Golpo আমার আলাদিন কষ্টের গল্প

আমার আলাদিন পর্ব ২০


আমার আলাদিন

জাবিন_ফোরকান

পর্বসংখ্যা২০

চারপাশে ভিড় জমে গিয়েছে। চিৎকার, চেঁচামেচি, হাঁকডাক। অথচ এতকিছুর মাঝেও ইরাম শুধুই নিজের ছেলের ছটফট করতে থাকা নাজুক শরীরটাকে দেখে যাচ্ছে। কি করবে, না করবে, কোথায় গিয়ে ঝাঁপ দিলে তার বুকের ধন রক্ষা পাবে সে মেলাতে পারছেনা। এমন সময়েই দৌঁড়ে এলো সারিকা। আশেপাশের কয়েকজনকে উদ্দেশ্য করে সে চেঁচিয়ে উঠল,

“পানি! প্লীজ, ঠান্ডা পানি কেউ জোগাড় করুন! কুইক!”

কয়েকজন দিগ্বিদিক হয়ে এদিক সেদিক ছুটে গেল। ইরাম ইযানকে নিয়ে মাটিতেই বসে পড়েছে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে।

“আমার বাবাটা! প্লীজ! আম্মু সরি, আম্মু পারিনি, আম্মু তোমাকে ব্যথা পেতে দিয়েছি, আমার আব্বুটা!”

ঝরঝর করে অশ্রু ঝরছে ইরামের। ইযানের গগনবিদারী চিৎকার জননীকে একটু একটু করে ভেঙে চুরমার করছে। একজন পানির বোতল নিয়ে এসে পড়ল। সারিকা ইরামের পাশে বসে বোতলের ছিপি খুলতে খুলতে বলল,

“আরে মেয়ে এটা কাঁদার সময় না। ওর হাতটা ধরুন, সাবধানে, আমি পানি ঢালছি।”

ইরাম দ্রুত মাথা দুলিয়ে ইযানের ক্ষত হয়ে যাওয়া হাতটা ধরল। সারিকা লালচে ত্বকের উপর পানি ঢালতে লাগল একনাগাড়ে।

“আআআ…. উয়াআ…!”

“এইতো, এইতো আব্বুটা, আম্মু আছি, আম্মু আছি এইখানে।”

ছটফটিয়ে কাঁদতে থাকল ইযান। ইরাম ছেলের মুখটা বুকে চেপে দোলাতে লাগল। আরও দুজন পানির বোতল জোগাড় করে এনেছে। সারিকা দুটোই নিজের হাতে নিল। তারপর সটান উঠে দাঁড়িয়ে ইরামকে টেনে তুলল।

“জলদি হাসপাতালে যেতে হবে। চলুন চলুন।”

গাড়ির ড্রাইভার প্রস্তুত ছিল। ইঞ্জিনও চালু করে রেখেছে। ইরাম ছেলেকে নিয়ে ছুটে গাড়িতে উঠে গেল। সারিকা মাটিতে পড়ে থাকা ম্যাকবুকের ব্যাগটা তুলে হন্তদন্ত হয়ে ছুটল। গাড়িতে চেপে বসতেই ড্রাইভার গতি বাড়িয়ে চলতে আরম্ভ করল। হাসপাতাল অবধি সমস্ত রাস্তাটা সারিকা ইযানের হাতে পানি ঢেলে গেল।

এতসব দৃশ্যের মাঝে কারো চোখে পড়লনা যে দৃশ্যটা সেটা হলো অদূরে সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ইহান। ইরামের কিশোর ভাইটা এখানে এসেছিল কলেজের একটা ক্লাস মিস দিয়ে। গতকাল ইরাম তাকে ফোন করে বলেছিল আজ ল্যাপটপ কিনতে যাবে, যেহেতু ইলেক্ট্রনিক্স সম্পর্কে ধারণা নেই তাই ইহানকে সাথে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু ইহানের প্রথম ক্লাসে টেস্ট থাকায় পরে পড়াশোনা করতে বলেছিল। আজ সকালে টেস্ট শেষ করেই পরের ক্লাস ছেড়ে ওই বাড়িতে গিয়ে করিমের কাছ থেকে সে জেনেছে, সারিকার সাথে চলে গিয়েছে ইরাম। সেখান থেকেই সে এসেছিল সোজা নিজের সাইকেল নিয়ে। সে যখন সাইকেল চালিয়ে রাস্তায় ঢুকেছে তখনি তাকে পাশ কাটিয়ে আততায়ী বাইকটা ছুটে গিয়েছে। ইহান এক লহমা সময় পেল সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য। যখন সে দেখল সারিকা সামলে নিচ্ছে সবটা, তখনি সে নিজের সাইকেল ঘুরিয়ে জোরসে প্যাডেল চালাল। পিছু নিল বাইকটার। তার চোখ ক্রমশ রক্তাভ হয়ে উঠল।

⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──

ইযানকে নিয়ে যাওয়া হলো সামিয়ার হাসপাতালে। সারিকা গাড়িতে থাকতেই ফোন করে জানিয়ে রেখেছিল। পৌঁছাতেই সোজা বার্ন ইউনিটে নেয়া হলো ইযানকে। ছেলের সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেল ইরাম। খবর পেয়ে সামিয়াও ছুটে এলেন। তার পরিচিত কলিগদের অনুরোধও করতে হলোনা। সামিয়ার নাতি জেনে সবাই কাজে লেগে পড়ল মুহূর্তেই।

বিছানায় শুইয়ে ইযানের ক্ষত হয়ে যাওয়া হাতটা পর্যবেক্ষণ করছেন ডাক্তাররা। সামিয়াও ভেতরে আছেন সবকিছুর তদারকি করতে। ইরাম রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে শুধু ছেলের তীব্র কান্না শুনতে পাচ্ছে। শরীর কাঁপছে তার। এখনো মনে হচ্ছে সবটা ভীষণ রকমের দুঃস্বপ্ন। সারিকা উদ্ভ্রান্ত হয়ে বারবার রুমের সামনে গিয়ে পায়চারি করছে। মেয়েটাও অশান্ত হয়ে উঠেছে একটা নিষ্পাপ বাচ্চার নিদারুণ কষ্টের সামনে। ইরাম দেয়াল ঘেঁষে থাকা চেয়ারে বসে নিজের মাথা চেপে ধরে রাখল। অক্সিজেনের সংকট বুঝি শরীরে। এমনভাবে হাঁপাচ্ছে সে। চোখের সামনে জগৎটা বুঝি দুলছে। দৃষ্টি ঝাপসা। অশ্রুর কোনো বিরতি নেই। ইরাম খেয়ালও করলনা কখন করিডোর বেয়ে বেশ কতক পদশব্দ শোনা গেল। শুধু সারিকার আওয়াজ কানে গেল,

“মিসির?”

সারিকার স্বামী এবং সাইবানের দুলাভাই, মিসির ইকবাল দ্রুত ছুটে এলো। হাঁপাচ্ছে সে। বোঝা যাচ্ছে খবর পেয়েই দৌঁড়ে এসেছে।

“কি ব্যাপার? কি হয়েছে? বাবু কেমন আছে?”

সারিকা স্বামীর কাছে গিয়ে মাথা নাড়ল,

“বলতে পারছিনা। মম আছে ভেতরে, ডাক্তাররা এখনো অবজার্ভ করছে।”

মিসির সারিকাকে নিজের বুকে আগলে নিল। নিজেকে শক্তভাবে ধরে রাখলেও সারিকা আসলেই ঘাবড়ে গিয়েছিল। স্বামীর উষ্ণ বুকে নিজেকে খুঁজে পেয়ে সে চোখ বুঁজে ফেলল, নিজেকে শান্ত করতে চাইল। স্ত্রীর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে মিসির রাগান্বিত কন্ঠে বলে উঠল,

“দিনে দুপুরে এটা কি ধরণের ক্রাইম? কারা করেছে এই কাজ? কেন? কি সমস্যা ওদের ওই দুধের বাচ্চাটার সাথে?”

“টার্গেট বোধ হয় ইরাম আপু ছিল, কিছুটা ছিটকে গিয়ে ইযানের হাতে লেগেছে।”

“কোন নিমকহারাম করবে এমন কাজ?”

“আমি জানি।”

অপর একটি কন্ঠস্বরে সকলে জমে গেল। ঝট করে ফিরে তাকাল। করিডোর বেয়ে ছুটে আসছে ইহান। সে এসেই ধপাস করে ইরামের সামনে হাঁটু মুড়ে বসে বোনকে শক্তভাবে জড়িয়ে ধরল।

“আপু, তুমি ঠিক আছো? তোমার কোথাও লাগেনি তো? দেখি, দেখি কোথায় কষ্ট হচ্ছে?”

ইরাম এতক্ষণ যাবৎ নিজের আলাদা একটা ঘোরের মাঝেই ছিল। তবে ভাইকে কাছে পেয়ে খপ করে তার কাঁধজোড়া খামচে ধরল সে। রীতিমত পাগলের মত উদ্ভ্রান্ত নয়নে সে তাকাল ইহানের দিকে,

“তুই…তুই জানিস? কে? বল আমাকে! এক্ষুণি! কীভাবে জানিস? কে আমার কলিজায় হাত দিয়েছে? বল! অরণ্য?”

মাথা ঝাঁকাল ইহান।

“বখতিয়ার।”

ইরামের ভ্রু কুঁচকে গেল। মিসির কাছে এসে দাঁড়াল। শুধাল,

“বখতিয়ার কে?”

“এলাকার পার্টির ছাত্রনেতা।”

ইহান গড়গড় করে বলে গেল।

“আপু, তোমরা যখন হাসপাতালে আসছিলে, তখন আমি আমার সাইকেলে করে ওদের বাইকটাকে ফলো করেছিলাম। কাছে যেতে পারিনি। দূর থেকেই দেখেছি। যেখানে থেমেছে, ওটা ওদের হাইডআউট। সবাই চেনে আপু। দুটো ছেলেই বখতিয়ারের চ্যালা।”

ইরাম থমকে গেল। চোখের পানিও বুঝি শুকিয়ে গেল তার। মিসির আর সারিকা একে অপরের দিকে তাকাল। মিসির বলে উঠল,

“কিন্তু একটা পলিটিকালি ইনভলভড ছেলের ইরামের উপর কিসের রাগ?”

“আমার আপুর সঙ্গে কারো কোনো শত্রুতা থাকতেই পারেনা। ওই বখতিয়ারের বাচ্চা শালা একটা কুত্তা! দেখুন গিয়ে, আপনাদের কারো মধ্যেই ঘাপলা আছে! আমার বোনের উপর দিয়ে শোধ তুলে নিয়েছে!”

রীতিমত গর্জে উঠল ইহান। তবে এর বেশি কিছু করা সম্ভব হলোনা। একজন ডাক্তার ভেতর থেকে উঁকি দিলেন,

“বাচ্চার মা কোথায়? একটু ভেতরে আসুন আপনি।”

ইরাম এক লাফে উঠে দাঁড়াল। বাকি সব চিন্তাই তার মাথা থেকে বেরিয়ে গেল ওই মুহূর্তে শুধু নিজের ছেলে ছাড়া। ভেতরে ইযান তখনো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। তার ছোট শরীরটা বেডে রাখা হয়েছে। হাতে ক্যানোলা সংযুক্ত, স্যালাইন বা ঔষধজাতীয় কিছু দেয়া হচ্ছে শরীরে। ক্ষতের উপর বার্ন ক্রিমের প্রলেপ দেয়া। ছোট্ট অস্তিত্বটিকে ঘিরে এত আয়োজন, এত যন্ত্রপাতির বহর, স্যালাইনের নল দেখে ইরাম আজ কতবারের মত শেষ হলো নিজেও বলতে পারবেনা। সামিয়া তার কাছে এগিয়ে গিয়ে আগলে নিতে চাইলেন নিজের মাঝে। অথচ ইরাম সামিয়ার সাহায্যও আর গ্রহণ করলনা। তাকে ঠেলে বিছানার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। অস্বচ্ছ চোখে ঝুঁকে ছেলের মুখটা আলতো করে স্পর্শ করল,

“খুব কষ্ট হচ্ছে, তাইনা আব্বু?”

ইরামের গলা সম্পূর্ণ ভেঙে গিয়েছে। ডাক্তার জানালেন,

“আল্লাহর অশেষ রহমত যে মাইল্ড বার্ন হয়েছে। সাথে সাথে ক্ষতে পানি ঢালার কারণে মূল বিপদটা সেখানেই কেটে গিয়েছে। তবে বয়স অনেক কম, আর বাচ্চার স্কিন অনেক সেনসিটিভ। তাই আমরা তিনদিনের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখব আপাতত। ট্রিটমেন্ট চলমান থাকবে। অনুরোধ থাকবে, ধৈর্য্য ধরার।”

ইরাম জবাব দেয়ার মতন কোনো অবস্থায় নেই। সামিয়াই নিজের ভেজা চোখ মুছে বললেন,

“থ্যাংকস ডক্টর।”

আশেপাশের কোনো দৃশ্যেই আর আগ্রহ নেই ইরামের। সে বিছানায় বসে সাবধানে ইযানের শরীরটা বুকে তুলে নিল। নার্স তাকে সাহায্য করল, যেন ক্যানোলা ডিস্টার্বড না হয়। কাঁদতে কাঁদতে হাঁপিয়ে গিয়েছে ইযান। শরীরটা ইরামের বুকে কাদামাটির মত দূর্বল হয়ে পড়ে থাকল। ছেলের দিকে ঝুঁকে তার গায়ের সুবাস জোরপূর্বক গ্রহণ করতে করতে ইরামের মস্তিষ্ক সচল হয়ে উঠল একটু একটু করে।

তার ছেলেকে যে বা যারা কষ্ট দিয়েছে, তাদের কোনোদিন সে ক্ষমা করবেনা! নিজের আপন মানুষ হলেও না!

⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──

বিমানবন্দরের বাইরে পা রাখতেই দূরে অনুরাগের বাইকটা চোখে পড়ল সাইবানের। মানুষের ভিড় ঠেলে লম্বা পা ফেলে ছুট লাগাল সে। সাথে করে ওয়ালেট, ঘড়ি আর ফোন ছাড়া কিছুই আনেনি সে। ব্যাগও না। খবর পেয়েছে সে সারিকার একটা টেক্সট মেসেজ থেকে। পরে সামিয়া কল করেছিলেন। ওই অবস্থায় ইমারজেন্সি ফ্লাইট টিকিট বুক করে সে সিলেট থেকে সোজা ঢাকা এসেছে। এখন সময়টা পড়ন্ত বিকালে গিয়ে ঠেকেছে।

অনুরাগ নিজের বাইক নিয়ে সাইবানের জন্যই অপেক্ষা করছিল। অদূর থেকে বন্ধুকে দৌঁড়ে আসতে দেখে এবার সে সোজা হয়ে দাঁড়াল। সাইবান কাছে আসতেই বোঝা গেল ভীষণ রকমের চিন্তিত এবং ক্রোধান্বিত সে। না চাইতেও বেশ ঝাঁঝ নিয়ে সাইবান জিজ্ঞেস করল,

“আমার বাচ্চা কেমন আছে?”

অনুরাগ যদিও উত্তরটা প্রস্তুত করেই এসেছিল, তবে সাইবানের সরাসরি জিজ্ঞেস করায় কিছুটা অবাক হলো সে। তার বাচ্চা? এর আগে কখনো ইযানকে এতটা গভীরভাবে সাইবান সম্বোধন করেনি। তবে আপাতত সেসব বিশ্লেষণে না গিয়ে অনুরাগ উত্তর করল,

“মাইল্ড বার্ন। অবজার্ভেশনে আছে।”

অনুরাগ কথাটা কোনমতে শেষ করেছে কি করেনি সাইবান হঠাৎ খপ করে তার থুতনি চেপে ধরল। অত্যন্ত আগ্রাসী ভঙ্গিতে অনুরাগকে ঠেলে বাইকের উপর ঠেসে ধরল। হতবাক বন্ধু তার মাঝে যেন রীতিমত অশরীরী ভর করতে দেখল। সাইবানের উজ্জ্বল হলদেটে চেহারায় তীব্র লালচে ভাব। ভ্রুজোড়া একজোট হয়েছে ভীষণ কুঞ্চনে, পিয়ার্সিং কাঁপতে দেখা যাচ্ছে ভীষণভাবে। দাঁত কিড়মিড় করে সাইবান রীতিমত হুংকার দিয়ে উঠল,

“কোথায় ছিলিস তোরা? কোথায় ছিলিস তোরা বেঈমানের দল?”

অনুরাগ ব্যথা পাচ্ছে। সাইবানের হাতটা সে খামচে ধরল,

“কুল ডাউন সাইবান! তোর মাথা ঠিক নেই!”

অনুরাগকে দ্বিগুণ শক্তিতে ছেলে ধরে হিংস্র পশুর ভঙ্গিতে ভারী গলায় সাইবান ঘোষণা করল,

“আমার প্রাণটায় হাত দিয়েছে ওরা! আল্লাহর কসম, অনুরাগ! একটা একটাকে ধরে মাটিতে জ্যান্ত পুঁতে ফেলব আমি!”

যেমন হুট করে ধরেছিল, তেমন হুট করেই অনুরাগকে ছেড়েও দিল সাইবান। তারপরই বন্ধুর অপেক্ষা না করে নিজেই বাইকের চালকের আসনে চেপে ধরল। নিজের চোয়াল চাপতে চাপতে অনুরাগ মহা বিস্ময় নিয়ে তাকে দেখল। যেন চিরকালের চেনা বন্ধুর স্থানে কোনো পিশাচ জায়গা করে নিয়েছে। এই পিশাচকে ভীষণ রকম অচেনা ঠেকল তার কাছে। তবে অনুরাগ বেশি বাহানা করলনা। সাইবানকে বাইক চালাতে দিল। নিজের পিছনের সিটে উঠে বসল। কিছুক্ষণ বাদেই টের পেলো কত বড় ভুল সিদ্ধান্ত ছিল সেটি। রাস্তা দিয়ে বাইক নয়, রীতিমত প্লেন ছুটিয়ে নিল সাইবান। এতটা তীব্র গতি যে শ্বাস নেয়াও কষ্টকর হয়ে দাঁড়াল। রাজধানীর গাড়ির বহরের মাঝে এত বিপদজনক সব বাঁক কেটে গেল সাইবান যেন রেসিং ট্র্যাকে রেস করতে নেমেছে সে। অনুরাগ পিছন থেকে আঁকড়ে ধরে রাখল বন্ধুকে।

“হাসপাতালে পৌঁছানোর আগে আমাদের উপরওয়ালার কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করছিস, শালা?”

না পারতে চিৎকার করে উঠল অনুরাগ। সাইবানের তরফ থেকে জবাব এলোনা। বাইকের সামনে ঝুঁকে উল্টো গতি বাড়াল সে। ছাড়িয়ে গেল ঘণ্টায় পঁচাশি কিলোমিটার! অনুরাগ চোখ বুঁজে সৃষ্টিকর্তার নাম জপতে জপতে ভাবল, ট্রাফিক পুলিশ সব জায়গায় থাকলে রাস্তার মোড়ে মোড়ে ধরে সাইবানকে জরিমানা করা হত আজ।

শেষমেষ প্রায় পঁয়ত্রিশ মিনিটের জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে বুঝি যমকে দেখতে দেখতে হাসপাতালে পৌঁছাতে সক্ষম হলো অনুরাগ। সাইবানের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। হেলমেটটা খুলে হাওয়ায় ছুঁড়ে দিয়ে দৌঁড়ে চলে গেল ভেতরে। অনুরাগ সেটা পাকড়াও করে বাইকে রেখে কিছুক্ষণ সেখানেই দাঁড়িয়ে নিজেকে স্থির করল। বুক এখনো ধড়ফড় করছে তার। যেন সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন যমদূত। নিজের কপালে জমা ঘাম শার্টের হাতায় মুছতে মুছতে মুরগীর মত ছটফট করতে থাকা অন্তরকে একটু শান্ত করে সে শেষমেষ ছুটে গেল ভেতরে।

হাসপাতালের পরিবেশ এখন অনেকটাই শান্ত। করিডোরে পা রাখতেই ওয়েটিং জোনে নিজের বোন সারিকা আর দুলাভাই মিসিরকে অপেক্ষারত দেখতে পেল সাইবান।

“সাই! ফাইনালি!”

সারিকা লাফিয়ে উঠল। অথচ তার প্রতি বিশেষ মনোযোগ না দিয়ে সাইবান শুধাল,

“কোন রুম?”

হাত তুলে সারিকা দেখিয়ে দিল। সাইবানের মুখটা কেমন থমথমে। তাই সে বেশি কথা বাড়ায়নি। সাইবান সোজা হাঁটা দিল। পিছনে সকলে তাকে অনুসরণ করল নীরবে।

একটি প্রাইভেট কেবিনে দেয়া হয়েছে ইযানকে। বাইরে পৌঁছাতেই কেবিনের স্বচ্ছ কাঁচের দেয়ালের ভেতরের দৃশ্য স্পষ্টত চোখে পড়ল সাইবানের। বিশাল বিছানায় শুয়ে আছে নাজুক শিশুটি। হাতে ব্যান্ডেজ, ক্যানোলা। পড়ন্ত বিকালের হলুদাভ রশ্মি তার শান্ত মুখটায় পড়ছে। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন সে। সাইবানের দৃষ্টি আটকালো ইযানের হাতের উপর। ওই নল, স্যালাইন, ব্যান্ডেজের বহর থেকে ক্রমশ শক্ত হয়ে উঠল তার দুহাতের মুঠো। এত জোরে পাকাল সে নখ গেঁথে গেল হাতের চামড়ায়। জীবনে প্রথমবারের মতো এক ভয়ানক অনুভূতি অনুভব করল সাইবান।

এক অসহায় বাবার অনুভূতি।

অন্তর তার চিৎকার করে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। ইচ্ছা হচ্ছে ছুটে গিয়ে কোনোকিছুর পরোয়া না করে ওই নাজুক শরীরটাকে নিজের বুকে চেপে ধরতে। জগতের সকল কষ্টের কাছ থেকে আড়াল করে ফেলতে। কষ্ট আসুক, যন্ত্রণা হোক, কিন্তু সব তার নিজের হোক! তার বাচ্চার কেন? নিজের ভাবনায় নিজেই খেই হারাল সাইবান। কবে থেকে ওই পোটলাটা তার এত আপন হয়ে গেল। যদি আজ হাসপাতালের বিছানায় ওই ছোট্ট শরীরটাকে না দেখত, তবে সাইবান কি আদৌ টের পেত?

কেবিনের দরজাটা নিঃশব্দে খুলল। ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো ইরাম। সাইবান তৎক্ষণাৎ চোখ ফিরিয়ে তাকাল। তার সবটুকু রাগ, ঝাঁঝ ক্ষণিকের জন্য মিইয়ে গেল। অশান্ত চোখজোড়া অর্ধাঙ্গিনীকে পর্যবেক্ষণ করল আপাদমস্তক। যখন নিশ্চিত হলো, বাহ্যিক কোনো ক্ষতি হয়নি, শুধুমাত্র তখনি সাইবান একটি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল সে ইরামের কাছে। যে এই মুহূর্তে অতি শান্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। বিষয়টা বেমানান। ইরামের চোখজোড়া কেমন যেন ফাঁপা। সাইবানের বুক কাঁপল ভীষণ। কেন, তা সে নিজেও বলতে পারবেনা।

“মাই প্রেশিয়াস…”

রীতিমত ফিসফিস করে উচ্চারণ করল সাইবান। একটি কাঁপা কাঁপা হাত বাড়িয়ে দিল। ঠিক তখনি,

ঠাস!

ইরামের ডান হাতটা সজোরে চড় দিল সাইবানের গালে। মাথাটা হেলে গেল তার একপাশে, ঝুলে পড়ল রীতিমত। সাইবান শ্বাস নেয়াও ভুলে গেল। দুহাত মুঠো পাকিয়ে গেল দুপাশে। অত্যন্ত ধীরে মাথা কাত করে অবিশ্বাস মাখা জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে সে দেখল ইরামকে। রমণীর পাথুরে চোখ আর শুকনো নেই, ঝরঝর করে অশ্রু ঝরছে। ইরাম দুহাত ছেড়ে কেঁদে উঠল,

“আর কতটা কেয়ারলেস হলে তুমি বুঝতে পারবে মানুষের জীবনের মূল্য কতটুকু? আই হেইট ইউ! আই হেইট ইউ সো মাচ, আলাদিন!”

                                  —চলবে—

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply