✍️ সাবিলা সাবি
পর্ব-৪৩
মেক্সিকোর সেই তপ্ত দুপুরে ‘ভিলা এস্পেরেন্জা’র অন্দরমহল সেজেছে এক কৃত্রিম আভিজাত্যে। ড্রয়িংরুমে দামী পারফিউমের সুভাস আর মেক্সিকান কফির ধোঁয়া মিলেমিশে এক ভারী পরিবেশ তৈরি করেছে। মেক্সিকোর প্রভাবশালী এক বিজনেস টাইকুন পরিবার আজ লুসিয়াকে দেখতে এসেছে; তাদের উপস্থিতিতে পুরো ড্রয়িংরুমে বইছে ক্ষমতার অদৃশ্য স্রোত। লুসিয়ার বাবা আর জাভিয়ানের বাবা-মা সোফায় বসে আগত অতিথিদের আপ্যায়নে ব্যস্ত। পাশেই মার্কো দম্ভভরে মেতে উঠেছে ব্যবসায়িক কূটচালে। অথচ যার উপস্থিত থাকার কথা সবচেয়ে বেশি ছিল, সেই জাভিয়ানই নিরুদ্দেশ। জরুরি কাজের অজুহাতে সে সকালেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে। চারপাশে যখন আভিজাত্যের লড়াই আর হাসিমুখের ভিড়, লুসিয়ার মনের কোণে তখন কেবলই মেঘ জমেছে। এই জৌলুস তাকে টানছে না, বরং এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তাকে এক গভীর বিষাদে ডুবিয়ে দিচ্ছে।
ঠিক এই মুহূর্তেই তান্বীর হাত ধরে ড্রয়িংরুমে পা রাখল লুসিয়া। তান্বী পরিস্থিতির জটিলতা খুব একটা তলিয়ে দেখেনি, কিংবা মার্কোর আদেশের অবাধ্য হওয়ার সাহস তার ছিল না। তাই সে অনেক যত্ন করে লুসিয়াকে একটি বাসন্তী রঙের শিফন শাড়িতে সাজিয়ে দিয়েছে। লুসিয়াও কেন জানি আজ কোনো প্রতিবাদ করেনি। তার মাথায় তখন কেবল বিকেলের চিন্তা—ফারহানের সাথে আজ তার দেখা করার কথা। ফারহানের প্রিয় পোশাক শাড়ি পরেই সে আজ তৈরি হয়ে আছে; যদি সুযোগ পায়, তবে আজই সে ফারহানের হাত ধরে সব ছেড়ে পালিয়ে যাবে।
লুসিয়া ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই সেখানে এক অস্বস্তিকর স্তব্ধতা নেমে এল। উপস্থিত সবার চোখেমুখে মুগ্ধতার বদলে ফুটে উঠল চরম বিস্ময় আর তাচ্ছিল্য। পাত্রপক্ষ মেক্সিকোর শীর্ষ ধনী পরিবার, তাদের জীবনযাত্রার পুরোটাই পাশ্চাত্য ধাঁচের। পাত্রের মা নিজে যেখানে একটি দামী ডিজাইনার গাউন পরে আভিজাত্য ফুটিয়ে তুলেছেন, সেখানে লুসিয়ার এই শাড়ি পরা রূপটি তাদের কাছে বড্ড বেমানান আর সেকেলে মনে হলো। মুহূর্তেই সেই বিলাসবহুল ঘরটিতে এক গুমোট ভাব ছড়িয়ে পড়ল।
লুসিয়াকে দেখা মাত্রই পাত্রের মায়ের সুতীক্ষ্ণ ভ্রু কুঁচকে গেল। কর্কশ গলায় তিনি বলে উঠলেন, “এটা আপনাদের মেয়ে? ছবিতে তো বেশ আধুনিক আর স্টাইলিশ মনে হয়েছিল। কিন্তু এ কী পোশাক! এই যুগে শাড়ি-টাড়ি কি কেউ পরে?”
অপমানে মার্কোর মুখ মুহূর্তেই রক্তিম হয়ে উঠল। লুসিয়ার দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে সে গর্জে উঠল, “লুসিয়া! তুই এই শাড়ি কেন পরেছিস? তোকে না বলেছিলাম ড্রেস পরে আসতে?”
পরিস্থিতি সামলাতে তান্বী কাঁচুমাচু হয়ে মাঝখানে দাঁড়াল। করুণ স্বরে বলল, “সরি ভাইয়া! আসলে আমিই লুচি আপাকে শাড়িটা পরিয়েছিলাম। আমি ভেবেছিলাম পাত্রপক্ষ আসবে, তাই আমাদের ঐতিহ্য অনুযায়ী—”
“তুমি কী ভেবেছিলে?” মার্কোর বাবা সাইফ চৌধুরীর হুঙ্কার দিয়ে তন্বীকে থামিয়ে দিলেন। “এটা কি বাংলাদেশ? এখানে কি পাত্রপক্ষ এলে মেয়েকে একহাত লম্বা ঘোমটা দিয়ে বসিয়ে রাখতে হবে? আমাদের মান-সম্মান সব কি আজ ধুলোয় মিশিয়ে দেবে?”
তান্বী মাথা নিচু করে অপরাধীর মতো বলল, “আমি সত্যিই দুঃখিত, আসলে বুঝতে পারিনি।”
পাত্রের মা এবার তান্বীর আপাদমস্তক খুঁটিয়ে দেখে তাচ্ছিল্যের সাথে জিজ্ঞেস করলেন, “এই মেয়েটি কে? কথা বলার ধরন তো বেশ অন্যরকম লাগছে!”
জাভিয়ানের মা পাশ থেকে আমতা আমতা করে উত্তর দিলেন, “ও আমার ছেলে জাভিয়ানের বউ, তান্বী।”
পাত্রের মা এবার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বললেন, “চেহারা দেখেই মনে হচ্ছিল বাঙালি হবে! বাই দ্য ওয়ে, আমি নিজেও এককালে বাংলাদেশের মেয়ে ছিলাম।”
পরিচয়টা শুনে তন্বীর চোখে কিছুটা আশার আলো ফুটে উঠল। সে আবেগপ্রবণ হয়ে বলল, “আন্টি! আপনি বাংলাদেশের? তাহলে তো আপনি শাড়ির কদর বুঝবেন!”
পাত্রের মা এবার বিরক্তির সাথে নাক সিঁটকে জবাব দিলেন, “হ্যাঁ, ছিলাম। তবে সেই মান্ধাতা আমলের সংস্কৃতির সাথে এখন আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আমি নিজেকে পুরোপুরি মেক্সিকান কালচারের সাথে মিশিয়ে নিয়েছি। শাড়ি এখন আমার কাছে স্রেফ পুরোনো দিনের এক ঝাপসা স্মৃতি।”
ঠিক সেই মুহূর্তে পাত্রের ছোট বোন, যে কি না উগ্র আধুনিক পোশাকে বসে ছিল, সে জাভিয়ানের বাবার দিকে তাকিয়ে টিপ্পনী কাটল, “আঙ্কেল! আপনার মতো রুচিশীল মানুষের ছেলের বউ হিসেবে একে মানায়? দেখতে অনেক সুন্দর হতে পারে, কিন্তু মেক্সিকোর এই হাই-সোসাইটির সাথে ও বড্ড বেমানান। বড় বেশি সাধারণ!”
এই প্রকাশ্য অবমাননায় তান্বীর বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। নিজের দেশের সংস্কৃতির প্রতি এমন তুচ্ছতাচ্ছিল্য আর তাকে ‘সাধারণ’ বলে দেওয়া খোঁচাটা তীরের মতো তার হৃদয়ে বিঁধল। পরিস্থিতিটা যদি লুসিয়ার বিয়ের সম্বন্ধ না হতো, তবে তন্বী আজ এই উগ্র মেয়েটিকে উচিত জবাব দিয়ে ছেড়ে দিত। মেক্সিকোর এই হাই-সোসাইটির চাকচিক্য যে মানুষের ব্যক্তিত্ব বদলাতে পারলেও রুচি বদলাতে পারেনি, সেটা সে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিত। কিন্তু লুসিয়ার কথা ভেবে আর বাড়ির বড়দের সম্মানের খাতিরে সে মনের কষ্ট মনেই চেপে রাখল। এক মুহূর্তের জন্য তার চোখ দুটো ভিজে এলেও পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিল সে। এখানে দুর্বলতা দেখালে এই মানুষগুলো আরও পেয়ে বসবে।
লুসিয়া সোফায় বসে অপমানে কুঁকড়ে যাচ্ছিল। তার কারণেই আজ তান্বীকে এভাবে কথা শুনতে হচ্ছে। সে মনে মনে ফারহানের কথা ভাবছিল। এই শাড়ি পরেই তো সে ফারহানের কাছে যেতে চেয়েছিল, অথচ এখানে সেই প্রিয় পোশাকটিই আজ চরম অবজ্ঞার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মার্কো রাগে কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে উঠল, “লুসিয়া, এখনই ভেতরে যা! এই বিদঘুটে পোশাক খুলে আধুনিক কিছু পরে আয়। আর তান্বী, তুমিও যাও! তোমাদের জন্য আজ সবার সামনে আমাদের মাথা নিচু হচ্ছে।”
ড্রয়িংরুমের গুমোট ভাবটা কাটাতে এবার পাত্র যার নাম আরভিয়ান নিজেই মুখ খুলল। মেক্সিকোর এত বড় বিজনেস টাইকুনের ছেলে সে, অথচ তার আচরণে কোনো দেমাগ নেই। যখন সবাই লুসিয়ার পোশাক নিয়ে আজেবাজে কথা বলছিল, আরভিয়ান তখন শান্ত চোখে লুসিয়াকে দেখছিল। সবাইকে অবাক করে দিয়ে সে বলল, “না না, ঠিক আছে। শাড়ি নাকি কি নাম এই পোশাকটার বদলানোর কোনো দরকার নেই। বরং লুসিয়াকে বেশ ইউনিক লাগছে। আমাদের সার্কেলে সবাই তো ওয়েস্টার্ন ড্রেস পরে, এমন পোশাকে কাউকে আমি আগে দেখিনি। সত্যি বলতে, লুসিয়াকে এই পোশাকে দারুণ মানিয়েছে।”
আরিভিয়ানের এই সহজ স্বীকারোক্তি মুহূর্তেই ড্রয়িংরুমের থমথমে পরিবেশটা হালকা করে দিল। মার্কো আর তার বাবা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। তবে আরভিয়ানের মা আর বোন বিষয়টাকে সহজভাবে নিতে পারল না; তাদের চোখেমুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট। সবশেষে ঠিক হলো আরভিয়ান আর লুসিয়া বাইরে কোথাও গিয়ে একা কথা বলবে। মার্কো চাইল তারা কোনো দামী রেস্টুরেন্টে যাক। লুসিয়া একটু ঘাবড়ে গেল; বিকেলেই তো ফারহানের সাথে তার দেখা করার কথা! সে চট করে বুদ্ধি খাটিয়ে বলল, “আমি যাব, তবে তান্বীকেও সাথে নিতে চাই। আমি একা যেতে পারব না।”
আরভিয়ান কোনো আপত্তি করল না, বরং খুব সহজেই রাজি হয়ে গেল। তান্বী প্রথমে একটু দোটানায় ছিল, কিন্তু লুসিয়ার চোখের আকুতি দেখে সে আর মানা করতে পারল না। তন্বী প্রেগন্যান্ট বলে জাভিয়ান তার বাইরে যাওয়া নিয়ে ইদানীং খুব কড়াকড়ি করে, কিন্তু মার্কো নিজে অনুমতি দেওয়ায় এবার আর কেউ বাধা দিল না। তান্বী মনে মনে একটু কষ্ট পেলেও নিজেকে সামলে নিল। সে জানে, এই মুহূর্তে লুসিয়ার পাশে থাকাটা কতটা জরুরি।
লুসিয়া শাড়িটা সামলে নিয়ে তান্বীর হাত ধরে ধীরপায়ে বাইরে বেরিয়ে এল। পোর্চে আরভিয়ানের দামী স্পোর্টস কারটা রোদে ঝিকমিক করছিল। লুসিয়া একবার গাড়ির দিকে তাকাল, পরক্ষণেই মনে হলো—এই তো সুযোগ! তান্বী পাশে আছে বলেই সে আজ এত বড় ঝুঁকি নেওয়ার সাহস পাচ্ছে। গাড়িতে ওঠার সময় লুসিয়া আড়চোখে দেখল মার্কো তাকে শাসানোর ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে। সে মনে মনে বলল, “ভাইয়া, আজ তোমরা আমাকে জোর করে সাজিয়ে পাঠিয়েছ ঠিকই, কিন্তু আমি যাচ্ছি আমার নিজের ঠিকানার খোঁজে।”
আরভিয়ান গাড়ি স্টার্ট দিয়ে মেক্সিকোর একটি নিরিবিলি পার্কের দিকে এগিয়ে চলল। লুসিয়া জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল, তার কান দুটো কেবল ফারহানের বাইকের সেই পরিচিত গর্জনের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। পার্কের এক কোণে গাড়ি থামাতেই আরভিয়ান বেশ উৎসাহ নিয়ে নামল। সে চাইল লুসিয়ার সাথে কিছুটা সময় একান্তে কাটাতে। কিন্তু লুসিয়ার মাথায় তখন অন্য ঘোর। সে তান্বীর দিকে ইশারায় তাকাল। তান্বী পরিস্থিতি বুঝতে পেরে আরভিয়ানের দিকে তাকিয়ে ম্লান হেসে বলল— “আরভিয়ান ভাইয়া, লুচি আপা একটু অসুস্থ বোধ করছে। উনি আসলে এই শোরগোল আর ভিড় ঠিক নিতে পারছে না। আমি ওনাকে নিয়ে পাশের ক্যাফে থেকে একটু ফ্রেশ হয়ে আসছি। আপনি বরং এখানে বসুন, আমরা দশ মিনিটের মধ্যেই আসছি।”
আরভিয়ান বেশ ভদ্রভাবেই মাথা নেড়ে সায় দিল, “ওহ নিশ্চয়ই! আপনারা যান, আমি এখানেই অপেক্ষা করছি।” আরভিয়ানকে সেখানে বসিয়ে রেখে লুসিয়া আর তান্বী দ্রুত পায়ে মেইন রোডের দিকে বেরিয়ে এল। লুসিয়া হাত বাড়িয়ে একটা ট্যাক্সি থামাল। তন্বীর বুক তখন দুরুদুরু কাঁপছে। সে জানে লুসিয়া তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, আর এই যাত্রার পরিণাম কী হতে পারে তা ভেবেই তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে।
ট্যাক্সিটা যখন ফারহানের অ্যাপার্টমেন্টের সামনে এসে থামল, তান্বীর দুচোখ নোনা জলে ঝাপসা হয়ে এল। দীর্ঘ কয়েকটা মাস ছিলো কয়েক যুগের সমান। যে ভাইকে সে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসতো, যাকে পরিস্থিতির নিষ্ঠুরতা একপ্রকার নির্বাসনেই পাঠিয়ে দিয়েছিল—আজ সেই ফারহানের দরজায় দাঁড়িয়ে তার বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। লিফটে ওঠার সময় তান্বী লুসিয়ার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। তার সারা শরীর তখন থরথর করে কাঁপছে। এক অজানা আশঙ্কায় সে ভাঙা গলায় ফিসফিস করে বলল, “লুচি আপা, ভাইকা আমার সামনে আসবে? আমার ওপর রেগে নেইতো?”
লুসিয়া তান্বীর চোখের জল মুছে দিয়ে ভরসা দিল, “পাগল নাকি তুমি? ফারহান তোমাকে দেখার জন্য কতটা ছটফট করে তা তুমি জানো না। তোমাকে দেখা মাত্রই খুশিতে পাগল হয়ে যাবে।”
লিফট যখন ফারহানের ফ্লোরে এসে স্থির হলো, তান্বীর মনে হলো তার হৃদস্পন্দন বুঝি বন্ধ হয়ে যাবে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার সেই চরম মুহূর্ত। ফারহানের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে দাঁড়াতেই তান্বী আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না; এতো মাসের জমানো হাহাকার আর মমতা আজ বাঁধভাঙা কান্নার মতো নেমে এল। লুসিয়া আলতো করে কলিং বেল টিপল। দরজার ওপাশ থেকে ফারহানের চিরচেনা পায়ের শব্দ এগিয়ে আসছে। তান্বী তড়িঘড়ি করে ওড়না দিয়ে চোখ মোছার চেষ্টা করল, কিন্তু অবাধ্য চোখের জল কিছুতেই থামছে না। তার কলিজার টুকরো ভাইটি এখন ঠিক এই দরজার ওপাশেই!
দরজাটা খোলার সাথে সাথেই ফারহানের দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল। সামনে বাসন্তী শাড়িতে দাঁড়িয়ে থাকা লুসিয়াকে দেখে তার হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। শরতের মেঘমুক্ত আকাশের মতো এক স্নিগ্ধতা মেয়েটির চোখেমুখে। ফারহান মুগ্ধ হয়ে অপলক তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। সে তার সব আবেগ উজাড় করে দিয়ে লুসিয়ার হাতটা আলতো করে ধরল। লুসিয়াকে নিজের দিকে টেনে নিতে নিতে গভীর স্বরে বলল, “লুসিয়া! তুমি জানো না তোমাকে আজ ঠিক কতটা সুন্দর লাগছে! আমি যেন চোখ সরাতে পারছি না।”
লুসিয়া ফারহানের ছোঁয়ায় কিছুটা লজ্জা পেলেও হাসিমুখে ওকে থামিয়ে দিল। সে আলতো করে ফারহানের হাতটা সরিয়ে দিয়ে বলল, “আরে আরে! একটু থামো মিস্টার ফারহান। রোমান্স করার অনেক সময় পাওয়া যাবে। আগে দেখো, তোমার জন্য কী বিশাল এক সারপ্রাইজ এনেছি।”
ফারহান ভ্রু কুঁচকে কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “সারপ্রাইজ? কিসের সারপ্রাইজ লুসিয়া?”
লুসিয়া দরজার পাশে ঘাপটি মেরে থাকা অন্ধকারের দিকে ইশারা করল। খুব নিচু স্বরে ডাকল, “এসো, ভেতরে এসো।”
লুসিয়ার কথা শেষ হতে না হতেই তান্বী ধীর পায়ে দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। তিন্বীকে দেখা মাত্র ফারহানের পুরো শরীর যেন পাথর হয়ে গেল। সে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। তার সামনে কি সত্যিই রক্তমাংসের তান্বী দাঁড়িয়ে? যে বোন তাকে ঘৃণা করার কথা ছিল, যাকে সে নিজের জীবন থেকে চিরতরে হারিয়ে ফেলেছে বলে মেনে নিয়েছিল,সে আজ তার দোরগোড়ায়। ফারহান স্তব্ধ হয়ে রইল। তার কণ্ঠ চিরে কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না। ওদিকে তান্বীও ফারহানের দিকে সরাসরি তাকাতে পারছে না। অপরাধবোধ আর অভিমানে মাথা নিচু করে রাখা মেয়েটির দুচোখ বেয়ে তখন নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। মেক্সিকোর এই নিঃঝুম অ্যাপার্টমেন্টের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা দুই ভাইবোন যেন কয়েক হাজার মাইলের এক হিমশীতল দেয়াল ভাঙার চেষ্টা করছে। পুরো ঘরে তখন পাথরের মতো ভারী নীরবতা। তান্বীর কান্নার শব্দ আর ফারহানের ভারী হয়ে আসা নিঃশ্বাস মিলেমিশে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ তৈরি করল। কিছুক্ষণ ওভাবেই কেটে যাওয়ার পর ফারহানের কণ্ঠ চিরে এক পশলা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। সে অস্ফুট স্বরে বলল, “বোন, তুই? তুই এখানে?”
তন্বী আর নিজেকে সামলাতে পারল না। দীর্ঘদিনের জমানো অভিমান আর যন্ত্রণার বাঁধ এক নিমেষেই চুরমার হয়ে গেল। কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই সে পাগলের মতো ফারহানকে জাপ্টে ধরল। ফারহানের বুকে মুখ লুকিয়ে সে এমনভাবে ডুকরে কেঁদে উঠল যে তার প্রতিটি হেঁচকিতে ফারহানের শার্ট ভিজে একাকার হয়ে গেল। ফারহানের নিজের চোখও আজ শাসন মানছে না। সে তার বোনটিকে পরম মমতায় আগলে ধরল। তার মনে হচ্ছে, এই মায়ার বাঁধনটুকু একবার আলগা হয়ে গেলেই সব আবার আগের মতো শূন্য হয়ে যাবে। ফারহান আলতো করে তান্বীকে নিজের বুক থেকে আলাদা করল। ওর ভেজা মুখটা দুহাতে তুলে ধরে ধরা গলায় জিজ্ঞেস করল, “তুই কি আমাকে আর ঘৃণা করিস না তান্বী?”
তান্বী অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “চেয়েছিলাম ভাইয়া। অনেক চেষ্টা করেছিলাম তোমাকে মন থেকে মুছে ফেলতে কিন্তু পারিনি। রক্তের টান কি এত সহজে ছিন্ন করা যায়? বাবা-মাও তোমাকে খুব মনে করেন। তুমি কেন তাদের কাছে যাও না? তারা তো তোমার পথ চেয়ে বসে আছেন।”
ফারহান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালার বাইরের ধূসর আকাশের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “কোন মুখে যাব রে? তাদের সামনে দাঁড়ানোর মতো জোর আজ আমার নেই। এলিনাকে আমি রক্ষা করতে পারিনি। এই অপরাধবোধ আমাকে আমৃত্যু তাড়িয়ে বেড়াবে।”
তান্বী এবার ফারহানের হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। “যা হওয়ার হয়ে গেছে ভাইয়া। এলিনা আপাকে তো আমরা আর কোনোদিন ফিরে পাব না। কিন্তু তাকে হারানোর শোকে তোমাকে তো আর হারিয়ে যেতে দিতে পারি না। প্লিজ ভাইয়া, তুমি একবার বাবা-মায়ের কাছে ফিরে চলো।”
ফারহান এবার একটু ম্লান হাসল। তান্বীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে কোমল স্বরে বলল, “এখনও সময় হয়নি বোন। আমার ছায়া এখন তাদের ওপর পড়লে হিতে বিপরীত হতে পারে। আমার শত্রুরা চারদিকে ওত পেতে আছে। সময় হলে আমি নিজেই ফিরব। এখন তুই ভেতরে আয়, বোস। আমি তোর জন্য তোর পছন্দের খাবারগুলো তৈরি করছি। তুই তো আমার হাতের রান্না খুব ভালোবাসতিস।”
ফারহান তান্বীকে নিয়ে ভেতরে গেল। তাদের এই আবেগঘন মুহূর্তের আড়ালে লুসিয়া এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল। ফারহানের চোখে তন্বীর জন্য সেই অগাধ মায়া আর অধিকার দেখে লুসিয়ার মনের ভেতর এক অদ্ভুত অস্বস্তি শুরু হলো। সে নিজের ওপর নিজেই বিরক্ত হলো। মনে মনে নিজেকে শাসন করে বলল “লুসিয়া, নিজেকে সামলা! তান্বী ফারহানের আপন বোন, ওর ওপর তান্বীর দাবিই তো সবচেয়ে বেশি। আমার কেন এসব দেখেও হিংসা হচ্ছে? উফ, আমার কি সত্যিই কোনো মানসিক সমস্যা আছে? ফারহান যদি একবার জানতে পারে আমি ওর বোনের প্রতিও ঈর্ষা করছি, তবে ও আমাকে কী ভাববে! ছিঃ লুসিয়া, ম্যাচিউর হ!”
লুসিয়া নিজের এই অব্যক্ত ঈর্ষাকে মনের গভীরে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করল ঠিকই, কিন্তু ফারহানের জীবনের প্রতিটি ইঞ্চিতে নিজের একচ্ছত্র অধিকার পাওয়ার তৃষ্ণা তাকে কিছুতেই শান্ত হতে দিল না।
ফারহানের অ্যাপার্টমেন্টের ডাইনিং টেবিলে আজ এক বিচিত্র আবহের সৃষ্টি হয়েছে। ফারহান যেন আজ সেই পুরনো ফারহান, যাকে মেইলস্ট্রোমদের বিষাক্ত নিশ্বাস এখনো পুরোপুরি গ্রাস করতে পারেনি। দীর্ঘ কয়েক মাস পর প্রাণের বোনকে ফিরে পেয়ে সে আজ খুশিতে আত্মহারা। রান্নাঘর থেকে ধোঁয়া ওঠা তন্বীর প্রিয় খাবারগুলো যখন টেবিলে সাজানো হলো, তখন ফারহানের চেহারায় এক অপার্থিব তৃপ্তি।
গল্পের মোড়টা ঘুরল তখন, যখন তন্বী আমতা আমতা করে নিজের প্রেগন্যান্সির খবরটা দিল। ফারহান এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। পরক্ষণেই তার মুখটা এক চিলতে রোদ পড়ার মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে অস্ফুট স্বরে বলল, আমি মামা হচ্ছি? তন্বী, তুই কি জানিস এটা আমার জীবনের সবচেয়ে সেরা খবর!
ফারহানের আনন্দ যেন আর ধরে না। সে পরম মমতায় তন্বীর পাশে বসল। তন্বীর শরীর এখন দুর্বল, তাই ফারহান নিজেই চামচ দিয়ে তন্বীর মুখে খাবার তুলে দিতে লাগল। ভাইবোনের এই চিরায়ত ভালোবাসার দৃশ্যটি যে কারো চোখ জুড়িয়ে দেওয়ার কথা।
কিন্তু ডাইনিং টেবিলের অপর প্রান্তে বসে থাকা লুসিয়ার চোখে তখন আগুনের ফুলকি। জাভিয়ান আর লুসিয়া, দুজনেই মেইলস্ট্রোম বংশের রক্ত বহন করছে। তাদের জিনেই যেন এক অদ্ভুত ডার্ক সাইকোলজি মিশে আছে। তারা নিজেদের সঙ্গীর ওপর অন্য কারো ছায়া পর্যন্ত সহ্য করতে পারে না, হোক সে আপন ভাই বা বোন। ফারহান যখন তন্বীকে খাইয়ে দিচ্ছে, লুসিয়ার দৃষ্টি তখন স্থির হয়ে আছে ফারহানের আঙুলের দিকে। তার মনে হচ্ছে, ওই হাতের স্পর্শ আর পুরো মনোযোগ কেবল তার একার হওয়া উচিত ছিল।
লুসিয়া হাতের কাঁটাচামচটা প্লেটের ওপর সজোরে চেপে ধরল। তার ফর্সা হাতটা রাগে সাদা হয়ে গেছে, চোয়াল শক্ত। ফারহানের এই মমতা, এই নিবিড় যত্ন যা কেবল তার পাওয়ার কথা ছিল, সেখানে তন্বীর ভাগ বসানোটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না।
ফারহান তান্বীকে নিয়ে ব্যস্ত থাকায় লুসিয়ার ভেতরে সেই জেনেটিক অন্ধকার ‘পজেসিভনেস’ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। তার কাছে ভালোবাসা মানেই পূর্ণ অধিকার, সেখানে দ্বিতীয় কোনো ভাগিদার সে সহ্য করতে পারে না। ফারহানের প্রতিটি কথা আর যত্ন এখন লুসিয়ার কাছে এক অসহ্য অবহেলা মনে হচ্ছে। সে বুঝতেই পারছে না যে রক্তের সম্পর্কের মমতা আর জীবনসঙ্গীর প্রতি টান সম্পূর্ণ আলাদা দুটো স্রোত।
ফারহান অবশ্য এই মানসিক টানাপোড়েনের কিছুই টের পেল না। সে পরম মমতায় তান্বীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, “বেশি করে খা বোন। তোর শরীরের এখন অনেক যত্ন দরকার। আজ থেকে তোর সব দায়িত্ব আমারও।”
ফারহানের মুখে এই ‘দায়িত্ব’ শব্দটা শোনামাত্র লুসিয়ার বুকের ভেতরটা যেন জ্বলে উঠল। তার মনে হলো ফারহান তাকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে তার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু বানিয়ে ফেলছে। সে আর এক মুহূর্ত সেখানে বসে থাকতে পারল না। হুট করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেই ফারহান আর তান্বী দুজনেই অবাক হয়ে ওর দিকে তাকাল। লুসিয়া থমথমে গলায় বলল, “আমার খাওয়া শেষ। আমি পাশের রুমে যাচ্ছি।” ফারহান বেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “আরে লুসিয়া, তুমি তো কিছুই খেলে না! কী হয়েছে তোমার?”
লুসিয়া কোনো উত্তর দিল না। গটগট করে শব্দ করে সে ডাইনিং থেকে চলে গেল। ফারহান তান্বীর দিকে তাকিয়ে একটু অপ্রস্তুত হাসল। কিন্তু তান্বী দেখল লুসিয়ার চোখে ঠিক সেই একই অস্থিরতা আর উন্মাদনা, যা সে জাভিয়ানের চোখে সবসময় দেখে আসছে। তন্বীর বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল।
লুসিয়া ঘরে ঢুকেই সজোরে দরজাটা বন্ধ করে দিল। প্রচণ্ড শব্দে পুরো ঘরটা যেন কেঁপে উঠল। তার বুকের ভেতরটা এমনভাবে ধড়ফড় করছে যেন কেউ হাতুড়ি দিয়ে পিটছে। সে টালমাটাল পায়ে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাতেই সে শিউরে উঠল। তার চোখ দুটো এখন আর স্বাভাবিক নেই; মণি দুটো ছোট হয়ে এসেছে এবং সেখানে এক অদ্ভুত ধূসর আভা খেলা করছে। লুসিয়া নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল—”ও ওর বোন, ফারহানের কলিজার টুকরো। আমি কেন এমন করছি? আমি কেন চাইছি ফারহান শুধু আমার দিকেই তাকিয়ে থাকুক?”
কিন্তু তার মস্তিষ্ক যেন আজ নিজের বশ মানছে না। আসলে লুসিয়া যা অনুভব করছে, তা কেবল সাধারণ হিংসা নয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা যায় ‘অ্যাবনরমাল পজিশিভ অ্যাটাচমেন্ট ডিসঅর্ডার’, যা তার বংশের রক্তে মিশে থাকা এক ধরণের জেনেটিক মিউটেশন। আয়নায় নিজের বিবর্ণ চেহারার দিকে তাকিয়ে লুসিয়া বুঝতে পারল, ফারহানের প্রতি তার এই টান এখন আর কেবল ভালোবাসায় সীমাবদ্ধ নেই, তা এক ভয়ানক নেশায় রূপ নিয়েছে।
ডাইনিং রুমের সেই নিস্তরঙ্গ পরিবেশে লুসিয়ার ফোনের রিংটোনটা যেন ধারালো তলোয়ারের মতো আঘাত করল। স্ক্রিনে আরভিয়ানের নামটা ভেসে উঠতেই সে এক মুহূর্তের জন্য শিউরে উঠল। দ্রুত দরজা খুলে বেরিয়ে এসে তান্বীর দিকে চেয়ে ধরা গলায় বলল, “তান্বী আরভিয়ান কল করছে। আমরা ওকে পার্কে একা ফেলে রেখে এসেছি কতক্ষণ হয়ে গেল!” ফারহান ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “আরভিয়ান কে?”
তন্বী এবার অপরাধীর মতো মুখ করে সবটা খুলে বলল। আজকের পাত্রপক্ষ, আরভিয়ানের প্রশংসা, শাড়ি নিয়ে সেই হুলস্থুল আর কীভাবে তাকে বোকা বানিয়ে তারা এখানে পালিয়ে এসেছে—সব শুনে ফারহান হো হো করে হেসে উঠল। সে হাসি থামিয়ে বলল, “তোরা মেয়েরা পারিসও বটে! একটা ছেলেকে মাঝপথে এভাবে একা বসিয়ে রেখে চলে এলি?”
ফারহানের মুখে এই নিশ্চিন্ত হাসি দেখে লুসিয়ার ভেতরে আবার সেই দহন শুরু হলো। তার চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে অভিমানের সুরে বলল, “তোমার কি একবারও খারাপ লাগছে না ফারহান? অন্য একটা ছেলে আমাকে দেখতে এসেছে, আমার পরিবার ওর সাথে আমার বিয়ে দিতে চাইছে—এটা শুনে তোমার একটুও অস্থির লাগছে না?”
ফারহান খুব শান্ত গলায় উত্তর দিল, “খারাপ কেন লাগবে লুসিয়া? তুমি তো আর ওকে বিয়ে করছ না। আর তোমার পরিবার তো জানে না যে আমাদের বিয়ে হয়ে গেছে। টেনশন করার তো কিছু দেখছি না।”
ফারহানের এই স্বাভাবিক ভঙ্গি লুসিয়াকে আরও বেশি অশান্ত করে তুলল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “ফারহান, একটু পাশের রুমে আসবে? জরুরি কথা আছে।”
ফারহান একবার তান্বীর দিকে তাকাল। তান্বী ইশারায় ওকে যেতে বলল। রুমে ঢোকা মাত্রই লুসিয়া একপ্রকার ফারহানের ওপর হামলে পড়ল। সে ফারহানের শার্টের কলার চেপে ধরে চিৎকার করে উঠল, “তুমি কেন জেলাস নও ফারহান? কেন তোমার রক্ত টগবগ করে ফুটছে না? তোমার জায়গায় যদি জাভি ব্রো কিংবা মেইলস্ট্রোম ভাইয়া থাকত, তবে এতক্ষণে ওই আরভিয়ানকে তারা মেরে টুকরো টুকরো করে ফেলত!
ফারহান এবার লুসিয়ার কাঁধে হাত রেখে স্থির দৃষ্টিতে ওর চোখের দিকে তাকাল। তার কণ্ঠে এক গম্ভীর গভীরতা—”লুসিয়া, ওটা ভালোবাসা নয়, ওটা একটা অসুখ। তোমার ভাইদের যা আছে, সেটা হলো সাইকোলজিক্যাল ডিসঅর্ডার। আমি একজন সুস্থ মানুষ, আমার ভেতরে ওসব অসুস্থতা নেই। তুমি কেন তোমার ভাইদের সাথে আমাকে তুলনা করছ? এই পৃথিবীতে সবার ব্যক্তিত্ব আলাদা হয়।”
ফারহান আরও কাছে এসে মৃদু স্বরে বলল, “জেলাস হওয়া মানেই কি ভালোবাসা? আমি তোমাকে বিশ্বাস করি লুসিয়া, এটাই আমার ভালোবাসা। আর বিশ্বাস যেখানে থাকে, সেখানে ঈর্ষার কোনো জায়গা নেই।”
লুসিয়া এক বিশাল ধাক্কা খেল। সে ভিলা এস্পেরেন্জার সাম্রাজ্যের সেই বদ্ধ পরিবেশে বড় হয়েছে যেখানে ভালোবাসা মানেই হলো শিকল, যেখানে প্রিয় মানুষকে আগলে রাখা মানে তাকে বাইরের পৃথিবী থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। সে ভেবেছিল ফারহানও তার জন্য একইভাবে ‘ক্রেজি’ হবে, আরভিয়ানকে নিয়ে ফারহানের ভেতরে ক্রোধ ফুটে উঠবে। কিন্তু ফারহানের এই শান্ত, যুক্তিপূর্ণ এবং সুস্থ আচরণ লুসিয়ার কাছে অবহেলা মনে হলো। তার মাথার ভেতরে সেই তার সেই মানসিক সিনড্রোম তখন চরম পর্যায়ে। অভিমানে আর রাগে লুসিয়ার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। সে ফারহানের কোনো কথা না শুনেই হুট করে রুম থেকে বেরিয়ে অ্যাপার্টমেন্টের মেইন দরজা দিয়ে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল।
ফারহান হতভম্ব হয়ে পেছনে পেছনে এল, কিন্তু ততক্ষণে লিফটের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। লিভিং রুমে বসে থাকা তান্বী আঁতকে উঠে দাঁড়াল। সে বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে ভাইয়া? লুচি আপা এভাবে হুট করে কোথায় গেল?”
ফারহান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তান্বীর পাশে সোফায় বসল। সে খুব ক্লান্ত গলায় লুসিয়ার সাথে হওয়া কথোপকথন আর তার ওই ‘পজেসিভ’ ডিমান্ডের কথা সব খুলে বলল। সব শুনে তন্বী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার চোখেমুখে এক বিষণ্ণ চিন্তার রেখা ফুটে উঠল। সে ফারহানের হাতটা ধরে খুব নিচু স্বরে বলল—”ভাইয়া, লুচি আপাকে তুমি একদম দোষ দিও না। উনি যে পরিবারে বড় হয়েছেন, সেখানে ভালোবাসা মানেই হলো চরম অধিকার। জাভিয়ানও ঠিক এমনই। ও আমার প্রতি এতটাই পজেসিভ যে মাঝেমধ্যে আমার মনে হয় আমি কোনো সোনার খাঁচায় বন্দি পাখি। লুচি আপা হয়তো ছোটবেলা থেকেই এসব দেখে অভ্যস্ত। ওনার কাছে এটাই ভালোবাসার সংজ্ঞা।”
তান্বী ফারহানের চোখের দিকে তাকিয়ে আবার বলল, “তুমি যেমন সুস্থভাবে ভাবছ, উনি সেটা ভাবতেই পারছেনা। কারণ ওনার রক্তে আর বেড়ে ওঠায় জাভিয়ানের মতো মানুষদের ছায়া আছে। জাভিয়ানও ঠিক তার মতোই পার্টনারের ওপর অন্য কারো ছায়া সহ্য করতে পারে না। ওটা একটা অসুখ হতে পারে ভাইয়া, কিন্তু এটাই তাদের পরিচয়।”
ফারহান জানালার বাইরে তাকিয়ে ভাবছিল, সে কি পারবে লুসিয়ার এই অন্ধকার মানসিকতাকে আলোর পথে ফেরাতে? নাকি এই মানসিক অসুস্থতা শেষ পর্যন্ত তাদের সাজানো সংসারকে ধ্বংস করে দেবে?
ওদিকে লুসিয়া তখন লিফট থেকে নেমে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে কাঁপছে। তার মনে হচ্ছে ফারহান তাকে সত্যি ভালোবাসে না। এই সময় তার ফোনটা আবার বেজে উঠল। আরভিয়ানের কল। ফারহান সোফায় ধপ করে বসে পড়ল। ওর কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। তান্বী ওর পাশে বসে ভাইয়ের অসহায়ত্ব দেখে একটু ম্লান হাসল। ফারহানের মতো শান্ত আর সাহসী ছেলে যে এভাবে ভ্যাবাচ্যাকা খেতে পারে, তা তান্বীর কল্পনার বাইরে ছিল। তান্বী ফারহানের কাঁধে হাত রেখে টিপ্পনী কেটে বলল, “যাক ভাইয়া, একটা জিনিস অন্তত ভালো হয়েছে—আমি একাই মেন্টালের পাল্লায় পড়িনি, তুমিও পড়েছো! আমি তো জাভিয়ানের পাগলামি সামলাতে সামলাতে ক্লান্ত, এখন দেখছি তোমার কপালেও একই লিখন।”
ফারহান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তান্বীর দিকে তাকাল। ওর গলায় এক অদ্ভুত হতাশা আর বিস্ময়। সে বিড়বিড় করে বলল, “বিশ্বাস কর তান্বী, মেক্সিকোর বাঘা বাঘা মাফিয়া লর্ডদের হ্যান্ডেল করাও এর চেয়ে অনেক সহজ! তাদের সাথে অন্তত লজিক দিয়ে লড়া যায়, কিন্তু এই মেয়ের লজিক তো দুনিয়ার বাইরের। আমি ওকে স্পেস দিচ্ছি, বিশ্বাস করছি—আর ও এটাকে ভাবছে অবহেলা!”
ফারহান একটু থেমে আবার বলল, “মাফিয়ারা যদি আক্রমণ করে, আমি জানি পিস্তল কোথায় চালাতে হবে। কিন্তু লুসিয়া যখন ওই আগ্নেয়গিরির মতো চোখ করে তাকালো আর বললো যে আমি কেন জেলাস নই, তখন তো আমার সব টেকনিক ফেইল করে গেলো। এই মেয়েকে আমি কীভাবে হ্যান্ডেল করব তান্বী?”
তান্বী এবার গম্ভীর হয়ে গেল। সে জানে লুসিয়া আর জাভিয়ানের এই সিনড্রোম কতটা গভীর। সে ফারহানকে সাবধান করে দিয়ে বলল, “ভাইয়া, এদের সাথে স্বাভাবিকভাবে লড়তে যেও না। এদের মাথায় ভালোবাসার কেমিস্ট্রিটা একটু আলাদা। তুমি যত বেশি সুস্থ আচরণ করবে, ও তত বেশি ভাববে তুমি ওকে ভালোবাসো না। জাভিয়ান মাঝেমধ্যে আমার ওপর এমনভাবে চড়াও হয় যেন আমি ওর সম্পত্তি। লুসিয়াও তোমার থেকে ঠিক ওই লেভেলের পাগলামিটাই এক্সপেক্ট করে।”
ফারহান মাথা নাড়ল। সে বুঝল, সে শুধু একজন গ্যাংস্টার নয় এখন তাকে একজন মনস্তত্ত্ববিদও হতে হবে। লুসিয়া যে অভিমানে বাইরে চলে গেছে, সেটা হয়তো কোনো বড় বিপদের সংকেত। ঠিক তখনই তন্বীর ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল ‘জাভিয়ান’-এর নাম।
তন্বীর বুকটা ধক করে উঠল। সে জানে, এতক্ষণে আরভিয়ান নিশ্চয়ই বাড়িতে খবর দিয়ে দিয়েছে যে তারা পার্কে নেই।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতেই ভিলার চারপাশ এক থমথমে নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল। ফারহান বেশ দুশ্চিন্তা নিয়ে তান্বীকে বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়েছিল। তান্বী ভেতরে গিয়ে দেখল লুসিয়া নিজের ঘরে অঘোরে ঘুমাচ্ছে; সম্ভবত দীর্ঘক্ষণ কান্নাকাটি আর মানসিক ধকল শেষে শরীর আর সায় দেয়নি। তান্বী কালক্ষেপণ না করে ফারহানকে বার্তা পাঠাল, “ভাইয়া, আপা বাড়িতেই আছে। এখন ঘুমাচ্ছে।”
মেসেজটা পেয়ে ফারহান এক স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। সে ভাবল, লুসিয়া হয়তো শান্ত হয়েছে। তার রক্তে থাকা সেই জেদ আর অস্থিরতা ঘুমের ঘোরে কিছুটা হলেও স্তিমিত হয়েছে। ফারহান মনে মনে ঠিক করল, রাতে কল দিয়ে প্রিয়তমাকে বুঝিয়ে সব ঠিক করে নেবে। কিন্তু সে জানত না, জাভিয়নের বংশের এই নীরবতা আসলে কোনো প্রলয়ঙ্করী ঝড়ের পূর্বাভাস। লুসিয়া ঘুমাচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু তার অবচেতন মন তখনও সেই আদিম অধিকারবোধে আচ্ছন্ন। মেইলস্ট্রোমদের রক্তে কোনো সাধারণ ঘুম নেই; আছে শুধু পরের পদক্ষেপের ছক। ফারহান যাকে প্রশান্তি ভাবছে, তা আসলে আগ্নেয়গিরি ফেটে পড়ার আগের সেই অসহ্য নিস্তব্ধতা।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতেই চৌধুরী ভিলার পরিবেশ এক থমথমে রহস্যে ছেয়ে গেল। ড্রয়িংরুমে যখন সবাই চা আর নাস্তা নিয়ে বসেছে, লুসিয়া তখন ধীর পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এল। তার অবয়বে বিকেলের সেই অস্থিরতার চিহ্নমাত্র নেই, বরং এক ধরণের অস্বাভাবিক শীতলতা তার প্রতিটি পদক্ষেপে। মার্কো কিছু বলতে যাওয়ার আগেই লুসিয়া পাথরের মতো নিস্পৃহ কণ্ঠে ঘোষণা করল, “আমি এই বিয়েতে রাজি। তোমরা আরিয়ানের সাথে কথা বলতে পারো, আমার কোনো আপত্তি নেই।”
পুরো ঘরে মুহূর্তেই খুশির জোয়ার বয়ে গেল। মার্কো আর জাভিয়ানের বাবা তো রীতিমতো উচ্ছ্বসিত, কিন্তু তান্বী এক কোণে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছিল। সে খুব ভালো করেই জানে, এই শান্ত ভাবটা আসলে লুসিয়ার ভেতরের দহন। ফারহানের সেই সুস্থ আর যুক্তিবাদী মানসিকতাকে লুসিয়া মেনে নিতে পারেনি; সে চেয়েছিল ফারহান তাকে নিয়ে উন্মাদনা দেখাক, অধিকারবোধের নেশায় হিংস্র হয়ে উঠুক। ফারহান তা করেনি বলেই লুসিয়া আজ নিজের জীবন নিয়ে এই সর্বনাশা খেলায় মেতেছে।
লুসিয়া এখানেই থামল না। নিজের ঘরে ফিরে সে আরভিয়ানকে বার্তা পাঠাল: “দুপুরের ঘটনার জন্য আমি লজ্জিত, আরভিয়ান। কাল কি আমরা দেখা করতে পারি? আমি তোমার সম্পর্কে আরও জানতে চাই।”
আরভিয়ানের উত্তর আসতে কয়েক সেকেন্ডও সময় লাগল না। সে তো আগে থেকেই লুসিয়ার মোহময়ী রূপে আচ্ছন্ন ছিল, এখন এই সম্মতির কথা শুনে তার আনন্দ যেন আর ধরে না।
মেইলস্ট্রোমের কানে যখন তান্বীর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার খবরটা পৌঁছাল, তখন তার মাথায় এক প্রলয়ঙ্করী বজ্রপাত হলো। সে তার ব্যক্তিগত ‘স্ট্রোমহাউজ’-এ এক বীভৎস তাণ্ডব শুরু করল। তার কাছে এই খবরটা কোনো আনন্দের সংবাদ নয়, বরং তার চরম আধিপত্যের ওপর এক বিরাট আঘাত।
মেইলস্ট্রোম গর্জাতে গর্জাতে স্টাডি রুমের দামি কাঁচের দেয়ালগুলো হাত দিয়ে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে লাগল। হাত বেয়ে রক্ত ঝরছে, কিন্তু সেদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে উন্মত্তের মতো চিৎকার করে বলতে লাগল, “জাভিয়ান! ওই জাভিয়ানের অস্তিত্ব এখন তন্বীর শরীরে? আমার সোলফ্লেম, যাকে আমি তিলে তিলে নিজের করতে চেয়েছি,তার রক্তে এখন জাভিয়ানের চিহ্ন মিশে থাকবে? এটা আমি হতে দেব না!”
মেইলস্ট্রোমের এই উন্মাদনা কেবল ঈর্ষা নয়, বরং এক ভয়াবহ বিকৃত অধিকারবোধ। তান্বীর শরীরের প্রতিটি কোষে সে কেবল নিজের ছায়া দেখতে চেয়েছিল। এখন সেখানে অন্য কারো অস্তিত্বের সম্ভাবনা তাকে ভেতরে ভেতরে পুড়িয়ে খাক করে দিচ্ছে। তার রক্তাক্ত হাতের ছাপ দেয়ালে দেয়ালে লেপ্টে গেল, যেন এক অশুভ ধ্বংসের মানচিত্র আঁকছে সে।
মেইলস্ট্রোমের ডার্ক সাইকোলজি এটা মেনে নিতে পারছে না যে, তান্বী এখন অন্য কারো উত্তরাধিকার বহন করছে—হোক সে তার নিজের ভাই জাভিয়ান। তার কাছে এই সন্তান মানে জাভিয়ানের এক চিরস্থায়ী স্বাক্ষর, যা তান্বীর শরীরের ওপর সে খোদাই করে দিয়েছে। এই ‘অস্তিত্বের ভাগাভাগি’ মেইলস্ট্রোমের রক্তে বিষ ছড়িয়ে দিচ্ছে। সে কোমরের বেল্ট থেকে পিস্তল বের করে সিলিং লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি গুলি ছুঁড়তে লাগল। গুলির শব্দে পুরো স্ট্রোমহাউজ থরথর করে কাঁপছে। ইসাবেলা দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে শিউরে উঠল; সে দেখল মেইলস্ট্রোমের চোখ দুটো এখন আর মানুষের নয়, হিংস্র কোনো পশুর মতো জ্বলছে। মেইলস্ট্রোম হাতের কাছে থাকা দামী সোফাটা ছুরি দিয়ে চিরে টুকরো টুকরো করতে করতে বিড়বিড় করতে লাগল— “জাভিয়ান ভেবেছে সে জিতে গেছে? এই সন্তানের উছিলায় তান্বীকে সারাজীবনের জন্য নিজের করে নিল? না! ওই বাচ্চার শরীরে জাভিয়ানের রক্ত থাকলেও, ওর মনের ওপর রাজত্ব করব আমি!”
ইসাবেলা সামনে এগিয়ে এল। সে জানে, এই উন্মাদনা এখনই না থামালে মেইলস্ট্রোম হয়তো মেক্সিকোকে শ্মশান বানিয়ে ছাড়বে। সে চিৎকার করে বলল, “মেইলস্ট্রোম! শান্ত হও! তুমি যদি এখন তান্বীর সামনে গিয়ে এই রুদ্রমূর্তি ধারণ করো, তবে ও সইতে পারবে না। ডক্টর বলেছে, এই অবস্থায় তান্বী ভয় পেলে ওর আর বাচ্চা—দুজনেরই প্রাণসংশয় হতে পারে। তুমি কি চাও জাভিয়ানের অস্তিত্ব মুছতে গিয়ে তান্বীকেও হারিয়ে ফেলতে?”
‘তান্বীর মৃত্যু’—এই একটা শব্দ মেইলস্ট্রোমকে পাথরের মতো স্তব্ধ করে দিল। তার হাতের ধারালো ছুরিটা মেঝেতে খসে পড়ল। সে হাঁফাতে হাঁফাতে সেখানেই বসে পড়ল; চোখের সেই খুনে লাল আভাটা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। তান্বীকে চিরতরে হারানোর ভয় তার পাহাড়সমান জেদকে এক মুহূর্তে জল করে দিল। সে ফিসফিস করে বলল, “ওকে মরতে দেওয়া যাবে না। ও শুধু আমার। ওর শরীরে জাভিয়ানের বীজ থাকলেও, ওটা বড় হবে আমার হাতের পুতুল হয়ে।”
মেইলস্ট্রোম ধীরপায়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে এখন এক হিমশীতল স্থিরতা। বাইরে করিডোরে কয়েকজন গার্ড দাঁড়িয়ে ছিল, যাদের দায়িত্ব ছিল তাকে পাহারা দেওয়া। মেইলস্ট্রোম কোনো কথা না বলে তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার হাতের পিস্তল গর্জে উঠল। নিমিষেই রক্তে ভেসে গেল স্ট্রোমহাউজের মেঝে। সেখানে থাকা তার অনুচরদের দিকে ফিরে অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় সে আদেশ দিল, “লাশগুলো সরিয়ে ফেলো। আর আমার নেকড়ে ক্রেভিয়ারকে ডাকো। আজ রাতের ডিনারটা ওর একটু স্পেশাল হওয়া চাই।” রক্তমাখা হাতটা রুমালে মুছতে মুছতে সে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকাল। তার প্রতিটি পদক্ষেপ এখন মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে এগিয়ে চলেছে তান্বীর দিকে।
.
.
.
সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে জাভিয়ান যখন ভিলায় ফিরল, তার চোখেমুখে এক ধরণের জমাটবদ্ধ কাঠিন্য। ড্রয়িংরুমে তান্বীকে দেখতেই তার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল। সে ধীরপায়ে তান্বীর সামনে এসে দাঁড়াল—একদম নিঃশব্দ, কিন্তু তার উপস্থিতিই পুরো ঘরের বাতাস ভারী করে তুলল।
জাভিয়ান তান্বীর খুব কাছে ঝুঁকে এসে নিচু স্বরে প্রশ্ন করল, “আজ দুপুরে তুমি মেডিসিন নাওনি কেন তান্বী?”
তান্বী চমকে উঠে জাভিয়ানের দিকে তাকাল। সে বুঝতে পারল না জাভিয়ান এত দ্রুত এই খবর কীভাবে পেল। জাভিয়ান তার নীরবতা দেখে চোয়াল শক্ত করে আবার বলল, “এক বেলা মেডিসিন ছাড়া থেকেছ তুমি। একবারও কি ভেবে দেখেছ এর ফল কী হতে পারে? তুমি আর আমার বেবি—দুজনেই এতে দুর্বল হয়ে পড়বে। আর আমার জিনিসের কোনো ক্ষতি হবে, এটা আমি কিছুতেই হতে দিতে পারি না।”
সে তন্বীর কাঁধে হাত রাখল, কিন্তু সেই স্পর্শে মমতার চেয়ে শাসনের জোরই বেশি ছিল। জাভিয়ান আবার বলতে শুরু করল, “তুমি এখন একা নও। তোমার ভেতরে আমার উত্তরাধিকার বেড়ে উঠছে। অথচ তুমি আমার অনুমতি ছাড়া লুসিয়ার সাথে বাইরে গেলে, নিজের খেয়াল রাখলে না! মনে রেখো জিন্নীয়া, তোমার শরীরের প্রতিটি কোষের ওপর এখন আমার অধিকার। আমার অমতে বা অবহেলায় যদি আমার সন্তানের বিন্দুমাত্র ক্ষতি হয়, তবে আমি কাউকে ক্ষমা করব না—সেটা তুমি হলেও না।”
জাভিয়ানের এই কঠোরতা দেখে তান্বীর চোখ টলমল করে উঠল। তান্বীর সেই কম্পিত অধর আর ভয়ার্ত চোখের দিকে তাকিয়ে জাভিয়ানের ভেতরের কঠোরতা মুহূর্তেই যেন অনেকটা ফিকে হয়ে এল। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তান্বীকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। তার রুক্ষ হাতের আঙুলগুলো তান্বীর চুলে বিলি কেটে দিতে লাগল। সে খুব নরম সুরে তান্বীর কপালে চুমু খেয়ে বলল, “আমি শুধু চাই তুমি ভালো থাকো, তান্বী। আমাদের বেবিটা সুস্থ থাকুক। আমাকে এভাবে বলতে বাধ্য করো না।” সে তন্বীর চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে মায়াভরা চোখে তাকিয়ে বলল, “এখন বলো, তোমার কী খেতে ইচ্ছে করছে? টক কিছু? নাকি মিষ্টি? আমাকে সবসময় বলবে, তোমার যা ইচ্ছে হবে আমি মুহূর্তের মধ্যে সব এনে হাজির করব। শুধু তুমি নিজের আর আমার এই আমানতটার খেয়াল রাখবে, কেমন?” জাভিয়ানের এই দ্বৈত রূপ—একপাশে পাথরের মতো শাসন, আর অন্যপাশে গভীর আদর—তান্বীকে এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে ফেলে দিল। সে বুঝতে পারল না, এই মানুষটাকে সে ভালোবাসবে নাকি ভয় পাবে।
সন্ধার পরপরেই ভিলার সিঁড়ি বেয়ে লুসিয়া যখন নেমে আসছিল, তার প্রতিটি পদক্ষেপ এক একটা নিঃশব্দ বিস্ফোরণ হচ্ছিলো। পরনে দামি হাঁটু পর্যন্ত ব্ল্যাক ওয়েস্টার্ন ড্রেস, চোখে গাঢ় কাজলের প্রলেপ আর ঠোঁটে রক্তবর্ণের লিপস্টিক—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে সে কোনো ধ্বংসযজ্ঞের প্রস্তুতি নিয়ে বেরিয়েছে। তার সৌন্দর্যে আজ স্নিগ্ধতা নেই, আছে এক অদম্য প্রতিহিংসা। তান্বী ড্রয়িংরুমে বসে ছিল। লুসিয়াকে এমন সংহারী রূপে দেখে সে শিউরে উঠে এগিয়ে এল। থতমত খেয়ে জিজ্ঞেস করল, “লুচি আপা! আপনি… আপনি এভাবে কোথায় যাচ্ছেন?”
লুসিয়া সিঁড়ির শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে তান্বীর দিকে তাকাল। তার চোখের মণি দুটো ছোট হয়ে এসেছে, সেখানে এক অদ্ভুত ধূসর শূন্যতা। সে খুব নির্লিপ্ত গলায় বলল, “আরভিয়ান বাইরে অপেক্ষা করছে। ওর সাথেই ডেটে যাচ্ছি।”
তন্বীর বুকটা ধক করে উঠল। সে আর্তনাদ করে ওঠার মতো সুরে বলল, “কিন্তু আপা আপনি আরভিয়ানকে বিয়ে করতে রাজি হলেন কী করে?আপনি ফারহান ভাইয়াকে ভালোবাসেন না? এই পাগলামি করলে ভাইয়ার কী হবে?”
লুসিয়া এবার একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। তার ঠোঁটের কোণে ঝুলে থাকা সেই হাসিতে বিদ্রূপ ঝরে পড়ল। সে ব্যাগটা কাঁধে ঠিক করতে করতে শীতল গলায় বলল—”ফারহান? ও তো এক ‘সুস্থ’ স্বাভাবিক মানুষ তান্বী। ওর রক্তে আমার জন্য কোনো হাহাকার নেই, কোনো উন্মাদনা নেই। ওকে আমি খুব শিঘ্রই ডিভোর্স দিয়ে দিবো।” কথাটা শেষ করেই লুসিয়া তান্বীর পাশ কাটিয়ে গটগট করে বেরিয়ে গেল। তান্বী পাথরের মতো দাঁড়িয়ে দেখল, লুসিয়া আসলে আরভিয়ানের কাছে যাচ্ছে না, সে নিজেকেই ধ্বংস করতে যাচ্ছে। লুসিয়া দৃষ্টির আড়াল হতেই তান্বী কাঁপতে কাঁপতে তার ফোনটা বের করল। ফারহানকে সে দ্রুত টাইপ করে মেসেজে পাঠালো: “ভাইয়া, লুচি আপা ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে! উনি আরভিয়ানের সাথে বেরিয়ে গেছে। উনি বলছেষ তোমার সাথে সব সম্পর্ক চুকিয়ে দেবে, ডিভোর্স দিয়ে দিবে কারন তুমি নাকি ওনাকে যথেষ্ট ‘আগলে’ রাখতে পারোনি। ভাইয়া,উনি নিজের জীবন নিয়ে জুয়া খেলছেন। তুমি যদি এখন না আসো, তবে হয়তো লুচি আপাকে তুমি সারাজীবনের জন্য হারাবে!” মেসেজটা পাঠিয়ে তান্বী সোফায় ধপ করে বসে পড়ল। তার মনে হলো, এই বংশের রক্তে যে অভিশাপ আছে, তা আজ সবটুকু ওলটপালট করে দেবে।
মেক্সিকোর একটি অত্যন্ত অভিজাত এবং ছিমছাম রেস্টুরেন্টে আরভিয়ান আর লুসিয়া মুখোমুখি বসে আছে। রেস্টুরেন্টের মৃদু আলো আর পিয়ানোর সুর চারপাশের পরিবেশকে রোমান্টিক করার চেষ্টা করলেও, তাদের টেবিলের আবহ ছিল বরফের মতো শীতল এবং এক টানটান উত্তেজনায় ঠাসা।
লুসিয়া তার ব্ল্যাক ড্রেসে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে। তার চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আরভিয়ানের দিকে থাকলেও মন পড়ে আছে ফারহানের সেই ফ্ল্যাটে। আরভিয়ান বেশ উৎফুল্ল; সে বারবার মেনু কার্ড দেখে লুসিয়ার পছন্দ বোঝার চেষ্টা করছে। আরভিয়ান বলল, “লুসিয়া, এখানকার সি-ফুড কিন্তু মেক্সিকো সিটির মধ্যে সেরা। তুমি কি ট্রাই করতে চাও? নাকি অন্য কিছু?”
লুসিয়া কোনো উত্তর দিল না। সে নির্লিপ্তভাবে তার দামি পার্সটা টেবিলের ওপর রাখল। আরভিয়ান কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে হাসল। সে আবার বলল, “বিকেলের জন্য আমি সত্যিই দুঃখিত। আমি বুঝতে পারিনি তুমি এতটা অসুস্থ ছিলে। তবে এখন তোমাকে দেখে বেশ ফ্রেশ লাগছে। শাড়ি নামের ওই পোশাকটাতেও তোমাকে বেশ দারুণ লাগছিল, তবে এই ড্রেসটাতে তোমাকে একদম মডার্ন কুইন লাগছে।”
লুসিয়া এবার তার ঠাণ্ডা চোখ দুটো আরভিয়ানের ওপর স্থির করল। তার গলার স্বর ছিল পাথরের মতো শক্ত। সে সরাসরি জিজ্ঞেস করল, “আরভিয়ান, তুমি কেন আমাকে বিয়ে করতে চাইছ? শুধু আমার রূপ দেখে? নাকি আমার ভাইদের ক্ষমতার ভাগ পেতে?”
আরভিয়ান চমকে উঠল। সে আশা করেনি লুসিয়া এত সরাসরি আক্রমণ করবে। সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “লুসিয়া, ক্ষমতার অভাব অন্তত আমার নেই। আমি তোমাকে প্রথম দেখাতেই পছন্দ করেছি। তোমার এই এটিটিউড, তোমার এই তেজ—এগুলোই আমাকে আকর্ষণ করেছে। আমি চাই তুমি আমার পাশে থাকো সারাজীবন।”
লুসিয়া একটা বাঁকা হাসি হাসল। সে গ্লাসের পানিটা এক চুমুকে শেষ করে বলল, “পারবে তো আমার জেদ সহ্য করতে? আমার সাথে থাকা কিন্তু সহজ নয় আরভিয়ান। আমার রক্তে পাগলামি আছে। তুমি যে ভালোবাসা খুঁজছ, আমি হয়তো তোমাকে সেটা কোনোদিন দিতে পারব না। কারণ আমার শরীরে অন্য কারো দেওয়া আদরের দাগ এখনো শুকোয়নি।”
মেক্সিকোর সেই অভিজাত রেস্টুরেন্টের মৃদু আলোয় লুসিয়ার মুখটা এখন কোনো গ্রিক ট্র্যাজেডির নায়িকার মতো দেখাচ্ছে। আরভিয়ান স্তব্ধ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। চারপাশের পিয়ানোর সুর যেন হঠাৎ অনেক দূরে সরে গেছে, আর লুসিয়ার সেই শেষ বাক্যটি তাদের মাঝখানে এক অদৃশ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরভিয়ান ঢোক গিলে নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করল। তার কপালে সামান্য ঘাম জমেছে। সে কাঁপা গলায় বলল, “তুমি… তুমি কী বলতে চাইছ লুসিয়া? আদরের দাগ মানে?”
লুসিয়া এবার চেয়ারে আরও একটু আরাম করে বসল। তার ঠোঁটের কোণে সেই বিদ্রূপাত্মক হাসিটা আরও চওড়া হয়েছে। সে আরভিয়ানের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে শীতল কণ্ঠে বলল—”আমি বলতে চাইছি, তুমি যে মরীচিকার পেছনে ছুটছ আরভিয়ান, তার দখল অন্য কেউ অনেক আগে নিয়ে নিয়েছে। আমার রক্ত শুধু দখলদারিত্ব বোঝে। ফারহান… সে আমাকে মুক্তি দিয়েছে, কিন্তু আমার আত্মাকে সে এক বিষাক্ত নেশায় বন্দি করে রেখেছে। তুমি কি পারবে কোনো মৃত আত্মার সাথে সংসার করতে? পারবে প্রতিদিন সকালে আমার চোখে অন্য কারো জন্য হাহাকার দেখতে?”
আরভিয়ান এবার টেবিলের ওপর রাখা লুসিয়ার হাতটা ধরার চেষ্টা করল। তার স্পর্শে কোনো দৃঢ়তা নেই, আছে এক ধরণের অসহায়ত্ব। সে মিনতি করার সুরে বলল, “লুসিয়া, আমি তোমাকে এই অন্ধকার থেকে বের করে আনব। আমি তোমাকে এত ভালোবাসা দেব যে তুমি সব ভুলে যাবে। কিন্তু এই ফারহানটা কে?”
“থামো!” লুসিয়া বিদ্যুৎবেগে তার হাতটা সরিয়ে নিল। তার চোখের মণি দুটো হঠাৎ করেই ছোট হয়ে এল, সেখানে এক হিংস্র ধূসর আভা। লুসিয়া একটু ঝুঁকে এল আরভিয়ানের দিকে। তার গলার স্বর এখন ফিসফিসে কিন্তু ভয়ঙ্কর, “তুমি ভালোবাসা দিতে চাও? জানো আমার ভালোবাসা কেমন? ওটা দমবন্ধ করা এক বন্দিত্ব, যেখানে প্রতিটা নিঃশ্বাসে থাকে রক্তের ঘ্রাণ। তুমি পারবে সেই শৃঙ্খল পরতে?”
আরভিয়ান কোনো উত্তর দিতে পারল না। তার ভেতরে এক ভয়ের চোরাবালি তাকে গ্রাস করছে। সে বুঝতে পারছে, এই রূপবতী নারীর পেছনে যে দানবটি লুকিয়ে আছে, তাকে সামলানোর ক্ষমতা তার মতো কোনো মানুষের নেই।
রেস্টুরেন্টের বাইরে পার্কিং লটে তখন তপ্ত বাতাসের ঝাপটা আর এক জমাটবদ্ধ উত্তেজনা। লুসিয়া আরভিয়ানের গাড়ির দিকে পা বাড়াতেই এক বিকট শব্দে বাইক ব্রেক করার আওয়াজ হলো। ধোঁয়া উড়িয়ে সেখানে এসে থামল ফারহানের বাইক। জিপিএস ট্র্যাক করে এই লোকেশন খুঁজে পেতে ফারহানের আধঘণ্টা দেরি হয়ে গেছে, আর সেই প্রতিটি সেকেন্ড তার ভেতরে এক প্রলয়ঙ্করী আগ্নেয়গিরি তৈরি করেছে। ফারহান বাইক থেকে নামল। তার শার্টের হাতা গুটানো, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম আর দুচোখে রাগের আভা। সে ঝড়ের বেগে এগিয়ে এসে লুসিয়ার সামনে দাঁড়াল। তার কণ্ঠস্বর আজ আর শান্ত নয়, বরং এক বজ্রকঠিন হুঙ্কার— “লুসিয়া! এসব কী পোশাক পড়ে বেরিয়েছো তুমি? আর এই ছেলের সাথে কেন বেরিয়েছ? বাড়িতে বলেছ ওকে বিয়ে করবে—এর মানেটা কী?”
লুসিয়া এবার একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। ফারহানের এই হিতাহিতজ্ঞানশূন্য অবস্থা দেখে তার মনের ক্ষতগুলো যেন এক পৈশাচিক শান্তিতে ভরে উঠছে। সে ফারহানের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বিদ্রূপের সুরে বলল, “কেন? তাতে তোমার কী? এই তো তখন আগে জ্ঞান দিচ্ছিলে তুমি আমাকে বিশ্বাস করো, আমি যার সাথেই থাকি তোমার জেলাসি নেই। তাহলে এখন কেন এসেছ? এখন কি সেই তথাকথিত ‘সুস্থ’ বিশ্বাসটা ভেঙে তছনছ হয়ে গেল?”
আরভিয়ান এবার বিরক্ত হয়ে মাঝখানে ঢুকে পড়ল। সে ফারহানকে সাধারণ কেউ ভেবে উদ্ধত গলায় জিজ্ঞেস করল, “লুসিয়া, এই ছেলেটা কে? ও তোমার সাথে এভাবে কথা বলার সাহস পায় কোথাথেকে?”
ফারহান এবার আরভিয়ানের দিকে ফিরল। তার চাহনি এতটাই শীতল আর ধারালো যে আরভিয়ান এক মুহূর্তের জন্য জমে গেল। ফারহান দাঁতে দাঁত চেপে কর্কশ গলায় বলল, “আমি ওর হাজবেন্ড! নাও গেট আউট ফ্রম হেয়ার বিফোর আই কিল ইউ!”
আরভিয়ান হতভম্ব হয়ে তোতলাতে লাগল, “লুসিয়া, উনি এসব কী বলছেন? তুমি তো… চলো এখান থেকে!” বলেই আরভিয়ান লুসিয়ার হাত ধরে হিঁচড়ে গাড়ির দিকে নিয়ে যেতে চাইল। ব্যাস! ফারহানের ধৈর্যের শেষ সুতোটুকু ছিঁড়ে গেল। সে আরভিয়ানের কলার ধরে এক ঝটকায় তাকে সরিয়ে নিল এবং সর্বশক্তি দিয়ে তার চোয়াল বরাবর এক ভয়ংকর ঘুষি বসিয়ে দিল। আরভিয়ান ছিটকে গিয়ে নিজের গাড়ির বনেটের ওপর পড়ল। মুখ দিয়ে অঝোরে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে তার। ফারহান এবার এক মুহূর্ত দেরি না করে লুসিয়াকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। লুসিয়া হাত-পা ছুড়ে নামার চেষ্টা করলেও ফারহানের লোহার মতো শক্ত হাতের বাঁধন আলগা হলো না।লুসিয়াকে বাইকের পেছনের সিটে প্রায় ছুড়ে বসাল ফারহান। বাইক স্টার্ট দেওয়ার আগে ফারহান আরভিয়ানের দিকে ফিরে পৈশাচিক হাসল। সে নিচু কিন্তু মারাত্মক স্বরে হুমকি দিল— “শুনে রাখ, লুসিয়ার আশেপাশে যদি তোকে আর কোনোদিন দেখি, তবে তোর বিয়ের আসর হবে সরাসরি কবরে। এটা ফারহানের ওয়ার্নিং নয়, তোর মৃত্যুর পরোয়ানা!”
বাইকটা তীব্র গতিতে ধোঁয়া উড়িয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে গেল। লুসিয়া ফারহানের পিঠ খামচে ধরে আছে। সে বুঝতে পারছে ফারহান আজ সত্যিই ‘ক্রেজি’ হয়ে গেছে। সে ঠিক এই উন্মাদনাটাই চেয়েছিল। ফারহানের এই রুদ্রমূর্তি দেখে সে আতঙ্কের মাঝেও এক তৃপ্ত আনন্দ অনুভব করছে।
অ্যাপার্টমেন্টের নিচে বাইক থামানোর পর পরিবেশটা ছিল মারাত্মক থমথমে। লুসিয়া বাইক থেকে নেমেই অবজ্ঞার সুরে বলল, “আমি টায়ার্ড। আমি এখন বাড়ি যাব, ফারহান।”
ফারহান ওর পথ আগলে দাঁড়িয়ে ধমকের স্বরে বলল, “নো! তুমি আজ কোথাও যাবে না। তুমি আজ আমার সাথেই থাকবে।”
লুসিয়া একটা বাঁকা হাসি দিয়ে ফারহানের খুব কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, “কেন? তুমি কি খুব উত্তেজিত? আমাকে খুব কাছে পেতে চাইছ রাতে?”
ফারহান শিউরে উঠে বলল, “ছি ছি! লুসিয়া, এসব কী বলছ? আমি ওসব কিছুই ভাবিনি। আমি শুধু তোমাকে নিজের বুকে জড়িয়ে একটু শান্তিতে ঘুমাতে চাই।”
লুসিয়া এবার বিদ্রূপের গলায় বলল, “হোয়াট? কিছুই করবে না? তবে আমাকে এই ফ্ল্যাটে নিয়ে যাচ্ছ কেন? যদি পুরুষত্বই না দেখাতে পারো, তবে বিয়ে করেছ কেন আমাকে?” এই কথাটি বলেই লুসিয়া উল্টো ঘুরে হাঁটতে শুরু করল। কিন্তু সে জানত না ফারহানের সহ্যক্ষমতা আজ শেষ সীমানায়। ফারহান এক ঝটকায় লুসিয়াকে আবার নিজের কাঁধে তুলে নিল। লুসিয়ার পায়ে থাকা হিল জুতো জোড়া নিজের একহাতে নিয়ে নিলো। লুসিয়া হাত-পা ছুড়লেও কোনো লাভ হলো না। ফারহান ওকে নিয়ে লিফটে উঠে পড়ল।
লিফটের দরজা বন্ধ হতেই ফারহান লুসিয়াকে নিচে নামিয়ে দিল। লুসিয়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই ফারহান এক আদিম পশুর মতো ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সে লুসিয়ার অধর জোড়া নিজের দখলে নিয়ে এমনভাবে কামড়ে ধরল যে নিমিষেই সেখান থেকে তাজা রক্ত ঝরতে শুরু করল। ফারহানের ঠোঁট তখন লুসিয়ার গলায়, ঘাড়ে—তীব্র এক উন্মাদনায় সে লুসিয়াকে ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে।
লিফট বারবার ওপরে উঠছে আর নিচে নামছে, কিন্তু ফারহানের সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। লুসিয়া কোনোমতে দম ফেলার জন্য ফারহানকে ধাক্কা দিয়ে সরাতেই ফারহান ওর চোখের দিকে তাকিয়ে পিশাচের মতো গর্জাল—”এইরকম চেয়েছিলে না তুমি? এমন পাগলামিই তো দেখতে চেয়েছিলে! এখন কেমন লাগছে? আমাকে ডিভোর্স দেবে তুমি? আমাকে এখনো চেনোনি লুসিয়া! এরপর যদি কোনোদিন আমার সামনে ডিভোর্সের কথা উচ্চারণ করেছ, তবে আমার রিভলবার দিয়ে এক নিমিষেই তোমাকে এই পৃথিবী থেকে বিদায় করে দেব। আমাকে হারানোর চিন্তা করার আগেই তোমার মৃত্যু হবে!”
লিফটের আয়নায় নিজের বিস্রস্ত চেহারা, ক্ষতবিক্ষত ঠোঁট আর ফারহানের রক্তচক্ষু দেখে লুসিয়া যেন এক স্বর্গীয় উন্মাদনা খুঁজে পেল। ফারহানের এই হিংস্রতা তাকে ভয় পাইয়ে দেওয়ার বদলে এক গভীর মোহের গভীরে তলিয়ে দিচ্ছে। সে ফারহানের কলারটা আরও জোরে চেপে ধরল; তার তপ্ত নিঃশ্বাসের খুব কাছে মুখ নিয়ে লুসিয়া তৃপ্তির সুরে ফিসফিস করে বলে উঠল—”ওয়াও… সো আমেজিং! ফারহান, তুমি জানো না এই মুহূর্তে তোমাকে ঠিক কতটা হট লাগছে!”
লুসিয়ার এই অদ্ভুত প্রতিক্রিয়ায় ফারহান এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। সে ভেবেছিল লুসিয়া হয়তো ভয়ে কুঁকড়ে যাবে বা তাকে ঘৃণা করবে, কিন্তু এই মেয়ে তো আগুনের শিখায় ডানা ঝাপটানো এক আত্মঘাতী পতঙ্গ। ফারহান তার হাত দিয়ে লুসিয়ার চিবুকটা সজোরে চেপে ধরল। “পাগল হয়ে গেছ লুসিয়া? আমি তোমাকে প্রায় মেরেই ফেলছিলাম আর তুমি বলছ আমেজিং? তুমি কি সত্যিই এমন যন্ত্রণায় আনন্দ পাও?”
লুসিয়া খিলখিল করে হেসে উঠল, যে হাসিতে মিশে ছিল এক আদিম মাদকতা। সে ফারহানের বুকের ওপর নিজের হাত রেখে তার হৃদপিণ্ডের দ্রুত স্পন্দন অনুভব করতে করতে বলল—”আমি তো এটাই চেয়েছিলাম ফারহান। তোমার ওই ‘নরমাল পার্সন’ মুখোশটা আমার দম বন্ধ করে দিচ্ছিল। আমি চেয়েছিলাম তুমি আমাকে নিয়ে পাগল হয়ে যাও, আমার ওপর নিজের অধিকার ফলাও। আজ এই রক্ত, এই ক্ষত আমাকে বলছে—তুমি শুধু আমার। আরভিয়ান বা অন্য কেউ তোমার থেকে আমাকে কোনোদিন কেড়ে নিতে পারবে না।”
ফারহান লুসিয়ার চোখের সেই তৃপ্তিমাখা চাউনি দেখে বুঝতে পারল, আজ রাতে তার আর নিস্তার নেই। সে যে দানবটাকে নিজের ভেতরে সযত্নে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিল, লুসিয়া আজ সেটাকে শুধু জাগিয়েই তোলেনি, বরং তাকে রক্তাক্ত করে তুলেছে। লুসিয়ার ঠোঁটের কোণের রক্ত আর তার চ্যালেঞ্জিং হাসি ফারহানকে বুঝিয়ে দিল—আজকের রাতটা হবে দীর্ঘ, যন্ত্রণাময় এবং চূড়ান্ত উন্মাদনার।
চলবে…….
প্রিয় পাঠক এতদিন গল্প দিতে দেরি করেছি তাই আজকের পর্ব বড় করে দিলাম এখানে ৭হাজারের বেশি শব্দ রয়েছে। ১০ হাজার লিখেছিলাম এতবড় দেয়া যাবেনা আর পরের পর্ব তাড়াতাড়ি পেয়ে যাবেন সম্ভবত কাল বা পরশু কিন্তু যদি আপনাদের রেসপন্স ভালো হয় তাহলে গঠনমূলক মন্তব্য করবেন দুই চার লাইনের। আর রিয়েক্ট দিবেন। আর এক দুই পর্ব পড়ে থেকেই গল্পের মেইন কাহিনীতে আমরা ঢুকে যাবো।
Share On:
TAGS: ডিজায়ার আনলিশড, সাবিলা সাবি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২৩
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ১৩
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২৯
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব- ৪১ (শেষাংশ)
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ১৫
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২৪(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৪২
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৪০
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২৭
-
ডিজায়ার আনলিশড (ভ্যালেন্টাইন স্পেশাল পর্ব)