ডেসটেনি পর্ব ২১ প্রথম অংশ
সুহাসিনি_মিমি
দুদন্ড স্থির হয়ে বসতে পারছেনা প্রিয়ন্তী। বিগত মিনিট ত্রিশ যাবৎ অস্থির হয়ে লাগাতার পায়চারি চালিয়েই যাচ্ছে। ঘরের এক কোণ হতে আরেক কোণ পায়চারি করতে করতেই মাথায় পাকাছে একের পর এক প্রশ্নের সমারোহ। আচ্ছা লোকটা চায়টা কি?কেন করছে আবারও এমনটা?কেন পুরোনো ক্ষত না শুকাতেই সেখানে নতুন ঘা তৈরী করতে উঠে পড়ে লেগেছে সে? আচ্ছা বজ্জাত মানুষতো একটা! বারবার এইরকম আচরণ করার মানে কি দাঁড়ায়? ও কি মানুষ নয়? নাকি ওর মন নেই? খারাপ লাগেনা ওর? আগেরবার যাওয়ার আগে কাঠকাঠ গলায় বিন্দুমাত্র ভাবান্তর না এনে লোকটা যে ও-কে
সরাসরি না বলে দিয়েছিল সেই অনুতপ্তবোধ টুকু ও কি নেই? তাহলে এখন আবার কেন এমনটা করছেন তিনি? এভাবে বারবার মজা নেওয়ার মানেটা কি? এই মজার ছলে আটকেই তো এত বড় একটা ছেকা খেয়েছিলো সেইবার। ভাবতে ভাবতেই প্রিয়ন্তী থেমে দাঁড়ালো। তারপর হঠাৎই রাগে ফুঁসে উঠে বলল বিড়বিড় করে,
“নিজেকে কি ভাবে সে? হুঁ? সবসময় কেন এমন করবে? প্রথমে মানুষকে কনফিউজ করবে, তারপর আবার নিজের মতো করে সরে যাবে!ব্যাটা জোচ্চোর, খাটাস, নিরামিষ, বান্দর, হনুমানের বাচ্চা!”
নিজের অজান্তেই আরও কয়েকটা অর্ধেক উচ্চারিত গালি বেরিয়ে এল ওর মুখ থেকে। রাগের কারণে বুকটা ওঠানামা করছে দ্রুত। অস্থির হয়ে গিয়ে টেবিলের উপর রাখা ফোনটা তুলে নিয়ে কল লাগাতে গেল শ্রেয়া কে। কল বাটনের উপর চাপতে গিয়েও কি মনে করে যেন থেমে গেল। এ-কি করতে যাচ্ছিলো ও?
না, না।এই মেয়েটাকে জানালে নিশ্চই মেয়েটা আগের বারের মতো এবারও ওকে উল্টাপাল্টা লজিকে বুঝ দিতে আসবে। একটা বিরক্ত শ্বাস ফেলে ফোনটা আবার রেখে দিল টেবিলে। দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরল। এভাবে থাকা যাচ্ছে না।এই বাড়িতে থাকলেই তো লোকটার সামনে পড়তে হবে।
আর সেটা চায় না ও। একদমই না।যে অনুভূতিটাকে এত কষ্ট করে চাপা দিয়েছে, ভুলে থাকার চেষ্টা করেছে সেই অনুভূতি আবারও পুনরুৎজীবিত করতে চায়না প্রিয়ন্তী।কিন্তু করবেটা কি?ভাবি অসুস্থ।
এই অবস্থায় ছেড়ে চলে যাওয়াটা নিশ্চই শোভনীয় দেখায় না।প্রিয়ন্তী চোখ বন্ধ করে গভীর একটা শ্বাস নিল। এভাবেও থাকতে পারবেনা যে ও। ফট করেই মাথায় একটা আইডিয়া আসতেই হন্তদন্ত হয়ে দরজার দিকে ছুটলো ও। দরজা খুলে বেরিয়ে পড়ল করিডোরে। সোজা হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে দাঁড়াল ভাবীর রুমের সামনে। দরজাটা ভিরিয়ে রাখা। ওর ভাবি নিচে মায়ের সঙ্গে কথাবার্তা বলছে। উপরে আপাতত ওর ভাই একাই। ভেতরে পাভেল তখন তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে ওয়াশরুম ছেড়ে বেরিয়ে আসছে।
প্রিয়ন্তী আস্তে করে নক করল দরজায়,
“ভাইয়া আসবো?”
“কি রে? কিছু বলবি?”
“ভাইয়া একটু কথা ছিল।”
পাভেল বিছানার ধারে বসে তোয়ালেটা পাশে রাখল।বলল,
“হুম, বল। শুনছি।”
প্রিয়ন্তী থামল এক সেকেন্ড। গলা শুকিয়ে আসছে যেন। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“আমি মানে, আমি ভাবছিলাম এখানে না থেকে বাড়িতে ফিরে যাই ভাইয়া?”
কথাটা বলেই চোখটা নামিয়ে ফেলল ও।পাভেল তৎক্ষণাৎ ভ্রু কুঁচকে প্রশ্নাত্মক চোখে চেয়ে বলল,
“কেন?”
“ সামনে তো আমার পরীক্ষা। প্রিপারেশন নিতে হবে। আর বইও তো সাথে করে নিয়ে আসিনি।”
“আর কোনো সমস্যা নেই তো?”
তৎক্ষণাৎ মাথা নাড়িয়ে বলল প্রিয়ন্তী,
“না ভাইয়া! আর কিছু না। পরীক্ষা সামনে তো। পড়তে হবে। আর বইও আনিনি সাথে করে এভাবে হুট্ করে চলে আসলাম না? তাই বলছিলাম কি, ভাবি নাহয় থাকুক, আমি আর দাদি ছলে গেলে..
“পড়া তোর এমনেতেও হবে না এখন।”
“মানে?”
পাভেল শান্ত গলায় বলতে শুরু করল,
“কাল রাতে আমরা এখান থেকেই গায়ে হলুদের প্রোগ্রামে যাচ্ছি। আমার ফ্রেন্ডের বোনের বিয়ে ভুলে গেছিস? এখান থেকে গেলে রাস্তাটা আরও ইজি হবে।নাহলে দেখা যাবে আরও দূর জার্নি করে যেতে হচ্ছে। তাই আমি ভেবেছি পুরো ফাংশন শেষ না হওয়া পর্যন্ত এখানেই থাকবো।”
প্রিয়ন্তীর মুখের রঙ ফিকে হয়ে এলো পাভেলের কথা শুনতেই।পাভেল আবার বলল,
“একেবারে বিয়ে শেষ হলেই সবাই একসাথে ফিরব বাড়ি। তিন-চার দিন তো লাগবেই। মেনেজ করে নে। এছাড়া আর কোনো সমস্যা নেইতো?”
বলে এক ভ্রু কুঁচকে তাকালো পাভেল। প্রিয়ন্তী তড়িঘড়ি মাথা নেড়ে না বুঝালো। বিয়ের ব্যাপারটাতো পুরোপুরি মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল ওর। এমনকি পাভেলের আগ থেকে বলে রাখা, শপিং যাওয়া সেটাও মাথা থেকে সরে গিয়েছিলো।সবকিছু মিলিয়ে মাথাটা ভনভন করতে লাগল ওর। নিঃসব্দে মাথা নেড়ে বেরিয়ে এলো প্রিয়ন্তী রুম ছেড়ে। করিডোরে দাঁড়িয়েই একবার চোখ বন্ধ করল। তিন-চার দিন! আরও তিন-চার দিন এই বাড়িতে থাকতে হবে। মুখোমুখি হতে হবে ওই লোকটার? কিভাবে পারবে ও নিজেকে সামাল দিতে? উপরন্তু লোকটা ওর পিছে যেভাবে লেগে আছে তাতে না আবার রেগে গিয়ে দূ চারখানা কঠোর বাক্য ছুড়ে দেয়। আজ যদি এই লোকটার জায়গায় অন্য কেউ হতো নিশ্চই প্রিয়ন্তী এভাবে নিঃশব্দে এতকিছু মেনে নিতো না? সম্পর্কের দিক থেকে যে ও আটকা। ভাবীর বড় ভাই হয় সে। প্রিয়ন্তী চায়না ওদের মধ্যে যে বিষয়টা নিয়ে ভুলবুঝাবুঝি হয়েছে সেটা নিয়ে ওর ভাই ভাবীর মধ্যে কোনো প্রকার জামেলার সৃষ্টি হোক।
:
:
:
সেদিন রাতটা প্রিয়ন্তী নিজেকে ঘরবন্দি করে রাখল। বেরোলো না আর। ডিনারটা পর্যন্ত করেনি মেয়েটা।
রুমে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করেই বিছানায় গা এলিয়ে দিল।নিচে গেলে যে লোকটার সম্মুখীন হতে হবে ওকে। যেটা প্রিয়ন্তী একদমই চায়না আর। এমনিতেই লোকটাকে দেখলে পুরোনো স্মৃতি কিরবির করে উঠে। মাথাচারা দেয় মস্তিস্ক জুড়ে। যতই হউক।জীবনের প্রথম ভালোলাগা ওর। ভালোবাসাও তো ছিল। একদমই ভালোবাসিস না প্রিয়ন্তী তুই। ছি। এতোটাও দুর্দশা হয়নি তোর। যে তোকে প্রত্যক্ষভাবে রিজেক্ট করেছে তাকে নিয়ে ভাবার কোনো প্রশ্নই আসে না। ব্যাটা নিরামিষ একটা। মানুষকে এভাবে বিব্রত করে কি মজা পায় কে জানে। মনে মনে নিজেকে নিজেই হাজার ধমকে ধামকে শান্ত করতে চাইলো।
ওদিকে নিচতলায় তখন রাতের খাবারের প্রস্তুতি শেষ।
মোহনা বেগম নিজে হাতে সব গুছিয়ে রেখেছেন।
টেবিলে একে একে বসেছে সবাই। মিতালী, পাভেল, তাজধীর, দাদি।মোহনা বেগম প্লেট সাজাতে সাজাতে হঠাৎ বললেন,
“প্রিয়ন্তীকে ডাকিসনি?”
মিতালী বলল,
“ডেকেছিলাম আম্মু, প্রিয় বোধহয় ঘুমিয়ে গেছে। রুমের লাইট অফ ছিল।”
মোহনা বেগম থামলেন।চোখ তুলে বললেন,
“এই সময় ঘুমিয়ে গেছে? খাবেনা মেয়েটা?”
পাভেল বলল,
“ভার্সিটি থেকে আসার সময় নাকি ফ্রেন্ডদের সঙ্গে খেয়েছিল। খুদা নেই বলল।”
“ওহ!”
সবাই মনোযোগ দিলে খাবারে। খাবারের পুরোটা সময় আর একটা বাক্যও ব্যায় করল না তাজধীর। চুপচাপ যেভাবে এসেছিলো সেভাবে খেয়েই চলে গেল উপরে।
:
:
:
ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গেই পেটের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল প্রিয়ন্তীর। মেয়েটা খুদা সহ্য করতে পারেনা। প্রথমে ঘুমালেও শেষ রাতের দিকেই ঘুম ভেঙে যায় ওর। পেটের মধ্যে ইঁদুর হাতুড়ি পিটা করছে। পরপর দুই গ্লাস পানি খেয়েও শান্ত থাকতে পারছেনা। মাত্র বাজে সকাল ৭ টা। পেটে কিছু না যাওয়া অব্দি শান্তি পাবেনা ভেবেই একপর্যায়ে উঠে বসে ও। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলো নিচে নেমে টুকটাক কিছু খেয়ে নিবে। এত সকালে নিশ্চই ওই নিরামিষ ব্যাটা ঘুম থেকে উঠবে না। যেই ভাবা সেই কাজ। কোনোরকম ফ্রেশ হয়ে নিচে নামতেই চোখে পড়ল বড় সোফাটায় আরামসে বসে বসে সকালের পত্রিকা পড়া মোহনা বেগমে। প্রিয়ন্তীকে নামতে দেখেই চোখ তুলে বললেন তিনি,
“আরেহ প্রিয়ন্তী, এত ভোরে উঠলে যে?”
প্রিয়ন্তী অপ্রস্তুত হাসি দিয়ে নামতে নামতে বলল,
“ঘুম ভেঙে গেছে আন্টি।”
“পেট খালি থাকলে ঘুম কিভাবে আসবে? নিশ্চই ক্ষুদা পেয়েছে?”
প্রিয়ন্তী ইতস্তত করে আমতা আমতা করে বলল,
“ওই মানে একটু পেয়েছে আরকি।”
ভদ্রমহিলা উঠে সোজা কিচেনের দিকে হাঁটা দিলেন। প্রিয়ন্তী অপ্রস্তুত হয়ে আস্তে আস্তে নামল নিচে। কাজের মেয়েটা তখন সকালের নাস্তা বানানোর কাজে ব্যস্ত। মোহনা বেগম নিজের হাতেই পরোটা ছেকে এনে টেবিল সাজালেন। গরুর মাংস গরম করলেন। টেবিলে আগে থেকেই জুস্, ব্রেড রাখা ছিল। প্রিয়ন্তী খানিকটা লজ্জায় দুনোমুনো মনে গিয়ে বসল টেবিলে। বারকয়েক না করল মোহনা বেগম কে এতটা হাইপার হতে হবেনা। যা আছে তাতেই হবে। ভদ্রমহিলা শুনলে তো। প্রীতিন্তীর মাঝে মাঝে খুব অবাক লাগে, মা এত ভালো, ওর ভাবি ওতো কত মিশুক ভালো। তবে ওই নিরামিষ ব্যাটা কার মতো হয়েছে কে জানে।
কাজের মেয়েটা ডিম পোস করে এনে প্রিয়ন্তী কে দেখে অবাক হয়ে বলল,
“আপা! এত সকালে উঠছেন যে? খিধায় ঘুম আসেনাই মনে হয়। না খাইয়া শোন্ কিসের জন্য? আমার মা বলতো না খাইয়া সুইলে শরীর থেইকা হাফ কেজি মাংস নাকি কৈমা যায়। আপনার চেহারাটাও হের লাইগা কেমন শুকনা শুকনা লাগাতাসে।”
প্রিয়ন্তীর লজ্জায় মাথা কাঁটা যাওয়ার মতো অবস্থা। এরকম বিব্রতকর অবস্থায় কোনো শুত্রুও না পড়ুক। ইশ!
:
:
:
সকালের কোমল রশ্মিটুকু সরে গিয়ে ধাবিত হয়েছে খরক্ষরে রৌদ্দুর। সিদ্দিক কুঞ্জের ছাদটা বেশ বিস্তৃতই।চারপাশে নিচের বাগানটা স্পষ্ট দেখা যায় এখান থেকে। সামনে পুরোটা জুড়ে সাজানো বাগান। গোলাপ, গাঁদা, আর নানা রঙের অচেনা ফুলে ভরা বাগানটা। মাঝখানে ছোট্ট ফোয়ারা। যেখান থেকে টুপটাপ করে পানি পড়ার শব্দ ভেসে আসছে। এইসব কিছুই পূর্ণ মনোযোগে ছাদের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে প্রিয়ন্তী।
পরনে ওর গাঢ় পেস্ট রঙের লিনেনের একটা পাকিস্তানি লং থ্রি-পিস। বাতাসে ওড়নাটা আস্তে আস্তে দুলছে। চুলগুলো কাঁটা দিয়ে এলোমেলো ভাবে পেঁচিয়ে রাখা। রুমে থাকতে দমবন্ধ লাগছিলো। তাই উঠে এসেছে ছাদে। খোলা হাওয়ার নিচে থাকলে হয়তো কিছুটা ভালো লাগবে। নিয়মমতো গতকাল রাতেও একই নাম্বার থেকে ওর ফোনে মেসেজ এসেছে। প্রতিদিনের মতো সকালে উঠে সেই ফোনে কল ব্যাক করলেও কোনো লাভ হয়নি। বরাবরের মতো সুইচ অফ এসেছে। প্রিয়ন্তীর আজকাল একটু বেশিই অস্বস্তি লাগে। কেন যেন খুব ভয় ও হয়। দিন দিন সে ভয়ের মাত্রাটা বাড়ছে বৈকি কমছে না। একবার মন চায় বিষয়টা ওর ভাইকে শেয়ার করতে। তবে অনেক কিছু ভেবেই পরবর্তীতে পিছ পা হয়ে যায় ও। শুধু শুধু এসবে ওর ভাইকে জড়ালে দেখা যাবে ওকে নিয়ে অতিরিক্ত টেনশন করবে।
“মিসের কি মন খারাপ নাকি?”
পেছন থেকে ভেসে এলো অতিপরিচিত ভারিক্কি, পুরুষালি গভীর সেই কণ্ঠখানা। প্রিয়ন্তী পিছন ঘুরল না। আর নাতো কোনো উত্তর দিলো। এই লোকটার জ্বালায় দুদন্ড শান্তিতে শ্বাস টাও ফেলা মুশকিল যেন। ঠিক যেখানে সেখানে এসে হাজির! গত রাত থেকে কতভাবে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে—ডিনার পর্যন্ত স্কিপ করেছে। না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। সকালে সবার আগে উঠে খেয়ে পালিয়েছে শুধুমাত্র লোকটার মুখোমুখি না হতে।
ওদিকে তাজধীর কয়েক পা এগিয়ে এলো। এসে দাঁড়ালো কাছাকাছি। লোকটা দাঁড়াতেই পুরুষালি ওই শরীর থেকে ভেসে আসা মিষ্টি সুবাসটা ভুরভুর করে বাতাসের সঙ্গে এসে নাকে ভারি খেল প্রিয়ন্তীর। ততক্ষনে লোকটা আরও কাছে এসে, গলা খানিকটা নামিয়ে আবার বলল,
“মিস বোধ হয় কোনো কারণে আমার ওপর রেগে আছেন?”
বারবার! বারবার একই কথা! এইবার প্রিয়ন্তীর ধৈর্য ভাঙল। জমে থাকা বিরক্তিটা আর চেপে রাখতে পারল না। টগবগ করা চোখে স্ফুলিঙ্গ ঝরে পরল যেন,
“আচ্ছা আপনার আমাকে নিয়ে ইন্টারেস্ট কেন? হ্যা? আপনার তো আবার মেয়েদের ব্যাপারে ইন্টারেস্টই নেই। আপনার ইন্টারেস্ট থাকার কথাতো অন্য কিছুতে…”
প্রথমের কথাটা খানিকটা উচ্চ বাক্য বললেও শেষের কথাটুকু নিজ মনে বিড়বিড় করে করে থামে প্রিয়ন্তী। আড় চোখে তাকাতেই বন্ধি করে নিলো লোকটার গেট আপ। ব্যাটা নিশ্চই সকালের ফ্রেশ শাওয়ার নিয়ে এসেছে। পরনে একটা কালো রঙা ট্রাওজার আর লেমন কালার টি শার্ট। উজ্জ্বল ফর্সা গায়ে লোকটাকে বোধহয় সবকিছুতেই কেমন অদ্ভুত ভাবে মানিয়ে যায়। তুড়ন্ত চোখ সরিয়ে নেয় প্রিয়ন্তী। ছিঃ! নির্লজ্জ মেয়ে। তাকাবি না। একদম তাকাবি না। মনে নেই লোকটা তোকে কিভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। ভেবেই কঠোর হলো প্রিয়ন্তী। সিদ্ধান্ত নিলো এখানে আর এক সেকেন্ড ও না। চলে যাবে নিচে।
ততক্ষনে লোকটা যে এসে একদম পাশে দাঁড়িয়েছে—প্রিয়ন্তী টেরই পায়নি। সে-ও রেলিংয়ে ভর দিয়ে দাঁড়াল। দৃষ্টি স্থির নিচের বাগানে। তারপর সামান্য ঝুঁকে, খুব স্বাভাবিক স্বরেই বলল,
“ইন্টারেস্ট তো থাকতেই হবে, মিস প্রিয়ন্তী! না হলে আজকাল যেভাবে চোরের উপদ্রব বেড়েছে,কখন না জানি বাড়ির মানুষকেই চুরি করে নিয়ে যায়।”
প্রিয়ন্তী কপাল কুঁচকে তাকাল এবার।বলল অনিচ্ছায়,
“মানে?”
“মানে আর কি! স্বয়ং লেফটেন্যান্ট কমান্ডারের বাড়ি থেকে তার অতি প্রিয় মাছ চুরি হয়ে যায় আজকাল। এটা কি কোনো সাধারণ চোরের কারসাজি বলুন? এই চোর নিশ্চই দীর্ঘদিনের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রফেশনাল কোনো চোর টোর-ই হবে।নাহলে দিন দুপুরে চুরি? তাও কিনা আমারই বাড়ি থেকে? এসব কি মানা যায় বলুন?সাহসটা কল্পনা করতে পারছেন? সরাসরি নেভির একজন অফিসারের বাড়ির অ্যাকুয়ারিয়ামে হাত দেওয়া!”
পা থেকে মাটি সরে যাওয়ার জো প্রিয়ন্তীর। গলা শুকিয়ে গেছে ইতিমধ্যে। মাথায় প্রচন্ড জোরে বাজ ভেঙে পড়ল বিনামেঘেই। ইশ! ইশ! ওতো ভুলেই বসেছিল ব্যাপারটা। মাথা থেকেই তো বেরিয়ে গিয়েছিলো বিষয়টা। এখন কি হবে? পরপর বলে গেল লোকটা,
“লোকজন যদি শোনে কি বলবে বলুন তো?
যে নিজের বাড়ির একটা ছোট্ট অ্যাকুয়ারিয়ামের মাছই নিরাপদে রাখতে পারে না সে নাকি সমুদ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে! হাসবে না আমায় নিয়ে?আজেবাজে কথাওতো রটাবে।”
তিরটা ঠিক জায়গাতেই লাগল।প্রিয়ন্তীর বুকের ভেতরটা কেমন হু হু করে উঠল।হাতের আঙুলগুলো থরবর করে কেঁপে উঠল। শুষ্ক গলায় ঢোক গিলল। মনে মনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। তাহলে কি লোকটা জেনে গেছে?যে ওই চুরি করেছে মাছটা?পরের সেকেন্ডেই নিজেকে থামাল সে। নিজেকেই ধমকাল মনে মনে। লোকটা তো জানেই না কে নিয়েছে! তাহলে ও এত ঘাবরাচ্ছে কেন? স্ট্রং হ প্রিয়ন্তী। ডোন্ট বি প্যানিকড। কিছু হয়নি। গভীর একটা শ্বাস নিল প্রিয়ন্তী। মুখের অভিব্যক্তি শক্ত করল জোর করে।প্রিয়ন্তী নিজের ভেতরের অস্থিরতা চেপে রেখে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক গলায় বলে উঠল,
“একদম ঠিক করেছে!”
তাজধীর কয়েক সেকেন্ড স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ওর দিকে।তারপর আকস্মিক শব্দ করে হেসে উঠল লোকটা। আশ্চর্য। এ ব্যাটার আবার কি হয়েছে। পাগলের মতো এভাবে হাসছে কেন হঠাৎ? এমা কিছু বুঝে ফেলেছে নাকি আবার?
“আনফরচুনেটলি ঐযে, ওইখানে একটা সিসি ক্যামেরা লাগিয়েছিলাম কোনো একদিন।উম শুধু এখানে না, বাড়ির প্রায় প্রতিটা কোণেই লাগানো হয়েছিল আরকি। দুর্ভাগ্যবশত প্রতিটি সিসি ক্যামেরাই সচল। মানে একদম ঠিকঠাক আরকি।”
পাশে দাঁড়িয়েই সামান্য ঝুঁকে আঙুল তুলে নিচের গেটের দিকে ইশারা করে বলল কথাগুলো। প্রিয়ন্তীর বুক ধড়ফড় করে উঠল আচমকাই।গেছিস প্রিয়, তুই গেছিস এবার।পরপর শুনতে পেল আবারও,
“কি করব বলুন? বাড়িতে তো আর থাকি না। আম্মু একা থাকেন, মিতালীও তখন ছিল। মা-বোনের নিরাপত্তার দায়িত্বটা তো আমারই। কাজের দোহাই দিয়ে তো এসব দায়িত্ব থেকে পালানো যায় না, তাই না?”
প্রিয়ন্তীর গলা শুকিয়ে কাঠ। ঢোক গিলল বহু কষ্টে।
মনে হচ্ছে গলা দিয়ে শব্দই বের হবে না।চোখ-মুখ কুঁচকে, মিনমিন করে বলল,
“তো আমাকে এসব বলছেন কেন আপনি?চুরি কি আমি করেছি নাকি?নাকি আমি শুনতে চেয়েছি?”
তাজধীর ভ্রু গোটালো। তারপর একদম নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ট্রাউজারের পকেট আচমকাই ওর ফোনটা বের করল। স্ক্রিন অন করল। একটু স্ক্রল করে থামল কোথাও একটা। তারপর একটা ভিডিও প্লে করে ফোনটা প্রিয়ন্তীর দিকে এগিয়ে ধরল সেটা। বলল বড্ড স্বাভাবিক গলায়,
“দেখেন তো এনাকে চিনেন কিনা। আমার কাছে কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে।মেয়ে মানুষের প্রতি আমার ওইরকম কোনো ইন্টারেস্ট নেই তো। অভিজ্ঞতাও কম। আপনি বোধ হয় চিনবেন। দেখুন না। একটু ভালো করে দেখুন চিনেন কিনা?”
প্রিয়ন্তী প্রথমে তাকাতে চাইল না। কিন্তু পরিস্থিতি এমন—না তাকিয়েও উপায় নেই। ভয়ে ভয়ে চোখ তুলল। স্ক্রিনে দৃষ্টি পড়তেই চোখ দুটো একদম কপালে উঠল বিস্ময়ে। বাকরুদ্ধ, কিংকত্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে রইলো কতক্ষন। ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে—
চারপাশ ফাঁকা দেখে চুপিচুপি ছাদে উঠছে একটা মেয়ে। পায়ের শব্দ কমানোর জন্য প্রায় টিপটো করে হাঁটছে। দরজার কাছে এসে একবার ডান-বাম তাকাল।তারপর অতি সপ্তপর্ণে চিলেকোঠার দরজাটা খুলে ঢুকলো ভিতরে।সোজা এগিয়ে গেল অ্যাকুয়ারিয়ামের সামনে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল—
মাছটার দিকে তাকিয়ে। তারপর আবার চারপাশে তাকাল একবার।আকস্মিক টপ করে হাত ঢুকিয়ে দিল পানির ভেতর! পরের সেকেন্ডেই হাত ছিটকে বের হলো। মাছটা ছটফট করছে মেয়েটার হাতে।
ভিডিওর মেয়েটা আঁতকে উঠে প্রায় লাফ দিয়ে পিছিয়ে গেল। আবার চারপাশে তাকাল ভয়ে।
তারপর কষ্ট করে আবার ধরল মাছটা। এইবার সাবধানে একটা ছোট কাঁচের বয়ামে ঢুকাল ব্লু হাফমুন ফিশটা। ঢুকানোর পরও বয়ামটা ধরে দাঁড়িয়ে আছে—
মুখে এমন ভাব, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অপরাধ করে ফেলেছে! শেষে আবার টিপটো করে দৌড়ে পালাল ঘর ছেড়ে। দরজা বন্ধ করতে গিয়েও একবার পিছলে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল! জাস্ট এতটুকুই। ভিডিও শেষ। প্রিয়ন্তীর মুখের রং ফ্যাকাসে। ঠিক চোর ধরা পড়ার মতোই হয়ে আছে। পুরো শরীর বরফ হয়ে জমে আছে জায়গাতেই।শেষ! মান সম্মান যা ছিটেফোঁটা বেঁচে ছিল সেটাও শেষ আপাতত। ধরা পড়ে গেছে সে।
একেবারে হাতে-নাতে। একটা কাজ ও ঠিকঠাক মতো করতে পারিস না? হতচ্ছাড়ি গাধী তোকে শ্রেয়া এমনিতেই বলে? একবার তো ভালো করে দেখে নিবি কোথাও কিছু আছে কিনা। মনে মনে নিজেকেই গাল দিতে ইচ্ছে করছে ওর। লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে একপ্রকার। এই মুহূর্তে যদি ছাদের রেলিংটা একটু নিচু হতো—হয়তো সত্যিই লাফ দিয়ে পালাত! আর সবকিছুর চেয়েও বড় কথা
এই লোকটার সামনেই কেন বারবার এমন অবস্থা বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হবে তোর ?কেন?কেন?কেন?
তবে প্রিয়ন্তী তো প্রিয়ন্তীই। সহজে হার মানার মেয়ে সে মোটেও নয়।মুহূর্তেই সমস্ত লজ্জা, অস্বস্তি সব চাপা দিয়ে গলা শক্ত করল ও। ঠোঁট শক্ত করে, ঘাড় টানটান করে বলে উঠল উল্টো,
“একদম ঠিক করেছি। চুরি করেছি।কি করবেন আপনি?আমার সাথে এরকম ইয়ার্কি করলে ভবিষ্যতে আরও করব।”
“তা আমার অতি পছন্দের মাছটাই চুরি করার কারণটা জানতে পারি কি?”
প্রিয়ন্তী ভ্রু তুলে তাকাল। বলল কাঠকাঠ,
“কারণ লাগবে কেন?সম্পর্কটা তো আমাদের ওইরকমই, তাই না?আমি তো সম্পর্কে আপনার বেয়াইন হই আর আপনি বেয়াই।বেয়াই বেয়াইনের মধ্যে এরকম একটু আকটু মজা হয়েই থাকে।”
নিশ্চুপ তাজধীর এপর্যায়ে ভ্যাবাচেকা খেলো।প্রিয়ন্তী আর দাঁড়ালোই না। উল্টো ঘুরে পা বাড়ালো সামনে। ছাদে থেকে নেমে সিঁড়ির দিক ধরতে ধরতে বলল,
“আর শুনুন, ভবিষ্যতে আমার সাথে এরকম ইয়ার্কি করলে এখন তো একটা মাছ নিয়েছি! তখন কিন্তু আরে একটা মাছও আস্ত রেখে যাবোনা। সবগুলো নিয়ে চলে যাব। তাই সিসি ক্যামেরার পাশাপাশি ঘরের তালাটাও মজবুত করে রাখবেন নেক্সট টাইম থেকে!”
বলেই গটগট পায়ে নামতে শুরু করল সিঁড়ি ধরে।
ছাদে একাই দাঁড়িয়ে রইল তাজধীর।অতীব মাত্রায় আশ্চর্য হয়ে থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকলো কীয়তক্ষণ ওভাবেই। তারপর আচমকাই শব্দ করে হেসে উঠল সে। প্রিয়ন্তীর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে দূ হাত দিয়ে অর্ধ ভেজা চুলগুলো পেছনে ঠেলতে ঠেলতে বলে উঠল,
“ইন্টারেস্টিং!”
চলবে….
বাকিটুকু এডিট করার মতো শক্তি শরীরে নেই। পারলে বাকিটুকু এডিট করে আগামীকাল দিয়ে দিবো। অপেক্ষা করবেন না। আসলে আপনারা দেখতেই পারবেন।
Share On:
TAGS: ডেসটেনি, সুহাসিনী মিমি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডেসটেনি পর্ব ১৮
-
ডেসটেনি পর্ব ১৫
-
ডেসটেনি [ সারপ্রাইজ_পার্ট ]
-
ডেসটেনি পর্ব ৯
-
ডেসটেনি পর্ব ২
-
ডেসটেনি পর্ব ১৯
-
ডেসটেনি পর্ব ৬
-
ডেসটেনি পর্ব ২০
-
ডেসটেনি পর্ব ১
-
ডেসটেনি পর্ব ১০