#নূর_এ_সাহাবাদ
#jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
পর্ব – ৪২
উত্তরের প্রাসাদের ভেতরের গবেষণাগারটা বহুদিন পর আবার মানুষের গুঞ্জনে ভরে উঠলো। এবার সেই গুঞ্জনে ভয় কম আশার ছায়া বেশি। মিরান নিজেই চাইছিলো ধরা পরুক আর তাকে গবেষণাগারে পাঠাক। সুযোগটা নিয়েছিল বহুদিন ধরে খুব নিঃশব্দে। অঙ্কুরের অনুপস্থিতি, প্রাসাদের অস্থিরতা, আর পাহারার ফাঁক সব মিলিয়ে সে একে একে যোগাযোগ করেছিল সেই বন্দি বিজ্ঞানীদের সাথে।
বৃদ্ধ, ক্লান্ত, আতঙ্কে ভাঙা মানুষগুলো প্রথমে তাকে বিশ্বাসই করেনি। কারণ এত বছর ধরে তারা শুধু দেখেছে মৃত্যু, পরীক্ষা, আর পাগলামি। কেউ তাদের খোঁজ ই পায়নি সাহায্য তো দূর। মুক্তি শব্দটাই যেন ভুলে গিয়েছিল সবাই। সেই সময়ে মিরান এর উপস্থিতি তাদের বিচলিত করে। একজন বৃদ্ধ চিকিৎসা বিদ সেদিন কাঁপা কাঁপা গলায় বলেছিল
“এখানে একবার ঢুকলে সে মৃত্যু ছাড়া বের হতে পারবে না। …”
মিরান তখন ধীরে টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকা কাগজগুলোর দিকে তাকিয়ে এক নিঃশ্বাসে কয়েকটা জটিল সংকেত পড়ে শুনিয়েছিল।
তারপর ভুলভাবে মেশানো এক তীব্র দাহকারী রস আলাদা করে দেখিয়ে বলেছিল
“এটা এভাবে রাখলে বিস্ফোরণ হবে। আগে ঠান্ডা ভেষজ নির্যাস মেশাতে হবে।”
ঘরের সবাই থমকে গিয়েছিল। আর তখনই তারা বুঝেছিল মেয়েটা শুধু জানে না, বোঝেও। সেও নিশ্চয়ই অভিজ্ঞ কেউ। মিরান তাদের কথা দেয় খুব শিঘ্রই সে আসবে এখানে। বহু দিনের পরিশ্রমের ফলে সে এখানে এসে পৌঁছেছে। মিরান এর প্রথম পরিকল্পনা ছিলো ওষুধের কার্যকারীতা উল্টো করার। অর্থাৎ এই ওষুধ প্রয়োগে আর কারো ক্ষতি করতে পারবে না, যারা এই ওষুধ কিনে নেয়। এত দাম দিয়ে কেনা দ্রব্য যখন কাজ না করবে তখন সেদিক থেকে বড়সড় একটা হামলার মুখে পড়বে অঙ্কুর। আর দ্বিতীয়ত যাদের ইতিমধ্যেই বিকৃত করে আটকে রাখা হয়েছে তাদের মেরে ফেলতে হবে রাসায়নিক দ্রব্য দ্বারাই।
ধীরে ধীরে গবেষণাগারের মুক্তির পথ যেন আবার খুলতে শুরু করলো। কিন্তু এবার আর কোনো ভয়ংকর ওষুধ না বরং ধ্বংস থামানোর প্রস্তুতি নিয়ে কাজ শুরু করা হবে। এই প্রকৃতি কে এভাবে ধ্বংসের মুখে ফেলা যাবে না। একটা বড় পাথরের চুলার সামনে কয়েকজন মিলে ফুটাচ্ছিল গাঢ় কালচে এক তরল। তার ভেতরে মেশানো হচ্ছিল শুকনো “নাগদমনী” ভেষজের গুঁড়া আর পাহাড়ি লবণ। মিরান বুঝিয়ে দিল
“এই মিশ্রণ জ্বলনকারী রসের শক্তি নষ্ট করবে। শরীরে দিলে আর আগের মতো ক্ষয় করতে পারবে না।”
আরেক পাশে এক বৃদ্ধ বিজ্ঞানী কাচের সরু নলে ধীরে ধীরে ঢালছিল রুপালি রঙের তরল।
তার সাথে মেশানো হচ্ছিল চূর্ণিত চুনাপাথর আর ভেষজ তেল। মিশ্রণটা ধোঁয়া তুলে জমাট বাঁধতে শুরু করলো। লোকটা ধীর গলায় বলল
“এটা প্রতিরোধক, আগের বিষাক্ত রস শরীরে ঢুকলে এই মিশ্রণ তার ক্রিয়া ধীর করে দেবে।”
মেহেরুন্নেসা থাকলে হয়তো কিছুই বুঝতো না।
কিন্তু মিরান বুঝছিল প্রতিটা ধাপ। আরেক টেবিলে কয়েকজন মিলে তৈরি করছিল কালচে নীল এক ধোঁয়াময় গুঁড়া। সেটা আগুনে ফেলতেই তীব্র ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়লো। মিরান বলল
“এটা তাদের থামাবে। ওই বিকৃত মানুষগুলোর ঘ্রাণশক্তি অত্যন্ত তীব্র। এই ধোঁয়া তাদের বিভ্রান্ত করবে।”
ধীরে ধীরে গবেষণাগারের ভয়ংকর পরিবেশ বদলাতে লাগলো। যে টেবিলে একসময় মানুষের শরীর বিকৃত করার পরিকল্পনা হতো। সেই টেবিলেই এখন তৈরি হচ্ছে প্রতিষেধক। যে কাচের শিশিগুলো একসময় মৃত্যু বহন করতো। এখন সেগুলোতেই ভরা হচ্ছে মুক্তির সম্ভাবনা। এক বৃদ্ধ বিজ্ঞানী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল
“এত বছর পর… মনে হচ্ছে আমরা আবার মানুষ হলাম।”
মিরান চারপাশে তাকিয়ে বুঝল, অঙ্কুর যা সৃষ্টি করেছে, সেটা শেষ করার পথও জন্ম নিচ্ছে এখানেই। গবেষণাগারের ভেতর তখন টিমটিমে আগুনের আলো। কাচের শিশি, ধোঁয়া, ফুটতে থাকা তরল সব মিলিয়ে আগের মতোই ভয়ংকর এক পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে ইচ্ছে করেই।
ঠিক তখনই ভারী দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো অঙ্কুর। তার পদশব্দে মুহূর্তের জন্য থমকে গেল কয়েকজন বিজ্ঞানী। কিন্তু পরের দৃশ্যটা দেখেই অঙ্কুরের ঠোঁটে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠলো।
কক্ষের মাঝখানে রাখা লোহার বেডে শুয়ে আছে মিরান। তার হাত দুটো বেঁধে রাখা, পাশে কয়েকজন বিজ্ঞানী ঝুঁকে আছে।
কেউ কাচের সরু নল দিয়ে গাঢ় রঙের তরল মাপছে, কেউ আবার তার বাহুতে কোনো রস লাগাচ্ছে ধীরে ধীরে। একপাশে রাখা ধাতব যন্ত্রে ফুটছে কালচে মিশ্রণ। আরেকজন বৃদ্ধ কাগজে কিছু হিসাব টানছে ব্যস্তভাবে। পুরো দৃশ্যটাই এত বাস্তব যেন সত্যিই নতুন কোনো পরীক্ষা চলছে।
অঙ্কুর কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে সবটা দেখলো। তার চোখে সন্তুষ্টির ঝিলিক ফুটে উঠলো।
ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বললো
“বাহ…”
তার ঠোঁটের কোণে শয়তানি হাসি।
“অবশেষে কাজে ফিরেছো তাহলে।”
একজন বিজ্ঞানী মাথা নিচু করে কাঁপা গলায় বললো
“আমরা… নতুন মিশ্রণ পরীক্ষা করছি।”
অঙ্কুরের চোখ গেল মিরানের দিকে। সে নিস্তব্ধ হয়ে শুয়ে আছে, চোখ আধবোজা। যেন কোনো শক্তিশালী ওষুধে অচেতন। অঙ্কুর হেসে উঠলো নিচু স্বরে।
“আমি জানতাম,তুই শেষ ওবদি বেইমান বেরোবি। যেদিন প্রাসাদের ভিন্ন মহলে আমায় নূরের কাছে ঘেঁষতে দেস নি। সেদিনই টের পেয়েছি।”
তার চোখে তখন তৃপ্তি। একটুও বুঝতে পারলো না এই পুরো দৃশ্যটাই সাজানো। আর যার ওপর পরীক্ষা চলছে ভেবে সে হাসছে, সেই মিরানই তার পতনের পথ তৈরি করছে নিঃশব্দে। অঙ্কুরের পদশব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতেই গবেষণাগারের ভেতরের নিস্তব্ধতা বদলে গেল। কয়েক মুহূর্ত সবাই স্থির হয়ে রইলো যেন নিশ্চিত হতে চাইছে সে সত্যিই চলে গেছে। তারপর লোহার লম্বা টেবিলে নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকা মিরান ধীরে চোখ খুললো। এক টানে উঠে বসল সে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধ বিজ্ঞানী দ্রুত দরজার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করলো
“সাবধানে… দেয়ালেরও কান আছে এখানে।”
মিরান উঠে দাঁড়ালো। তার বাহুতে লাগানো তরল কাপড়ে মুছে ফেলতে ফেলতে নিচু গলায় বললো
“সময় খুব কম।”
চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর মুখে ভয় স্পষ্ট। কারও হাত কাঁপছে, কারও চোখে আতঙ্ক।
মিরান একে একে সবার দিকে তাকালো।
“ওদের থামাতে হবে।”
নীরবতা। একজন মধ্যবয়স্ক বিজ্ঞানী ধীরে বললো
“কাকে?”
মিরানের চোখ কঠিন হয়ে উঠলো।
“ওই বিকৃত মানুষগুলোকে।”
কথাটা শুনতেই কয়েকজন অস্বস্তিতে একে অপরের দিকে তাকালো। এক বৃদ্ধ কাঁপা গলায় বললো
“অসম্ভব…”
মিরান চকিতে তাকালো
“কেন অসম্ভব? তোমরাই ওদের সৃষ্টি করেছো। নিশ্চয়ই ধ্বংস করার পথও জানো।”
লোকটা মাথা নিচু করলো।
“ওরা আর পুরো মানুষ নেই, ওদের শরীরে যে রস প্রয়োগ করা হয়েছে… তা মাংসকে শক্ত করেছে, ব্যথা কমিয়েছে, রক্ত গরম করেছে।”
আরেকজন বললো
“ওদের মেরে আর কি হবে? ওরা মরলে বরং অঙ্কুর ক্ষেপে যাবে আর আরও মানুষ ধরে আনবে।”
মাত্র কয়েকজনের ভাষাই বোঝে মিরান। বাকিরা ভিন্ন দেশের হওয়ায় তাদের ভাষা বুঝে না। যাদের ভাষা বুঝে তারা বুঝিয়ে দেয় ওই লোক গুলো কি বলছে। মিরান বলল
“ওদের মেরে ফেললে অঙ্কুরের শক্তি অনেক গুণে দমে যাবে”
মিরানের দৃষ্টি আরও কঠিন হলো।
“তাহলে এমন কিছু বানাও, যা ওই রসের বিরুদ্ধে কাজ করবে। আর মরে যাবে ওরা”
একজন বৃদ্ধ তৎক্ষণাৎ মাথা নাড়লো।
“না… না… এটা জানাজানি হলে অঙ্কুর আমাদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারবে।”
আরেকজন ফিসফিস করলো
“তুমি বুঝতে পারছো না মেয়ে… অঙ্কুর একা না।”
মিরান ভ্রু কুঁচকালো। বৃদ্ধ লোকটা চারপাশে তাকিয়ে নিচু স্বরে বললো
“তার হাত অনেক লম্বা।”
“বণিক আছে… সৈন্য আছে… কিছু জমিদারও আছে তার সাথে। অনেকেই এই গবেষণার ফল চায়।”
নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
“আমরা যদি বিরোধিতা করি”
আরেকজন বললো
“তাহলে শুধু আমরা না… আমাদের পরিবারও মরবে।”
মিরান চুপ করে শুনলো সব। তারপর ধীরে সামনে এগিয়ে এলো। টেবিলের ওপর রাখা একটা কাচের শিশি হাতে তুলে নিল। ভেতরে ঘূর্ণি খাচ্ছে গাঢ় কালো তরল। মিরান তাকালো সবার দিকে।
“ভয় আমি বুঝি, কিন্তু ভয় পেতে পেতে তোমরা কি বানিয়েছো দেখেছো?”
সে আঙুল তুলে চারপাশ দেখালো
“এই প্রাসাদ মৃত্যু জন্ম দিচ্ছে।”
“আজ একটা গ্রাম… কাল একটা রাজ্য…”
তার গলা আরও দৃঢ় হয়ে উঠলো
“ঝুঁকি না নিলে এই সুন্দর পৃথিবীটাকে ওরা ধ্বংস করে ফেলবে।”
কেউ কথা বললো না। শুধু টিমটিমে আগুনের আলোয় একেকটা মুখে দ্বিধা, ভয় আর অপরাধবোধ একসাথে ফুটে উঠলো। মিরান ধীরে বললো
“এখনও সময় আছে। তোমরা চাইলে… সব শেষও করতে পারো আবার প্রকৃতি কে এই ধ্বংস লীলা থেকে বাঁচাতেও পারো।
দুদিন ধরে কক্ষের একই কোণে নিঃশব্দে বসে আছে মেহেরুন্নেসা।বনা কান্না। না চিৎকার। না কোনো প্রশ্ন। শুধু নিস্তব্ধতা। চোখ দুটো ফাঁকা হয়ে গেছে যেন। সেদিনের দৃশ্যটা বারবার ফিরে আসছে তার মাথায়
বাইজিদ আর রুবায়েত একসাথে। সেই মুহূর্তটার পর থেকে তার ভেতরে যেন কিছু ভেঙে গেছে।
দাসীরা খাবার এনে রেখে গেছে বহুবার। মেহের ছুঁয়েও দেখেনি। পানির পাত্র পর্যন্ত প্রায় খালি হয়নি। অঙ্কুর প্রথম দিন হেসেছিল। দ্বিতীয় দিন বিরক্ত হয়েছিল। কিন্তু আজ তার ধৈর্য ফুরিয়ে আসছে। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দেখলো একইভাবে বসে আছে মেহেরুন্নেসা। ফ্যাকাশে মুখ, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। তার সামনে খাবারের থালা। অঙ্কুর ধীরে এগিয়ে এলো।
“এভাবে না খেয়ে মরার অভিনয় করে লাভ নেই” ঠান্ডা স্বরে বললো সে।বকোনো উত্তর নেই। মেহেরুন্নেসা তাকালও না। অঙ্কুর কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর নিচু হয়ে মুখের কাছে ঝুঁকে এলো।
“খেয়ে নাও।”
নিস্তব্ধতা। মেহেরুন্নেসার চোখে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। ঠিক তখনই অঙ্কুরের চোখ বদলে গেল। সে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। কণ্ঠটা ঠান্ডা হয়ে এলো আরও।
“ঠিক আছে।”
একটু থেমে বললো
“তুমি না খেলে… আজ রাতেই বাইজিদের মাকে মেরে ফেলবো আমি।”
মুহূর্তেই কেঁপে উঠলো মেহেরুন্নেসা। তার নিস্তেজ চোখ হঠাৎ বড় হয়ে গেল। ধীরে মুখ তুললো সে। অঙ্কুর এবার স্পষ্ট করে বললো
“মাইমুনা শেখ এখনো বেঁচে আছে শুধু আমার ইচ্ছায়।”
“তোমার জেদের জন্য যদি তার গলা কাটা পড়ে… দায় কিন্তু তোমার।”
মেহেরুন্নেসার বুক কেঁপে উঠলো।
“না…” খুব ক্ষীণ শব্দ বের হলো তার গলা থেকে।
অঙ্কুর থালাটা তার সামনে ঠেলে দিল।
“তাহলে খাও।”
মেহেরুন্নেসার হাত কাঁপছে। চোখ ভিজে উঠেছে তবুও সে ধীরে থালার দিকে হাত বাড়ালো।
অঙ্কুর দাঁড়িয়ে দেখলো। তারপর ঠোঁটের কোণে ধীরে ফুটে উঠলো সেই পরিচিত, শীতল হাসি।
সে জানে ভালোবাসা দিয়ে না হোক, ভয় দিয়ে মানুষকে ভাঙা যায়। ধীরে ধীরে খাবার শেষ করলো মেহেরুন্নেসা। হাত কাঁপছিল তার। প্রতিটা লোকমা যেন গলায় কাঁটার মতো আটকে যাচ্ছিল। অঙ্কুর দূরে দাঁড়িয়ে সবটা দেখছিল। চোখে সেই অদ্ভুত তৃপ্তি। খাওয়া শেষ হতেই সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো।
“এই তো”
ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো,
“ভদ্র মেয়েদের মতো কথা শুনলে কত ভালো লাগে।”
মেহেরুন্নেসা মুখ ফিরিয়ে নিল। অঙ্কুর তার সামনে এসে দাঁড়ালো। কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থেকে হঠাৎ বললো
“বাইজিদ তোমায় ঠকিয়েছে।”
মেহেরুন্নেসার চোখ কুঁচকে উঠলো।
“চলো”
অঙ্কুর যেন খুব স্বাভাবিক একটা কথা বলছে
“আমরা বিয়ে করে ফেলি।”
মুহূর্তেই আগুন জ্বলে উঠলো মেহেরুন্নেসার চোখে। সে দাঁড়িয়ে গেল এক ঝটকায়।
“তোর সাহস কী করে হয় এসব বলার!”
কাঁপা রাগে গলা ভারী হয়ে উঠলো তার,
“নিজেকে কী ভাবিস তুই? আমার তো তোকে জানোয়ার ছাড়া কিচ্ছু মনে হয়না”
অঙ্কুর ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে তাকিয়ে রইলো।
মেহেরুন্নেসা থামলো না
“জোর করে কাউকে বন্দি করে রাখাকে ভালোবাসা বলে না! তার ওপর আমি অন্য কারও স্ত্রী। তুই অসুস্থ! বিকৃত!”
তার শ্বাস দ্রুত উঠানামা করছে।
“আমি মৃত্যুর আগ পর্যন্তও তোকে ঘৃণা করবো।”
অঙ্কুর এবার হেসে উঠলো। একদম জোরে না বরং ধীর, অদ্ভুত সেই হাসি। যেন এসব কথায় তার কিছুই যায় আসে না। সে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো।
“এত রাগ ভালো না”
নিচু গলায় বললো সে। তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে যোগ করলো
“যাই হোক… আমার লোকেরা কিন্তু তোমার আব্বুকে আনতে গেছে।”
মুহূর্তেই মেহেরুন্নেসার মুখের রঙ বদলে গেল।
“কি…?”
অঙ্কুর মাথা কাত করলো।
“বিয়েতে কনের বাবাকে তো লাগবেই, তাই না?”
তার চোখে ভয়ংকর আনন্দ ঝিলিক দিল।
“ভাবলাম… নিয়ম মেনেই সব করি। আবার ধরো তখন তুমি পাগলামো শুরু করলে। আমি তোমার আব্বুর মাথা টা নামিয়ে দিলাম এক কোপে। আর….”
ঠিক তখনই কক্ষের বাইরে দ্রুত পায়ের শব্দ শোনা গেল। একজন লোক হাঁপাতে হাঁপাতে ভেতরে ঢুকলো।
তার মুখ ফ্যাকাশে, চোখে আতঙ্ক।
“জনাব…” কাঁপা গলায় বললো সে,
“আবার হয়েছে।”
অঙ্কুর বিরক্ত চোখে তাকালো।
“কি হয়েছে?”
লোকটা ঢোক গিলে বললো
“দানবগুলোর কয়েকজন মিলে… ওদেরই একজনকে খেয়ে ফেলেছে।”
মুহূর্তেই অঙ্কুরের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
“কি বললি?”
লোকটা মাথা নিচু করলো।
“গত সপ্তাহেও দুবার হয়েছিল, আজ আবার…”
কথা শেষ হওয়ার আগেই পাশের টেবিলে রাখা ধাতব পাত্রটা ছুঁড়ে মারলো অঙ্কুর। প্রচণ্ড শব্দে সেটা দেয়ালে আঘাত করে পড়লো। মেহেরুন্নেসা চমকে উঠলো। অঙ্কুরের চোখে তখন ভয়ংকর রাগ।
“অপদার্থের দলেরা ওদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না নাকি?”
আর এক মুহূর্ত দেরি না করে ঝড়ের মতো বেরিয়ে গেল সে। সোজা চলে গেল গবেষণাগারে।
ভেতরে ঢুকেই এক বৃদ্ধ বিজ্ঞানীর জামার কলার চেপে ধরলো।
“কি করেছিস তোরা?”
গর্জে উঠলো সে
“একটার পর একটা নিজেদেরই খেয়ে ফেলছে কেন?”
বৃদ্ধ লোকটা ভয়ে কাঁপছে। তবুও সাহস করে বললো
“দীর্ঘদিন… শিকার না পেয়ে এমনটা করছে তারা।”
অঙ্কুরের চোখ সরু হয়ে এলো। বিজ্ঞানী কাঁপা গলায় বলতেই থাকলো
“ওদের শরীর স্বাভাবিক না। ওই রস শরীরের ভেতরের ক্ষুধাকে অস্বাভাবিক করে দিয়েছে।”
“মানুষ… পশু… রক্ত… মাংস—সবসময় চাই ওদের।”
আরেকজন ধীরে বললো
“অনেকদিন ধরে বাইরে শিকার করতে পারেনি।
তাই এখন… নিজেরাই নিজেদের আক্রমণ করছে।”
অঙ্কুর ধীরে হাত ছেড়ে দিল। তার মুখে রাগ আছে। কিন্তু তার চেয়েও বড় কিছু ফুটে উঠলো চোখে। সে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে গবেষণাগারের দরজার দিকে তাকালো। তারপর নিচু স্বরে বললো
“অসম্ভব…”
সবাই চুপ। অঙ্কুর নিজেকেই যেন প্রশ্ন করলো
“ভবনের দরজা তো খোলা হয়…”
তার চোখে ভাবনার ছায়া ঘনীভূত হলো।
“মূল ফটকও খোলা থাকে তার আগেই…”
তবুও ওরা বাইরে যায় না কেন? কেন প্রাসাদের সীমানা পেরোয় না? কিছু একটা আছে। অবশ্যই আছে। অঙ্কুর ধীরে ধীরে মাথা তুললো।
তার চোখে এবার কৌতূহল আর সন্দেহ একসাথে জ্বলে উঠছে।
যেন বহু বছরের এক রহস্য হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। অঙ্কুর সিদ্ধান্ত নিল আজ রহস্যটার শেষ দেখেই ছাড়বে। রাত যত গভীর হলো, উত্তরের প্রাসাদের চারপাশ তত নিস্তব্ধ হয়ে উঠলো। দূরে সাহাবাদ প্রাসাদের বিশাল ফটক ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল। একটার পর একটা মশাল নিভে যেতে লাগলো। অন্ধকার গিলে নিল চারপাশ। শুধু আকাশে আধখানা চাঁদ।
তার ফ্যাকাশে আলো পড়ে আছে প্রাচীন দেয়ালে।
উঁচু দুর্গটার চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছিল অঙ্কুর। কালো পোশাকে প্রায় ছায়ার মতো লাগছে তাকে।
নিচের বিশাল প্রাঙ্গণ, লোহার গেট, আর অন্ধকার করিডর সবকিছু তার চোখে স্পষ্ট। কিছুক্ষণ পর নিচ থেকে শব্দ ভেসে এলো। ভারী দরজা খোলার শব্দ।
একটা…দুইটা… তারপর আরও কয়েকটা।
অন্ধকার গহ্বরের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে বের হতে শুরু করলো তারা। বিকৃত দেহ, অস্বাভাবিক চলন, গর্জনের মতো নিঃশ্বাস। চাঁদের আলোয় তাদের ছায়াগুলো আরও ভয়ংকর লাগছে।
অঙ্কুর গভীর মনোযোগে তাকিয়ে রইলো।
দানবগুলো দ্রুত এগিয়ে গেল মূল ফটকের দিকে।
যেন বাইরে যাওয়ার জন্য ছটফট করছে।
কিন্তু ফটকের কাছাকাছি পৌঁছাতেই একে একে থেমে গেল সবাই।
গর্জন করছে নখ দিয়ে মাটি আঁচড়াচ্ছে আর লোহার সুবিশাল ফটকে এমন জোরে শব্দ হচ্ছে যে ভেঙে ফেলবে।
কয়েক মুহূর্ত পর হঠাৎ করেই তারা পেছন ফিরে আবার ভিতরের দিকে চলে যেতে লাগলো।
অঙ্কুরের কপাল কুঁচকে গেল। চোখে স্পষ্ট বিস্ময়।
“কেন…?”
নিজেকেই প্রশ্ন করলো সে।
ফটক তো খোলা হলো একটু আগেই। পথও নিশ্চই ফাঁকা। তাহলে ওরা বাইরে যাচ্ছে না কেন?
অঙ্কুর ধীরে ধীরে দুর্গের অপর পাশের কিনারায় এগিয়ে গেল। সেখান থেকে বড় লোহার ফটকটা আরও স্পষ্ট দেখা যায়। সেখান থেকে তাকাতেই তার চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। ফটক তো বন্ধ। দানব গুলো কে ছেড়ে দেওয়ার পর প্রাসাদ থেকে তো কেউ যেতে পারবে না ওটা বন্ধ করতে। কারণ দানব গুলোর সামনে পড়লেই মৃত্যু নিশ্চিত। তারমানে বাইরের দিক থেকে কেউ আসে? তা কি করে সম্ভব? যেখানে জমিদার বাড়ির সৈন্য সামন্ত ই বেরোয় না ভয়ে, সেখানে কে আসবে এই গভীর রাতে উত্তরের প্রাসাদে?
ঠিক তখনই….
চাঁদের আলো কেটে দ্রুত একটা ছায়া ছুটে গেল নিচে। অঙ্কুর থেমে গেল। দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠলো।
একটা ঘোড়া। আর তার পিঠে এক নারী।
চাঁদের আলোয় বাতাসে উড়ছে তার দীর্ঘ সোনালি চুল। ঘোড়াটা ফটকের কাছ ঘেঁষে মুহূর্তেই ছুটে চলে গেল জঙ্গলের ভেতরের দিকে।
চলন এত দ্রুত যে মুখ স্পষ্ট বোঝা গেল না।
কিন্তু অঙ্কুরের চোখ সরু হয়ে এলো। দানবগুলো সেই মুহূর্তে অদ্ভুতভাবে গর্জন করছে। একে অপরের মধ্যে লড়াই শুরু করে দিয়েছে। অঙ্কুর ভেবে পায় না এত দুঃসাহস কার। কিন্তু কোথাও যেন দুইয়ে দুইয়ে চার মিলছে। গোটা সাহাবাদে শাহজাদী সুনেহেরা জাহ্নবী ছাড়া আর কারও সোনালি চুল নজরে আসেনি অঙ্কুরের। আর এমন দক্ষ ঘোড়া চালনা, এত দুঃসাহস তার দ্বারাই সম্ভব। অঙ্কুরের যেন মাথা খারাপ হবার জো।
এই টুকুনি এক নারী তার এত বড় সর্বনাশ করে চলেছে। গত দুই বছরে অর্ধেক দানব মারা গেছে। এখন অন্য ওষুধের কাজ চলে বিধায় আর মানুষের ওপর সেই নোংরা পরীক্ষা চলে না। অঙ্কুরের মাথা ভো ভো করে ঘুরছে যেন। কিন্তু সুনেহেরা জঙ্গলের ভিতরের দিকে কেন গেল? অঙ্কুর সরলো না সেখান থেকে। আজ সে ও দেখবে এই মেয়ে কি করে আর কখন ফিরে।
উল্টো পথ হয়ে ফিরলো সুনেহেরা। সে নিজেও সন্দেহ করেছিলো কেউ বুঝি তার ওপর নজর রাখছে। পাহাড়ের পাদদেশ পেড়িয়ে আস্তাবলের সামনে এসে থামাল ঘোড়া। ততক্ষণে আযান পড়ে গেছে মসজিদে আস্তাবলে ঘোড়া রেখে রোজকার মত গেল সৈন্য ঘাঁটি তে। বড় ঘরটার জানালা দিয়ে উকি মারতেই দেখলো কক্ষ ফাঁকা। কপালে দীর্ঘ ভাজ পড়ে সুনেহেরার। রাতের বেলায় গেল কোথায় মাহাদি? হঠাৎ পিছনে কারও পায়ের খচখচ শব্দে সতর্ক হয় সে। কোমড় থেকে সরু ছুরি টা বের করে আচমকা আক্রমণ করে বসে।
“এই এই এই….. মারবেন নাকি? এ আপনার কেমন খোঁজ নেওয়া শাহজাদি?”
মাহাদির কন্ঠ পেয়ে চোখ সরু হয় সুনেহেরার। এখন সে বর্মে আবৃত নেই বলে আবছা অন্ধকারে চিহ্নিত করতে পারে নি। মাহাদি বুকে হাত দিয়ে নাটকীয় সুরে বলে।
“এক্ষুনি মেরে ফেলছিলেন? তা রাত বিরেতে এই অধমের ওপর আক্রমণের কারণ টা জানতে পারি?”
সুনেহেরা ছুরিটা ছুড়ে ফেলে বলে
“আপনাকে মেরে দেওয়াই উচিত।”
বলেই বড় বড় পা ফেলে যেতে লাগলো। মাহাদি পিছন পিছন ডাকছে আর বলছে
“শাহজাদি শুনুন। জরুরি কথা আছে। থামুন দয়া করে। আমি আপনাকে আটকাতে পারছি না, যদি হাত ধরে টেনে আটকাই তাহলে কি গর্দান নেবেন? শাহজাদি শুনুন”
মাহাদির কথায় পা থামলো তার। সামনে এসে দাঁড়িয়ে ঠান্ডা কন্ঠে মাহাদি বলল
“গত কাল আসেন নি কেন?”
সুনেহেরা অন্য দিকে তাকিয়ে বলল
“ভোর হয়ে গেছিলো, আর…….
সুনেহেরা কথা শেষ করার আগেই চোখ পড়লো মাহাদির ওপর। ছিপছিপে ফর্সা গড়নের মানুষটার লালচে বাবড়ি চুল। এই প্রথমবার মাহাদির সম্পূর্ণ চেহারা দেখলো সে। মাহাদি তার নজর অনুসরণ করে বলল
“এভাবে দেখবেন না। নজর লাগলে চেহারা খারাপ হয়ে যাবে”
কেমন হইছে বলিও হুমম। আর রিয়্যাক্ট দিও। তোমাদের জন্য লিখি কত কষ্ট করে।
Share On:
TAGS: জান্নাতুল ফেরদৌস, নূর এ সাহাবাদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪৯
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৭
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১২
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১০
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১২
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১৫
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৪৩
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৮
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ২৩
-
নূর এ সাহাবাদ বিয়ে স্পেশাল পর্ব