আমার_আলাদিন
জাবিন_ফোরকান
পর্বসংখ্যা৭
🚫 টক্সিসিটি অ্যালার্ট ‼️
“অরণ্য! অরণ্য প্লীজ, একবার আমার কথাটা শুনুন!”
ইরামের আকুতি মিনতিতে কোনো কাজই হলোনা। অরণ্য তার হাতটা ধরে টানতে টানতে বেডরুমের ভেতর নিয়ে গিয়ে বিছানায় ফেলে দিল। যে কব্জিটা অরণ্য ধরেছে সেটায় লাল দাগ পড়ে গিয়েছে, ভীষণ ব্যথায় টনটন করছে। অরণ্য ঠাস করে দরজাটা আটকে দিল। অতঃপর ইরামের দিকে ফিরল। লোকটার চোখেমুখে উপচে পড়া ক্রোধ। ফুঁসতে ফুঁসতে বিছানার কাছে এসে ইরামের শরীরের উপর ঝুঁকে পড়ল সে।
“তুই ওই বাইনচোদটাকে ঘরের ভেতর ঢুকতে দিয়েছিস কোন সাহসে? কি সম্পর্ক তোর ওই কুত্তার বাচ্চার সাথে?”
কেঁপে কেঁপে উঠল ইরাম। হাহাকার করে উঠল,
“প্লীজ। উনি শুধু আমার অর্ডার ডেলিভারি করতে এসেছিল।”
“অর্ডার ডেলিভারি করতে ঘরের ভেতর ঢোকাতে হয়?”
“বলছিল একটু পানি থাকলে দিতে। এত গরম বাইরে। তাই ভেতরে বসিয়ে শুধু পানি দিয়েছিলাম আমি।”
“শুধু পানি খাইয়েছিস নাকি নিজেকেও?”
“অরণ্য!”
ঠাস করে ইরামের গালে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল অরণ্য। সেই থাপ্পড়ে এতটাই জোর পড়ল যে দাঁতে লেগে ইরামের ঠোঁট কেটে রক্ত বেরিয়ে এলো, মুখের ভেতর নোনতা স্বাদ পেল সে। অথচ একটুখানি দম ফেলার সুযোগটুকুও পেলনা। অরণ্য তার থুতনি চেপে ধরে জোরপূর্বক তার ঠোঁটের মাঝে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। এ কোনো ভালোবাসা বিনিময় নয়, স্রেফ ক্ষুধার্ত এক পশুর আক্রমণ। ঝটকা দিয়ে উঠল ইরাম, ঠেলে অরণ্যকে দূরে সরাতে চাইলেও পারলনা। তার হাত দুটো বিছানার সঙ্গে শক্তভাবে চেপে ধরে রাখল অরণ্য।
“তুমি শুধু আমার ইরাম। তোমার শরীর, মন, আত্মা সবকিছুর উপর শুধু অরণ্য মির্জা সওদাগরের অধিকার। কোনো বাঙ্গির পোলা তোমার দিকে চোখ তুলে তাকালে আমি ওকে জ্যান্ত কবর দিয়ে রাখব, শুনে নাও তুমি। তুমি আমার, আমার এবং শুধুই আমার! বুঝেছ? এই বুঝেছিস বান্দি? বল!”
ইরাম দাঁতে ঠোঁট কামড়ে ধরে রাখল। বলবেনা সে। কিছুতেই বলবেনা। তাতে অরণ্য দ্বিগুণ ক্ষেপে তার পরনের শাড়ি টেনে ধরল। আঁচল টেনে সরিয়ে ফেলল, ইরাম কাপড়টা আঁকড়ে ধরল,
“অরণ্য। প্লীজ, বিশ্বাস করুন আমার অন্য কারো সাথে কোনোপ্রকার সম্পর্ক নেই। ওই লোকটারও কোনো দোষ নেই। আপনি এমন করবেন না। আপনি মাথা ঠান্ডা করে….”
“এই চুপ! মাথা আমার ঠান্ডা হবে শুধু তোকে পেলে, বুঝেছিস? শাড়ি পড়বি তুই, অন্য পুরুষকে নিজের দেহ দেখিয়ে বেড়াবি? ইরাম! কতবার তোকে বলেছি আমি যে…”
ঠিক নিজের কোমরে ধারালো কিছুর তীক্ষ্ণ ঘায়ে চিৎকার করে উঠল ইরাম। অরণ্য নাইটস্ট্যান্ড থেকে একটা রেজর ব্লেড তুলে ইরামের কোমরে বসিয়ে দিয়েছে। বিন্দু বিন্দু রক্তে বিছানার সাদা চাদর লালচে হয়ে উঠল মুহূর্তেই। অরণ্য থামলনা। হাত বাড়িয়ে ড্রয়ার খুলে একটা হ্যান্ডকাফ বের করল। ছটফট করতে থাকা ইরামের দুটো কব্জি সে বেডপোস্টের সাথে বেঁধে ফেলল। শাড়িটা সম্পূর্ণ খুলে ছুঁড়ে ফেলল মেঝেতে। ইরামের গলা ভেঙে গিয়েছে আকুতি জানাতে জানাতে,
“প্লীজ, অরণ্য এখন না। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, দোহাই লাগে আপনার! অরণ্য!”
“আমি তোর স্বামী, আমার যখন মনে চায় তোকে নিজের ইচ্ছামত ভোগ করতে পারি, তুই নিজেই কাবিননামায় স্বাক্ষর করে সেই সার্টিফিকেট আমায় দিয়ে দিয়েছিস। তাই এখন একদম চুপ থাকবি।”
নিজের শার্ট খুলে ঝুঁকে এলো অরণ্য। অসম্ভব সুদর্শন এবং শারীরিক গঠনের অধিকারী নিজ স্বামীকে ইরামের তখন মনে হলো সাক্ষাৎ কোনো পিশাচ। তার গাল চেপে ধরে হঠাৎ আদুরে গলায় অরণ্য বলল,
“এবারের মত তোমাকে বিশ্বাস করলাম। কিন্তু দ্বিতীয়বার কোনো পরপুরুষের সাথে যদি তোমায় দেখি বউ, তাহলে ওটাকে খু*ন করব, এরপর তোকে, সবশেষে নিজেকে! বুঝেছ? হাউ মাচ আই লাভ ইউ মাই ওয়ার্ল্ড?”
অরণ্য নিজের কাজ আরম্ভ করল। অথচ ইরামের শরীর একটুও সায় দিলনা। চোখ বুঁজে ফেলল সে। ফোঁটায় ফোঁটায় নীরব অশ্রু বালিশে পরে যেন জানতে চাইলো, এ কেমন ভালোবাসা?
বর্তমান:
সাইবান দ্বিতীয় কিছু বলার সুযোগ পেলনা। এর আগেই হঠাৎ করে ইরাম পিছন ঘুরে একটা জোরালো ধাক্কা দিয়ে তাকে দূরে সরিয়ে দিল। ধাক্কাটায় অদ্ভুত জোর পড়ল, যার দরুণ সাইবান সোজা বিপরীত দিকের কাউন্টারে গিয়ে আছড়ে পড়ল। কোনমতে দুহাতে নিজের ভারসাম্য রক্ষা করে প্রসারিত দৃষ্টিতে চেয়ে দেখল সে ইরামকে।
“ডোন্ট ইউ ডেয়ার টাচ মি!”
শান্ত, নির্মল, স্নিগ্ধ ইরাম সেকেন্ডের ব্যবধানে ধারণ করেছে রুদ্রমূর্তি। তার চোখ বেয়ে যেন আগুন ঝরছে। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল সাইবান, কিছুতেই বুঝতে পারলনা এই রমণীর সঙ্গে কি হচ্ছে। ইরামের কন্ঠস্বর অবধি বদলে গিয়েছে, তাতে দৃঢ়তা এবং ক্রোধ,
“কি ভাবো কি নিজেদের তোমরা ছেলেরা? স্ত্রী কি তোমাদের ব্যক্তিগত প্রপার্টি? হ্যাঁ? প্রপার্টি টু গার্ড? টু পজেজ? নিজেরা হাজারটা মেয়ের দিকে চোখ দিলে সমস্যা নেই, কিন্তু স্ত্রী সামান্য হাত ধরলে, মুচকি হাসলেই সব সমস্যা? কি বলতে চাও তুমি? তোমার দুলাভাইয়ের সাথে আমার পরকীয়ার সম্পর্ক?”
“ইরাম আপু!”
শেষ বাক্যের পর আর চুপ থাকতে পারলনা সাইবান। পাল্টা গর্জে উঠল সেও।
“মুখ সামলে কথা বলুন আপনি! খবরদার ওই শব্দটা যদি আর একবার মুখে এনেছেন…”
“তবে? কি করবে তুমি? বিছানায় টেনে নিয়ে যাবে? মারবে? জোর করে ভোগ করে বুঝিয়ে দেবে আমি শুধু তোমারই সম্পত্তি?”
“শাট দ্যা ফাক আপ রাইট নাউ!”
সাইবানও রেগে গিয়েছে। ইরামের এমন প্রতিক্রিয়ায় তার মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। নিজেকে কেমন অপরাধী লাগছে। প্রপার্টি? দখলবাজ ছেলে? ইরাম তাই ভাবে তাকে? হ্যাঁ, তাই তো! ইরাম কবেই বা তাকে প্রাধান্য দিয়েছে? কবেই বা তাকে নিয়ে একটু ভেবেছে? রাগের মাঝেও এক সূক্ষ্ম পরিহাসের হাসি ফুটল তার ঠোঁটজুড়ে। মাথার চুলে অতি হতাশায় আঙুল চালালো সে,
“জোরজবরদস্তি আর অধিকারবোধের মাঝে একটা পার্থক্য আছে, আপু। আপনি দুটোকে গুলিয়ে ফেলেছেন।”
ইরাম আগের তুলনায় খানিকটা শান্ত হলেও তার ক্রোধ সম্পূর্ণ উবে গেলনা। দৃপ্ত কন্ঠে সে অভিযোগ করল,
“তোমরা এই জেনারেশন ভুলে গিয়েছ জবরদস্তি ইয নট রোমান্টিক অ্যাট অল। স্ত্রীর উপর জোর খাটিয়ে নিজেকে আলফা মেল প্রমাণ করতে চাও? কন্ট্রোলিং হয়ে দাপট দেখাতে চাও? ফ্যান্টাসি জগৎ থেকে বের হয়ে আসো। বাস্তব জগৎ আর কল্পনার জগতের মাঝে ফারাক আকাশ পাতালের। একটা মেয়ের ওয়াদায় যুক্ত হওয়ার অর্থ এই না যে সে নিজের গোটা অস্তিত্ব তোমার নামে দলিল করে দিয়েছে!”
“আপনি আমাকে শুরু থেকে তাই ভেবে এসেছেন, তাইনা ইরাম আপু? আপনি আমাকে আপনার দেখা আর পাঁচটা দশটা ছেলের থেকে আলাদা কিছু কোনোদিন ভাবতেই পারেননি!”
সাইবানের কথায় হঠাৎ করে থমকে গেল ইরাম। এতক্ষণে যেন তার হুশ ফিরল। একটা ঘোরের মধ্যে ছিল যেন, হুট করে বাস্তবে চলে এসেছ। সামনে সাইবান দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটার চেহারা উৎফুল্ল, ঠোঁটে সবসময়ের মতই দুষ্টুমির হাসি। অথচ তার চোখে উদ্ভাসিত অব্যক্ত বিষাদটুকু ইরাম ঠিকই টের পেল। সাইবান সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নিজের চুলে আরেক দফায় হাত বুলিয়ে বলে বসল,
“ইউ নো হোয়াট, আপু? ইউ ডিজার্ভ ইট! ইউ ডিজার্ভ টু বি অ্যালোন! ইউ ডিজার্ভ এভরিথিং ইউ আর গোয়িং থ্রু!”
ইরামের শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা একটি স্রোত খেলে গেল। কোনো জবাব দিতে পারলনা সে। সাইবান উল্টো ঘুরে হনহন করে কিচেনের বাইরে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার আগে হাতের ধাক্কায় ঠাস করে একপাশে রাখা থালাবাসনের বক্সটা ফেলে দিল। মেঝেতে ধপাস করে সবকিছু পড়ল। ভেঙে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেল চারপাশে। ভাঙা কাঁচের উপর প্রতিফলিত হওয়া নিজের অজস্র প্রতিবিম্বের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইল ইরাম। কখন সামিয়া এবং মিসির দুজনই অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে কিচেনে এসে তাকে ধরল সে টেরটুকুও পেলনা।
─────────────────────────────
সেদিন রাতের বেলা।
গেস্ট রুমের ভেতর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ইরাম। নিজের প্রতিবিম্বকে নিজেরই বেশ খানিকটা অচেনা লাগছে। আজ বহুদিন বাদে সে সাজগোঁজ করেছে। জীবনে সবসময় অন্যের খেয়াল রাখা হলেও কখনো নিজের খেয়াল রাখার সুযোগ তার হয়নি। রুগ্ন, পাতলা শরীরে ঢোলা গাঢ় সবুজ চুমকি বসানো ডিজাইনার কামিজ জড়ানো। সামিয়া অনেক শখ করে কিনে এনেছেন। সাইবানের বিয়েটা যেহেতু হঠাৎ করেই হচ্ছে, তিনি চান অন্তত আজ রাতে ছোট করে একটা মেহেদী অনুষ্ঠান করতে। অনুষ্ঠান বলতে খাওয়াদাওয়ার আয়োজন। মেহেদী আর্টিস্ট বুক করা হয়েছে। এমনিতেও এসব জিনিসের প্রতি একদম মন নেই ইরামের। উপরন্তু সকালের ঘটনাটা এখনো মন থেকে বের করতে পারছেনা সে। সাইবানের চেহারাটা স্মরণে আসলেই নিজেকে কেমন অপরাধী লাগছে তার। অরণ্যর মানদন্ডে সাইবানকে মেপে ফেলেছে সে। তখন না বুঝলেও এখন তার খারাপ লাগছে। মনের ভেতর একটা অশুভ চিন্তা উঁকি দিচ্ছে। সাইবান শেষ যে কথাটা তাকে বলে গিয়েছে, সেটাও ভীষণ গায়ে লেগেছে। হাঁটুর বয়সী একটা ছেলে এইভাবে তার মুখের উপর বলে গেল? আর সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনল? সবকিছু মিলিয়ে ইরাম এখন অথৈ দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে।
জরিদার লালচে সোনালী পাড়ের ওড়নাটা গায়ে জড়াতে জড়াতে ইরাম আরেক দফায় নিজের প্রতিবিম্বকে দেখল। ভিন্ন একজন মানুষ তাকিয়ে আছে তার দিকে। ইযান কোলে আসার পর থেকে সময় করে নিজের চুল আঁচড়ানোর প্রয়োজনবোধ করেনি, ত্বকের যত্ন নেয়ার সুযোগ পায়নি, হয়নি নিজের শারীরিক ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার সুযোগ। তবুও হালকা মেকআপের প্রলেপে এবং গয়নার সজ্জায় তাকে মন্দ লাগছেনা। তাজা গোলাপের মালা হাতে বেঁধে এবং চুলে গুঁজে শেষমেষ নিজের সাজসজ্জায় ক্ষান্ত দিয়ে ইরাম বাইরে বেরিয়ে এলো।
বাড়ির লিভিং রুমটা বেশ সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। মরিচবাতি এবং পর্দায় ঘেরা চারপাশ। সোফা সরিয়ে মেঝেতে কার্পেট বিছিয়ে দেয়া হয়েছে। তাতে মেহেদী, মিষ্টি, ফলমূল ইত্যাদির ডালা সাজানো। মেহেদী আর্টিস্ট ইতোমধ্যে চলে এসেছে, কার্পেটে বসে এই মুহূর্তে সারিকার হাতে মেহেদী পরিয়ে দিচ্ছে। একপাশে সামিয়ার কোলে চুপটি করে বসে ইযান বড় বড় চোখ মেলে চারপাশ দেখছে। সুগন্ধা একটি ঝুনঝুনি নাড়িয়ে তার আকর্ষণ ধরে রাখতে চাইছে। বাড়ির একমাত্র জামাই মিসির হলুদ একটা পাঞ্জাবী পড়েছে, হাতে মোবাইল ফোন। পায়চারি করতে করতে কারো সঙ্গে কথা বলছে। খুব সম্ভবত বিয়ের কোনো কাজ নিয়েই। মোটামুটি সকলকে দেখতে পেলেও সাইবানকে কোথাও চোখে পড়লনা ইরামের। তার বন্ধু বান্ধবদের আসার কথা ছিল, এসেছে কিনা কে জানে।
“আরে! কি সুন্দর লাগছে তোকে! আমি জানতাম আমার চয়েজ ভালো, তবে এতটাও ভালো ভাবতেই পারিনি!”
সামিয়া মন্তব্য করতেই চোখ ঘুরিয়ে ইরামের দিকে তাকাল সারিকা। আপাদমস্তক রমণীকে পর্যবেক্ষণ করে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো বিতৃষ্ণায়।
“খাচ্ছে, পড়ছে আমাদের টাকায়, আবার যতসব ঢং!”
কথাটা সারিকা মৃদু গলায় বললেও পিছন থেকে ইরাম স্পষ্ট শুনতে পেল। তবে বাইরের মানুষের সামনে তেমন কোনো মন্তব্য না করার সিদ্ধান্ত নিল। ইযানকে আদর করে এসে অতঃপর কার্পেটে পা ছড়িয়ে বসল সে। মেহেদী আর্টিস্ট তার হাতে নিজের কারুকার্য রচনা শুরু করল তৎক্ষণাৎ। বিষয়টা খুবই বিরক্তিকর। এত দীর্ঘ সময় ধরে একটানা এভাবে বসে থাকা।
ইরাম সবথেকে সংক্ষিপ্ত আর সিম্পল ডিজাইন বেছে নেয়ার পরেও পাক্কা দুই ঘণ্টা সময় লাগল সম্পূর্ণ শেষ হতে। বসে থাকতে থাকতে ইতোমধ্যে ইরামের পিঠ ধরে গিয়েছে। অবশ হয়ে আসছে হাত পা। মেহেদী আর্টিস্ট মেয়েটা তাকে নরম গলায় শুধাল,
“আপু, আপনার হাসবেন্ডের নামটা?”
চোখ পিটপিট করল ইরাম।
“হাসবেন্ডের নাম দিয়ে কি হবে?”
“মেহেদীর ডিজাইনের ভেতর একটা জায়গায় লুকিয়ে লিখে দেব। পরে হাসবেন্ড খুঁজে বের করবে ওনার নাম কোথায় লিখা আছে।”
“এসব আজব ট্র্যাডিশন কবে উদ্ভব হলো?”
ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল মেহেদী আর্টিস্ট।
“না মানে, এটা ট্রেন্ড। সবাই করে তাই।”
“সবাই করলেই কি আমাকেও করতে হবে?”
বলতে বলতে ইরামের চোখ পড়ল সারিকার দিকে। তার মেহেদী পরা শেষ। মিসির একটা হেয়ার ড্রায়ার নিয়ে এসেছে। তার পাশে বসে হাতে ড্রায়ার চালিয়ে দ্রুত শুকিয়ে নিতে সাহায্য করছে। দৃশ্যটা মনোরম। অথচ সারিকা কেমন শকুনি দৃষ্টিতে ইরামকে দেখছে। মাথা ঝাঁকিয়ে শেষমেষ সুর পাল্টে ইরাম মেহেদী আর্টিস্টকে বলল,
“আচ্ছা লিখুন কোথায় লিখবেন।”
“জি, নামটা বলুন আপু।”
সারিকাকে শুনিয়ে শুনিয়ে খানিকটা অহেতুক জোর দিয়েই ইরাম বলল,
“লিখুন, আমার আলাদিন।”
─────────────────────────────
বাড়ির গেটের ভেতরে ঢুকল সাইবানের গাড়ি, পিছনে অনুসরণে অনুরাগের বাইক। ভেতরে বিয়ে সম্পর্কিত একটা অনুষ্ঠান হচ্ছে সেটা সাইবানের পোশাক আশাকে বোঝা যাবেনা। সবসময়ের মতই একটা হাতছাড়া কালো রঙের টাইট ফিটিং ট্যাংক টপ আর সাদা ট্রাউজার পরনে। জিমে গিয়েছিল, সেখান থেকে অনুরাগের বাসায়। পরে সামিয়া ফোনের উপর ফোন করায় একেবারে বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে বাড়ি আসলো। সাইবান গাড়ির দরজা খুলে বেরোলো। তার ঠোঁটে ঝুলছে সিগারেট। আজ সারাদিনে সেবন করা ছয় নাম্বারটা। গাড়ি থেকে নীরব এবং অনুরাগের সঙ্গে বাইক থেকে নেমে এলো আফনান। সকলেই আশেপাশে তাকাল। অল্প হলেও সাজসজ্জা সুন্দর লাগছে। মরিচবাতি ঘেরা, এখানে সেখানে হলুদাভ এবং নীলাভ লাইটিংয়ের ব্যবস্থা। বাড়িটা স্বর্ণের মতন জ্বলজ্বল করছে সামনে। ভেতর থেকে হালকা ধাঁচের কাওয়ালি মিউজিকের আওয়াজ ভেসে আসছে। সঙ্গে কোরমা পোলাওয়ের সুঘ্রাণ। সকলেই বেশ উৎসাহ নিয়ে আশপাশ দেখতে লাগল। অনুরাগ হেঁটে গিয়ে সাইবানের ঠোঁট থেকে সিগারেটটা কেড়ে নিয়ে মাটিতে ফেলে জুতো দিয়ে পিষে ফেলল। বিরক্তবোধ করল সাইবান।
“কি সমস্যা?”
“আজ বাদে কাল তোর বিয়ে। আর তুই এখন সিগারেট ফুঁকে যাচ্ছিস?”
“আমি সিগারেট খাব, গাঁজা টানব, মদ গিলব। তোর কি সমস্যা তাতে? আর বিয়ে?”
তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল সাইবান।
“ওইসব বিয়ে টিয়ে হলো ভুংভাং। আমার জায়গায় থাকলে বুঝতি। তোর এত শখ হলে আমার বদলে তুই বিয়েটা করে ফেল, কেমন?”
“ধর্ম আলাদা না হলে হয়ত ভেবে দেখতাম।”
অনুরাগের কথায় ভ্রুকুটি করল সাইবান। অনুরাগ সিনহা, ধর্মে সনাতনী। কিন্তু বন্ধুদের মাঝে কখনো জাত, পাত, ধর্ম বিষয়ক কোনো পার্থক্য উঠে আসেনি। আফনান এবং নীরবের থেকে সাইবান অনুরাগের সঙ্গে বেশি মিশুক। আফনানরা এসেছে অনেক পরে। সেখানে অনুরাগ তার স্কুলজীবনের বন্ধু। তাই অন্য সকলের থেকে ছেলেটা তাকে একটু বেশিই বুঝতে পারে।
“কি ভেবে দেখতি? আমার হবু বউকে বিয়ে করবি সেটা? আরেকবার ভাব দেখি!”
“সাইবান।”
“না না সোনা, ওসব বললে হবেনা। ভাব শুধু তুই একবার, আমার সামনে ভাব! এক্ষুণি ভাব! তোর মাথায় শিলপাটা ভেঙে ভাবনা ঘুচিয়ে দেব একদম।”
অনুরাগ আর সাইবানের কথোপকথনের মাঝখানে আফনান আর নীরব কাছে ঘেঁষে দাঁড়াল। নীরব শীষ বাজিয়ে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
“আন্টি কোথায়? আন্টিটাকে দেখছি না যে?”
সাইবান ভ্রু কুঁচকে বলল,
“মম? মম তো বিজি।”
“আরে না, তোর হবু বউ আন্টিটা!”
আফনান আর নীরব একে অপরের সাথে হাই ফাইভ করে অট্টহাসি হেসে উঠল। সাইবান এবং অনুরাগ দুজনই খানিকটা বিব্রত হয়ে পড়ল। অনুরাগ বলে উঠল,
“এই। এসব কোন ধরণের দুষ্টুমি? দুষ্টুমির একটা লিমিট আছে। কাউকে অসম্মান করে কথা বলবি না।”
“আপনি কবে থেকে এত সাধু হয়ে গেলেন অনুরাগ দাদা?”
কটাক্ষ করে খিলখিলে হাসল আফনান। নীরব তাল দিয়ে বলল,
“ওই বুড়ি আমাদের কচি বন্ধুর গলায় ঝুলে যাবে, আর আমরা বুড়িকে বুড়ি বলতে পারবনা?”
“এই সাইবান, ডাক না আন্টিটাকে, আমরা একটু সালাম কালাম করি, দোয়া করে দিক আমাদের!”
আফনানের কথার ভিত্তিতে সাইবান চুপ করে রইল। তারপর আনমনে অস্বস্তিভাবটা ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করে বলল,
“আছে হয়ত ঘরের ভেতর কোথাও। মেয়ে মানুষের কাজকাম আমি বুঝিনা।”
“মেয়ে…? আন্টি বল আ…”
“আসসালামু আলাইকুম।”
হঠাৎ করে বন্ধুদের কথোপকথনের মাঝে ভেসে এলো একটি স্নিগ্ধ মেয়েলী কন্ঠস্বর। সকলে নিজেদের জায়গায় জমে গেল। সাইবান ঝট করে পিছন ফিরে তাকাল। বাড়ির দরজা পেরিয়ে সিঁড়ি টপকে হেঁটে হেঁটে আসছে ইরাম। চারপাশে সাজানো মরিচবাতির আলোয় ইরামের পরনের গাঢ় সবুজ ডিজাইনার সালোয়ার কামিজ এবং হাতভর্তি টকটকে মেহেদীর কারুকার্য ক্ষণিকের জন্য সাইবানসহ তার সমস্ত গ্রুপকে বাকরুদ্ধ করে দিল। না চাইতেও সকলে চেয়ে রইল। ইরাম মুচকি হাসল, তার নাকে সজ্জিত নথটি সামান্য দোল খেল,
“তোমরা আলাদিনের বন্ধুরা, তাইনা?”
আফনান আর নীরবের মুখটা হা হয়ে গেছে, শ্বাস আটকে ফেলেছে নিজেদের। অপরদিকে অনুরাগ নিষ্পলক চেয়ে আছে, দৃষ্টি সরাতেই পারছেনা।
“কিসের আন্টি কিসের কি?”
ফিসফিস করল নীরব, তার কথায় তাল দিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় আফনান মুখে হাতচাপা দিয়ে বলে উঠল,
“ওহ! ড্যাম শিইইইইইইট!”
ইরাম তাদের সামনে এসে দাঁড়াল। অনুরাগ ততক্ষণে লজ্জা পেয়ে চোখ সরিয়ে নিয়েছে। কিন্তু বাকিরা আহাম্মকের মত চেয়ে আছে।
“আমি ইরাম কিবরিয়া, তোমাদের দেখে ভালো লাগলো। বাইরে দাঁড়িয়ে আছো কেন? ভেতরে আসো?”
“আন্টি….না মানে ভাবী… ইয়ে.. আপু ওয়া আলাইকুমুস সালাম।”
আফনানের জিহ্বা জড়িয়ে গেল বলতে গিয়ে। নীরব নিজের মুখ বন্ধ করে শক্ত একটি ঢোক গিলে বলল,
“ইয়ে মানে আপু, না মানে ভাবী! ওরে শালা! সরি… আই মিন…হেল! লিভিং হেল মাই গুডনেস গ্র্যাশিয়াস!”
চাইলেও গুছিয়ে কথা বলতে পারলনা নীরবও। মাথার চুল টেনে ধরল নিজের। দুজন ছেলের অপ্রস্তুত ভঙ্গি দেখে স্মিত হাসল ইরাম।
“তোমরা বোধ হয় অনেকটা টায়ার্ড। প্লীজ, ভেতরে যাও। আমি শরবতের ব্যবস্থা করছি। আর তুমি, মিস্টার ভদ্র ছেলে, যাও গিয়ে বসো ভেতরে।”
অনুরাগের গাল রক্তিম বর্ণ ধারণ করল যখন ইরাম তাকে ভদ্র ছেলে বলে ডাকল। তিনজনই রোবটের মতন মাথা নেড়ে প্রায় ছুটে বাড়ির ভেতরে চলে গেল। যাওয়ার আগে একজন নির্দিষ্ট বান্দার তরফ থেকে পাওয়া ভয়ংকর দানবিক দৃষ্টিটা আর খেয়াল হলোনা কারোরই।
সকলে চলে যেতেই একটি নিঃশ্বাস ফেলে ইরাম ঘুরে তাকাল। অবশেষে দেখল সে সাইবানকে। তখনো একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখজোড়া নিবদ্ধ ঠিক যেই পথে আফনান, নীরব এবং অনুরাগ ভেতরে ঢুকেছে সেই পথে। দৃষ্টিতে একটা তীক্ষ্ণ ধার, অশুভ।
“আলাদিন।”
নরম গলায় বলল ইরাম। সাইবান চোখ ঘুরিয়ে তাকে দেখল। আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করল সে ইরামকে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। মাথার চুল থেকে পায়ের পাতা অবধি, এক ইঞ্চিও বাদ রাখলনা। ওই চোখের মাঝে এতটাই গভীরতা যে ইরামের মনে হলো অথৈ সাগরে ডুবে যাচ্ছে সে। সাইবান কোনো রাখঢাক করছেনা। জিভ গালে ঠেকিয়ে নির্লজ্জের মতো তাকে দেখে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। দীর্ঘ একটি প্রশ্বাস টেনে নিজেকে শান্ত রেখে ইরাম বলতে গেল,
“আজকে সকালের জন্য আমি….”
কথাটা ইরাম শেষ করতে পারলনা। সাইবানের উপর পাশ থেকে পশুর মত কিছু একটা ঝাঁপিয়ে পড়ল। ইরামের দিকে তাকিয়ে থাকায় মস্তিষ্কে ঝিম ধরে গিয়েছিল বেচারার, বিপদের আঁচটুকু টের পায়নি। এত ক্ষীপ্রতায় ঘটনাটা ঘটল যে তাল রাখতে বেগ পোহালো ইরাম। সে শুধু দেখল সাইবান মাটিতে আছড়ে পড়েছে। তার বুকের উপর চড়ে বসে ক্রমাগত মুখে ঘুষি হাঁকিয়ে যাচ্ছে একটা বছর পনেরো ষোলোর কিশোর ছেলে।
“স্কাউন্ড্রেল! বাস্টার্ড! আমার বোনকে বিয়ে করবি তুই? আমার বড় আপুকে? শালা লুইচ্চা চারশো বিশ! বেয়াদবের বাচ্চা! চোখ তুলে দেখ তুই শুধু, আমার আপুকে ফাঁসিয়ে বিয়ে করা তোর পিছন দিয়ে বের করে দেব আমি!”
“ইহান!”
আঁতকে উঠল ইরাম। হতবিহ্বল হয়ে দেখল তার আপন ছোট ভাই কীভাবে বিনা বিরামে সাইবানের শরীরে একের পর এক ঘুষি হাঁকিয়ে যাচ্ছে তীব্র আক্রোশে।
—চলবে—
[ দিবনা বলেও দিয়ে দিয়েছি, আমি অনেক ভালো!😞🤲🏻
কিন্তু কালকে দিব না না না! 🥸🙌🏻 ]
Share On:
TAGS: আমার আলাদিন, জাবিন ফোরকান
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
আমার আলাদিন পর্ব ১৩
-
আমার আলাদিন গল্পের লিংক
-
আমার আলাদিন পর্ব ৬
-
আমার আলাদিন পর্ব ১৭
-
আমার আলাদিন পর্ব ৪
-
আমার আলাদিন পর্ব ১১
-
আমার আলাদিন পর্ব ৮
-
আমার আলাদিন পর্ব ১৯
-
আমার আলাদিন পর্ব ২
-
আমার আলাদিন পর্ব ১৪