Golpo আমার আলাদিন কষ্টের গল্প

আমার আলাদিন পর্ব ২৫


#আমার_আলাদিন

#জাবিন_ফোরকান

#পর্বসংখ্যা২৫

বাড়িজুড়ে দীর্ঘ পিনপতন নীরবতা। সবাই যেন ভুলেই গিয়েছে কীভাবে কথা বলতে হয়। অস্বস্তি গেঁড়ে বসল প্রত্যেকের অন্তরে। এমন পরিস্থিতি কীভাবে তৈরি হলো? সমস্ত জীর্ণতা ভেঙে সবার আগে প্রতিক্রিয়া করলেন সামিয়া। ত্যাক্ত ভাষা পরিহার করে তিনি বেশ স্বাভাবিক কণ্ঠেই হাত তুলে ইরামের দিকে নির্দেশ করে বললেন,

“আপনাদের ওর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই আগে। ও..”

“আমার পরিচয় আমি নিজে দিতে জানি, আম্মু।”

অবশেষে মুখ খুলল শীতল রমণী। কোনোকিছুর পরোয়া না করে সামনে এসে দাঁড়াল। পরনের সালোয়ার কামিজের ওড়নাটা ঘোমটা হিসাবে মাথায় দেয়া তার। সেটা টেনে ঠিকঠাক করে মিস্টার আর মিসেস চৌধুরীর দিকে চেয়ে সে জানাল,

“আসালামু আলাইকুম, আংকেল আন্টি। আমি ইরাম কিবরিয়া, ওয়াইফ অব সাইবান আলাদিন। এই বাড়ির একমাত্র বউ।”

মিস্টার এবং মিসেস চৌধুরীর মাঝে মহাবিস্ময় ভর করল। তড়িৎ গতিতে এদিক সেদিক তাকালেন তারা। আহাম্মক বনে গিয়েছেন পুরোপুরি। আহমদের দিকে চেয়ে মিস্টার চৌধুরী জিজ্ঞেস করলেন,

“আহমদ সাহেব। আপনার ছেলে বিবাহিত? আমরা জানতাম না। তিতলিও তো কিছুই বলল না! কবে হলো?”

“এই বছরের ২২ এপ্রিল। আপনার সঙ্গে আমি কথা বলছি আংকেল, আমার সঙ্গেই কথোপকথন চালালে ভালো হয় না?”

ঝট করে ইরামের দিকে ফিরে তাকালেন মিস্টার চৌধুরী। মুখটা সামান্য লালচে হলো তার। বোঝাই যাচ্ছে এমন গর্ধব প্রমাণিত হওয়ায় এবং ইরামের তীক্ষ্ণ কথায় অপমানিত বোধ করেছেন। মিসেস চৌধুরী সেই তুলনায় সহনশীল, তিনি দ্রুত বললেন,

“ওহ! এটা একটা ভুল বোঝাবুঝি। মিসেস মুন্সী, আহমদ সাহেব আমরা সত্যিই জানতাম না সাইবানের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। তাই এমন একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। মাফ করবেন। বাড়ি বয়ে এসে আপনাদের অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলা আমাদের উদ্দেশ্য ছিলনা। আমরা তো শুধুই নিজেদের মেয়েটার কথা চিন্তা করছিলাম। বড় হয়েছে, অনেকের খারাপ নজরেও পরে গিয়েছে। ওর একটা ব্যবস্থা যত দ্রুত করা যায় ততই মঙ্গল। তাই তাড়াহুড়ো করে…ইয়ে…বোঝেনই তো মেয়ের বাবা মায়ের কষ্ট।”

সকলে একে অপরের দিকে তাকাল। সামিয়া এবং আহমদ গুরুজন হিসাবে কিছু বলার আগেই ইরাম বলে বসল,

“ভুল বোঝাবুঝি? আপনাদের মেয়ে কিছুই বলেনি? কিন্তু সেদিনই আমাদের বিয়ের রিসেপশন পার্টিতে বেশ সেজেগুজে তৈরি হয়েই এসেছিল। এত ভালো বান্ধবী আমার হাসবেন্ডের, এত ভালো সম্পর্ক আপনাদের পরিবারের, তবুও কিছুই জানলেন না? বেশ, বিশ্বাস করে নিলাম আপনারা কিছুই জানতেন না। তবে দুঃখিত। এটা বিশ্বাস করতে পারছিনা যে এর পেছনে আপনাদের মেয়ের কোনো হাত ছিলনা। আপনারা জানেননি কারণ সে বলেনি। এখন সে বলেনি ঠিক কোন উদ্দেশ্য থেকে সেটা খুঁড়তে গেলে কেঁচোর বদলে সাপ বেরিয়ে আসতে পারে।”

“এই মেয়ে!”

হঠাৎ গর্জে উঠলেন মিস্টার চৌধুরী। ইরামের দিকে আঙুল তুলে শাসালেন,

“মুখ সামলে কথা বলো! ভুল হয়ে গিয়েছে আমাদের দ্বারা, তোমাকে অপ্রস্তুত করার জন্য আমরা দুঃখিত। কিন্তু তাই বলে আমার মেয়ের সম্পর্কে উল্টাপাল্টা কথা আমি মেনে নেব ভাবলেও বা কি করে? দেখে তো ভদ্র ঘরের মেয়ে মনে হয়, বিয়েও হয়েছে ভদ্র পরিবারে। তাহলে কথায় এত অভদ্রতা কেন? আমার মেয়েকে দোষ দাও? সাহস কত তোমার? শুধুমাত্র সাইবানের স্ত্রী বলে তোমাকে ছেড়ে কথা বলব ভাবলে বোকার স্বর্গে বসবাস করছ। তাছাড়া তুমি এখানে এলেই বা কোথা থেকে? এই ফ্যামিলি চ্যারিটি কেইস করতে ভালোবাসে জানতাম। তেমনি কোনো কেইস না তো?”

ইরাম বরাবর তাকাল মিস্টার চৌধুরীর চোখের দিকে। একচুল নড়লনা, না তো পিছিয়ে গেল।

“আমি এই বাড়ির চ্যারিটি কেইস নাকি অন্যকিছু সেটা আপনার চিন্তার বিষয় নয়, আংকেল। জীবনে ঠেকে শিখেছি, গুরুজনদের ততক্ষণ সম্মান দেয়া উচিত যতক্ষণ তারা গুরুজনের মত আচরণ করে। আপনি সেই নিয়মের ব্যতিক্রম নন।”

“একটা ভুল বোঝাবুঝির উপর এত রিয়্যাক্ট করার কি আছে? মিসেস মুন্সী? আহমদ সাহেব? আপনাদের বাড়ির বউ এত বেয়াদব কেন?”

মিসেস চৌধুরী বলতেই সামিয়া একটুখানি বাঁকা হেসে জানালেন,

“আমাদের বাড়ির বউ যে, তাই শিরদাঁড়াটা একটু বেশিই শক্ত।”

গাঢ় নীরবতা নেমে এলো চারপাশে আবারও। ইরাম শেষ একবার মিস্টার আর মিসেস চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলল,

“আমার আপনাদের সঙ্গে কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা নেই। না আছে আপনাদের মেয়ের প্রতি। তবে আজ থেকে বিষয়টা নিয়ে দ্বিতীয়বার চিন্তা করব। ভুল বোঝাবুঝি যখন হয়েছেই, তখন এখানেই সেটার সমাপ্তি ঘটলে ভালো হয়। তবে নিজের মেয়ে বলে চোখে ঠুলি পরে বসে থাকবেন না। কেন সে এত গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা আপনাদের জানায়নি সেটা নিয়ে মেয়েকে প্রশ্ন করতে শিখুন। বায়াসড পিতামাতা হবেন না। এমনভাবেই কিন্তু সমাজে অপরাধী, দুর্নীতিবাজ, পরকীয়াকারী তৈরি হয়!”

এটুকুই। ইরাম আর দাঁড়ালনা। উল্টো ঘুরে হনহন করে হেঁটে বাড়ির ভেতরে আড়াল হয়ে গেল। সে চলে যাওয়ার পরেও তার প্রত্যেকটা কথার শীতল একটা আবেশ রয়ে গেল। নাস্তা অধরা পরে রইল, চা ঠান্ডা হয়ে গেল। অথচ কারো আর মনে রইলনা কিছুই। গাঢ় নিস্তব্ধতা। মিস্টার চৌধুরী বসে পরে একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আহমদকে বললেন,

“আজ যা হলো তার জন্য আমরা ক্ষমাপ্রার্থী। মাফ করবেন। কিন্তু একটা কথা না বলে পারছিনা। আপনাদের বাড়ির বউয়ের ঔদ্ধত্য ঠিক মানতে পারলাম না।”

“তিতলিরও হয়ত কোথাও গিয়ে ভুল হতে পারে। আমরা এতকিছু করেছি, আজ এখানে আসছি সেটাও আমার মেয়েটা জানেনা। তারপরও এভাবে আমাদের মেয়েকে নিয়ে কথা শুনিয়ে গেল? দুঃখিত হলেও এই বিষয়টা মানতে পারলাম না। ওর আচরণ খুবই অহংকারী।”

মিসেস চৌধুরী সহমত পোষণ করতেই অবিশ্বাস্য একটি গুরুগম্ভীর কন্ঠস্বর ভেসে এলো,

“রাণী বলে কথা, অহংকার তার অলংকার।”

ঝট করে ফিরে তাকাল সকলে। এতক্ষণ যাবৎ একদম নিশ্চুপ বসে থাকা সাইবান নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। তার চোখজোড়ায় যেন ঝড় খেলে যাচ্ছে। আগ্রাসী দানবের ছায়া জেগে উঠছে তার অবয়বজুড়ে। শীতল চোখে সে তাকাল মিস্টার চৌধুরীর দিকে। বুকে দুবাহু বেঁধে মাথা কাত করে অশরীরীতুল্য এক কন্ঠে বলল,

“আমার স্ত্রীর নামের সঙ্গে বেয়াদব শব্দটা উচ্চারণ করার আগে এই বাড়ির চৌকাঠের বাইরে বেরিয়ে যাবেন। এই রাজ্যের ত্রিসীমানায় রাণীর অপমান শুধু নিষিদ্ধ নয়, দণ্ডনীয় অপরাধ। প্রথমবার ভুলটা করেছেন তাই আমি কিছু মনে না করে খোলা মনে মাফ করে দিলাম। দ্বিতীয়বার ইউ আর নট লিভিং উইদাউট কনসিকুয়েন্স!”

⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──

রাতের জন্য ইযানের প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো মোটামুটি গুছিয়ে নিয়েছে ইরাম। ঘুমন্ত ছেলেকে আস্তে করে বুকে চেপে সে যখন বেডরুম থেকে বেরোতে যাবে তখনি হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে ঢুকল সাইবান। দৌঁড়ে এসেছে বেশ তাড়াহুড়ো করে। উজ্জ্বল চেহারায় খানিকটা লালচে ভাব ফুটে উঠেছে তাই। ইরামকে দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেলল সে,

“পোটলাকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন?”

ইরাম বিনা দ্বিধায় শান্ত গলায় উত্তর করল,

“গেস্ট রুমে। ভালো লাগছেনা তাই আজ তাড়াতাড়ি ঘুমাব।”

সাইবানের চোখ কপালে উঠে গেল রীতিমত। পরক্ষণেই সেখানে মিশ্রিত ভয় এবং আক্রোশ ভর করল।

“বেডরুম ছেড়ে গেস্টরুমে যাবেন মানে কি?”

“মানে তেমন কিছুই না। আই নিড স্পেস, দ্যাটস ইট।”

ইরাম এগোল কিন্তু সাইবান দরজা আটকে দাঁড়িয়ে গেল। তার শক্তপোক্ত গড়নের শরীর মুহূর্তেই পথ বন্ধ করে দিল সম্পূর্ণ। বিরক্তি নিয়ে তাকাল ইরাম। সাইবান গভীর গলায় বলল,

“দরকার হলে আমি চলে যাব। আপনি এখানেই থাকবেন!”

“তোমার রুম থেকে তোমাকে বের করার অধিকার আমার নেই।”

“কিসের অধিকার নেই আপনার? আপনি আমার বিয়ে করা বউ, আমি আপনার তিন কবুল বলা স্বামী।”

“বিয়েটা কোন উদ্দেশ্যে হয়েছে সেটা বাকিরা না জানলেও আমি আর তুমি ঠিকই জানি, আলাদিন। তাই প্লীজ নাটক করোনা। আমার ক্যারিয়ার দাঁড়িয়ে গেলে এই সংসার সংসার খেলাটাও শেষ হয়ে যাবে। এত অধিকার ফলানোর আর কারণ দেখছিনা। সামনে থেকে সরো তুমি!”

ইরাম সাইবানকে জোর করে সরিয়ে এগোতে চাইলেই তার একটা হাত খপ করে ধরে ফেলল ছেলেটা। ইযান নাড়া খেয়ে ততক্ষণে জেগে উঠতে শুরু করেছে। ইরাম এক হাতেই ছেলেকে বুকে ধরে রেখে ক্রুব্ধ দৃষ্টিতে সাইবানের দিকে তাকিয়ে মৃদু গলায় আক্রোশ চেপে বলল,

“আমার হাত ছাড়ো, আলাদিন!”

“আপনার কাছে আমি কি দোষ করেছি, ইরাম আপু? বারবার আমার সব নিবেদনগুলোকে এভাবে পায়ে ঠেলে দেন কেন? আপনি কি কিছুই বোঝেন না? কিছুই জানেন না?”

খপ করে ইরামের চিবুক চেপে ধরে নিজের সঙ্গে দৃষ্টি মেলালো সাইবান। জ্বলজ্বলে চোখে চেয়ে বলল,

“আপনার চোখে আমার জন্য এমন শীতলতা দেখলে আমার অন্তরে রক্তক্ষরণ হয়।”

ঝুঁকে এলো সে, ইরামের কপালে কপাল ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“প্লীজ। রিকগনাইজ মি ফর ওয়ান্স! আজকে যা হয়েছে তার জন্য আমি সরি। সত্যিই বুঝতে পারিনি আমার করা একটা কাজ এতগুলো ঘটনার জন্ম দেবে।”

ইরাম এক হাতে ধাক্কা দিয়ে সাইবানকে দূরে সরিয়ে দিল। ইযানকে সাবধানে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে পুনরায় সে উঠে দাঁড়াল। মোকাবেলা করল স্বামীর।

“তোমাদের জেনারেশনটার অধঃপতনের কারণ তোমাদের কেয়ারলেস মনোভাব। তোমার প্রত্যেকটা কথা, প্রত্যেকটা কাজ হলো বুমেরাং। আজ হোক, কাল হোক, দশ বছর পরে হোক এর প্রতিদান ফিরে আসবেই। কিন্তু তোমাদের এই ডোন্ট কেয়ার ভাব সাময়িকভাবে খুবই কুল লাগলেও দিনশেষে অধঃপতন ডেকে আনে সেটা তোমরা বুঝতে পেরেও মানতে চাওনা। উল্টো এর একটা নামও দিয়ে রেখেছ। জীবন উচ্ছন্নে গেলে কি যেন বলো তোমরা? ওহ, কুকড! মাই লাইফ ইয কুকড, রাইট?”

সাইবান নিঃশব্দে চেয়ে রইল ইরামের দিকে। রমণীর আজ কিছু একটা হয়ে গিয়েছে। ইযানের দুর্ঘটনার পর থেকে এই পরিবর্তনটা ভালোভাবে দেখা যাচ্ছে।

“এক হাতে তালি বাজে না আলাদিন। আজকে যা হয়েছে তার পিছনে কোনো না কোনোভাবে তোমারও দায় জড়িয়ে আছে।”

হাহাকার করে উঠল সাইবান,

“আমি কি করেছি? তিতলি আমার খুব ভালো ফ্রেন্ড। শি ইয লাইক…লাইক আ সেফ প্লেস ফর মি। যখন আমার কাছে কেউ ছিল না, তখন অনুরাগ আর তিতলি ছিল। হাউ ক্যান আই জাস্ট সিম্পলি ফরগেট হার পার্ট?”

“আমার সমস্যা তিতলিকে নিয়ে নয়, তোমাকে নিয়েও নয়। আমি তোমার কাছে বিয়ের সময় শুধু একটা কথাই চেয়েছিলাম, আলাদিন। আমি বলেছিলাম রমণীঘটিত কোনোপ্রকার ব্যাপার যেন আমার সামনে না আসে। অথচ তোমার ফোনে আজও বান্ধবীর নাম্বার তিতলি বেব নামে সেভ করা।”

এবার সাইবান জমে গেল। ইরামের কথাটা সত্যি। বিয়ের আগে বন্ধুত্বের হিসাবে কাজটা করা হয়েছিল ঠিক, কিন্তু পরে আর বদলানোর ব্যাপারটা তার মাথায় আসেনি।

“আমি..আমি সরি ওকে? ভুলে গিয়েছিলাম আমি। এক্ষুণি চেঞ্জ করে দিচ্ছি।”

নিজের ফোন বের করতে পকেটে হাত ভরল সাইবান। ইরাম হাত তুলে তাকে থামাল। একটি নিঃশ্বাস ফেলে বলল,

“থাক আলাদিন। আমি বুঝি। তোমারও ব্যক্তিগত জীবন আছে। তিতলির বাবা মা তো এমনি এমনি আজ বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসেননি। হয়ত মেয়ের পছন্দ তারাও বুঝতে পেরেছেন। মাঝখানে আমিই ঢুকে গিয়েছি। আমি না থাকলে হয়ত শেষমেষ তোমার তিতলির সাথেই বিয়ে হত। ব্যাপার না। আর একটা বছর সহ্য করো। আমি কিছু একটা করি। তারপরই তুমি মুক্তি পেয়ে যাবে। তখন যা ইচ্ছা হয় করো, যার সাথে মনে হয় ঘুরে বেড়াও, রোখার মতন কেউ থাকবেনা।”

“আপনি খুব খারাপভাবে নিষ্ঠুর, সেটা কি আপনি জানেন?”

সাইবানের ভাঙা গলায় ইরাম একটুখানি থমকাল। তার শক্ত মনোভাব খানিক নরম হলো। সাইবান মাথা নিচু করে পায়ের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার দুহাত শক্ত মুঠো পাকিয়ে রেখেছে, নিয়ন্ত্রণে।

“আপনি শুধু নিজের দিকটাই বুঝে গেলেন আজীবন, আমায় বুঝতে চাইলেন না।”

“এখানে বোঝাবুঝির কিছু নেই। আমি যা বলছি, ঠান্ডা মাথায় নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি। আমার মনে হয়, তোমার দোষ আছে। তোমার মনে হয়, তোমার দোষ নেই, তুমি পরিস্থিতির শিকার। এখানেই আমাদের চিন্তাধারার পার্থক্য। এটাই সম্পর্কের অসমতা। আজ যা হলো, তা শুধু ট্রেলার ছিল। ভবিষ্যতে এমন আরও অনেক অনেক বিভিন্নতা তৈরি হবে। আমার কাছে তোমার আচরণ অযৌক্তিক লাগবে। তোমার কাছে আমার আচরণ অযৌক্তিক লাগবে। কারণ আমরা ভিন্ন যুগের মানুষ, ভিন্নভাবে ভাবি। তোমার কাছে যেটা বন্ধুত্ব রক্ষা, আমার কাছে সেটা বিষ! তাই বলছি, দূরে থাকো, ভালো থাকো।”

সাইবান লম্বা পায়ে এগিয়ে এসে ইরামের কোমর জাপটে ধরে তাকে পাশের দেয়ালের সঙ্গে ঠেসে ধরল।

“এতই অবিশ্বাস করেন আপনি আমাকে? কি মনে হয়? তিতলি আমার সাইডচিক? ওকে আমি প্রশ্রয় দিয়ে বিয়ের স্বপ্নে ভুলিয়ে রেখেছিলাম? হ্যাঁ? তাই মনে হয় আপনার, তাইনা?”

রীতিমত গর্জে উঠল সাইবান। কপালে শিরা উপশিরা ফুলেফেঁপে উঠেছে তার। মুখ ধারণ করেছে রক্তিম বর্ণ। তীব্র আক্রোশে কাঁপছে সমস্ত শরীর। মেজাজ হারিয়ে ফেলেছে সে। কিন্তু ইরাম মেজাজ হারালনা। একদম ঠান্ডা গলায় স্বামীকে মোকাবেলা করল,

“তুমি হয়ত প্রশ্রয় দাওনি, অন্য কেউ সেটাকে প্রশ্রয় হিসাবে ধরে নিয়েছে।”

নির্বাক চেয়ে রইল আলাদিন। ইরাম বলল,

“তোমাদের পুরুষদের সমস্যাটা কোথায় জানো, আলাদিন? তোমরা ‘না’ শব্দের অর্থ বোঝো না, এর ব্যবহার জানো না। নো মিনস নো আলাদিন! তোমার স্ত্রী তোমাকে না বললে যেমন তোমাকে সেই ‘না’ এর সম্মান রাখতে হবে, তেমনি যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজের গায়রত রক্ষায় তোমাকেও জোর দিয়ে ‘না’ বলা শিখতে হবে। এখন তোমার পাশে ঘুরঘুর করা নারী যদি তোমার বছর বছরের পুরাতন বন্ধু হয় তবুও।”

সাইবান নিজের একটি হাত তুলল। সটান ইরামের মুখের পাশে দেয়াল বরাবর একটা ঘুষি বসিয়ে দিল সে। ইরাম একচুল নড়লনা অবধি। একদম স্থির চেয়ে রইল স্বামীর আক্রোশ পূর্ণ মুখপানে।

“আপনি আমাকে বিশ্বাস করেন না, তাইতো? আমি আপনার কাছে আর পাঁচটা দশটা কাপুরুষের সমান। বেশ তবে। থাকুন আপনি আপনার সন্দেহ আর অবিশ্বাস নিয়ে। থাকুন আপনার মনের মতন। নিজেকে নিয়েই ভাবুন, নিজের সন্তানকে নিয়েই ভাবুন। ওটাই আপনার একমাত্র ধর্ম, কর্ম ও জ্ঞান। সেলফিশ উইম্যান!”

কথাগুলো বলার সময় একবারের জন্যও ইরামের চোখের দিকে তাকালনা সাইবান। দূরে সরে নিজের মাথার চুলে আঙুল চালিয়ে হনহন করে হেঁটে সে বেডরুম থেকে বেরিয়ে গেল। ইরাম দেয়ালের সঙ্গে লেপ্টে দাঁড়িয়ে স্বামীর চলে যাওয়া দেখল।

সে জানে, আজ এক রাতে আলাদিন তার থেকে হাজার বছর দূরে সরে গিয়েছে। সেটাই তো ইরাম চেয়েছিল। এই সম্পর্কে আবেগ যত কম জড়াবে, সম্পর্কের বাঁধন ছিঁড়ে ফেলাও তত সহজ হবে। অথচ তার বুকের ভেতরে এমন চিনচিনে ব্যথা হচ্ছে কেন?

⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──

রুমটা অন্ধকারাচ্ছন্ন। বিছানার উপর চিৎ হয়ে শুয়ে আছে সাইবান। কোনো আলো জ্বালায়নি। বাইরের বাগানের বাতির হলদেটে আলো আবছায়াভাবে রুমের ভেতর এসে পড়ছে। পিনপতন নীরবতায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছে ঘড়ির টিকটিক আর্তনাদ। চোখ বুঁজে আছে সাইবান। দুই হাত পা বিছানায় ছড়ানো। কম্বল টেনে গায়ে দেয়ার প্রয়োজনও মনে করেনি। পায়ে স্লিপার্স এখনো রয়ে গিয়েছে। না পোশাক বদলেছে, না কিছু খুলে রেখেছে। গত এক ঘণ্টা যাবৎ সে এভাবেই শুয়ে আছে। একপাশে নাইটস্ট্যান্ডের উপর রাখা ফোনটা তার থেকে থেকে ভাইব্রেট করছে। জানে কে কল করেছে। তিতলি। তবে সাইবান সেই ফোন ধরলনা। দিন দুনিয়ার বোধ তার মাঝ থেকে হারিয়ে গিয়েছে।

অন্ধকার ক্রমশ গুমোট হয়ে চেপে ধরতে চাইছে যেন সাইবানকে। হঠাৎ করেই রুমের ভেতরকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। যেন অদূর থেকে কোনো অশনি সংকেতের ঘণ্টা বাজছে। রুমে এসি চলছে, এরপরও দরদর করে ঘামছে সে। সিলিংয়ে ঝুলতে থাকা সিলিং ফ্যানটার তার শূন্য চোখজোড়া আঁকড়ে রেখেছে বুঝি। দৃষ্টিই ফেরাতে পারছেনা। একটানা চেয়ে রইল সাইবান। নিষ্পলক। নিঃশ্বাস প্রশ্বাস ক্রমশ দ্রুততর হয়ে উঠল তার। অতঃপর একদম হঠাৎ করেই চোখের সামনের নীরব রুমের দৃশ্যটা বদলে গেল। কেমন ভয়ংকর হয়ে উঠল। অশরীরী আতঙ্ক বয়ে গেল সাইবানের শিরদাঁড়া। এই অনুভূতি তার খুব ভালো করে চেনা। চোখজোড়া শুকনো খটখটে হয়ে গেল তার, চেহারায় ভর করল ভয়। তারপরই দেখতে পেল সে।

সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছে একটি ফাঁ*সির দড়ি। হালকা বাতাসে এদিক সেদিক দুলছে। সেই দড়ির ছায়া পাশের দেয়ালে প্রতিফলিত হচ্ছে।

ঢং! ঢং! ঢং!

ঘণ্টা বাজছে কোথাও। মৃত্যুর ঘণ্টা। সাইবান কুঁকড়ে গেল। নিজের দুই কান চেপে ধরল সজোরে। তার গলা চিড়ে আর্তনাদ বেরিয়ে এলো অথচ কেউই শুনলনা সেই চিৎকার। সে দেখতে চায়না! ওই দড়ি! ওই ঘণ্টা! না! না! না!

“সাই!”

কন্ঠটা হঠাৎ ছেদ ঘটাল মুহূর্তে। সাইবান জমে গেল সম্পূর্ণ। চোখ পিটপিট করে তাকাল। বিছানার পাশে এসে বসেছে চিন্তিত মুখের সারিকা। ভাইয়ের কপালে হাত রেখে তাপমাত্রা মাপছে। ঘেমে নেয়ে একাকার সাইবান। বি*স্ফারিত দৃষ্টিতে সে দেখল সারিকাকে। পরক্ষণেই মুখ ঘুরিয়ে তাকাল সিলিং ফ্যানের দিকে। ফাঁ*সির দড়িটা আর নেই। হ্যালুসিনেশন হচ্ছিল তার। বুকের ভেতর আটকে রাখা দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলল সাইবান। ঢোক গিলল সজোরে। সারিকা ঝুঁকে বলল,

“তোর শরীর খারাপ লাগছে? মমকে ডেকে আনি, ওয়েট।”

সারিকা উঠতে গেল, অথচ উঠতে পারলনা। সাইবান নিজের শক্তিশালী দুবাহুর মাঝে জাপটে ধরল বোনের কোমর। কোলে মাথা গুঁজে দিল শিশুর মতন। সারিকা সেখানেই থেমে গেল। ঝুঁকে ভাইকে নিজের কোলে শুইয়ে জড়িয়ে ধরে রাখল অনেকটা সময় ধরে। মাথায় শান্তনার হাত বুলিয়ে দিল। শেষমেষ ফিসফিস করে আর্তনাদ মাখা গলায় শুধাল,

“তুই আবার এই রুমে কেন এসেছিস?”

সাইবান নিজের বাহুর জোর বাড়াল। সারিকার কোলে মুখ গুঁজে দাঁতে দাঁত পিষে হাহাকার করে উঠল,

“আই হেইট হার! আই হেইট হার সো মাচ, সিস!”

“ঘৃণা করলে এত আগলে রাখিস কেন?”

সাইবান ক্ষণিকের জন্য উত্তর করলনা। অতঃপর কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,

“যে চোখে আমার মরণ, সেই চোখকেই করেছি বরণ। মরণ যে আমায় আকর্ষণ করে, কি করে ঠেকাই তারে?”

—চলবে—

[ আজকে চুন্দল চুন্দল খমেন্ট করবেন। কারণ আজকে চুন্দল খমেন্ট পলব।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply