Golpo romantic golpo নূর এ সাহাবাদ

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৩৬


নূরসাহাবাদ

jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

পর্ব- ৩৬

মেহেরুন্নেসা ধীরে চারপাশে তাকালো। নারীদের চোখে ভয় নেই, বরং আছে শক্তির এক অদ্ভুত জেদ। কেউ কেউ হাসছে, কেউ গুরুতরভাবে প্রশিক্ষণে মন দিয়েছে।
সে বুঝতে পারলো এটা কোনো সাধারণ দুর্গ না। এটা বেঁচে থাকার প্রস্তুতির জায়গা। বাইজিদ আবার লাগাম ঠিক করলো।
“এখানে কিছুক্ষণ থাকবো”
শান্ত গলায় বললো সে। মেহেরুন্নেসা আর কিছু বললো না। শুধু চারপাশের সেই অচেনা, শক্তিশালী পৃথিবীটাকে দেখছিল।
যেখানে জীবন মানে শুধু রাজকীয়তা না…
বরং যুদ্ধ, বেঁচে থাকা, আর নিজেকে গড়ে তোলা। মেহেরুন্নেসা কিছুক্ষণ চুপ করে চারপাশে তাকিয়ে রইলো। দুর্গের ভেতরের সেই ব্যস্ততা, নারীদের অস্ত্রচর্চা, আর অচেনা পরিবেশ সব মিলিয়ে তার মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল। সে ধীরে বাইজিদের দিকে তাকালো।
“আমরা এখানে কেন এলাম?”
তার কণ্ঠে কৌতূহল আর দ্বিধা দুটোই স্পষ্ট।
বাইজিদ একটু থামলো। চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে তারপর শান্ত গলায় বললো
“এদের সকালের দায়িত্ব তোমার।”
মেহেরুন্নেসা ভ্রু কুঁচকে ফেললো।
“মানে?”
বাইজিদ এবার তার দিকে ঘুরে তাকালো।
“এই নারীরা… তুমি এদের পরিচালনা করবে। শেখাবে, শৃঙ্খলায় রাখবে।”
মেহেরুন্নেসার চোখ বড় হয়ে গেল।
“আমি?” সে অবাক হয়ে বললো,
“আমি তো নিজেই জানি না অস্ত্র চালনা।”
তার কণ্ঠে স্পষ্ট অস্বস্তি। একজন সাধারণ মেয়ে সে কীভাবে যোদ্ধাদের নেতৃত্ব দেবে? বাইজিদ তার দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।
তারপর ধীরে বললো
“আমি তোমায় শেখাবো।”
একটু থেমে যোগ করলো
“কিন্তু আজ না।”
মেহেরুন্নেসা তাকিয়ে রইলো। বাইজিদ ধীরে এগিয়ে এলো, কণ্ঠ এবার আরও নিচু, ভারী
“আজ আমার আরও একটু সান্নিধ্য প্রয়োজন তোমার।”
মুহূর্তের জন্য চারপাশের শব্দ যেন থেমে গেল।
মেহেরুন্নেসা এক পা পিছিয়ে গেল না, কিন্তু তার চোখে অপ্রস্তুত এক কাঁপন ফুটে উঠলো। সে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। বাইজিদ আর কিছু যোগ করলো না। শুধু তার দৃষ্টি স্থির রইলো মেহেরুন্নেসার উপর যেন দীর্ঘদিনের দূরত্ব শেষে সে আর এক মুহূর্তও হারাতে চায় না।
আর দুর্গের সেই অচেনা ভোরে
দুজনের মাঝখানে আবারও নেমে এলো এক নীরব টানাপোড়েন।

