প্রণয়ের_মায়াতৃষ্ণা ||৩৮||
ফারজানারহমানসেতু
রাত হতেই চারিপাশের কোলাহল কমে যাচ্ছে। যে যার নিজস্ব গন্তব্যে ফিরে যাচ্ছে।বাইকে মুখ কালো করে বসে আছে রোজা। চোখ দুটো ফুলে উঠেছে, ফর্সা মুখখানি লালবর্ণ ধারণ করেছে। এখন আর তূর্জানের কাধে হাত রাখেনি। রাখবেই বা কেন? জোর করে বিয়ে করলেই কি হয়ে গেলো না কি? আবার কবুল বলানোর সময় ভয় দেখিয়ে কবুল বলিয়েছে।
খানিক আগের ঘটনা… রোজা কাজি অফিস লেখা দেখেই অদ্ভুত নয়নে তাকালো তূর্জানের পানে, অথচ তার ভাবভঙ্গি স্বাভাবিক। রোজা এখনো পুরো ব্যাপারটা বুঝে উঠতে পারেনি। একবার চারপাশে তাকিয়ে আবার তূর্জানের দিকে তাকালো। “আমরা এখানে কেন এসেছি তূর্জান ভাই ? আপনার কোনো নিকট আত্মীয়র বিয়ে না কি?”
তূর্জান খুব শান্ত গলায় বলল,” না। “
“ তাহলে হঠাৎ এখানে এলেন কেন? “
“বিয়ে করতে।”
রোজার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। তোতলিয়ে বলল,“কি… কি বললেন?”
“যা শুনেছিস তাই বলেছি। আজ আমরা বিয়ে করবো।”
রোজার বলল, “আপনি পাগল হয়ে গেছেন নাকি? এভাবে পাগলামি করছেন?”
তূর্জান এবার ধীরে ধীরে রোজার দিকে এগিয়ে এল। চোখদুটো অদ্ভুতভাবে স্থির। হঠাৎ রোজার একহাত ধরে সামনে এগেতে এগোতে বলল,
“পাগল তো অনেক আগেই হয়েছি..
তারপর আর কি? কাজির সামনে বসেও রোজা চোখের জল ফেলে যাচ্ছে। এদিকে দয়ামায়াহীন পাষণ্ড লোক নির্বিকার কবুল বলে রোজার কবুল বলার অপেক্ষা করছে। যদিও জোর করছে না, তবে রাক্ষসী দৃষ্টি ফেলে রেখেছে রোজার দিকে।
কিন্তু রোজা কিছুতেই কবুল বলছে না। হঠাৎ রোজার হাত ধরে টেনে বাইরে যেতে লাগলো। বলল, “ চল বিয়ে করবো না। মিরানকে বলছি তোকে এসে নিয়ে যাবে। আর আজ থেকে তুইও আমাকে ভুলে যাবি, বাড়িতে গিয়েও সাবাইকে বলবি আমাকে ভুলে যেতে। কি পারবি তো? “
বলেই রোজাকে ছেড়ে বাইকের কাছে যেতে গেল। রোজা কান্নামিশ্রিত কণ্ঠেই বলল, “ কোথায় যাবেন আপনি? “
তূর্জান পিছনে না ফিরেই বলল, “ মরতে যাচ্ছি। তুই তো এটাই চাস, আমি যেন মরে যাই। যা তোর ইচ্ছা সই আজকের পর থেকে আমাকে দেখতে হবে না। “
“ কেন এমন পাগলামো করছেন? প্লিজ যাবেন না।“
“ ওকে যাবো না। তোর কাছে দুইটা অপশন, এক আমাকে সাদাকাফনে দেখবি, দুই বিয়ে করবি? তোর ইচ্ছা!”
“ যদি একটাকেও না মানি? “
“ একটা না মানলে অন্যটা মানতে হবে। সময় দুইমিনিট। “
বলেই রাস্তার এপাশ থেকে ওপাশে রোজার দিকে তাকিয়ে পিছনের দিকে একপা একপা করে পিছাতে লাগলো। তারপর দূরে একটা কার দেখিয়ে বলল, “ ওইটা আসা পর্যন্ত তোর সময়। সব তোর ইচ্ছেতে হবে, হ্যাঁ বললে আমি ফিরে আসবো, না বললেও ফিরে আসবো। শুধু পার্থক্য হবে, জিন্দা আর মৃত। “
রোজার জান বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম। এমন পাগলামো করার কি আছে? তূর্জান এখনো, মাঝরাস্তাতে নির্বিকার হয়ে রোজার দিকে তাকিয়ে আছে। এদিকে গাড়ি তূর্জানের থেকে খানিকটা দূরে নিজের গতিতে ধেয়ে আসছে। রোজা কাদতে কাদতেই বলল, “ প্লিজ ফিরে আসুন। এভাবে পাগলামো কেন করছেন? আমার ভয় করছে, দেখুন গাড়ি আপনার কাছে চলে আসছে। প্লিজ তূর্জান ভাই ফিরে আসুন। প্লিজ।“
তূর্জানের কোনো ভাবাবেগ হলো না। একবার রোজার দিকে তাকিয়ে, দুহাত ছড়িয়ে আস্তে করে চোখ বন্ধ করে নিল। ততক্ষনে গাড়ি চলে আসছে তূর্জানের দিকে। রোজা এবার কিছু না ভেবেই দৌড়ে গেলো তূর্জানের দিকে। গন্তব্য দৌড়ে গিয়ে তূর্জানকে ঠেলে সরিয়ে দেবে।
ইচ্ছে অনুযায়ী গিয়ে তূর্জানের প্রশ্বস্ত বুকে হাত রেখে সরানোর চেষ্টা করল। কিন্তু তূর্জান এখনো আগের মতোই দাড়িয়ে আছে। একচুল পরিমান নড়ছেও না। অথচ গাড়ি প্রায় সন্নিকটে এসে গেছে। আশেপাশে গাড়ি চলছে পুরো ঝড়ের গতিতে। রোজার ভীষণ ভয় করছে। যেহেতু মেইনরোড সেহেতু প্রত্যেকটা গাড়ি চলাচলের নিদিষ্ট গন্ডি আছে। রোজা তূর্জানের বুকে ধাক্কা দিয়ে বলল, “ কেন পাগলামো করছেন? আচ্ছা মরার শখ জেগেছে আপনার, চলুন একসাথে ইনজয় করতে করতে মারা যাই দুজনে। “
বলেই তূর্জানের দিকে তাকালো। নাহ রোজার কোনো টেকনিক এখন কাজে দিচ্ছে না। রোজা চলন্ত ধেয়ে আসা গাড়ির দিকে তাকাতেই ভয়ে জড়সর হয়ে চোখমুখ কুচকে বলল, “ আ.. আ.. আমি রাজি, আপনাকে বি.. বিয়ে করবো আমি। প্লিজ সরুন, গাড়ি..
বলতেই তূর্জান দুদিকে ছড়িয়ে রাখা হাত দিয়ে তার প্রেয়সীর কোমড়ে হাত রেখে রাস্তার ওপাশে চলে গেলো। রোজা ভয়ে এখনো তূর্জানের বুকে মাথা রেখে ফুফিয়ে উঠছে। তার ধারণা সে এখন আর বেচে নেই। নয়তো, সে গাড়ির নিচে চাপা পড়েছে অথচ ব্যাথা পেল না। আবার কানে কোনো শব্দ আসছে না। ওভাবেই তূর্জানকে আলিঙ্গন করে নেতিয়ে পড়ল, প্রশ্বস্ত বুকের মালিকের বাহুডোরে। এদিকে গাড়ি ভিতরে থেকেই জানালার মিরর উঠিয়ে মিরান তূর্জানের দিকে তাকিয়ে উড়ন্ত চুমু ছেড়ে দিল।
বোঝালো, “ দুলাভাই আমার জন্যই আজকে পেলে আমার বনুকে। “
তূর্জানও ইশারায় বোঝাল, “ গ্ৰেট জব।মিরজাফর শশুরের ভালো ছেলে, আমার একমাত্র শালা। “
মিরান গাড়ি থেকে নেমে, ড্রাইভার কে ভাড়া দিয়ে দিল। গাড়ি ভাড়া করে এনেছে। নয়তো তার বাবা জানলে তাকে উগান্ডায় পাঠিয়ে দিবে। মিরান তূর্জানের দিকে এগোতে এগোতে মনে মনে বলল, “ এদের কি বুদ্ধিরে ভাই। বিয়ে করার জন্য মরার এক্টিং করতেও বাধে না। ভাই এতো ভালো মানুষ কেমনে বাসে? আমারও একটু শিখতে হবে, ওই অনন্যা বেডি আমার ভালোবাসা বোঝে না কেন?”
রোজা আজ থেকে মিসেস নেওয়াজ। শুধু তাই নয়, মিসেস তূর্জান নেওয়াজ। তূর্জান নেওয়াজের ওয়াইফ, ভাবনার মাঝেই তূর্জান বাইকের ব্রেক কষলো। রোজাকে নিশ্চয় মারার ফাদ এটেছে এই লোকটা। নয়তো দেখছে ধরে বসেনি, হঠাৎ এমন ব্রেক কষার কি দরকার।
“ নামুন, মিসেস নেওয়াজ। “
হঠাৎ এমন বাক্য কর্ণপাত হতেই তাকালো তূর্জানের পানে। যে এখনো রোজার দিকে তাকিয়ে আছে। তূর্জান ভ্রু কুচকে বলল, “ নামতে বলেছি, এভাবে দেখার কি আছে? সারাজীবন দেখতে পারবি, এখন নাম। “
“ বাড়িতে তো এখনো পৌঁছায়নি, এখানে নেমে কি করবো? “
“ বৃষ্টি পরতে শুরু করেছে, নেমে ওই টং চায়ের দোকানে যা। “
বলতেই রোজা আকাশের দিকে তাকালো। সে ভাবনায় এতোই বিভোর ছিল যে, আকাশের পরিবর্তন ও ঠিক পায়নি। অধিক প্রিয় আকাশটাও আজ তার অজান্তে পেরিয়ে বৃষ্টিতে রুপ নিয়েছে। বৃষ্টির পানির ছিটেফোঁটা এসে পড়ল রোজার সর্বাঙ্গে। রোজা বাইক থেকে নেমে দাড়াল। তূর্জান বাইক থেকে নেমে, রোজার হাত ধরে টং দোকানের গিয়ে দাড়ালো। হয়তো রাত হওয়ায় দোকানীও দোকান বন্ধ করতে চাইছেন। রাত তো আর কম হলো না। প্রায় দশটা। রোজা তূর্জানের থেকে মুখ ঘুরিয়ে অন্য দিকে বসল। তূর্জানের সাথে তার কথা নেই।
কিসের কথা পাষণ্ড লোকের সাথে। জোর করে বিয়ে করে কি এমন হবে? যে জোর করে বিয়ে করতে হলো। রোজা বাড়িতে কি বলবে? ভেবেই পাচ্ছে না। বৃষ্টি বেড়েই চলেছে। একঘন্টা প্রায় চলে যাচ্ছে, তাও বৃষ্টি থামছে না। এদিকে তূর্জানরা বসে থাকায় দোকানী মহিলাও, তার দোকান বন্ধ করতে পারছেন না। রোজা তূর্জানের দিকে তাকায়নি এখন পর্যন্ত। বৃষ্টি উপভোগ করছে, আর হয়তো ভাগ্য নিয়ে ভাবছে। হঠাৎ কি থেকে কি হয়ে গেল। ভাবনার মাঝে তূর্জান একটা চায়ের কাপ এগিয়ে দিল রোজার সামনে। রোজা নিচ্ছে না দেখে বলল, “ চায়ের উপর রাগ দেখাচ্ছিস? “
“ না। “
“ তাহলে চা নিচ্ছিস না কেন? আমার রাগ চায়ের উপর ঢালছিস? “
“ না। “
“ তাহলে কি? “
“ খাবো না আপনার চা। আপনার চা আপনি খান। নয়তো হাতে ঢালুন। আমাকে বিরক্ত করবেন না। ভালো লাগছে না।“
বলতেই তূর্জান চা নিজের হাতে ঢেলে নিলো। কি বিভৎস দৃশ্য। রোজা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কি হলো মস্তিস্ক এখনো ঠিক ধরতে পারেনি। রোজা তূর্জানের দিকে তাকিয়ে বলল, “ কি করলেন এটা? “
“ শুনেছি বিয়ের পর বউয়ের কথা শুনলে জান্নাতে যাওয়া যায়। তাই ফাস্ট দিন থেকেই জান্নাতে যাওয়ার কাজ স্টার্ট করলাম। “
“ পাগল আপনি? দেখুন তো লাল হয়ে গেছে। “
“ তোর কি? “
এর উত্তরে রোজা কিছু বলল না। ছেহ! তূর্জান হয়তো আশা করেছিল রোজা বলবে, আমারই তো সব। দোকানী পানি এনে দেওয়ার আগেই
রোজা তূর্জানকে টেনে এনে বৃষ্টির পানিতে হাত ধরে রাখলো। তারপর আস্তে করে বলল, “ আমি কোনো নায়িকা না যে, আমার ওড়না ছিড়ে হাত বেধে দিবো। হাত এভাবেই রাখতে হবে।“
“ বউ, ওড়না কিন্তু আমার টাকায় কেনা। তুমি এমন কিপ্টা কেন? “
হঠাৎ তুমি শুনে রোজা তাকালো তূর্জানের দিকে। একবার তুমি, আরেকবার তুই, আবার আপনি। দুনিয়ায় আর কিছু থাকলে নিশ্চয় তাও বলতো।
রোজা চোখ নামিয়ে তূর্জানের হাতের দিকে তাকিয়ে বলল, ““ জীবনে কিছু জিনিসের জন্য কিপ্টা হওয়াও ভালো। অনন্ত জিনিসটা থেকে যায়। “
“ একটা ওড়না ছিড়ে হাত বেধে দিলে, আমি আরও দশটা কিনে দিতাম। “
“ লাগবে না। আর কি যেন বললেন? ওড়না আপনার টাকায় কেনা, কোনো জিনিস নিজস্ব বাহুডোরে আটকে গেলে, ওটা নিজেরই একান্ত হয়। “
দুজনের এমন অবস্থা দেখে দোকানী বলল, “ কি বাবুরা, আজকে মনে হয় বৃষ্টি থামবে না। একদম বৃষ্টিতে আটকে গেছেন? “
তূর্জান বলল, “ হুমম। তাই মনে হয়। “
দোকানী হেসে বলল, “ আমার মনে হয়, আজকে বৃষ্টি কমবো না। আপনাগো আইজকা আমার বাড়িতেই থাকতে হইবো।
তূর্জান অবাক হয়ে একবার পুরো দোকানে চোখ বুলালো। তারপর বললো, আপনার বাড়ি এটা ? “
“ হু, এইটা আমার বাড়ি। নিজের সংসার চালানোর জন্য, বাড়ির একপাশে দোকান খুলছি।“
তারপর রোজার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
“ ভাবি আপনের সমস্যা না হলে আমার বাড়িতে থাকতে পারেন। ভাইরে দেইখা তো মনে হয় ভাইয়ের থাকতে সমস্যা হইবো না। আপনে থাকলে ভাইও থাকবো।“
রোজা প্রথমত অবাক, এই মহিলা তাকে ভাবি বলেই যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, তার সামনে তূর্জানের প্রশংসা করে উল্টে দিচ্ছে। পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত কেউ কারোর প্রশংসা সহ্য করেছে যে রোজা করবে?
রোজা তূর্জানের হাত ছেড়ে বলল, “ আমাকে ভাবি বলবেন না। আপু বলতে পারেন, নয়তো আমার নাম রোজাস্মিতা মেহরোজ, রোজা বলতে পারেন। “
“ তাইলে আপু কই। কিন্তু ওনাকে তো আবার দুলাভাই কইতে হইবো। “
ধ্যাৎ রোজা বোঝায় কি মহিলা বোঝে কি? রোজা প্রসঙ্গ পাল্টে বলল, “ আমি আজকে রাত এখানেই থাকছি। চলুন ভিতরে। “
বলেই মহিলার সঙ্গে ভিতরে গেলো। বাড়িটা ছোট হলেও দেখে যা বোঝা গেল, মহিলা পরিষ্কার ভীষণ। রোজাকে নিয়ে যাওয়ার সময় তূর্জানকেও ভিতরে আসতে বাড়ি মহিলাও চলে গেলো। বাধল বিপত্তি,তূর্জানের ছয় ফুট উচ্চতা হওয়ায় সে দরজায় মাথায় বারি খেল। লেগেছে বেশ জোরেই, যেহেতু চোখমুখ কুচকে ফেলেছে। রোজা তূর্জানকে মাথা ডলতে দেখে, হেসে ফেলল। ব্যাথা ভুলেও তূর্জান রমনীর হাসিমুখ দেখতে ব্যাস্ত হলো। রোজা সারাদিনে এমন করে হাসলো। একটু ব্যাথা পেয়ে যদি এমন হাসি দেখার ভাগ্য হয়। তবে পৃথিবীর প্রত্যেক পুরুষ হাসি দেখতে প্রস্তুত।
মহিলা বেশ তোরজোর করেই সবজি আর ভাত রান্না করলো। মানা করেছিলো। তবে দোকানী ভীষণ খুশি, হয়ে বলল তার ঘরে নাকি মেহমান আসে না। সে গরিব কিন্তু সেও চায় অন্যদের মতো মেহমান আপ্যায়ন করবে।যদিও রোজা তূর্জানের ক্ষুধা লেগেছিলো। তাই বেশি নিষেধ ও করেনি। মহিলার বাড়িতে মাত্র দুইটা রুম। একটাতে তার অসুস্থ ছেলে থাকে। আরেকটা তে তূর্জান আর রোজাকে থাকতে দিলো। রোজা যদিও বলেছে সে মহিলার সাথে থাকবে। তূর্জান রুমে উপরে টিনের চালের দিকে তাকিয়ে শুয়ে ছিলো। কি সুন্দর টিনের উপর ঝনঝন শব্দ হচ্ছে।
মধ্যবিত্ত ঘরে একটা চৌকি আর কিছু পুরোনো জিনিসপত্র বাদে কিছুই নেই। অথচ ঘরের ভিতরে কত শান্তি। মেয়েরা বুঝি এমনই হয়। উহু মেয়েরা না, মায়েরা, যারা সন্তানের জন্য সব করতে পারে। ভাবনার মাঝেই রোজা প্লেটে খাবার নিয়ে এসে বিছানায় রাখলো। বলল, “ ওই আপু ডাকলো, গেলেন না কেন? না কি বড়লোকী অভ্যাস ছেড়ে একদিন এখানে ওনার ইচ্ছে পূরণ করতে ওনার সঙ্গে বসে খেতে পারতেন না।“
তূর্জান তড়িৎ বেগে চোখ খুলল। উঠে বসে বলল, “ ওখানে গেলে তোর আনন্দে ভাটি পড়তো। “
“ মানে? “
“ কিছু না, ক্ষুধা লেগেছে। “
“ ক্ষুধা লেগেছে খেয়ে নিন। “
তখন ভুল করে ডান হাতেই ঢেলেছিলো ।তূর্জান ডান হাত দেখিয়ে বলল,“ হাত জ্বলছে। “
“ আমি কি করতে পারি? “
“ কিছু না। এবার যেতে পারিস, নয়তো আমার প্রতি বিশ্বাস থাকলে এখানেই শুয়ে পরতে পারিস।“
বলেই আবার শুয়ে পড়ল। চোখ বুজে পড়ে রইলো। রোজা জানে, তূর্জান ওখানে যায়নি কেন? গেলেও তো খাইয়ে দিতে হতো। রোজা ওনার সঙ্গে আনন্দে খেতে পারতো না। যেহেতু রোজার জন্য হাতে চা পড়েছে তো তারই দায়িত্ব। তাই আস্তে করে বলল, “ উঠুন। “
“ ট্রাস্ট করতে পারিস নি। এখন রুম থেকেই বের হতে হবে? “
“ চোখ খুলে কথা বলুন। “
তূর্জান তাকাতেই দেখল রোজা ভাত নিয়ে বসে আছে। তূর্জান এমন সুযোগ হাতছাড়া করে কিভাবে? উঠে পড়ল তাড়াতাড়ি। বউ তার এই ভালো এই রণচন্ডী। রোজাও এইটুকু সহ্য করে নিল। বাড়িতে ফিরেই তূর্জান নেওয়াজ কে দেখে নিবে! এখন একা আছে, চুপ থাকাই শ্রেয়।
জোর করে বিয়ে করা, মোস্তফা নেওয়াজ আর তাজারুল নেওয়াজকে বলে বকা শুনাবে।
এদিকে বাড়িতে সবাইকে মিরান বলেছে, রোজা আর তূ্র্জান সেফ আছে। আর বিয়ের ব্যাপারও বলেছে। কিন্তু যে পাগলামো দুই ভাই করেছে তা বলেনি। বললে নিশ্চিত মোস্তফা নেওয়াজ জুতা ছুড়ে মারতেন। এখন ঠাই হতো, কোনো গাছের নিচে। সবাই চুপই আছে। যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। এখন পরিস্থিতি না ঘেটে ঠিক করাই শ্রেয়। আর মোস্তফা নেওয়াজ ও তূর্জানের চোখে রোজার জন্য যে ভালোবাসা দেখেছে, তা তার মেয়ের জন্য যথেষ্ট।
অনন্ত তার ভালোবাসা তূর্জান নেওয়াজের ভালোবাসার কাছে তুচ্ছ। তার কন্যা সন্তান নেই, সেইজন্যই হয়তো পরিস্থিতি তাকে মেয়ে উপহার দিয়েছিলো। কিন্তু তূর্জানকে তো তিনি দূরে সরিয়ে দিতে পারেন না। কোনো বাবা তো চায় না, মেয়ে কে তার হাজবেন্ড থেকে দূরে রাখতে। আর তূর্জানের সেই একটা ডিসিশনের জন্যই আজ কতগুলো বছর তিনি মেয়ে সন্তান পেয়েছেন। হোক না সে ভাইয়ের বন্ধুর সন্তান।
রাফেজ রাফিয়া যেমন সুখে সংসার করছে। রোজাও এমন একটা সংসার ডিজার্ভ করে।
আরিয়ান আর তুবার বিয়েও ঠিক। এখন তাদের প্রেম জমে খির। মিরান ও চেষ্টায়, আছে যদি ওই পাথরীর মন একটু গলে। বাবারে মেয়েদের মন এত কঠিন হয়। তানিয়া নেওয়াজ ও আজকে বলেছেন, সবাই মিলে এই ঝামেলা শেষ করতে হবে। আর কতদিন তার ছেলে, এভাবে কষ্টে থাকবে? এবার আর রোজার বড় আম্মু হয়ে থাকাটা বোধহয় তিনি ও চান না। তিনিও এবার শাশুড়ি হতে চান। তাজারুল নেওয়াজ কে বলেও কিচ্ছু লাভ হচ্ছে না। তিনি নির্বিকার হয়ে থাকেন। একটা প্রজেক্টই তো লস, তাও তূর্জান তার জমানো, টাকা থেকে বড় এমাউন্টস তাজারুল নেওয়াজের একাউন্টে পাঠিয়ে দিয়েছে। সাথে বলে দিয়েছে, “আমার ওয়াইফের জন্য কারোর লস অনন্ত হয়নি। আপনার প্রজেক্টের চেয়ে বড় এমাউন্ট আপনার একাউন্টে জমা দিয়েছি।“
তবে যাইহোক, রোজা তূর্জানের বিয়ের খবর শুনে পুরো বাড়ি আনন্দে আছে। নেওয়াজ বাড়িতে ছোটখাটো পার্টির আয়োজন করে ফেলেছে মিরান। বৃষ্টি সাথে পরিবারের খুনসুটি।
মিরান তার মায়ের সাথে দুষ্টামি করে বলল,
“ আম্মু। “
“ হুমম। “
“ এইযে তুমি আম্মু থেকে চাচি শাশুড়ি হলে, এটাতে তোমার অনুভূতি কেমন? “
কান্নার অভিনয় করে রেহেনা নেওয়াজ বলল,
“ ফাটাফাটি। “
এবার রাফিয়ার কাছে গিয়ে বলল, “ ভাবি, তুমি যে প্রথমে বোন, তারপর জা, তারপর আবার চাচাতো ভাবি, তারপর আবার জা হচ্ছো তোমার অনুভূতি কেমন?”
“ অনুভূতি গুলোকে এখন অনুভূতি দ্বারা প্রকাশ করতে পারবো না।”
সবাই হাসতে হাসতে বৃষ্টি ইনজয় করল। আর মিশন বানালো, রোজা তূর্জান। যেখানে রাহেলা নেওয়াজ নেতৃত্ব দেবেন। আর মিরান তো আছেই।
রোজা তূর্জানকে খাইয়ে দিয়ে, তূর্জানের পাশেই শুয়ে পড়েছে। যদিও আলাদা ওই আপুর ঘরে থাকতে চেয়েছিল। কিন্তু উনি নাকি ওনার অসুস্থ ছেলের পাশে থাকবেন। ওখানে জায়গা হবে না। আর রোজার ও ভীষণ ক্লান্ত লাগছিল, তাই বাধ্য হয়ে একই বিছানায় ঘুমাতে রাজি হয়েছে। তবে মাঝখানে আপুর একটা শাড়ি দিয়ে পর্দা টানিয়ে দিয়েছে। শাড়ির একপাশে তূর্জান, অন্যপাশে রোজা। যদিও রোজা ঘুমানোর আগেই তূর্জান রোজার অসস্থি বুঝতে পেরে বিছানা ছেড়ে উঠে গেছে। রোজা ঘুমিয়েছে অনেকক্ষন।
তূর্জান ভাঙা জানালার পাশে দাড়িয়ে বৃষ্টি উপভোগ করছে। তার ইচ্ছেরা আজ তারপাশে। তাইতো যে সুখ বড় অট্রালিকায় পায়নি, তার থেকে দ্বিগুন সুখ আজ এই ভাঙা বাড়িতে পাচ্ছে। ক্লান্ত শরীরে আজ জেগে থাকতে ইচ্ছে করছে না। অথচ কত রাত ক্লান্ত থেকেও চোখের কোনে ঘুম আনতে পারেনি। তবে আজ অবাধ্য কেন হচ্ছে চক্ষুদ্বয়। মনে, হচ্ছে জেগে থাকলে আজ নিশ্চিত ঘুমে মাতাল হয়ে যাবে। রোজা যেহেতু একপাশে তূর্জানের জায়গা রেখেছে। সেহেতু তূর্জানও মাঝে অধিক দুরুত্ব রেখে শুয়ে পড়ল। একপলক ঘুমন্ত রোজার দিকে তাকিয়ে আনমনেই গেয়ে উঠলো,,
“ কতদিন, ভেবেছি শুধু দেখবো যে তোমায়,
ক্লান্তহীন তুমি ছিলে আমার কল্পনায়।
সেই ছবি উঠলো ভেসে,,
চোখেরই পাতায়।
আমি শুধু চেয়েছি তোমায়,
আমি শুধু চেয়েছি তোমায়।
আমি শুধু চেয়েছি তোমায়,
আমি শুধু চেয়েছি তোমায়।
টালমাটাল মনটা কিছু তোমায় বলতে চায়,
বেসামাল ভাবনাগুলো তোমায় ছুঁতে চায়।
আমি শুধু চেয়েছি তোমায়,
আমি শুধু চেয়েছি তোমায়।
আমি শুধু চেয়েছি তোমায়,
আমি শুধু চেয়েছি তোমায়। ”
আমি শুধু চেয়েছি তোমায়, আমার sweetness rose..
ইনশাআল্লাহ চলমান….
আজকের পর্ব গ্ৰুপে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু যদি ওয়াফাই না থাকে তাহলে তো কাউকে এড দিতে পারবো না। তাই পেইজে পোস্ট করলাম। অনুভূতি কেমন তূর্জানের sweetness rose গণ।
Share On:
TAGS: প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা, ফারজানা রহমান সেতু
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৩৩
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৬
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৩২
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৩৬
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১৬
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৩
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ২৮
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১৭
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ২৬
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১