jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৪০
তিন দিন কেটে গেছে। দুর্গের আকাশে আজ অদ্ভুত ভারী এক নিস্তব্ধতা। গত রাতে এখানেও হামলা করেছিল সেসব অদ্ভুত দেখতে মানুষজন। কী ভয়ংকর তাদের হাঁকডাক। মেহেরুন্নেসা ভীষণ ই চিন্তিত। কি করে এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচাবে মানুষদের। সব কিছু কেমন নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এখন নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে আর কখন? দিনকে দিন বিজ্ঞানের এই অপব্যবহার তারা চালিয়েই যাবে। মানুষের জীবন কে করে তুলবে দুর্বিষহ আর বিভীষিকা ময়। নাহহহ এ তো হতে দেওয়া যায় না। যেভাবেই হোক এদের থামাতেই হবে। এই চিন্তাতেই কাটলো মেহেরুন্নেসার দিন।
বিকেলের শেষ আলো ফুরোতেই বাইজিদ এসে পৌঁছালো প্রশিক্ষণ দুর্গে। ঘোড়া থেকে নামার ভঙ্গিতেই বোঝা যায় সে ক্লান্ত, কিন্তু তার থেকেও বেশি ভারাক্রান্ত। কক্ষে ঢুকতেই মেহেরুন্নেসা তার মুখের দিকে তাকিয়ে থমকে গেল।
“কি হয়েছে?”
ধীরে জিজ্ঞেস করলো সে। বাইজিদ কোনো ভূমিকা না করে বললো
“অবস্থা ভালো না, মেহের।”
তার কণ্ঠে ক্লান্তির চেয়ে বেশি একটা চাপা রাগ।
“ওরা… ছড়িয়ে পড়ছে।”
মেহেরুন্নেসার বুক কেঁপে উঠলো
“মানে?”
“যেখানে সেখানে হামলা করছে। গ্রাম… পথ… বাজার কিছুই নিরাপদ না।”
সে থামলো এক মুহূর্ত।
“মানুষ ভয়ে ঘর থেকে বের হচ্ছে না।”
মেহেরুন্নেসা ধীরে বললো
“এভাবে চলতে থাকলে… পুরো রাজ্যটাই শেষ হয়ে যাবে।”
বাইজিদ চুপ। তার মুঠো শক্ত হয়ে আছে। মেহেরুন্নেসা ভারি গলায় বলল
“অঙ্কুরকে থামাতে হবে”
বাইজিদ তপ্ত শ্বাস নিয়ে ধপাস করে পালঙ্কে বসলো। পিছন দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে দিয়ে বলল
“সে চেষ্টা করিনি ভেবেছো? গত আটটি বছরে কম চেষ্টা করিনি ওকে থামানোর। কোনো ভাবেই সফল হতে পারিনি”
“ওকে হত্যা করতে হবে।”
বাইজিদ এর ভাবান্তর দেখা গেল না।
“সেটা হবে আরেক তরফা বোকামি। ওর কাছে আমার মা আছে মেহের। আমার বোন আছে। ওকে মারলে আমি তাদের খোঁজ কোনো দিনও পাবো না।
“ ও বেঁচে থাকতেই বা পাচ্ছেন কোথায়? গত আট বছরে একবারও মায়ের মুখটা আপনাকে দেখতে দিয়েছে ওই জানোয়ার টা?”
বাইজিদ না সূচক মাথা নাড়ল। মেহেরুন্নেসা বাইজিদ এর বাহু ধরে ঝাকিয়ে বলল
“তাহলে কেন ওকে ভয় পেয়ে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না? আচ্ছা বেশ। ওকে আগে প্রমাণ দিতে বলুন যে তারা বেঁচে আছে”
বাইজিদ গভীর দৃষ্টিতে তাকায় মেহেরুন্নেসার দিকে।
“যদি ও প্রমাণ দিতে পারে আপনার মা বোন বেঁচে আছে, তাহলে আমাদের প্রথম কাজ হবে তাদের খুঁজে বের করা। তারপর অঙ্কুর কে দেখে নিবো। আর যদি প্রমাণ দিতে না পারে। ওর মত অঙ্কুরকে আমি ধূলিসাৎ করে দিতে দু’বার ভাববো না”
বাইজিদ মেহেরুন্নেসা কে জানায় না অঙ্কুর কে না মারার সবচেয়ে বড় কারণ টা কি। চন্দ্রা যে অঙ্কুর কে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসে। এই এক দুর্বলতায় অঙ্কুর আজও টিকে আছে।
বাইজিদ তাকালো তার দিকে। চোখে কঠিন সম্মতি
“হ্যাঁ।”
“কিন্তু তার আগে বন্দীদের উদ্ধার করতে হবে। আম্মা, অর্ষা…”
বাইজিদ এর দিকে তাকিয়ে একটু ভ্রুকুটি করে বললল
“আপনার রুবা…”
বাইজিদ বুঝে ফেলল মেহেরুন্নেসার কটাক্ষ করে বলা কথাটা। অন্য দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল
“আমি অন্য কারও, এটা বলে খুব খুশি হচ্ছো? হও হও। যেদিন সত্যি সত্যি হারিয়ে যাব…..”
“শাহজাদা!”
মেহেরুন্নেসা চেঁচিয়ে উঠে বাইজিদ এর কাঁধ স্পর্শ করতেই বাইজিদ সরিয়ে দিলো তার হাত। মেহেরুন্নেসা আরেকটু গা ঘেষে বসে বলল
“এত রাগ করার কি আছে? নিশ্চিত হচ্ছিলাম আবার কিছু……”
বাইজিদ একটু কড়া চোখে তাকালো
“একেই বলে নারী। প্রাণ দিয়ে দিবে, তবুও বিশ্বাস করবে না।”
“পুরুষদের একটু সন্দেহ করে রাখতে হয়। অত ছেড়ে দিতে নেই। হাতের বাইরে চলে যায়”
বাইজিদ ফোঁস করে নিশ্বাস ছাড়লল
“তাহলে প্রথম কাজ, ওরা কোথায় আছে সেটা জানতে হবে।”
মেহেরুন্নেসা ওপর নিচ মাথা নাড়লো। বাইজিদ ধীরে বললো
“অঙ্কুর খুব চালাক। বন্দীদের এমন জায়গায় রাখবে যেখানে সরাসরি যাওয়া যাবে না।”
মেহেরুন্নেসা বলল
“মানে গোপন জায়গা”
“হ্যাঁ।”
মেহের একটু হাঁটতে শুরু করলো কক্ষের ভেতর।
তার চোখে চিন্তার ঝলক।
“ওর সবচেয়ে বড় শক্তি কি?”
সে হঠাৎ জিজ্ঞেস করলো। বাইজিদ বললো
“ভয়।”
“আর দুর্বলতা?”
বাইজিদ থেমে গেল। তারপর ধীরে বললো
“তার গোপনীয়তা।”
মেহেরুন্নেসা থেমে তাকালো।
“তাহলে আমরা সেটাতেই আঘাত করবো।”
বাইজিদ ভ্রু কুঁচকালো
“কিভাবে?”
“ওর লোকদের ভেতর ঢুকতে হবে। ভেতরের খবর না জানলে কিছুই করা যাবে না।”
বাইজিদ গভীরভাবে তাকিয়ে রইলো তার দিকে।
“ঝুঁকি আছে”
“আমাদের হাতে আর পথও নেই”
এক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর বাইজিদ ধীরে মাথা নাড়লো।
“ঠিক আছে,আমরা ভাগ হয়ে কাজ করবো। আমি বাইরে থেকে খোঁজ নেবো ওদের গতিবিধি, পাহারা, সবকিছু।”
“আর আমি, ভেতরের পথ খুঁজবো।”
দুজনের চোখে চোখ পড়লো। এইবার তাদের মাঝে শুধু ভালোবাসা না একই লক্ষ্য। একই যুদ্ধ। বাইজিদ ধীরে বললো
“অঙ্কুরের খেলা শেষ করতে হবে। নয়তো ধ্বংস হয়ে যাবে প্রকৃতি”
মেহেরুন্নেসার চোখে তখন কঠিন আগুন
“এবার… আমাদের পালা।”
কক্ষের ভেতর নীরবতা নেমে এসেছে। দুজনেই নিজের মতো করে ভাবছে কোন পথটা ঠিক হবে।
হঠাৎ মেহেরুন্নেসা ধীরে বললো
“আমাদের একজন সাহায্য করতে পারে।”
বাইজিদ তাকালো তার দিকে
“কে?”
“মিরান।”
নামটা উচ্চারণ করতেই যেন এক অদ্ভুত ছায়া নেমে এলো মেহেরুন্নেসার চোখে। বাইজিদ ভ্রু কুঁচকালো
“তুমি তাকে ভরসা করো?”
মেহেরুন্নেসা একটু থামলো।
“পুরোপুরি না,কিন্তু… সে অনেক কিছু জানে।”
বাইজিদ চুপ করে রইলো। ঠিক তখনই
মেহেরুন্নেসার মনে হঠাৎ ভেসে উঠলো সেই দৃশ্য।
জঙ্গলের অন্ধকার, আর সেই লোকটা।
যার হাতে সে ধরা পড়েছিলো। তার চোখ, তার উপস্থিতি সব যেন বাইজিদ এর দেওয়া বর্ণনার সাথে মিলে যায়। আর সেদিন মিরান তার সাথে কথা বলছিল।
“সে অন্ধকার জগতের রাজা…”
মিরানের সেই কথাটা যেন আবার কানে বাজলো।
মেহেরুন্নেসার বুক কেঁপে উঠলো। তার মাথায় হঠাৎ একটা ভাবনা ঝলসে উঠলো, তাহলে কি… সেই লোকটাই… অঙ্কুর?
তার আঙুল ঠান্ডা হয়ে এলো। কিন্তু সে কিছুই প্রকাশ করলো না।
মুখের অভিব্যক্তি সামলে নিল মুহূর্তেই।
বাইজিদ তখনও তাকিয়ে আছে তার দিকে।
“কি ভাবছো?”
মেহেরুন্নেসা হালকা মাথা নাড়লো
“কিছু না,”
শান্ত গলায় বললো,
“আমি শুধু ভাবছি… মিরান এর সাথে কথা বলতে হবে।”
তার চোখে আবার সেই দৃঢ়তা ফিরে এলো।
মেহেরুন্নেসা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে বললো
“আমায় মহলে নেওয়ার ব্যবস্থা করুন।”
বাইজিদ একটু চমকালো
“এখন?”
“হ্যাঁ”
সে দৃঢ় গলায় বললো,
“মিরান প্রাসাদের কারাগারে আছে।”
বাইজিদের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠলো। মেহেরুন্নেসা সামনে এগিয়ে এলো এক পা
“আমি যদি নিজে গিয়ে তার সাথে কথা বলি হয়তো সে সাহায্য করবে।”
বাইজিদ কিছুক্ষণ ভেবে চুপ রইলো।
তারপর ধীরে বলল
“এখনই সম্ভব না।”
মেহেরুন্নেসার ভ্রু কুঁচকে গেল।
“আরও দুইদিন পর। তখন তোমায় মহলে নেওয়া যাবে নিরাপদে।”
মেহেরুন্নেসা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর মাথা নাড়লো
“ঠিক আছে।”
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই আবার বললো
“একটা কথা আছে।”
বাইজিদ তাকালো তার দিকে।
মেহেরুন্নেসার কণ্ঠ নিচু হয়ে এলো
“চন্দ্রপ্রভাকে কিছুই জানাবেন না।”
বাইজিদ স্থির হয়ে গেল
“কেন?”
মেহেরুন্নেসার চোখে ক্ষীণ দ্বিধা ঝলসে উঠলো কিন্তু সে সেটা চাপা দিল।
“এখন না। সময় হলে সব বলবো।”
বাইজিদ গভীরভাবে তাকিয়ে রইলো তার দিকে।
তার চোখে প্রশ্ন আছে। কিন্তু সে জোর করলো না শেষমেশ ধীরে মাথা নাড়লো
“ঠিক আছে। কিছুই জানাবো না।”
ভোর হতেই চলে গেলো শাহজাদা। বাইজিদ চলে যাওয়ার পর দুর্গে নেমে এলো এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। দিনটা কেটে গেল স্বাভাবিক নিয়মেই প্রশিক্ষণ, মানুষের আনাগোনা, দূরের পাহারার শব্দ। কিন্তু রাত নামতেই সবকিছু যেন অন্যরকম হয়ে উঠলো। গভীর রাত। দুর্গের এক প্রহরী নিঃশব্দে এসে দাঁড়ালো মেহেরুন্নেসার কক্ষের বাইরে। দরজায় খুব আস্তে আঘাত। মেহেরুন্নেসা চমকে উঠলো। এতো রাতে…?
দরজা খুলতেই প্রহরী মাথা নিচু করে একটা মোড়ানো পত্র এগিয়ে দিল।
“আপনার জন্য”
শুধু এটুকুই বললো সে। মেহেরুন্নেসার বুক ধক করে উঠলো। সে ধীরে পত্রটা হাতে নিল। দরজা বন্ধ করে ভেতরে ফিরে এলো। কক্ষের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো সেই কাগজটার দিকে। তারপর ধীরে ধীরে মোড়ক খুললো সে।
ভেতরে একটা ছোট কাগজ।
আর একটা ধাতব আংটি।
আংটিটা চোখে পড়তেই তার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল।
সে কাঁপা হাতে তুলে নিল সেটা।
এই আংটি…!
এটা তারই। সেদিন যখন মিরান তাকে জঙ্গল থেকে উদ্ধার করে কারাগারে নিয়ে গেছিলো, তার পর থেকে আর এটা পায়নি সে। হয়তো কারাগারেই হাত থেকে খুলে পড়ে গিয়েছিল।
মেহেরুন্নেসার শ্বাস ভারী হয়ে এলো। এর মানে এই পত্র যেই পাঠিয়েছে, সে কারাগারে ছিল
অথবা সেখানে যাতায়াত আছে। তার আঙুল শক্ত হয়ে এলো আংটির ওপর। দ্রুত কাগজটার দিকে তাকালো। সংক্ষিপ্ত লেখা তাতে
“জঙ্গল পেরিয়ে অপর প্রান্তে এসো।
আমি অপেক্ষায় থাকবো বেগম।”
নিচে কোনো নাম নেই। যদিও নামের কোনো দরকারও নেই। মেহেরুন্নেসার চোখ ধীরে সরু হয়ে এলো। এটা মিরান সে নিশ্চিত। এই আংটি এই ভাষা, এই গোপন ডাক এটা অন্য কারও হতে পারে না। মেহেরুন্নেসা কে বেগম বলে ওই একজনই ডাকে।
সে কারাগারে থেকেও যোগাযোগ করছে। মেহেরুন্নেসা ধীরে বসে পড়লো। তার বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ বাড়ছে। এটা ফাঁদও হতে পারে। আবার একমাত্র সুযোগও। সে আংটিটা শক্ত করে মুঠোয় ধরলো। তার চোখে এবার দ্বিধা নেই শুধু সিদ্ধান্ত।
“যেতে হবে”
খুব আস্তে নিজেই বললো সে। তারপর ধীরে উঠে দাঁড়ালো। রাত গভীর হচ্ছে আর সেই অন্ধকারের ভেতরেই লুকিয়ে আছে উত্তর।
দুর্গ পেরিয়ে নিঃশব্দে জঙ্গল অতিক্রম করলো মেহেরুন্নেসা। চাঁদের আলো গাছের ফাঁক দিয়ে পড়ছে, ছায়াগুলোকে আরও রহস্যময় করে তুলছে। তার বুক ধুকপুক করছে, কিন্তু ঘোড়া থামায়নি একবারও।
অবশেষে মহলের পেছনের নির্জন প্রান্তে পৌঁছে সে থেমে গেল। চারপাশ নিস্তব্ধ। হঠাৎ ছায়া থেকে বেরিয়ে এলো কেউ। মেহেরুন্নেসা সতর্ক হয়ে উঠলো। কোমড়ে থাকা ছোট্ট লোহার খাপ থেকে ধারালো বাঁকানো ছুরি টা বের করলো। কিন্তু পরের মুহূর্তেই তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
“মিরান…?”
সে যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না। এ কি সেই কারাগারের মিরান? না। এই নারী সম্পূর্ণ ভিন্ন।
কয়েদির মলিন চেহারা নেই, ছেঁড়া পোশাক নেই।
বরং পরনে নিখুঁত, দামী পোষাক অদ্ভুত রুচিশীল, গাঢ় রঙের কাপড়ে মোড়া। চুলগুলো সাজানো, চোখে তীক্ষ্ণ আত্মবিশ্বাস। একেবারে অন্য মানুষ।
মেহেরুন্নেসা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।
মিরান ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টানলো
“চিনতে পারছো না?”
মেহেরুন্নেসা ধীরে বললো
“তুমি… এখানে? এভাবে?”
মিরান এগিয়ে এলো
“সময় কম, চলো।”
কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে সে হাঁটা শুরু করলো উত্তরের দিকে। মেহেরুন্নেসা এক মুহূর্ত দেরি করলো, তারপর তার পিছু নিল। জঙ্গল ঘন হতে লাগলো। পথ ক্রমে আরও নির্জন। অবশেষে মেহেরুন্নেসা আর না পেরে বললো
“আমরা কোথায় যাচ্ছি?”
মিরান থামলো না।
“উত্তরের দিকে।”
“কেন?”
এবার প্রশ্নে তাড়াহুড়ো। মিরান একটু ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো তার চোখে অদ্ভুত এক ঝিলিক।
“আজ একটা সুযোগ আছে।”
“কিসের সুযোগ?”
মিরান এবার ধীরে বললো
“তোমার ননদ কে খোঁজার।”
মেহেরুন্নেসার পা থেমে গেল এক মুহূর্তের জন্য।
“কি বলছো তুমি?”
মিরান থামলো না, শুধু বললো
“গতরাতে অঙ্কুর এসেছিলো আমার কাছে।”
মেহেরুন্নেসার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল
“কারাগারে?”
“হ্যাঁ।”
মিরানের কণ্ঠ শান্ত, কিন্তু ভেতরে লুকানো তীক্ষ্ণতা স্পষ্ট
“তার শরীরে আমি একটা গন্ধ পেয়েছি।”
মেহেরুন্নেসা এগিয়ে এলো
“কিসের গন্ধ?”
মিরান সরাসরি তাকালো তার দিকে
“নারীর।”
জঙ্গলের বাতাসও যেন থেমে গেল। মেহেরুন্নেসার গলা শুকিয়ে এলো
“তাতে কি…?”
মিরান এবার থেমে দাঁড়ালো।
“অঙ্কুর নিজের চারপাশে কাউকে রাখে না… যদি না তার দরকার হয়।”
তার চোখ গাঢ় হয়ে উঠলো
“আর যদি কোনো নারী তার কাছে থাকে”
সে ধীরে বললো
“তাহলে সেটা সাধারণ কেউ না।”
মেহেরুন্নেসার বুক কেঁপে উঠলো।
“তুমি বলতে চাও…..”
“হতে পারে, অর্ষা ওখানেই আছে।”
নীরবতা আবার ঘিরে ধরলো দুজনকে। মেহেরুন্নেসা শক্ত করে মুঠো বাঁধলো। জঙ্গল পেরিয়ে ধীরে ধীরে তারা পৌঁছালো উত্তরের প্রাসাদের সামনে। চাঁদের আলোয় বিশাল প্রাসাদটা যেন মৃত কোনো দৈত্যের মতো দাঁড়িয়ে আছে নিস্তব্ধ, অন্ধকার, অথচ ভয় জাগানো।
মেহেরুন্নেসার বুক কেঁপে উঠলো। মনে পড়লো বাইজিদ এর বলা কথা গুলো। ওই মানুষ খেকো গুলো যদি এখন বেড়িয়ে আসে? ভয়ে ভয়ে বলল
“এটা… এত চুপচাপ কেন?”
মিরান একবার চারপাশে তাকালো। তার চোখে যেন কিছু বোঝার ছাপ ফুটে উঠলো, কিন্তু সে কিছুই বললো না।
“চলো”
প্রাসাদের ভেতরে ঢুকতেই একটা তীব্র, অচেনা গন্ধ আঘাত করলো নাকে। মেহেরুন্নেসা নাক কুঁচকালো।
“এটা কিসের গন্ধ…?”
“বিভিন্ন রাসায়নিক সামগ্রীর”
সংক্ষিপ্ত উত্তর মিরানের।
ভেতরে আরও এগোতেই তারা থমকে গেল। প্রাসাদটা ফাঁকা। অস্বাভাবিক রকম ফাঁকা।
না কোনো প্রহরী, না কোনো মানুষের শব্দ।
কিন্তু সবকিছু এলোমেলো না। বরং এমনভাবে পড়ে আছে, যেন একটু আগেই কেউ কাজ করছিল এখানে। মিরানের চোখে ক্ষীণ এক সন্দেহের রেখা ফুটে উঠলো। সে বুঝলো কিছু।
কিন্তু মেহেরুন্নেসাকে কিছুই জানালো না।
মেহেরুন্নেসা ধীরে এগিয়ে গেল এক টেবিলের দিকে। সেখানে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য কাচের শিশি।
কেউ লম্বা সরু, কেউ গোলাকার, কেউ আবার নিচে চওড়া মুখ সরু। প্রতিটা শিশির ভেতরে ভিন্ন ভিন্ন রঙের তরল গাঢ় নীল, রক্তিম লাল, হালকা সবুজ, আর কুয়াশার মতো সাদা।
পাশেই পড়ে আছে সূক্ষ্ম সূচ, ধাতব কাঁচি, বিভিন্ন মাপের ছুরি, আর অদ্ভুত আকৃতির যন্ত্র
কিছু বাঁকানো, কিছু চিমটির মতো, কিছু আবার নলের মতো লম্বা।
মেহেরুন্নেসার গা শিউরে উঠলো।
“এগুলো… মানুষ কি কাজে ব্যবহার করতো?”
তার গলা শুকিয়ে গেল। মিরান কিছু বললো না। আরেকটা টেবিলের দিকে এগিয়ে যেতেই দেখা গেল আরও গোছানো এক জগৎ।
কাগজে ভরা হিসাব কোনোটা অদ্ভুত চিহ্ন, কোনোটা অজানা ভাষা। পাশেই কয়েকটা কাচের পাত্রে ধীরে ধীরে ফুটছে কিছু তরল।
একটা পাত্রে হালকা সবুজ তরল থেকে ধোঁয়া উঠছে।
তার ভেতরে মেশানো হয়েছে গাঢ় নীল রঙের আরেকটি দ্রবণ। মিরান নিচু হয়ে তাকালো
“এটা সম্ভবত কপার সালফেট আর কোনো ভেষজ নির্যাসের মিশ্রণ”
মেহেরুন্নেসা তাকিয়ে রইলো।
“দেখছো?”
মিরান দেখালো,
“মেশানোর পর রঙ বদলে যাচ্ছে… আর তাপ তৈরি হচ্ছে।”
আরেক পাশে একটা কাচের নলের ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে পড়ছে স্বচ্ছ তরল, নিচে থাকা লালচে দ্রবণে।
“এটা এসিড আর ক্ষার (Acid–Base) বিক্রিয়া” বললো মিরান,
“সম্ভবত নাইট্রিক অ্যাসিড আর কোনো ক্ষারীয় পদার্থ।”
নিচের পাত্রে তখন বুদবুদ উঠছেবএকটা নতুন বর্ণ তৈরি হচ্ছে, কমলা রঙের। মেহেরুন্নেসার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। আরেকটা টেবিলে কিছু শুকনো ভেষজ গুঁড়া করা, তার সাথে মেশানো হচ্ছে হলুদাভ এক তরল।
“এটা সালফার (Sulfur) জাতীয় কিছু,”
বললো মিরান
“শরীরের ভেতর উত্তাপ বাড়াতে ব্যবহার হতে পারে।”
পাশেই একটা পাত্রে ঘন কালচে তরল, তার ভেতরে ফেলা হয়েছে সাদা স্ফটিকের মতো পদার্থ। মুহূর্তেই তা গলে গিয়ে গাঢ় ধোঁয়া ছাড়তে লাগলো।
“এগুলো… শরীরের ওপর প্রয়োগ করা হতো?” কাঁপা গলায় বললো মেহেরুন্নেসা।
মিরান এবার ধীরে বললো
“হ্যাঁ… এবং একটার সাথে আরেকটার বিক্রিয়ায় নতুন কিছু তৈরি হতো।”
সে একটা কাগজ তুলে দেখালো
“এখানে লেখা ‘মিশ্রণ-৭’… সম্ভবত কয়েকটা রাসায়নিক একসাথে মিশিয়ে শক্তি বাড়ানোর চেষ্টা।”
মেহেরুন্নেসার গা কাঁপতে লাগলো।
“মানে… তারা মানুষকে বদলে দিতে চেয়েছে এসব দিয়ে…”
মিরান তাকালো চারপাশে।
“শুধু বদলানো না,নতুন কিছু বানাতে চেয়েছে।”
প্রাসাদের ভেতর নীরবতা আরও গভীর হয়ে উঠলো। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা যন্ত্র, তরল, আর অদ্ভুত বিক্রিয়াগুলো সব মিলিয়ে যেন এক ভয়ংকর সত্যি চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
মেহেরুন্নেসা ধীরে ফিসফিস করে বললো
“এটা কোনো প্রাসাদ না… এটা এক বিভীষিকার জন্মস্থান…”
প্রাসাদের ভেতরে যত এগোচ্ছে তারা, ততই ঘন হয়ে উঠছে সেই অদ্ভুত গন্ধ। একটা বড় টেবিলের সামনে এসে থামলো মেহেরুন্নেসা। সেখানে সারি সারি কাচের শিশি। কেউ ধোঁয়া ছাড়ছে, কেউ স্থির, কেউ আবার নিজে নিজেই রঙ বদলাচ্ছে।
সে একটার দিকে হাত বাড়াতেই মিরান থামালো
“ছুঁইয়ো না।”
মেহেরুন্নেসা তাকালো। মিরান একটা লম্বা সরু শিশি তুলে ধরলো ভেতরে স্বচ্ছ তরল।
“এটা নাইট্রিক অ্যাসিড। চামড়ায় লাগলে জ্বালিয়ে দেয়। ধাতু পর্যন্ত ক্ষয় করতে পারে।”
মেহেরুন্নেসার হাত সরে গেল তৎক্ষণাৎ। আরেকটা বোতল হালকা হলুদাভ।
“এটা সালফিউরিক অ্যাসিড”
মিরান ব্যাখ্যা করলো,
“শরীরের জল শুষে নেয়… ভেতরের গঠন নষ্ট করে দেয়।”
মেহেরুন্নেসার গা শিউরে উঠলো।
“এগুলো ওরা তৈরি করে?”
তার গলা কেঁপে উঠলো। মিরান সরাসরি উত্তর দিল না।;আরেকটা ছোট শিশি তুলে ধরলো। সবুজাভ রঙ।
“হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড, খুব শক্তিশালী না, কিন্তু অন্য কিছুর সাথে মিশলে মারাত্মক বিক্রিয়া করে।”
পাশেই একটা ধাতব পাত্রে সাদা গুঁড়া
“এটা ক্ষারীয় পদার্থ, এসিডের সাথে মিশলে তাপ, বাষ্প সব তৈরি হয়।”
মেহেরুন্নেসা ধীরে চারপাশে তাকালো
“এরা… এগুলো দিয়ে কি করতো?”
মিরান নিচু গলায় বললো
“শরীর ভাঙতো… আবার গড়তো।”
একটা নীরবতা নেমে এলো। তারপর মিরান সোজা হয়ে দাঁড়ালো
“চলো। অর্ষাকে খুঁজতে হবে।”
কয়েকটা শিশি নিয়েও নিলে একটা ছোট কালো থলিতে। কে জানে কি করবে এগুলে দিয়ে। কিন্তু মেহেরুন্নেসা ভীষণ রকম আশ্চর্য হচ্ছে এই ভেবে যে, মিরান এত কিছু কি করে জানে। দেখে দেখেই সব কিছুর নাম কার্যকরীতা বলে দিচ্ছে?
তারা ভেতরের দিকের করিডর ধরে এগোতে লাগলো। প্রতিটা দরজা খোলা কিন্তু কোথাও কেউ নেই। মেহেরুন্নেসা চারিদিকে তাকিয়ে বলল
“এরা সবাই গেছে কোথায়?”
মিরান পিছনে না ফিরেই বলল
“কেন শাহজাদা তোমায় এটা বলে নি?”
“কোনটা?”
“অঙ্কুর সবাইকে ধরে নিয়ে গেছে নদী অঞ্চলে। দিনেমার বিজ্ঞানী দের কাছে উপকরণ / উপাদান বিক্রি করবে। সেগুলো তো তাদের বুঝিয়ে দিতে হবে। যারা এগুলো তৈরি করেছে তারা ছাড়া বুঝাবে কে?”
মেহেরুন্নেসা অল্প এগিয়ে এলো
“হ্যা কিন্তু তাদের এখানে আনলেও তো পারতো। বিজ্ঞানী দের কেন ওখানে নিয়ে গেল?”
মিরান হাসলো
“অঙ্কুর এত বোকা না যে ওদের কে নিজের ডেরা চেনাবে”
“আর সেই ওষুধ প্রয়োগ করা বিকৃত মানুষ গুলো কোথায়? তাদেরও কি নিয়ে গেছে?”
মিরান একটা মাটির ঘটি উল্টে পাল্টে দেখছে
“নাহহ। ওদের এই মহলে রাখা হয় না। ওরা সামনের ওই সরু ভবন টায়। ওদের জন্য তোমার ছোট ননদী একাই যথেষ্ট।”
মেহেরুন্নেসাও কিছুটা আঁচ করেছিলো। মনে মনে কৃতজ্ঞ হলো মেয়েটার সাহস দেখে। নিজের প্রাণের পরোয়া না করে মাঝরাতে ছুটে আসে দানব গুলো কে আটকাতে। যাতে সাধারণ মানুষের ক্ষতি না করে তারা।
অবশেষে একটা ছোট কক্ষের সামনে এসে থামলো তারা। দরজাটা আধখোলা।
ভেতরে ঢুকতেই মেহেরুন্নেসার পা থেমে গেল।
ঘরের মাঝখানে একটা একাকী কাঠের চেয়ার।
চেয়ারের হাতল আর পায়ের কাছে শক্ত করে বাঁধা দড়ি। এমনভাবে জড়ানো, যেন কেউ সেখানে বসে বন্দি ছিল অনেকক্ষণ। মেঝেতে দড়ির ঘষার দাগ।
“এখানে… কেউ ছিল…
মিরান কিছু বললো না, শুধু চারপাশে নজর বুলালো। পাশেই একটা ছোট টেবিল। তার ওপর মখমলের গিলাফ বিছানো। তার ওপর রাখা কয়েকটা অলংকার। গলার হার, কানের দুল, আর কয়েকটা আংটি।
মেহেরুন্নেসা ধীরে এগিয়ে গেল। হাত বাড়িয়ে একটা আংটি তুলে নিল।
পরের মুহূর্তেই সে স্থির হয়ে গেল। তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠলো।
“এটা…!”
তার কণ্ঠ কেঁপে উঠলো। মিরান তাকালো
“কি হয়েছে?”
মেহেরুন্নেসা আংটিটা তুলে ধরলো।
“এই আংটি, একই রকম… আমার কাছেও আছে…”
তার হাত ধীরে নিজের আঙুলের আংটির ওপর গেল। একই নকশা। একই ধাতু। একই খোদাই।
তার শ্বাস ভারী হয়ে এলো।
“আর…চন্দ্রপ্রভার হাতেও আছে ঠিক এমন একটা।”
সেই সময় পিছন থেকে ভেসে আসলো এক দরাজ কন্ঠের গমগমে হাসি
“আরে সুন্দরী আজ নিজেই এসেছে আমার ডেরায়। কী কপাল আমার”
পেইজের রিচ তো চাঙ্গে। এমন হলে আমার লেখায় মন ই বসে না। তোমরা গল্প পড়ো অনেকেই। কিন্তু সবাাি রিয়্যাক্ট দাও না 🙃
বিষয়টা আমার অনেক খারাপ লাগে। রিয়্যাক্ট দিয়ে একটা গঠনমূলক কমেন্ট করবা। আমার উৎসাহ অনেক বাড়ে এতে। কেমন হলো জানিও। আর নন ফলোয়ার যারা আছো ফলো দিয়ে দিও।
গল্প তাদের কাছেই আগে পৌছায় যারা রিয়্যাক্ট কমেন্ট করে। অনেকেই দেখি বলে গল্প খুঁজে পায় না। গল্পটা হারিয়ে না ফেলতে পেইজে ফলো দিয়ে রাখো। 💟
Share On:
TAGS: জান্নাতুল ফেরদৌস, নূর এ সাহাবাদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১২
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৩৪ এর প্রথমাংশ
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ২
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৭
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৬(প্রথমাংশ +শেষাংশ)
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১৫
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৩
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৩৯ এর প্রথমাংশ
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১২
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩১