকে পড়ল। পিছন থেকে আবারও ডেকে উঠলেন মোহনা বেগম,

“বাবা তুই কি সত্যিই এসেছিস?”

তাজধীর মাথা ঘুরিয়ে একবার তাকাল। কণ্ঠে স্পষ্ট বিরক্তি ঢেলে বলল এবার,

“এসব কেমন প্রশ্ন, আম্মু?”

“না তুই অন্য কোথাও যেতে গিয়ে ভুল করে এখানে চলে আসিস নিতো? নাকি তোর কিছু হয়েছে? মানে আঘাত তাগাত পেয়েছিস কোথাও? দেখি দেখি আম্মু কে দেখা!”

“কি হবে আমার? কীসব বলছো তুমি? এখন আমার নিজের বাড়িতে আসতেও কি আলাদা করে ইমেইল পাঠাতে হবে?আজব!”

মোহনা বেগম কিছুটা অপ্রস্তুত হলেন এপর্যায়ে। বললেন,

“যাকে বলে কয়ে অসুস্থতার দোহায় দিয়েও বাড়ি ফিরাতে পারিনা। সে হুট্ করে কাউকে কিছু না বলেই চলে আসলো? কোনো কারণ ছাড়াই?”

“আম্মু! তুমি কি চাচ্ছ এখন আমি ফিরে যাই?”

“এমা সেটা কখন বললাম?”

“তাহলে এমন ওভাররিয়েক্ট করা অফ দাও প্লিজ। খুদা পেয়েছে। খাবার রেডি করো। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।”

বোলার পরো মায়ের খুব একটা হেলদুল দেখতে না পেয়ে আরেকটু জোড়েই বলল সে,

“দিবে নাকি যেভাবে এসেছি সেভাবেই চলে যাবো?”

“এমা দিচ্ছি দিচ্ছি। তুই জলদি ফ্রেশ হয়ে আয়।”

বলেই ত্রস্ত রান্নাঘরে ঢুকলেন তিনি। তাজধীর মায়ের দিকে তাকিয়ে নীরবে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে এগোলো নিজের রুমের দিকে।
:
:
:

অল্প সময়ে যতটা সম্ভব দ্রুত ছেলের পছন্দ মত খাবার রেধেছেন মোহনা বেগম। একবার এদিক, ওদিক ঘুরে ঘুরে সব ঠিকঠাক কিনা দেখছেন। ছেলের আগমনে সমস্ত দুশ্চিন্তার লাঘব টেনেছেন আপাতত।
ছেলেটা খেয়ে একটু জিরুক, এরপর নাহয় ঠান্ডা মাথায় জিজ্ঞেস করবেন। ততক্ষনে ফ্রেশ হয়ে নিচে নামল তাজধীর। পরনে সাদামাটা ট্রাউজার আর টি-শার্ট চাপিয়েছে। ভেজা চুল থেকে পানি ঝরছে এখনো। নেমে টেবিলের সামনে এসে থামল। পুরো টেবিলে এক নজরে চোখ বুলিয়ে বলল,

“এগুলো কি? তোমায় বলিনি কিচেনে না যেতে? হাই প্রেসার নিয়ে কিচেনে কেন ঢুকেছো তুমি?”

“তেমন কিছুনা বাবা। কিছু হবেনা। তার এভাবে বসে বসে থাকতেও শরীর আরও অবশ হয়ে আসে। কাজ করলে একটু ব্যায়ামতো তো হয় তাইনা? “

“কথাবার্তা তো একদম ভালোই আয়ত্ত করেছো দেখছি। জাস্ট একটাবার অসুস্থ হয়ে বেডে পরো, তারপর দেখো!”

মোহনা বেগম কথা বাড়ালেন না আর। তাজধীর খেতে খেতে বলল,

“ওদের কি খবর? কেমন আছে ওরা?”

“কে মিতু? আছে আলহামদুলিল্লাহ।”

“ওহ!”

“তোর আসার কথা জানিয়েছি একটু আগেই। বলল আসছে।”

তাজধীর থামল এক সেকেন্ড। ঠোঁটের কোনে এক মুহূর্তর জন্য সূক্ষ একটা হাসি পরিলক্ষিত হলো। মিলিয়েও গেলো তা সঙ্গে সঙ্গেই।

এইতো ঘন্টা খানেক আগের কথা! রান্না ঘরে ব্যস্ত হয়ে আগেভাগেই কল লাগালেন ভদ্রমহিলা মেয়েকে। ওপাশ থেকে রিসিভ হতেই বলে উঠেন তাড়াহুড়ায়,

“হ্যালো মিতু? “

“হ্যাঁ আম্মু, বলো।”

মোহনা বেগম উত্তেজিত গলায় বললেন,

“জানিস মিতালে, আজকে তো খুব আশ্চর্যজনক কিছু ঘটে গেছে! আমার তো এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না!”

মিতালী চমকে উঠল বলে তখন,

“কি হয়েছে আম্মু?”

“বলব?”

“আরে বলো না!”

“তোর ভাই এসেছে!”

“সত্যি বলছো?! কখন এলো ভাইয়া?!”

“এই তো, একটু আগেই এলো। আমি নিজেও বিশ্বাস করতে পারছি না এখনো!”

“কিছু হয়েছে নাকি আম্মু? ভাইয়া ঠিক আছেতো? “

“সেটাই তো বুঝতে পারছিনা ঠিক। তোর ভাইকে এক মাসের মাথায় বাড়িতে আসতে দেখছিস কখনো?
বছর পার হয়ে যায়—তবুও আসে না। আমরা ডেকে ডেকে নিয়ে আসি। আর আজ হুট করে নিজে নিজে চলে আসলো!”

মিতালী এবার ধীরে বলল,

“হুম তাই তো!”

“তাই তো মানে? আমার তো মনে হচ্ছে কিছু একটা হয়েছে!”

“তুমি জিজ্ঞেস করেছো?”

“করেছি! কিছুই বলছে না। উল্টা আমার ওপর রাগ দেখাচ্ছে!”

“থাক রাগিও না ভাইকে। আমি পাভেল কে বলে আসছি এখুনি।”

মেয়ের থেকে আশ্বস্ত হয়ে ফোন কাটেন তখন মোহনা।
:
:
:
ড্রয়িং রুমে বসে টিভির দিকে তাকিয়ে আছে তাজধীর। স্ক্রিনে চলছে লাইভ ম্যাচ। ধারাভাষ্যকারের উত্তেজিত কণ্ঠ আর দর্শকদের চিৎকার—সব মিলিয়ে পরিবেশ জমে উঠেছে টানটান। কিন্তু তাজধীর?হাতে
রিমোট ধরা থাকলেও, চোখ দুটো স্ক্রিনে থাকলেও মনটা তার পুরোপুরি সেখানে নেই। অমনি বাড়ির বাইরে এসে থামল কোনো একটা গাড়ি।ত্রস্ত টানটান হয়ে ভাব নিয়ে বসল তাজধীর। উঠালো পায়ের উপর পা। ভাবটা এমন যেন পূর্ণ মনোযোগ তার খেলাতেই আটকে আছে ঘন্টা দুয়েক যাবৎ। মোহনা বেগম প্রায় দৌড়েই দরজার দিকে গেলেন। দরজা খুলতেই সামনে মিতালীকে দেখে একদম উজ্জ্বল হয়ে উঠল মায়ের মুখ। বললেন,

“এসেছিস মা!”

বলে জড়িয়ে ধরলেন মেয়েকে শক্ত করে।আসে পাশে তাকিয়ে বললেন ফির,

“জামাই কোথায়? জামাই আসেনি?”

“না মা, পাভেল অফিস থেকে ডাইরেক্ট এখানে আসবে।”

অমনি টিভির স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে একবার দরজার দিকে আড় চোখে তাকায় তাজধীর।
নীরব, স্থির সেই দৃষ্টি আশেপাশে খুঁজে কাউকে। কিন্তু মিতালী ছাড়া আর কাউকে না দেখে আবার চোখ নামিয়ে নেয় স্ক্রিনে। মাকে পাশ কাটিয়ে মিতালী এসে দাঁড়ায় ভাইয়ের কাছাকাছি।মিতালী কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই আচানক ধুম করে প্রশ্নোর মুখোমুখি হয়ে উঠে তৎক্ষণাৎ,

“দাদি কে আনিস নি?”

মিতালী উত্তর দেয় সুস্পষ্ট,

“না ভাইয়া। দাদি প্রিয়ন্তীর সঙ্গে বাসায় আছে।প্রিয় কে তো আর একা রেখে আসা যায়না। তাই অগত্যা দাদি কে রেখেই আসতে হলো।

পাশ থেকে প্রশ্ন করলেন মোহনা মেয়েকে,

“এমা! তো প্রিয়ন্তী কেও সঙ্গে করে নিয়ে আসতি।একা কেন রেখে এলি ওদের?”

“আনতে চেয়েছিলাম তো। কিন্তু আজ সকালে ও ভার্সিটিতে গেছে। ফোন দিয়ে জানতে চাইলাম আসবে কিনা। না করে দিলো। বলল, ইম্পর্ট্যান্ট ক্লাস আছে।আসতে পারবেনা। তাই আর জোর করিনি।”

টানটান বদন খানায় মুহূর্তেই নেমে এসে ভর করল নিগুড় কাল আমানিশা। মুখটা হুট্ করেই ফ্যাকাসে নির্জীব দেখাল যেন তাজধীরের। চোখ দুটো এক সেকেন্ডের জন্য বন্ধ করে উঠে দাঁড়ালো সোজা। গটাগট ধূপধাপ পা ফেলে সোজা উঠে এলো চিলে কোঠায়। এই ঘরটা বাড়ির বাকি সব রুম থেকে আলাদা।সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগৎ। চারপাশে সারি সারি রাখা অ্যাকুরিয়ামের ভিড়ে সর্বপ্রথমই চোখে পড়ল খালি অ্যাকুরিয়ামটায়।অমনি ভ্রু কুঁচকে এলো তার। দ্রুত এগিয়ে গেল সামনে। আশেপাশে উপর নিচ ভালো করে দেখল আরেকবার। একি তার ব্লু হাফমুন ফিশটা কোথায়?

একটা একটা করে সব ট্যাংক চেক করল।
না,কোথাও নেই। কপালের ভাঁজ আরও গাঢ় হয়ে উঠল তাতে। সন্দেহবশত পুনরায় নেমে এলো নিচে। নিচে গিয়ে নামতেই দ্রুত ডেকে উঠল মা-কে,

“আম্মু। আমি না থাকাকালে কেউ কি উপরে গেছে?”

“মানে?”

“আমার রুমে। চিলেকোঠায়।”

মোহনা বেগম ভ্রু কুঁচকে বললেন,

“না তো! তুই না থাকলে তো কেউ যায় না সেখানে।”

“কেউই যায়নি?”

“না।”

একটু ভেবে আবার বললেন,

“এই মধ্যে জব্বার দুইবার এসে তোর অ্যাকুরিয়াম ক্লিন করে গেছে। কেন? কিছু হয়েছে নাকি?”

তাজধীর চুপ করে গেল। মাথার ভেতর দ্রুত হিসাব মিলাতে লাগল। জব্বার ছেলেটা বছরের পর বছর ধরে এই কাজ করছে। তার অনুপুস্তিতে অ্যাকুরিয়াম পরিষ্কার করা, মাছগুলোর খেয়াল রাখা—সব তার দায়িত্ব। আর এই কাজের জন্য সে মোটা অঙ্কের বেতনও পায়। সবচেয়ে বড় কথা— প্রতিটা মাছ তার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা জব্বার বেশ ভালো করেই জানে। তাই ভুলক্রমেও সে তার মাছে হাত দিবেনা। আর যদি অন্য কিছু হতো—তাহলে অবশ্যই তার মা-কে তো অন্তত জানাত। তাজধীর আর কিছু বলল না।কিছু একটা ভেবে শুধু মাথা নাড়িয়ে আবার সোজা উঠে গেল উপরে। নিজের রুমে ঢুকেই বেডের উপর এলোমেলো হয়ে পড়ে থাকা ল্যাপটপ টা ওপেন করল। খুলল। স্ক্রিন জ্বলে উঠল। নিরাপত্তার খাতিরে নিজ বাড়ির প্রতিটা কোণায় সিসি ক্যামেরা লাগিয়েছে সে। গেইট থেকে শুরু করে করিডর, সিঁড়ি, এমনকি চিলেকোঠার রুমও বাদ যায়নি। সাধারণত বাইরে থাকলেও মাঝে মাঝে ফুটেজ চেক করা হয়। বিশেষ করে তার মাছগুলোর। কিন্তু এইবার—ব্যস্ততায় সেটা আর করা হয়ে উঠেনি। ত্রস্ত টাইমলাইন খুঁজে ফুটেজ গুলো লোড করতে লাগল সে। কার এত বড় স্পর্ধা! সোজা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার তাজধীর সিদ্দিকের বাড়ির একুরিয়ামেই হাত বাড়ায়?

চলবে….

কাল সন্ধ্যার মধ্যে ৪k উঠাতে পারবেন রিয়েক্ট? তাহলে কালকেও একটা সারপ্রাইস পর্ব দিবো প্রমিস 🫶

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply