কাছেআসারমৌসুম__(৭১)
নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি
ধুলোমাখা রাস্তা পেরিয়ে এয়ারপোর্টের চকচকে,সিমেন্ট বাঁধানো প্রাঙ্গণে থামল গাড়িটা। ড্রাইভার ত্রস্ত পায়ে নেমে গিয়ে পেছনের ডিকি টেনে খুললেন। অয়নের বড়োসড়ো লাগেজটা এনে দাঁড় করলেন মাটিতে। গাড়ির দরজা ঠেলতে হাত বাড়িয়েও থামল অয়ন। বুকে ব্যথা উঠল! কিড়মিড় করল কোনো কিছুর টানে। মায়ের ছলছলে চোখদুটো সেই পীড়া বাড়াল কয়েকগুণ। মনে পড়ল ছোটো মা,চাচ্চু,মিন্তু, দিদুন ইউশা প্রত্যেকের কথা। ইউশাটার সাথে তো দেখাও হলো না। অয়ন সীটের সাথে দু দণ্ড ঘাড় এলিয়ে রাখল। সময়ে সময়ে শক্ত করল নিজেকে। এই মূহুর্তের জন্যে বাড়ি ছাড়াটা ওর জন্যে সব থেকে জরুরি। নাহয়,আবার হয়ত মনের টানে তুশিকে বিরক্ত করে ফেলবে। না হয় আবার অশান্তির নেশায় ধরবে ওকে। আচ্ছা,এরপর অয়ন পারবে তুশিকে ভুলতে? কোনটা ভুলবে আসলে? তুশিকে সেই প্রথম দেখাটা,বউ সেজে তুশি যখন ওর সাথে একই গাড়িতে বকবক করতে করতে আসছিল সেই কথাগুলো? না যখন ওর রুমে উঁকি দিতে গিয়ে ধরা পড়ে কাচুমাচু মুখ বানালো সেটা?
আর সেই লাল জর্জেটের শাড়ি পরা খোলা চুলের মেয়েটা,তাকে ভুলতে পারবে অয়ন! এত এত প্রশ্ন,অথচ উত্তরের তাগিদে একইরকম শূন্যে ভেসে গেল অয়ন। ভুলতে ওকে হবেই। বাড়ি ছাড়ার জায়গায় দেশ ছাড়ছে ও,স্বজন ছাড়ছে,বাবা-মা ছাড়ছে,এত ত্যাগের বিনিমিয়ে ওকে এটুকু সাহায্য বিধাতা করবেন না?
ফোস করে শ্বাস ফেলে এক ঝটকায় দোর ঠেলে নেমে এলো অয়ন। অনেক হয়েছে ছোটো হওয়া,সম্মান খোয়ানো আর কত? যাকে নিয়ে লড়বে,যুদ্ধে নামবে,ভাইয়ের প্রতিপক্ষ হবে দিন শেষে সেই তো মুখ ফিরিয়ে নিলো। তুশির ওইদিনের কথাগুলো বুঝিয়ে দিলো,অয়ন এত চেষ্টা করেও মেয়েটার হৃদয়ের এক টুকরো কোণও ছুঁতে পারেনি!
বেখেয়ালি,অন্যমনস্ক ছেলেটা গাড়ির দরজা আটকে পিছু ফিরল, উদাস চোখজোড়া চমকে উঠল অমনি। ভীষণ বিস্ময়ে ভড়কে গেল অয়ন। মাথায় পিক ক্যাপ, আর পরনে ইউনিফর্ম পরা সার্থ এগিয়ে এলো পা চালিয়ে। মুখোমুখি দাঁড়াতেই অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল অয়ন। সার্থ এখানে আসবে ও আশা করেনি। এজন্যেই তখন বাড়িতে ছিল না? যাক,ভাইয়ের কথা মনে ছিল তাহলে! জিভে ঠোঁট ভেজাল অয়ন।
জিজ্ঞেস করল মৃদূ গলায়,
“ তুমি?”
