Golpo romantic golpo নূর এ সাহাবাদ

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ২৯ এর শেষাংশ


নূর এ সাহাবাদ পর্ব ২৯ এর শেষাংশ

jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

২৯ এর শেষাংশ

মারজানের চিৎকারে মুহূর্তের মধ্যেই মহলের নিস্তব্ধতা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। দৌড়ে আসতে লাগলো দাসী, প্রহরী, চাকর যে যেখানে ছিল। করিডোরে পায়ের শব্দ, ফিসফাস, আতঙ্ক সব একসাথে মিশে এক অস্থির পরিবেশ তৈরি করলো।
“কি হয়েছে?কে চিৎকার করলো?”

একটার পর একটা প্রশ্ন ভেসে আসছে।
প্রভা দরজার মাঝখানে দাঁড়িয়ে, সম্পূর্ণ অসহায়। তার ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু যেন কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। পালঙ্কের ওপর অরণ্য আধোচেতন অবস্থায় পড়ে আছে। কিছুই বুঝতে পারছে না।
ঠিক তখনই ভারী পায়ের শব্দে করিডোর কেঁপে উঠলো। বাকের শাহ্ দ্রুত পা ফেলে ভেতরে ঢুকলেন। তার চোখ গম্ভীর, কপাল কুঁচকানো।
“কি হয়েছে এখানে?”
তার কণ্ঠ বজ্রের মতো।
তার পেছনেই ছুটে এলেন জাবের শাহ্, অরণ্যের বাবা। মুখে উদ্বেগ আর অস্থিরতা। তার পাশে আমিনা চোখ ভয়ে বড় হয়ে আছে।
ঘরের ভেতর ঢুকেই তারা থমকে গেল। মারজান মেঝেতে বসে পড়েছে, মাথায় হাত দিয়ে কাঁদছে।
“হায় আল্লাহ… আমার সর্বনাশ হয়ে গেল…”
তার কান্না এতটাই নাটকীয়, এতটাই জোরে যেন পুরো মহল শুনে ফেলে। বাকের শাহ্ চোখ সরু করে তাকালেন
“স্পষ্ট করে বলো কি হয়েছে!”
মারজান মুখ তুলে তাকালো। চোখে জল, মুখে কাঁপন। কিন্তু সেই কাঁপনের আড়ালে লুকিয়ে আছে নিখুঁত অভিনয়।
“আমি… আমি তো কিছুই বুঝিনি… আমি তো নিজের কক্ষে ছিলাম…”
সে কেঁদে উঠলো।
“ হঠাৎ… হঠাৎ এই ছেলে…!”
কাঁপা আঙুল তুলে দেখালো অরণ্যের দিকে। জাবের শাহ্ এক পা এগিয়ে এলেন
“অরণ্য…?”
তার কণ্ঠে অবিশ্বাস। মারজান আবার বলে উঠলো
“সে নেশা করে এসেছে… চোখে কোনো হুঁশ ছিল না…!”
প্রভা তড়িঘড়ি করে বললো
“না! এটা মিথ্যে! সে”
“ চুপ!”
বাকের শাহ্ বজ্রকণ্ঠে থামিয়ে দিলেন তাকে। প্রভা থমকে গেল। চোখ ভিজে উঠলো সাথে সাথেই।
মারজান সুযোগটা লুফে নিল।
“আমি তাকে থামাতে গিয়েছিলাম… কিন্তু সে আমার হাত চেপে ধরলো…”
সে নিজের হাত বুকের কাছে চেপে ধরলো, যেন এখনও ব্যথা অনুভব করছে।
“আমাকে… আমাকে জোর করে…আমার ইজ্জত লুটতে চেয়েছে। আমাকে অসতী করতে…..”
কথাটা শেষ করলো না। মাথা নিচু করে কেঁদে উঠলো।
চারপাশে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লো।
“কি বলছে বেগম সাহেবা…”
“এ কি করে সম্ভব…?”
জাবের শাহ্ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছেন নিজের ছেলের দিকে। তার চোখে ধাক্কা, লজ্জা, অবিশ্বাস সব একসাথে। আমিনা কাঁপতে কাঁপতে বললেন

“না… আমার ছেলে এমন না…”
তার কণ্ঠ ভেঙে গেল। কিন্তু মারজান থামলো না।
“শুধু তাই না…!”
সে আবার মুখ তুলে তাকালো, চোখে আগুন জ্বলে উঠেছে এবার।
“সে আমাকে এমন সব কথা বলেছে… এমন প্রস্তাব দিয়েছে… যা আমি মুখে আনতেও পারি না!”
ঘরের ভেতর যেন শ্বাসরুদ্ধকর নীরবতা। প্রভা এবার আর সহ্য করতে পারলো না।
“না! আপনি মিথ্যে বলছেন! সে কিছুই করেনি! সে আমার কক্ষে ছিল। আমি…”
কথা শেষ করার আগেই সে থেমে গেল। নিজেই বুঝতে পারলো এই কথাটাই তার বিরুদ্ধে যাবে।
মারজানের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠলো।
“দেখলে তো? নিজেই স্বীকার করছে…”
বাকের শাহ্ ধীরে ধীরে ঘুরে তাকালেন প্রভার দিকে। তার চোখ কঠিন হয়ে উঠছে। প্রভা অনুভব করলো মাটি যেন পায়ের নিচ থেকে সরে যাচ্ছে।
আর এই বিশাল মহলের ভেতর সত্যিটা দাঁড়িয়ে আছে একা। আর মিথ্যে ছড়িয়ে পড়ছে আগুনের মতো। সে রাতটা যেন অভিশপ্ত ছিল। মহলের ভেতর উত্তেজনা, গুঞ্জন, কান্না সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়েছিল। অথচ এই বিশাল অশান্তির মাঝেও একটা জিনিস স্পষ্ট,
শাহজাদা বাইজিদ নেই। সে থাকলে… হয়তো এত সহজে কেউ সত্যিকে মাটিচাপা দিতে পারতো না।

তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, হিসেবি মস্তিষ্ক, সব মিলিয়ে সে নিশ্চয়ই ঘটনাটার ভেতরের ফাঁকগুলো ধরে ফেলতো। কিন্তু আজ… সে নেই। সে বানিজ্যের কাজে অন্য রাজ্যে আছে। আর সেই সুযোগটাই কাজে লাগালো মারজান।

সে কাঁদছে, বুক চাপড়াচ্ছে, কখনো মেঝেতে বসে পড়ছে এমনভাবে নিজের কাহিনি সাজাচ্ছে, যেন সে-ই এই ঘটনার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী
“ আমি তো তাকে সন্তানের মতোই দেখেছি। সে আজ আমার মান-ইজ্জত নিয়ে খেললো…!”
তার কান্নার শব্দে অনেকের চোখে সন্দেহের বদলে সহানুভূতি জন্মাতে শুরু করলো। প্রভা হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে। সে বারবার বলতে চাইছে
“ না! এটা মিথ্যে! আপনারা বিশ্বাস করবেন না!”

কিন্তু তার কণ্ঠ যেন ডুবে যাচ্ছে মারজানের কান্নার ভেতর। ঠিক তখনই একটা কণ্ঠ ভেসে এলো। কাঁপা, কিন্তু স্পষ্ট।
“মিথ্যে বলছেন আপনি।”
সবাই একসাথে ঘুরে তাকালো। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট মিরান। মাত্র তেরো বছরের একটা মেয়ে। কিন্তু চোখে অদ্ভুত দৃঢ়তা। মারজানের কান্না থেমে গেল এক মুহূর্তের জন্য।
“কি বললে?”
মিরান ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। তার চোখ সরাসরি মারজানের দিকে।
“আমি সব দেখেছি।”
ঘরের ভেতর আবার ফিসফাস শুরু হলো।
মিরান শান্ত গলায় বললো
“অরণ্য শাহ্ মহলে ঢোকার পর থেকেই… শাহজাদি রত্নপ্রভা আর আমি, আমরা দুজনই তার সাথে ছিলাম।”
প্রভার বুক ধক করে উঠলো। মিরান থামলো না
“সে তখন নেশাগ্রস্ত ছিল। কিন্তু… সে কারো সাথে জোরজবরদস্তি করেনি।”
তার কণ্ঠ এবার আরও দৃঢ়।
“ বেগম সাহেবা হঠাৎ করে ঘরে ঢুকে… এসব কথা বলতে শুরু করেন।”
ঘরের ভেতর যেন বাতাস বদলে গেল। মারজানের চোখ সরু হয়ে এলো।
“তুই কি বলছিস বুঝে বলছিস তো?”
তার কণ্ঠে এবার হুমকির ছায়া। কিন্তু মিরান পিছিয়ে গেল না।
“ আমি যা দেখেছি… তাই বলছি।”

জাবের শাহ্ ধীরে ধীরে তাকালেন মিরানের দিকে। তার চোখে আবার একটুখানি আশার ঝিলিক। আমিনা কাঁপা গলায় বললেন
“আমি জানি, আমার ছেলে এমন না…”
কিন্তু বাকের শাহ্ এখনও নিশ্চুপ। তার দৃষ্টি একবার মারজানের দিকে, একবার প্রভার দিকে, একবার অরণ্যের দিকে ঘুরছে। ঘরের ভেতর সত্যি আর মিথ্যার লড়াই শুরু হয়ে গেছে।
কিন্তু মিরানের এই সাহসী কথার পরও
মারজানের চোখের সেই হিসেবি ঝিলিক একটুও মুছে যায়নি।
কারণ খেলা এখনো শেষ হয়নি। ঘরের ভেতর তখনো চাপা উত্তেজনা। কেউ জোরে কথা বলছে না, কিন্তু সবার চোখে মুখে প্রশ্ন আসলে কি ঘটেছে?
মিরানের কথার পর পরিবেশটা খানিকটা বদলালেও, পুরোটা পরিষ্কার হয়নি কিছুই।
মারজান নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে। তার চোখে ক্ষোভ, অপমান আর ভেতরে ভেতরে জমে থাকা এক অদৃশ্য আগুন। বাকের শাহ্ ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলেন। তার উপস্থিতিতেই যেন পুরো ঘর আবার স্থির হয়ে গেল।বতিনি একবার চারপাশে তাকালেন
প্রভা, অরণ্য, মারজান… সবার দিকে। তারপর গম্ভীর গলায় বললেন
“আজকের এই ঘটনার কোনো বাড়াবাড়ি হবে না।
ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা। যা হয়েছে… তা একটি ভুলবোঝাবুঝি ছাড়া কিছু নয়।”

মারজানের চোখে ক্ষীণ বিস্ময় খেলে গেল। যেন সে এমন সিদ্ধান্ত আশা করেনি। বাকের শাহ্ আবার বললেন
“ অরণ্য নেশাগ্রস্ত ছিল। সে হয়তো এমন কিছু কথা বা আচরণ করেছে… যা মারজান বেগম ভুলভাবে নিয়েছেন।”
কথাগুলো বলার সময় তার কণ্ঠে দৃঢ়তা ছিল, কিন্তু কোথাও একটা হিসেবি সংযমও। জাবের শাহ্ ধীরে মাথা নিচু করলেন। যেন এই সিদ্ধান্তই তিনি চেয়েছিলেন। আমিনা চোখ মুছলেন চুপচাপ। প্রভা নিঃশ্বাস ফেললো বুকের ভেতর জমে থাকা ভয়টা যেন একটু নরম হলো।
কিন্তু মারজান এরর মুখ শক্ত হয়ে গেল। বাকের শাহ্ এবার অরণ্যের দিকে তাকালেন।
“অরণ্য!”
কঠিন ডাক। অরণ্য তখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক না। তবুও কোনোমতে উঠে বসলো।
“তোমাকে অবশ্যই বড়মার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।”
ঘরের ভেতর আবার নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
“তুমি যা-ই করে থাকো বা না-ই করে থাকো।
এই ঘটনার দায় তোমাকেই নিতে হবে।”

অরণ্য কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তার চোখে লজ্জা, অপমান আর কোথাও যেন নিজের ওপরই বিরক্তি। ধীরে ধীরে সে পালঙ্ক থেকে নামলো। পা টলছে সামান্য, তবুও নিজেকে সামলে মারজানের সামনে এসে দাঁড়ালো। এক মুহূর্তের জন্য তার চোখ উঠলো মারজানের চোখের দিকে তাকিয়ে । সেই চোখে ছিলো এক অদ্ভুত হাসি। অরণ্যের বুকটা কেঁপে উঠলো।
তারপর সে মাথা নিচু করে ঝুঁকে পড়লো
“ক্ষমা করবেন”
কণ্ঠ ভারী। মারজান কিছু বললো না। শুধু তাকিয়ে রইলো তার দিকে। তার ঠোঁটের কোণে তখন ক্ষীণ, অদৃশ্য এক হাসি যেটা কেউ দেখলো না। কিন্তু সেই হাসির ভেতরেই লুকিয়ে ছিল
একটা অসমাপ্ত প্রতিশোধের শুরু। মারজান বাইরে থেকে নিশ্চুপ। কিন্তু মনে মনে আওড়ালো।
“এবার না পারলে… পরের বার। আরও বড় করে সাজাতে হবে খেলাটা। এই ছেলেকে আমি
ছাড়বো না…”

তার দৃষ্টি এক ঝলক গেল অরণ্যের দিকে।
সেই দৃষ্টিতে ছিলো প্রতিশোধের প্রতিশ্রুতি।
ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এলো।
বাকের শাহ্ এবার ধীরে ধীরে ঘুরে তাকালেন রত্নপ্রভার দিকে।
তার কণ্ঠ এবার আগের চেয়েও কঠিন
“তুমি এত রাতে… অরণ্যের কক্ষে কেন গিয়েছিলে?”

প্রভা থমকে গেল।
তার ঠোঁট শুকিয়ে গেল হঠাৎ। চোখে ভয়, লজ্জা সব একসাথে ভিড় করলো। সে কিছু বলার আগেই অরণ্য এক পা এগিয়ে এলো।
“ আমি বলছি।”
সবাই তাকালো তার দিকে। অরণ্যের চোখ এবার অনেকটাই পরিষ্কার। নেশার ঘোর কাটলেও ক্লান্তি রয়ে গেছে। তবুও কণ্ঠে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা।
“ আমরা… একে অপরকে ভালোবাসি।”

শব্দগুলো ঘরের ভেতর ধাক্কা খেলো। প্রভার বুক কেঁপে উঠলো। জাবের শাহ্ বিস্ময়ে তাকালেন ছেলের দিকে। আমিনা চোখ বড় করে ফেললেন।
মারজানের চোখ আবার সরু হয়ে এলো।
অরণ্য থামলো না
“আর সে, আমাকে কক্ষে পৌঁছে দিতে এসেছিল। কোনো খারাপ উদ্দেশ্যে আসে নি”

তার কণ্ঠে কোনো লজ্জা নেই, কোনো দ্বিধা নেই।
বরং যেন একটা দায়িত্ববোধ প্রভাকে রক্ষা করার।
প্রভা নিঃশব্দে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। তার চোখ ভিজে উঠছে ধীরে ধীরে। বাকের শাহ্ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। ঘরের ভেতর কেউ কথা বলছে না। এই এক স্বীকারোক্তি সব হিসেব বদলে দিতে পারে।কিন্তু মারজানের চোখের সেই অদ্ভুত দৃষ্টি তখনো অটুট।

অরণ্যের মুখ থেকে কথাটা বের হতেই যেন পুরো ঘরটা স্তব্ধ হয়ে গেল। তারপরই চারদিক থেকে চাপা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লো
“কি বললো?”
“ ওরা… ভালোবাসে?”
“এ কিভাবে সম্ভব…?”
দাসীরা একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে, প্রহরীদের চোখে বিস্ময়। ফিসফাস ক্রমশ বেড়েই চললো।
“তারা তো ভাই-বোন…!”
“চাচাতো হলেও… এই সম্পর্ক…!”
শব্দগুলো যেন বিষ হয়ে ছড়িয়ে পড়ছিল চারদিকে। রত্নপ্রভা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। তার বুক কাঁপছে, কিন্তু সে কিছু বলছে না।
অরণ্য দাঁড়িয়ে আছে সোজা হয়ে। যেন যা বলেছে, তা থেকে একচুলও সরবে না।
জাবের শাহ্ হতবাক। তার চোখে অবিশ্বাস, লজ্জা আর কোথাও যেন ভয়ও।

আমিনা কাঁপতে কাঁপতে পেছনে সরে গেলেন। মুখে হাত চাপা
“ ইয়া আল্লাহ”
আর বাকের শাহ্, তিনি দাঁড়িয়ে আছেন স্থির।
কিন্তু তার ভেতরে যেন আগুন জ্বলছে। তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে, হাত মুষ্টিবদ্ধ। চোখে এমন ক্রোধ যা বিস্ফোরিত হলে সবকিছু ভস্ম করে দিতে পারে।
তবুও তিনি কিছু বললেন না। একটা শব্দও না। কারণ তিনি জানেন এই সিদ্ধান্ত তার একার নয়।
মাইমুনা শেখের মৃত্যুর পর থেকে এই মহলে একটা নিয়ম অদৃশ্যভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

রত্নপ্রভার জীবনের বড় কোনো সিদ্ধান্ত কেবল একজনই নেয়। শাহজাদা বাইজিদ। আর সে এখন এখানে নেই।বঘরের ভেতর গুঞ্জন চলছেই। কেউ চাপা স্বরে নিন্দা করছে, কেউ অবিশ্বাসে মাথা নাড়ছে। মারজান একপাশে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছে। তার চোখে আবার সেই ক্ষীণ হাসি।
“এবার আগুনটা নিজে থেকেই ছড়িয়ে পড়বে”

বাকের শাহ্ অবশেষে গম্ভীর গলায় বললেন
“ এই বিষয়ে এখন আর কোনো কথা হবে না।৳
সবাই থেমে গেল।
“শাহজাদা বাইজিদ ফিরে না আসা পর্যন্ত,
এই ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হবে না।”
তার কণ্ঠে চূড়ান্ত ঘোষণা।
“ততদিন… সবাই নিজ নিজ সীমা জানবে।”

ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এলো।
কিন্তু সেই নীরবতার নিচে ফুঁসছে লজ্জা, ক্রোধ, আর এক নিষিদ্ধ ভালোবাসার আগুন। যার রায় এখন নির্ভর করছে একজন অনুপস্থিত মানুষের ওপর।

মিরান বিরতি নিলো। মেহেরুন্নেসার কপাল কুচকে আসে। অবাক সুরে বলে
“তাহলে মারজান বেগমের কারণে অরণ্যের শাস্তি হয় নি। তাহলে কার জন্য হয়েছে?”

মিরান ফের ফিরে গেলো পূর্বের ঘটনায়। সেই ঘটনার পর মহল যেন এক অদৃশ্য ভারে ঢেকে গেল। বাকের শাহ্-এর ঘোষণার পর সবাই একে একে সরে গেল নিজ নিজ কক্ষে। করিডোরে পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেল, আলো কমে এলো, কিন্তু ফিসফাস থামলো না। রত্নপ্রভা নিজের কক্ষে ফিরে দরজা বন্ধ করেই ভেঙে পড়লো।

তার বুকের ভেতরটা পুড়ছে লজ্জা, অপমান, আর অরণ্যের জন্য এক অদ্ভুত টান সব মিলিয়ে।
আর অন্যদিকে মারজান আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। তার ঠোঁটে ধীরে ধীরে সেই কুটিল হাসি ফিরে এলো।
একটা চাল ব্যর্থ হলোতাতে কি? খেলা তো এখনো বাকি।
তার দৃষ্টি ধীরে সরে গেল দরজার দিকে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে এক তরুণী। সাজগোজ করা, চোখে চপলতা, ঠোঁটে হালকা হাসি।
তার নাম আমিরা। মারজানের বোনের মেয়ে।
সে সেই রাতেই সব দেখেছে, সব শুনেছে আর এখন তার চোখে কৌতূহল আর দুষ্টামির মিশেল।

মারজান ধীরে এগিয়ে এলো তার কাছে।
নিচু গলায় বললো
“একটা কাজ করতে পারবে?”
আমিরার ঠোঁটের কোণে হাসি গাঢ় হলো।
“কিসের কাজ খালাম্মা?”
মারজানের চোখে ঝিলিক
“অরণ্যের কাছাকাছি যেতে হবে তোমাকে।”
একটু থামলো।
“এমনভাবে… যেন সে নিজেই দূরে যেতে না পারে।”
আমিরা হালকা হেসে মাথা নাড়লো।
“বুঝেছি।”
পরদিন থেকেই শুরু হলো খেলা। সকালের নাস্তার টেবিল অরণ্য চুপচাপ বসে আছে। মাথা নিচু, চোখে ক্লান্তি। হঠাৎ পাশে এসে বসল আমিরা। নিঃসংকোচে হাত রাখলো অরণ্যের বাহুতে
“আজ আপনি এত চুপচাপ কেন?”

নারী স্পর্শ পেতেই অরণ্য চমকে একটু সরে গেলো। তাকালো পাশে থাকা আমিরার দিকে। তার কণ্ঠে মিষ্টি সুর, কিন্তু চোখে অন্যরকম দৃষ্টি।
অরণ্য একবার তাকিয়ে আবার মুখ ফিরিয়ে নিল।
“কিছু না।”
“কিছু না? এত বড় মহলে এসে কেউ যদি এমন চুপচাপ থাকে, তাহলে তো মনে হয় কিছু একটা আছে।”
বলতে বলতেই সে আরও কাছে ঝুঁকে এলো।
অরণ্য স্পষ্ট অস্বস্তি নিয়ে চেয়ারটা সামান্য সরিয়ে নিল।
“দূরে বসুন।”
আমিরা হেসে ফেললো।
“ এত দূরত্ব ভালো না কিন্তু”
সারাদিন কখনো করিডোরে, কখনো বাগানে, কখনো সিঁড়ির ধাপে বারবার সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে আমিরা। অকারণে কথা বলছে, হাসছে, কখনো ইচ্ছে করে খুব কাছে চলে আসছে।
অরণ্য যতটা পারে এড়িয়ে চলছে। একবার তো বিরক্ত হয়ে বলেই ফেললো
“আপনার কি আর কোনো কাজ নেই?”
আমিরা কাঁধ ঝাঁকালো।
“ এখন নেই।”
তার চোখে সেই একই খেলা। দূর থেকে সবটা দেখছে রত্নপ্রভা। তার বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠছে। সে বুঝতে পারছে এটা কাকতালীয় না। কেউ তাকে সরাতে চাইছে। কেউ অরণ্যের চারপাশে জাল বুনছে। অরণ্য বারবার এড়িয়ে যাচ্ছে। এটা দেখেও তার মনটা শান্ত হচ্ছে না। বরং একটা অদ্ভুত ভয় চেপে বসছে।
কারণ সে জানে এই মহলে কেউ কিছু এমনি এমনি করে না।
আর মারজান? সে এত সহজে হাল ছাড়ার মানুষ না। হতেও পারে সেই আমিরা কে দিয়ে এমন
করাচ্ছে।

দিন শেষে নিজের কক্ষে বসে রত্নপ্রভা জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলো। বাবার আদেশে অরণ্যের আশেপাশেও ঘেষতে পারে না। তার মনে শুধু একটাই কথা ঘুরপাক খাচ্ছে
“এই খেলাটা কোথায় গিয়ে থামবে…?”

মহলের অন্দরমহলের এক নির্জন কোণে বসে আছে মারজান। জানালার ফাঁক দিয়ে আসা আলো তার মুখের অর্ধেকটা আলোকিত করেছে, বাকিটা অন্ধকারে ঢাকা। তার সামনে বসে আমিরা। মুখে বিষন্নতা। সারাটা দিনেও সুবিধে করতে পারেনি অরণ্যের সাথে। ভিতরে ভেতরে সে অপেক্ষা করছে নির্দেশের। মারজান ধীরে ধীরে বললো
“এভাবে শুধু ঘুরঘুর করে কিছু হবে না।”
আমিরা ভ্রু তুললো।
“ তাহলে?”
মারজানের চোখে কুটিল ঝিলিক।
“এমন কিছু করতে হবে… যাতে আর পিছু হটার পথ না থাকে।”
একটু থামলো। তারপর খুব নিচু, ঠান্ডা গলায় বললো
“ তাকে এমন অবস্থায় নিয়ে যেতে হবে… যাতে সবাই বিশ্বাস করে। তোমাদের সম্পর্ক অস্বীকার করার উপায় নেই।”

আমিরা এবার পুরোটা বুঝে গেল। তার ঠোঁটে ধীরে ধীরে একটা আত্মতুষ্টির হাসি ফুটে উঠলো।
“আপনি চাইছেন আমি গর্ভবতী হই তার দ্বারা?”

মারজান সরাসরি উত্তর দিল না।
শুধু বললো
“ এই মহলে বিয়ে জোরপূর্বক হবে না… কিন্তু পরিস্থিতি তৈরি করা যাবে”
তার চোখ সরু হয়ে এলো।
“ এমন পরিস্থিতি যেখানে সিদ্ধান্তটা নিজেরাই নিতে বাধ্য হয়।”
নীরবতা। তারপর আমিরা মাথা নেড়ে বললো
“বুঝেছি খালা।”
সেই দিন থেকেই আমিরার আচরণ বদলে গেল আরও স্পষ্টভাবে। সে শুধু কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করছে না। বরং পরিকল্পনা করে অরণ্যকে একা পাওয়ার চেষ্টা করছে। কখনো সে ইচ্ছে করে পথ আটকে দাঁড়ায়
“আপনি আমাকে এড়িয়ে চলছেন কেন?”
কণ্ঠে অভিমান মেশানো সুর। অরণ্য বিরক্ত হয়ে পাশ কাটিয়ে যেতে চায়
“ আপনার এই আচরণ ঠিক না। কি ভুল করছি আমি?”
সে আরও কাছে এগিয়ে আসে। অরণ্য পেছনে সরে যায়।
“ইশশ দূরে থাকুন। শাহজাদীর হাতে প্রাণ টা না দিতে চাইলে দূরে থাকুন”

কিন্তু আমিরা থামে না। কখনো বাগানের নির্জনে গিয়ে বসে অরণ্যকে সেখানে ডাকার অজুহাত বানায়। কখনো আবার নিজের কক্ষে দাসীর মাধ্যমে বার্তা পাঠায়
“জরুরি কথা আছে।”
অরণ্য কোনো সময়ই যায় না। আর আমিরা নিজে গেলেও, দূরত্ব বজায় রাখে। তার চোখে বিরক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠছে দিন দিন। কিন্তু আমিরা ধৈর্য হারায় না। সে জানে খেলা দীর্ঘ হতে পারে।
আর দূর থেকে রত্নপ্রভা সব খেয়াল রাখে। ভালোবাসার মানুষের আশেপাশে কেউ এভাবে ঘুরঘুর করলে সব নারীর ই কলিজা পোড়ে।

তার বুকের ভেতরটা প্রতিদিন একটু একটু করে ভারী হয়ে উঠছে। সে বুঝতে পারছে এটা শুধু কারো আগ্রহ না এটা একটা পরিকল্পনা।
একটা ফাঁদ। আর সেই ফাঁদের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে অরণ্য। আর এই পুরো খেলাটার পেছনে
অদৃশ্যভাবে হাসছে মারজান। সেই বার শাহজাদা বাইজিদ দীর্ঘ সময় ধরে ভ্রমণ করেছিলেন অন্যান্য রাজ্যে। প্রায় মাস দুই পর সে মহলে ফেরে। কিন্তু সে ফেরা মাত্রই বাকের শাহ্ তাকে কোনো ঘটনা জানাতে দিল না। প্রতিবেশী রাজ্য নাসিরাবাদ এর জমিদার এর বড় কন্যা রুবায়েত ফারনাজ এর সাথে শাহজাদার বিবাহের প্রস্তাব আসে। নাসিরাবাদ তখন ধনে জনে পরিপূর্ণ। বাকের শাহ্ এর আড্ড মনে ধরে সম্বন্ধ টা।

কিন্তু সে জানতো, ছেলেকে রাজি করাতে তার কাল ঘাম বেড়িয়ে যাবে। তখনো বাইজিদ পিতার সাথে ঠিক করে কথা বলে না। কোনো একজন যদি তাকে বোঝাতে পারে, সে হলো রত্নপ্রভা। বাকের শাহ্ একান্তে রত্নপ্রভা কে বোঝায়,
“যদি বাইজিদ কে এ বিবাহে রাজি করাতে পারো। তবে অরণ্যের সাথে তোমার বিবাহ নির্বিঘ্নে হবে”

প্রভার তখন কিশোরী মন। সাত পাঁচ না ভেবেই উঠে পড়ে লাগে ভাইজান কে রাজি করাতে। বহুত ইনিয়ে বিনিয়ে বলার পর শাহজাদা রাজি হয়। তারা মেয়ে দেখে আসে এবং দিন তারিখ ও ঠিক করে আসে। শাহজাদার বিয়ের রাতেই ঘটে সেই জঘন্য করুণ ঘটনা। তারা যখন রওনা হলো বিবাহের উদ্দেশ্যে। তখন মহল ফাঁকা……

মেহেরুন্নেসার চোখে পানি দেখে মিরান এর কথা থামলো। হাঁটুতে হাত রেখে মৃদু ঝাকিয়ে বলল
“বেগম! কি হয়েছে কোনো সমস্যা?”

মেহেরুন্নেসার চোখ থেকে মুক্তাদানার মতো কয়েক ফোটা পানি গড়িয়ে পড়লো।
“শাহজাদার পূর্বেও স্ত্রী ছিল?”

৩k পূরণ হলে কালই গল্প পেয়ে যাবে। আর যারা বলো যে এত ছোট কেন? 🙂 প্রতিদিন ২৫০০+ শব্দ লিখতে কেমন লাগে জানো? আর যদি সত্যিই অনেক ছোট মনে হয়, তাহলে একদিন পরে পরে গল্প দিই। বড় করে দিব এর চেয়ে। কি বলো?

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply