Golpo romantic golpo যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ

যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ১৮


যেখানেপ্রেমনিষিদ্ধ

ইশরাতজাহানজেরিন

পর্ব_১৮

রাত ভালোই হয়েছে। ক্লাবঘরের ভেতর ফ্যান ঘুরছে ধীরে ধীরে। দেয়ালে ঝুলছে দলের ব্যানার, টেবিলে ছড়িয়ে আছে চা-সিগারেটের ছাই, আর পুরনো স্পিকার থেকে ভেসে আসছে টিকা-টোলার মোরের গান।
আব্রাজ সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছে। পায়ে পা তুলে, চোখ আধা বন্ধ। পাশে দাঁড়িয়ে সামির
হাতে ফাইল, মুখে চিন্তার ছাপ।

“ভাই… কাল ভোট। লোকজন বলছে এবারের ইলেকশনটা টাফ হবে।”

আব্রাজ চোখ না খুলেই বলল, “টাফ? কার জন্য টাফ? আমার জন্য নাকি তাদের জন্য?” হালকা হাসি দিয়ে সিগারেট টান দিলো। “তুই এখনো রাজনীতিকে খেলার মাঠ ভাবিস, আর আমি ভাবি রেফারি আর স্কোরবোর্ড দুটাই আমি।”

“কিন্তু বিরোধীরা তো এবার বিদেশি মিডিয়াও আনছে…”

আব্রাজ হঠাৎ উঠে বসে, হাসতে হাসতে বলল, “বিদেশি মিডিয়া? হাহ! ওদের ক্যামেরা আসবে, যাবে, ছবি তুলবে, তারপর গরম ভাত খেয়ে চলে যাবে। ভোট কিন্তু আমি গুনব।” চোখ টিপল সে।

“বুঝলি না এখনো?”

“ভাই আমি শুধু চাই ঝামেলা না হোক।”

“ঝামেলা? আমি থাকলে ঝামেলা আমার পকেটে থাকে।”

“থাকবেই তো কারন আপনি ঝামেলার বস্তা।”

“কিছু বললি?”

“না ভাই আপনি কানে বেশি শুনেন।”

“হতে পারে। তবে কম শোনার থেকে বেশি শোনা ভালো।”

সে টেবিল ঠুকে আবার বলল, “শোন সামির, এই শহরে মানুষ দুইটা জিনিস বোঝে। কে ক্ষমতায় আছে, আর কে নেই। মাঝামাঝি কিছু নাই।” গানটা একটু জোরে বাজে। আব্রাজ তাল মেলাতে থাকে।

“কিন্তু মানুষ এবার খুব সচেতন হয়ে গেছে ভাই…”

আব্রাজ হাসতে হাসতে মাথা নাড়ায়। “সচেতন? হাহ! মানুষ যতই সচেতন হোক, শেষে গরম ভাতে ভোট দিয়ে আসে।” একটু থেমে, চোখ সরু করে আবার বলে,
“আর যারা বেশি কথা বলে… তারা সাধারণত ভোটের পর চুপ হয়ে যায়।”

সামির একটু অস্বস্তিতে পড়ে। “ভাই আপনার এত কনফিডেন্ট কেন?”
আব্রাজ হেসে উঠে দাঁড়ায়, “কারণ আমি কনফিডেন্স বানাই না, আমি রেজাল্ট বানাই। আর তুই চিন্তা করিস না বেশি, চিন্তা করলে চুল পড়ে যাবে। আর তখন তোকে দেখলে মানুষ বলবে, ‘এই টাকলা কার লোক রে?’ বুঝলি মান ইজ্জতের একটা ব্যাপার আছে না?”

সামির কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়। আব্রাজ জানালার দিকে তাকিয়ে বলল, “কাল সকালে যখন রেজাল্ট আসবে, তখন সবাই বলবে, ‘আবার সে-ই! আর বিরোধীরা বলবে ‘ভোট কারচুপি!’ এটা তো পুরোনো গান রে বাবা।”

“আপনি কি সত্যিই মনে করেন সব ঠিক হয়ে যাবে?”

আব্রাজ ঘুরে তাকায় “ঠিক না হলে আমি ঠিক করে নিই।” থেমে আবার হাসল, “আর শোন, জীবনটা একটা ম্যাচ। আর আমি এমন খেলোয়াড়, যে রেফারির বাঁশিও আগে থেকে চিনে রাখে।” গান চলতেই থাকে। আব্রাজ আবার সোফায় বসে পড়ে, চোখ বন্ধ করে। যেন পুরো দুনিয়া তার নিয়ন্ত্রণে। আর সামির শুধু তাকিয়ে থাকে, বুঝে উঠতে পারে না, এটা আত্মবিশ্বাস… নাকি অন্য কিছু। কিন্তু যাই হোক না কেন, এই ব্যাটায় আবার ভোট চুরি করবে এটাই আসল কথা।

হঠাৎ দরজা ধাম করে খুলে যায়। ভেতরে ঢোকে নৈশি সরকার। হাই হিলের শব্দে পুরো ঘর কেঁপে ওঠে। গাঢ় রঙের শাড়ি, চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। যেন যুদ্ধ করতে এসেছে, নির্বাচন না। সামির তো প্রায় লাফিয়ে উঠে দাঁড়ায়, “এই যে… আপা… মানে…..”

“চুপ!” নৈশি হাত তুলে থামায়।
আব্রাজ তখনো সোফায় হেলান দিয়ে, চোখ আধা বন্ধ। এক চোখ খুলে তাকাল। “ওহ… বিরোধী দল স্বয়ং!”
সে হালকা হাসে, “কী ব্যাপার? ভোটের আগের রাতে দোয়া নিতে আসছেন?”

নৈশি ঠোঁট বাঁকায়, “দোয়া না, সতর্ক করতে এসেছি।”

“আমাকে?” আব্রাজ সোজা হয়ে বসে, “আমি তো ভেবেছিলাম আপনারা শুধু ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন, লাইভে কান্না করেন। সামনে আসার সাহসও আছে নাকি?”

সামির চুপচাপ পাশে দাঁড়িয়ে, মনে মনে বলছে, “আজকে মারামারি হবেই…”

নৈশি এগিয়ে এসে টেবিলের উপর রাখা সিগারেটের প্যাকেট তুলে নেয়, একবার দেখে আবার ছুঁড়ে ফেলে দেয়। “আপনার এই নাটক, ভোট কারচুপি, লোক ভাড়া করা, ভয় দেখানো সব জানি আমি।”

আব্রাজ হাত তুলে থামায়, “এক মিনিট এক মিনিট…”
হাসতে হাসতে বলে, “আপনি কি প্রমাণ নিয়ে এসেছেন, না শুধু রাগ নিয়েই এসেছেন?”

“প্রমাণও আছে, সাহসও আছে।”

“সাহস?”

নৈশি চোখ বড় করে তাকায়, “আপনি নিজেকে কী মনে করেন?”

“আমি?”

আব্রাজ উঠে দাঁড়ায়, ধীরে ধীরে তার চারপাশে হাঁটতে থাকে, “আমি সেই লোক, যাকে হারাতে আপনারা মিটিং করেন, প্ল্যান করেন, আবার শেষে হেরে গিয়ে প্রেস কনফারেন্স করেন।”

“আপনি জিতেন না, আপনি চুরি করেন!”

“আরে না না…”

আব্রাজ মাথা নাড়ে, “চুরি করলে লুকিয়ে করতে হয়। আমি তো প্রকাশ্যে করি, তাই এটা চুরি না, এটা ম্যানেজমেন্ট।”

সামির এবার সত্যি হেসে ফেলে, “ভাই, আপনি থামেন…”
“তুই চুপ থাক!” দু’জন একসাথে চেঁচায়।

নৈশি এগিয়ে এসে বলে, “শুনেন, কাল যদি কিছু গণ্ডগোল হয় আমি সরাসরি মিডিয়াতে যাব।”

আব্রাজ হাততালি দেয়, “ওয়াও! আবার মিডিয়া! আপনারা মিডিয়াকে এত ভালোবাসেন কেন? ওরা কি আপনার পার্টির কর্মী?”

“আপনি ভয় পাচ্ছেন?”

“ভয়?”

আব্রাজ একদম কাছে এসে দাঁড়ায়, চোখে চোখ রেখে বলে, “আমি শুধু একটা জিনিসে ভয় পাই, ডায়েট চার্টে ভাত কম থাকলে।”

সামির এবার দেয়ালে মাথা ঠুকে হাসি আটকায়। নৈশি বিরক্ত হয়ে বলে, “আপনি সিরিয়াস না একদম!”