সার্থর চাউনি নরম।
সোজাসুজি বলল,
“ যাস না অয়ন! ”
ভাইয়ের কণ্ঠ দৃঢ়,অথচ পরতে পরতে অনুনয় মেশানো বাক্যে ভেতরটা কেমন করল অয়নের। ভিজে গেল বুকখানা।
ঢোক গিলে বলল,
“ কেন, আমি গেলে তোমার কী? উলটে তোমারই ভালো,পথের কাঁটা দূর হবে।”
সার্থ মাথা নুইয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসল।
“ আমি তোকে কখনো আমার পথের কাঁটা ভাবিনি। তাহলে হয়ত আনন্দ হতো, খুশি হতাম! আমি সব সময় জেনে এসেছি তুই আমার ভাই,আমার এক মাত্র ছোটো ভাই।”
“ এখন এত আবেগ,এত ভালোবাসা! অথচ স্বার্থের সময় এটা কেন মনে রাখতে পারলে না?”
“ আমি আমার একার স্বার্থ দেখিনি। তুশির ভালোটাও দেখেছিলাম। কোনো না কোনোভাবে তোর ভালোও। কিন্তু এখন হাজার বোঝালেও তুই বুঝবি না। অভিমানের চশমা পরে আছিস অয়ন,স্বচ্ছতা সেখানে নেই।”
“ থাকার দরকারও বা কী? যা ঘটেছে চোখের সামনেই দেখেছি। আমি নার্সারীর বাচ্চা নই,ভাইয়া!”
“ আমি এখানে কথার যুদ্ধ করতে আসিনি। এসেছি তোকে বোঝাতে,তোকে আটকাতে। যাস না অয়ন! আমার জন্যে,আমার ওপর রাগ করে নিজের মা-বাবাকে ছেড়ে যাস না। আমি তো সৈয়দ শওকত আলীর সঙ্গে কথা বলি না,ওনার সাথে আগে থেকেই আমার যোজন যোজন দুরুত্ব! তাই চাই না, এখন তার অন্য ছেলেও দুরুত্ব বাড়িয়ে দিক।”
অয়ন দুই ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“ ও আচ্ছাহ, তাহলে এইজন্যে এসেছো? ভালো,ভালো। কিন্তু তোমার চাওয়া না চাওয়া দিয়ে আমি আর জীবনে এগোবো না। আমি এখন আমার মতো চলব। আমার ইচ্ছে মতো।”
অয়ন পাশ কাটাতে গেলে
বাহু টেনে ধরল সার্থ। অনুরোধ করল মোলায়েম স্বরে,
“ অয়ন, যাস না ভাই!”
অয়ন ফিরল না। সামনে চেয়েই শক্ত গলায় বলল,
“ যাতে এক বাড়িতে থেকে তোমার আর তুশির সংসার দেখতে পারি,তোমাদের প্রেম দেখতে পারি! তোমাদের বাচ্চাকাচ্চার মামা ডাক শুনতে পারি,সেই খুশিতে?”
সার্থর মুখটা মলিন হয়। রং হারায় তীক্ষ্ণ চোখ।
অয়ন হাতটা ছাড়িয়ে নিলো। বিড়বিড় করে বলল,
“ ব্লাডি সেলফিশ!”
“সেলফিশ! তোর কথা শুনে মনে হচ্ছে সব অন্যায় আমার একার।”
“ নয়?”
“ না। আমি যদি কোনোরকম কোনো অন্যায় করে থাকি সেটা এক মাত্র তুশির সাথে। আমার যত অপরাধ ওই মেয়েটার প্রতি। কিন্তু তোকে আমি বারবার বলেছিলাম তুশিকে বিয়ে করিস না। নিষেধ করেছিলাম,জানিয়েছিলাম ও তোকে ভালোবাসে না। এত জোর দিয়ে বলেছিলাম মানে নিশ্চয়ই আমি শিয়র ছিলাম ওর অনুভূতি নিয়ে। বিয়ের আগের রাতেও তোকে রিকুয়েস্ট করেছিলাম আমি! তুই শুনিসনি। কানেই নিসনি আমার কথা। আর লাস্ট মোমেন্টে তুশি যখন তোকে বিয়ে করবে না বলে পালাচ্ছিল তখন আমি ওকে বিয়ে করাতে আমাকে শুনতে হলো,আমি সেলফিশ!
আচ্ছা,আই এগ্রি। সেলফিশ আমি। তাহলে তোকে কী ডাকব? সেল্ফ সিকিং? যে সবাইকে মাড়িয়ে কেবল নিজের লাভটাই দেখে? তুশির প্রতি তোর এত ধ্যান, এত মনোযোগ ছিল তাহলে তুই নিজেও জানতিস না তুশি তোকে ভালোবাসে না? জানতিস না? বুঝতে পারিসনি কখনো?”
অয়ন জিভে ঠোঁট চুবিয়ে মুখ ফিরিয়ে রাখল। দৃষ্টি অস্থির। উত্তর দিলো না।
সার্থ নিজেই বলল,
“ আজকে আর তোর ঠিক ভুল বিচার করে দেব না। সেজন্যে আসিওনি। এসেছি তোকে ফেরাতে। আমার জন্যে নাহোক,অন্তত মায়ের জন্য…”
কথা কেড়ে নিলো অয়ন,
“ তোমার এত মহান সাজার দরকার নেই। এত ভালো ভাই সাজারও দরকার নেই। তুমি তুশির ভালো স্বামী হতে চাইছ,তাই হয়ে থাকো। কাল যা বললাম আজকেও তাই বলব, আমার ওপর এত দরদ দেখিও না। আম গেটিং লেইট,সো গুড বাই।”
অয়ন হনহন করে সিকিউরিটি গেইটের ভেতরে ঢুকে গেল। ভেবেছিল সার্থ বাইরেই থেমে যাবে,কিন্তু হয়নি। পুলিশি আইডি কার্ডটা শো করতেই আরামসে গেইট পেরিয়ে ভেতরে এলো সে। পেছনে পায়ের শব্দে ফিরল অয়ন। তাজ্জব হয়ে বলল,
“ তুমি যাওনি?”
সার্থর কথায় অদম্য জেদ,
“ তোকে না নিয়ে ফিরব না বলেছি।”
“ আচ্ছা? এখন কি টানাহেঁচড়া করবে?”
“ প্রয়োজন পড়লে তাই করব। ভালোয় ভালোয় চল,নাহয় ঘাড়ে উঠিয়ে নিয়ে যাব। তোকে ক্যারি করার মতো শক্তি আমার আছে!”
অয়ন তব্দা খেয়ে গেল। একটু ভড়কে বলল,
“ তুমি কি আমাকে তুশি পেয়েছ?”
“ তুই যাবি?”
অয়ন দু সেকেন্ড থম ধরে চেয়ে রইল। সার্থ নরম হলো, ওর এক কাঁধে হাত রেখে বলল,
“ আমাদের বাড়িটা এমনিই শুকনো চরের মতো অয়ন। তুই চলে গিয়ে সেটাকে মরুভূমি বানিয়ে দিস না।”
অয়ন উদাস ঠোঁটে হাসে। ভাইয়ের হাতটায় হাত রেখে বলে,
“ তুমি কি চাও না আমি ভালো থাকি?”
“ চাই,কেন চাইব না?”
“ দেন লিভ মি এ্যালন।”
সাথে কাঁধ থেকে হাতটা ঝট করে নামিয়ে দিলো ও। সার্থর মুখটা অন্ধকার হলো। জিজ্ঞেস করল আধভেজা স্বরে,
“ সত্যিই চলে যাবি?
সবাইকে ছেড়ে গিয়ে পারবি ভালো থাকতে?”
“ না পারার কী আছে? আর আমি জানি তুমিও খুব ভালো থাকবে। তাই বলছি এই মিথ্যে মিথ্যে নাটকগুলো কোরো না।”
“ আমি তোকে আমার দিকটা বোঝাতে চাই না। মা,ছোটো মা, দিদুন, ইউশা ওদের দিকটা ভাব একবার।”
“ ওদের নিয়ে ভাবার জন্যে তুমি আছো না? দ্য গ্রেট সার্থ আবরার? ন্যায়ের সৈনিক,ধুরন্ধরতার প্রতীক? তুমিই ভাবো। আমাকে রেহাই দাও। আমি আমার নিজের পথ বেছে নিয়েছি। আসি?”
অয়ন চলে গেল। আর একবারও ঘুরে চাইল না, দেখল না ভাইকে। সার্থর কষ্ট হয়,জ্বলে যায় বুকটা। একটু নড়বড়ে হয়ে পড়ে দেহ। ততক্ষণে অয়ন দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেছে। আক্ষেপের দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে এলো ও। এখন বাড়ি ফিরে মায়ের মুখটা দেখবে কী করে? আর ইউশা! অতটুকু মেয়েটা নিতে পারছে এসব? ওদিকের অবস্থা জানতে পকেট হাতিয়ে চটপট ফোন বের করল সার্থ। ডায়াল লিস্ট খুঁজে কল দিলো সাইফুলের নম্বরে।
অয়ন ইমিগ্রেশনের চ্যাপ্টার শেষ করেছে। ফেলোশীপের কাগজপত্র আর ভিসা চেইক করার পর সিল পড়েছে পাসপোর্টে। এয়ারপোর্টের এই কাউন্টার ওই কাউন্টার যাতায়াতের পর, জানা গেল ফ্লাইট আসতে পনেরো মিনিট দেরি হবে। অয়ন চ সূচক শব্দ করল। যত চাইছে তাড়াতাড়ি করতে, দেশের মাটি টেনে ধরছে তত। ভাইয়া গিয়েছে তো? অয়ন আবার পেছন ফিরে দেখল। মিছিমিছি হন্যে চোখ খুঁজল সার্থকে। এমনিতে পাসপোর্ট ভিসা ছাড়া সিকিউরিটি গেইটটাই পার করা যায় না, তবে পুলিশের লোক তো সব কিছুতে এক্সট্রা সুবিধা পায়।
অয়ন বলাকা লাউঞ্জের দিকে এগোলো। সাথের বড়ো ট্রলিটা কাউন্টারে জমা আছে। হিথ্রোতে নামার আগ পর্যন্ত হাতে আর আসবে না। সাথে পিঠের কালো-ছোটো ব্যাগটা ছিল শুধু। ওটা সোফায় নামিয়ে রেখে বসল ও। ব্যাগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, পাসপোর্ট-ভিসা, আর একটা হুডি আছে। হিথ্রোতে ঠান্ডা লাগে অনেক! ও কী ভেবে ফোন বের করল। স্ক্রিন জ্বলতেই ভেসে উঠল তুশির মেদুর মুখখানি। পার্টিতে ওদের পাশাপাশি কিছু ছবি তোলা হয়েছিল। কালো স্যুট পরা অয়ন,আর সাদা গাউন পরিহিতা তুশিকে কী চমৎকার মানিয়েছিল না? ভাইয়া তো বেশি লম্বা। তুশি ওর বুকের কাছে পড়ে থাকে। সেখানে অয়নের বেলায় তুশির মাথাটা ওর ঠিক কাধ অবধি আসে। স্ক্রিনে তুশির মুখের ওপর আঙুল চালাতে গিয়েও অয়ন সচকিত হলো। না, ও আর তুশিকে নিয়ে ভাববে না। এক দণ্ডও না। অয়ন তাড়াহুড়ো করে ওয়ালপেপার চেঞ্জ করে একটা স্থেটোর ছবি দিয়ে রাখল। এরপর ফোনের স্লাঈড টেনে বার করল সিমটা। ক সেকেন্ড আঙুলে ঘুরিয়ে ঝিম ধরে থেকে শেষে ছুড়ে ফেলে দিলো বিনে। আস্তে আস্তে সব স্মৃতি মুছে ফেলবে ও। গ্যালারিতে তুশির যত ছবি আছে,গন্তব্যে পৌঁছে তাও মুছে দেবে। ফোনটা রাখল অয়ন। এর মাঝে তিন মিনিট কেটেছে। এখনো বারো মিনিট বাকি। এতটা সময় কাটাবে কী করে? অয়ন কফি অর্ডার করল। হঠাৎ মনে পড়ল ব্যাগে বই আছে। প্লেনের দশ থেকে তেরো ঘন্টা জার্নিতে সময় কাটানোর জন্যে সাথে নিয়েছিল। এটা ওর অভ্যেস!
দূরের জার্নি,বা কোথাও ক্যাম্পেইনে গেলে সাথে বই রাখা। ব্যাগের চেইন টেনে বই বের করল অয়ন। তুলতে গিয়ে ব্যাগ থেকে চার্জার পড়ে গেল। অয়ন বইটা সোফায় রেখে চার্জার তুলতে ঝুকলো, পাশের সীটে হুড়মুড়ে গতিতে বসল কেউ একজন! ভীষণ তাড়া লোকটির। অথচ ওনার বসার তোড়ে বইটা ঝুপ করে পড়ে গেল মেঝেতে। লোকটি জিভ কেটে বললেন,
“ সো সরি!”
“ ইটস ওকে।”
অয়ন বই নিতে ঝুঁকল,হঠাৎ কুঁচকে এলো ভ্রুদুটো। বন্ধ বইয়ের ভাঁজ থেকে কিছু একটা বেরিয়ে এসেছে। কাগজ! চার্জার,বই আর কাগজটা হাতে নিয়ে সোজা হলো অয়ন। বাকিগুলো নামিয়ে রেখে মেলল কাগজটা।
তুরন্ত চোখজোড়া কপালে চলে গেল। তুশির হাতের লেখা! এই লেখা তো তুশির। ইউশাকে না পেয়ে মেয়েটা যখন ওর কাছে পড়তে আসতো,তখন দেখেছিল অয়ন। কী লিখেছে তুশি?
অয়ন সতর্ক হয়ে লেখা পড়তে নিলো। অসংখ্য কাটাছেঁড়া আর বানান ভুল দিয়ে ভরতি একটা চিঠি। প্রতিটা লাইনে ভুল, শব্দে ভুল। অয়নের চোখ ধরা যাচ্ছিল পড়তে গিয়ে। শুধু আর শুধুমাত্র তুশির লেখা বলে খুব কষ্টে মনোযোগ ধরে রাখল সে। প্রথম দিকের কথাগুলো অয়ন জানে! তুশি সার্থকে ভালোবাসে,জীবনে আর কাউকে সেই জায়গা দিতে পারবে না ব্লা ব্লা ব্লা…! এসবের উদাহরণ বিগত কয়েকদিনে পেয়ে গেছে ও। নতুন কিছু নেই?
অয়ন তুচ্ছ চিন্তায় হাসল। পড়তে পড়তে হঠাৎ এক লাইনে এসে আটকে গেল নজর।
“ ইউশা!
আপনি জানেন,ওই মেয়েটা আপনাকে ঠিক কতটা ভালোবাসে? এক দিন নয়, দুদিন নয়,সেই ভালোবাসার সময় সীমা বহু বছরের অয়ন ভাই।”
চিঠির এই অবধি এসে অয়নের বুকে কোপ পড়ল। কুঠারের নয়,তলোয়ারেরও নয়, বিস্ময়ের এক ধারালো কোপে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে গেল সে। রক্তে রক্তে যেন গোটা শরীর ডুবে গেল। ডুবে গেল অয়নের অস্তিত্ব। আকাশ ভেঙে মাটিতে ছিটকে পড়ার চেয়েও ভয়াবহতা নিয়ে থরথর করে কাঁপল পায়ের জমিন। পুরো দুনিয়া ভস্ম হয়ে আগুন ধরল যেন
“ ইউশা, ইউশা ও-ওকে ভা-ভালোবাসে?”
কথাটা অয়নের মাথার কোষে বেজে বেজে পড়ল। বক্ষস্পন্দের এক কোণে টান লাগল সজোরে। চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই ছোট্ট মেয়েটার মুখ। ফ্রক পরা থেকে একদম পরিণত মেয়ে হতে দেখেছে যাকে,সেই ইউশা? যে ইউশা সারাদিন অয়ন ভাই এটা এনো,ওটা এনো,এটা খাব ওটা খাব,এটা দাও ওটা দাও বলে বলে কান খেয়ে ফেলতো, সেই ইউশা?
তুখোর জ্বরে কাঁপতে থাকা একটা মেয়ে,যাকে পাজাকোলে করে অয়ন পরীক্ষার হলে নিয়ে বসিয়েছিল,যে মেয়েটা ওর শার্ট খামচে ধরে ঠোঁট ভেঙে বলেছিল – “ আমি কিচ্ছু লিখতে পারব না অয়ন ভাই। আমাকে বাড়ি নিয়ে যাও।”
সেই ইউশা ওকে ভালোবাসে? কখন,কীভাবে? কবে থেকে?
অয়ন পাগল হয়ে গেল। হাত খসে চিঠি সেই কখন পড়ে গেছে। ও আর কিচ্ছু ভাবতে পারল না। অন্ধকার নেমে এলো চোখে। যখন মনে পড়ল,তুশিকে ভালোবাসার কথাটা ও প্রথম ইউশাকে বলেছিল, প্রতিত্যুরে ইউশা হেসে বলল – ওহ!
চোখদুটো খিচে নিলো অয়ন। পাশের লোকটি বললেন,
“ ফ্লাইট রেডি। শুনতে পাচ্ছেন?”
বোর্ডিং অ্যানাউন্সমেন্ট হচ্ছে,
“Passengers for UK flight…”
ভাসতে থাকা শব্দটা পরিষ্কার তখন। কিন্তু অয়ন শুনতে পেলো না। কান ঝিমঝিম করছে। হঠাৎ তড়াক করে উঠে দাঁড়াল ও। কী যেন ভাবল,অস্থির অস্থির ভাবে দেখল চারিদিক। পাশের ভদ্রলোক উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,
“ চলুন তাহলে, একটা লম্বা সফর শুরু হবে।”
অয়ন উত্তর করল না। আচমকা তিরের বেগে ছুটল লাউঞ্জের স্টাফের কাছে। উত্তেজনায় ওর কণ্ঠ কাঁপছিল। কোনোরকম। বলল,
“আমি এই ফ্লাইটে উঠছি না… আমাকে এক্ষুণি বের হতে হবে। ইটস এ্যান ইমার্জেন্সি।”
লোকটি অবাক হলেও অভ্যস্ত। সাথে সাথে হাত বাড়িয়ে কাউকে একটা ডাকলেন।
বাড়ি থেকে আসা গাড়িটা চলে গেছে অনেকক্ষণ আগে। খুব বেশি সময় যানবাহন দাঁড়িয়ে থাকতে দেয়া হয় না এখানে। সার্থ কিছু সময় ছিল! কোথাও গিয়ে ওর মনে হয়েছিল,হয়ত অয়ন ফিরবে। এসে বলবে- ভাইয়া আমি কোত্থাও যাব না। কিন্তু হলো না ওসব। ওদিকে চাচ্চু জানিয়েছে মা এখনো কাঁদছেন,একইরকম মন মরা সবাই। বাড়ি ফিরতে প্রথম বার ইচ্ছে করছে না সার্থর। বুকের ভেতরটা কেমন ভার হয়ে আছে। একটা বোঝার পাথর জেঁকে বসেছে গাঢ ভাবে। তুশির সাথে ও চোখ মেলাবে কী করে? ইউশাকেই বা কীভাবে দেখবে?
সার্থ অনেকক্ষণ ঝিম মেরে দেওয়ালের সাথে দাঁড়িয়ে রইল। শেষে টালমাটাল পা চালিয়ে উঠে বসল বাইকে। অন্যমনস্ক হাতে ড্যাশবোর্ডে চাবি ঘোরানোর মাঝেই টের পেলো ধড়ফড়িয়ে পেছনের সীটে বসেছে কেউ একজন। চকিতে পিছু ফিরল সার্থ। হতভম্বতায় চমকে উঠল অমনি।
“ তুই!”
অয়নের হাবভাব অশান্ত। কেমন ছটফটিয়ে বলল,
“ তাড়াতাড়ি চলো,সময় নেই ভাইয়া ফাস্ট!”
“ কী হয়েছে? কিছু ফেলে এসছিস?”
“ প্রশ্ন পরে করবে,আগে আমাকে পৌঁছাতে হবে ভাইয়া, চলো চলো এক্ষুনি চলো!”
সার্থ বিস্মিত হলেও, আর কথা এগোলো না। বাইকের গতি বাড়িয়ে টান দিলো চাকায়। পথে একবার বলল,
“ হেলমেটটা পর।”
“ তুমি এত স্লো চালাচ্ছো কেন? লাস্ট গিয়্যারটা ধরো ভাইয়া আমাকে আরো তাড়াতাড়ি যেতে হবে।”
“ হয়েছেটা কী?”
“ ব্লান্ডার, আমার জীবনের সব চেয়ে বড়ো ব্লান্ডার!”
মিন্তু মুখ কালো করে নিচে আসতেই রেহণূমা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
বললেন,
“ এলো না?”
ও মাথা নুইয়ে বলল,
“ বলল পরে খাবে! জোর করতেই ঝারি মেরে বের করে দিলো।”
“ পরেও আর খাবে না,আমি জানি! অয়নের পিছনে ছায়ার মতো ঘুরতো সারাক্ষণ,সেখানে ও চলে যাওয়ায় কষ্ট পেয়েছে। আবার যাওয়ার সময় দেখাও হলো না। মেয়েটা ওকে খুব ভালোবাসে তো। বড়ো ভাই মনে করে একদম!”
তুশি দাঁড়িয়ে ছিল দূরে। কথাটায় মাথা নুইয়ে জিভ কাটল ও। মিন্তুর মন ভার। মুখে হাসি নেই।
রেহণূমা বললেন,
“ তুই খেতে বোস।”
“ না,ইউশা আসুক।”
“ বাবাহ,এমনিতে তো সারাদিন ওর পেছনে লেগে থাকিস।”
মিন্তু কথা বলল না। মাথা নুইয়ে ঘরে চলে গেল। রেহণূমা নীরস শ্বাস ফেলে বললেন,
“ খালা,আপনারা খেয়ে নিন। আমি আপাকে একবার দেখে আসি। এখন আমাকেই তো সব সামলাতে হবে। মেয়ে হলে মায়েদের কষ্ট কমে শুনেছি,আর আমার দুখানা মেয়েই আমার ঝামেলা বাড়িয়ে দিলো! বেশি সুন্দরী হলেও জ্বালা,নাহলেও জ্বালা।”
রেহণূমা বিড়বিড় করলেন। মায়ের যাওয়ার দিক চেয়ে থাকতে থাকতে তুশির চোখ টলমল করে উঠল। বাড়িটা যেন শ্বশ্মানে রূপ নিয়েছে। কোনো আনন্দ নেই,মজা নেই,চারদিকে বিষাদে ভরা। মা কথাই বলছেন না ওর সাথে। ও কী করেছে? ঘটনা যাই ঘটুক সব দোষ শুধু ওর।
হাসনা ডাকলেন,
“ খাইতে আয় বু।”
“ খিদে নেই দাদি।”
এটুকু বলেই ও রুমে ঢুকে গেল। হাসনাও আর খেতে পারলেন না। সব ঢেকে-ঢুকে রেখে নাতনির পেছনে চললেন।
এই ঘর নিশ্চুপ,নীরব। জানলার ভারি পর্দা টানায়,সবকিছু যেন তিঁমিরে তলিয়ে গেছে। মুক্ত বাতাস নেই! আদ্যোপান্ত মোড়ানো কেবল অনুতাপ আর হাহাকার দিয়ে।
বিছানায় মাথা রেখে ফ্লোরে বসে কাঁদছে ইউশা। সেই থেকে চোখদুটো বিশ্রাম আদৌ নেয়নি। বিরহের অনলে ছারখার হওয়া বুক নিয়ে,
ওইভাবে একবার মাথা তুলে দেওয়াল ঘড়ি দেখল ও। মধ্যাহ্ন পার হয়েছে অনেকটা সময়। এতক্ষণে তো অয়নের চলে যাওয়ার কথা। ইউশার চোখের স্রোত বেড়ে গেল। বুক মুচড়ে উঠল। হাতের পিঠে মুখ ডুবিয়ে হুহু করে কেঁদে উঠল ও। অয়ন আর এই দেশে নেই। তাকে চাইলেই আর দেখা যাবে না,ছোঁয়া যাবে না। নিশ্চয়ই জেদ করে যোগাযোগও বন্ধ করে দেবে? এভাবে তো ইউশা মরে যাবে! ও বাঁচতে পারবে না। অয়ন ভাই ওর নিঃশ্বাস, সেই নিঃশ্বাস দূরে গেলে মানুষ বাঁচে? ইউশার কান্নাটা বাড়ল আরো। একে একে শব্দ বেরোলো মুখ থেকে। অশ্রুতে সিক্ত গলবিল নিংড়ে কথা জড়িয়ে এলো,
“ আমায় ছেড়ে চলেই গেলে অয়ন ভাই? একটুও আমাকে মনে পড়ল না,খারাপ লাগল না,কষ্ট হলো না? যেতে পারলে,
পারলে যেতে?”
পেছন থেকে একটা ধীরুজ জবাব এলো,
“ পারিনি।”
চেনা কণ্ঠ,রক্তে মিশে যাওয়া ঐ গলার স্বর শুনে তুরন্ত মাথা তুলল ইউশা। হুড়মুড় করে ফিরল পেছনে। বুকটা কেমন ছ্যাৎ করে কেঁপে উঠল অমনি।
অস্পষ্ট আওড়াল,
“ অয়ন ভাই!”
চৌকাঠ থেকে দু পা ভেতরে এসে দাঁড়িয়েছে অয়ন। নড়ল না,এগিয়েও এলো না। কেবল মূর্তির মতো মূক নয়ন মেলে চেয়ে রইল এদিকে। ইউশা নিজেই ছুটে গেল এলোমেলো পায়ে। চোখে অবিশ্বাস নিয়ে, ভেজা ভারি পল্লবগুলো ঝাপটে,কাঁপা হাতটা বাড়িয়ে রাখল অয়নের গায়ে। ঠকঠক করা আঙুল চালিয়ে ওর বুকের কাছের শার্টটা আলতো করে ছুঁলো। থেমে থেমে বলল,
“ তুমি কি সত্যিই এসেছ? আমি, আমি ভুল দেখছি না তো? তুমি যাওনি অয়ন ভাই? তুমি যাওনি? আমি সত্যি দেখছি তো, বলো না সত্যি দেখছি আমি?”
ওইপাশ থেকে উত্তর এলো না। অয়ন চুপ,একইরকম নিস্পন্দ। ভ্রুতে ভাঁজ, দৃষ্টিতে বিস্ময় তবে। চোখের মনিদুটো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ও ইউশাকেই দেখল কিছু সময়। ইউশা অধৈর্য হয়ে বলল,
“ কথা বলছো না কেন?”
অয়ন পালটা প্রশ্ন ছুড়ল
“ তুই আমাকে ভালোবাসিস, ইউশা?”
চলবে…
Share On:
TAGS: কাছে আসার মৌসুম, নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪৯
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪৬
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৪ ক
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫৯(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬৪
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫৪
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬৫
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১০
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১১