যেখানেপ্রেমনিষিদ্ধ
ইশরাতজাহানজেরিন
রাতের শুটিংয়ের ক্লান্তিতে পুরো ইউনিট যখন ঝিমিয়ে পড়েছে, তখন খাবারের টেবিলে প্রাণের আচরণ সবার চোখ কপালে তুলে দিলো। সেটে সবাই জানে ডিরেক্টর প্রাণ মানেই এক আগ্নেয়গিরি। ভুল হলে কাউকে ছেড়ে কথা বলে না। কিন্তু ডিনার ব্রেকে সবাই যখন লাইন ধরে খাবার নিচ্ছে, প্রাণ হঠাৎ সবাইকে অবাক করে দিয়ে নিজে প্রত্যাশার প্লেট নিয়ে এগিয়ে এল।
প্রাণ খুব শান্ত গলায় বলল, “সবাই কি খেয়াল করেছেন প্রত্যাশা গত ছয় ঘণ্টা ধরে টানা শট দিয়েছে? ওর জন্য আলাদা করে টেবিলের এই দিকটায় বসার জায়গা করে দিন। ভিড়ের মধ্যে ও খেতে পারবে না।”
ইউনিটের লোকজন একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। যে ডিরেক্টর সামান্য দেরি হলে চিৎকার করে সেট মাথায় তোলে, সে আজ নায়িকার জন্য বসার জায়গা ঠিক করছে! প্রত্যাশা একটু ইতস্তত করে বলল, “আমি সবার সাথেই খেতে পারতাম প্রাণ ভাইয়া…”
“তোমার ভাই নেই?”
“আছে।”
“তো ওকেই ডাকো না। এমনিতেও আমার একটা বোন আছে। আমি ওকে কথা দিয়েছি সে ছাড়া পৃথিবীর কেউ আমাকে ভাইয়া ডাকতে পারবে না। বসো তুমি ওখানে গিয়ে বসো।” প্রাণ প্রোডাকশন বয়কে ডেকে বলল, “শোনো, ওর খাবারে লঙ্কার ঝাল যেন কম থাকে। আর লেবুটা কেটে দিয়েছ তো?”
সবাই যখন জটলা পাকিয়ে নিজেদের খাবার নিতে ব্যস্ত, প্রাণ দেখল ইউনিটের দ্বিতীয় হিরো আরিয়ান একটা প্লেট নিয়ে হাসতে হাসতে প্রত্যাশার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আরিয়ানের হাতে একটা গোলাপ, সম্ভবত পরবর্তী সিনের প্রপ। কিন্তু ও সেটা প্রত্যাশার চুলে ছোঁয়ানোর চেষ্টা করছে। প্রাণের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে দ্রুত পায়ে ওদের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল। “আরিয়ান, প্রপস নিয়ে ইয়ার্কি করা আমার পছন্দ না। নিজের প্লেট নিয়ে ওপাশে গিয়ে বসো।”
আরিয়ান থতমত খেয়ে চলে গেল। প্রাণ নিজেই প্রত্যাশার পাশে বসল। সবাই দেখল, প্রাণ কথা বলছে খুব কম, কিন্তু ওর পুরো মনোযোগ প্রত্যাশার দিকে। প্রত্যাশা যখন গ্লাস থেকে পানি খেতে যাবে, প্রাণ আগেই গ্লাসের তলার পানিটা টিস্যু দিয়ে মুছে ওর হাতে তুলে দিল যাতে ওর কাপড়ে জল না পড়ে। ইউনিটের একজন কস্টিউম ডিজাইনার ফিসফিস করে পাশে থাকা মেকআপ ম্যানকে বলল, “ডিরেক্টর সাহেবের কি আজ সূর্য পশ্চিমে উঠেছে? উনি নিজে হাতে গ্লাস মুছে দিচ্ছেন!”
মেকআপ ম্যান উত্তর দিল, “চুপ করো ভাই! ডিরেক্টর সাহেব যা রাগী, কিছু বলতে গেলে কাল থেকে কাজ থাকবে না। কিন্তু মানতেই হবে, ম্যাডামের প্রতি উনার কেয়ারটা কিন্তু একদম জেন্টলম্যানের মতো।”
প্রাণ সবার অবাক হওয়া চাহনি টের পাচ্ছিল, কিন্তু ও পাত্তাই দিল না। ও কেবল প্রত্যাশার দিকে তাকিয়ে আলতো করে বলল, “মাছটা ভালো করে খাও, কাঁটা আছে সাবধানে। আমি বেছে দিবো? আমার না মাছের কাঁটা বাছার শখ।”
“মানে?”
“মানে কারো শখ মাছ ধরা, কারো মাছ খাওয়া আর আমার মাছের কাঁটা বাছা।”
খাবার শেষ করে শুটিং ফ্লোরে ফিরতেই প্রাণের সেই ‘রাগী ডিরেক্টর’ ইমেজ আবার ফিরে এল। কিন্তু প্রত্যাশার বেলায় সেটা বদলে গেল এক অদ্ভুত মায়ায়।
সিনের দাবি অনুযায়ী প্রত্যাশাকে সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নামতে হবে। প্রাণ নিজে গিয়ে সিঁড়ির প্রতিটা ধাপ চেক করল। প্রাণ ক্রু-দের দিকে তাকিয়ে গর্জন করে বলল, “এই জায়গাটা এত পিচ্ছিল কেন? এখনই মুছে শুকনো করো। যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, আমি কাউকে আস্ত রাখব না!”
পরিবেশ নিমিষেই থমথমে হয়ে গেল। কাজ শেষ হলে প্রাণ প্রত্যাশার কাছে গিয়ে খুব নিচু গলায় বলল, “একটু সাবধানে নামবে। আমি লেন্সের পেছনে আছি, ঘাবড়াবে না।”
বেচারা প্রত্যাশা পড়ে গেল বিপাকে। এ কোন জ্বালায় পড়েছে সে? কিছুক্ষণের মধ্যেই শুটিং শুরু হয়ে গেল।
প্রত্যাশা দৌড়ে নামার সময় সিনের প্রয়োজনে হোঁচট খাওয়ার অভিনয় করার কথা ছিল, কিন্তু ও সত্যি সত্যি কিছুটা ভারসাম্য হারাল। শট শেষ হওয়ার আগেই প্রাণ ক্যামেরা ছেড়ে দৌড়ে গিয়ে ওকে ধরে ফেলল।
প্রাণ উদ্বিগ্ন গলায় বলল, “লাগল নাকি? আমি বলেছিলাম না সাবধানে থাকতে!” সবার সামনে ডিরেক্টর থেকে একজন প্রেমিকের ব্যাকুলতা ওর চোখেমুখে ফুটে উঠল। ইউনিট মেম্বাররা বুঝতে পারল, এই রাগী মানুষটার ভেতরে একটা নরম হৃদয় শুধু একজনের জন্যই বরাদ্দ। প্রত্যাশা ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “আমি ঠিক আছি। শট কি ওকে?”
প্রাণ দ্রুত নিজের হাত সরিয়ে নিল। ওর কানে তখনো লাল আভা। ও আবার গম্ভীর হয়ে মনিটরের দিকে ফিরে গেল। “হুম, শট ওকে। “
পাশ থেকে সহকারী ডিরেক্টর হঠাৎ বলল, “মনে আছে প্রাণ এই সিনে তুমি মারা যাবে। মনে আছো তো? আরিয়ান ছেলেটা শেষে প্রত্যাশার নায়ক হবে।”
“এই ফালতু গল্প কে কোন ফালতু সিলেক্ট করছে?”
“মীর আরবিন প্রাণ।”
প্রাণ তার সহকারী ডিরেক্টরের দিকে তাকাল। লোকটা চুপ হতেই প্রাণ মনে মনে বলল, “না না, প্রত্যাশার নায়ক হওয়ার যোগ্যতা কেবল আমার আছে। এই বলদা আরিয়ানের বাচ্চাকে যে করেই হোক সরাতেই হবে।”
একটু শুটিং শুরু হওয়ার কথা। আরিয়ান প্রত্যাশার হাত ধরে একটা রোমান্টিক ডায়ালগ বলার প্র্যাকটিস করছিল। দূর থেকে দেখে প্রাণের মাথায় রক্ত চড়ে গেল। স্ক্রিপ্টে এই সিনটা ছিল যে, প্রাণ মারা যাবে আর আরিয়ান প্রত্যাশাকে নিয়ে যাবে। প্রাণ রাগে নখ কামড়াচ্ছে। হঠাৎ প্রাণ তার সহকারীকে ডাকল।
“আরিয়ানকে ড্রেসিং রুমে পাঠাও। বলো যে ডিরেক্টর সাহেব স্পেশাল কিছু ইনস্ট্রাকশন দেবেন। আর শোনো, ওই ড্রিঙ্কটা ওর টেবিলে রাখো।”
মিনিট পনেরো পর। সেটে হৈচৈ পড়ে গেল। আরিয়ান ড্রেসিং রুম থেকে টলতে টলতে বের হয়ে এল। ওর চোখ লাল, কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। প্রাণ আগে থেকেই সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল। সে সবার সামনে চিৎকার করল, “আরিয়ান! এ কী অবস্থা তোমার? নেশা করে সেটে এসেছ? আমার সেটে ডিসিপ্লিন সবার আগে!”
আরিয়ান, “স…স্যার… আমি তো শুধু ওই জুসটা খেলাম যা আপনি…”
প্রাণ কথা কেড়ে নিয়ে বলল, “শাট আপ! আমার ওপর দোষ দিচ্ছ? এই মাতাল ছেলেকে দিয়ে আমি আমার সিনেমার এন্ডিং নষ্ট করতে দেব না। প্রোডাকশন! এখনই একে বের করে দাও। আর কোনোদিন যেন আমার আশেপাশে একে না দেখি!”
আরিয়ানকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হলো। সেটের সবাই স্তব্ধ। প্রত্যাশা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। সে জানে আরিয়ান ছেলেটা ওমন নয়, কিন্তু প্রাণের রাগের সামনে কথা বলার সাহস কারোর নেই। সেটে অদ্ভুত একটা থমথমে পরিবেশ। প্রত্যাশা এগিয়ে এল প্রাণের কাছে। “শুনুন আরিয়ান তো চলে গেল। এখন আমাদের ক্লাইম্যাক্স সিনটা কী হবে? নায়ক ছাড়া তো শুটিং সম্ভব না।”
প্রাণ খুব ধীরস্থিরভাবে প্রত্যাশার দিকে এগিয়ে এল। ওর চোখে এখন এক অদ্ভুত বিজয়ীর হাসি। সে আলতো করে প্রত্যাশার কপালে ঝুলে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দিল। “গল্প বদলে গেছে প্রত্যাশা। এই সিনেমার রাইটার আমি, ডিরেক্টর আমি। আমি ঠিক করেছি, নায়ক মরবে না। যে নায়ক তার ভালোবাসাকে একা ফেলে চলে যায়, সে আসলে নায়কই না।”
“মানে?”
“মানে এখন থেকে এই সিনেমার একমাত্র নায়ক আমি। স্ক্রিপ্ট চেঞ্জ। নায়ক ফিরে আসবে, আর তার অধিকার ছিনিয়ে নেবে। ক্যামেরা রেডি করো!”
শুটিং শুরু হলো। সিনের দাবি অনুযায়ী প্রত্যাশা কাঁদছিল। প্রাণ নায়ক রূপে অন্ধকার থেকে হেঁটে এসে প্রত্যাশাকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরল। এটা আর অভিনয় রইল না, প্রাণের শরীরের প্রতিটি পেশি বলছিল সে প্রত্যাশাকে ছাড়বে না। প্রাণ প্রত্যাশার কানে ফিসফিস করল, “আরিয়ান বা অন্য কেউ কোনোদিন তোমার নায়ক হতে পারবে না। তোমার স্ক্রিপ্ট আমি লিখি, আর সেখানে তোমার পাশে শুধু আমার নামই থাকবে। বুঝেছ?”
“তার মানে?”
“সব কিছুতে মানে খুঁজো কেন? আমি তো সিনেমার কথা বলছিলাম।”
“ওহ।”
প্রত্যাশা প্রাণের বুকের ধড়ফড়ানি শুনতে পাচ্ছিল। ডিরেক্টর প্রাণের আড়ালে থাকা এই হিংস্র আর প্রেমিক প্রাণকে দেখে সে আজ প্রথম শিউরে উঠল। প্রত্যাশা আর কিছু ভাবার আগেই “ক্যামেরা রোল… অ্যাকশন!”
_
রাত তখন নিঝুম। আমবাগানের ঝোপের আড়ালে মশার কামড় সহ্য করে প্রায় আধঘণ্টা ধরে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে স্বাধীন। তার অস্থিরতা এখন চরমে। ঠিক তখনই অন্ধকারের বুক চিরে ছায়ার মতো কেউ একজন এগিয়ে এলো। সাঁঝ যখন স্বাধীনের সামনে এসে দাঁড়াল, তার হাঁটার ভঙ্গিটা তখন কেমন জানি। শরীরটা একটু সামনের দিকে ঝুঁকে আছে, আর মুখটা ব্যথায় কুঁকড়ে ছোট হয়ে গেছে। স্বাধীন ব্যাকুল হয়ে এগিয়ে এসে ফিসফিসিয়ে বলল, “এত দেরি করলে যে? আমি তো ভেবেছিলাম আজ আর তোমার দেখা পাব না।”
সাঁঝ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কোমরে হাত দিয়ে কোনোমতে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে তখন আগুন জ্বলছে। রাগে গরগর করতে করতে সে বলল, “আর বোলো না! ওই আরযান ভাইটা না মানুষ না, আস্ত একটা কসাই। একটানা তিন ঘণ্টা ধরে তার শরীরে মাসাজ করিয়ে ছাড়ল আমাকে। হাত আর কোমরের বারোটা বেজে গেছে। লোকটা কি নিজেকে নবাব সিরাজউদ্দৌলা ভাবে নাকি? রাক্ষস একটা!”
স্বাধীন হকচকিয়ে গেল, “তিন ঘণ্টা মাসাজ! বল কী?”
“হ্যাঁ! শাস্তি দিচ্ছিল আমাকে। বাড়ির সবাই পাপ করেছে আর শাস্তি দিলো আমায়। সেই অপরাধে আজ এই জুলুম। উফ, আমার হাড়গোড় সব আলগা হয়ে গেছে স্বাধীন। লোকটা ঘুমানোর পর আমি চোরের মতো পালিয়েছি। আমার মেরুদণ্ডটা বোধহয় আর সোজা হবে না।” বলতে বলতে সাঁঝ একটু সামলে নিল। স্বাধীনের খুব কাছে সরে এসে তার চোখের দিকে তাকাল। চাঁদের আলো গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে এসে সাঁঝের মুখে এক মায়াবী আভা তৈরি করেছে। ব্যথার চেয়েও এখন তার মনে জেদ আর আকাঙ্ক্ষা বেশি কাজ করছে। আজ সে স্বাধীনকে পটানোর মিশনে নেমেছে। ভাই তাকে কষ্ট দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই কষ্টের বদলা সে আজ স্বাধীনের ভালোবাসা দিয়ে উসুল করবে। সাঁঝ একটু নুয়ে পড়ার ভান করে স্বাধীনের বুকের ওপর আলতো করে হাত রাখল। আদুরে গলায় বলল, “স্বাধীন, আমার কোমরটা বড্ড ব্যথা করছে গো। একটু ধরবে আমাকে?”
স্বাধীন অপ্রস্তুত হয়ে সাঁঝের কোমর জড়িয়ে ধরল। ঠিক সেই মুহূর্তেই সাঁঝ তার দুই হাত স্বাধীনের ঘাড়ের পেছনে পেঁচিয়ে ধরল। তার চোখের চাহনিতে এখন আর রাগ নেই, বরং আছে তীব্র এক আমন্ত্রণ। সে ফিসফিস করে বলল, “ভাইয়া তো আমার সব শক্তি কেড়ে নিয়েছে, এখন তুমি আমায় একটু শক্তি দাও না?”
সাঁঝের ওষ্ঠাধর তখন স্বাধীনের ঠোঁটের খুব কাছে। স্বাধীন যখন হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি শুনতে পাচ্ছে, আর সাঁঝ তার জীবনের প্রথম ‘রিওয়ার্ড’ নিশ্চিত করার জন্য চোখ জোড়া বন্ধ করেছে। ঠিক তখনই সেই রোমান্টিক আবহ চুরমার হয়ে গেল। “সাঁঝ, তোর কোমরের ব্যথা কি তবে মালিশে কমেনি? দেখি, এবার আমি না হয় একটু থেরাপি দেই!” একটি বজ্রগম্ভীর কণ্ঠস্বর তার কানে এসে ঠেকল। সে চারপাশে দেখল কেউ নেই। এই আরযান ভাইের কারনে এখন সে ভুলবাল শুনে।
হঠাৎ তীব্র এক টর্চের আলো তাদের ওপর আছড়ে পড়ল। আরভিদ ভাই! আরযান ভাইয়ের ঘুম ভাঙলেও কি না, আরভিদ যে জেগে তক্কে তক্কে ছিল, সেটা ওরা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি।
আরভিদ টর্চের আলোটা সাঁঝের মুখের ওপর স্থির রেখে শান্ত কিন্তু শীতল গলায় বলল, “বাহ! আরযান ভাই তোকে দিয়ে মাসাজ করিয়েছে বলে তোর খুব কষ্ট হচ্ছে, তাই না? তাই কষ্ট লাঘব করতে মাঝরাতে এই বাগানে ‘পেইনকিলার’ নিতে এসেছিস? আর এই ছেলে কে তুই, তোর কি রাতকানা রোগ হয়েছে? এই বেঁকে যাওয়া মেয়েটাকে নিয়ে তুই কোন স্বর্গে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিস?”
সাঁঝের মুখটা মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে তোতলাতে তোতলাতে বলল, “না… মানে ভাইয়া… আমি জাস্ট একটু ফ্রেশ বাতাস খেতে আসছিলাম।”
“ফ্রেশ বাতাস না বিষাক্ত বাতাস, সেটা ঘরে চললে বুঝবি।” আরভিদ স্বাধীনের দিকে এগিয়ে এসে তার কলারটা হালকা করে টেনে ধরল। “তোর সাথে হিসাবটা পরে করছি। আর সাঁঝ, তুই এখন ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে ঘরে যা। কাল সকালে আরযান ভাই জানলে তোর কোমরের যেটুকু হাড় আস্ত আছে, সেটুকুও আর থাকবে না।” সাঁঝের মনে হলো তার হৃদপিণ্ডটা বুঝি এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেছে। টর্চের তীব্র আলোয় চারপাশটা শ্বেতশুভ্র দেখাচ্ছে। স্বাধীন তখন ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেছে, আর সাঁঝের কোমরের ব্যথাটা যেন আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেল। সাঁঝ তৎক্ষনাৎ বলল, “আরে বাবা এসব কি বলছো? এটা তো ডেলিভারি ম্যান।”
“কি? তো পার্সেল কই?”
“খেয়ে ফেলেছি। চকলেট অর্ডার দিয়েছিলাম।”
আরভিদ ভ্রু কুঁচকে এক পা এগিয়ে এল। “বলিস কী? আজকাল ডেলিভারি ম্যানরা কি ডেলিভারি দেওয়ার আগে কাস্টমারকে ওভাবে জড়িয়ে ধরে ‘অক্সিজেন’ দেয়? আর এই রাত দুটোর সময় কোন কোম্পানি ডেলিভারি পাঠায় রে?”
স্বাধীন দেখল অবস্থা বেগতিক। আরভিদ ভাইয়ের হাতের টর্চটা যেভাবে লাঠির মতো দুলছে, তাতে পিঠের চামড়া আস্ত থাকবে বলে মনে হচ্ছে না। সে কোনো কথা না বলে অন্ধকার দেখে এক দৌড়ে পাঁচিল টপকে উধাও হয়ে গেল। সাঁঝ বিড়বিড় করে বলল, “দেখলে ভাইয়া? কত বড় বেয়াদব! ডেলিভারি দিয়ে থ্যাংক ইউ বলার সুযোগও দিল না, পালিয়ে গেল।”
আরভিদ এবার গম্ভীর হয়ে টর্চটা সাঁঝের চোখের সামনে ধরল। “নাটক বন্ধ কর সাঁঝ। ওই পোলার নাম স্বাধীন না? আমি সব জানি। তুই দাঁড়া, আমি এখনই আরযান ভাইকে ডেকে তুলছি। তিন ঘণ্টা মাসাজ করেও তোর শিক্ষা হয়নি, এখন উনি এসে তোকে আজীবনের জন্য ফিজিওথেরাপি দিয়ে দেবেন।”
আরযান ভাইয়ের নাম শুনতেই সাঁঝের কলিজা শুকিয়ে কাঠ। সে জানে, আরযান ভাই জানলে আজ রক্ষে নেই। সে ধপ করে আরভিদের পায়ের কাছে বসে পড়ল। কোমরের ব্যথায় চোখমুখ কুঁচকে গেলেও সে আরভিদের পা দুটো শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। “ওরে আমার কলিজার ভাই! দোহাই লাগে তোমার, আরযান ভাইকে কিচ্ছু বোলো না। ওই রাক্ষসটা জানলে আমাকে জ্যান্ত কবর দিয়ে দেবে। তুমি যা বলবে আমি তা-ই করব। কাল থেকে তোমার সব কাজ করে দেব, তোমার সব সিক্রেট ভাবীর কাছে গোপন রাখব প্লিজ ভাইয়া, এবার বাঁচাও!”
আরভিদ পা ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বলল, “ছাড় বলছি! তুই তো দেখি পা না ধরলে ছাড়বি না।”
“না, ছাড়ব না! তুমি আগে কথা দাও আরযান ভাইকে বলবে না।” সাঁঝ তখন প্রায় কান্নাকাটি জুড়ে দিয়েছে। “তুমি যা শর্ত দেবে আমি সব মেনে নেব। তোমার জুতো পালিশ থেকে শুরু করে বিকেলের নাস্তা বানানো সব আমার দায়িত্ব। শুধু ভাইয়াকে জাগিয়ো না!”
আরভিদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর ফিসফিস করে বলল, “ঠিক আছে, শর্ত একটাই কাল থেকে আগামী একমাস আমি যা বলব সন শুনতে হবে। রাজি?”
সাঁঝ তখন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছে। সে চটজলদি বলল, “রাজি! এক মাস কেন, দুই মাস করব। শুধু ওই যমরাজকে ডেকো না।”
আরভিদ টর্চ নিভিয়ে দিল। “চল এবার ঘরে। আর মনে রাখিস, ডেলিভারি ম্যান যদি আবার কোনোদিন বাগানে আসে, তবে কিন্তু পার্সেলটা আমিই রিসিভ করব!”
সাঁঝ কোনোমতে কোমর চেপে ধরে আরভিদের পেছনে পেছনে পা টিপে টিপে ঘরের দিকে এগোলো। মনে মনে নিজেকে গালি দিল। আজ চুমু তো দূরে থাক, নিজের জীবনটাই বন্ধক দিয়ে আসতে হলো! তারা যাওয়ার আগেই বাড়ির প্রধান ফটক দিয়ে হঠাৎ এক জোড়া হেডলাইটের তীব্র আলো বাগানটাকে দিনের মতো উজ্জ্বল করে দিল। একটা কালো রঙের সেডান গাড়ি টায়ার ঘষে পোর্টিকোর সামনে এসে থামল। আরভিদ আর সাঁঝ দুজনেই যেন জমে গেল। এই অসময়ে বাড়িতে গাড়ি ঢোকার কথা নয়। গাড়ির দরজা খুলে যে ব্যক্তিটি বেরিয়ে এল, তাকে দেখে আরভিদের চোখ ছানাবড়া। সে আর কেউ নয়, তাদের ভাই আব্রাজ। কিন্তু সে একা নয় গাড়ির ওপাশ দিয়ে নেমে এল দীর্ঘাঙ্গী এক তরুণী। ঘোমটা না থাকলেও তার পরনের দামি জামদানি বলে দিচ্ছে, মেয়েটি কোনো সাধারণ অতিথি নয়। আরভিদ টর্চের আলোটা সরাসরি আব্রাজের মুখের ওপর ফেলে হতবাক গলায় বলল, “আব্রাজ? তুই এই রাত আড়াইটার সময় বাড়িতে আপদ নিয়ে হাজির হলি কোত্থেকে?”
আব্রাজ হাত দিয়ে টর্চের আলোটা আড়াল করে রুক্ষ গলায় চেঁচিয়ে উঠল, “আলোটা সরা হারামজাদা! চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে।”
সাঁঝের কোমরের ব্যথা যেন ম্যাজিকের মতো উধাও হয়ে গেল। তার রোমান্টিক মন তখন উত্তেজনায় টগবগ করছে। স্বাধীনকে আজ চুমু খাওয়া হয়নি ঠিকই, কিন্তু বড় ভাইয়ের এই কীর্তি দেখে তার মনে নতুন আশার আলো জ্বলল। সে একটু এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল, “ভাইয়া, এই সুন্দরীটি কে? এত রাতে কোত্থেকে তুলে আনলে?”
আরভিদ ততক্ষণে একটু সামলে নিয়ে বিদ্রূপের সুরে বলল, “আরে বাহ! ছোটরা বাগানে ডেলিভারি ম্যানের সাথে দেখা করে, আর বড়রা দেখি সরাসরি হোম ডেলিভারি নিয়ে আসে! আব্রাজ, দেশে কি হোটেল রুম সব বুকড ছিল? নাকি মীর বাড়ির কর্তাদের ভয় পাওয়ানোর জন্য এই চিজটাকে একেবারে সোজা ড্রয়িংরুমে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা?”
আব্রাজ বরাবরই ঠোঁটকাটা আর বদমেজাজি। সে একটা খ্যাকানি দিয়ে বলল, “মুখ সামলে কথা বলবি আরভিদ। ছোট আছিস ছোটর মতো থাক, বেশি পকপক করলে এক চড়ে দাঁত সব পেটে ঢুকিয়ে দেব।”
তরুণীটি তখন আব্রাজের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। সাঁঝের কৌতূহল এখন আকাশচুম্বী। সে হুট করে বলে বসল, “আরে! ভাইয়া, তুমি কি…..?”
আব্রাজ পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করতে করতে অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং গালমন্দ মেশানো গলায় ঘোষণা করল, “বেশি আবোলতাবোল বকিস না। তোরা যখন এখানে চোর-পুলিশ খেলছিস, তখন আমি এই আপদটাকে ঘাড়ে নিয়ে ফিরছি। শোন, এটা আমার সদ্য বিয়ে করা দুশমন, মানে আমার বৈধ বউ। কাজি অফিসে সাইন করে সোজা নিয়ে এসেছি। তাও বিশ টাকা কাবিনও দিয়েছি। এখন রাস্তা ছাড়।”
আরভিদ আর সাঁঝ দুজনেই যেন আকাশ থেকে পড়ল। আরভিদ প্রায় চিৎকার করে উঠল, ” ভাই বিয়ে করেছিস মানে?
সাঁঝ ঢোক গিলে আবার জিজ্ঞেস করল, “কি হয় এটা তোমার?”
আব্রাজ ধোঁয়া ছেড়ে অবজ্ঞার হাসি হেসে বলল, “আমার বউ তোর ভাবী।”
“কিহহহহহহহহহহহহহহহ।”
চলবে?
( সবাই কমেন্ট কইরো, রেসপন্স কইরো।)
Share On:
TAGS: ইশরাত জাহান জেরিন, যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেম আসবে এভাবে পর্ব ১২
-
প্রেম আসবে এভাবে পর্ব ১৩
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ১৪
-
পরগাছা পর্ব ৭
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪+৫
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪৮
-
প্রেমতৃষা ৪২ (প্রথম অর্ধেক)
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৯
-
প্রেমতৃষা পর্ব ১১+১২
-
প্রেমতৃষা পর্ব ১৩+১৪