অ্যারেঞ্জম্যারেজ২ — পর্ব ১০
অবন্তিকা_তৃপ্তি
গতকাল সারাটারাত, কেন যেন হুট করে শোয়েব-তিতলির মধ্যে অদ্ভুত এক নাজুক পরিস্থিতি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। শোয়েব লজ্জা হোক বা অপরাধবোধ; তিতলির থেকে দূরে থেকেছে। আর তিতলি মেয়ে তো, ও আগ বাড়িয়ে শোয়েবের লজ্জা কাটানোর চেষ্টাটুকু অব্দি করেনি। দুজন-দুজনের মতো, সকাল করেছে। শোয়েব ঘুম থেকে উঠেছে এলার্মের শব্দে। তিতলি ওর পাশটায় ক্যাজুয়াল পাজামা সেট পড়ে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। পাজামা সেটের পাজামা হাঁটুর কাছে উঠে এসেছে বেখেয়ালে। শোয়েব ওর পায়ের দিকে তাকাল, নগ্ন-ধবধবে দুটি পা। শোয়েবের বুক কাপে। ও দীর্ঘশ্বাস ফেলে আলগোছে পাজামা ঠিকঠাক করে নামিয়ে নিলো। পরে নিজেকে সামলে; তিতলির বাহু ঝাকালো——-‘তিতলি; এই তিতলি। প্লিজ উঠো , আমি চলে যাব। তিতলি?’
তিতলি ডাকাডাকিতে ঘুমঘুম চোখদুটো মেলে তাকাল। সয়েন ওর মুখের উপর ঝুঁকে ছিলো। তিতলিকে চোখ মেলতে দেখে শোয়েব ভ্রু উচালো,
——-‘পরে ঘুমিও। এখন উঠে আন্টি মানে আম্মুকে বলে আসো- আমি বেরুবো। কাজ আছে।’
তিতলি হামি তুলে, ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠে বলল——-‘এখন বেরুবেন? আম্মু দিবে না তো। দুপুরে লাঞ্চ করবেন না?’
‘না, সময় নেই। প্লিজ ম্যানেজ করো ব্যাপারটা।’ —- শোয়েব বলল। তিতলি ঘড়ি দেখে। সকাল ১১ টা বেজে গেছে ততক্ষণে। তিতলি উঠে বসলো। চুলগুলো এলোমেলোভাবে খোপা করে ঘুমঘুম স্বরে বলল——-‘আপনি বসুন, আমি ব্রাশ করে আসি।’
শোয়েব তখন হা করে তিতলির খোপা করাটা দেখছিল। ঘুমঘুম চোখে কি যে মারাত্মক লাগছিল তিতলিকে- একমাত্র শোয়েবই সেটা বুঝতে পারছে। পরপর শোয়েব নিজেকে সামলে, ছোট স্বরে বলল,
‘হু, দ্রুত করিও।’
তিতলি ব্রাশ করতে একটা থ্রিপিস নিয়ে বাথরুমে চলে গেল। পরে পায়রা বেগম শোয়েবের কাজ আছে দেখে তেমন একটা জোড করলেন না। বরং শোয়েবকে বারবার বলে দিলেন,
ফ্রী হলেই যেন এ বাড়ি আসে।পায়রা সাচ্ছন্দে শোয়েবকে জামাই আদর করতে চান। শোয়েব লজ্জা পেয়ে হাসলো শুধু, মাথা নেড়ে সায় দিল। ওকে বলা লাগবে না এ বাড়ি আসার কথা। যতদিন তিতলি এখানে আসে, শোয়েবের এ বাড়ি আসতে হবে। ভালোই হয়েছে পায়রা অগ্রিম সেটা জানিয়ে ওকে লজ্জা থেকে বাঁচিয়ে দিলেন।
শোয়েব বেরুবে; পায়রা তিতলিকে বললেন——‘শোয়েবকে এগিয়ে দিয়ে আসো।’
শোয়েব বেরিয়েছে, তিতলি পেছন-পেছন। শোয়েব গাড়িতে উঠার আগে অনেকক্ষণ দাঁড়াল। তিতলি মাথাটা নামিয়ে দাড়িয়ে ছিলো। একসময় বলল——-‘দাঁড়ালেন যে? কিছু বলবেন?’
শোয়েব থামল; বেশখানিক পর ছোট স্বরে বলল———‘তোমার সময় কতদিন লাগবে তিতলি?’
‘কিহ?’ —— তিতলি হা হয়ে তাকাল শোয়েবের দিকে।
শোয়েব এমন একটা রিএকশন দেখে নিভে গেল। সাথেসাথে চোরের মতো করে বলল——-‘নাথিং, নাথিং। আসি এখন। ভালো থেকো।’
শোয়েব গাড়িতে উঠবে, তিতলি ওকে থামিয়ে দিল। শোয়েবের দিকে তাকাল ও। শোয়েব ভ্রু কুচকায়——-‘কিছু বলবে?’
তিতলি শোয়েবের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে, একসময় ভীষন গম্ভীর স্বরে বলল————‘একবার এক রাজার একটা রাজ্য জয় করতে ইচ্ছে হয়েছিল। রাজা সে ব্যাপারে তার প্রিয় নাপিতের কাছে জিজ্ঞেস করেছিল: সে রাজ্য জয় করবে কি না। নাপিত রাজাকে নিয়ে সেদিন হেসেছিল অনেক। বুঝেছেন? বুঝেছেন কিছু?’
শোয়েব ভ্রু কুচকে তিতলির দিকে তাকিয়ে থাকে,——-‘এটার মানে কি? রাজা-রানির গল্প কোত্থেকে এলো এখানে?’
তিতলি মৃদু হাসল——‘কিছু না; এমনি। আসুন এবার। দেরি হচ্ছে না আপনার?’
শোয়েব তবুও তিতলির দিকে সন্দেহের চোখে তাকিয়ে রইল। তিতলি স্রেফ হাসল পালটা। শোয়েব সেদিন চলে গেল কাজে। তিতলি সেদিন শোয়েবের এ বোকামিতে ভীষণ-ভীষণ হেসেছিল। কতবড় বুদ্ধু একটা, আর নিজেকে কি না সাইকিয়াট্রিক ভাবে। হাঁহ.. !
——————————-
বেশ কদিন পর. . .
সামনে তিতলির টেস্ট এক্সাম। অনেকদিন পর নিয়মিত আবার পড়াশোনায় ফিরেছে তিতলি। সারাদিন কোচিং, টিউশন; স্যারের বাসা দৌড়া-দৌড়ি করে শোয়েব ও ওর মধ্যে বেশ কম সময়েরই আদান-প্রদান হচ্ছে। যাও টুকটাক কথা হয়; সব ফোনে। তিতলি সারাদিন শেষে মাগরিব পর যখন বই-খাতা খুকে বসে: শোয়েব তখন কল করে। আধা ঘণ্টা দুজন কথা বলে কল কেটে দেয় শোয়েব। নাহলে কল ধরে রাখলে এই মেয়ের পকর-পকরই শেষ হয়না।
আজও- তিতলি মাত্রই গোসল করে চুলে টাওয়াল পেঁচিয়ে এসে পড়ার টেবিলে চা নিয়ে বসেছে। তখনই শোয়েবের কল এলো। এটা এখন রোজকার নিয়ম হয়ে গেছে শোয়েব-তিতলির জন্যে। মাগরিব পর; ৭:৩০ এ শোয়েবের কল আসা এখন বাধ্যতামূলক. ! তিতলির ঠোঁটে হাসি ফুটে। ও ভিডিও কলটা রিসিভ করে ওর সামনে ঠেস দিয়ে রাখল।
শোয়েব মাত্রই চেম্বারে যাবার জন্যে রেডি হচ্ছে। তিতলি শোয়েবের রেডি হওয়া দেখে। শোয়েব আয়নায় দাড়িয়ে শার্ট ইন করছিলো। সাদা ফর্মাল শার্ট পড়েছে আজ ও। তিতলি ওকেই দেখতে থাকে হা হয়ে। শোয়েব আয়নায় তাকিয়ে তখনও, নিজের মতো বলে;
‘হ্যাই: কি অবস্থা?’
তিতলি ওকে দেখতে দেখতে জবাব দিল——‘ভালো না; টায়ার্ড ভীষণ। আর ভালো লাগে না এই বিজি লাইফ।’
শোয়েব চুল সেট করছে; ওভাবেই বলে——-‘আর কটাদিন। তারপর এক্সাম শেষ হলে আমরা কোথাও ঘুরতে যাব। তোমারও রিফ্রেশমেন্ট হয়ে যাবে। জানিও কই যেতে চাচ্ছো.।’
তিতলি মুখটা ভার হয়ে যায়, শুকনো কণ্ঠে বলল———‘আপনি আমাকে এখন দেখতে আসেন না কেন?’
শোয়েব রেডি হওয়া শেষ। ও ফোনটা হাতে নিয়ে বিছানায় এসে বসে। তিতলির শুকনো মুখ দেখে: পরপর বলল———‘এক্সাম তো তোমার। এখন আমি আসলে পড়াশোনাতে ডিস্ট্রাক্ট হবে।’
‘হবো না; আপনি এত বেশি বুঝেন কেন?’ —— তিতলি বিরক্ত হলো এবার।
শোয়েব তিতলির গোলগাল অভিমানী মুখটুকুর দিকে চেয়ে থাকে: পরে নিঃশব্দে হাসল, বলল———‘এক্সাম কবে শেষ?’
‘১০ তারিখ। আপনি কিন্তু আমার কথার জবাব এখনও দেননি। আসবেন কবে?’ —— তিতলি নাছোড়বান্দার মতো বলেই যায় আবার।
শোয়েব ক্যালেন্ডার দেখে———‘আজকে ৫ তারিখ। আর ৫ দিন। শুক্রবারে আমি আসব, চেম্বার নেই, থাকব তোমাদের ওইখানে। হবে এখন? খুশি?’
তিতলি ক্লান্ত কণ্ঠে বলল———‘আরও ৫ দিন?’
শোয়েব ওকে এত অধৈর্য হতে দেখে হেসে ফেলে। নিজেও মজা করে বলল———‘আগে আসলে কি দিবা? তোমার তো সময় নেওয়া হচ্ছে এখন। আমার লাভটা কি আগে আসলে?’
তিতলি গাল ফুলালো,রেগে আগুন হয়ে বলল——-‘আপনি একটা বুদ্ধু; ব্রেইনওয়ালা বুদ্ধু আপনি।’
তিতলি কলটা কেটে দিল ঠাস করে। শোয়েব ওদিকে আহাম্মক। হলোটা কি এটা? শোয়েব ফোনটা হাতে নিয়ে আবার কল দিল তিতলির নম্বরে। তিতলি কল কেটে দিল। শোয়েব আবার কল দিল, তিতলি আবার কাটল। শোয়েব এখন মেসেজ দিল———-‘কল কাটো কেন? আমার কল কাটা পছন্দ না তিতলি। হয়েছে কি, কথা না বললে বুঝব কি করে? কি বুদ্ধুর কাজ করেছি আমি?’
তিতলি এবার তো আরো আগুন হয়ে গেল। ও পাল্টা মেসেজ করে————-‘একদেশে এক বুদ্ধু রাজা ছিলো। সেই বুদ্ধু রাজা হলেন: মিস্টার শোয়েব মুনতাসীর। আমি আপনার কল ধরব না; কল করবেন না এখন আমাকে আর। বাই।’
শোয়েব মেসেজটা পড়ে আরও আহাম্মক। হা করে মেসেজটার মানে বোঝার চেষ্টা করল। রাজা? রাজা? তিতলি তো ওইদিনও এক রাজার গল্প বলেছিল? শোয়েব মনে করার চেষ্টা করল গল্পটা। শোয়েবের গল্পটা বিড়বিড় করে নিজেকে আবার শোনাল,
‘একবার এক রাজার একটা রাজ্য জয় করতে ইচ্ছে হয়েছিল। রাজা সে ব্যাপারে তার প্রিয় নাপিতের কাছে জিজ্ঞেস করেছিল: সে রাজ্য জয় করবে কি না। নাপিত রাজাকে নিয়ে সেদিন হেসেছিল অনেক। ‘
মানেটা কি ছিলো এটার? পরপর শোয়েবের মাথার তার খুলে যায়। ব্রেইন ঠিক এতক্ষণে ফাংশন করা শুরু করে। শোয়েব হা হয়ে যায় মুহূর্তেই।
চলবে
সবাই রিঅ্যাক্ট-কমেন্ট করবেন। আমি আজ সবার কমেন্টের রিপ্লাই করব।
Share On:
TAGS: অবন্তিকা তৃপ্তি, অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ সিজন ২
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৪
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ১৯
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৩৩
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৬
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৪৩
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৫০
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৪৫
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৪০
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৫২
-
অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ সিজন ২ পর্ব ১