দুর্গের ভেতরে ঢুকতেই পরিবেশটা বদলে গেল।
বাইরের কোলাহল, অস্ত্রের শব্দ সব পেছনে পড়ে ভেতরে এক ধরনের নিয়ন্ত্রিত শৃঙ্খলা। পাথরের দেয়াল, উঁচু ছাদ, আর মাঝখানে বসার জন্য সাজানো আসন। বাইজিদ ও মেহেরুন্নেসা এগিয়ে যেতেই সামনে থেকে এক পুরুষ দ্রুত এগিয়ে এলো। সে এসে মাথা নিচু করে কদমবুসি করলো
“হুজুর।”
তার কণ্ঠে ছিল গভীর শ্রদ্ধা। তারপর সম্মানের সাথে বললো
“ভিতরে আসন গ্রহণ করুন।”
সে হাতের ইশারায় বসার জায়গা দেখিয়ে দিলো। কয়েকজন দাসী দ্রুত এসে নাশতার আয়োজন করলো ফল, রুটি, আর পানীয় সাজিয়ে রাখা হলো সামনে। মেহেরুন্নেসা সবকিছু অবাক হয়ে দেখছিল। তার দৃষ্টি গিয়ে থামলো সেই পুরুষটার উপর।
ধবধবে ফর্সা গায়ের রঙ, তীক্ষ্ণ চোয়াল, আর কাঁধ পর্যন্ত নেমে আসা বাবড়ি চুল যার রঙ হালকা লালচে। চোখের মণি গভীর নীল অস্বাভাবিকভাবে তীক্ষ্ণ। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তার উপস্থিতিতেই যেন একটা আলাদা ভার তৈরি হচ্ছে চারপাশে। মেহেরুন্নেসা ধীরে বাইজিদের দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বললো
“লোকটার কণ্ঠ কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে।”
বাইজিদ তার দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে ফেললো।
“চেনা লাগারই কথা,”
বললো সে। মেহেরুন্নেসা অবাক হয়ে তাকালো।
বাইজিদ চোখের ইশারায় লোকটার দিকে দেখিয়ে বললো
“ও মাহাদি।”
এক মুহূর্তের জন্য মেহেরুন্নেসা বুঝতেই পারলো না।
“মাহাদি…?”
তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেলো।
বাইজিদ মাথা নেড়ে বললো
“হ্যাঁ। আমাদের সেনাপতি।”
মেহেরুন্নেসার দৃষ্টি আবার সেই পুরুষটার দিকে গেলো। তার মনে পড়লো মাহাদি সবসময় বর্মে ঢাকা থাকতো। মাথা থেকে পা পর্যন্ত। কখনো তার মুখ দেখার সুযোগ হয়নি কারও।
আজ প্রথমবার দেখলো। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। মাহাদি তখনও শান্ত, সংযত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। যেন এই বিস্ময় তার জন্য নতুন কিছু না। মেহেরুন্নেসার মনে অদ্ভুত এক অনুভূতি কাজ করলো একজন মানুষ, যাকে এতদিন শুধু শক্ত বর্মের আড়ালে চিনতো আজ তার আসল রূপ সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
মাহাদিকে দেখে মেহেরুন্নেসা সত্যিই বিস্মিত হয়ে গেল। এতদিন বর্মে ঢাকা একজন কঠোর, গম্ভীর সেনাপতি তার ভেতরে এমন সুদর্শন একজন মানুষ লুকিয়ে ছিল, সেটা কল্পনাও করেনি সে। তার চোখে সেই বিস্ময়ের ছাপ স্পষ্টই রয়ে গেল।
বাইজিদ আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকলো না।
সে ধীরে মেহেরুন্নেসার হাত ধরলো।
“চলো,”
শুধু এইটুকুই বললো। মেহেরুন্নেসা কিছু না বলে তার সঙ্গে ভেতরের দিকে এগিয়ে গেল।
দুর্গের করিডোর পেরিয়ে তারা পৌঁছালো এক কক্ষে। দরজা খুলতেই যেন অন্য এক জগৎ সামনে এলো। কক্ষটা রাজকীয়, জাঁকজমকপূর্ণ মোটা কারুকাজ করা দেয়াল, ঝুলন্ত ভারী পর্দা, মেঝেতে নরম কার্পেট। এক পাশে বিশাল খাট, তাতে নরম গদি আর রেশমি বালিশ সাজানো।

কোণায় পিতলের প্রদীপ জ্বলছে, যার আলো পুরো ঘরে সোনালি আভা ছড়িয়ে দিয়েছে।
এটা যেন কোনো যুদ্ধের দুর্গ না বরং একান্ত বিশ্রামের, ব্যক্তিগত এক আশ্রয়। মেহেরুন্নেসা চারপাশে তাকিয়ে একটু থমকে গেল।
ঠিক তখনই বাইজিদ এগিয়ে গিয়ে পালঙ্কে বসলো।
তারপর হাত বাড়িয়ে মেহেরুন্নেসাকে কাছে টানলো। মেহেরুন্নেসা প্রস্তুত ছিল না। হঠাৎ করেই ভারসাম্য হারিয়ে সে তার কাছে এসে পড়লো।
বাইজিদ তাকে নিজের কোলে বসিয়ে নিলো।
“এই…”
মেহেরুন্নেসা অপ্রস্তুত হয়ে উঠলো, হালকা করে সরে যাওয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু বাইজিদের হাত শক্ত। সে ধীরে মাথা ঝুঁকিয়ে তার কাঁধের কাছে মুখ রাখলো। আস্তে করে ঘাড়ে মুখ ডোবালো। কোনো কথা বলছে না শুধু চোখ বন্ধ করে যেন সেই কাছাকাছি থাকার অনুভূতিটুকু ধরে রাখতে চাইছে। মেহেরুন্নেসা একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেল।
“ছাড়ুন…”
সে ধীরে বললো, ঠেলে সরানোর চেষ্টা করলো।
কিন্তু বাইজিদ সরলো না। বরং আরও একটু শক্ত করে তাকে ধরে রাখলো।
তার কণ্ঠ নিচু, ক্লান্ত
“আর একটু… থাকো।”
এই কথাটায় এমন এক আকুতি ছিল, যা মেহেরুন্নেসাকে থামিয়ে দিলো। সে আর জোর করলো না। তার হাত ধীরে থেমে গেল।
কক্ষের ভেতর নীরবতা নেমে এলো। তারা অনেক দূরত্ব পেরিয়ে আবার কাছে এসেছে। বাইজিদ কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল। মেহেরুন্নেসা তখনও তার কাছেই, নীরবে বসে। তারপর খুব আস্তে বললো
“এরপর থেকে… চাইলেও আমাকে এভাবে কাছে পাবে না।”
কথাটা শুনে মেহেরুন্নেসা একটু সরে এসে তাকালো তার দিকে। চোখে বিস্ময় আর অজানা শঙ্কা।
“কেন…?”
বাইজিদ হালকা নিঃশ্বাস ফেললো।
“কাল থেকে তোমার প্রশিক্ষণ শুরু হবে”
শান্ত গলায় বললো সে
“এই জায়গাটা যেমন দেখছো, তেমন সহজ না। এখানে সময়, নিয়ম সবকিছু বদলে যায়।”
মেহেরুন্নেসার মুখটা একটু ভার হয়ে গেল।
সে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করলো
“আপনি… মহলে ফিরে যাবেন?”
প্রশ্নটা খুব সাধারণ, কিন্তু ভেতরে লুকানো ভয়টা স্পষ্ট। বাইজিদ তার দিকে তাকিয়ে রইলো কয়েক সেকেন্ড। তারপর ধীরে বললো
“আমি একা না… তুমিও যাবে।”

মেহেরুন্নেসার চোখে হালকা নড়াচড়া হলো।
যেন এই কথাটার ভেতরেই সে খুঁজে পেল কিছু নিশ্চয়তা। কক্ষের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এলো। কিন্তু সেই নীরবতা আর আগের মতো ভারী না। ধীরে ধীরে দূরত্বটা কমে এলো দুজনের মাঝে। মেহেরুন্নেসা মাথা নিচু করে রইলো, আর বাইজিদ তার হাতটা আলতো করে নিজের হাতে নিলো। বাইরে যুদ্ধের প্রস্তুতি, দায়িত্ব, অনিশ্চয়তা সবই অপেক্ষা করছে।
কিন্তু এই মুহূর্তে তারা দুজন শুধু একটু শান্তি খুঁজে নিলো একে অপরের পাশে। যেন আগামীর ঝড়ের আগে ছোট্ট এক টুকরো প্রাশান্তি।

ওদিকে মহলে সময় যেন থমকে আছে সিমরানের জন্য। সেই কাল থেকে বাইজিদ বেরিয়েছে এখনো ফেরেনি। প্রতিটা মুহূর্তে তার অস্থিরতা বাড়ছে। কক্ষের ভেতর থাকতে পারছে না, বারবার জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে, আবার ফিরে আসছে। শেষমেশ আর না পেরে সে বাগানের দিকে বেরিয়ে গেল।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই ধাক্কা। আউচ করে পিছনে ফিরতেই দেখলো সামনেই দাঁড়িয়ে নেওয়াজে আবিদ।

সিমরান এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। চোখে স্পষ্ট অস্বস্তি। এই মানুষটার সাথেই তার বিবাহ ঠিক হয়েছে, এই ভাবনাটাই তার কাছে অসহ্য লাগে। আগে সে তাকে সম্মান করতো কিন্তু এখন? সে চোখ সরিয়ে নিতে চাইল। নেওয়াজও থেমে গেল, এক ঝলক তাকালো তার দিকে।
তারপর খুব সংক্ষেপে বললো
“দুঃখিত।”
আর কোনো কথা না বলে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলো।
“শুনুন”
পিছন থেকে ডেকে উঠলো সিমরান। নেওয়াজ থামলো, কিন্তু ঘুরলো না সঙ্গে সঙ্গে।
“শাহজাদা কোথায় বলতে পারেন?”
সিমরানের কণ্ঠে চাপা উৎকণ্ঠা। নেওয়াজ ধীরে ঘুরে তাকালো। তার কপাল কুঁচকে এলো হালকা।
এই দৃশ্যটা তার অচেনা না। অনেক আগে থেকেই সে লক্ষ্য করেছে সিমরান সবসময় বাইজিদের আশেপাশে থাকে। খাবার বাড়ে, খোঁজ নেয়… নিঃশব্দে ঘুরঘুর করে।

সবকিছুই তার চোখ এড়ায়নি।
কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে সে খুব সংক্ষিপ্তভাবে বললো
“শাহজাদা আমাকে কিছু জানিয়ে যাননি। তার খবর মাহাদির কাছে পাওয়া যায়। তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করুন।”
তার কণ্ঠ নিরাসক্ত। কোনো ব্যাখ্যা নেই, কোনো বাড়তি কথা নেই। সিমরান বলল
“সেও নেই মহলে”

“তাহলে নিশ্চয়ই কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে গেছে।”

বলেই সে সরে গেল। সিমরান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তার বুকের ভেতরটা আরও ভারী হয়ে উঠলো। অপেক্ষাটা যেন আরও দীর্ঘ হয়ে গেল। নেওয়াজ ধীরে ধীরে বাগান পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল। পায়ের শব্দ খুব মৃদু কিন্তু তার ভেতরের অস্থিরতা যেন প্রতিটা পদক্ষেপে ধরা পড়ছে।
সিমরানের সেই প্রশ্নটা তাকে ভাবাচ্ছে আবারও
“শাহজাদা কোথায়?”

কথাটা এখনো কানে বাজছে। তার কপাল কুঁচকে এলো। অনেকদিন ধরেই কিছু বিষয় তাকে ভাবাচ্ছে। আগে সে গুরুত্ব দেয়নি ভাবতো, হয়তো কাকতালীয়। কিন্তু এখন?
সবকিছু যেন এক সুতোয় গাঁথা মনে হচ্ছে।
সিমরান সবসময় বাইজিদের আশেপাশে।
খাবার বাড়িয়ে দেওয়া, খোঁজ নেওয়া, অকারণে কাছে থাকা
এসব কি শুধু দায়িত্ব? নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য কিছু? নেওয়াজের বুকের ভেতর হালকা চাপ অনুভব হলো। সে কি সত্যিই শাহজাদাকে ভালোবাসে? এই প্রশ্নটা তার মনে তীরের মতো বিঁধে থাকে। উত্তর সে জানে না। জানার সাহসও করে না।
কারণ এই বিয়ে তার নিজের ইচ্ছায় ঠিক হয়নি।
জমিদারের সিদ্ধান্ত। আর জমিদারের প্রতি তার সম্মান অগাধ। সেই সম্মানের জন্যই সে কোনোদিন প্রশ্ন তোলেনি। কোনো আপত্তি করেনি। চুপচাপ মেনে নিয়েছে। তবুও সে তো মানুষ। তারও তো কিছু স্বপ্ন ছিল। একটা সংসার যেখানে তার স্ত্রী তার পাশে থাকবে, তার দিকে তাকিয়ে হাসবে, তার অপেক্ষা করবে।
সেই জায়গাটায় যদি অন্য কারও ছায়া থাকে…?
ভাবনাটা তার ভেতরটা অদ্ভুতভাবে ফাঁকা করে দেয়।

নেওয়াজ থেমে গেল এক মুহূর্ত। দূরে তাকিয়ে রইলো। তার চোখে কোনো স্পষ্ট আবেগ নেই শুধু একটা চাপা ভার। যেটা সে কাউকে দেখায় না।
কিন্তু এড়িয়ে যেতেও পারছে না। মহলের ভেতর তখনও এক ধরনের নিস্তব্ধতা।
দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে যাচ্ছে ঠিক সেই সময় হঠাৎ করেই উঠোনে ভেসে এলো ঘোড়ার খুরের শব্দ।
ধপ… ধপ… ধপ…
তার সঙ্গে তীব্র হ্রেষাধ্বনি। প্রহরীরা সতর্ক হয়ে উঠলো। দাসীরা জানালার আড়াল থেকে উঁকি দিলো। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সবাই বুঝে গেল
শাহজাদা ফিরেছে।
রত্নপ্রভা দ্রুত কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলো। তার মুখে স্পষ্ট উত্তেজনা চোখে অপেক্ষার ছাপ। সে সোজা উঠোনের দিকে এগিয়ে গেল। তার মনে একটাই ভাবনা মেহেরুন্নেসাও নিশ্চয়ই সঙ্গে এসেছে…
এতদিন পর সব ভুল বোঝাবুঝি মিটে গিয়ে, আজ হয়তো আবার সব আগের মতো হয়ে যাবে।

উঠোনে এসে দাঁড়াতেই সে দেখলো সিমুর্গ থেমে গেছে মাঝখানে। আর তার উপর থেকে নামছে বাইজিদ। ধুলোয় ঢাকা, ক্লান্ততবুও চোখে সেই চিরচেনা দৃঢ়তা। রত্নপ্রভা চারপাশে তাকালো।

তার চোখ খুঁজলো, কিন্তু মেহেরুন্নেসা নেই।
তার মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। ঠিক তখনই রত্নপ্রভা এগিয়ে এলো।

“ভাইজান” সে একটু থেমে বললো,
“মেহের কোথায়?”
উঠোনে হালকা নীরবতা নেমে এলো। সবাই যেন একই উত্তরের অপেক্ষায়। বাইজিদ ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। তার দৃষ্টি একবার চারপাশে ঘুরলো তারপর স্থির হলো সামনে।
কণ্ঠ গম্ভীর, দৃঢ়
“মেহেরুন্নেসাকে… অসম্মান করে এই মহল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল।”
কথাটা শুনে কয়েকজনের মুখে বিস্ময়ের ছাপ ফুটে উঠলো। রত্নপ্রভা স্তব্ধ হয়ে গেল। বাইজিদ থামলো না। সে আরও স্পষ্ট করে বললো
“কিন্তু… তাকে ফিরিয়ে আনা হবে।”
তার কণ্ঠে এবার অন্যরকম কঠোরতা।
“এইবার সম্মানের সাথে।”
একটু থামলো। তার চোখে তখন জেদ
“বরণ করে।”
উঠোনে এক অদ্ভুত নীরবতা ছড়িয়ে পড়লো। কেউ কিছু বললো না। এই কথাগুলো শুধু ঘোষণা না, এটা এক ধরনের প্রতিশ্রুতি।
ওদিকে একটু দূরে, স্তম্ভের আড়ালে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল সিমরান। তার চোখ স্থির বাইজিদের উপর। প্রতিটা শব্দ সে শুনেছে।

তার বুকের ভেতরটা যেন ধীরে ধীরে জ্বলতে শুরু করলো। মুঠো করে ধরলো নিজের ওড়নার প্রান্ত।
চোখে ক্ষীণ আগুন।
তাহলে এতকিছু করেও সে-ই ফিরে আসবে? তার শ্বাস ভারী হয়ে উঠলো। মুখে কোনো কথা নেই
কিন্তু ভেতরে ভেতরে হিংসা, ক্ষোভ আর অস্থিরতা তাকে পুড়িয়ে দিচ্ছে।
যে মানুষটাকে সে চেয়েছে এতদিন তার মুখে আজ শুধু আরেকজনের নাম। উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে সবাই।
কিন্তু এই মুহূর্তে তিনজন মানুষের ভেতরেই শুরু হয়ে গেছে আলাদা আলাদা যুদ্ধ। বাইজিদ উঠোন ছেড়ে ধীরে ধীরে নিজের কক্ষে ঢুকলো। দীর্ঘ পথ, ক্লান্তি সব যেন একসাথে শরীরে ভর করেছে। তবুও তার চোখে আজ অন্যরকম এক প্রশান্তি।
সে সোজা চলে গেল স্নানাগারের দিকে।
দরজা খুলতেই ভেতরের দৃশ্যটা যেন এক আলাদা জগত।
সুবিশাল স্নানাগার মসৃণ পাথরের মেঝে, চারপাশে খোদাই করা নকশা, দেয়ালের কোণায় জ্বলছে সুগন্ধি তেলের প্রদীপ। মাঝখানে বড় পাথরের জলাধার, যার পানি হালকা বাষ্প ছড়াচ্ছে। চারদিকে গোলাপ আর চন্দনের মিশ্রিত মৃদু সুবাস ভাসছে।
জায়গাটা শান্ত, স্নিগ্ধ একেবারে প্রশান্তির জন্য তৈরি। বাইজিদ ধীরে ধীরে ভেতরে এগিয়ে এলো।
জলাধারের পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো।
তার মনে হলো তার গায়ে এখনো যেন লেগে আছে মেহেরুন্নেসার স্পর্শ, তার কাছে থাকার উষ্ণতা। মেহের এর ঠোঁটের স্পর্শ, আদর মেখে আছে সর্বাঙ্গে। একটা অদ্ভুত দ্বিধা কাজ করলো তার ভেতর। এই পানিতে নামলে সব ধুয়ে যাবে না তো?
সে হাত বাড়িয়ে পানিতে ছোঁয়াতে গিয়েও থেমে গেল। চোখ বন্ধ করতেই ভেসে উঠলো সেই মুহূর্তগুলো
মেহেরুন্নেসা তার কাছে, খুব কাছে তার গলা জড়িয়ে ছিলো শক্ত করে। একটা গভীর টান, দীর্ঘদিনের দূরত্ব ভেঙে আসা সেই কাছাকাছি থাকা সব যেন আবার ফিরে এলো মনে।
তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হালকা হাসি ফুটে উঠলো।

সে চোখ খুললো ধীরে। চারপাশে একই স্নিগ্ধতা, কিন্তু তার ভেতরে যেন এখনো রয়ে গেছে সেই মুহূর্তের উষ্ণতা। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে অবশেষে সে ধীরে পানির দিকে তাকালো। যেন নিজেকেই বোঝাচ্ছে সব স্মৃতি ধুয়ে যায় না। কিছু থেকে যায় মনে। অতঃপর গোসল সেরে বেড়োলো স্নানাগার থেকে। কক্ষে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে নেওয়াজ। বাইজিদ একটু অবাক হলো।
“কিছু বলবেন নায়েব?”

নায়েব মাথা নিচু করে বলল
“বেয়াদবি মাফ করবেন হুজুর। আমার মনে হয়, ছোট শাহজাদা বেঁচে আছে”

বাইজিদ চোখ সরু করে তাকায়
“পাগল হলেন আপনি? তার মৃত্যু দন্ডের সময় আপনি স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন সেখানে”

নায়েব পূর্বের ন্যায় মাথা নিচু করে বলল
“গত রাতে আপনি এবং মাহাদি কেউ ই মহলে ছিলেন না বিধায় আমি নিজগৃহে যাই নি। সারা রাত অন্দরে ছিলাম। সেসময় আমি শাহজাদি রত্নপ্রভা কে একজন পুরুষের সাথে কথা বলতে দেখি। যাকে দেখতে হুবহু আপনার মতন। কিন্তু আপনি সেই সময় মহলে অনুপস্থিত। আর আপনার মত দেহ গঠন একজনেরই আছে। সে হলো শাহজাদা অরণ্য। আমি ভুল দেখিনি জনাব।”

বাইজিদ এর কপাল কুচকে এলো। মনে মনে বলল
“চন্দ্রা কি আমার কাছে কিছু লুকাচ্ছে?”

কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলি আপনাদের। আজ দেখলাম একটা পেইজ থেকে নূর-এ-সাহাবাদ আপলোড দেয়। লেখিকার নাম ধাম কিচ্ছু নেই। আশ্চর্য বিষয় হলো সেটাতে ৫.৬k রিয়্যাক্ট। আমার হৃদয় টা টুকরো টুকরো হয়ে গেছে বলতে পারেন। অথচ আমার পেইজের গল্পে ৩.৫k ও উঠছে না। ৩k কত কষ্ট করে উঠে। মন ভেঙে যায় এসব দেখলে। এত পাঠক পড়ে গল্প টা। রিয়্যাক্ট কেন দেয় না তারা? এর উত্তর নেই আমার কাছে। এভানে চলতে থাকলে লেখা লেখি থেকে মন উঠে যাবে। চোর গুলোর যন্ত্রণায় শান্তি নেই প্রথমত, গল্প চুরি করে। আর তারপর পাঠক রা। আমার কিছু নিয়মিত পাঠক ছাড়া অন্যরা রিয়্যাক্টই দেয় না। এটায় ৩.৫k পূর্ণ করবেন যেভাবেই হোক।

জানাবেন কেমন হলো। মাহাদির অংশ টুকু পড়ে নিশ্চয়ই চমকে উঠেছিলেন?

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply