Golpo ডার্ক রোমান্স ডিজায়ার আনলিশড

ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৪৪


✍️ সাবিলা সাবি

ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৪৪

দুই দিন পরের কথা। মেক্সিকো সিটির সেন্ট্রাল চার্চের গোরস্থানটা আজ কুয়াশার চাদরে ঢাকা। লিলি ফুলের তীব্র সুবাস বাতাসে মিশে এক ধরণের গুমোট ভাব তৈরি করেছে। কালো পোশাক পরা মানুষের ভিড় বাড়ছে। মেইলস্ট্রোমের খালা, যিনি সম্পর্কে ইসাবেলার সৎ বোন ছিলেন, তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় আজ মেক্সিকোর প্রভাবশালী সব পরিবার এক জায়গায় জড়ো হয়েছে।সবাই জানে এই পরিবারগুলোর ভেতরকার সম্পর্ক কতটা বিষাক্ত, কিন্তু আজ তারা সবাই এক অদ্ভুত সৌজন্যের মুখোশ পরে আছে। ইসাবেলার সৎবোনের সাথে চৌধুরী পরিবারের সম্পর্কটা ভালো ছিলো কারন টা বিজনেস আর সেই খাতিরেই আজকে এখানে আসা। কালো গাড়ির দীর্ঘ সারি চার্চের গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করছে। জাভিয়ানের সাথেও এই মহিলার সম্পর্ক বেশ ভালো ছিল, তাই পরিস্থিতির জটিলতা ভুলে জাভিয়ান আজ সপরিবারে এখানে উপস্থিত। তান্বীকে একটা বাড়িতে রাখার রিস্ক না নিয়ে সঙ্গে করেই নিয়ে এসেছে।

চার্চের ঘণ্টা বাজছে ধীরলয়ে। মাটির নিচে চিরনিদ্রায় যাওয়ার আগে এটাই শেষ বিদায়। কালো ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর চোখের ভাষা আজ পড়া দায়। শোকের আড়ালে তারা একে অপরকে মাপছে। দামী পারফিউম আর কবরের ভেজা মাটির গন্ধ মিলেমিশে এক বিচিত্র পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

ভিড়ের এক পাশে মেইলস্ট্রোম শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও তার স্থির চাউনি ড্রয়িংরুমের সেই তাণ্ডবের কথাই মনে করিয়ে দেয়। আজ তার পরনে কালো স্যুট, চোখে চশমা। একটু দূরেই জাভিয়ান দাঁড়িয়ে আছে তান্বীর খুব কাছে। তান্বীর পা কাঁপছে, জাভিয়ান তার হাতটা শক্ত করে ধরে তাকে সাহস দেওয়ার চেষ্টা করছে। এই গোরস্থানে আজ শুধু মৃত আত্মার বিদায় হচ্ছে না, বরং উপস্থিত প্রতিটি মানুষের বুকের ভেতরে জমা থাকা ঘৃণা আর জেদগুলোও যেন এক একটি সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ার অপেক্ষায় আছে। শোকের এই ছায়াঘেরা পরিবেশে কে কার বন্ধু আর কে শত্রু, সেটা বোঝা আজ বড় কঠিন।

শীতল বাতাস আর যাজকের প্রার্থনার মাঝে তান্বী লক্ষ্য করল এক অদ্ভুত দৃশ্য। ভিড়ের একপাশে দাঁড়িয়ে আছেন ‘সাইফ চৌধুরী’ তার চোখেমুখে শোকের চেয়েও বেশি জমাট বেঁধে আছে এক পাহাড় সমান ঘৃণা। আর ঠিক উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে থাকা ‘ইসাবেলা মোরেলাস’ অপলক তাকিয়ে আছেন সাইফের দিকে। ইসাবেলার চোখে সেই চিরচেনা ঘৃণা নেই, বরং সেখানে টলমল করছে অনেক বছরের পুরনো সেই ভালোবাসা আর হাহাকার। জাভিয়ানও বিষয়টা খেয়াল করতেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল; বছরের পর বছর পার হয়ে গেলেও এই দুই মানুষের মধ্যকার অদৃশ্য দেয়ালটা এখনো ভাঙেনি।

বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ পাইন গাছের পাতাগুলোকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। জাভিয়ানের মনে হলো, এই গোরস্থানের প্রতিটি কবরের নিচে হয়তো এত গোপন কথা নেই, যা এই দুজন জীবন্ত মানুষের বুকের ভেতর চেপে রাখা আছে। সাইফ চৌধুরীর চোয়াল শক্ত হয়ে আছে, তিনি একবারের জন্যও ইসাবেলার দিকে তাকাচ্ছেন না। অন্যদিকে ইসাবেলা যেন নিজেকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন, তার কালো নেটের আড়ালে থাকা চোখ দুটো বারবার ঝাপসা হয়ে আসছে।
হঠাৎ তান্বী অনুভব করল জাভিয়ানের হাতের ধরা আরও শক্ত হয়েছে। তান্বী দেখল, মেইলস্ট্রোম তখনো দূরে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টিতে মাটির দিকে তাকিয়ে আছে, মনে হচ্ছে সে এই পরিবেশ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে রেখেছে। কিন্তু সাইফ আর ইসাবেলার এই দৃষ্টি বিনিময়—কিংবা একতরফা তাকিয়ে থাকা—পুরো শোকসভাকে এক অন্যরকম ভারী করে তুলল। পুরনো কোনো এক গল্পের শেষ অধ্যায় যেন এখানে এসেও শেষ হতে পারছে না।

গোরস্থানের পাইন গাছের সারির ফাঁক দিয়ে আসা হিমেল বাতাস ইসাবেলার মুখ স্পর্শ করে যাচ্ছে। কিন্তু তার শরীরের চেয়েও বেশি শীতল হয়ে আছে তার অন্তর। সাইফ চৌধুরীর সেই ঘৃণামাখা দৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে ইসাবেলার মস্তিষ্ক আজ থেকে বহু বছর আগের সেই অভিশপ্ত দিনে ফিরে গেল। চোখের সামনে ভেসে উঠল ‘ভিলা এস্পেরেন্জা’-র সেই শেষ দুপুরটি। ইসাবেলার মনে পড়ল, সেদিন আকাশটা এমন মেঘলা ছিল না, কিন্তু সাইফ চৌধুরীর গলার স্বর ছিল বজ্রপাতের চেয়েও ভয়াবহ। ইসাবেলা এখনো কানে শুনতে পায় সেই বিষাক্ত শব্দগুলো, যা তার সাজানো সংসারকে এক মুহূর্তে তাসের ঘরের মতো গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। ভেসে উঠলো সেই স্মৃতিচারণ:

সাইফ চৌধুরী সেদিন উন্মত্তের মতো চিৎকার করে ইসাবেলার দিকে আঙুল তুলে বলেছিলেন—”এই ছেলে আমার রক্ত নয় ইসাবেলা! এই ইভান আমার সন্তান হতে পারে না। ও অবৈধ, ও একটা জারজ সন্তান! ওর বাবা অন্য কেউ, আমি নিশ্চিত। তুমি আমাকে ধোঁকা দিয়েছ!” ইসাবেলা পাথরের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। নিজের চরিত্রের ওপর এমন কালিমালেপন সে কল্পনাও করতে পারেনি। অথচ এই সাইফ চৌধুরীই একদিন মেক্সিকোর এক বিজনেস ট্যুরে এসে ইসাবেলার প্রেমে পড়েছিলেন। ইসাবেলা ছিলেন খাঁটি মেক্সিকান নারী, মেক্সিকোর তৎকালীন ডার্ক লর্ডের ছোট কন্যা। যার বাবার ইচ্ছা ছিল মেয়ে হবে ‘ডার্ক কুইন’ বা মাফিয়া কুইন। কিন্তু ইসাবেলা সব আভিজাত্য আর বাবার অমত উপেক্ষা করে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন এই সাইফকে। কিন্তু নিয়তি ছিল নিষ্ঠুর। সাইফ চৌধুরীর সেই অবিশ্বাসের দেয়াল এতই উঁচু ছিল যে ইসাবেলার কোনো মিনতি সেখানে পৌঁছাতে পারেনি। সাইফ বড় ছেলে ‘ইভান ভ্যালেন্তিনো চৌধুরীকে’ ‘জারজ’ অপবাদ দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিতে চাইলেন। অথচ ইভানই ছিল এই চৌধুরী বংশের প্রকৃত বড় উত্তরাধিকার। সাইফ আর ইসাবেলার ঘরেই প্রথমে সন্তান জন্মায় আর সেই ইভানের জন্মের পরেই পৃথিবীতে এসেছিল সায়েম চৌধুরী আর কার্গো চোধুরী এর ঘরে জাভিয়ান আর রাহিয়ান। এরপর মেক্সিকান পরিবেশে সাইফ আর ইসাবেলার ঘরে জন্ম নেয় মার্কো রেয়েস চৌধুরী এবং সবশেষে কোল আলো করে আসে একমাত্র মেয়ে লুসিয়া।
সেই সাজানো সুন্দর সংসার ধ্বংস হয়ে যায় সাইফের এক মুহূর্তের সন্দেহে। ক্ষমতার জোরে সাইফ ছোটদের নিজের কাছে রেখে দিলেও ইসাবেলাকে বাধ্য করেছিলেন শুধু ইভানকে নিয়ে বেরিয়ে যেতে। সেদিন ছোট লুসিয়া কাঁদছিল আর মার্কো অবাক চোখে মায়ের চলে যাওয়া দেখছিল। ইসাবেলা শুধু ইভানের হাত শক্ত করে ধরে ভিলা এস্পেরেন্জা থেকে বেরিয়ে এসেছিল। ফিরে তাকায়নি তার বাকি দুই সন্তানদের দিকে।

ফিরে আসা বর্তমানে:
গোরস্থানের নিস্তব্ধতা ভেঙে ইসাবেলা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আজ সেই ইভান মেক্সিকোর ত্রাস— যার মাফিয়া কোডনেম ‘মেইলস্ট্রোম’। মেইলস্ট্রোম আজকের সবচেয়ে ভয়ংকর নাম হতে পারে, কিন্তু সে যে এখনো চৌধুরী বংশের বড় উত্তরাধিকার, সেই সত্য আজ ইসাবেলার চোখের দীপ্তিতে স্পষ্ট। সাইফ চৌধুরী সেদিন ইভানকে অস্বীকার করে যে আগ্নেয়গিরি জন্ম দিয়েছিলেন, আজ সেই আগ্নেয়গিরির লাভায় সবাই দগ্ধ হচ্ছে।ইসাবেলা আড়চোখে সাইফ চৌধুরীর দিকে তাকাল। সাইফ চৌধুরী তখনো দূরে দাঁড়িয়ে কফিনের দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি কি জানেন, তার সেই এক মুহূর্তের অবিশ্বাস আজ কতগুলো জীবনকে নরকের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে? বিশেষ করে ইভান, যে তার ডার্ক লর্ড নানার উত্তরাধিকার আর মাফিয়া রক্তের তেজ নিয়ে আজ ধ্বংসের খেলায় মেতেছে।

গোরস্থানের হিমেল বাতাস ইভানের কোটের হাতা উড়িয়ে দিচ্ছে, কিন্তু তার মন এখন বর্তমানে নেই। সেও ফিরে গেছে বহু বছর আগের সেই ধুলোবালি মাখা অন্ধকার রাস্তায়, যেখানে ‘ইভান ভ্যালেন্তিনো চৌধুরী’ নামক এক রাজপুত্রের মৃত্যু হয়েছিল আর জন্ম হয়েছিল ‘মেইলস্ট্রোম’ নামক এক হিংস্র পশুর। ইভানের মনে পড়ল, ভিলা এস্পেরেন্জা থেকে বের করে দেওয়ার পর প্রথম কয়েক বছর তারা এক নরক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন। মেক্সিকোর সিটির বস্তিতে যখন ক্ষুধার জ্বালায় সে তার মায়ের কান্না দেখত, তখন তার ভেতরে প্রথম খুনের নেশা জেগেছিল।

সেই স্মৃতিচারণে ভেসে উঠলো:
ইভান নিজেকে প্রশ্ন করল— সে কি জন্মগতভাবে পশু ছিল? না। তাকে পশু বানানো হয়েছে। তার মনে পড়ল সেই রাতের কথা, যখন মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে নিজের আর মায়ের একমুঠো খাবারের জন্য সে প্রথমবার কারো বুকে ছুরি চালিয়েছিল। সেই প্রথম রক্তের উষ্ণতা তার হাতে লাগার পর সে আর মানুষ থাকেনি। ডার্ক লর্ড নানার উত্তরাধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তাকে প্রতিটি ধাপে প্রমাণ করতে হয়েছে সে ‘জারজ’ নয়। মাফিয়া ট্রেনিংয়ের সময় তাকে দিনের পর দিন অন্ধকার কুঠুরিতে ক্ষুধার্ত রাখা হতো। তার নানার নির্দেশে তাকে এমন এক খাঁচায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল যেখানে তাকে আর একটা ক্ষুধার্ত নেকড়ের মধ্যে লড়াই করতে হয়েছিল খাবারের জন্য। ইভান সেদিন নেকড়েটাকে খালি হাতে ছিঁড়ে ফেলেছিল। সেদিন তার নানা অট্টহাসি দিয়ে বলেছিলেন—
“আজ থেকে তোর নাম আর ইভান নয়, আজ থেকে তুই ‘মেইলস্ট্রোম’। কারণ তুই যেখানে যাবি, সেখানে শুধু ধ্বংস আর রক্তগঙ্গা বইবে।”

কিং হওয়ার পথটা মোটেও সুশোভিত ছিল না। তাকে নিজের হাতে নিজের বন্ধুদের মারতে হয়েছে বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণের জন্য। কত রাত সে ঘুমাতে পারেনি কারণ তার চোখে ভেসে উঠত সেই সব মানুষের মুখ, যাদের সে তার সিংহাসনের সিঁড়ি বানিয়েছে। এক পর্যায়ে সে অনুভব করল, তার হৃদপিণ্ডটা পাথরের হয়ে গেছে। মায়া, মমতা বা ভালোবাসা—এই শব্দগুলো তার অভিধান থেকে মুছে গেছে। সে নিজেকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে যেখানে সে ব্যথা পায় না, শুধু ব্যথা দিতে জানে।

ইভানের চোখ এখন আর লাল নয়, বরং এক ভয়াবহ শীতলতায় ঢাকা। সে জানে, পশু হওয়ার সুবিধা একটাই—তাকে আর নৈতিকতার দোহাই দিয়ে থামানো যায় না।
ইভানের স্মৃতির পাতাগুলো এখন আর শুধু ধূসর নয়, সেগুলো টকটকে লাল রক্তে ভেজা। মাফিয়া সাম্রাজ্যের সিংহাসনে বসার আগে তাকে যে অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়েছে, তা কোনো সাধারণ মানুষের কল্পনারও বাইরে। সেদিনের সেই ছোট ইভান কীভাবে আজকের এই নৃশংস ‘মেইলস্ট্রোম’ হয়ে উঠল, সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে আজও তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। ইভানের আরো মনে পড়ল মেক্সিকোর সেই কুখ্যাত ‘ডেথ ক্যাম্প’-এর কথা। ডার্ক লর্ড নানা তাকে বলেছিলেন, “যদি মানুষের ওপর রাজত্ব করতে চাও, তবে আগে নিজের ভেতর থেকে মানুষটাকে মেরে ফেলো।”
তাকে পনেরো দিন একটা ভূগর্ভস্থ কুঠুরিতে আটকে রাখা হয়েছিল যেখানে এক ফোঁটা পানিও ছিল না। যখন তৃষ্ণায় তার বুক ফেটে যাচ্ছিল, তখন তার সামনে নিয়ে আসা হয়েছিল তার এক বিশ্বস্ত সঙ্গীর দেহ, যার গলা একটু আগেই কেটে দেওয়া হয়েছে। তাকে আদেশ দেওয়া হয়েছিল— “তৃষ্ণা মেটাতে চাইলে এই রক্তই তোমার পানীয়।” ইভান সেদিন প্রথমবার বুঝেছিল বেঁচে থাকার লড়াই কতটা বীভৎস হতে পারে। জীবনের মায়া ত্যাগ করে, নিজের বিবেককে কবর দিয়ে সে সেদিন সেই উষ্ণ রক্ত পান করেছিল। সেই দিন থেকেই ইভানের মানুষের প্রতি মায়া চিরতরে মুছে যায়। তার ঠোঁটে লেগে থাকা সেই রক্তের স্বাদ তাকে এক অদ্ভুত আদিম শক্তি দিয়েছিল। সে বুঝেছিল, এই পৃথিবীতে দয়া মানেই মৃত্যু। নৃশংসতার এখানেই শেষ ছিল না। তাকে শেখানো হয়েছিল কীভাবে জ্যান্ত মানুষের হাড়ের জোড়াগুলো একটা একটা করে খুলে ফেলতে হয়। তাকে এমন সব অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হতো যেখানে অপরাধীকে মারার চেয়ে বেশি জরুরি ছিল তাকে তিল তিল করে যন্ত্রণার চরম সীমায় নিয়ে যাওয়া। একবার এক বিশ্বাসঘাতককে শাস্তি দেওয়ার সময় ইভানকে বলা হয়েছিল তার চামড়া জ্যান্ত অবস্থায় ছাড়িয়ে নিতে। ইভান এক বিন্দু হাত না কাঁপিয়ে সেই কাজ করেছিল। তার চারপাশের চিৎকারগুলো তার কানে তখন সঙ্গীতের মতো লাগত। সেদিন থেকে সে আর কোনো সাধারণ বিছানায় ঘুমাতে পারত না। তার নাকে সবসময় লেগে থাকত পচা মাংস আর রক্তের কটু গন্ধ। সিংহাসন দখলের লড়াইয়ে সে নিজের হাতে সত্তরজন শক্তিশালী যোদ্ধাকে এক রাতে নিকেশ করেছিল। তাদের প্রত্যেকের হৃৎপিণ্ড সে নিজের হাতে উপড়ে নিয়েছিল শুধু এটা প্রমাণ করতে যে—সে কোনো জারজ নয়, সে স্বয়ং শয়তানের অবতার।

ফিরে আসা বর্তমানে:
ইভান তার গাড়ির জানালার কাচে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখল। এই দামী সুট, এই ক্ষমতা, এই কয়েক হাজার কোটি টাকার সাম্রাজ্য—সবই এসেছে সেই পশুত্বের বিনিময়ে। সে আজ মেক্সিকোর কিং ঠিকই, কিন্তু এই মুকুটের প্রতিটি হীরা কারো না কারো রক্তে ভেজা। সে বিড়বিড় করে বলল, “বাবা… আপনি আমাকে জারজ বলে তাড়িয়ে দিয়ে ভেবেছিলেন আমি হারিয়ে যাব? অথচ আপনার সেই ঘৃণা আমাকে এই নরকের রাজা বানিয়েছে। এখন আমি আপনার সাজানো পৃথিবীর প্রতিটি ইট খুলে নেব। আপনি যাকে তুচ্ছ করেছিলেন, তার পায়ের নিচেই আপনার পুরো বংশ মাথা নত করবে।”

ঠিক তখনই তান্বীর মেরুদণ্ড দিয়ে এক হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। সে অনুভব করল দূর থেকে কেউ তাকে তীক্ষ্ণ নজরে বিদ্ধ করছে। একটু আড়ালে, বিশাল এক পাইন গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে মেইলস্ট্রোম। তার চোখে কোনো শোক নেই, আছে কেবল তান্বীর ওপর এক ভয়ংকর অধিকারবোধের ছাপ। মেইলস্ট্রোমের সেই শীতল চাহনি দেখা মাত্রই তান্বী আতঙ্কে কুঁকড়ে গেল। তার দুহাত কাঁপতে শুরু করল। জাভিয়ান মুহূর্তেই তান্বীর এই পরিবর্তন টের পেল। সে চট করে চারপাশটা দেখে নিল, যদিও মেইলস্ট্রোম ততক্ষণে আবার আড়ালে চলে গেছে। জাভিয়ান কোনো কথা না বলে তান্বীর কাঁধে হাত রাখল। সে তান্বীকে আরও শক্ত করে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। তার আলিঙ্গনের এই বাড়তি চাপ যেন এক নিঃশব্দ ঘোষণা যে সে তান্বীকে কোনোভাবেই হাতছাড়া করবে না। রিচুয়ালগুলো একে একে শেষ হচ্ছে। কফিন নামিয়ে দেওয়ার সময় যখন সবাই মাটি দিচ্ছিল, তখনো সাইফ চৌধুরী আর ইসাবেলার চোখের লড়াই থামেনি। ঘৃণা আর ভালোবাসার এই অসম যুদ্ধে কে হারবে আর কে জিতবে, তা হয়তো এই গোরস্থানের নিস্তব্ধতাই জানে।

তান্বীর দুশ্চিন্তা অন্য জায়গায়। মেইলস্ট্রোম এখানে কেন এল? সে কি শুধু তান্বীকে এক ঝলক দেখতে এসেছে, নাকি এই শোকের আবহে বড় কোনো ঝড়ের পরিকল্পনা করে রেখেছে? পাইন গাছের পাতার প্রতিটি খসখস শব্দে তান্বী এখন কেবল মেইলস্ট্রোমের সেই হিংস্র নিশ্বাস শুনতে পাচ্ছে।
চার্চের গোরস্থানের সেই থমথমে পরিবেশে মেইলস্ট্রোম যখন আড়াল থেকে বেরিয়ে এল, তখন চারপাশের বাতাস আরও কয়েক ডিগ্রি শীতল হয়ে গেল। সে ধীর পায়ে অত্যন্ত মার্জিত ভঙ্গিতে জাভিয়ান আর তান্বীর দিকে এগিয়ে এল। তার মুখে এক বিচিত্র এবং শীতল হাসি ছিল, যা দেখে তান্বীর হৃৎপিণ্ড এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। মেইলস্ট্রোম সরাসরি তান্বীর চোখের দিকে একবার তাকাল। সেই দৃষ্টিতে ছিল এক অব্যক্ত দহন, যা তান্বীর অনাগত সন্তান আর তার শরীরের প্রতিটি অণুকে যেন অভিশাপ দিচ্ছিল। এরপর সে জাভিয়ানের দিকে তার হাত বাড়িয়ে দিয়ে খুব নিচু অথচ গম্ভীর স্বরে বলল, “অভিনন্দন জাভিয়ান এমিলিও চোধুরী! তোমার বংশের প্রদীপ আসতে চলেছে শুনে খুব ভালো লাগল। কনগ্রাচুলেশনস!”

জাভিয়ান মেইলস্ট্রোমের চোখের সেই ধূর্ত চাউনি দেখে মুহূর্তেই সতর্ক হয়ে গেল। সে জানে, মেইলস্ট্রোম এমন মানুষ নয় যে হৃদয়ের গভীর থেকে কাউকে শুভেচ্ছা জানাবে। ওর এই শুভেচ্ছার পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো ভয়ংকর ষড়যন্ত্র কিংবা বিষাক্ত পরিকল্পনা। মেইলস্ট্রোম আসলে জাভিয়ানের সুখকে উপহাস করছে। জাভিয়ান মেইলস্ট্রোমের বাড়ানো হাতের দিকে একবার তাকাল ঠিকই, কিন্তু হাত মেলাল না। সে তান্বীর কাঁধ জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল। জাভিয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে শীতল গলায় শুধু বলল, “ধন্যবাদ। তবে আমাদের এখন বেরোতে হবে।”
জাভিয়ান এক মুহূর্তও সেখানে অপেক্ষা করার ঝুঁকি নিল না। সে জানে, মেইলস্ট্রোমের উপস্থিতি মানেই তান্বীর জন্য চরম মানসিক চাপ। সে দ্রুত তান্বীকে নিয়ে ভিড় ঠেলে পার্কিং লটের দিকে হাঁটা দিল। তান্বী একবার পেছন ফিরে তাকাল। দেখল মেইলস্ট্রোম এখনো সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখেমুখে এক পৈশাচিক তৃপ্তি খেলা করছে। যেন সে মনে মনে বলছে, পালিয়ে কোথায় যাবে জাভিয়ান? আমার স্ট্রোমহাউজের ছায়া থেকে মুক্তি পাওয়া এত সহজ নয়।

গাড়িতে ওঠার পর তান্বী ভয়ে ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে গেল। জাভিয়ান তান্বীর হাতটা শক্ত করে ধরে বলল, “ভয় পেও না তান্বী। ও শুধু ওর মানসিক বিকৃতি দেখাচ্ছে। আমি থাকতে ওর কোনো ছায়াও তোমার ওপর পড়বে না।”
কিন্তু তান্বীর মনের কোণে তখন একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল। মেইলস্ট্রোম কি সত্যিই জাভিয়ানের সন্তানের সহজ আগমন মেনে নেবে? নাকি এই শুভেচ্ছা ছিল বড় কোনো ধ্বংসের শুরু?
.
.
.
রাত যত গভীর হচ্ছে, স্ট্রোমহাউজের সেই বিশাল অন্ধকার ঘরে মেইলস্ট্রোমের উন্মাদনা যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। সে ডাইনিং টেবিলের এক প্রান্তে বসে একটা মদের গ্লাসে আঙুল বোলাচ্ছে আর তার চোখের সামনে বারবার তান্বীর সেই ভীত-সন্ত্রস্ত মুখটা ভেসে উঠছে। কতদিন পর! কতদিন পর সে তার ‘তন্ময়তা’কে এত কাছ থেকে দেখল। মেইলস্ট্রোম চোখ বন্ধ করতেই অনুভব করল তান্বীর সেই চেনা ঘ্রাণ, তার গায়ের কম্পন—সবই যেন এখনো তার আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তান্বী তার সামনে নেই, কিন্তু মেইলস্ট্রোমের বিকৃত মস্তিষ্ক তাকে ঘরের প্রতিটি কোণায় দেখতে পাচ্ছে। সে বিড়বিড় করে বলল—”তুমি কি জানো সোলফ্লেম, আজ তোমাকে দেখে আমার ভেতরের মরুভূমিটা আবার জেগে উঠেছে? জাভিয়ানের বাহুবন্দি হয়ে তুমি ভাবছ খুব সুরক্ষিত আছ? না… তুমি এখনো আমার সেই অদৃশ্য শিকলে বাঁধা।”
সে চোখ খুলল। ডাইনিং টেবিলের উল্টো দিকের দেওয়ালে টাঙানো তান্বীর বিশাল, বাঁধানো ছবিটার দিকে তার দৃষ্টি স্থির হলো। ছবির তান্বী হাসছে, এক প্রাণবন্ত হাসি। মেইলস্ট্রোম অপলক দৃষ্টিতে সেই ছবির দিকে তাকিয়ে রইল, আর তখনই ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেসে এল একটা গানের সুর। স্পিকারে তখন গান চলছে—

“তুমহারি তাসবিরকে সাহারে মসাম কায়ি গুজারে, মসামইনা সামঝো পার ইশক কোন হামারে, নাজরো কে সামনে মে আতা নেহি তুমহারে, মাগার রেহেতে হো হার পাল মানজার মে হামারে,”

গানের প্রতিটি শব্দ যেন মেইলস্ট্রোমের ভেতরের ক্ষতগুলোকে আরও গভীর করে তুলছে। সে ছবির তান্বীর দিকে তাকিয়ে মদের গ্লাসটা উঁচিয়ে ধরল, যেন তাকেই চিয়ার্স জানাচ্ছে। “

আগার ইস্কসে হে মিলা, ফির দারদেসে কেয়া গিলা, ইস দারদে মে জিন্দেগি খুশ হাল হে, এ দুরিয়া ফিল হাল হে…….”

তার ঠোঁটে এক পৈশাচিক হাসি ফুটে উঠল। হঠাৎ তার মাথায় এক ভয়ংকর সমীকরণ কাজ করতে শুরু করেছে। সে ভাবল, খালার মৃত্যুতে যদি তান্বী এই বাড়িতে পা রাখতে বাধ্য হয়, তবে এমন পরিস্থিতি বারবার তৈরি করা সম্ভব। তান্বীকে তার কাছে ফিরিয়ে আনার জন্য যদি কারো মৃত্যু প্রয়োজন হয়, তবে সে সেই মৃত্যু উপহার দিতেও কার্পণ্য করবে না।
সে তার ডায়েরিতে খসখস করে কিছু একটা লিখল। গানের সুরের সাথে তাল মিলিয়ে তার ভাবনাগুলো এখন আরও বিষাক্ত— “যদি একটা মৃত্যু তোমাকে আমার বাড়ির দোরগোড়ায় নিয়ে আসতে পারে, তবে মেক্সিকো সিটিতে লাশের পাহাড় গড়তে আমার আপত্তি নেই। এমন কার মৃত্যু হলে তান্বী, তুমি আবারও ছুটে আসবে? কার রক্ত ঝরলে তুমি আবারও আমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপবে?”

মেইলস্ট্রোম বুঝতে পারছে, তান্বীকে সরাসরি তুলে আনা এখন কঠিন কারণ জাভিয়ান তাকে ছায়ার মতো আগলে রাখছে। আবার তার অনাগত সন্তান। কিন্তু ‘সামাজিক শোক’ বা ‘পারিবারিক বিপর্যয়’ এমন এক ফাঁদ, যা থেকে তান্বী বেরোতে পারবে না। সে গ্লাসের বাকি মদটুকু এক চুমুকে শেষ করে উঠে দাঁড়াল। তান্বীর ছবিটার খুব কাছে গিয়ে দাঁড়াল সে। ছবির কাঁচের ওপর আলতো করে আঙুল বুলাল। গানের সুর তখনো চলছে, “খেরিয়াত পুছো, কাভিতো কেফিয়াত পুছো, তুমহারে বিন দিবানেকা কেয়া হাল হ্যাঁ? দিল মেরা দেখো না মেরি হেসিয়াত পুছো তেরে বিন একদিন জ্যাসে ‘স’ সাল হে……”

কিন্তু মেইলস্ট্রোমের কানে তখন কেবল তান্বীর কান্নার আওয়াজ। জানালার বাইরে তাকিয়ে সে অন্ধকারের সাথে কথা বলতে লাগল—”সোলফ্লেম, তুমি তৈরি থাকো। খুব শীঘ্রই আবারও এই বাড়িতে কালো পোশাক পরে তোমাকে আসতে হবে। সেদিন আর শুধু অভিনন্দন নয়, সেদিন আমি তোমার অস্তিত্বের গভীরে প্রবেশ করব। এই ছবিটা সাক্ষী রইল তান্বী, তুমি জাভিয়ানের নও, তুমি চিরকাল শুধু এই মেইলস্ট্রোমের।”

গোরস্থান থেকে ফেরার পর থেকেই তান্বীর ভেতরটা অস্থির হয়ে আছে। বাড়িতে ফিরে জাভিয়ানকে যখন সে একা পেল, আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ড্রয়িংরুমের আবছা আলোয় জাভিয়ানের হাত ধরে তান্বী প্রশ্ন করল—
“জাভিয়ান, আজ গোরস্থানে যা দেখলাম, যা বুঝলাম?…সেদিন আসলে কী হয়েছিল? ইসাবেলা চাচি কেন তার ছেলেকে নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন?”

জাভিয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তান্বীর চোখের দিকে তাকাল। তার চোখে আজ এক অদ্ভুত শূন্যতা। সে বলতে শুরু করল—”সবটাই ছিল একটা সাজানো নরক তান্বী। আমার আর আমার ভাইয়ের যখন জন্ম হয়, তখন আমাদের মা সবসময় পার্টি আর বন্ধুদের নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। আমাদের দেখাশোনা করত একজন সার্ভেন্ট। কিন্তু ইসাবেলা চাচি… তিনি আমাদের নিজের মায়ের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন। তার নিজের ছেলে ইভানের চেয়েও তিনি আমাদের আগলে রাখতেন। কিন্তু হঠাৎ একদিন চাচি নিখোঁজ হয়ে যান।”
জাভিয়ান থামল, তার গলার স্বর ধরে আসছে। “অনেকদিন পর চাচি যখন ফিরে এলেন, তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত। আসলে চাচির বাবা ছিলেন মেক্সিকোর ডার্ক লর্ড। তিনি চেয়েছিলেন তার মেয়ে কোনো মাফিয়াকে বিয়ে করুক, আমার চাচার মতো সাধারণ বিজনেস ম্যানকে নয়। যেদিন চাচিকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়, তার ওপর অমানুষিক শারীরিক অত্যাচার করা হয়। সেই মাফিয়া, যার সাথে চাচির বিয়ে ঠিক হয়েছিল, সে চাচিকে না পাওয়ার রাগে এই প্রতিহিংসা চালিয়েছিল কিন্তু চাচির বাবা এতে কোনো প্রতিবাদ করেননি।”

তান্বী শিউরে উঠে বলল, “তারপর?”
“চাচা যখন চাচিকে ফিরে পেলেন, তিনি সত্য জানার চেষ্টা না করে উল্টো সন্দেহ করলেন। সেই মাফিয়া কিছু মিথ্যা প্রমাণ সাজিয়েছিল যাতে মনে হয় চাচির সাথে তার আগে থেকেই প্রেমের সম্পর্ক ছিল। সে দাবি করল ইভান আসলে চাচার নয়, বরং তার সন্তান। অপমান আর সন্দেহে অন্ধ হয়ে সাইফ চাচা সেদিন ডিএনএ টেস্ট করতেও অস্বীকার করলেন। তিনি ইভানকে ‘জারজ’ বলে গালি দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিতে চাইলেন।” জাভিয়ানের চোখের কোণে এক ফোঁটা জল চিকচিক করে উঠল। “চাচি সেদিন অপমানে ইভানকে নিয়ে ঘর ছাড়লেন। আমি সেদিন প্রথমবার কেঁদেছিলাম তান্বী। আমার ছোট মনে বারবার প্রশ্ন আসছিল—চাচি আর ইভান কোথায় যাবে? কীভাবে থাকবে? আমি লুকিয়ে আমার জমানো কিছু টাকা সেদিন চাচির হাতে তুলে দিয়েছিলাম। এর অনেক বছর পর যখন সব সত্যি বেরিয়ে এল, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। তিল তিল করে পুড়তে পুড়তে সেই মমতাময়ী চাচি আজ ‘মাফিয়া কুইন’ হয়ে গেছেন, আর ইভান হয়ে উঠেছে সবচেয়ে ভয়ংকর ‘মেইলস্ট্রোম’। চাচা তখন অনুশোচনার বদলে চাচিকে আরও বেশি ঘৃণা করতে শুরু করলেন।”

তান্বী স্তম্ভিত হয়ে বলল, “তার মানে চাচির এই বদলে যাওয়া, ইভানের এই পশু হওয়া—সবটাই তো সাইফ চাচার দোষ! তিনি যদি সেদিন বিশ্বাস করতেন, তবে এমনটা হতো না।”

জাভিয়ান তান্বীর দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসল। “এই বংশের রক্ত বিষাক্ত তান্বী। আমার মা-বাবা, চাচা—এরা কেউ আপন নয়। সবাই শুধু নিজের স্বার্থ দেখে। আমি চাই না এই বিষাক্ত ছায়া আমাদের সন্তানের ওপর পড়ুক।”ৎজাভিয়ানের এই স্বীকারোক্তি তান্বীকে এক গভীর আতঙ্কে ফেলে দিল। সে বুঝতে পারল, ইভানের এই প্রতিহিংসা শুধু চাচার বিরুদ্ধে নয়, এই পুরো বংশের বিরুদ্ধে। আর সেই আগুনেই কি তাকে আর তার সন্তানকে পুড়তে হবে?

জাভিয়ান তান্বীর থরথর করে কাঁপতে থাকা হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল। তান্বীর চোখেমুখে যে আতঙ্ক, তা জাভিয়ানকে অপরাধবোধে বিদ্ধ করছে। সে জানে, এই বাড়িতে থাকা মানে প্রতিদিন তিল তিল করে মরা। বিষাক্ত অতীত আর ইভানের রক্তক্ষয়ী প্রতিশোধের মাঝখানে তান্বী আর তার অনাগত সন্তান পিষ্ট হচ্ছে। জাভিয়ান তান্বীর কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে খুব নিচু এবং দৃঢ় স্বরে বলল—”শোনো জিন্নীয়া, আমি আর একটা মুহূর্তও দেরি করতে চাই না। এই দেওয়ালের প্রতিটি ইটে অভিশাপ লেগে আছে। এখানে ভালোবাসা নেই, আছে শুধু ঘৃণা আর স্বার্থপরতা। আমি ঠিক করেছি, আমাদের সন্তানটা পৃথিবীতে আসার সাথে সাথেই আমরা এই মেক্সিকো, এই ভিলা এস্পেরেন্জা—সব ছেড়ে চিরতরে দূরে কোথাও চলে যাব।”

তান্বী চোখের জল মুছে অস্ফুট স্বরে বলল, “কিন্তু ইভান? সে কি আমাদের যেতে দেবে? সে তো এখন পুরো শহরের রাজা।”

জাভিয়ান এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হলো, কিন্তু পরক্ষণেই তার চোখে দেখা দিল এক অদ্ভুত সংকল্প। সে বলল—”ইভান আমার ভাই হতে পারে, কিন্তু সে এখন মেইলস্ট্রোম। সে ধ্বংস করতে এসেছে। কিন্তু তান্বী, আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, আমি আমার সবটুকু ক্ষমতা দিয়ে তোমাকে আর আমাদের বাচ্চাকে রক্ষা করব। আমরা এমন এক জায়গায় যাব যেখানে ইভানের ছায়া পৌঁছাবে না, যেখানে সাইফ চাচার অন্ধকার অতীত আমাদের তাড়া করবে না। আমরা শুধু আমরা হবো—তুমি, আমি আর আমাদের ছোট একটা পৃথিবী।”

জাভিয়ান তান্বীকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। তার আলিঙ্গনে আজ এক ধরণের মরিয়া ভাব। সে জানে, পালানোটা সহজ হবে না। একদিকে ইভানের সেই আকাঙ্ক্ষা তান্বীর প্রতি, আর অন্যদিকে চৌধুরীবংশের সেই অদৃশ্য শিকল। কিন্তু তান্বীর পেটে বাড়তে থাকা নতুন প্রাণের জন্য জাভিয়ান আজ নিজের রক্তের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেও প্রস্তুত।

দুই দিন পর। ভিলা এস্পেরেন্জার ড্রয়িংরুমে আজ যেন শ্মশানের মতো স্তব্ধতা, যা যেকোনো মুহূর্তে অগ্নিকাণ্ডে রূপ নিতে পারে। মার্কোর কানে যখন পৌঁছালো যে লুসিয়াকে ফারহান নামের এক ছেলে সবার সামনে থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে এবং নিজেকে লুসিয়ার স্বামী পরিচয় দিয়েছে, তখন থেকেই মার্কোর রক্ত টগবগ করে ফুটছে। আজ ড্রয়িংরুমে বিচারসভা বসেছে। একদিকে সাইফ চৌধুরী ও মার্কো, অন্যদিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে লুসিয়া। লুসিয়া শান্ত গলায় সবার সামনে ঘোষণা করল— সে তান্বীর ভাই ফারহানকে বিয়ে করে ফেলেছে। কথাটা শেষ হতে না হতেই সাইফ চৌধুরী হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে লুসিয়ার গালে এক প্রচণ্ড থাপ্পড় বসিয়ে দিলেন। লুসিয়া ছিটকে সোফার ওপর পড়ল। মার্কোও দাঁত কিড়মিড় করে থাপ্পড় মারার জন্য তেড়ে উঠতে গেলে জাভিয়ান বিদ্যুৎবেগে এসে মার্কোর কবজি শক্ত করে ধরে ফেলল।

জাভিয়ান গম্ভীর স্বরে বলল, “বোনের গায়ে হাত তুলবি না মার্কো। যা বলার মুখ দিয়ে বল।”

মার্কো ঝটকা দিয়ে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে চিৎকার করে উঠল, “হাত ছাড়ো ব্রো! ও তোমার আপন বোন নয় বলে হয়তো তোমার গায়ে লাগছে না। কিন্তু ও কাকে বিয়ে করেছে শুনেছ? ওই বাংলাদেশের ছেলেটাকে? ওর সাথে লুসিয়ার যায়? মেক্সিকোর কত বড় বড় বিজনেস টাইকুনের ছেলেরা আমাদের সাথে সম্পর্ক করতে চায়, তাদের সাথে বিয়ে হলে আমাদের বংশের নাম হতো, পাওয়ার বাড়ত!”

জাভিয়ান এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। তার চোখেমুখে এখন গভীর ঘৃণা। সে বলল, “বংশের নাম করতে হলে কি বোনের বিয়ে দিতে হয় ? নিজের কোনো যোগ্যতা নেই? আর তুইতো সারাক্ষন বই লাইব্রেরী এসব নিয়ে থাকিস ক্ষমতা! পাওয়ারস! এসব কবে থেকে ভাবিস?? তোর কথা বলার ধরণটা একদম সায়েম চৌধুরীর মতো লাগছে। মাঝে মাঝে তোকে দেখলে আমার এখন সন্দেহ হয়— তুই কি সত্যিই চাচার ছেলে নাকি সায়েম চৌধুরীর ছায়া?”

মার্কো অপমানে নীল হয়ে গেল। সে জানত সায়েম চৌধুরীর সাথে তার তুলনা করাটা কতটা বড় অপমান। সে গর্জে উঠে বলল, “তুমি কী বলতে চাও জাভিয়ান ব্রো? তুমি কি বলতে চাইছ ওই সাধারণ ছেলেটাকে লুসিয়া বিয়ে করবে আর আমরা মেনে নেব?”

ড্রয়িংরুমের উত্তাপ প্রতি মুহূর্তে বাড়ছে। জাভিয়ান মার্কোর চোখে চোখ রেখে শান্ত কিন্তু অত্যন্ত কঠিন গলায় বলল, “লুসিয়া এখন আর ছোট নেই মার্কো। ও নিজের ভালো-মন্দ বোঝে। ওর জীবন ওকে নিজের মতো করে সাজাতে দে, সিদ্ধান্ত নিতে দে।”

মার্কো তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। তার চোখেমুখে তখন রাজ্যের ঘৃণা। সে চিৎকার করে বলল—”সিদ্ধান্ত? তুমি একে সিদ্ধান্ত বলছ? জাভিয়ান, তুমি কি জানো ওই ছেলেটা কে? ও একটা ছিঁচকে গ্যাংস্টার! যার পুরো পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে ওই মাফিয়া রিকার্দোর সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে। ওর নিজের বড় বোন মরেছে, পুরো পরিবারটা রাস্তায় বসেছে। আর তুমি বলছ এই ছন্নছাড়া ছেলেটা আমার বোনকে আগলে রাখবে? ও তো নিজের পরিবারকেই বাঁচাতে পারেনি!”

মার্কোর এই বিষাক্ত কথাগুলো তান্বীর বুকে তীরের মতো বিঁধল। সে আর আড়ালে থাকতে পারল না। ধীর পায়ে ড্রয়িংরুমের মাঝখানে এসে দাঁড়াল তান্বী। তার দুচোখে জল থাকলেও কণ্ঠে ছিল এক অটল বিশ্বাস। সে মার্কোর দিকে তাকিয়ে বলল— “মার্কো ভাইয়া, আপনি যেটাকে ঘৃণা বলছেন, সেটা আসলে আমার ভাইয়ের জীবনের সংগ্রাম। হ্যাঁ, আমার ভাইয়া যা করেছিল সেটা অপরাধ ছিল, পরিস্থিতির শিকার হয়ে সে ভুল পথে পা বাড়িয়েছিল। কিন্তু তার মানে এই নয় যে সে মানুষ হিসেবে খারাপ। ফারহান ভাইয়া যথেষ্ট ভালো ছেলে। ও লুচি আপাকে কতটা ভালোবাসে সেটা আমি জানি।”

তন্বী এক মুহূর্ত থামল, তারপর আরও জোরালো গলায় বলল—”ফারহান ভাইয়া লুচি আপাকে নিজের জীবন দিয়ে আগলে রাখবে ভাইয়া। নিজের জীবন গেলেও ও লুচি আপার গায়ে একটা আঁচড় লাগতে দেবে না। আপনারা শুধু আভিজাত্য আর টাকা দেখেন, কিন্তু আমার ভাইয়া দেখেছে লুচি আপার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।”

সাইফ চৌধুরী চেয়ারে ধপ করে বসে পড়লেন। তার নিজের মেয়ে আজ তার অবাধ্য, তার বড় ভাতিজা আজ বিদ্রোহ করছে, আর যে মেয়েটা এই বাড়ির বউ,সেও তার ভাইয়ের পক্ষ নিয়ে কথা বলছে। মার্কো তান্বীর দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু জাভিয়ান মাঝপথে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “যথেষ্ট হয়েছে মার্কো। তান্বী ঠিকই বলেছে। যদি লুসিয়া ফারহানের কাছে সুখী হয়, তবে তাই হোক।”

ড্রয়িংরুমের বাতাস এখন বারুদ হয়ে ফেটে পড়ার অপেক্ষায়। মার্কোর চোখেমুখে এক ধরণের ক্রুর ধূর্ততা। সে জাভিয়ানের কথা পাত্তাই দিল না, বরং সরাসরি লুসিয়ার সামনে গিয়ে এক চরম শর্ত ছুঁড়ে দিল। তার কণ্ঠস্বরে কোনো ভাইয়ের মমতা নেই, আছে কেবল সম্পদের অহংকার।
মার্কো দাঁত কিড়মিড় করে বলল—”লুসিয়া, এটাই তোর শেষ সুযোগ। তুই আজই সিদ্ধান্ত নে কী করবি। আমাদের কথামতো যদি চলিস, তবে এই ভিলা এস্পেরেন্জার রাজকীয় জীবন আর চৌধুরী বংশের পাহাড়সমান সম্পদের ভাগ পাবি। আমরা তোর বিয়ে এমন এক ছেলের সাথে দেব যে তোকে রানীর মতো রাখবে। আর যদি জেদ ধরে বলিস ওই বাংলাদেশি ছেলেটার কাছেই যাবি, তবে মনে রাখিস— এই বাড়ির একটা সুতোও তুই পাবি না। এখনি যা আছে সব ফেলে দিয়ে শুধু জামাকাপড় নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যা!”
পুরো ঘরে নিস্তব্ধতা নেমে এল। সবাই ভাবল লুসিয়া হয়তো ভেঙে পড়বে। কিন্তু লুসিয়া তার চোখের জল মুছে এক তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। তার সেই হাসিতে ছিল আজন্মের ঘেন্না আর মুক্তির আনন্দ।লুসিয়া সরাসরি মার্কোর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল—”তোমাদের এই টাকা-পয়সা আর সম্পদের মোহ এখন আমার আর নেই মার্কো ব্রো। তোমার এই নোংরা আভিজাত্য তুমি সাথে করে কবরে নিয়ে যেও, আমার তাতে বিন্দুমাত্র আফসোস নেই। তোমার ভিলা এস্পেরেন্জায় থাকার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা আমার আর অবশিষ্ট নেই।” সে তার গলার দামি হিরের লকেটটা খুলে টেবিলের ওপর ছুড়ে মারল। তারপর শান্ত কিন্তু গম্ভীর গলায় যোগ করল—”আমাকে ভুলেও আর কোনোদিন খুঁজবেনা। আমি আজ এই মুহূর্তেই চলে যাচ্ছি। আর কাপড়-চোপড়? আমার কিচ্ছু চাই না তোমাদের বাড়ির। যা পরে আছি, এই পোশাকেই আমি নিজের পথে বেরিয়ে যাচ্ছি। আজ থেকে আমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করবে না তুমি, আর না ড্যাড।”

লুসিয়া এক মুহূর্তও পেছনে ফিরে তাকাল না। তার দৃপ্ত পদক্ষেপে ছিল এক পাহাড়সম তেজ। সাইফ চৌধুরী চেয়ার ধরে বসে পড়লেন, তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তান্বী লুসিয়ার সাহসিকতা দেখে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
লুসিয়া যখন ধীর অথচ দৃঢ় পায়ে ভিলা এস্পেরেন্জার সদর দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন পুরো ড্রয়িংরুমে এক অস্থির নীরবতা নেমে এলো। তান্বী আর সহ্য করতে পারল না। সে জাভিয়ানের হাতটা খামচে ধরে ফিসফিস করে কেঁদে উঠল।”জাভিয়ান, প্লিজ কিছু একটা করুন! লুচি আপাকে আটকান। উনি এক পোশাকে, কিচ্ছু না নিয়ে এভাবে একা কোথায় যাবেন? মেক্সিকোর এই অন্ধকার রাতে উনি কিভাবে যাবেন? প্লিজ ওনাকে যেতে দেবেন না!” তান্বীর কণ্ঠে আকুতি ঝরে পড়ছিল। সে ভাবতেই পারছিল না এই রাজকীয় ঐশ্বর্যের মেয়েটি কীভাবে শূন্য হাতে পথে নামবে।
জাভিয়ান নড়ল না। সে অপলক দৃষ্টিতে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল, যেখান দিয়ে লুসিয়া বেরিয়ে যাচ্ছে। তার চোখে আজ এক অদ্ভুত গর্ব। সে তান্বীর দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল—”কিছু বলতে হবে না তান্বী। লুসিয়া চৌধুরী তোমার মতো অত সহজ-সরল বা নরম মনের নয়। ওকে দেখে আজ তোমার মায়া হচ্ছে, কিন্তু তুমি জানো না— ও চৌধুরী বংশের রক্ত। ওর শরীরের প্রতিটি রক্তকণিকায় আভিজাত্যের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের বংশের সেই আদিম জেদ।” জাভিয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বলল, “ও একাই চলতে পারবে। যে মেয়ে এই প্রাসাদের সব সুখ এক মুহূর্তে লাথি মেরে ফেলে দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে, তাকে আটকানোর ক্ষমতা কারো নেই। ওর মধ্যে সেই জেদটা আছে যা ওর ভাই ইভানের মধ্যে আছে। ইভানকে যখন বের করে দেওয়া হয়েছিল, সেও এভাবেই শূন্য হাতে লড়াই শুরু করেছিল। লুসিয়া প্রমাণ করে দিল, সে ইভানেরই বোন।”

তান্বী স্তব্ধ হয়ে জাভিয়ানের কথাগুলো শুনল। সে বুঝতে পারল, এই পরিবারে ভালোবাসা হয়তো কম, কিন্তু দম্ভ আর জেদ পাহাড়ের মতো শক্ত। জাভিয়ান জানত, লুসিয়াকে এখন আটকানো মানে তাকে অপমান করা। সে চায় লুসিয়া নিজের পায়ে দাঁড়াক, এই বিষাক্ত ছায়া থেকে দূরে থাকুক।
বাইরে তখন ইঞ্জিনের গর্জন শোনা গেল। লুসিয়া একবারও পেছনে তাকায়নি। সাইফ চৌধুরী তখনো পাথরের মূর্তির মতো সোফায় বসে আছেন। তার মেয়ে আজ তাকে অস্বীকার করে বেরিয়ে গেছে। ভিলা এস্পেরেন্জা আজ সত্যিই এক বিশাল খাঁচায় পরিণত হলো, যেখানে সম্পদ আছে কিন্তু শান্তি নেই।

জাভিয়ান তান্বীর কাঁধে হাত রেখে নিচু স্বরে বলল, “চিন্তা করো না তান্বী। ফারহান ওকে আগলে রাখবে। আর আমাদের এই চৌধুরী বংশের জেদ যখন কারো মাথার ওপর চেপে বসে, তখন সে পরাজয় মানে না।”

ট্যাক্সিটা যখন ফারহানের অ্যাপার্টমেন্টের সামনে থামল, লুসিয়ার বুকের ভেতরটা ধকধক করছিল। পেছনে ফেলে আসা ওই বিশাল রাজপ্রাসাদ, বাবার আক্রোশ আর মার্কোর দম্ভ—সব কিছু এক নিমেষে ম্লান হয়ে গেছে। লুসিয়া ট্যাক্সি থেকে নামল। তার হাতে কোনো ব্যাগ নেই, কোনোকিছু নেই; আছে কেবল এক বুক জেদ। সে দ্রুত লিফট দিয়ে উপরে উঠে ফারহানের ফ্ল্যাটের দরজায় নক করল। ভেতর থেকে ফারহান দরজা খুলতেই স্থবির হয়ে গেল। সে কল্পনাও করেনি লুসিয়া এভাবে একা, এতো রাতে এই অবস্থায় তার দরজায় এসে দাঁড়াবে।

“লুসিয়া! তুমি এখানে? এতো রাতে?” ফারহানের কণ্ঠে বিস্ময় আর উদ্বেগ। লুসিয়া কোনো কথা না বলে সরাসরি ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল। ফারহান দরজা বন্ধ করতেই লুসিয়া তার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার চোখ দুটো ক্লান্তিতে বুজে আসছে, কিন্তু ঠোঁটে এক অদ্ভুত জয়ের হাসি। ফারহান বুঝতে পারল, লুসিয়া আজ সত্যিই সব মায়া ছিন্ন করে চলে এসেছে। ফারহান আর কোনো প্রশ্ন না করে আলতো করে লুসিয়াকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। লুসিয়া ফারহানের কাঁধে মাথা রাখল। ফারহান তাকে নিয়ে গিয়ে সেই বিছানাটায় নিজের কোলে বসাল। ঘরের সেই হলদেটে আলোয় লুসিয়াকে আজ কোনো মেক্সিকান রাজকুমারী নয়, বরং খুব সাধারণ এক ক্লান্ত মানবী মনে হচ্ছিল।
লুসিয়ার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে সে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইল।ফারহান খুব শান্ত গলায় বলতে শুরু করল—
“লুসি, তুমি তো এক পোশাকেই বেরিয়ে আসলে। এই আভিজাত্য, সম্পদ—সব কিছু এক মুহূর্তে ছাড়ার সাহস সবাই পায় না। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো, তুমি আজ থেকে আমার সাথে থাকবে। আমি তোমাকে আমার সাথে বাংলাদেশে নিয়ে যেতে চাই। তুমি তো আমাদের দেশে গিয়েছিলে, তাই না? তবে সেটা ছিল বেড়াতে যাওয়া।”
ফারহান লুসিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে আবার বলল—
“বেড়াতে যাওয়া আর সারাজীবন থাকা কিন্তু এক কথা নয় লুসি। আমার বাংলাদেশে ওই বাড়িতে এসি নেই, গিজার নেই, বাথটাব নেই। সত্য বলতে কি, তোমার এই ভিলা এস্পেরেন্জার রান্নাঘরটাও হয়তো আমার ওই দেশের শোবার ঘরের চেয়ে বড়। সেখানে কোনো রাজকীয় আসবাবপত্র নেই। আমি চাইলে তোমাকে মেক্সিকোতে রাজকীয় জীবন দিতে পারি, কিন্তু আমি একটা জিনিস বুঝেছি— অবৈধ উপার্জনে পরিবারকে সুখে রাখা সবচেয়ে বড় পাপ। আমি তোমাকে আমার সাধারণ উপার্জনে ওভাবেই রাখব। তুমি কি পারবে আমার সাথে তোমার সেই শ্বশুড়বাড়িতে মানিয়ে নিতে? পারবে সারাজীবন ওভাবেই থাকতে?”

লুসিয়া ফারহানের কথাগুলো খুব গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। সে ফারহানের গলার ওপর দুহাত রেখে তাকে আরও কাছে টেনে নিল। লুসিয়ার ঠোঁটে আজ এক অদ্ভুত শান্তি।সে ধীর স্বরে বলল—”ফারহান, ভিলা এস্পেরেন্জার ওই বাথটাব বা এসির বাতাসে আমি শান্তি পাইনি। সেখানে প্রতিটি নিঃশ্বাসে আমি বিষ অনুভব করতাম। ওই সাধারণ শ্বশুড়বাড়িই হবে আমার স্বর্গ। যখন বাংলাদেশে তোমার বাড়িতে গিয়েছিলাম, সেই খোলা বারান্দায় বসে জোছনা দেখা যে কতটা শান্তির, সেটা আমি তখনই বুঝেছি। আমার রাজকীয় বিছানা চাই না ফারহান, তোমার বুকের এই আশ্রয়টুকুই আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্পদ। আমি তৈরি ফারহান, আমি তোমার সাথে বাংলাদেশ যাব।”

মেক্সিকোর সেই নিঝুম অ্যাপার্টমেন্টে লুসিয়া ফারহানের বুকের মাঝে মিশে আছে। ফারহান তার চুলে বিলি কাটতে কাটতে হঠাৎ একটু গম্ভীর হয়ে গেল। সে লুসিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল—”লুসি, রাজপ্রাসাদ ছেড়ে তো চলে আসলে, কিন্তু ওখানে গিয়ে কিন্তু তোমাকে কাজ করতে হবে। ঘর গোছানো থেকে শুরু করে টুকটাক অনেক কিছু। সেটা কি তুমি পারবে?”

লুসিয়া একটু অপ্রস্তুত হয়ে মাথা নিচু করল। তার কণ্ঠে এক ধরণের অসহায়ত্ব। সে ফিসফিস করে বলল, “ফারহান, আমিতো আসলে কোনো কাজই পারি না। কোনোদিন কোনো কিছু করতে হয়নি তো…” ফারহান শব্দ করে হেসে উঠল। সে লুসিয়াকে আরও একটু কাছে টেনে নিয়ে বলল, “আরে পাগলী, কাজ না পারলে কী হয়েছে? আমার মা তোমাকে সব শিখিয়ে দিবে। আমার মা খুব ধৈর্যশীল মানুষ। আর আমিও তো আছি। আমি তোমাকে রান্না শিখিয়ে দিবো, আর আমি নিজে রান্না করেও তোমাকে খাওয়াবো। আমাদের বাংলাদেশের ওই ছোট রান্নাঘরে আমরা দুজন মিলে যখন কাজ করব, তখন দেখবে সব কিছুই সহজ মনে হচ্ছে।”
লুসিয়ার চোখে তখন স্বপ্নের ঝিলিক। সে ফারহানের গালে হাত রেখে পরম আবেশে বলল—”তুমি পাশে থাকলে আমি সব পারবো ফারহান। হয়তো প্রথমে একটু কষ্ট হবে, মানিয়ে নিতে সময় লাগবে। কিন্তু এক সময় আমি ঠিকই সব শিখে নেব। কারণ আমার কাছে দামি আসবাবপত্র বা কাজের লোক বড় নয়— দিনের ২৪ ঘণ্টা তোমাকে পাশে পাবো, এটাই আমার জন্য এনাফ। তোমার ভালোবাসা থাকলে আমি কুঁড়েঘরেও রানীর মতো থাকব।”

ফারহান অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল লুসিয়ার দিকে। যে মেয়েটিকে সে মেক্সিকোর সবচেয়ে অভিজাত ক্লাবগুলোতে দেখেছে, সে আজ সামান্য একটু সময়ের জন্য নিজের পুরো জীবনটা বদলে নিতে প্রস্তুত। ফারহান মনে মনে ভাবল, লুসিয়ার ফ্যামিলি অনেক ক্ষমতাশালী, কিন্তু তারা জানেনা তাদের বাড়ির মেয়েকে আজ সে জয় করে নিয়েছে কেবল এক টুকরো ভালোবাসা দিয়ে। সে বিড়বিড় করে বলল, “তোমাকে কোনোদিন কোনো কষ্ট পেতে দেব না লুসি। এই ফারহান মরে গেলেও তোমাকে আগলে রাখবে।”

চলবে…….

রিচেক করিনি ভুল থাকলে একটু ধরিয়ে দিবেন আর এখন থেকে নিয়মিত গল্প দিবো তবে আপনাদেরকেও রেসপন্স করতে হবে। ১.৫কে রিয়েক্ট হলেই পরের পর্ব পেয়ে যাবেন আর রিয়েক্ট কমেন্ট হলে কালকেই দিয়ে দিবো পর্ব ।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply