✍️ সাবিলা সাবি
পর্ব-৪২
সকাল গড়িয়ে তখন দুপুর হতে চলেছে, কিন্তু ফারহান আর লুসিয়ার বাসর ঘরের রোমান্স থামার কোনো নাম নেই। শেষ পর্যন্ত ফারহান একপ্রকার জোর করেই লুসিয়াকে পাজাকোলে তুলে নিয়ে বাথরুমের দিকে হাঁটা দিল। লুসিয়া তখনো ফারহানের গলা জড়িয়ে ধরে ওর বুকে মুখ লুকিয়ে হাসছে।
বাথরুমে ঢুকে ফারহান লুসিয়াকে শাওয়ারের নিচে দাঁড় করিয়ে দিল। হালকা গরম পানির ঝাপটা যখন লুসিয়ার সারা শরীরে পড়ল, তখন ওর রাতের সেই সব ক্লান্তি নিমেষেই উধাও হয়ে গেল। কিন্তু ফারহান যখন নিজেও শাওয়ারের নিচে এসে দাঁড়াল, তখন পরিবেশ আবার বদলে গেল।
পানির ঝাপটায় লুসিয়ার গায়ের সেই তপ্ত ভাবটা আরও বেড়ে গেল। ফারহান সাবান নিয়ে আলতো করে লুসিয়ার পিঠে আর কাঁধে ঘষতে শুরু করল। শাওয়ারের পানির শব্দ আর বাথরুমের কাঁচের দেয়ালে জমে থাকা বাষ্পের মাঝে ফারহানের স্পর্শগুলো ছিল অত্যন্ত গভীর।
লুসিয়া পেছনে ঘুরে ফারহানের বুকের ওপর নিজের দুহাত রেখে তাকিয়ে রইল। পানির স্রোতে ফারহানের চুলগুলো কপালে এসে পড়েছে, যা ওকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। লুসিয়া ফিসফিস করে বলল, “তুমি তো দেখছি শুধু গোসল করাচ্ছো না, তোমার তো মতলব অন্যরকম।”
ফারহান লুসিয়ার কোমরে হাত রেখে তাকে নিজের দিকে আরও টেনে আনল। পানির ধারায় ভিজে একাকার হয়ে ফারহান ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, “মতলব তো তুমিই বদলে দিয়েছো লুসিয়া। এই পানির নিচে তোমাকে এত হট লাগছে যে আমি আর নিজেকে সামলাতে পারছি না।”
ফারহান শাওয়ারের পানির মাঝেই লুসিয়াকে নিবিড়ভাবে চুমু খেতে শুরু করল। অবশেষে অনেকক্ষণ পর যখন তারা বাথরুম থেকে বের হলো, তখন দুজনের চোখেই এক অদ্ভুত প্রশান্তি। ফারহান লুসিয়াকে তোয়ালে দিয়ে মুছিয়ে দিতে দিতে ভাবল, জীবনের এই সুন্দর মুহূর্তগুলো কখনো শেষ না হয়।
গোসল সেরে বের হওয়ার পর ঘরের আবহাওয়াটা হঠাৎই ভারী হয়ে এল। ফারহান আলমারি থেকে লুসিয়ার জন্য রাখা একটা সাধারণ পোশাক বের করে দিয়ে শান্ত গলায় বলল, “লুসিয়া, তোমাকে আজই বাড়িতে ফিরে যেতে হবে।”
লুসিয়ার হাতের তোয়ালেটা খসে পড়ল। সে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে ফারহানের দিকে তাকিয়ে বলল, “কী বললে? কাল রাতে আমরা এক হলাম, আজ আমাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সকাল—আর তুমি এখনই আমাকে তাড়িয়ে দিতে চাইছো?”
ফারহান আসলে চায় না লুসিয়াকে চোখের আড়াল করতে, কিন্তু বাস্তব বড়ই কঠিন। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের শার্টের বোতাম আটকাতে আটকাতে বলল, “লুসিয়া, আর দেরি করো না। আজকে আমার একটা খুব জরুরি কাজ আছে, যেটা আমার জন্য খুব ইম্পর্ট্যান্ট। আমাকে বের হতে হবে, আর তুমি এই অবস্থায় এখানে একা থাকাটা একদম সেফ না।”
লুসিয়া বিছানায় বসে বিষণ্ণ চোখে ফারহানের দিকে তাকিয়ে ছিল। সে জানে ফারহান ঠিকই বলছে—বিয়ে হলেও হুট করে এভাবে নিরুদ্দেশ হয়ে থাকলে বাড়ির লোক সন্দেহ করবে। কিন্তু বাসর রাতের সেই গভীর আবেশ কাটিয়ে এখনই বিদায় নিতে ওর মন মানছে না।
ফারহান এগিয়ে এসে লুসিয়ার হাত ধরে টেনে তুলল। “আমার হাতে সময় কম নাহলে আমি তোমাকে ড্রপ করে দিতাম। তোমাকে এমনিতেও আজকে বাড়িতে ফিরতে তো হবেই, নাহলে সবার সন্দেহ আরও বাড়বে। আমি কাজ শেষ করে যত দ্রুত সম্ভব তোমার সাথে কন্টাক্ট করব।”
লুসিয়া অভিমানী গলায় বলল, “সবই বুঝলাম, কিন্তু কাল রাতের পর আজকে তোমার থেকে দূরে যাওয়াটা যে কতটা কষ্টের সেটা কি তুমি বুঝতে পারছো?”
ফারহান এবার হেসে ফেলল। সে লুসিয়াকে কাছে টেনে নিয়ে ওর নাকে নাক ঘষে বলল, “আমিও তো যেতে দিতে চাইছি না। কিন্তু আমাদের এই লুকোচুরি খেলাটা আর কয়েকটা দিন চালাতে হবে। সব গুছিয়ে নিয়ে আমি তোমাকে সবার সামনে নিজের করে নেব, প্রমিজ।”
লুসিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাজি হলো। ফারহান ওর কপালে একটা বিদায়ী চুমু খেয়ে ওকে গাড়িতে তুলে দিল। বাসর রাতের সেই স্মৃতিগুলো আর শরীরের আনাচে-কানাচে লেগে থাকা ফারহানের স্পর্শগুলো নিয়ে লুসিয়া বাড়ির পথে রওনা হলো। ওদিকে ফারহানও তার কাজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল, যদিও ওর মনটা পড়ে রইল ওই চঞ্চল মেয়েটার কাছেই।
গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে চোখ বুজতেই লুসিয়ার মনে হলো সে কি কোনো সুখকর দুঃস্বপ্ন দেখছে? নাকি এই সবকিছুই সত্যি? তার অবশ হয়ে আসা শরীর, আর শিরায় শিরায় বয়ে চলা এক অদ্ভুত শিহরণ বারবার জানান দিচ্ছে—না, এটা স্বপ্ন নয়। বন্ধ চোখের পাতায় এখনো ভেসে উঠছে বাসর ঘরের সেই টিমটিমে আলো আর ফারহানের সেই উন্মত্ত রূপ।
লুসিয়া নিজের হাত দিয়ে আলতো করে নিজের কাঁধ আর গলা স্পর্শ করল। ফারহানের সেই শক্ত হাতের মুচড়ে ধরা, ওর তপ্ত নিশ্বাস আর ঠোঁটের সেই বন্য কামড়ের দাগগুলো এখনো আগুনের মতো জ্বলছে। ওর সারা শরীরে এখনো ফারহানের পুরুষালি গায়ের ঘ্রাণ লেগে আছে। মেক্সিকোর তপ্ত রোদেও লুসিয়ার মনে হচ্ছে ফারহান এখনো ওর ওপর ঝুঁকে আছে, ওর কানের কাছে ফিসফিস করে বলছে সেই অধিকারের কথাগুলো।
গাড়িটা যখন ওদের ভিলা এস্পেরেন্জার সামনে এসে থামল, লুসিয়া দুরুদুরু বুকে নিজের স্কার্ফ দিয়ে গলা ভালো করে ঢেকে নিল। সে জানে, এই চার দেয়ালের ভেতর সবাই একেকটা জীবন্ত আতঙ্ক। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, লুসিয়ার মনে আজ কোনো ভয় নেই। ফারহানের সেই সারারাতের ‘পাগলামি’ আর সোহাগ ওকে এক অন্যরকম শক্তি দিয়েছে।
.
.
.
দুপুরের খাবারের টেবিলে আজ এক থমথমে পরিবেশ। বিশাল ডাইনিং টেবিলের প্রধান আসনে বসে আছেন কার্গো চৌধুরী, যার শীতল দৃষ্টির সামনে যে কেউ কুঁকড়ে যায়। তার পাশে গম্ভীর মুখে বসা জাভিয়ান আর পাশেই তান্বী।
অন্যপ্রান্তে লুসিয়ার ভাই মার্কো নিজের কাঁটাচামচ দিয়ে প্লেটে শব্দ করছে, যা পরিবেশকে আরও অস্বস্তিকর করে তুলেছে। লুসিয়া খুব সাবধানে ওড়না দিয়ে নিজেকে আগলে রাখার চেষ্টা করলেও তার ভেতরে এক তীব্র অস্থিরতা কাজ করছিল। ফারহানের সেই সারারাতের উন্মাদনার রেশ এখনো তার চোখেমুখে এক অদ্ভুত আভা ছড়িয়ে রেখেছে। শত চেষ্টা করেও সে সেই তৃপ্তির ছাপ লুকোতে পারছিল না।
খাবার শুরু হতেই মার্কো হঠাৎ থেমে গেল। সে তার গ্লাসটা সশব্দে টেবিলে রেখে সরাসরি লুসিয়ার মুখের দিকে তাকাল। তার দেখাদেখি কার্গো চৌধুরীও ভ্রু কুঁচকে লুসিয়ার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকালেন। লুসিয়া গ্লাস থেকে পানি খাওয়ার জন্য মুখ তুলতেই মার্কো কর্কশ গলায় বলে উঠল,
“লুসিয়া, তোর ঠোঁটের নিচের ওই অংশটা অমন ফুলে লাল হয়ে আছে কেন? আর ওখানে ওটা কিসের দাগ? পরিষ্কার মনে হচ্ছে কেউ কামড়ে দিয়েছে!”
লুসিয়ার হাত থেকে গ্লাসটা প্রায় পড়েই যাচ্ছিল। সে দ্রুত নিজের নিচের ঠোঁটটা দাঁত দিয়ে চেপে ঢাকার চেষ্টা করল, কিন্তু তাতে ফোলা ভাবটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। ফারহানের সেই তীব্র কামড়ের দাগগুলো মেকআপ দিয়েও পুরোপুরি ঢাকা সম্ভব হয়নি।
জাভিয়ানের মা, কার্গো চৌধুরী এক কুৎসিত ও সন্দেহভাজন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, “শুধু ঠোঁট না মার্কো, ওর গলার ওপাশটাতেও ওড়নার ফাঁক দিয়ে নীলচে ছোপ দেখা যাচ্ছে। লুসিয়া, কাল রাতে তুমি মার্তার বাসায় ছিলে বলে দাবি করেছ। তো মার্তার বাসায় কি কোনো বিষাক্ত পোকা কামড়েছে তোমায়? নাকি কোনো মানুষ?”
পুরো ডাইনিং রুমে পিনপতন নিস্তব্ধতা নেমে এল। মার্কো টেবিল চাপড়ে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলল, “লুসিয়া! সত্যিটা বল। কোন হারামি তোর শরীরে এই চিহ্নগুলো দেওয়ার সাহস পেয়েছে? কার সাথে রাত কাটিয়েছিস তুই?”
লুসিয়া এবার নিজেকে শক্ত করল। সে মার্কোর চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরস্থিরভাবে বলল, “দাগটা হয়তো কোনোভাবে লেগে গেছে ভাইয়া। তোমরা ছোটখাটো বিষয় নিয়ে কেন এত রিঅ্যাক্ট করছ?”
“এটা ছোটখাটো বিষয় না!” কার্গো চৌধুরী গর্জে উঠলেন। “এটা পরিষ্কার কোনো পুরুষের কামড়ের দাগ। জাভিয়ান, এখনই খুঁজে বের করো লুসিয়া কাল রাতে কোথায় ছিলো আর কার সাথে।”
লুসিয়ার বুকটা ধক করে উঠল। ঠিক সেই মুহূর্তে যখন পরিস্থিতি চূড়ান্ত উত্তেজনায় পৌঁছেছে, তখন পাশে বসা তান্বী হঠাৎ মুখ চেপে ধরল। তার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল আর সে খাবার ফেলে দিয়ে পাশের বেসিনের দিকে দৌড়ে গেল। প্রবল শব্দে বমি করার আওয়াজ ভেসে এল।
জাভিয়ান হতভম্ব হয়ে তান্বীর দিকে এগিয়ে গেল। ডাইনিং রুমের সবাই এবার লুসিয়াকে ছেড়ে তান্বীর দিকে মনোযোগ দিল। তন্বীর এই আকস্মিক অসুস্থতা লুসিয়াকে এক মুহূর্তের জন্য বাঁচিয়ে দিল।
লুসিয়া আড়চোখে দেখল জাভিয়ান উঠে গিয়ে তান্বীর পিঠ চাপড়ে দিচ্ছে। তার মাথায় তখন একটাই চিন্তা—যদি এখনই ফারহানের কথা সবাই জেনে যায় তবে কি সব শেষ হয়ে যাবে?
ডাইনিং টেবিলের সেই শ্বাসরুদ্ধকর জেরা থেকে লুসিয়া সাময়িক নিষ্কৃতি পেলেও ওদিকে ফারহানের জীবন এক অন্যরকম মোড় নিয়েছে। মেক্সিকোর অন্ধকার জগতের ডার্কলর্ড যাকে সবাই ‘এল শ্যাডো’ নামে চেনে, তার একমাত্র মেয়ে বেলাডোনা কিডন্যাপ হয়েছে। ফারহান যে মেক্সিকোতে আছে, এই খবর ডার্ক লর্ডের কান পর্যন্ত পৌঁছাতে দেরি হয়নি। ফারহানের ট্র্যাক রেকর্ড আর অদম্য সাহসের কথা ভেবে এল শ্যাডো তাকেই তলব করেছে বেলাডোনাকে ফিরিয়ে আনার জন্য।
.
.
.
মেক্সিকো সিটির শহরতলীর এক পরিত্যক্ত কারখানায় বেলাডোনাকে বন্দি করে রেখেছে এক বিদ্রোহী গ্যাং। ফারহান সেখানে পৌঁছাল একা, কিন্তু তার মাথায় ঘুরছিল এক নিখুঁত রণকৌশল। সে জানত, গায়ের জোরে এখানে জেতা অসম্ভব; এখানে জিততে হবে বুদ্ধিতে।
ফারহান প্রথমে কারখানার পাওয়ার গ্রিডটি ধ্বংস করে পুরো এলাকাকে অন্ধকারে ডুবিয়ে দিল। ঘুটঘুটে অন্ধকারে যখন কিডন্যাপাররা দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে এলোপাথাড়ি গুলি ছুড়ছিল, ফারহান তখন নাইট-ভিশন গগলস পরে নিঃশব্দে ভেতরে ঢুকল। তার হাতের প্রতিটি মুভমেন্ট ছিল চিতার মতো দ্রুত আর ঘাতক। একের পর এক গার্ডকে সে সাইলেন্সার লাগানো পিস্তল দিয়ে ধরাশায়ী করল।
সে যখন ভেতরের ঘরে পৌঁছাল, দেখল বেলাডোনাকে লোহার চেয়ারে বেঁধে রাখা হয়েছে। তার মুখে টেপ মারা, চোখে অদম্য আতঙ্ক। ফারহানকে দেখে সে আরও ভয় পেয়ে গেল। ফারহান দ্রুত তার সামনে গিয়ে ইংরেজিতে নিচু স্বরে বলল,—”Don’t be afraid, Belladonna. Your father sent me. Don’t say a word, just follow me.” (ভয় পেও না বেলাডোনা। তোমার বাবা আমাকে পাঠিয়েছেন। কোনো কথা না বলে শুধু আমাকে ফলো করো)
বেলাডোনার বাঁধন খুলতেই দরজায় এক বিশালদেহী গ্যাং লিডার এসে হাজির হলো। ফারহান এক মুহূর্ত দেরি না করে নিজের বুদ্ধিকে কাজে লাগাল। সে পকেট থেকে একটি স্মোক গ্রেনেড ফ্লোরে ছুঁড়ে মারল। ধোঁয়ার কুয়াশার মাঝেই সে বেলাডোনাকে পাজাকোলে তুলে নিয়ে পেছনের জানলা দিয়ে লাফ দিল।
বাইরে তখন ডার্ক লর্ডের ব্যাকআপ টিম চলে এসেছে। ফারহান বেলাডোনাকে তাদের হাতে তুলে দিয়ে শান্ত গলায় বলল, “ওকে নিরাপদে নিয়ে যাও।”
বেলাডোনা যাওয়ার আগে ফারহানের দিকে একবার ফিরে তাকাল। তার চোখে তখন ভয়ের বদলে এক তীব্র মুগ্ধতা। মেক্সিকোর এই রহস্যময় উদ্ধারকারী যে তার মনটাও কিছুটা কিডন্যাপ করে নিয়ে গেল, সেটা সে নিজেও বুঝল না।
ফারহান যখন ফিরে আসার জন্য নিজের বাইকে স্টার্ট দিল, তখন তার মনে একটাই চিন্তা—লুসিয়া কি বাড়িতে কোনো বিপদে পড়েছে?
.
.
.
রাত বাড়ার সাথে সাথে চৌধুরী ভিলায় অস্থিরতা কয়েক গুণ বেড়ে গেল। ডাইনিং টেবিলে তান্বীর সেই আকস্মিক বমির পর সবাই ভেবেছিল হয়তো খাবারে কোনো সমস্যা হয়েছে। কিন্তু রাত যত গভীর হলো, তান্বীর অবস্থা তত বেশি খারাপের দিকে গেল। সে বারবার বমি করছে আর মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছে। কোনোভাবেই কিছু খেতে পারছে না।
জাভিয়ান ঘাবড়ে গিয়ে ইমার্জেন্সি ডক্টর কল করল। ভিলা এস্পেরেন্জার ড্রয়িংরুমে তখন থমথমে পরিবেশ। কার্গো চৌধুরী গম্ভীর হয়ে সোফায় বসে আছেন, আর জাভিয়ানের বাবা সায়েম চৌধুরী পায়চারি করছেন।
ডক্টর তান্বীকে পরীক্ষা করে বেরিয়ে আসতেই জাভিয়ান অস্থির হয়ে এগিয়ে গেল।
“ডক্টর, কী হয়েছে ওর? ফুড পয়জনিং?” জাভিয়ান রুদ্ধশ্বাসে প্রশ্ন করল।
ডক্টর মুখে ম্লান হাসি নিয়ে জাভিয়ান আর সায়েম চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “অভিনন্দন জাভিয়ান! ভয়ের কিছু নেই। এটা কোনো অসুস্থতা নয়, বরং দারুণ একটা সুখবর। মিসেস তান্বী প্রেগন্যান্ট।”
ডক্টর যখন ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে তান্বীর গর্ভবতী হওয়ার খবরটা নিশ্চিত করলেন, তখন জাভিয়ানের প্রতিক্রিয়ায় সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল।
“আমি বাবা হচ্ছি? ডক্টর, আপনি শিউর তো?” জাভিয়ানের গলায় এক অদ্ভুত উত্তেজনা। সে শব্দ করে হেসে উঠল—সে হাসি যেন থামতেই চায় না।
সে পাগলের মতো করতে লাগলো। ড্রয়িংরুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সে ডক্টরকে জড়িয়ে ধরল, তারপর কার্গো চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে প্রায় চিৎকার করে বলল, “মম! শুনেছ? আমি বাবা হচ্ছি! আমার বংশের উত্তরাধিকারী আসছে!”
জাভিয়ানের এই বাঁধভাঙা খুশি দেখে কার্গো চৌধুরী আর মার্কো একে অপরের দিকে তাকাল। যে জাভিয়ান সবসময়ই এতোটা গম্ভীর থাকতো আর সে এখন খুশিতে প্রায় আত্মহারা। সে তন্বীর দিকে দৌড়ে গেল এবং ঘুমন্ত তান্বীকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেয়ে বলল, “জিন্নীয়া! তুমি আমাকে পৃথিবীর সেরা খবরটা দিয়েছ! আজ থেকে তুমি যা চাইবে, এই বাড়িতে তাই হবে!”
জাভিয়ানের এই পাগলামি দেখে লুসিয়া এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে বুঝতে পারল, জাভিয়ানের সব মনোযোগ এখন তান্বী আর তার হবু সন্তানের দিকে ঘুরে গেছে। এই সুযোগে লুসিয়া নিজেকে আড়াল করে নিল। সে ভাবল, বাড়ির সবাই যখন এই খুশিতে পাগল, এটাই তার নিজেকে এই জেরা থেকে বাঁচানোর সেরা সময়।
.
.
ভিলা এস্পেরেন্জায় থমথমে আকাশটা যেন তান্বীর এক পশলা অসুস্থতায় মুহূর্তে মেঘমুক্ত হয়ে গেল। ডক্টর চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর তন্বীর জ্ঞান ফিরল। সে চোখ মেলতেই দেখল বিছানার পাশে জাভিয়ান বসা, তার চোখেমুখে এমন এক উচ্ছ্বাস যা তান্বী এর আগে কোনোদিন দেখেনি।
জাভিয়ান তন্বীর হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে পরম আবেশে জড়িয়ে ধরল। ওর কণ্ঠে আজ কোনো কঠোরতা নেই, বরং এক তৃপ্তি মিশে আছে। সে ধরা গলায় বলল, “জিন্নীয়া! তুমি আজ আমাকে পূর্ণতা দিলে। অবশেষে আমাদের বেবি আসছে! বিশ্বাস করো, আমি আজ পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ।”
তান্বী ফ্যাকাশে মুখে একটু হাসল। জাভিয়ানের এই নমনীয় রূপ দেখে সে অভিভূত। সে জাভিয়ানের চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করল, “এতই যখন খুশি, তাহলে একটা কথা বলো তোমার নিশ্চয়ই প্রথম কন্যা সন্তান চাই? সাধারণত বাবারা তো মেয়ে সন্তানেরই আবদার করে।”
জাভিয়ানের হাসিমাখা মুখটা এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। সে জানালার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ থেকে গম্ভীর স্বরে বলল, “পৃথিবীর সব বাবারা হয়তো প্রথমেই কন্যা সন্তান চায়, তান্বী। কিন্তু আমি চাই আমার যেন প্রথম সন্তান একটা ছেলে হয়।”
তান্বী কিছুটা অবাক হয়ে তাকাল। জাভিয়ান তন্বীর চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে খুব দৃঢ়ভাবে বলল, “আমি চাই আমার প্রথম ছেলে সন্তানের নাম রাখতে—’রাহিয়ান’।”
‘রাহিয়ান’ নামটা শোনামাত্র তান্বী যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলো। ওর শরীরটা এক মুহূর্তের জন্য অবশ হয়ে গেল। স্তব্ধ হয়ে সে জাভিয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল। রাহিয়ান—জাভিয়ানের সেই ভাই, যে অনেক বছর আগে মাত্র কিশোর বয়সে সুইসাইড করে মারা গিয়েছিল। আসলে জাভিয়ান যতটা না বাবা হওয়ার খুশিতে পাগল, তার চেয়েও বেশি মরিয়া তার মৃ/ত ভাইয়ের ছায়া খুঁজে পেতে।
.
.
.
বেলাডোনাকে উদ্ধার করে ফারহান সারাদিন পর যখন নিজের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরল, তখন তার শরীরে ক্লান্তি আর মনে কেবল লুসিয়ার চিন্তা। কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। রাত বাড়তেই এল শ্যাডোর ব্যক্তিগত দেহরক্ষীরা আবারও ফারহানের দরজায় এসে হাজির। জানানো হলো, খোদ ডার্ক লর্ডের প্রাসাদ থেকে তার ডাক পড়েছে। ফারহান ভাবল, হয়তো উদ্ধারকাজের কোনো আনুষ্ঠানিক কৃতজ্ঞতা বা পাওনা মিটিয়ে দেওয়ার জন্য এই তলব।
কিন্তু প্রাসাদে পৌঁছানোর পর ফারহানকে এল শ্যাডোর চেম্বারে না নিয়ে যাওয়া হলো একটি বিশাল বারান্দায়, যেখান থেকে পুরো মেক্সিকো সিটির নিয়ন আলো দেখা যায়। সেখানে গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে ছিল বেলাডোনা। পরনে একটি কালো সিল্কের বোল্ড টাইপ গাউন, তার চোখে ভয়ের বদলে এখন খেলে যাচ্ছে এক রহস্যময় দ্যুতি।
ফারহান কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই বেলাডোনা ঘুরে তাকাল। তার দৃষ্টিতে এমন এক মুগ্ধতা ছিল, যা ফারহানকে কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলে দিল। বেলাডোনা ফারহানের দিকে এক পা এগিয়ে এসে শুদ্ধ ইংরেজিতে বলে উঠল—
“You know Farhan, I’ve seen many men in this dark world. Brave ones, cruel ones… but none like you. I never imagined a guy from Bangladesh could be this incredibly brave, intelligent, and… effortlessly handsome at the same time.” (জানো ফারহান, এই অন্ধকার জগতের অনেক পুরুষকেই আমি দেখেছি। কেউ সাহসী, কেউবা নিষ্ঠুর… কিন্তু তোমার মতো কাউকে দেখিনি। আমি কখনো ভাবিনি বাংলাদেশের কোনো ছেলে একই সাথে এতটা অবিশ্বাস্য রকমের সাহসী, বুদ্ধিমান আর… অনায়াসেই এতটা হ্যান্ডসাম হতে পারে।)
ফারহান বিনয়ের সাথে নিজের মাথা কিছুটা নিচু করল। সে বুঝতে পারছে বেলাডোনা কেবল কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে না, বরং তার প্রতি এক অদ্ভুত আকর্ষণ বোধ করছে। ফারহান শান্ত গলায় ইংরেজিতেই উত্তর দিল, “Thank you, Belladonna. But I was just doing my job. Any man in my place would do the same to save a life.” (ধন্যবাদ, বেলাডোনা। তবে আমি শুধু আমার দায়িত্ব পালন করছিলাম। আমার জায়গায় অন্য যে কেউ থাকলেও আপনার প্রাণ বাঁচাতে ঠিক একই কাজ করত।)
বেলাডোনা একটু হাসল, তার হাসিটা ছিলো এক বিষাক্ত সুন্দর ফুলের মতো। সে আরও একধাপ এগিয়ে এসে ফারহানের গলার নিচের সেই ক্ষতের দিকে তাকাল—যেটা আসলে লুসিয়ার দেওয়া ভালোবাসার চিহ্ন ছিল, কিন্তু বেলাডোনা ভাবল সেটা হয়তো লড়াইয়ের কোনো ক্ষত। সে ফিসফিস করে বলল, “No, Farhan. Not just anyone. You have something special in your eyes. My father wants to reward you with money or power, but I… I want to know the man behind this mask.”
(না, ফারহান। যে কেউ নয়। আপনার চোখের মাঝে বিশেষ কিছু একটা আছে। আমার বাবা আপনাকে টাকা অথবা ক্ষমতা দিয়ে পুরস্কৃত করতে চান, কিন্তু আমি… আমি এই মুখোশের আড়ালের মানুষটাকে জানতে চাই।)
ফারহানের ভেতরে তখন আশঙ্কার ঘণ্টা বাজছে। সে জানে, এই ডার্ক লর্ডের মেয়ের মুগ্ধতা মানেই আগুনের সাথে খেলা। তার হৃদয়ে কেবল লুসিয়ার বাস, কিন্তু এই পরিস্থিতিতে বেলাডোনাকে চটিয়ে দেওয়া মানে মেক্সিকোতে নিজের মরণ পরোয়ানা লিখে ফেলা।
বেলাডোনা ফারহানের দিকে আরও এক পা এগিয়ে এল। ওর চোখে তখন এক অদ্ভুত উন্মাদনা আর মুগ্ধতা। মেক্সিকোর অন্ধকার জগতের রাজকন্যার সামনে সবাই যেখানে ভয়ে তটস্থ থাকে, সেখানে ফারহান তাকে অবলীলায় মৃত্যুমুখ থেকে ছিনিয়ে এনেছে। বেলাডোনার মনে হলো, এই মানুষটাই তার জীবনের যোগ্য সঙ্গী।
সে সরাসরি ফারহানের চোখের দিকে তাকিয়ে নেশাভরা গলায় ইংরেজিতে বলল, “ফারহান, তুমি আজ আমাকে যেভাবে মৃত্যুমুখ থেকে বাঁচালে, তাতে আমি সত্যিই তোমার ওপর ফিদা হয়ে গেছি। আমি ডিসিশন নিয়ে নিয়েছি। আমি পাপাকে বলে আজকেই তোমাকে বিয়ে করব। আর মেক্সিকোতে আমার যত বাড়ি, দামী গাড়ি আর ক্ষমতা আছে—সবই আমি তোমার নামে লিখে দেব। তুমি হবে এই ডার্ক লর্ডের সাম্রাজ্যের পরবর্তী কিং।”
এমন আকাশকুসুম প্রস্তাব শুনে যে কারো মাথা ঘুরে যাওয়ার কথা, কিন্তু ফারহান এক মুহূর্তের জন্য শিউরে উঠল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল লুসিয়ার সেই পজেসিভ মুখটা, যে কিনা অন্য মেয়ের সাথে একটা সেলফি তোলা দেখেই আইডি উড়িয়ে দিয়েছিল!
ফারহান বিনয়ের সাথে কিন্তু বেশ নার্ভাস হয়ে দুই হাত জোড় করে ইংরেজিতে বলল, “সরি সিস্টার! অনেক ধন্যবাদ আপনার এই বিশাল অফারের জন্য, কিন্তু আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি অলরেডি ম্যারিড। আমার এক বাঘিনী বউ আছে মেক্সিকোতে, যার রাগ আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না।”
ফারহান একটু শুকনো ঢোক গিলে কাঁচুমাচু মুখে আবার বলল, “আমার বউ যদি কোনোভাবে জানতে পারে যে আপনি আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন, তবে সে আমাকে আর মেক্সিকোতে রাখবে না সরাসরি সাত আসমানের ওপর পাঠিয়ে দেবে! আর সাত আসমানের ওপর একবার পৌঁছে গেলে আপনার এই গাড়ি, বাড়ি আর সাম্রাজ্য ভোগ করার মতো অবস্থায় আমি অন্তত থাকব না। জান থাকলে তবে না ভোগবিলাস!”
ফারহানের মুখে ‘সিস্টার’ সম্বোধন আর বউয়ের প্রতি এমন ‘ভয়’ মিশ্রিত ভালোবাসার কথা শুনে বেলাডোনা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে ভাবতেও পারেনি যে একজন দুর্ধর্ষ গ্যাংস্টার তার বউয়ের কথা ভেবে এতটা আতঙ্কিত হতে পারে। বেলাডোনা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থেকে হঠাৎ হোহো করে হেসে উঠল। “তোমার বউ কি সত্যিই এতটা ভয়ংকর ফারহান?” বেলাডোনা হাসতে হাসতে প্রশ্ন করল।
ফারহান কপালে জমা ঘাম মুছে বিড়বিড় করে বলল, “ভয়ংকর বললে কম হবে সিস্টার, সে হলো জলজ্যান্ত এক এটম বোমা। তার বিস্ফোরণ থেকে বাঁচতে হলে আমাকে আপনার থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতেই হবে।”
ফারহান যখন কোনোমতে প্রাণ হাতে নিয়ে প্রাসাদ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে, ওদিকে লুসিয়া তখন ফোন হাতে নিয়ে ফারহানকে কন্টাক্ট করার চেষ্টা করছে। সে কি বুঝতে পারছে, তার স্বামী মেক্সিকোর এক ডন-কন্যার বিয়ের প্রস্তাব রিজেক্ট করে তার প্রতি লয়ালিটির পরিচয় দিচ্ছে?
ফারহান যখন একরকম প্রায় দৌড়েই প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে নিজের বাইকের দিকে এগিয়ে গেল, বেলাডোনা তখনো সেই বিশাল বারান্দায় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার কানে তখনো বাজছে ফারহানের সেই কথাগুলো— ‘সাত আসমানের ওপর পাঠিয়ে দেবে’। মেক্সিকোর অন্ধকার জগতে সে ক্ষমতা দেখেছে, লোভ দেখেছে, এমনকি বিশ্বাসঘাতকতাও দেখেছে অহরহ; কিন্তু এমন অদ্ভুত আনুগত্য সে আগে কখনো দেখেনি।
বেলাডোনা জানালার বাইরে রাতের মেক্সিকো সিটির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার ঠোঁটের কোণে এক ম্লান কিন্তু শ্রদ্ধাময় হাসি ফুটে উঠল। সে স্বগতোক্তির মতো ইংরেজিতে বিড়বিড় করে বলল—”সত্যি? আজকালকার যুগেও কি সত্যিই এমন ছেলে হয়? যে চোখের সামনে মেক্সিকান ডন-কন্যার অফার করা অগাধ সম্পত্তি, রাজকীয় জীবন আর সুন্দরী একটা মেয়েকে অবলীলায় ‘সিস্টার’ ডেকে রিজেক্ট করে দিল—শুধুমাত্র তার বউয়ের ভয়ে? না, এটা ভয় নয়, এটা চরম লেভেলের লয়ালিটি।”
বেলাডোনা অবাক হয়ে ভাবছিল, মেক্সিকোতে থাকা সেই মেয়েটা ঠিক কতটা ভাগ্যবতী, যার জন্য একজন পুরুষ পৃথিবীর অন্য প্রান্তে এসেও নিজের সততা আর ভালোবাসা এভাবে ধরে রাখতে পারে। সে মনে মনে ফারহানের ওপর আর রাগ করতে পারল না, বরং তার প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধা কাজ করতে শুরু করল। “সো লয়াল অ্যান্ড সো অনেস্ট…” বেলাডোনা ফিসফিস করে বলল। সে বুঝতে পারল, ফারহানকে জোর করে পাওয়া সম্ভব নয়, কারণ তার হৃদয়ের সিংহাসনে অলরেডি এক ‘বাঘিনী’ শক্ত হয়ে বসে আছে।
ওদিকে ফারহান যখন বাইক চালিয়ে অ্যাপার্টমেন্টের দিকে ফিরছে, তার বুক তখনো দুরুদুরু কাঁপছে। সে মনে মনে বিড়বিড় করছে, “আজকে বেঁচে গেলাম! খোদা না করুক, বেলাডোনার এই বিয়ের প্রস্তাবের কথা যদি লুসিয়া কোনোভাবে জানতে পারে, তবে সাত আসমান তো দূরে থাক, আমাকে এই মেক্সিকো সিটির মাটির ১০ তলা নিচে জীবন্ত কবর দিয়ে দেবে।”
.
.
.
সকাল থেকেই চৌধুরী ভিলার আবহাওয়ায় এক আমূল পরিবর্তন এসেছে। তান্বীর প্রেগন্যান্সির খবর জাভিয়ানকে যেন খোলস বদলে এক আদর্শ স্বামীতে পরিণত করেছে। সকাল সকাল নিজ হাতে তান্বীর জন্য ব্রেকফাস্ট ট্রে সাজিয়ে সে রুমে গেল। তার সবটুকু মনোযোগ এখন তান্বীর যত্ন আর অনাগত ‘রাহিয়ান’কে ঘিরে। কিন্তু বাড়ির এক কোণে যখন সুখের জোয়ার, অন্য কোণে তখন লুসিয়ার জন্য ঘনিয়ে এল অমাবস্যার অন্ধকার।
সকাল সকাল লুসিয়ার বাবা সাইফ চৌধুরী আর মার্কো ড্রয়িংরুমে এক অদ্ভুত গম্ভীর মেজাজে বসে আছে। লুসিয়াকে ডেকে পাঠানো হলো। কোনো ভূমিকা ছাড়াই সাইফ চৌধুরী ঘোষণা করলেন, “লুসিয়া, কাল তোমাকে দেখতে আসবে। আমার বিজনেস পার্টনারের একমাত্র ছেলে, মেক্সিকোর নামকরা বিজনেস টাইকুন পরিবারের সন্তান। আমি কথা দিয়েছি কালই তোমরা দেখা করবে।”
লুসিয়া আকাশ থেকে পড়ল। সে কম্পিত কণ্ঠে প্রতিবাদ করে বলল, “ড্যাড, আমি এখন বিয়ে করব না। আমার পড়াশোনা বাকি, আর আমি মানসিকভাবে প্রস্তুত নই।”
মার্কো টেবিল চাপড়ে গর্জে উঠলো। তার চোখেমুখে ঘৃণা আর অবিশ্বাস। “প্রস্তুত নস মানে? তুই অঘটন ঘটিয়ে বেড়াচ্ছিস লুসিয়া! আমরা কি অন্ধ? এর আগে একটা স্মাগলারের ছেলের সাথে মিশেছিলিস। তোকে আর স্বাধীনতা দেওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তুই বংশের মুখে চুনকালি মাখাবি। সেটা আমি বেঁচে থাকতে হতে দেব না। কালই চূড়ান্ত কথা হবে।”
লুসিয়া বুঝতে পারল মার্কো আলেকজান্দ্রর কথাই বলছে, যার সাথে এর আগে প্রেমের নাটক করেছিলো। সে মরিয়া হয়ে ডাইনিং টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জাভিয়ানের দিকে তাকাল। তার চোখে জল, এক বুক আকুতি—সে ভাবল জাভিয়ান হয়তো এখন নমনীয় হয়েছে, হয়তো সে তাকে বাঁচাবে।
লুসিয়া আশা করেছিল জাভিয়ান অন্তত বলবে যে এখন তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই। কিন্তু জাভিয়ান লুসিয়ার দিকে একবার শীতল নজরে তাকাল। তার মাথায় তখন শুধুই তান্বী আর তার হবু সন্তান। সে কোনো প্রতিবাদ তো করলই না, বরং একরাশ উদাসীনতা নিয়ে গ্লাসের পানি শেষ করে গটগট করে নিজের রুমের দিকে চলে গেল। তার সেই মৌনতা মনে হলো লুসিয়ার মৃত্যুদণ্ডে সই করে দিয়ে গেল।
তান্বী একপাশে বসে সবটা দেখছিল। তার মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। সে জানে লুসিয়া আর ফারহানের সেই গোপন সম্পর্কের গভীরতা কতটুকু। মার্কো বা তার বাবাকে কিছু বলার সাহস সে পেলোনা।তান্বী শুধু অসহায় চোখে লুসিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
লুসিয়া নিজের রুমে ফিরে গিয়ে সশব্দে দরজা বন্ধ করে দিল। সে কাঁপতে কাঁপতে ফোন বের করল ফারহানকে মেসেজ দেওয়ার জন্য। মার্কো কালই তাকে অন্য কারো হাতে তুলে দিতে চায়।
বিকেলে লুসিয়া বুক ভরা আশা নিয়ে জাভিয়ানের কাছে গেল।সে ভেবেছিল জাভিয়ান অন্তত তার কষ্টের কথা বুঝবে। কিন্তু জাভিয়ান তখন তান্বীর জন্য ফলের প্লেট সাজাতে ব্যস্ত। লুসিয়া কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই জাভিয়ান বুঝতে পারলো সে কেনো এসেছে তাই জাভিয়ান শান্ত গলায় বলল, “লুসিয়া, মার্কো তোর আপন ভাই। তোর বাবা আর ভাই মিলে যখন একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেখানে আমার কী বলার আছে? তাছাড়া তান্বীর এই অবস্থায় আমি কোনো ঝামেলায় জড়াতে চাইছি না।”
জাভিয়ানের এই নির্লিপ্ত কথাগুলো লুসিয়ার বুকে তীরের মতো বিঁধল। সে আর এক মুহূর্ত সেখানে না দাঁড়িয়ে সোজা চলে গেল তান্বীর রুমে। তন্বী তখন একা শুয়ে ছিল। লুসিয়া তার বিছানার পাশে বসে তান্বীর হাতটা শক্ত করে ধরল।
“তান্বী, তোমাকে একটা সত্যি কথা বলব। প্লিজ, কাউকে বলবে না। কথা দাও!” লুসিয়ার চোখেমুখে তখন মরিয়া ভাব।
তন্বী অবাক হয়ে বলল, “কী হয়েছে লুচি আপা? তুমি এভাবে কাঁপছ কেন?”
লুসিয়া ফিসফিস করে বলল, “আসলে আমি এই বিয়েটা করতে পারব না। কারণ… কারণ আমি অলরেডি বিয়ে করে ফেলেছি!”
তন্বী যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে ধড়ফড় করে উঠে বসে বলল, “বিয়ে করে ফেলেছ? কাকে? কবে?আর কখন?”
লুসিয়া চোখের জল মুছে একটু হেসেই বলল, “তোমার ভাইকে! ফারহান আর আমি মেক্সিকোতে সব সেরে নিয়েছি। এমনকি আমাদের বাসরও হয়ে গেছে তান্বী। আমার শরীরের সেই চিহ্নগুলো যা কাল ডাইনিং টেবিলে সবাই দেখেছিলো, সেগুলো ফারহানেরই দেওয়া।”
তান্বী মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তার নিজের ভাই ফারহান যে লুসিয়ার মতো একজনের সাথে এত বড় একটা ঝুঁকি নিয়েছে, সেটা সে ভাবতেই পারেনি। তান্বী লুসিয়াকে জড়িয়ে ধরে বলল, “ভাইয়া যখন তোমাকে বিয়ে করেছে, তাহলে আর চিন্তা কী? তুমি ভাইয়াকে জানাও। আমি জানি আমার ভাই কিছু একটা ব্যবস্থা ঠিকই করবে। সে তোমাকে এভাবে অন্য কারো হতে দেবে না।”
তান্বী কিছুক্ষণ চুপ থেকে লুসিয়ার দিকে তাকিয়ে আদুরে গলায় বলল, “লুচি আপা একটা কথা বলব? আমিনা ভাইয়ার সাথে দেখা করতে চাই। আমাকে নিয়ে যাবে ওর কাছে?”
লুসিয়া খুশিতে তান্বীর হাত চেপে ধরল। “অবশ্যই! ফারহান তোমাকে দেখলে অনেক খুশি হবে। কালকেই আমি তোমাকে ফারহানের সামনে নিয়ে যাব।”
তান্বীর মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এল। একদিকে নিজের সন্তান আসার সুখবর, আর অন্যদিকে ভাইয়ার বিয়ের কথা শুনে তার মনে হলো সব ঠিক হয়ে যাবে।
এদিকে মার্কোর কড়া নির্দেশে পুরো বাড়ি একটা দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি দরজায় সশস্ত্র পাহারা, আর মার্কোর তীক্ষ্ণ নজর যেন লুসিয়ার প্রতিটি নিঃশ্বাসের ওপর নজরদারি করছে। মার্কো পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে—পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত লুসিয়া এই ঘরের চৌকাঠ পার হতে পারবে না।
রাত বাড়ার সাথে সাথে লুসিয়ার অস্থিরতা চরমে পৌঁছাল। শরীরের প্রতিটি কোষে এখনো ফারহানের সেই তপ্ত স্পর্শের ছোঁয়া লেগে আছে। বাসর রাতের সেই উন্মাদনা ওকে এতটাই নেশাতুর করে রেখেছে যে, ফারহানকে ছাড়া প্রতিটা সেকেন্ড ওর কাছে এক একটা বছরের মতো মনে হচ্ছে। সে বিছানায় এপাশ-ওপাশ করছে আর বারবার নিজের ঠোঁটের সেই কামড়ের দাগটা স্পর্শ করছে।
অবশেষে গভীর রাতে ফারহানের ফোন এল। লুসিয়া দ্রুত ফোনটা রিসিভ করে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। “ফারহান, আমি আর পারছি না! ভাইয়া আমাকে বন্দি করে রেখেছে। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। আমি এখনই তোমার কাছে আসতে চাই।”
ফারহান ওপাশ থেকে শান্ত গলায় বোঝানোর চেষ্টা করল, “শান্ত হও লুসিয়া। একটু ধৈর্য ধরো। মার্কো এখন সন্দেহের চোখে দেখছে তোমাকে। এই মুহূর্তে তুমি বাসা থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে আমাদের সব পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে। আমি খুব শীঘ্রই তোমাকে এখান থেকে বের করে আনব, প্রমিজ।”
লুসিয়া এবার জেদ ধরে বলল, “না! আমি কোনো সান্ত্বনা শুনতে চাই না। সেদিন রাতের পর তুমি কি করে ভাবলে আমি তোমাকে ছাড়া এক রাতও থাকতে পারব? কাল সারাদিন রাত পার হয়ে গেলো তুমি আমাকে একটা ফোন অব্দি করোনি। আমার শরীর এখনো তোমার ছোঁয়ার জন্য পুড়ছে ফারহান। তুমি কি আমাকে একটুও মিস করছো না?”
ফারহান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিসফিস করে বলল, “মিস করছি মানে? আমার সারা কক্ষে তোমার গায়ের সুবাস লেগে আছে লুসিয়া। আমার হাত দুটো এখনো তোমার কোমরের সেই উষ্ণতা খুঁজছে। কিন্তু পাগলামি করো না, জান। তুমি কি চাও আমাদের এই নতুন জীবনের শুরুতেই কোনো ট্র্যাজেডি ঘটুক?”
লুসিয়া বিছানার চাদর খামচে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “মার্কো ভাইয়া যা খুশি করুক, আমি পরোয়া করি না। আমি শুধু তোমাকে চাই ফারহান। এই মুহূর্তেই চাই। তুমি কি আসবে না? নাকি আমাকে এই নরকে একাই ফেলে রাখবে?”
ফারহান ওপাশে কিছুক্ষণ চুপ থেকে গলার স্বর আরও নিচু করল, “লুসিয়া… জানালার দিকে তাকাও। তোমার রুমের ঠিক পেছনের বাগানের ওই অন্ধকার কোণটায় একটা ছায়া দেখতে পাচ্ছো?”
লুসিয়া দ্রুত জানালার কাছে গিয়ে পর্দা সরিয়ে দেখল। বাগানের ঘন অন্ধকারের মাঝে একটি দীর্ঘদেহী ছায়া দাঁড়িয়ে আছে। ওর হৃদপিণ্ড এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। ফারহান ওপাশ থেকে বলল, “তোমার জন্য আমি যেকোনো কিছুকেই টেক্কা দিতে পারি। এবার বেরিয়ে আসো বাইরে।”
লুসিয়ার চোখেমুখে তখন ভয়ের বদলে এক তীব্র জয়ের আনন্দ ফুটে উঠল। মার্কোর পাহারা ফাঁকি দিয়ে ফারহান আবারও তার ‘অধিকার’ বুঝে নিতে চলে এসেছে। অন্ধকার বাগানের এক কোণে রাখা লুসিয়াদের কালো রঙের গাড়িটি এক গোপন আশ্রয়ের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। লুসিয়া অত্যন্ত সন্তর্পণে পাহারাদারদের চোখ ফাঁকি দিয়ে পা টিপে টিপে গাড়ির ভেতর গিয়ে বসল। কয়েক মুহূর্ত পরেই ফারহান ছায়ার মতো নিঃশব্দে এসে গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে দরজা লক করে দিল।
কিন্তু ফারহান কিছু বলার সুযোগ পাওয়ার আগেই লুসিয়া সব বাঁধ ভেঙে ফেলল। বিরহ আর আকাঙ্ক্ষা ওকে এতটাই মরিয়া করে তুলেছিল যে, সে কোনো কথা না বলে এক ঝটকায় ফারহানের কোলের ওপর উঠে বসল। গাড়ির সীমিত জায়গার মধ্যে লুসিয়ার এই আকস্মিক আক্রমণে ফারহান কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল, কিন্তু তার শক্ত দুহাত মুহূর্তেই লুসিয়ার কোমর জাপ্টে ধরল।
লুসিয়া কোনো ভূমিকা ছাড়াই ফারহানের গলার খাঁজে মুখ ডুবিয়ে দিল। সে পাগলের মতো ফারহানের গলায় আর ঘাড়ে ছোট ছোট চুমু খেতে শুরু করল। ওর তপ্ত নিশ্বাস ফারহানের গলার চামড়ায় আগুনের মতো বিঁধছে। লুসিয়ার শরীরের প্রতিটি কম্পন ফারহান অনুভব করতে পারছে।
ফারহান ফিসফিস করে ধরা গলায় বলল, “লুসিয়া, কী করছো? এটা খুব রিস্কি হয়ে যাচ্ছে। কেউ দেখে ফেললে…”
লুসিয়া ওর কথা থামিয়ে দিয়ে ফারহানের ঘাড়ের এক জায়গায় হালকা কামড় বসাল। তারপর ফিসফিস করে বলল, “মরতে হলে মরব ফারহান, কিন্তু এই মুহূর্তে তোমাকে ছাড়া আমি আর এক সেকেন্ডও থাকতে পারছি না। সেদিনের সেই নেশা তুমি আমার রক্তে মিশিয়ে দিয়েছো। এখন আমাকে থামানোর ক্ষমতা কারো নেই।”
ফারহানের ভেতরের সংযমও এবার ভাঙতে শুরু করল। সে লুসিয়াকে আরও শক্ত করে নিজের শরীরের সাথে মিশিয়ে নিল। বাইরে বাগানে মার্কোর লোকজনের টর্চের আলো এদিক-ওদিক ঘুরছে, কিন্তু গাড়ির কালো কাঁচের আড়ালে ফারহান আর লুসিয়া এক অন্য জগতে হারিয়ে গেল।
ফারহান লুসিয়ার চুলে হাত বুলাতে বুলাতে ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে তপ্ত কণ্ঠে বলল, “আজকেও কি তুমি আমাকে ছাড়বে না লুসিয়া?”
লুসিয়া কোনো জবাব দিল না, শুধু ফারহানের বুকেই নিজের মুখটা ঘষতে লাগল।
গাড়ির ভেতরটা তখন এক রুদ্ধশ্বাস ও তপ্ত গোলকে পরিণত হয়েছে। বাইরে ঠান্ডা বাতাস বইলেও ব্ল্যাক গ্লাস দিয়ে ঘেরা এই সংকীর্ণ জায়গাটুকু আগ্নেয়গিরির চেয়েও উত্তপ্ত। লুসিয়া ফারহানের কোলের ওপর বসে ওর শার্টের কলারটা খামচে ধরে আছে, যেন সে কোনোভাবেই ফারহানকে আর কাছছাড়া করতে চায় না।
লুসিয়ার ঠোঁটগুলো ফারহানের গলায় আর কাঁধে পাগলের মতো বিচরণ করছিল। ফারহানের শরীরের বলিষ্ঠতা আর ওর সেই পরিচিত পুরুষালি সুবাস লুসিয়াকে পুরোপুরি কাঙাল করে তুলছিল। ফারহান এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে লুসিয়ার কোমরে তার শক্ত হাত দুটো বসিয়ে তাকে নিজের শরীরের সাথে আরও নিবিড়ভাবে পিষে ধরল।
ফারহান খুব নিচু আর নেশাভরা গলায় বলল, “লুসিয়া, তুমি তো জানো আমি একবার নিয়ন্ত্রণ হারালে কী হয়! এই গাড়ির ভেতরে কিন্তু নিজেকে সামলাতে পারবে না।”
লুসিয়া কোনো উত্তর দিল না, শুধু ফারহানের নিচের ঠোঁটটা নিজের ঠোঁট দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল। সে বুঝিয়ে দিল—সামলানোর জন্য সে আসেনি, সে এসেছে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে। ফারহান এবার বেপরোয়া হয়ে উঠল। সে এক হাতে লুসিয়ার ড্রেসের ফিতেটা সরিয়ে দিয়ে ওর গলার সেই স্পর্শকাতর জায়গায় নিজের ঠোঁট আর দাঁত বসিয়ে দিল।
গাড়ির পেছনের সিটে তখন দুই জোড়া উত্তপ্ত নিশ্বাসের শব্দ আর দুই হৃদপিণ্ডের দ্রুত ধুকপুকানি মিলেমিশে একাকার। ফারহানের হাতের শক্ত স্পর্শ লুসিয়ার সারা শরীরে বিদ্যুৎ বয়ে দিচ্ছিল। লুসিয়া যন্ত্রণায় আর সুখে একবার ফারহানের চুলে আঙুল চালিয়ে দিল, আবার পরক্ষণেই ওর পিঠে নিজের নখ গেঁথে দিল।
গাড়ির এসি চললেও তারা ঘামে ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। ফারহান লুসিয়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলতে লাগল, “তুমি শুধু আমার লুসিয়া… কেউ তোমাকে আমার থেকে কেড়ে নিতে পারবে না।”
বাইরে থেকে পাহারাদারদের পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছিল, টর্চের আলো বারবার গাড়ির কাঁচের ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছিল—কিন্তু ভেতরে তখন পৃথিবীর সমস্ত নিয়ম কানুন তুচ্ছ করে ফারহান আর লুসিয়া একে অপরের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছিল।
বাসর রাতের সেই বন্যতা আজ মনে হলো এই গাড়ির ছোট পরিসরে আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।ফারহান লুসিয়াকে নিজের বুকের সাথে এমনভাবে জাপ্টে ধরে ছিল যে তাদের মাঝে বাতাসের প্রবেশ করার মতো জায়গাটুকুও অবশিষ্ট ছিল না। সেই গভীর রাতে মার্কোর নাকের ডগায় বসেই লুসিয়া আর ফারহান তাদের ভালোবাসার এক চরম ও নিষিদ্ধ অধ্যায় লিখে ফেলল।
গাড়ির ভেতরের সেই তপ্ত পরিবেশটা ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এল। ফারহান দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের অবিন্যস্ত চুলগুলো ঠিক করে নিল, ওর কপালে তখনো বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। লুসিয়া ফারহানের বুকের ওপর মাথা রেখে পরম শান্তিতে চোখ বুজে আছে। ওর সারা শরীরে ফারহানের শক্ত স্পর্শের রেশ এখনো রয়ে গেছে, কিন্তু এতক্ষণের সেই অস্থিরতা এখন আর নেই।
ফারহান লুসিয়ার গালটা আলতো করে ছুঁয়ে খুব নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল, “এবার শান্ত হয়েছো? জানো, তুমি কত বড় ঝুঁকি নিলে আজ?”
লুসিয়া ফারহানের শার্টের বোতাম নিয়ে খেলা করতে করতে মৃদু হাসল। ফারহানের হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি এখনো ওর কানে তালের মতো বাজছে। সে মুখ তুলে ফারহানের চোখের দিকে তাকিয়ে ধরা গলায় উত্তর দিল, “হ্যাঁ, এবার শান্তি পেয়েছি। সেদিনের রাতের পর থেকে আমার ভেতরটা মরুভূমির মতো খাঁ খাঁ করছিল। এই একটা দিন তোমাকে না পেয়ে মনে হচ্ছিল আমি মরে যাব।”
ফারহান ওর চিবুকটা উঁচিয়ে ধরে বলল, “পাগলি একটা! এবার তোমাকে সাবধানে ঘরে ফিরতে হবে।”
লুসিয়া এবার ফারহানের ঠোঁটে একটা ছোট্ট চুমু খেয়ে আলতো করে সরে বসল। ওর চোখেমুখে এখন এক অদ্ভুত তৃপ্তির আভা। সে নিজের ড্রেসটা ঠিক করতে করতে বলল, “তুমি পাশে থাকলে আমি আর কাউকে ভয় পাই না ফারহান। এখন আমি আবার ওই বন্দি বাড়িতে ফিরে যেতে পারব, কারণ আমার শরীরে এখন তোমার স্মেল লেগে আছে।”
ফারহান গাড়ি থেকে নামার আগে শেষবার লুসিয়াকে জড়িয়ে ধরল।
চলবে……..
(রেসপন্স করবেন সবাই বেশি বেশি)
Share On:
TAGS: ডিজায়ার আনলিশড, সাবিলা সাবি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২১
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ১৫
-
ডিজায়ার আনলিশড (ভ্যালেন্টাইন স্পেশাল পর্ব)
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২৩
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৩২
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৩৫ (প্রথমাংশ)
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৩৭
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২২
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৪৩
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২৭