“আর আপনি বেশি সিরিয়াস। রাজনীতি করতে হলে একটু কমেডি সেন্স লাগে। না হলে হারার পর মানুষ আপনাকে নিয়ে মিম বানাবে, কাঁদার সময়ও পাবে না।”

নৈশি ঠোঁট কামড়ে বলে, “কাল দেখা যাবে কে হাসে।”
“অবশ্যই দেখা যাবে,”

আব্রাজ আবার সোফায় বসে পড়ে, পা তুলে বলে, “আমি তো আগেই বলে দিচ্ছি। আমি হাসব। আপনি… ভাবেন।”

নৈশি ঘুরে দরজার দিকে হাঁটে। দরজা খুলে থেমে যায় এক মুহূর্ত। “খেলা শেষ না, আব্রাজ।”
আব্রাজ চোখ বন্ধ করেই বলে, “খেলা শুরুই হয় আমায় দিয়ে, শেষও হয় আমায় দিয়ে।”

নৈশি চলে যেতে নিয়েও রাগের বশে পা থেমে যায়। সে মাথা ঠান্ডা করে আবারও আব্রাজের দিকে এগিয়ে যায়। একেবারে কাছে আসতেই আব্রাজ বলে, “আপামনি দূরত্ব বজায় রাখেন, গায়ে পারফিউমের বদলে যে মশা মারার স্প্রে মেরে এসেছেন ওটার গন্ধে আমার কিডনির নিচে থাকা ডান পাশের বাম পাশের ওপরের নিচের বিশেষকোষ দু’টো ব্যথা করছে।”

“কেন আপনার বিশেষ কোষ দুটো কি পেছনে নাকি?”

“হ্যাঁ পেছনেই। কিডনির নিচে দু’টো তিল আছে। ভালোবেসে নাম দিয়েছি বিশেষকোষ। আপনার এত ওভারথিং করার কিছু নেই। বাই দ্য ওয়ে দেখবেন নাকি? একেবারে খাসা।

” খাসা নাকি সর্বনাশা!”

ক্লাবঘর থেকে একটু দূরে পুরনো একটা গ্যারেজঘর। টিনের চাল, মাঝে মাঝে টুপটাপ পানি পড়ছে তাতে। একটা লো ভোল্টেজের বাল্ব ঝুলে আছে সিলিংয়ে। ভেতরে গোল হয়ে বসে আছেন জামাতের এমপি প্রার্থী আব্দুল মোতালেব নিজামী আর তার দল। টেবিলের ওপর চা, বিস্কুট… আর মাঝখানে একটা নকশা করা খাতা। যেন যুদ্ধের প্ল্যান না, বিয়ের দাওয়াত কার্ডের ডিজাইন! আব্দুল মোতালেব নিজামী গম্ভীর মুখে বললেন, “শুনেন সবাই… এইবার রাজনীতি দিয়ে না, বুদ্ধি দিয়ে খেলতে হবে।”
একজন বলল, “ভাই, বুদ্ধি মানে? পোস্টার বেশি মারবো?”
“না।”
সে মাথা নাড়লেন , “এইবার পোস্টার না… পাত্র-পাত্রী মারবো।”
সবাই একসাথে “হ্যাঁআআ???” করে উঠল।
আব্দুল মোতালেব নিজমী এবার সামনে ঝুঁকে আসে, “আব্রাজ আর নৈশি… দুইজন দুই দলের, দুইজন দুই আগুন। একে অপরকে দেখলেই বিস্ফোরণ। ঠিক?”
“ঠিক…”
“তাই এবার আমরা আগুন দিয়ে আগুন নিভাব। ওদের বিয়ে দিয়ে দেই।”
একজন তো চা খেতে খেতে কাশি দিয়ে প্রায় মরে যাওয়ার দশা। “বিয়ে? এই দুইজন? ওরা তো বাসর রাতেই একে অপরকে মেরে ফেলবে!”
আব্দুল মোতালেব নিজামী শান্ত গলায় বলল, “আমি সেটাই তো চাই।”
আরেকজন মাথা চুলকায়, “কিন্তু ভাই, বিয়ে করাবেন কীভাবে?”
“সহজ।”

সে খাতা খুলে দেখায়, “ নকল কাজি, দুইটা সাক্ষী, আর একটু নাটক। খবর ছড়িয়ে দিব…… ‘গোপনে বিয়ে করেছে!’”
একজন হেসে বলল, “তারপর?”
“তারপর কী!”
সে হাত নেড়ে বলে, “ওদের দলই আগে ঝামেলা শুরু করবে। ‘আমাদের নেতা কই গেল?’ ‘ওই মেয়েরে কেন বিয়া করলো?’ এইসব!”
আরেকজন যোগ করল, “আর বিরোধী দল বলবে ‘ওই ছেলে আমাদের আপাকে ফাঁদে ফেলছে!’”
সবাই হেসে লুটোপুটি। “ভাই, এই প্ল্যান তো সিনেমার থেকেও বেশি।”
আব্দুল মোতালেব নিজামী গম্ভীর মুখে বললেন, “রাজনীতি নিজেই একটা সিনেমা… আমরা শুধু ডিরেক্টর।”
পাশে বসা চিকন লোকটা এবার গলা ঝেরে বলল, “কিন্তু ভাই… যদি ওরা সত্যি সত্যি সংসার শুরু করে ফেলে?”
“তাহলে তো আরো ভালো!”
দুইজনই রাজনীতি ভুলে শপিং মল নিয়ে ব্যস্ত থাকবে! আব্রাজ তো বাজারে গিয়ে দামাদামি করবে ‘এই আলুর ভোট কয়টা? আর নৈশি বলবে, ‘তুমি চুপ করো! সংসার আমি চালাই!’
আব্দুল মোতালেব নিজামী এবার হাত তুলে থামায়, “শুনেন… আজ রাতেই কাজ। খবর এমন ছড়াবো ভোরের আগে পুরো শহর জানবে।”
“কিন্তু ভাই, যদি ধরা পড়ে যাই?”
সে মুচকি হেসে বলল, “ধরা পড়লে বলবো আমরা তো শুধু ভালোবাসার মিলন ঘটাতে চেয়েছি।
সে টেবিলে চাপড় মারে, “কাল ভোটের আগে ওদের জীবনেই ভোট পড়ে যাবে।”

সবাই একসাথে বলে, “ইনশাআল্লাহ!” … তারপর আবার হেসে ওঠে।

ক্লাবঘরের ভেতর তখন উত্তাপ চড়েছে। স্পিকারে গান থেমে গেছে এখন। আব্রাজ এখনো আগের মতোই ভাবলেশহীন ভাবে বসে আছে। নৈশি তার সামনে। সে গিয়েও ফিরে এসেছে। এই লোককে দুটো কথা না শুনিয়ে গেলে মনটা আনচান করবে। সে টেবিলে হাত ঠুকে এবার বলল, “আপনার মতো লোক রাজনীতি না, সার্কাসে থাকা উচিত! এই কথা কয়বার বলতে হবে আপনাকে?”

আব্রাজ হেলান দিয়ে বলল, “আর আপনার মতো মহিলার হিরো আলমের ছবিতে থাকা উচিত, এই ধরুন পাড়ার কোনো কুচুটে কাকিমার রোলে। কারন আপনি কাজ কম, মুখ চালান বেশি।”

“আপনি কাজ করেন?” নৈশি ভ্রু তোলে বলল , “না কি শুধু ম্যানেজমেন্ট?”

সামির পাশ থেকে ফিসফিস করল, “এই শব্দটা আবার বললেন…”

আব্রাজ চোখ টিপে বলল, “ম্যানেজমেন্ট একটা আর্ট। আপনি বুঝবেন না।”

“আমি বুঝি না?”

নৈশি এগিয়ে আসে, “আমি আপনার মতো মানুষকে দেখলেই বলতে পারি ভেতরে কি আছে।”

“ওহ! চোখে এক্স-রে ভিশন আছে নাকি? তাহলে একটু দেখে বলুন তো আমার পশ্চাদদেশে কয়টা হাড় আছে।”

“আপনার ওখানে হাড় না, একগাদা সমস্যা আছে।”

“সমস্যা থাকলে সমাধানও আমি নিজেই।” আব্রাজ ঠোঁট বাঁকায়। সামির মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এই দুইজন যদি ভোটের আগে মারামারি শুরু করে দেয়… আমি চাকরি ছাড়ব… ঠিক তখনই দরজা ধাম ধাম ধাম করে বাজতে থাকে। সবাই চুপ হয়ে দরজার দিকে তাকাল। আব্রাজ ভ্রু কুঁচকে বলল, “আব্বে শালা, কোন থারকি এই রাতের বেলা মরতে এসেছে? মানুষের তো কমনসেন্স নেই, না বলে কয়ে রাতের বেলা হনহনিয়ে থলি একটা নিয়ে ভিক্ষা করতে আরেকজনের ক্লাবে চলে আসে।” নৈশি ভ্রু কুঁচকে একবার আব্রাজের দিকে তাকালো। এই লোক একেবারে সিউর তাকেই এই কথাটা ইঙ্গিতে বলেছে। আব্রাজ সামিরের দিকে চাইতেই সে গিয়ে দরজা খুলে দিলো। দরজা ধাম করে খুলতেই সবাই চমকে তাকাল। বাইরে থেকে একদল লোক ঢুকল ধীর পায়ে, মুখে এমন ভাব যেন তারা হঠাৎ কোনো ভয়ংকর সত্য ধরে ফেলেছে। সামনে আব্দুল মোতালেব, চোখ কুঁচকে চারপাশ দেখছেন। পেছনে তার কর্মীরা মাথা নাড়ছে গুরুগম্ভীরভাবে। ঘরে তখন আব্রাজ বসা, নৈশি সামনে দাঁড়িয়ে, সামির মাঝখানে ঘামছে। আব্দুল মোতালেব একবার আব্রাজের দিকে তাকাল, একবার নৈশির দিকে তাকাল, তারপর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল এমনভাবে যেন মানবসভ্যতা শেষ। “ইন্নালিল্লাহ…” সে মাথা নাড়ল।
পেছনের এক কর্মী বুক চাপড়ে বলল, “ভাই… যা ভাবছিলাম, তাই!” আরেকজন চোখ ঢেকে বলল, “এই দৃশ্য দেখার আগে যদি মইরা যাইতাম…”
সামির হাঁ করে তাকিয়ে বলল, “কি দৃশ্য? এখানে তো শুধু ঝগড়া হচ্ছিল!”
লোকটা তার দিকে আঙুল তুলে বলল, “চুপ! সাক্ষী কথা কয় না।”
আব্দুল মোতালেব-এর পেছন থেকে কে যেন একজন বলল, “দেখছেন ভাই ঝগড়া করতাছিলো। ঝগড়া তো রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা নিজেদের মধ্যে করে না। কারা করে? প্রেমিক, প্রেমিকারাই তো নাকি?”
“হুম। হক কথা।”
আব্রাজ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। “কি ব্যাপার? আপনারা নাটকের অডিশন দিতে এসেছেন নাকি?”
নৈশি চোখ রাঙিয়ে বলল, “আপনারা অনুমতি ছাড়া ঢুকছেন কেন?”
আব্দুল মোতালেব কষ্ট পাওয়া মুখ করে বলল, “আপা… অনুমতি? যখন সমাজ ভাঙে, তখন দরজায় নক করা যায় না।”
আব্দুল মোতালেব ধীরে ধীরে রুমের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। টেবিলের ছাই ভর্তি অ্যাশট্রে দেখে মাথা নাড়ল, ফ্যানের দিকে তাকিয়ে আবার দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
“রাত গভীর… দরজা বন্ধ… পুরুষ এক পাশে… মহিলা এক পাশে… বাতাসে উত্তাপ…আহা”
পেছন থেকে একজন বলল, “ভাই, আলামত সব মিলে গেছে!”
নৈশি টেবিল চাপড়াল।
“কিসের আলামত???”
লোকটা চোখ বন্ধ করে বলল, “নৈতিক অবক্ষয়ের। নানা রকম মানুষ কিছুদিন ধরেই বলছিল আপনারা নাকি প্রেম করেন। আমরা কেউ এসব বিশ্বাস করিনি। ওমা একটু আগে এক লোক ফোন করে জানালো এত রাতে নৈশি আপা আপনার সাথে দেখা করতে ক্লাবে এসেছে। আমরা তাও বিশ্বাস করিনি। কিন্তু এখানে এসে……..”
সামির এক পা পিছিয়ে গেল।
“ভাই… এরা আবার কী সার্কাস নিয়ে আইছে?”
আব্রাজ চোখ কুঁচকে বলল, “না, সার্কাস না। সার্কাসে অন্তত টিকিট লাগে ওনারা তো খালি হাতে চলে এসেছে।”
আব্দুল মোতালেব গলা খাঁকারি দিল। ” আপনারা যেহেতু পাপ করেই ফেলেছেন তো আমরা একটা গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে চাচ্ছি।”
লোকটা ফাইল খুলে টেবিলে রাখল। “আমরা পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ, সামাজিক অবস্থা, নৈতিক অবক্ষয় সব বিচার করে একটা সিদ্ধান্তে নিয়েছি।”
সামির ফিসফিস করল, “ভাই, এরা কি গবেষণা পেপার লিখছে? আর কিসের সিদ্ধান্ত? আসতে না আসতে বলে সবাই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলছে।”
আব্রাজ বলল, “না। এরা বেকার।”
আব্দুল মোতালেব আঙুল তুলে বলল, “প্রথমত রাত গভীর। দ্বিতীয়ত একজন পুরুষ নেতা, একজন মহিলা নেত্রী। তৃতীয়ত নির্জন ক্লাবঘর। চতুর্থত দু’জনে এখানের চোখেই ইয়ে ইয়ে প্রেম।”
পেছন থেকে এক কর্মী বলল, “পঞ্চমত রসায়ন চলছে।”
নৈশি গর্জে উঠল, “আপনাকে আমি এখনি রসায়নের ল্যাবে পাঠাব!”
আব্দুল মোতালেব তাড়াতাড়ি বলল, “মূল কথায় আসি। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আপনাদের বিয়ে হওয়া উচিত।”
“কীইইই????”
আব্রাজ আর নৈশি একসাথে এমন চিৎকার দিল যে ফ্যান কেঁপে উঠল। সামির চেয়ারে বসে পড়ল। “আমার হার্টে টান লাগছে…”
মালাধরা লোকটা ভয়ে মালা উল্টো করে ধরল। আব্রাজ বুকের ওপর হাত রেখে বলল, “এক মিনিট। আমি ঠিক শুনছি তো? আমারে এই মহিলার সাথে?”
নৈশি সাথে সাথে বলল, “এই লোককে বিয়ে করার চেয়ে আমি একা পাহাড়ে গিয়ে ছাগল পালব!”
আব্রাজ ভ্রু তুলল। “ছাগলরাও রাজি হবে না।”
আব্দুল মোতালেব শান্ত গলায় বলল, “দেখেন, আপনারা দুইজনই আগুন। আগুন আগুনে মিললে সংসারের চুলা জ্বলবে।”
আব্রাজ বলল, “আর বেশি মিললে পুরো জীবন জ্বলবে।”
পেছনের এক কর্মী নোট নিচ্ছিল। সে হেসে বলে উঠল, “ভাই, এই লাইনটা ভালো। পোস্টারে দিমু?”
নৈশি টেবিল চাপড়াল। “আপনাদের সাহস কত! কে আপনাদের ডেকেছে?”
আব্দুল মোতালেব বলল, “জনগণের বিবেক।”
সামির বলল, “জনগণ যদি এদের পাঠায়, জনগণের চিকিৎসা দরকার। আর ওনারা প্রেমিক প্রেমিকা এসব তো স্বপ্নে ভাবাও পাপ। মানুষ গুজব ছড়াবে আর তার ভিত্তিতে এখানে চলে আসবেন?”
লোকটা পাত্তা দিল না। “ওনারা যদি প্রেমিক-প্রেমিকা না হন, তাহলে এত রাতে একা একা এখানে কেন? এখন আবার বলবেন রাজনৈতিক আলাপ? দেখুন রাজনৈতিক আলাপ চায়ের দোকানে হয়, রাতে হয় খালি আবেগের আলাপ। আর আমরা কচি খোকা না যে কদু পড়া দিবেন আর আমরা চাটব। এখন এত কিছু জানি না, আপনারা এখানে প্রেম করছিলেন স্বীকার করেন বা না করেন বিয়ে করতেই হবে।”
পেছন থেকে একজন বলল, “ভাই, আগে কাবিননামা পড়ি?”
আরেকজন আবার যোগ করল, “কাজি রেডি আছে!”
সামির চেঁচায়, “কাজি?? আপনারা কাজিও নিয়ে আসছেন???”
নৈশি চুল ঠিক করে বলে, “শুনেন, আপনারা সবাই এখনই বের হন, না হলে আমি….”
আব্রাজ মাঝখানে ঢুকে, “না না, থাকেন! দেখি তো এদের প্ল্যান কোথায় যায়!”
পেছনের মুখ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছোকরাটা এবার আব্রাজের গলায় ফুলের মালা পড়িয়ে দেয়। আব্রাজ মালাটা খুলে হাতে নিয়ে দেখে, “ফুল খারাপ না… ডিসকাউন্টে পেয়েছেন নাকি?”
নৈশি চোখ রাঙায়, “আপনি মজা পাচ্ছেন?”
“অবশ্যই!”
আব্রাজ হাসে, “রাজনীতিতে এতদিন পরে এমন রোমান্টিক ষড়যন্ত্র দেখলাম!”
আব্দুল মোতালেব শেষ চেষ্টা করে, “দেখেন, আপনারা যদি এখন বিয়ে করে ফেলেন। সব ঝামেলা শেষ। আপনারা যদি এমন করেন তাহলে জনগণ কি শিখবে? প্রেম করলে বিয়ে করা উত্তম।”
লোকটা আবার বলল, “নৈশি আপনার দলের কেউ আসেনিকেন?”
নৈশি থমকে গেল। “কারণ… কারণ এটা আমার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত!”
“আহা!” লোকটা আঙুল তুলল, “ব্যক্তিগত! শুনছেন সবাই? ব্যক্তিগত! রাজনীতিতে ব্যক্তিগত মানেই সম্পর্ক। মানে ইয়ে ইয়ে।”
পেছন থেকে এক লোক বলল, “লিখেন ভাই, স্বীকারোক্তি দিছে।”
সামির মাথা ধরে বসে পড়ল। “আমি চাকরি ছাড়মু…”
নৈশি এবার টেবিল চাপড়াল। “এটা জঘন্য নাটক!”
আব্দুল মোতালেব শান্ত গলায় বলল, “নাটক না আপা, সামাজিক সমাধান। আপনারা নেতা মানুষ। যদি রাতের আঁধারে দেখা করেন, জনগণ কী শিখবে?”
আব্রাজ সিগারেট ধরিয়ে বলল, “জনগণ শিখবে, মিটিং সবসময় অফিস টাইমে হয় না।”
লোকটা পাত্তা দিল না। “ইসলামও নাজাজ হবে।”
আব্রাজ কাশতে কাশতে বলল, “ভাই, নাজাজ না নাজায়েজ।”
“ব্যাকরণ ধরবেন না,” লোকটা রেগে বলল। “বিয়ে ধরেন।” তারপর হাত নেড়ে দুজন সাক্ষী এগিয়ে এলো। একজনের হাতে কলম, আরেকজনের হাতে সিল।
সামির চমকে উঠল, “এইটা কি মোবাইল কোর্ট নাকি?”
নৈশি আব্রাজের দিকে আঙুল তুলল, “শুনেন, ওনার মতো ভোট চোরের সাথে আমার জুতাও বিয়ে করবে না!”
আব্রাজ ভ্রু তুলে বলল, “আপনার জুতারও রুচি নাই দেখি।”
“আপনি একটা অসভ্য মানুষ!”
“আর আপনি একটা হাঁটতে থাকা মাইক।”
“চিটার!”
“ঝগরুটে!”
“ভোট ডাকাত!”
“খাম্বাচোর।”
“বাটপার!”
“সন্ত্রাসী!”
সামির ফিসফিস করল, “এরা ঝগড়া করতে করতে সংসারও চালাইতে পারবে মনে হয়…”
নৈশি রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “আমি মরব, তবু এই লোককে বিয়ে করব না!”
আব্রাজ সোফায় বসে পা তুলে বলল, “আমিও চাই না। আমার ভবিষ্যৎ সন্তান জন্মেই আমাকে মামলা দেক এমন কুটনী মহিলাকে বিয়ে করার অপরাধে।”
আব্দুল মোতালেব চোখ সরু করে বলল, “তাহলে আমরা খবর ছড়াইয়া দিমু, গোপনে প্রেম, ধরা খাইছে, এখন অস্বীকার।”
নৈশি থমকে গেল। “কি?”
“হ্যাঁ,” সে বলল।
“ভোরের আগে পুরো শহর জানবে। পোস্টার হবে ‘নেতা-নেত্রী ইয়ে ইয়ে।”
আব্রাজ এবার প্রথমবার একটু সোজা হয়ে বসল। “হুম।”
লোকটা আরো এগোল, “আপনার দল বলবে চরিত্রহীন। ওনার দল বলবে ফাঁদে পড়ছে। ভোট দুইজনেরই শেষ।”
নৈশি চুপ। আব্রাজ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। মুখে আগের হাসি, কিন্তু চোখে অন্য কিছু। “মানে,” সে বলল,
“আমাকে ব্ল্যাকমেইল?”
লোকটা মুচকি হাসল। “রাজনীতি।”
নৈশি দাঁত চেপে বলল, “আমি কখনো রাজি হব না।”
আব্রাজ তার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি রাজি না হলে কালকে আপনার পোস্টারে হৃদয় চিহ্ন আঁকা থাকবে।”
“আপনি আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন?”
“না,” আব্রাজ বলল,
“আমি হিসাব বুঝাচ্ছি।”
নৈশি গর্জে উঠল, “আপনার সাথে বিয়ে করার চেয়ে ভালো হারব!”
আব্রাজ সঙ্গে সঙ্গে বলল, “আমি হারতে পছন্দ করি না।”
“আমি আপনাকে সহ্য করতেও পারি না !”
“আমিও না।”
“আপনি জঘন্য!”
“আপনি শব্দদূষণ!”
“আপনি।”
“আপনি নিজে…..”
হঠাৎ আব্রাজ বলল “থামেন। কাবিন কত তা বলেন?” সবাই তো থ। নৈশি ঘুরে তাকাল। “কি বললেন???” আব্রাজ কাঁধ ঝাঁকাল। “জিদ ধরেছি আমি। এই মহিলা যদি বলে বিয়ে করবে না, আমি তাহলে এখনি করব। কি বলে! ম্যাডাম পুলির জুতাও নাকি আমায় বিয়ে করবে না? এখন জুতার মালিকই আমার বাসার বাসন মাজবে। খচ্চর মহিলাকে দিয়ে যদি তিন বেলা আন্ডারপেন্ট না ধোয়াই তবে আমিও মীর আব্রাজ রোদ না। একেবারে রোদের তাপে জীবন ঝলসে দিব।”
নৈশি প্রায় লাফিয়ে উঠল। “আপনি পাগল!”
“হ্যাঁ,” আব্রাজ বলল, “আর আপনি কারণ।”
সামির দেয়ালে মাথা ঠুকল। “ভাইরে ভাই…”
আব্দুল মোতালেব খুশিতে উজ্জ্বল। “আলহামদুলিল্লাহ! কাজি আনো!”
নৈশি চেঁচিয়ে উঠল, “না! আমি রাজি না!”
আব্রাজ মুচকি হেসে তার দিকে ঝুঁকল। “আপনি ভয় পাচ্ছেন নাকি?”
নৈশি চোখ লাল করে বলল, “আমি ভয় পাই? আপনাকে?”
“তাহলে বসেন।”
“আমি বসব না!”
“তাহলে আমি সবাইকে বলব আপনি আমাকে ভালোবেসে এসেছিলেন।”
“মিথ্যাবাদী!”
“প্রমাণ? রাত, ক্লাবঘর, একা আপনি আরো কিছু চাই নাকি!”
নৈশি থেমে গেল। জনগন তাকে সম্মান করে। এই সম্মান অর্জন করতে কষ্ট করতে হয়েছে। একটা কারনে সে বোকামি করে সব শেষ করতে পারেনা। বিয়ে করবে তো? এই বিয়ে দিয়েই আব্রাজের জীবনকে ভাজা ভাজা করবে সে। শেষে ওই লোক যে খালি বদনাম হবে তা নয়, রাজনীতি তো ছাড়তেই হবে সাথে নৈশির মুক্তিও মিলবে বিয়ে থেকে। নৈশি পাঁচ সেকেন্ড চুপ থেকে চেয়ার টেনে বসল। “ঠিক আছে।”
সবাই হাঁ!
সে বলল, “বিয়ে হবে। কিন্তু শোনেন আব্রাজ এই বিয়ে আমি ভাঙব, আপনাকে ভাঙার পর।”
আব্রাজ হেসে পাশের চেয়ার টেনে বসল। “দেখা যাবে।”
“আমার সাথে পারবেন না।”
“আপনার সাথে থাকাই তো চ্যালেঞ্জ।”
কাজি ঢুকল হাঁপাতে হাঁপাতে।
“কনে কোনটা?” সামির মাটিতে বসে পড়ল। “আমারে মাইরা ফেলেন…” আব্রাজ কাজীর দিকে তাকিয়ে বলল, “ওই মহিলাটা। বাই দ্য ওয়ে একজনই তো মহিলা আছে। তাও কনে খুঁজে পাচ্ছেন না? পাবেনই বা কেমন করে? এটা মহিলা কম ব্যাটাছাওয়াল বেশি। এই বিয়ে পড়ানো শুরু করেন।” আব্রাজ আব্দুল মোতালেব-এর দিকে তাকিয়ে বলল, “২০ টা টাকা ভাঙতি দেন তো। দেনমোহরের একটা বিষয় আছে না? এই মহিলার পেছনে ২০ টাকা খরচা করেও আমার কোনো ফয়দা হবে না৷ ২০টা টাকার জন্য মাইরি আফসোস হচ্ছেরে। এই আপামনি দেনমোহর ২০ টাকা দিচ্ছি। তাও ফেরতযোগ্য।”

চলবে?

( সবাই রেসপন্স করবেন আর কমেন্ট করে যাবেন। যা রেসপন্সের ছিঁড়ি, মন খালি বলে গল্পটা বাদ দিয়ে দে।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply