প্রণয়ের_রূপকথা (৮১)
বিয়ের অনুষ্ঠান আর মাত্র কিছুদিন পরেই। দীপ্র চাচ্ছিল খামারটা বিয়ের অনুষ্ঠানের আগেই হয়ে যাক। তবে সেটা সম্ভব হচ্ছে না। সব মিলিয়ে ও বিরক্ত। অরণ্যকে ডেকে পাঠিয়েছিল। অরণ্যটাও আসছে না। ও কল করল।
“তুই কোথায়?”
“আসছি ব্রো।”
“সেই কখন বলেছিস আসছি। এত সময় লাগে?”
“সময় তো লাগবেই ভাই। তুই যখন কল করিস তখন আমি রোমান্সে বিজি। তবু আমি আমার রোমান্স ফেলে তোর জন্য ছুটে আসছি। বুঝিস এর মানে?”
দীপ্র ঠোঁট কামড়ে ধরে। অরণ্যই বলে,”মানে হলো বউয়ের থেকে বউয়ের ভাইয়ের প্রতি বেশি দরদ।”
ওর ফালতু কথা আরো কতক্ষণ চলল। দীপ্র এবার বিরক্ত। ও বলল,”আসার দরকার নেই। রাখ তুই।”
“আরে এই দীপ্র….
বলতে বলতে কল কেটে গেল। স্ক্রিনে চেয়ে অরণ্য হতাশ হলো। ও যখন দীপ্রর রোমান্সে বারোটা বাজিয়েছিল তখন তো খুব কথা শোনানো হয়েছে। আর এখন, দীপ্র ও তো ওর রোমান্সে বারোটা বাজাল। অথচ ও দোষ দেয় নি। বরং রোমান্স ফেলেই চলে এসেছে। কিন্তু ছেলেটা মিনিমাম কৃতজ্ঞতা দেখাল না! একেই হয়তো বলে নিজের বেলায় আঁটিসাটি। পরের বেলার দাঁত কপাটি।
অরণ্য ভেবেছিল এসে রাগ দেখাবে। কিন্তু তা আর হলো না। দীপ্র নিজেই রাগ দেখাল। দেখাল অভিমান। শেষমেশ অরণ্য বলল,”সরি ভাই। এমন করছিস কেন।”
“তুই বুঝছিস না অরণ্য। এটা খুব জরুরি।”
“বুঝেছি তো। কিন্তু এই সময়ে কীভাবে কী হবে বল?”
“সেটা জানি না। তুই করে দিবি।”
অরণ্য বিছানায় পা তুলে বসে। তারপর বলে,”ইতিহাসে তুই ই একমাত্র বর, যে বাসর রাতে বউকে গোরুর খামার উপহার দেবে।”
ওর কথায় মুচকি হাসে দীপ্র। সবাই জানে খামারটা এখন তৈরি সম্ভব না। তবে দীপ্র চায় কুহুকে চমকে দিতে। সেই জন্যই তো অরণ্যর সাহায্য প্রয়োজন। ও বলে,”আমি দীপ্র দেওয়ান। নতুন ইতিহাস তৈরি না করতে পারলে, কেমন স্বামী হলাম বল?”
অরণ্য জবাবে স্যালুট জানায়। হেসে বলে,”ঠিক আছে বস। আমি দেখছি। আপনার জন্য কী করতে পারি।”
কুহুর দরজায় ঠকঠক করতেই কুহু বলল,”কে?”
“আমি।”
দীপ্রর কণ্ঠ পেয়ে ঘুরে চাইল কুহু। বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়ল। ওড়না টেনে নিয়ে বলল,”কিছু বলবেন?”
“বলব। তবে ঘরে আসতে বলবি না?”
“ও হ্যাঁ, আসেন। অনুমতি কেন নিতে হবে?”
দীপ্র কিছু কিছু বিষয়ে খুব জেন্টেল। এই বিষয় গুলো কুহুর খুব ভালোও লাগে। দীপ্র ঘরে প্রবেশ করে বলল,”তোকে দেখি না ঠিকঠাক। কিছু হয়েছে? সারাক্ষণ ঘরেই কাটাচ্ছিস। আবার ছুটিও নিলি স্কুল থেকে। কারণ কী হুম?”
চোখের দৃষ্টি উঠানো ছিল। কুহু নামিয়ে বলল,”এমনি।”
“আসলেই এমনি?”
জোরাল প্রশ্নের মুখে মেয়েটি বলল,”না মানে, চাচ্ছিলাম নিজের যত্ন নিতে। আমি তো অত যত্ন নিই না নিজের। বিয়ের অনুষ্ঠানে যদি ভালো না দেখায়, তখন লোকে কী বলবে?”
“কী বলবে?”
বলে কয়েক পা এগোল দীপ্র। এতে করে ওদের দূরত্ব কমে এলো। এই তো হাত বাড়ালেই মানুষটাকে ছোঁয়া যায়। কুহু অবশ্য ছুঁয়ে দেখল না। বরং অন্যপাশ ফিরে নরম ভাবে বলল,”বলবে দীপ্র দেওয়ানের বউ তো সুন্দর না।”
ওর কথায় হাসল দীপ্র। হাত বাড়িয়ে ওপাশ ঘুরে থাকা মেয়েটির মুখ টেনে নিতেই কুহু আলগোছে দীপ্রর বুকে মাথা রাখল।
“জানেন, আমার না সারাক্ষণ ভয় হয়। যদি কারো মনে হয়, আমি আপনার যোগ্য নই। আমি সুন্দর নই। মানাচ্ছে না আপনার পাশে।”
দীপ্র আর পারে না। মেয়ে জাতি হয়তো এমনই। এদের বর যদি সুন্দর হয়, তখন এরা নিজেকে নিয়ে অস্বস্তিতে ভোগে। ভাবে সে হয়তো যোগ্য নয়। মানানসই নয়। অথচ প্রকৃত বরের চোখে তার বউ হয় জান্নাতি হুরের থেকেও সুন্দর। এ কথাটা কীভাবে বোঝায় দীপ্র?
“কুহু।”
বলে একটু হতাশার মতন শ্বাস ফেলে ছেলেটি। বুক থেকে মেয়েটির মাথা সরিয়ে নেয়। হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে নেয় গাল। আদুরে, অপরাগ ভাবে বলে,”তোকে কী করে বুঝাই। আমার চোখে ঠিক কতটা সুন্দর তুই। কীভাবে বোঝাই বল তো।”
ব্যর্থতা ওর কণ্ঠে। যার তীব্রতা কুহুর দু চোখে খুশি হয়ে নামে। ও মাথা তুলে বলে,”আসলেই সুন্দর?”
“হুম। খুব সুন্দর। খুব মানে খুব। ঐ আসমানের চাঁদ, সমুদ্রের ঢেউ, পাহাড়ের বৃষ্টি, রাতের অন্ধকার কিংবা দিনের আলো, সব কিছুর থেকে তুই বেশি সুন্দর কুহু। বেশি সুন্দর তুই।”
তীব্র ভালো লাগায় কুহুর মনটা প্রজাপতি হয়ে যায়। ও ফের মাথা রাখে দীপ্রর বুকে। হাত দুটো শক্ত করে ধরে কোমর। নাক ঘষতে থাকে বুকে। তারপর বলে,”আপনি মন খারাপ করবেন না আর। আমি জানি খামারটা এখন তৈরি হবে না।”
দীপ্র ছোট করে বলে,”হুম।”
“কদিন বেশ সময় দিয়েছেন। আর দিতে হবে না।”
“আচ্ছা দেব না।”
“হুম। দেবেন না। এই কটা দিন আমার চোখের সামনে বসে থাকবেন। কেমন?”
এবার দীপ্র হাসে। ঠোঁট কামড়ে বলে,”সামনে বসে থাকব?”
“হুম।”
“সামনে বসে থাকলে, মুশকিল হবে না?”
“কেন? মুশকিল কেন হবে?”
“হবে না?”
কুহু বুঝে না। দীপ্র ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে। দুষ্টুমির সুরে বলে,”জানিস না কথাটা? কিছু মানুষ বসতে পেলে শুতেও চায়। আর স্বামী হিসেবে আমি কিন্তু শুধু বসে, শুয়েই শান্ত হব না। আমি কিন্তু বেশ লোভী। সামাল দিতে পারবি তো?”
বলেই মেয়েটির কপালে কপাল ঠেকায় ও। হাত দিয়ে গাল ছুঁয়ে ঠোঁট দিয়ে ঠোঁট ছুঁতে যাবে ঠিক সে সময়েই জেসমিনের আগমন ঘটে। ও ঘরে প্রবেশ করেই চ্যাঁচিয়ে উঠে।
“ও আল্লাহ গো, আল্লাহ গো আমি কিছু দেখি নি। কিছু দেখি নি।”
কুহু ছিটকে সরে যায় দীপ্রর থেকে। দ্রুত নিজেকে ঠিক করে বলে,”এই চুপ। এভাবে চ্যাঁচামেচি করছিস কেন? চুপ কর জেসমিন। দোহাই লাগে। কে এসে পড়বে।”
জেসমিন তবু থামে না। চিল্লাচিল্লি চলতেই থাকে। কুহু দ্রুত এসে ওর মুখ চেপে ধরে।
“পাগল, চুপ কর তুই।”
জেসমিনে আটকানো মুখেই কিছু একটা বলতে চায়। তবে পারে না। উম উম শব্দ হয়। কুহু ছাড়ে ওর মুখ। জেসমিন হাপাচ্ছে তখন।
“ধীরে বলবি।”
“আইচ্ছা।”
বলে মাথা কাত করে। তারপর কেমন লজ্জা পায়। দীপ্র আড়েআড়ে চায়। জেসমিন লাজুক ভাবে বলে,”আপনারা এত রোমান্টিক। মাঝে মাঝে তো আমারো….
দীপ্র এবার ডেকে উঠে।
“জেসমিন!”
ওর কথায় জেসমিন দাঁত কেলিয়ে হাসে। বলে,”জি ভাইজান।”
“চুপচাপ নিজের কাজে যা। একে তো অন্যায় করেছিস। আবার হাসছিস!”
“অন্যায়?”
জেসমিন বুঝে না। দীপ্র গম্ভীর ভাবে বলে,”তো? কেউ যখন তার বউয়ের সাথে রোমান্স করে, তখন ঘরে ঢুকে পড়া অন্যায় না? অনুমতি নিয়ে ঘরে আসতে হয় জানিস না?”
“না মানে ভাইজান। আমি তো আগে অনুমতি নিই নি।”
“এখন থেকে নিবি।”
“আচ্ছা ভাইজান।”
বলে ঘর ছাড়ে জেসমিন। কুহু বলে,”অনুমতির বিষয় আবার বলতে গেলেন কেন?”
“তো? বলব না? তোর বর আছে। আর বরের যখন মন চাইবে, সে রোমান্স করতে চলেও আসবে। যার তার আগমনে সে বেশ বিরক্ত হয়। বুঝেছিস?”
কুহু মাথা কাত করে। ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে। দীপ্র দম ফেলে। বলে,”এখনকারটা তোলা রইল। পরে এসে শোধ নেব। এখন যেতে হবে।”
“কোথায় যাচ্ছেন?”
“যাচ্ছি একটা কাজে। শহরের দিকে।”
“আপনার কাজ কি শেষ হয় না? বললাম না কাছে বসে থাকবেন।”
কুহুর চোখে মুখে অভিমান। দীপ্র হাত বাড়িয়ে ওর মাথা ছুঁয়ে দেয়। বলে,”দ্রুত ফিরে আসব। কথা দিলাম তোকে।”
দীপ্র ঘর ছাড়ে। কুহু দরজার কাছে এসে দাঁড়ায়। মানুষটার যাওয়া দেখে। ওর উপস্থিতি টের পায় দীপ্র। পেছন ঘুরে দেখার লোভ সামাল দিতে পারে না। যেতে যেতে ফিরে চায়। কুহু হাত নাড়িয়ে বলে,”ফেরার পথে আইসক্রিম আনিয়েন। সাথে ঝাঁল দিয়ে পেয়ারা মাখা। বড়ো মায়ের দোয়া দরুদ পড়ে ফু দেয়াটা কাজে লেগেছে বোধহয়। আজকাল যেন কি হয়ে গেছে। এত বেশি খেতে ইচ্ছে করছে।”
মুচকি হাসে দীপ্র। বলে,”ঠিক আছে আনব। আপনি নিজের খেয়াল রাখবেন ম্যাডাম।”
** আপনাদের কাছে গল্পটা কাঁটা হয়ে গেছে। আমারো। তাই আপনারা রেসপন্স করেন না। আমিও লেখার আগ্রহ পাই না। তবে দায় আছে। শেষ তো করতে হবে। ৯০ পর্বের মধ্যেই শেষ করে দেব ইনশাআল্লাহ। আর যারা বই হিসেবে দীপ্র-কুহুকে চেয়েছিলেন তাদের জন্য………
চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি
Share On:
TAGS: প্রণয়ের রূপকথা, ফাতেমা তুজ নৌশি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩৯
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৮
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩৪
-
কি আবেশে পর্ব ২৭
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৭৪
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৭
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪৫
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫৯