বড় ছেলের মেয়ে জন্মানোর পাঁচ মাস পর নিজের ভেতরে এক অদ্ভুত রকমের অনুভূতি টের পেলেন রেহানা বেগম। ডাক্তারি পরীক্ষায় জানতে পারলেন তিনি অন্তঃসত্ত্বা। ওখানেই মাথায় হাত দিয়ে বসে রইলেন তিনি। রাগে দুঃখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। এই মুখ এখন বাসায় কিভাবে দেখাবেন? ছেলে মেয়েরা কি বলবে? বড় ছেলের বউ তো কড়া কথা শোনাতে ছাড়বে না। এমনিতেই মাঝে মাঝে দু’জনের মধ্যে মনোমালিন্য হয়, তখন একে অপরকে অপদস্থ করতে দু’জনেই খুব পছন্দ করেন। এখন তো উঠতে বসতে বড় বউ খোটা দিবে। ভীষণ চিন্তিত অবস্থায় স্বামীকে কল করেন তিনি। চেম্বারের বাইরে বসে অপেক্ষা করেন। রাশেদ সাহেব আসতেই তাকে সমস্ত ঘটনা খুলে বলেন। এও বলেন যে ডাক্তার বলেছে এবরেশন করানো সম্ভব নয়। অলরেডি তিনমাস চলছে। একথা শুনে রাশেদ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন,’তিনমাস হয়ে গেছে আর তুমি জানতে পারলে না? এমন তো নয় যে আগে বাচ্চা হয়নি তোমার। কিছু বুঝতে পারলে না?’
রেহানা বেগম ভেঙে পড়লেন খুব। জড়ানো গলায় বললেন,’বাবুকে নিয়ে মেতে ছিলাম, অতোটা গুরুত্ব দেইনি। তাছাড়া এখন স্বাভাবিক নিয়মেই মেয়েদের পিরিয়ড সার্কেল বন্ধ হয়ে যায়। ভেবেছিলাম তাই হবে হয়তো।’
‘আটত্রিশ চলছে, এখনই এত ভাবা উচিত হয়নি তোমার। এখন কিছু করার নেই। যে যা বলুক না কেন, বিষয়টা তো লুকিয়ে রাখা যাবে না।
রেহানা বেগম করুন চোখে স্বামীর দিকে তাকালেন। শরীর ছেড়ে দিলেন রাশেদের শরীরের উপর। বললেন,’এই বিষয়টা লুকাতে হবে। বাইরের কেউই যাতে জানতে না পারে। তোমার তো টাকা পয়সার অভাব নেই। কিছু একটা তো করো।’
রাশেদ কিছুক্ষণ ভেবে বলেন,’বাইরের সবার থেকে লুকানো সম্ভব। তুমি আমাদের ফ্ল্যাটে গিয়ে বাকি সময়টা নাহয় থাকলে। কিন্তু বাড়ির সবাইকে তো জানানো দরকার। আর যাই হোক আমরা তো কোন পাপ করিনি। আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন, তিনি সন্তুষ্ট হয়েছেন বলেই দিয়েছেন। আমরা এর অবহেলা করতে তো পারব না।’
রেহানা আর কোন কথা বললেন না। রাশেদের হাত ধরে বাড়িতে ফিরে এলেন। বিশাল ডুপ্লেক্স বাড়িটি রাশেদ সাহেবের। নারায়ণগঞ্জের ধনী ব্যবসায়ীদের মধ্যে তিনিও একজন। এছাড়া শহরের বাইরেও কয়েকটি ফ্ল্যাট কিনেছেন তিনি। যদিও সবগুলো ভাড়া দেওয়া না। মাঝে মাঝে রেহানাকে নিয়ে সেখানে ঘুরে আসেন। বৃদ্ধ বয়সে তারা পৃথিবী ঘুরবেন বলে পরিকল্পনা করেছিলেন। বলতে গেলে রেহানার খুব ইচ্ছে ছিলো। কিন্তু মাঝখান থেকে এ কি হয়ে গেল। রেহানার সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল। এখন এই বাচ্চা জন্ম দেওয়ার পর তার দেখাশোনা করতে করতেই বাকি জীবনটা পার হয়ে যাবে।
বাড়িতে ফিরে কাউকে কিছু বলতে হলো না। অনুপমা মুখিয়ে ছিল যেন, শ্বাশুড়ি তার ডাক্তারের কাছে গিয়েছে। কি হয়েছে তা জানতে হবে তো। তবে রেহানার মুখটা থমথমে দেখে কিছু জিজ্ঞেস করে না। নিজেই হাত থেকে রিপোর্ট নিয়ে দেখল। অবাক চোখে তাকিয়ে রইল রেহানার দিকে। চোখে মুখে ঘৃণা দেখা দিলো অনুপমার। রাশেদ সাহেব ততক্ষণে রুমে চলে গিয়েছেন। অনুপমা হায় হায় করে উঠলো,’ছিঃ ছিঃ ছিঃ! এসব কি মা? এই বয়সে এসে পেট বাঁধিয়ে ফেলেছেন! বাসায় এসে আমাকে দেখাচ্ছেন? এতটুকু লাজ লজ্জা নেই আপনার?’
রেহানা জবাব দিলেন না। এখন এসব কথা তাকে হজম করতে হবে। আরো কত কথা শোনা লাগবে কে জানে! তবে অনুপমা থামলো না। তার মুখ চলতে থাকলো,’এই বয়সে এসেও স্বামীর সাথে শোয়া লাগে। যদি ইচ্ছে করে তাহলে দেখে শুনে নিবেন না? এখন সবাই জানতে পারলে কি হবে?’
কান ঝাঁ ঝাঁ করে উঠলো রেহানার। ইচ্ছে করছে দু চারটে চড় বসিয়ে দিতে। কিন্তু উপায় নেই। তাই এই কথা থেকে বাঁচতে রুমে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। তবে যাওয়ার আগে বলে গেলেন একথা তাদের পরিবার ব্যতীত আর কেউ যেনো না জানে। আপাতত কোন আত্মীয়দের বলার দরকার নেই। রেহানা চলে যাওয়ার পর অনুপমা একে একে সবাইকে ফোন দিতে রসিয়ে রসিয়ে ঘটনাটা বললো। প্রথমে ওর মাকে ফোন দিয়ে কতক্ষন কথা বললো। তারপর ননদ রাহা, যার বিয়ে হয়েছে বছর দুয়েক আগে। ভাগ্যিস তার বাচ্চা হয়নি, সে অন্তত সমাজে মুখ দেখাতে পারবে। কিন্তু অনুপমার তো জাত যাবে ইত্যাদি ইত্যাদি বলেছে। সব শেষে নিজের স্বামীকেও ফোন করে ঘটনার বিস্তারিত জানিয়েছে। এসব শুনে সাইমনের মাথায় আগুন ধরে গেছে। অফিস থেকে ছুটি নিয়ে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরেছে। সাথে বোনকেও আসতে বলে দিয়েছে। বাসার ড্রয়িং রুমে থমথমে অবস্থা। ঝড় আসার পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে। রাহা মায়ের পাশে বসে আছে। রেহানা মাথা নিচু করে বসে আছেন। কিছুক্ষণ নিরব থাকার পর রাশেদ বললেন,’রাহা, তোমার মা এখন থেকে আমাদের ফ্ল্যাটে গিয়ে থাকবে। ওর মন ভালো নেই, তুমি বরং মায়ের ব্যাগপত্র গুছিয়ে দাও।’
এবার গলা ঝাড়ে সাইমন। খেকিয়ে বলে উঠলো,’এটা কেমন কথা আব্বু? এসব কি? আমাদের তো একটা রেপুটেশন আছে সমাজে। এসব কথা জানাজানি হলে সমাজে মুখ দেখাতে পারবো? তোমরা এমন কেন করলে?’
মাঝে থেকে অনুপমা বলে উঠলো,’আহা, তুমি কি অবুঝ নাকি সাইমন? এটা ইচ্ছাকৃত নয়। তাছাড়া এখন এবরেশন করার সময় নেই। তাই বাচ্চাটাকে জন্ম দিতেই হবে।’
মূলত সবার সামনে নিজেকে এভাবেই গুছিয়ে রাখে অনুপমা। বউ শ্বাশুড়ির বিরোধ তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। অনুপমার কথা শুনে রাশেদ বললেন,’আমাদের হাতে গোনা কয়েকজন আত্মীয় ছাড়া আর কেউ যেনো না জানে।’
অনুপমা বললো,’আমার বাপের বাড়ির পরিবার আর রাহার শ্বশুর বাড়িতে তো জানাতেই হবে। বর্তমানে এরাই তো আমাদের আত্মীয়।’
এবার রাহা মুখ খোলে,’এখনও কাউকে বলিনি। তবে আস্তে ধীরে বলে ফেলব। আমার শ্বশুর শাশুড়িকে তো চিনো তোমরা। তারা ধার্মিক, মনে হয় না যে বেশি রিয়েক্ট করবে।’
কিন্তু সাইমন কে থামানো গেল না। সে গম্ভীর মুখে বললো,’দেখ বাবা আমি কোন লুকোচুরি খেলতে চাই না। এই বাচ্চাটা জন্মানোর পর কোন অনাথ আশ্রমে দিয়ে দিও। তাহলে আমাদের সম্মান বাঁচবে।’
এই মুহূর্তে গর্জে ওঠেন রাশেদ। গলার জোর বাড়িয়ে বলেন,’একথা বলার সাহস কি করে হয় তোমার? আল্লাহ আমাদের অনেক কিছু দিয়েছেন। সম্পত্তির ভাগ যদি তিন জনের মধ্যে হয় তাহলেও অনেক পাবে তুমি। তার জন্য আমি নিজের রক্তকে ফেলে দিব?’
সাইমন কথার জবাব দিলো,’আমি সম্পত্তির কথা ভেবে বলিনি। সমাজের লোকেরা কি বলবে আমাদের? এসব নিয়েই ভাবছি।’
‘তোমাকে অত ভাবতে হবে না। যদি সম্মান বড় হয় তোমার কাছে তাহলে বাড়ি ছেড়ে চলে যাও। আজকাল মুখে কথা আটকায় না তোমার।’
সাইমন আরো কিছু বলতে গেলে অনুপমা আটকায় তাকে। এভাবে ঝগড়া করলে তো চলবে না। তাদের মেয়ের ও ভবিষ্যৎ আছে নাকি। এজন্য সাইমন কে ঘরে নিয়ে বোঝাতে বসে সে। বিষয়টা সত্যি এবার খারাপের দিকে চলে যাচ্ছে। রাশেদ সাহেব এক কথার মানুষ, ছেলেকে তিনি ভালোবাসেন তবে অন্যায় করলে শাসন করেন। বাবার সাথে তেমন ঝগড়া বিবাদ হয়না তার। তারা তাদের মত থাকতে পছন্দ করেন।
চৌদ্দ বছর বয়সে বিয়ে হয় রেহানার, বছর ঘুরতেই সাইমনের জন্ম হয়। তারপর মেয়ে রাহা। এরপর তারা বাচ্চা নেননি। এখন কিভাবে যে হয়ে গেল আল্লাহ ভালো জানেন।
রেহানাকে দূরের ফ্ল্যাটে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। রাশেদ প্রথম কয়েক মাস তেমন যায়নি। কাজের লোক রেখে দিয়েছিলেন। কিন্তু রেহানার যখন সাত মাস চলে তখন সোজা ফ্ল্যাটে গিয়ে উঠেন। ওখান থেকেই ব্যবসার দেখাশোনা করতেন। তবে এতদিনে রেহানার একটা বদ্ধ ধারণা তৈরি হয়েছে। তা হলো, তার পেটের বাচ্চাটা একটা অভিশাপ। তার জীবনটা নরক করে দিয়েছে, বাচ্চাটার প্রতি তার ক্ষোভ ধীরে ধীরে বাড়তে লাগলো। কয়েকমাস একা থাকার কারণে তার এই রাগটা তীব্র হলো। রাশেদ তা টেরই পেলেন না।
সময় গড়িয়ে তাদের একটা ফুটফুটে মেয়ে সন্তান হলো। ধবধবে ফর্সা, চেহারার গঠন মাশআল্লাহ অনেক সুন্দর। পরিবারের কারোর মতোই হয়নি মেয়েটা। তবে নজড় কাড়া সৌন্দর্য নিয়ে দুনিয়ায় এসেছে সে। মেয়ের মুখ দেখে সবকিছুই ভুলে গেছেন তিনি। রাহা ব্যতীত হসপিটালে আর কেউ আসেনি। বোনকে কোলে নিয়ে সে কি খুশি রাহা। বলে,’দেখো আব্বু, আমার বনুটা কত সুন্দর হয়েছে। আমার তো হিংসে হচ্ছে।’
রাশেদ হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। মেয়েটা অন্তত পজেটিভ ভাবছে। কিন্তু ছেলে আর তার বউ একটিবারের জন্যও এলো না। এমনকি কখনো মায়ের কোন খবর পর্যন্ত নিলো না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্ত্রীর কাছে মেয়েকে নিয়ে গেলেন। তবে রেহানার অমোঘ পরিবর্তন দেখে ঘাবড়ে গেলেন। মেয়েকে কাছে টানছে না রেহানা। অথচ রাহার জন্মের পর মেয়েকে বুকে চেপে সবসময় বসে থাকতেন। চোখে মুখে খুশির ঝিলিক দেখেছেন তখন। এখন মুখটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তবে এ নিয়ে বেশি মাথা ঘামায় না রাশেদ। এমনিতেই এমন সময়ে বাচ্চা হয়েছে। তাই হয়তো মন খারাপ রেহানার।
দিন যত গড়াতে লাগলো রেহানার অবহেলা বাড়তে শুরু করলো। মেয়েকে সবসময় কাজের লোকের কাছে ফেলে রাখতো। শুধু খাওয়ানোর সময় চোখমুখ কুঁচকে খাইয়ে দিত। তবে রাশেদ খুব আহ্লাদ করেন মেয়েকে নিয়ে। আদর করে নাম রাখেন রেহনুমা জান্নাত নূর। বড় মেয়ের নাম রুকাইয়া জান্নাত রাহা, সেই সাথে মিলিয়ে নাম রাখেন তিনি। মেয়ে তার নামের মতোই নূর ছড়ায় যেন। নূর জন্মানোর পর ব্যবসায় ব্যপক উন্নতিও হয়েছে।
নূরের চার বছর হওয়ার পর নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন রেহানা। তার নাতনির বয়স সাড়ে পাঁচ বছর। অনুপমা মেয়ে সাহারাকে নিয়ে স্কুলে যায়। নূরকে দেখলে একটু আধটু কথা বলে মজা করে। কিন্তু সাইমন কখনোই বোনের সাথে কথা বলেনা। নূর ভাইয়া ভাইয়া করে ডাকলেও সাড়া দেয়না। মেয়ের জন্য চকলেট আনলেও নূরকে কেউ কিছু দেয়না রাশেদ ব্যতীত। যেখানে নিজের মা অবহেলা করে সেখানে ভাই ভাবি তো তেমন কিছু নয়। তবে সাহারার সাথে নূরের বেশ সখ্যতা গড়ে ওঠে। সমবয়সী না হলেও তারা তো ছোট। প্রতিদিন খেলাধুলা করে তারা। অনেক মজা করে। সাহারা লুকিয়ে লুকিয়ে তার চকলেট গুলো নূরের সাথে ভাগ করে খেতো। নিজের সব খেলনা গুলো নূরের সাথে শেয়ার করতো।
অনুপমা মেয়েকে তেমন মিশতে দিত না নূরের সাথে। সাহারা লুকিয়ে লুকিয়ে নূরের সাথে খেলাধুলা করতো। বলা বাহুল্য যে এবাড়িতে আসার পর নূর বাড়ির বাইরে যেতে পারেনি আর। যখন ওকে স্কুলে ভর্তি করানোর সময় এলো তখন রেহানা ঘোর আপত্তি জানালো। তার এই মেয়েকে পড়ানোর ইচ্ছে নেই। স্কুলে গেলেই তো সবাই পরিচয় জানতে পেরে যাবে। তখন তাদের জাত যাবে। অনুপমা তো কিছুতেই তার মেয়ের স্কুলে নূরকে ভর্তি করাবে না। ননদ আর মেয়েকে একসাথে নিয়ে গেলে তো সম্মান থাকবে না।
এজন্য রাশেদ অনেক ভেবে বাসা থেকে তিন কিলোমিটার দূরের একটা মহিলা মাদ্রাসায় নূরকে ভর্তি করিয়ে দিলেন। পাঁচ বছরের ছোট্ট নূর গাঁয়ে বোরকা জড়িয়ে গাড়িতে করে মাদ্রাসায় যায়। মেয়ের জন্য কালো রঙের গাড়ি কিনেছেন রাশেদ। বাড়ির ভেতর থেকেই গাড়িতে উঠে যেতো নূর। বিকেলে ফিরত সেভাবে। তবে এজন্য অনুপমা মুখটা সবসময় বিকৃত করে রাখত। এতো আদিখ্যেতা সহ্য হয় না তার।
কিন্তু সময়ের নিয়মে সব পাল্টাতে থাকলো। সাহারা আর নূর বড় হলো। অনুপমার কোলে ছেলে এলো আর রাহার কোলে দুই ছেলে এলো। ওরা সবাই নূরের ছোট, শুধুমাত্র সাহারাই নূরের চেয়ে দেড় বছরের বড়।
রাশেদ সাহেব সাহারাকে মাম্মাম বলে ডাকতে বলেছে নূরকে। নূর বেশ খুশিমনে মাম্মাম বলে ডাকে। তবে দুজনের বড় হয়ে ওঠার ধরন বেশ আলাদা হলো।
সাহারা বড় হলো ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ে আর বড় ভার্সিটিতে পড়ে। আর নূর বড় হলো কুরআন হাদিস পড়ে। সময়ের সাথে সাথে নিজেকে পর্দার আড়ালে লুকিয়ে ফেলেছে নূর। বাবা আর ভাই ব্যতীত আর কারো সামনে যায়না সে। বয়স তার আঠেরো। সময়ের সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে নূরের সৌন্দর্য দ্বিগুন বেড়েছে। বাইরে সে খুব একটা বের হয়না। তার মাদ্রাসার পড়া শেষ হয়নি এখনও। আগের মতোই মাদ্রাসায় যায় গাড়ি করে। এতেও অনুপমার বিদ্রুপের শেষ নেই। তবে নূর তাতে কিছু মনে করে না। সাহারার সাথে সখ্যতা থাকায় সে তাকে ইসলাম সম্পর্কে মোটিভেট করে। তাকে কোরআন শেখাতে চায়। প্রতি সন্ধ্যায় ঘন্টাখানেক করে সাহারা কোরআন পড়ে নূরের কাছে। এতে অনুপমা বিরক্ত হয়ে বলে,’আমার মেয়েকে ছোট বেলায় টিচার রেখে কুরআন পড়িয়েছি নূর। তোমাকে এখন আর শেখাতে হবে না। এখন ওর ভার্সিটিতে কত পড়া জানো তুমি? সেই সন্ধ্যা থেকে ওকে পড়িয়ে যাচ্ছ। তাহলে বাকি পড়া ও কখন পড়বে?’
কথার আক্রমণে মিইয়ে যায় নূর। তার কন্ঠস্বর কখনোই উঁচু হয়নি। আজও হলো না, কাচুমাচু হয়ে কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলে,’ভাবি, মাম্মামের পড়া তো শুদ্ধ হয়না। তাই আমি একটু দেখিয়ে দিচ্ছি। খুব তাড়াতাড়ি শিখে যাবে। আসলে এতদিন ইংলিশ মিডিয়ামে পড়েছিল তো, তখন পড়ার চাপ ছিলো তাই হয়তো ভুলে গেছে।’
‘আমার মেয়ের ভালো মন্দ আমাকেই বুঝতে দাও বাপু। তুমি তোমার টা ভাবো।’
সাহারা খানিকটা বিরক্ত হয়ে বলে,’উফফ আম্মু!! আমি নিজ থেকে শিখতে চাইছি। তোমার এত সমস্যা কোথায়?’
‘তুই থাম, রেজাল্ট খারাপ হলে তোর একদিন কি আমার একদিন। সবসময় নূরের সাপোর্ট নিচ্ছিস কেন? চুপচাপ পড়তে বস।’
মায়ের এমন ঘ্যানঘ্যান ভালো লাগে না সাহারার। তাই সে নূরকে উদ্দেশ্য করে বলে,’তুই রুমে যা জান্নাত, নাহলে মা আমার মাথা খাবে। সেমিস্টার দিয়ে আবার পড়ব তোর কাছে।’
নূর চলে গেল ধীর পায়ে। আপনজনের সাথে সময় কাটানোর ইচ্ছা আর ব্যথিত নয়ন নিয়ে প্রস্থান করলো। কিন্তু অনুপমা ছাড়লো না। সে রেহানাকে গিয়ে বললো,’মা আপনার মেয়েকে একটু সামলে রাখবেন?’
রেহানা বই পড়ছিলেন। বয়সের ভারে এখন খুব একটা বাইরে বের হন না। আগের সেই তেজটা তার মাঝে নেই। সবসময় রুমের ভেতর থাকতে পছন্দ করেন। অনুপমার কথায় চোখ তুলে তাকিয়ে বলে,’কেন? কি করেছে সে?’
‘আপনার মেয়েকে হুজুর বানিয়েছেন ভালো কথা। তাই বলে সবসময় এতো জ্ঞান দিতে কেন আসে বলুন তো? ডান হাতে গ্লাস ধরতে হবে, বসে পানি পান করতে হবে, বাথরুমে গেলে মাথায় কাপড় দিতে হবে আবার আমার মেয়েকে জোর করে কোরআন পড়াচ্ছে। কেন আমি ছোট বেলায় পড়াইনি ওকে? বলে কিনা শুদ্ধ হয়না ওর পড়া। আপনার মেয়ে একাই বেশি পণ্ডিত তাই না? হয়েছে তো বৃদ্ধ বয়সে তাতে এত ঢং কিসের?’
রেহানার মাথা গরম করে দিয়ে চলে গেল অনুপমা। ফলস্বরূপ নূরের গালে ভারি হাতের থাপ্পড় পড়লো।
আর যাই হোক হাতের জোরটা রেহানা বেগমের রয়ে গেছেন। সাথে নূরের প্রতি যে তিক্ততা ছিলো তাও বৃদ্ধি পেয়েছে। এখনও তিনি মেয়ের সাথে কোথাও যেতে বা কাউকে পরিচয় করিয়ে দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। বছর তিনেক আগে একবার রাহার শ্বশুর বাড়ির কয়েকজন বেড়াতে এসেছিল। মহিলাদের সাথে নূরের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন রেহানা। তবে তাদের মুখে যে বিদ্রুপের হাসি ছিল তা বুঝতে সময় লাগেনি। একজন তো মুখ ফসকে বলে ফেলল,’মা মেয়ে হিসেবে বেশ লাগছে।’
এতে রেহানার খারাপ লাগা যেন আরো বেড়ে গেল। এই মেয়ে জন্ম দেওয়ার পর লাঞ্ছনা গঞ্জনা ব্যতীত আর কিছুই পাননি তিনি। তারপর থেকে নূর চাইলেও আর তাকে বাইরে বের হতে দেন না। মাদ্রাসায় যায় ওইটুকুই।
মায়ের হুটহাট প্রহার সহ্য করা অভ্যাস হয়ে গেছে নূরের। আগে কারণ জানতে চাইলেও এখন আর প্রশ্ন করেনা। ছোটবেলা থেকেই সবার অবহেলায় বড় হওয়া নূরের ভেতরে ম্যাচিউরিটি এসে গেছে। নিজের রুমে থাকতেই বেশি পছন্দ করে সে। এই বাড়িতে বাবা আর মাম্মাম ছাড়া যেন তার কেউই নেই। আর কেউই তার সাথে কথা বলে না। সাইমুনের ছেলে অনুভব একটু একটু কথা বলে এই যা। সবকিছু থেকে কেমন নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। রেহানা বেগম কিছুক্ষণ গালমন্দ করে চলে গেলেন। এ যেন তার নিত্যদিনের কাজ। নূর এশার নামাজ আদায় করে কোরআন পড়তে বসল।
নূরকে সবাই আলাদা মানুষ ভাবে। আজকালকার মেয়েরা সচরাচর এমন নিশ্চুপ স্বভাবের হয়না। মনটা বেশ নরম তার। পড়াশোনা করার পাশাপাশি টুকটাক রান্না করা ছাড়া আর কোন কাজ নেই তার। রাশেদ সাহেব মেয়ের রান্না খুব পছন্দ করেন। প্রতিদিন রাতের খাবারে নূরের বানানো কোন না কোন আইটেম থাকে। সে খাবারের প্রতি আর কারো টান না থাকুক, রাশেদ সাহেব বেশ তৃপ্তি করে খান। তা দেখে নূর ভীষণ খুশি হয়। মেয়েকে খুশি হতে দেখে রাশেদ সাহেব ও বেশ খুশি হয়।
তবে রেহানা মেয়ের কর্মকাণ্ড নিয়ে খুব একটা সন্তুষ্ট নন। এখন নূরের কথা কম বেশি সবাই জেনে গেছে। রাশেদ সাহেবের যে বৃদ্ধ বয়সে মেয়ে হয়েছে তা সময়ের ব্যবধানে সবাই জেনেছে তবে দেরিতে। এজন্য বোধহয় লোকজন একটু কম সমালোচনা করেছে। করলেও রাশেদ তা কানে তোলেননি। কিন্তু রেহানা সবকিছু দেখতেন এবং তার রাগ নূরের উপর ঝাড়তেন। এই যেমন বাসায় কোন আত্মীয়, বিশেষ করে পুরুষ মানুষ এলে নূরকে খুঁজে পাওয়া যায় না। দরজা বন্ধ করে বসে থাকে। এজন্য কেউ এসে যদি নূরের কথা জিজ্ঞেস করে তাহলে তাদের মিথ্যা বলতে হয়। বলতে হয় যে নূর মাদ্রাসায় গেছে।
তবে আজ একটা অঘটন ঘটে গেল। বহুদিন অনুপমার ভাই এসেছে বিকেলে। বোনকে তার বাড়িতে দাওয়াত করতে এসেছে। কালেভদ্রে এদিকে আসেনা সে, ব্যবসার কাজের ব্যস্ততা তার। বছরে একবার কি দুবার এদিকে আসা হয়।
নূর তখনই বাসায় ফিরেছে। ড্রয়িং রুম পার হয়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় চলে গেল মাথা নিচু করে।
অনুপমার ভাই দেখলো পা হতে মাথা পর্যন্ত কালো কাপড়ে ঢাকা। হাত পায়েও মোজা পড়া। সুতরাং শরীরের একটা লোম ও দেখা যাচ্ছে না। সে বলে উঠলো,’এটা কি তোর ননদ অনু?’
অনুপমা ও একবার তাকিয়ে দেখলো নূরের দিকে। তাচ্ছিল্য করে বললো,’হ্যাঁ, এটাই সেই ননদ। যাকে আমার শ্বশুর শাশুড়ি বুড়ো কালে জন্ম দিয়েছে।’
‘আচ্ছা, কখনো দেখিনি। তুইও তো আমার ছোট বেয়ানের সাথে আলাপ করিয়ে দিসনি কখনো।’
এমন সময় সাহারা এসে বললো,’জান্নাত পর্দা করে মামা, তোমার সাথে কথা তো দূরে থাক সামনেও আসবে না।’ বলতে বলতে মামার পাশে বসলো,’তাছাড়া ওর সাথে তোমার কথা না বললেও চলবে।’
‘আরেহ আমি কি তোর ছোট ফুপু কে বিয়ে করব নাকি। ক’দিন পর আমার ছেলের ই বিয়ে হবে।’
কথাটা বলে হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়লেন যেন। অনুপমা বললেন,’নূরকে ডেকে আনো যাও, মুখ ঢেকে হলেও আজ অন্তত একটু কথা বলুক।’
‘উফফ মা!! তুমি তো জানো সব তাও ওর পিছনে লাগছো কেন?’
‘গিয়ে বলবে আমি ডেকেছি যাও।’
মায়ের থেকে নূরকে প্রটেক্ট করতে পারে না সাহারা, খুব একটা পারদর্শী নয় সে। তবে ওর দাদু এতে একশতে একশ।
সাহারা নূরকে ডাকতে গেল। তবে নূর জানে সাহারার মামা এসেছে। এর আগেও এমন পরিস্থিতিতে পড়েছিল সে। সাইমনের বন্ধুরা এবং অনুপমার বন্ধুরাও এসেছিল বাড়িতে। তবে মেয়েদের দেখা দিলেও ছেলেদের সামনে যেতে নারাজ ছিল নূর। তবে অনুপমা যেন ইচ্ছে করেই নূরকে এমন পরিস্থিতিতে ফেলে। সে সাফ সাফ জানিয়ে দিলো, ‘আমি যাব না মাম্মাম, ভাবিকে বলো গিয়ে।’
‘আমি বলেছি আম্মুকে, কিন্তু কে শোনে কার কথা। এজন্য আসলাম। আচ্ছা তুই থাক।’
নূর আসেনি, অনুপমার ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করেনি এজন্য সে অপমানিত হয়েছে। রাতে সাইমন এলে অনুপমা বলে,’আচ্ছা আমার পরিবারের সদস্যদের কি তোমার বোন হিং/স্র জা/নো/য়ার মনে করে? একটু দেখা করলে কি এমন হতো? আজ আমার ভাইকে তোমার বোন অপমান করেছে। সবসময় আমি তাকে প্রটেক্ট করি। পর্দা করে বিধায় কোথাও ডাকি না। আমার ভাই একজন বয়স্ক মানুষ, তার সামনে এসে দু’টো ভালো মন্দ কথা বললো না।’
সাইমন ল্যাপটপ খুলে বসেছে, কিছু কাজ বাকি তার। রোজ রোজ ছোট বোনের নামে এসব নালিশ শুনতে শুনতে সে তিক্ত হয়ে গেছে। বলা বাহুল্য অনুপমা সবসময় একটু বাড়িয়ে বলে থাকে। এই যেমন আজ সামান্য বিষয়টা বাড়িয়ে ফেলল এ। সাইমন জোর গলায় নূরকে ডাকতে লাগলো।
চলবে,,,,,,,
পদ্মপ্রিয়া
পর্ব_১
ঈশিতারহমানসানজিদা
Share On:
TAGS: ঈশিতা রহমান সানজিদা, পদ্মপ্রিয়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE