Golpo romantic golpo নূর এ সাহাবাদ

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৩৫


jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

পর্ব – ৩৫

মেহেরুন্নেসা এক নাগাড়ে বেশ কিছুক্ষণ বকবক করে এবার কেঁদে ফেলল। বাইজিদ আগের মতই স্থির। একদৃষ্টে চেয়ে আছে প্রিয়তমার মুখ পানে। শক্ত গলায় বলল
“শুধু একবার বলো, তুমি বিশ্বাস করেছো যে আমি তোমাকে রেখে দ্বিতীয় বিবাহ করছি। আমি এই মূহুর্তে এখান থেকে চলে যাব আর কক্ষনো আসবো না তোমার সামনে। জীবনেও দেখবে না আমার কায়া। কায়া তো দূর ছায়াও দেখবে না। শুধু একবার বলো যে তুমি বিশ্বাস করেছো”

মেহেরুন্নেসা মাথা নিচু করে হেঁচকি তুলে তুলে কাঁদছে। বাইজি ভ্রু গুটায়
“উত্তর দাও। চুপ থাকলে কিন্তু আমি হ্যা ভেবে নিব। তাহলে হ্যা ই ভেবে নিই?”

“নাআআ”
এক ছুটে গিয়ে ঝাপিয়ে পড়লো বাইজিদ এর বুকে। বাইজিদ অল্প একটু পিছিয়ে তাকে সামলে নিল। ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি। স্বামীর বুকে মুখ গুজে রমণীর কান্নার তোপ আরো বাড়লো।
“কোথায় ছিলেন এই ক’দিন। আপনি জানেন না আমি আপনাকে ছাড়া থাকতে পারি না। কেন আসেননি আপনি?”

কান্নার দরুন কথাগুলো অস্পষ্ট শোনায়।
“আপনি ভীষণ পাষাণ লোক। আসবেন কেন? মহল থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার সময়ই তো জানতেন আর দেখা হবে না আমাদের। আপনি একটু….একটুও ভালো বাসেন না আ…আমায়”

কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি উঠে গেছে তার। বাইজিদ চুপচাপ দেখলো প্রিয়তমার পাগলামি। এ ক’দিন সেও যেমন যন্ত্রণা পেয়েছে। তার স্ত্রী ও তা পেয়েছে। ঘর থেকে খ্যাক খ্যাক করতে করতে বেড়িয়ে এলো মল্লিকা।
“বলি উঠোন ঝাড়ু দিতে কত সময় লাগে? রাত যে হয়ে আসছে। রান্না চাপাবি না। এটা কি তোমার জমিদার শশুর বাড়ি পেয়েছ……”

উঠোনে বাইজিদ কে দেখেই চোখ ছানাবড়া মল্লিকার। মেহেরুন্নেসা কে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে আছে লম্বা চওড়া একজন বীর। তারই সামনে তার স্ত্রী কে কথা শোনাচ্ছিল। এবারে গর্দান টা থাকলে হয়।

বাইজিদ কটমট করে তাকালো মল্লিকার দিকে। মল্লিকা ভয়ে চুপসে গেছে। বাইজিদ এর ঠোঁট নড়লো
“মেহের…..”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই হঠাৎ চারপাশে অস্বাভাবিক শব্দ। ধুপ! ধাপ! দেয়াল টপকে, গাছের আড়াল ভেঙে কয়েকজন মুখোশধারী লোক একসাথে ঢুকে পড়লো উঠোনে। তাদের হাতে অস্ত্র। চোখে স্পষ্ট আক্রমণের ইঙ্গিত। সবকিছু এত দ্রুত ঘটলো যে বুঝে ওঠার সময়ই পেল না কেউ। মেহেরুন্নেসা চমকে পিছিয়ে এলো।
বাইজিদের চোখ মুহূর্তেই বদলে গেলো। সে চারপাশে তাকিয়ে বুঝে গেল এটা কোনো সাধারণ ঘটনা না। আর সে প্রস্তুত হয়ে আসেনি।
সাথে অল্প কিছু লোক, তাও বাইরে। এই হঠাৎ আক্রমণের জন্য সে একেবারেই তৈরি ছিল না।
একজন আক্রমণকারী সামনে এগিয়ে এলো।
আর এক সেকেন্ড দেরি মানেই বিপদ।
বাইজিদ আর কিছু ভাবলো না।
এক ঝটকায় মেহেরুন্নেসার হাত ধরে ফেললো।
“চলো!”
তার কণ্ঠে কোনো দ্বিধা নেই। মেহেরুন্নেসা অবাক হয়ে তাকালো কিন্তু সময় নেই প্রশ্ন করার।
বাইজিদ তাকে টেনে নিয়ে দৌড় দিলো উঠোন পেরিয়ে। পেছন থেকে চিৎকার
“ধরো! পালাতে দিও না!”
অস্ত্রের ঝনঝন শব্দ ভেসে আসছে। মেহেরুন্নেসার পা যেন ঠিকমতো চলছে না, তবুও বাইজিদের টানে সে ছুটে চলেছে। বাড়ির সীমানা পেরিয়ে, কাঁচা পথ ধরে সোজা পাহাড়ের দিকে।
বাতাস কানে শোঁ শোঁ করে লাগছে, শ্বাস ভারী হয়ে উঠছে তবুও থামছে না তারা। পেছনে ধাওয়া করছে সেই দল।
দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎই পিছন থেকে ভেসে এলো পরিচিত এক হ্রেষাধ্বনি। বাইজিদ এক ঝলকে ফিরে তাকালো, সিমুর্গ!
তার শ্বেত অশ্ব, বাতাস চিরে ছুটে আসছে ঠিক তাদের দিকেই। যেন মালিকের বিপদ সে দূর থেকেই টের পেয়েছে।
বাইজিদের চোখে এক মুহূর্তের জন্য স্বস্তির ঝিলিক ফুটে উঠলো।
“সিমুর্গ!”
ঘোড়াটা কাছে আসতেই এক লাফে লাগাম ধরলো সে। সময় নষ্ট না করে মেহেরুন্নেসার দিকে তাকিয়ে বললো
“চড়ো!”
মেহেরুন্নেসা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে তাকে তুলে বসালো সামনে, আর নিজে পেছনে উঠে লাগাম শক্ত করে ধরলো।
“ধরে থাকো!”
এক ঝটকায় সিমুর্গ ছুটে বেরিয়ে গেল। পেছনে ধাওয়া করা লোকগুলো মুহূর্তেই দূরে পড়ে যেতে লাগলো।বকাঁচা পথ, ঝোপঝাড়, উঁচুনিচু জমি কিছুই থামাতে পারলো না তাদের। ঘোড়ার খুরের শব্দ আর বাতাসের তীব্র চাপ সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত তাড়না।

তারা জানে না কোথায় যাচ্ছে। ধীরে ধীরে আলো বদলাতে লাগলো। আকাশে সূর্য ঢলে পড়লো পশ্চিমে, চারদিক গাঢ় কমলা রঙে রাঙিয়ে দিলো।
তারপর অন্ধকার নামতে শুরু করলো। সন্ধ্যা নেমে এলো নিঃশব্দে। ঠিক তখনই দূরে মেঘ জমতে শুরু করলো। বাতাস ভারী হয়ে উঠলো। হঠাৎ করেই ঝড়ের আগাম বার্তা।
এক ঝটকায় ঠান্ডা হাওয়া বয়ে গেল।
“ঝড় আসছে…” ফিসফিস করে বললো মেহেরুন্নেসা।
কথা শেষ হওয়ার আগেই আকাশে বিদ্যুৎ চমকালো। গর্জে উঠলো মেঘ। বাতাসের গতি বাড়তে লাগলো, চারপাশে ধুলা উড়ছে।
এই অবস্থায় এগোনো বিপজ্জনক। বাইজিদ চোখ কুঁচকে সামনে তাকালো
হঠাৎ তার নজরে এলো একটা জায়গা।
ঘাট। নদীর পাড়ে বাঁধা আছে একটা বিশাল নৌকা ছইওয়ালা, মজবুত কাঠের। ঝড়ের আগে আশ্রয়ের জন্য যেন একমাত্র ভরসা।
“ওখানে!”
সে ইশারা করলো। সিমুর্গকে ঘুরিয়ে দ্রুত সেই ঘাটের দিকে ছুটলো। বাতাস তখন আরও তীব্র, বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা পড়া শুরু হয়েছে।
নৌকার কাছে পৌঁছাতেই বাইজিদ দ্রুত নেমে পড়লো। মেহেরুন্নেসাকেও নামতে সাহায্য করলো।
এক মুহূর্ত দেরি না করে তারা দুজন নৌকার ভেতরে উঠে গেলো। ছইয়ের নিচে ঢুকতেই বাইরের ঝড়টা যেন একটু দূরে সরে গেল।
তবুও বাতাসের হু হু শব্দ, বৃষ্টির আঘাত সব শোনা যাচ্ছে। মেহেরুন্নেসা হাঁপাচ্ছে, ভিজে চুল মুখে লেগে আছে। বাইজিদও শ্বাস সামলাচ্ছে।
কয়েক সেকেন্ড শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ।

একই নৌকার ছইয়ের নিচে, এত কাছে তবুও তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে দূরত্ব। ঝড় বাইরে শুরু হয়েছে। নৌকা টা বিশাল আকারের। বাইরে তখন ঝড় পুরোপুরি নেমে এসেছে। বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা ছইয়ের উপর আছড়ে পড়ছে, বাতাসে নৌকাটা হালকা দুলে উঠছে। দূরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, তার আলোয় মাঝে মাঝে ভেতরটা ঝলসে উঠছে।

ছইয়ের নিচে দাঁড়িয়ে আছে দুজন। ভেজা কাপড়, দ্রুত শ্বাস কিন্তু তার চেয়েও বেশি ভারী তাদের মাঝের নীরবতা। বাইজিদ তাকিয়ে আছে মেহেরুন্নেসার দিকে।
এতদিন পর এত কাছে তার চোখে জমে থাকা সব কথা যেন বের হতে চাইছে, কিন্তু শব্দ খুঁজে পাচ্ছে না। মেহেরুন্নেসা চোখ নামিয়ে রেখেছে। বুকের ভেতরটা কাঁপছে, নিজেকে সামলে রাখার চেষ্টা করছে।
হঠাৎ বাইজিদ ধীরে এক পা এগিয়ে এলো।
“কেন…?”
তার কণ্ঠ নিচু, ভারী,
“কেন আমার দিকে তাকাচ্ছো না?”
মেহেরুন্নেসা চুপ। বৃষ্টি আরও জোরে নামতে লাগলো।
“আমি এসেছি…”
আবার বললো বাইজিদ, এবার একটু ভাঙা গলায়,
“সব ছেড়ে সব উপেক্ষা করে শুধু তোমার জন্য…”
মেহেরুন্নেসার ঠোঁট কেঁপে উঠলো।
সে ধীরে মুখ তুললো। চোখ ভেজা, বৃষ্টি নাকি জমে থাকা কান্না বোঝা গেল না।
“ইচ্ছে করছে না তাকাতে”
খুব আস্তে বললো সে। বাইজিদ যেন আঘাত পেলো।
“কি?” সে বিস্ময়ে তাকালো।
“সবাই বলছে আপনি আমাকে ফেলে আরেকটা বিয়ে করছেন…”
সব পরিষ্কার হয়ে গেলো বাইজিদের কাছে।
তারা দুজনেই কারো নোংরা চাল এর শিকার। সেও যে এমন খবর পেয়েছে তা জানালো না মেহেরুন্নেসা কে।

বাইজিদ আর নিজেকে আটকাতে পারলো না।
সে এগিয়ে এসে খুব আস্তে তার দুহাত ধরে ফেললো।
সেই নরম হাত ফোসকায় ভরা। তার চোখে ব্যথার ছায়া ফুটে উঠলো।
“এগুলো…?”
ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো সে। মেহেরুন্নেসা আর কিছু বললো না। শুধু চোখ নামিয়ে রাখলো।
বাইরে বজ্রপাত হলো।
বাইজিদ ধীরে ধীরে তাকে নিজের কাছে টেনে নিলো। মেহেরুন্নেসা প্রথমে থমকে গেলো তারপর নিজেও আর দূরে থাকতে পারলো না।
সে মুখ লুকিয়ে দিলো বাইজিদের বুকে।

বাইজিদের হাত শক্ত হয়ে উঠলো তার চারপাশে।
“আর দূরে যেতে দিব না”
সে খুব আস্তে বললো। মেহেরুন্নেসা চোখ বন্ধ করে রইলো। বাইজিদ তার শরীরে হাত দিয়ে বলল
“ভিজে গেছো তো। এই ঠান্ডা লেগে যাবে এভাবে থাকলে।”

মেহেরুন্নেসা নিজের দিকে চোখ বুলিয়ে বলল
“তো কি করবো। এখানে তো আর বস্ত্র নিয়ে আসিনি।”

এমন সময় নৌকায় কারো ধুপধাপ পায়ের শব্দ পাওয়া যায়। বাইজিদ মেহেরুন্নেসা কে নিজের পিছনে লুকিয়ে নেয় টেনে। একজন মধ্য বয়সী পুরুষ নোকায় আসে হারিকেন হাতে। বাইরে বৃষ্টি অনেকটা কমেছে।
“কে রে আমার নৌকায়?”

হারিকেন উঁচু করতেই বাইজিদ এর চেহারা দৃশ্যমান হয়। পান্নার ন্যায় সবুজ চোখ জোড়া যেন জ্বলে ওঠে। লোকটা হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে
“শাহজাদা সালাম। আপনি? এই সময় এখানে?”

বাইজিদ বুঝে এটা তাদেরই প্রজা। শান্ত কন্ঠে বলে
“আমরা একটা বিপদে পড়েছি। আজ রাতটা ঝড় থেকে বাঁচতে এই নৌকায় উঠেছি। ভোর হলেই মহলে ফিরে যাব।”

“কিন্তু আপনি তো ভিজে গেছেন শাহজাদা। সাথে নিশ্চয়ই মা বেগম? আমি পোষাক এর ব্যাবসাই করি এই নৌকা দিয়ে। ওই বাক্স দুইটা ভর্তি পোষাক আছে। আপনাদের যা যা লাগে নিন। আমি ঘরে ফিরে যাচ্ছি না হয়। আমার ঘরে আপনারা থাকতে পারবেন না। তা না হলে….”

“তার কোনো প্রয়োজন নেই। আমরা এখানেই ঠিক আছি।”
পকেট থেকে একটা লাল থলি বের করে লোকটাকে দিয়ে বলল
“এই নাও। পোষাকের দাম”

“কিন্তু এ তো অনেক শাহজাদা। আর আমি….”

“রেখে দাও”
লোকটা থলি টা কপালে ঠেকিয়ে বেড়িয়ে গেলো। নৌকায় থাকা হারিকেন টাও জ্বালিয়ে দিয়ে গেলো। বাক্স দুইটা খুলে দেখলো আসলেই অনেক পোষাক। তবে মেয়ে পোষাক বলতে সব শাড়ি। বাইজিদ টকটকে সিঁদুর রঙা একখানা শাড়ি বের করে দিলো মেহেরুন্নেসা কে। বাইরে ঝরের দাপট বাড়ছে চাদরও পাওয়া গেলো সেখানে। কয়েকটা পুরো করে বিছিয়ে দিলো বাইজিদ। মেহেরুন্নেসা ঠান্ডায় কাপছে
“কি হলো পোষাক পাল্টাও। কাপছো তো শীতে”

মেহেরুন্নেসা মাথা নিচু করে বলল।
“আ…..আপনি আগে বাইরে যান”
বাইজিদ বাহিরে উঁকি দিয়ে বলল
“বাইরে ঝড়ের গতি দেখেছো? মারবে নাকি?”

মেহেরুন্নেসা ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো। শাড়িটা হাতে নিয়ে। বাইজিদ মুচকি হেসে এগিয়ে গেলো তার কাছে। ভেজা ওষ্ঠে নিজের বৃদ্ধাঙ্গুল ছুঁইয়ে বলল
“আমার মেহের আমার কাছেও লজ্জা পায়? আমি না স্বামী”

মেহেরুন্নেসা মাথা নিচু করে ফেলে আরো। বাইজিদ অল্প একটু দূরে সরে বলে।
“ছই এর পর্দা নামিয়ে দাও”

বাইজিদ নিজের পাশের টা নামায়। অপর পাশের টা মেহেরুন্নেসা নামায়। চটের পর্দা। ভেদ করে বৃষ্টি ভিতরে আসে না। বাইজিদ হারিকেন এর আচ কমিয়ে বলল
“এবার বদলাতে পারো তোমার পোষাক”

“আপনি ওই দিকে ফিরুন”

বাইজিদ হেসে সত্যিই উল্টো দিকে ফিরলো। নিজের পরনের পাঞ্জাবি টাও খুলল। পায়জামা টা ভিজেনি অত। উদাম গায়ে তার পেশিবহুল দেহ যেন নজরকাড়া। তবে বেশিক্ষণ উল্টো ঘুরে থাকলো না। তার অবাধ্য চোখ স্ত্রীর দিকে ঠিকই গেলো। শুকনো ঢোক গিলল পুরুষ টা। এমন অপরুপা রমনী তার স্ত্রী। হারিকেন এর হলুদ আলোয় মেহেরুন্নেসা কে যেন হুরপরীর ন্যায় সুন্দর দেখাচ্ছিলো বাইজিদ এর চোখে। ভেজা কাপড় গুলো ছই এর ভিতরেই মেলে দিলো। চাদরের ওপর বসতেই বাইজিদ তাকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো। আরেকটা চাদর দিয়ে ঢেকে নিলো দুজন কে। এবার একটু শীত কমলো মেহের এর। গুটিয়ে রইলো বাইজিদ এর বুকে।

ভোরের আলো ধীরে ধীরে ছইয়ের ফাঁক গলে ভেতরে ঢুকলো। ঝড় থেমে গেছে অনেক আগেই। বাইরে শুধু ভেজা মাটির গন্ধ, নদীর শান্ত স্রোত আর পাখির ডাকার শব্দ। মেহেরুন্নেসার ঘুম ভাঙলো প্রথমে।
চোখ খুলতেই সে বুঝতে পারলো সে শুয়ে আছে বাইজিদের বুকে। তার হাত এখনো আলতো করে জড়িয়ে আছে তাকে। এক মুহূর্তের জন্য সে স্থির হয়ে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে মাথা তুললো।
বাইজিদও তখন চোখ খুললো। দুজনের চোখে চোখ পড়লো। কেউ কিছু বললো না। শুধু ধীরে ধীরে উঠে বসল তারা। মেহেরুন্নেসা চাদর নিজের গায়ে পেচিয়ে, জড়িয়ে রেখেছে। গতরাতে কাচা হাতে পড়া সিঁদুর রঙা শাড়ি টা পর্দার পাশে পড়ে আছে। মেহেরুন্নেসা লজ্জায় মিইয়ে গেল গতরাতের কথা মনে উঠতেই। বাইজিদ আগে বেড়োলো যাতে মেহেরুন্নেসা অস্বস্তি তে না পড়ে। বাইজিদ যেতেই মেহেরুন্নেসা পোষাক পরে নিলো

তারপর বেড়িয়ে এলো ছই থেকে। নৌকা থেকে নেমে নদীর ধারে গেলো দুজন। ঠান্ডা পানিতে হাত-মুখ ধুয়ে নিলো। রাতের ক্লান্তি কিছুটা কেটে গেলো। মেহেরুন্নেসা ভেজা চুলগুলো ঠিক করতে করতে তাকালো বাইজিদের দিকে। সে তখন চারপাশে কিছু খুঁজছে।
“তুমি এখানেই থাকো”

বলে সে পাশের ঝোপঝাড়ের দিকে চলে গেলো।
কিছুক্ষণ পর ফিরে এলো, হাতে কয়েকটা বন্য ফলমূল।
“এইগুলো একদম তাজা। নাও খেয়ে নাও”
মেহেরুন্নেসা একটু হেসে নিলো। দুজন পাশাপাশি বসে সেগুলো খেতে লাগলো। খুব সাধারণ খাবার তবুও সেই মুহূর্তে যেন অনেকদিন পর একসাথে বসে থাকার শান্তি বেশি মূল্যবান।
খাওয়া শেষ করে তারা আবার উঠে দাঁড়ালো।
“চলো,” বললো বাইজিদ।
নদীর ধার ধরে, ভেজা মাটির পথ পেরিয়ে তারা সামনে এগোতে লাগলো। চারপাশে অচেনা পরিবেশ কোথায় যাচ্ছে তারা, সেটা কেউই নিশ্চিত না। তবুও এগিয়ে চলা ছাড়া উপায় নেই।
কিছুদূর যাওয়ার পর হঠাৎই সামনে কিছু একটা দেখা গেল। দুজনই থেমে গেলো।
গাছপালার ফাঁক দিয়ে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠলো একটা বিশাল স্থাপনা। উঁচু দেয়াল, ভাঙাচোরা গেট, লতাপাতায় ঢাকা চারদিক একটা দুর্গ। অথবা পুরনো কোনো জমিদার বাড়ি। অনেকদিন ধরে পরিত্যক্ত।

চারপাশে নিস্তব্ধতা এমন যে মনে হচ্ছে জায়গাটা নিজেই কোনো রহস্য লুকিয়ে রেখেছে।
মেহেরুন্নেসা ধীরে বললো
“এখানে কেউ থাকে?”
বাইজিদ চোখ সরু করে তাকিয়ে রইলো।
“মনে হয় না”
তার কণ্ঠে সতর্কতা।
কিন্তু সেই বিশাল, নির্জন জায়গাটা যেন তাদের ডেকে নিচ্ছে কোনো অজানা কারণে। মেহেরুন্নেসা কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইলো প্রাসাদের দিকে।
তার কপাল ধীরে ধীরে কুঁচকে এলো।
“এটা আবার কেমন জায়গা ?” খুব আস্তে বললো সে।
তার চোখে স্পষ্ট অস্বস্তি।
“এত বড় অথচ একদম শুনশান কেমন যেন ভয় লাগছে।”
চারপাশে এমন নিস্তব্ধতা, যেন শব্দ করতেও ভয় লাগে। বাতাসে এক ধরনের ঠান্ডা শূন্যতা গা শিউরে ওঠার মতো।
সে ধীরে বাইজিদের দিকে তাকালো
“এই জায়গাটা কী?”
বাইজিদ তখনও প্রাসাদের দিকে গভীর মনোযোগে তাকিয়ে আছে। তার চোখে চিন্তার ছাপ, যেন অতীতের কোনো স্মৃতি ভেসে উঠছে।
কিছুক্ষণ পর সে ধীরে বললো
“এটা নাসিরাবাদ প্রাসাদ।”
মেহেরুন্নেসার দৃষ্টি আবার প্রাসাদের দিকে ফিরলো।
“আমরা নাসিরাবাদের সীমানায় ঢুকে পড়েছি।”
কথাটা শুনে মেহেরুন্নেসা এক মুহূর্ত চুপ করে রইলো। এই তাহলে নাসিরাবাদ। মনে মনে ভাবলো সে।
এই নামটা সে শুনেছে। কিন্তু কখনো এভাবে সামনে এসে দাঁড়াবে, তা ভাবেনি। বাইজিদ আবার বললো
“শেষবার এখানে এসেছিলাম… আট বছর আগে।”
তার কণ্ঠে স্মৃতির ভার।
“তখন জায়গাটা এমন ছিল না। চারদিকে আলো, মানুষ, আড়ম্বর… জৌলুসে ভরা ছিল পুরো প্রাসাদ।”
মেহেরুন্নেসা ধীরে তার দিকে তাকালো। তার চোখে তখন অন্যরকম এক দৃষ্টি। হালকা ঠোঁট বাঁকিয়ে সে বললো
“বিয়ে করতে এসেছিলেন?”
বাইজিদের চোখ হঠাৎ বড় হয়ে গেলো। সে যেন থমকে গেলো একদম।
“কি…?”
তার কণ্ঠে বিস্ময় স্পষ্ট। মেহেরুন্নেসা শান্ত চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। বাইজিদের ভেতরটা কেঁপে উঠলো। সে জানলো কী করে…?
তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেলো অবাক, সতর্ক, আর একটু অস্বস্তি মেশানো।
কারণ এই কথাটা মেহেরুন্নেসার জানার কথা না। বাইজিদ এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল।
তার চোখ এখনো বিস্ময়ে বড় হয়ে আছে।
“তুমি… জানলে কী করে?”
জিজ্ঞেস করলো সে। তার কণ্ঠে সন্দেহ আর অবাক হওয়ার মিশ্রণ। মেহেরুন্নেসা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তাকিয়ে রইলো। তারপর হালকা হেসে ফেললো।
“দুষ্টুমি করলাম”
খুব স্বাভাবিক গলায় বললো সে। একটু থেমে আবার যোগ করলো
“আমি কি কোনো শাহজাদি নাকি যে আপনি জমিদার প্রাসাদে বিয়ে করতে আসবেন?”

তার হাসিটা ছিল হালকা, সহজ যেন কথাটা একদমই গুরুত্বহীন। বাইজিদ তাকিয়ে রইলো।
তার ভ্রু কুঁচকে আছে, কিন্তু এবারও সে পুরো বিষয়টা ধরতে পারলো না। মেহেরুন্নেসার এই সহজ উত্তর তার ভেতরের অস্বস্তিটা কিছুটা ঢেকে দিলো। সে চোখ সরিয়ে নিলো প্রাসাদের দিক থেকে।
“চলো,”
ধীরে বললো বাইজিদ। মেহেরুন্নেসা একটু অবাক হয়ে তাকালো।
“কোথায়?”
বাইজিদ এক মুহূর্ত চুপ করে রইলো। তারপর সামনে অচেনা পথটার দিকে তাকিয়ে বললো
“তোমায় একটা জায়গা দেখাবো।”

মেহেরুন্নেসা তার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ।
এই মানুষটা সবসময়ই হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেয়, হঠাৎ বদলে যায়কখনো কাছে টানে। তবুও সে কিছু বললো না। ধীরে মাথা নেড়ে সায় দিলো।
“চলুন তাহলে।”
দুজন আবার হাঁটা শুরু করলো।
নাসিরাবাদ প্রাসাদটা পেছনে পড়ে রইলো ভাঙা, নিস্তব্ধ, রহস্যে মোড়া এক বিশাল ছায়ার মতো।
সামনে পথটা সরু হয়ে গেছে, দুপাশে গাছের সারি, আর দূরে পাহাড়ের রেখা। বাতাস হালকা শীতল। মেহেরুন্নেসা একটু এগিয়ে হাঁটছে, মাঝে মাঝে চারপাশ দেখছে। বাইজিদ তার পাশে, কিন্তু একটু দূরত্ব রেখে।
তবুও এই নীরব হাঁটায় একটা অদ্ভুত টান আছে।
যেন ঝড়ের পরেও কিছুটা শান্তি এখনো বাকি আছে। আর সেই শান্তির ভেতরেই দুজন আবার অজানা পথে এগিয়ে চলেছে। হাঁটতে হাঁটতে তারা ধীরে ধীরে জঙ্গলের ঘন অংশ পেরিয়ে এলো।
চারপাশে লম্বা গাছ, পাতার ফাঁক দিয়ে পড়ে থাকা সূর্যের আলো সব মিলিয়ে পথটা আরও রহস্যময় হয়ে উঠছিল। একটা সময় দূরে দেখা গেল সিমুর্গকে। শ্বেত অশ্বটা তাদের দেখেই হালকা হ্রেষাধ্বনি করলো, যেন অপেক্ষাই করছিল।
বাইজিদ এগিয়ে গিয়ে লাগাম ধরলো।
“চলো।”
মেহেরুন্নেসা কোনো প্রশ্ন না করে ঘোড়ায় উঠলো। বাইজিদ তার পেছনে উঠে বসলো, লাগাম শক্ত করে ধরলো। এক ঝটকায় সিমুর্গ আবার ছুটে চললো। জঙ্গল ভেদ করে বাতাস চিরে এগিয়ে যেতে লাগলো তারা। গাছপালা, ঝোপঝাড়, পাথুরে পথ সব পেছনে পড়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তারা পৌঁছে গেল সাহাবাদের সীমানায়।
আর সেখানেই হঠাৎ সামনে দৃশ্যটা বদলে গেল। এক বিশাল দুর্গ। পুরনো, কিন্তু পরিত্যক্ত নয়।
দেয়ালগুলো শক্ত, চারপাশে পাহারা আর সাজানো অস্ত্রশস্ত্র ঢাল, তলোয়ার, বর্শা সবই সুসজ্জিতভাবে রাখা।
দুর্গের পরিবেশটা সাধারণ কোনো প্রাসাদের মতো না এটা যেন এক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। সিমুর্গ থেমে গেল প্রবেশপথের কাছে। মেহেরুন্নেসা চারপাশে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল।
ভেতরে প্রবেশ করতেই সে দেখলো, নারীরা।
কিন্তু তাদের পোশাক সাধারণ রাজকীয় বা গৃহস্থালি পোশাকের মতো নয়। ছোট, ব্যবহারিক, চলাফেরার উপযোগী যোদ্ধাদের মতো।
কিছুজন তলোয়ার চালানোর অনুশীলন করছে, কেউ ধনুকের নিশানা ঠিক করছে, কেউ আবার শারীরিক প্রশিক্ষণে ব্যস্ত।

মেহেরুন্নেসার চোখ একটু অস্বস্তিতে কেঁপে উঠলো। সে স্বাভাবিকভাবেই চোখ নামিয়ে নিলো, লজ্জা পাচ্ছিল এই ভিন্নধর্মী পরিবেশ দেখে।
বাইজিদ সেটা খেয়াল করলো। এদের ছোট পোষাক দেখেই মেহের এর অস্বস্তি হচ্ছে।
সে শান্ত গলায় বললো
“এরা যোদ্ধা।”
মেহেরুন্নেসা ধীরে তাকালো। বাইজিদ সামনে তাকিয়েই বললো
“মিশরীয় নারী যোদ্ধাদের দল।”
একটু থেমে যোগ করলো
“আর পাশের দুর্গে যারা আছে… তারা একটা ধ্বংসপ্রাপ্ত রাজ্যের নাগরিক।”
তার দৃষ্টি দূরে কোথাও।
“যুদ্ধ তাদের সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। এখন তারা এখানেই অস্ত্র চালনা শিখছে… নিজেদের রক্ষা করার জন্য।”

রিচেক দিই নি বানান ভুল হতে পারে। আর গত পর্বে রিয়্যাক্ট এত কম কেন? সবাই রিয়্যাক্ট দিবেন। আর কেমন হয়েছে জানাবেন 🫶💟

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply