Golpo আমার আলাদিন কষ্টের গল্প

আমার আলাদিন পর্ব ২৯


#আমার_আলাদিন

#জাবিন_ফোরকান

#পর্বসংখ্যা২৯

অতীত~

দ্রুত পা চালাচ্ছে ইরাম। ঘড়ির কাঁটায় রাত প্রায় সাড়ে দশটা। আজকে স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল। সে শিক্ষিকা হিসাবে আয়োজনের দায়িত্বে ছিল। অনুষ্ঠান শেষে অফিস থেকে বেতন তুলে ফিরতে ফিরতে এত দেরী। এমন দেরী বেশ অনেকদিন বাদেই হলো। শাড়ির আঁচল মাথায় তুলে ঘোমটা দিয়ে এগোল সে। এলাকার মুরুব্বিগণ এই সময় রাতের খাবার শেষে হাঁটতে বেরোন। মোড়ের টং দোকানে চা সিগারেটের আড্ডায় মাতেন। আজও ব্যতিক্রম নয়। তিন চারজন বৃদ্ধ এবং মধ্যবয়স্ক পুরুষদের একটা দল আয়েশ করে চা খেতে খেতে আলাপ করছে। ইরাম রাস্তার অপর পাশ দিয়ে যাচ্ছে। ঘোমটাটা একটু লম্বা করেই টেনে দিল এবার। মুরুব্বিদের দৃষ্টিতে পড়তে চায়না। কিন্তু পড়তে হলো। সঙ্গে সঙ্গে আড্ডার বিষয়ও বদলে গেল।

“বুঝলেন রফিক মিয়া, মাইয়া মানুষ কুড়িতেই বুড়ি। তিরিশে দাদী। বিয়া শাদি ছাড়া মাইয়াগো সুখ নাই। সংসার ছাড়া কোনো গতি নাই।”

“হ, আজকালকার মাইয়াগো দেখছেন? কেমন ব্যাটা মানুষের মতন এদিক সেদিক দৌঁড়াইয়া বেড়ায়। রাত বিরাতে রাস্তায় রাস্তায় হাঁটে। এরপর অঘটন ঘটলেই সব পুরুষগো দোষ। আরে তুই মাইয়া মানুষ তোর ইজ্জতের চিন্তা নাই?”

“ঠিক ঠিক।”

অদূর থেকে হেঁটে গেলেও আসরের আলোচনার বিষয়বস্তু যে ইরাম স্বয়ং, এটা বুঝতে তার বেগ পোহাতে হলনা। পাত্তা না দিয়ে সে হাঁটার জোর বাড়াল। ঠিক তখন ডাক ভেসে এলো এক মুরুব্বীর,

“কি গো ইরাম মা? আইলা কোনদিক দিয়া?”

গুরুজন। উত্তর না দিলে বেয়াদবি হবে। তাই ইরাম থামল। খানিকটা কাছে এগিয়ে গিয়ে সালাম দিল,

“আসসালামু আলাইকুম। এইতো, স্কুলে আজকে ফাংশন ছিল, তাই একটু দেরি।”

“রাহাত আর ইহান মিয়া কি তোমারে আনতে যাইতে পারেনা? একলা মাইয়া মানুষ রাত বিরাতে খালি দৌঁড়াদৌড়ি করো। বিপদ আপদ হইলে?”

“রাহাত তো এখন কাজ করে। ইহানও পড়াশোনায় ব্যস্ত। ব্যাপার না চাচা, আল্লাহ যার সাথে থাকে তার ভয় কিসের?”

“এই ভাই ভাই কইরাই তো জীবন যৌবনটা ধ্বংস করলা। তা মোখলেস মোল্লার পোলার সাথে নাকি তোমার সম্বন্ধ চলতেছিল? আগাইসে? আমাগো জানাইও মাইয়া, তোমার অভিভাবকই তো একপ্রকার। তোমার একটা গতি হইলে আমরা শান্তি পাই।”

ইরাম একটি ঢোক গিলল। ভীষণ অস্বস্তি হলো তার। উক্ত মোখলেস মোল্লার ছেলের সাথে তার সম্বন্ধ আরও এক মাস আগেই ভেস্তে গিয়েছে সেটা আর জানালনা। যেন ইচ্ছা করেই তাকে নীচ প্রমাণ করে আত্মিক শান্তি লাভের উদ্দেশ্যে গুরুজন নামক মানুষগুলোর পক্ষ থেকে প্রশ্নটা করা হয়েছে। মাথা নিচু করে ইরাম বলল,

“জি চাচা, দরকার পড়লে অবশ্যই জানাব।”

সালাম দিয়ে চলে এলো ইরাম। পিছন ফিরে তাকালনা। শুনলও না কিছু। তাকে ঘিরে এলাকায় গাল গল্পের অভাব নেই। একমাত্র মেয়ে যে ত্রিশ ছুঁয়েও এখনো বিয়ের পিঁড়িতে বসতে পারেনি। সমাজের মানুষগুলোর জন্য সে বিশ্বের অষ্টম আশ্চর্য, ঠিক তেমনি কটাক্ষের বস্তু। বছর বছর ধরে এসব ইরামের গায়ে সয়ে এসেছে। এখন আর বুকে লাগেনা। এতগুলো বছর যখন একটা পরিবারের পিছনে দিয়েছে, তখন আর কিছুটা সময়ে ক্ষতি হয়? যদিও ইরামের আজকাল মনে হয়, সে আজীবন এই সংসারটার ঘানি বয়েই বাঁচবে। আর পাঁচটা মেয়ের মতন তার নিজের সংসার বলে কিছুই কোনোদিন হবেনা।

মুন্সীবাড়ির মানুষগুলো এখনো জাগ্রত। এত জলদি ঘুমায়না। ইরাম আস্তে করে গেট খুলে ভেতরে ঢুকল। জুতা খুলে প্রতিদিনের মতন তাকে রেখে, পা মুছে ভেতরে এলো নিঃশব্দে। বহু কষ্টে একটা বেসরকারি প্রাইমারি স্কুলে সে গত বছর টিচার হিসাবে জয়েন করেছে। বেতন ২০ হাজার। আজ এই মাসের বেতনটা হাতে পেয়ে দিয়েছে। প্রতি মাসে বেতনের অর্ধেক টাকা সে সাংসারিক খরচ হিসাবে দিয়ে দেয়। এবারেও কোনো ব্যতিক্রম ঘটবেনা। টাকা গুণতে গুণতে নিচতলায় রাহাতের রুমের দিকে এগোল সে। স্বামী স্ত্রী উভয়ে কোনো গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করছে বোধ হয়।

“বোঝার চেষ্টা করো, ইরাম আপুকে এভাবে দিনের পর দিন এই বাড়িতে রাখা সম্ভব না।”

আড়াল থেকে শোনার ইচ্ছা না থাকলেও ইরাম নিজের নামটা শুনে থমকাল। রাহাতের স্ত্রী মিথিলা নরম গলায় স্বামীকে বলছে,

“দেখ রাহাত, আমাকে কূটনী ভাইয়ের বউ ভেবনা। আমি শুধু বাস্তবতা বলছি। আমরা এতদিন একা ছিলাম, সমস্যা হয়নি। কিন্তু এখন আমরা আর একা নই, আমাদের যমজ সন্তান এসেছে দুনিয়ায়। ওদের দেখতে হবে, বড় করতে হবে। আজও ছোটটি আছে বলে বিশেষ প্রভাব পড়ছেনা, কিন্তু যত বড় হবে তত আর্থিক আর মানসিক চাপ বাড়বে। আপুর বয়স হয়েছে। সমাজে মানুষ নানান ধরণের কথা বলে বেড়ায়। আপুর নামে ওইসব শুনলে আমারও খারাপ লাগে। উনি এই সংসারের জন্য কম করেননি। কিন্তু দিনশেষে এটা ওনার নিজের সংসার না। আমাদের সংসার। ওনাকে আজ হোক, কাল হোক, নিজের সংসারে যেতেই হবে।”

“আমিও ভাবছি মিথিলা। তোমার কি মনে হয় আমি হাত গুটিয়ে বসে আছি? বাবা নেই, আমার উপরেই তো দায়িত্ব এই সংসারের। নিজের বোনকে ভালো হাতে তুলে না দিয়ে শান্তি পাই? কিন্তু, কিছু তো হচ্ছে না। আপুর বয়সের জন্য এমনিতেও সম্বন্ধ পাওয়াটা মুশকিল। যাও বা আসছে, দ্বিতীয় বিয়ে, আগের বাচ্চা আছে, প্রবাসী, মধ্যবয়স্ক, বৃদ্ধ। আমি কীভাবে এগোই?”

রাহাত বলল। মিথিলা মাথা ঝাঁকিয়ে ব্যক্ত করল,

“তো কি হয়েছে? মানুষ কি দ্বিতীয় বিয়ে করে না নাকি? ওই ছেলেদের সংসার অন্য কোনো মেয়ে করবেনা? দ্বিতীয়, তৃতীয় বিয়ে কোনো ব্যাপার না, আগের বাচ্চাও ব্যাপার না। আপুর বয়স হিসাবে ঠিকই আছে এসব। এখন তো তুমি কচি ছেলে পাবেনা। কচি ছেলেরা আপুকে কেনই বা বিয়ে করবে? অদ্ভুত! তুমি যাই পাও, তাই বিবেচনা করে দেখ। শুধু ভালো ঘরের, মোটামুটি ব্যক্তিত্ববান ছেলে হলেই হবে। বিয়ের পর এমনিতেও মেয়েমানুষকে অনেককিছু অ্যাডজাস্ট করে চলতে হয় যেমন আমি করছি!”

ইরাম এমন সময় দরজায় নক করল। যেন মাত্রই এসেছে। মিথিলা এবং রাহাত উভয়ে নিজেদের সামলে নিল। আস্তে করে ইরাম ভেতরে ঢুকল। মলিন হাসি মেখে তাকাল,

“এসে গিয়েছিস ভাই? খেয়েছিস রাতে?”

“হ্যাঁ আপু। খেয়েছি। তুমিও যাও। ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নাও। মিথিলা যাও, আপুর খাবারটা গরম করে দাও।”

মিথিলা মাথা নেড়ে স্বামীর আজ্ঞা পালন করতে এগোচ্ছিল। ইরাম তাকে থামাল। একটি হাত তুলে সেখানে দশ হাজার টাকা রেখে বলল,

“এই নাও। এই মাসের টাকাটা। খরচ করো মনমত। আর বাবুদের জন্য কিছু লাগলে অবশ্যই আমাকে বলবে। ভাই আমার নতুন চাকরি পেয়েছে, এখনি এত ইনকাম করতে পারবেনা। তাছাড়া তোমাদের সঞ্চয়ও তো জরুরি বল? আমি গেলাম, আর হ্যাঁ, খাবারটা গরম করতে হবেনা তোমাকে। আমি নিজে করে নেব। সারাদিন বাবুদের পিছনে খাটতে থাকো, আজ একটু বিশ্রাম নাও। শুভরাত্রি।”

আর দাঁড়ালনা ইরাম। উল্টো ঘুরে রুমের বাইরে চলে গেল। সিঁড়ি বেয়ে উপরে নিজের রুমের দিকে উঠতে উঠতে সে ভাবল, মুরুব্বীরা ঠিক বলেনি।

ত্রিশে মেয়েরা শুধু দাদী হয়না, মরে যায়।

***

ঠিক আড়াই মাসের মাথায় যখন ইরামের জন্য সম্বন্ধটা আসলো, তখন সে আর বিশেষ বিবেচনা করেনি। পাত্র নিজে থেকেই রাহাতের মাধ্যমে বাড়িতে প্রস্তাব পাঠিয়েছে। নাম, অরণ্য মির্জা সওদাগর। রাহাতের ভাষ্যমতে বিরাট এক ব্যবসায়ী। গাজীপুরে নাকি তিনটা ফ্যাক্টরি আছে। বয়সটাও ইরামের কাছাকাছি। বড় ঘরের ভদ্র সন্তান। সমস্যা হলো, এতিম। বাবা মা, আত্মীয় স্বজন বলতে তিন কূলে কেউ নেই। এত বড় একজন মানুষ ইরামের মত কাউকে নিজে থেকে বিয়ে করতে চাইছে ব্যাপারটা সন্দেহজনক মনে হলেও এতিম শোনার পর থেকে সেটা খানিক ধামাচাপা পড়ে গিয়েছে। এত চিন্তা করে কি হবে? দেখা করা যাক। কথা বলেই নাহয় বোঝা যাবে।

আজ তাই একটা ক্যাফেতে বসেছে ইরাম। মিথিলার তোড়জোড়ের কারণে হালকা পাতলা সাজাও হয়েছে। ব্লক প্রিন্টের সালোয়ার কামিজ, খোলা চুল আর কাজলটানা চোখ। চেয়ে আছে সে বাইরের দিকে। অন্যমনস্ক হয়ে। ঠিক এমন সময়েই কন্ঠটা কানে এলো তার।

“কি আছে ওই দেয়ালে যা জেঁকে বসেছে আপনার খেয়ালে?”

এমন কাব্যিক কথা প্রথমবারেই ইরামের মনোযোগ আকর্ষণ করে নিল। ঝট করে ফিরে তাকাল সে। দন্ডায়মান এক সুঠাম, সুদর্শন ব্যক্তি। ক্রিম বর্ণের শার্ট, আর কফি বর্ণের ফরমাল প্যান্ট। ক্ষণিকের জন্য ইরাম বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। পুরুষ মানুষ এতটা আকর্ষণীয় এবং সুদর্শন হতে পারে তার আগে জানা ছিলনা। ছবিতে রাহাত দেখিয়েছে ব্যক্তিকে, কিন্তু ছবির চাইতে বাস্তব মানুষটা আরও বেশি মনোমুগ্ধকর। ইরাম নিষ্পলক চেয়েই রইল। টানা চোখজোড়া, সম্পূর্ণ কালো নয় যেন, অতি হালকা বাদামীর মিশেল আছে তাতে। তীক্ষ্ণ চোয়াল, ক্লিন শেভড করে এসেছে আজ বোঝা যাচ্ছে। চুলগুলো জেল দিয়ে ব্যাকব্রাশ করে রাখা, একগুচ্ছ লুটিয়ে পড়েছে কপালের উপর। ইরামের বুঝতে বাকি রইলনা, তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে অরণ্য মির্জা সওদাগর।

“মিস্টার মির্জা…”

অস্ফুট স্বরে বলে উঠে দাঁড়াতে নিল ইরাম। তাতে তাকে ইশারা করে বসিয়ে নিজে বিপরীত দিকের চেয়ার টেনে বসতে বসতে অরণ্য বলল,

“ওহ প্লীজ, জাস্ট কল মি অরণ্য।”

“আপনার নামটা সুন্দর, অরণ্য।”

“আপনার চাইতে বেশি নয়, ইরাম।”

একটি শক্ত ঢোক গলাধঃকরণ করল রমণী। জীবনে প্রথমবারের মতন বুঝি অন্তরে একটা ধুকধুক অনুভূতি হলো। অরণ্য সবার প্রথমেই অর্ডার দিয়ে দিল। নিজের জন্য কফি, ইরামের জন্য চা। ওয়েটার চলে যেতেই ইরাম জিজ্ঞেস করল,

“আপনি কীভাবে জানলেন আমার চা পছন্দ?”

অরণ্য হাঁটুর উপর হাঁটু তুলে রহস্যময় হেসে বলল,

“আপনি প্রতিদিন স্কুলের ক্যান্টিনে বসে এক কাপ পিওর রং চা খান। আন্দাজ করাটা কঠিন কিছু না।”

ইরাম ভ্রু কুঁচকে ফেলল,

“আপনি আমাকে ফলো করেন নাকি?”

“না করলে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতাম কীভাবে বলুন?”

একগাল হাসল অরণ্য। ইরাম সেই হাসির দিকে তাকাল। লোকটাকে হাসলে এত সরল লাগে কেন? অরণ্য ঝুঁকে এসে টেবিলে কনুই ঠেকিয়ে জানাল,

“চিন্তা করবেন না। আমি স্টকার না। আপনার স্কুলের পাশেই আমার একটা নির্মাণাধীন ফ্যাক্টরি আছে।”

“ওহ! এ এম এস ট্রেডার্স? ওটা আপনার?”

“হুম। ওটার কাজেই গিয়েছিলাম এক ঘোর বর্ষার দিনে। বিল্ডিংয়ের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখলাম, এক রমণী বেরিয়ে এলো স্কুলগেট থেকে। নিজের মাথায় ছাতা ধরার বদলে বাচ্চাদের মাথায় ছাতা ধরে ধরে সে তাদের তুলে দিল গাড়ি অব্দি। অতঃপর ভিজে গেল তার শাড়ি, জড়িয়ে গেল আমার মন, হয়ে গেল চোখে চোখে অন্তরের আলাপন।”

এবার না হেসে পারলনা ইরাম। তার চোখজোড়া আনন্দে চকচক করে উঠল। গালে লালিমা ছেয়ে গেল। বাইরের স্নিগ্ধ সূর্যের আলো মুখে প্রতিফলিত হতেই অদ্ভুতুড়ে একটা আভা ছড়াল যেন চারপাশে। অরণ্য মন্ত্রমুগ্ধের মতন দেখল। যেন ইরামের চাইতে মনোমুগ্ধকর কোনো বস্তু তার চোখ এর আগে দর্শন করেনি। বুকে হাত দিয়ে অরণ্য মোলায়েম কন্ঠে বলল,

“আস্তে আস্তে। বিয়ের আগেই হার্ট অ্যাটাক করাবেন আমায়, প্রিয়?”

ইরাম তীর্যক হাসল।

“আপনাকে কে বলল আমি আপনাকে বিয়ে করতে রাজী হচ্ছি?”

“হবেন না? তবে কি আপনার জন্য আমার হাজার বছর অপেক্ষার চাঁদর বিছিয়ে বসতে হবে? যদি শেষ ভাগ্যে তোলা থাকে কাজী, আমি তবে সহস্র বছর অপেক্ষা করতে রাজি।”

“হাহাহা! আপনি এত দারুণ দারুণ সব কবিতা বানান কীভাবে?”

“আপনিই আমার কবিতা।”

ইরাম অরণ্যর চোখে প্রথমবারের মতন সরাসরি তাকাল। ওই চোখের মাঝে যে সরলতা, মুগ্ধতা এবং আবেগ সে দেখল, তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ পেলনা।

অতঃপর শুরু হলো তাদের ইঁদুর বিড়ালের দৌরাত্ম্য। পাক্কা দুই মাস প্রয়োজন হলো অরণ্যর, ইরামকে বিয়েতে রাজি করানোর জন্য। শেষ দিনের ঘটনাটা অনেকটা এমনি ছিল যে ইরাম স্কুল থেকে ফিরছিল। গ্রীষ্মের তীব্র গরম মাথায় নিয়ে। প্রতিবার লোকালেই যাওয়া হয়। অথচ সেদিন হলোনা। তার জন্য অপেক্ষা করছিল অরণ্যর গাড়ি। ইরাম ভেতরে ঢুকতেই এসি অন করে দিল সে। তারপর ঝুঁকে ইরামের পায়ের পুরাতন শু জোড়ায় হাত দিল অরণ্য,

“দেখি, প্লীজ। এই গরমে মানুষ শু পড়ে? স্যান্ডেল নেই?”

“একি! আপনি আমার পায়ে হাত দিচ্ছেন কেন?”

“হুশশ।”

অরণ্য কোনো কথা শুনলনা। ইরামের শু খুলে নিয়ে বক্সের ভেতর ঢুকিয়ে রাখল। পা মুক্ত হতেই মেলে বসতে পারল ইরাম। এসির বাতাসে বেশ আরাম লাগল। অরণ্যর প্রস্তুতি নেহায়েত কম নয়। কোত্থেকে একটি বরফ ঠান্ডা লেমনেডের কাপ বের করে তাতে স্ট্র বসিয়ে ইরামের হাতে ধরিয়ে দিল সে। হতবাক ইরাম এক পলক অরণ্যর দিকে চেয়ে শেষমেষ মুচকি হেসে তাতে চুমুক দিল। অরণ্য ড্রাইভ শুরু করল। আকাশী রঙের ফুল হাতা শার্ট, উপরে কোট ব্লেজারে পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী লাগছে আজ মানুষটাকে। আর অবশ্যই, বরাবরের মতই সুদর্শন। ইরাম চোখ ফেরাতে পারলনা। অরণ্যর গিয়ার ধরা, এক হাতে স্টিয়ারিং ঘোরানো, মনোযোগী দৃষ্টি, প্রত্যেকটা কার্যকলাপ সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। লেমনেড গলায় যেতেই গরমটা চিরবিদায় নিল। অরণ্য কীভাবে কীভাবে যেন সবসময়েই বুঝে যায় ইরামের কখন কি প্রয়োজন।

“মনে হচ্ছে আমার কোনো চান্স নেই, তাইনা?”

হঠাৎ করে বিষন্ন গলায় বলে উঠল অরণ্য। ইরাম তাতে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল। প্যাসেঞ্জার সিটে সোজা হয়ে বসে শুধাল,

“মানে?”

“মানে আমার ভাগ্যটাই এমন, এই আরকি। মাথার উপরে বাবা, মা, গুরুজনের ছায়া নেই তো, তাই সহজে কেউ আগলে নিতে চায়না।”

ইরামের বুকের ভেতরটা খামচে ধরল কেউ বুঝি। অরণ্য স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে রাস্তার দিকে দৃষ্টি রেখেই বলল,

“জীবনটা সহজ ছিল না। মানুষ ভাবে, টাকা থাকলেই বুঝি সব আছে। অথচ আমার কাছে শান্তিটাই নেই। আপনার জানা আছে শান্তি কোথায় বিক্রি হয়? তবে নিজের জন্য কিনে বাক্স ভরে রাখতাম।”

কেন যেন নিজেকে রুখতে পারলনা ইরাম। অজান্তেই নিজের হাতটা গিয়ারের উপর রাখা অরণ্যর হাতের উপর রাখল।

“আপনার বাবা মাকে খুব মিস করেন, তাইনা?”

মলিন হাসল অরণ্য।

“না। করি না। ওনারা চলে না গেলে বুঝতাম না দুনিয়াটা কত কঠিন। আত্মীয় নামক কালসাপগুলো সম্পত্তির লোভে কতটা ভয়ংকর হতে পারে সেটা ওনাদের বিদায় নেয়ার পরেই বুঝেছি। আপনার সুখের সময় সবাই আপনার পাশে থাকে, এরপর সুযোগ বুঝে হামলে পড়ে। আমার দুনিয়ায় এখন আছি শুধু আমি, আমার অর্জন, আর আমার একাকীত্ব। আফসোস নেই।”

ইরাম নিজের হাতের বাঁধনটা আরেকটু শক্ত করে বলল,

“এখন থেকে আপনি আর আপনার অর্জন থাকবেন শুধু। একাকীত্বের ভারটা নাহয় আমার উপর ছেড়ে দেবেন?”

অরণ্য সইতে পারলনা। ব্রেক কষে তৎক্ষণাৎ গাড়ি থামিয়ে ফেলল। মাঝরাস্তায় এভাবে হঠাৎ গাড়ি থামিয়ে ফেলায় আশেপাশের যানবাহন দ্রুত হর্ণ বাজাতে লাগল। চিৎকার চেঁচামেচি শুরু হয়ে গেল। অথচ অরণ্যর কোনোদিকে খেয়াল নেই। সেই অপলক চেয়ে আছে ইরামের দিকে। ঝুঁকে এলো সে, রীতিমত ফিসফিস করে উচ্চারণ করল,

“আরেকবার বলুন?”

ইরাম মোলায়েম হাসল। তার চোখে হালকা অশ্রু জ্বলজ্বল করল,

“একাকীত্বে দীর্ঘশ্বাস, মায়ায় অবিশ্বাস আর বিয়েতে সর্বনাশ। আপনি নিজের সর্বনাশ করতে মুখিয়ে আছেন। কুয়াতে ঝাঁপ দেয়া ঠেকানোর সাধ্য কার?”

অরণ্যর ঠোঁটে বিস্তৃত একটা হাসি ফুটল এবার। ইরামের হাতটা ধরে সে উপরে তুলল। প্রথমবারের মতন নিজের ঠোঁটের স্পর্শ ছুঁয়ে দিল কাজের কারণে রুক্ষ হয়ে আসা আঙুলজুড়ে। বলল,

“এই হাতে রুক্ষতা মানায় না। এতে আমি বুনব শুধুই কোমলতা। শুনছেন আমার প্রিয়? আজ থেকে এই অরণ্যের হাজারও কাঁটার গাছের মাঝে একটিমাত্র ফুলগাছ আপনি।”

***

আজ ইরামের বিয়ে।

কাবিন এবং যাবতীয় কাজ সকালেই হয়ে গিয়েছে। এখন শুধুমাত্র অনুষ্ঠান। যদিও ইরাম মত দিয়েছিল, ছিমছাম অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে। বেশি মানুষের উপস্থিতিতে সে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেনা। তবে শেষ মুহূর্তে অরণ্য বেঁকে বসেছে। না, ইরামকে সে চুপেচাপে বিয়ে করবেনা। সমস্ত এলাকার মানুষকে দাওয়াত দিয়ে খাওয়াবে। যে মানুষগুলো এতদিন ইরামকে নিয়ে হাজার কথা চালাচালি করেছে, তাদের যদি একটু ভালোমত আপ্যায়ন করা না হয়, তাহলে কিছু হলো?

ইরাম স্টেজের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফটোগ্রাফারের জন্য পোজ দিতে দিতে অদূরে দাঁড়ানো অরণ্যকে দেখছে। শেরওয়ানি পরনে লোকটাকে আজ অনন্য লাগছে। ইরাম থেকে থেকে স্বামীকে দেখে যাচ্ছে। একপাশে খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা। সেখানে মানুষজন খেতে বসে পড়েছে। মুরুব্বীরা সব একসঙ্গে প্লেটের পর প্লেট মাংস সাবাড় করছে। খেতে পারুক বা না পারুক, নেয়ার কমতি নেই। বিয়ে বাড়ির এই অপচয়টা ইরামের একদম পছন্দ নয়। ফটোগ্রাফারকে বিরতি দিয়ে সে ভারী লেহেঙ্গা তুলে এগোল টেবিলের দিকে। অরণ্য দাঁড়িয়ে আছে। সকলের খাওয়া দাওয়া ঠিকমত হচ্ছে নাকি দেখছে। একজন মুরুব্বী তাকে ডেকে কিছু বলতেই মুচকি হেসে অরণ্য বলল,

“ভালো করে খান চাচা। যার বিয়ে না হওয়ার চিন্তায় মাথার চুল উঠিয়ে ফেলেছেন, তার বিয়ের খাবারটা কেমন লাগছে? এই চাচাকে আরো দুই পিস রোস্ট দাও।”

ইরাম কাছে গিয়ে খপ করে অরণ্যর বাহু ধরে ফেলল। বাকিদের উদ্দেশ্যে জোরপূর্বক হেসে তাকে টেনে সরিয়ে নিয়ে এসে বলল,

“আপনি কি শুরু করেছেন? এভাবে বলে কেউ?”

“ওমা। ওনারা বললে দোষ নেই, আমি পাল্টা বললেই দোষ? শোনো কবিতা, তোমার জন্য আমি করতে পারি ঝগড়া, আমার লাগবে না কোনো মহড়া, বাজাব শুধু নাগাড়া।”

হেসে ফেলল ইরাম। অরণ্যর বাহু চাপড়ে বলে উঠল,

“পাগল হয়ে গিয়েছেন আপনি।”

“হুম। তোমাকে বউয়ের রূপে দেখে আমার সার্কিট হাউজে আগুন জ্বলে গেছে। এই জ্বালা শুধু আজকে রাতেই মেটানো সম্ভব হবে। তো বলছিলাম, যদি এখনি আমরা একটু প্রাইভেসি খুঁজে পেতে পারি তাহলে…”

ইরাম ভ্রু তুলে অরণ্যকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দৌঁড়ে চলে এলো। পিছন থেকে অরণ্যর খিলখিলে হাসির আওয়াজ ভেসে এলো। স্টেজের কাছে চলে আসতেই ইরামের চোখ পড়ল অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষটার উপরে।

সামিয়া মুন্সী।

খালার বাড়িতে বেশ সংশয় নিয়েই দাওয়াত কার্ড পাঠিয়েছিল সে। ভাবেনি, তিনি সত্যিই এসে পড়বেন। মিথিলার সঙ্গে কথা বলছেন সামিয়া। ইরাম এগোতেই ঘুরে তাকালেন। আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করলেন নববধূকে।

“মাশাআল্লাহ! কি মিষ্টি লাগছে আমার ইরামটাকে!”

“খালামণি!”

সামিয়াকে জড়িয়ে ধরল ইরাম। কত বছর পর আজ এই মানুষটার এমন আদুরে ছোঁয়া পেল? হিসাবে নেই আর। সামিয়া ইরামের পিঠে পরম আদরের হাত বুলিয়ে দিলেন। কপালে চুমু খেলেন।

“আল্লাহর কাছে লাখ লাখ শুকরিয়া, অবশেষে তোর জীবনে সুখের দিন এসেছে।”

ইরাম মন ভরে গ্রহণ করল সবটুকু আদর। মুচকি হেসে বলল,

“সব তোমাদের দোয়া, খালামণি। তুমি আজ এসেছ, আমি কতটা খুশি হয়েছি বোঝাতে পারবনা তোমায়।”

“আমিও রে। তোকে বধূর রূপে দেখার সাধ আজ আমার পূরণ হয়ে গেল।”

“স্টেজে আসো, আপু! ফ্যামিলি ফটো তুলব!”

এমন সময় স্টেজ থেকে ইহানের ডাক ভেসে এলো। ইতোমধ্যে স্টেজের উপরের সোফায় বসেছে সবাই। রাহাত, মিথিলা, অরণ্য মাঝখানে। ইহান পিছনে দাঁড়িয়ে হাত তুলে ইরামকে ডাকছে। ইরাম সামিয়ার দিকে ফিরল,

“আসো খালামণি, ফ্যামিলি ফটো।”

“আরে না না, ফ্যামিলি কীভাবে আমি…”

“আসুন না, খালামণি! প্লীজ! আপনি আমাদের পরিবারই তো!”

স্টেজ থেকে জোর গলায় বলল অরণ্য। এবার আর মানা করতে পারলেন না সামিয়া। ইরাম তাকে স্টেজে নিয়ে গেল। ইহানের সঙ্গে পিছনে দাঁড়ালেন তিনি হাসিমুখে। ইরাম অরণ্যর পাশে বসল। অত্যন্ত যত্ন নিয়ে তার চোলির ওড়না, লেহেঙ্গা গুছিয়ে দিল অরণ্য নিজের হাতে, যেন ছবিতে সুন্দর দেখায়। মিউজিক বাজছে গমগম করে। মেহমানের বাচ্চারা এদিক সেদিক নাচানাচি করছে। অনেকে ছবি তুলছে স্টেজের। ফটোগ্রাফার পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে। এত এত লোক, এত আলোকসজ্জার মাঝে ঠোঁটে বিরাট হাসি ধরে রেখে যখন ইরাম সামনে তাকাল, তখন ভিড়ের মাঝে একটি অবয়বের উপর তার দৃষ্টি আটকে গেল।

বহু দূরে। মেহমানদের ভিড়ের মাঝে, একদম পিছনের দিকে। কালো পাঞ্জাবি পরনে এক সুউচ্চ, সুঠাম অস্তিত্ব। জ্বলজ্বলে একজোড়া চোখ, ভ্রুর উপরে চকচকে সিলভার পিয়ার্সিং। বুকে দুবাহু বেঁধে তাকিয়ে আছে স্টেজের দিকে। দৃষ্টিজুড়ে অনুভূতিহীনতা, শূন্যতা। ইরাম জমে গেল। নিষ্পলক চেয়ে রইল। ওই গভীর কালো চোখের সঙ্গে তার দৃষ্টি মিলল। অরণ্য নিজের মাঝে ইরামের একটা হাত ধরে রেখেছে, সেই হাতটা কাঁপল খানিক। অস্ফুট স্বরে আপনমনে ইরাম উচ্চারণ করল,

“আলাদিন…..”

ডাকটা ওই মানুষ অব্দি পৌঁছেছে কিনা ইরামের জানা নেই। চোখ ধাঁধানো ফ্ল্যাশের আলোয় চারপাশ উদ্ভাসিত হতে লাগল, বারংবার। যখন ইরামের চোখ সয়ে এলো, তখন সে দেখল মানুষটা আর ভিড়ের মাঝে নেই। উল্টো ঘুরে হাঁটা শুরু করেছে। একটা সময় সে গেট পেরিয়ে বেরিয়ে গেল, আড়াল হয়ে গেল রাত্রির কালিগোলা আঁধারমাঝে। একবারও আর পিছন ফিরে তাকালনা।

—চলবে—

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply