পদ্মপ্রিয়া
পর্ব_১২
ঈশিতারহমানসানজিদা
ফিনাইলের তীব্র গন্ধে মাথা ধরে আসে, আশপাশ টা খুবই নির্জন। প্রাইভেট হসপিটালে সবকিছুই শান্ত এবং স্বাভাবিক। রাত দু’টো বাজে, একটু আগেই ফয়েজ কে ঠেলে বাসায় পাঠিয়েছে আজমাঈন। ঘুম আসায় চেয়ারে বসে বসে ঢুলছিল সে। ঠিকমতো ঘুম না হলে কালকে বিয়ে করতে গিয়ে মুরগির মতো ঝিমুনি দিবে। অবশ্য নূর এখনও জানে না যে ফয়েজ চলে গেছে। কেউ না থাকলেও নূরের সমস্যা হবে না। সে আপনমনে ট্যালি কাউন্টার দিয়ে দোয়া পড়ছে। রাশেদ সাহেব ঘুমাচ্ছেন। আপাতত তিনি শঙ্কামুক্ত, নূর একজন নার্সের থেকে নামাজের ঘর কোথায় তা জেনে নিলো। তারপর তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে বের হলো। কেবিনে প্রবেশ করার আগে আজমাঈনকে দেখতে পেলো সে। চেয়ারে বসে আরেক চেয়ারে পা তুলে দিয়ে ঘুমাচ্ছে। দেওয়ালে হেলান দিয়ে আছে বিধায় পড়ে যাচ্ছে না। এভাবে ঘুমালে যেকোনো সময় পড়ে যেতে পারে।
চেনা হসপিটাল, প্রায় নার্স চেনা ওর। এজন্য একজন নার্সকে দিয়ে কেবিন ঠিক করে দিলো। আজমাঈন কে ডেকে দিলো ওই নার্সটি। নূর তখন রাশেদ সাহেবের কাছে গিয়ে বসেছে। আজমাঈনের কথাগুলো আওড়াচ্ছে। তখন কি বলে গেল সব মাথার উপর দিয়ে গেল। কথার গভীরতা সে ধরতে পারেনি, তাই কথার প্রেক্ষিতে জবাব দিতেও পারেনি। আজমাঈন নিঃশব্দে প্রস্থান করেছিল। খানিক বাদে বাইরে এসে দেখলো ছেলেটা নেই। হয়তো কেবিনে চলে গেছে। বাকি রাতটুকু বাবার পাশে বসে কাটিয়ে দিলো নূর। তবে সকাল সকাল চোখটা লেগে এসেছিল, বেডে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল। সকাল সকাল নার্স এসে তাকে জাগিয়ে দিলো। রাশেদ সাহেব জেগেছেন কিছুক্ষণ আগে। তিনি বলেন, ‘বাসায় চলে গেলেই পারতি, এখন আসলেই হতো।’
‘এখন আর কথা বলতে হবে না তোমাকে।’
বাধ্য হয়ে মাথা নাড়েন তিনি। তবে আজমাঈন তখন দরজা ঠেলে ভেতরে এলো। রাশেদ সাহেব বলেন, ‘তুমিও ছিলে নাকি?’
‘জি আঙ্কেল, আমি আর ফয়েজ ছিলাম। মাত্রই ওকে বাসায় পাঠিয়ে দিলাম। বিয়ে বাড়ি বোঝেনই তো। বললাম আমি বরং আপনাদের বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে তারপর ফিরে যাব।’
রাশেদ সাহেব মাথা নাড়েন, আগের চেয়ে সুস্থ তিনি। এখন সকাল সাড়ে সাতটা। নূর বাড়ির কাউকে না জানিয়ে বাবাকে নিয়ে বের হলো। আজমাঈন ড্রাইভ করছে। নূর পেছনে বসা, বাবাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। আজমাঈন বললো,’আঙ্কেল, আপনি যথেষ্ট স্ট্রং পারসোনালিটির মানুষ এবং দায়িত্ববান বাবা। সেখানে নিজের প্রতি এতো অবহেলা দেখালে চলবে? আপনার মেয়েরা তো কাল হসপিটাল ভাসিয়ে দিচ্ছিল প্রায়। একটু খেয়াল রাখুন।’
মজা করায় উচ্চস্বরে হাসলেন তিনি। বলেন,’ওরা এমনই, মেয়ে থাকার যে কত শান্তি তা তো বুঝবে না। আমার দুটো রাজকন্যা।’
‘তাহলে দোয়া করুন আমার ও যেন দু’টো রাজকন্যা হয়, তবে আগে বিয়ের জন্য দোয়া করুন।’
রাশেদ সাহেব হেসে বলেন,’তোমার বন্ধুর তো হয়ে যাচ্ছে, এখন তোমার পালা। মেয়ে দেখব নাকি?’
‘তা দু চারটে দেখুন। নাহলে বন্ধুরা আমাকে ক্ষেপিয়ে মারবে। লাস্ট উইকেট টা আমিই আছি।’
এভাবে কথাবার্তা বলতে বলতে দু’জনেই হাসছে। কিন্তু নূর চুপচাপ বসে আছে। ওর কাছে কোন কথাই মজার লাগছে না। অথচ এরা হেঁসে কুপোকাত। বিষয়টা আজমাঈন খেয়াল করলো। চেয়েছে নূরের মনটা ভালো করতে। বুঝতে পারলো এ মেয়ে সহজে হাসার পাত্রী নয়। একে হাসাতে হলে বহুত কসরত করতে হবে। মাথা ঝাড়া দিয়ে সে ড্রাইভিং এ মন দিলো। ওদের নামিয়ে দিয়ে নিজেও ফয়েজের বাড়িতে ফিরে গেল। রাতে ঘুম হয়নি, এজন্য গিয়েই টানটান হয়ে শুয়ে পড়লো। কেউ তাকে বিরক্ত করলো না।
সেই ঘুম ভাঙল দুপুরের দিকে। ফয়েজ তখন বাবু সেজে তৈরি, বিয়ে করার জন্য পারফেক্ট সাজ যাকে বলে। আজমাঈন কোনমতে তৈরি হলো। নেভি ব্লু কালারের পাঞ্জাবি গায়ে জড়ালো। পাঞ্জাবির গলায় এবং হাতায় সুক্ষ্ম পাথরের ভারি কাজ। সাথে সাদা পাজামা, চুলগুলো ঠিক করে বের হলো সে। আজ বাবা মা ভাই বোন সবাই যাবে। তাহমিনা বেগম সুন্দর শাড়ি পড়েছেন। আজমাঈনের কড়া নির্দেশ, বাবার সাথে সাথে থাকতে হবে। এই লোক যেন আজমাঈনের আশেপাশে না ঘেষে। কালকে অবস্থা খারাপ করে দিচ্ছিলো।
বিয়ে বাড়ি কোলাহল পূর্ণ, ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা দৌড়াদৌড়ি করছে, স্টাফ গুলোর অবস্থা নাজেহাল। পারে তো চিতা বাঘের মতো লাফ মেরে এদিক থেকে ওদিক যায়। কিন্তু আফসোস সে ক্ষমতা নেই। রেহানা বেগমের কিছু বান্ধবী এসেছে। কলেজ লাইফের বন্ধু তারা, তাদের সাথেই কথা বলছেন। অনেক দিন ধরে দেখা হয়না। মূলত নূরের জন্মের পর থেকেই তেমন দেখা হয়না। শুধু ফোনেই কথাবার্তা হতো। আজ অনুষ্ঠান উপলক্ষে এসেছে তাই তারা নূরকে দেখতে চাচ্ছে। রেহানা কাউকে দিয়ে খবর পাঠালো মেয়েকে। আজ নূর রুমের মধ্যে বসে নেই। সকালে বাসায় আসার পর থেকেই রাশেদ সাহেবের পেছন পেছন ঘুরঘুর করছে। একটু সুস্থ হতেই তিনি এদিক ওদিক দেখভাল করছেন। বাবাকে এবার আর একা ছাড়া যাবে না। পরনে তার সাদা রঙের বোরকা, সাদা কালো রং দুটোই পরে বেশি। হাতে সাদা রঙের মোজা আর পায়ে জুতো।
গুটিগুটি পায়ে মায়ের সামনে এসে সবাইকে সালাম দিলো। একজন মহিলা জিজ্ঞেস করলো,’বাহ, মেয়ে তো বেশ ধার্মিক। নাম কি তোমার?’
‘রেহনুমা জান্নাত নূর।’
সবাই কেমন চোখে দেখতে লাগলো নূরকে। এতে আরো অস্বস্তি লাগলো নূরের। চোখের ভাষাই বুঝিয়ে দিচ্ছে যে তারা নূরকে ভালো চোখে দেখছে না। রেহানা শক্ত গলায় বলেন,’এভাবে বোরকা পরে ঘুরছ কেন? বিয়ে বাড়িতে কেউ এভাবে ঘোরে? মানুষ কি বলবে? যাও রুমে গিয়ে বসে থাকো।’
নূর মিনমিন করে বলে,’আব্বুর সাথে আছি।’
‘আজকের দিনটা না থাকলে কিছু হবে না। রাতে তো প্রায় সবাই চলে যাবে তখন যেও। এখন রুমে যাও।’
এরপর নূরের কথা আসে না আর। সে মাথা নাড়ে। এরই মাঝে শোনা গেল বর চলে এসেছে। সবাই ছুটে যাচ্ছে। জোনাকি দৌড়ে যাচ্ছিল, নূরকে দেখে থেমে গেল,’তুমি নূর না? চলো বর এসেছে, সবাই গেইট ধরব।’
রেহানা বাঁধা দিলেন,’আহা, তোমরা যাও। তোমাদের দুলাভাই হয়।’
‘আরেহ, আজকাল এসব সম্পর্ক কেউ দেখে নাকি? গেইট ধরতে শালি হওয়া লাগে না। নূর তুমি চলো।’
এই মেয়েটির পরিচয় জানলেও তার সাথে একটু আগ পর্যন্ত কথা হয়নি নূরের। তাই তাকে বাঁধা দেওয়ার সময় পেলো না যেন। জোনাকি হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে নূরের। এতো দ্রুত যাচ্ছে যে নূর তাল মেলাতে পারছে না। অপর হাত দিয়ে কোনমতে চোখের পর্দা টেনে নামায়।
আজমাঈন গাড়ি থেকে নেমে এদিক ওদিক তাকায়, ফয়েজ অন্য গাড়িতে ছিলো। ওরা আগেই নেমে গেইটের কাছে চলে গেছে। আজমাঈন কে টেনে ধরে ওর বাবা। বলে,’ওদিক দিয়ে ভেতরে যাই চল। এই মেয়েদের মধ্যে থেকে কি করবি?’
আজমাঈন ঝাড়া দিয়ে হাত ছাড়ায়, হাতজোড় করে বলে,’আমাকে ক্ষমা করুন শিকদার সাহেব। আপনার বয়স না হলেও আমার এখন ফুটন্ত বয়স। এখন আমাকে এই মেয়েদের মধ্যেই ঘোরাঘুরি করতে হবে। নাহলে আপনার ছেলে নিজের বউ খুঁজে পাবে না। আপনারও পুত্রবধূ কে দশ ভরি স্বর্ণ দিয়ে দোয়া করাও হবে না। তাই এখান থেকে ভাগেন।’
কিন্তু আজমল শিকদার হাতটা ফের ধরলেন। মাথা নেড়ে বলেন,’বাপের চেয়ে বেশি বুঝোস ব্যাটা। তোর মা’কে আমি অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ করেছি। সাতাশ নম্বর পাত্রী ছিলো তোর মা। প্রেম পিরিতি বাদ দে, তোর জন্য অলরেডি পাঁচটা মেয়ে দেখেছি। ছবিগুলো বাড়িতে রাখা আছে। গিয়ে দেখাব।’
আজমাঈন অসহায় কন্ঠে বলে উঠলো,’আম্মু, আম্মাজান। আমারে আপনে বাঁচান, আপনের দর্জাল স্বামীর থেকে।’
তাহমিনা শাড়ির আঁচল সামনে এগিয়ে এলেন। স্বামীর হাত ধরে বলেন,’আমি সাতাশ নম্বর পাত্রী ছিলাম তাই না? তুমি চুয়ান্ন নাম্বার পাত্র ছিলে আমার। এখন আফসোস করি ক্যান যে রিজেক্ট করলাম না।’
‘করলে ভালোই হতো, তাহলে অন্তত এই শয়তান ছেলে জন্ম নিতো না আর আমার জমি গুলো বেঁচে যেতো।’
ব্যস কথা কাটাকাটি শুরু হয়ে গেল। আজমাঈন এক ফাঁকে চলে এলো গেইটের কাছে। লাল রঙের ফিতা বেঁধে বরপক্ষ কে আটকে রেখেছে মেয়েপক্ষ। ইতিমধ্যে তারা পঞ্চাশ হাজার টাকা দাবি করেছে। এ নিয়ে বাকবিতন্ডা হচ্ছে খুব। জোনাকি সবাইকে থামিয়ে বলে,’আমরা আপনার শালি দুলাভাই, আমাদের এই বিশেষ দিনের দাবি তো মানতেই হবে। ঘোড়া ডিঙিয়ে যেমন ঘাস খাওয়া সহজ নয় তেমনি শালি ডিঙিয়ে বউয়ের কাছে যাওয়াও সহজ নয়।’
অতঃপর স্লোগান শুরু হলো, এক বড় না দুই বড় দুলাভাইয়ের মন বড়। জোনাকি আবারও বলে উঠলো,’তবে এখানে একটা কথা আছে, আমরা তো শালি। আমাদের দাবির বাইরেও একটা আলাদা দাবি রয়েছে। আমাদের সাহারার একটা ছোট মেয়ে আছে।’ নূরের হাতটা উঁচিয়ে ধরলো,’এইযে নূর। আমাদের এখানে সে’ই সকলের ছোট। তাই ওর আলাদা দাবি মেটাতে হবে। এখন আপনি ঠিক করুন কি দিবেন।’
অতঃপর নূরকে উদ্দেশ্য করে বললো,’নূর, তোমার আঙ্কেলের কাছে যা চাইবে আজ তাই দিবে।’
এই মুহূর্তে ফয়েজ হায় হায় করে উঠলো। এতো বড় মেয়ের আঙ্কেল সে, ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। সে সহসাই বলে উঠলো,’নূর প্লিজ, দয়া করে আঙ্কেল বলবে না। দরকার হলে নাম ধরে ডাকো তবুও আঙ্কেল নাহ। আমার তেমন বয়স হয়নি।’
এবার হাসি আটকায় কে, দুই পক্ষ হাসির পাল্লা দিলো যেন। আজমাঈন এতক্ষণে নূরকে খেয়াল করলো। জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরে ওর অবস্থা নাজেহাল এটা ঝট করেই বুঝে গেল। এতগুলো মানুষ দেখে মেয়েটার ভেতরে কি হচ্ছে!! এখন সময়টাকে সামাল দিতে হবে। আজমাঈন বলে উঠলো,’আচ্ছা আচ্ছা, আমরা তো এই বাড়তি বিষয় টা জানি না তাই ভেবে দেখা হয়নি। আগে শালিদের আবদার মেটানো হোক। বাকিটা আমি কথা দিচ্ছি, অবশ্যই দেওয়া হবে। আমার বন্ধুর জামিন আমি।’
আজমাঈন হলুদ রঙা খাম বের করে জোনাকির দিকে এগিয়ে দিলো। ছো মেরে নিয়ে গেল জোনাকি। তারপর বললো,’শোনো নূর, তোমার ভাগের টা ছাড়বে না। দুলাভাই না দিলেও তার বন্ধুর থেকে আদায় করে নিবে কেমন? না দিলে তখন আমাকে বলবে।’
নূর শুকনো ঢোক গিলে আজমাঈনের দিকে তাকায়। ছেলেটা কপালে থাকা চুলগুলো ঠিক করছে। এমন পরিস্থিতিতে জীবনেও পড়েনি নূর। জমে গেল তৎক্ষণাৎ। তবে সেদিকে এখন কারো খেয়াল নেই। ফিতা কাটার অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছে সবাই। এই ফাঁকে নূর পালিয়ে গেল। এক প্রকার দৌড়ে গিয়ে রাশেদ সাহেবের হাত ধরলো। মেয়েকে এমন হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসতে দেখে জিজ্ঞেস করেন,’কি হয়েছে?’
নূর হাঁপিয়ে উঠেছে,’কিছু না আব্বু, ওই মেয়েগুলো আমাকে গেইটে নিয়ে গেছিল জোর করে। এত চিল্লাচিল্লি ভালো লাগছে না।’
‘বুঝেছি, তুই আমার সাথে থাক। নাহয় ভাগ্নে দের সাথে যা।’
‘ওদের সাথে যাব না, ওরা তো এক জায়গায় বসে থাকে না। বড় হয়েছে অথচ এখনও দৌড়াদৌড়ি কমছে না।’
রাশেদ সাহেব আর কথা বলেন না। ব্যস্ত হলেন অতিথিদের সঙ্গে কথা বলায়। সবাই টুকটাক তার শরীরের খোঁজ নিচ্ছেন। আজমাঈনও সেই বাহানায় এলো,’আঙ্কেল শরীর কেমন এখন?’
‘আরে আজমাঈন যে! এসো এসো বসো। আল্লাহর রহমতে এখন ভালো আছি। তোমাদের ওখানকার কি খবর? সব ঠিকঠাক?’
‘জি, আপনি এখানে বসে আছেন কেন? ওখানে আপনার নাতজামাই আছে। গেলে ভালো লাগবে। হাসিখুশি থাকলে শরীর তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়। আপনাকে ছাড়া সে খেতে বসবে না বলে দিয়েছে।’
রাশেদ সাহেব বলেন,’বুড়ো হয়ে গেছি কত আর খাব? তোমরা হলে গিয়ে আজকের যুবক। তোমরা খাওয়া দাওয়া করো। আমাকে এইযে দেখছ না মেয়ে ধরেছে, আর ছাড়বে না। ওসব তেল ঝাল খাবার খেতে দিবে না। এজন্য নিজে রান্না করেছে আমার জন্য।’
‘ওহ আচ্ছা, তাহলে তো বেশ।’
পেটের মধ্যে হাতড়ে আর কোন কথা খুঁজে পাচ্ছে না আজমাঈন। তাই বিদায় নেয়, অবশ্য নিজের ভেতরের অস্থিরতা ও বুঝতে পারে। একঝাঁক সুখ পাখি এসে ডানা ঝাপটায়, তার আওয়াজ কানে বাজে। মাথা ঘুরে ওঠে কেমন। কিছু একটা মনে আসতেই গাড়ি নিয়ে বের হয়ে যায়। কাউকে কিছু না জানিয়েই কাজটা করে বসে সে। এখানে ফয়েজ তাকে শত খুঁজেও পায়না। ফোনটাও বন্ধ করে রেখেছে।
বিয়ের বাকি কাজগুলো ভালোভাবেই সম্পন্ন হলো। এতক্ষণ সবাই হাসিখুশি থাকলেও এখন কেমন বিষাদগ্রস্ত লাগছে সবাইকে। কেননা এখন বধূ বিদায়ের পালা। সাহারা কাঁদছে খুব, একদম নাজেহাল অবস্থা। অনুপমা এমনভাবে কাঁদছে যে মেয়েকে সে কিছুতেই যেতে দিবেনা। অথচ রাশেদ সাহেব জানেন তারা মূলত নূরকে বিদায় করার জন্যই মেয়েকে আগেভাগে বিয়ে দিচ্ছে। সব কিছু নাটক ব্যতীত কিছুই। পুত্রবধূর এমন আজহারি দেখে তার কেমন হাসি পাচ্ছে। অবশ্য নাতনির জন্য কষ্ট লাগছে। এত তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে মেয়েটাকে পর করে দিলো। সাহারার সাথে পাল্লা দিয়ে ওর কাজিন গুলোও ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদছে। ফয়েজের কানে তালা লেগে গেছে। সে ইশারায় ভাই ভাবিকে দিয়ে বাড়ি যাওয়ার তাড়া দিচ্ছে।
কোনমতে গাড়িতে বসতেই ছুটতে ছুটতে হাজির হলো আজমাঈন। জানালা দিয়ে উঁকি দিতেই অবাক চোখে তাকায় ফয়েজ,’এতক্ষণ কোথায় ছিলি?’
হাঁপিয়ে যাওয়ায় কথা বলতে পারছে না আজমাঈন। ও মাথা নাড়ে শুধু, ওর ঝংকার তোলা হাসিতে ফয়েজ কথার খেই হারায়। ছেলেটার অবস্থা বিধ্বস্ত, অতিরিক্ত জার্নিতে যেমন চেহারা হয় ঠিক তেমন চেহারা। বন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করে যে বাড়ির ভেতরে পা বাড়ায়। নূরকে খোঁজে, অবশেষে ওকে না পাওয়াতে অনুভবকে দিয়ে গিফট বক্স পাঠিয়ে দেয়। তবে এবার বিষয়টা রেহানা বেগমের নজরে আসে। তার কাছে নূরকে কেমন অন্যরকম লাগে। আগে তো কখনো বাড়ির কোন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকেনি, তবে সাহারার বিয়ে অন্য কথা। উপস্থিত থাকলেও মেয়ের আচার আচরণে বিশেষ কিছু দেখেছেন। মেয়ে তার কারো থেকে পালাই পালাই করে শুধু। সেই কেউ টা কে? অনুভব কে গিফট দিতে দেখে সেটাও নোটিশ করেছেন।
সিদ্ধান্ত নিলেন নূরের রুমে গিয়ে দেখবেন, গিফটে কি আছে। বাড়ির মেহমান অর্ধেকের বেশি চলে গেছে। এখন গিয়ে দেখবেন যে ছেলেটা কি এমন গিফট দিলো আলাদা করে।
অনুভব কোনমতে গিফটের প্যাকেট টা দিয়ে চলে গেছে। নূর হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গিফটা আজমাঈন দিয়েছে একথাও বলে গেছে অনুভব। নূরের এবার মনে হচ্ছে যে সবকিছু কেমন বেশি বেশি হয়ে যাচ্ছে। রাশেদ সাহেব ব্যতীত অন্য কারো যত্ন হজম হয়না ওর। আজমাঈনের তরফ থেকে দু’টো গিফট পেয়েই হাঁপিয়ে গেছে। আগের আতরের বোতল গুলো আজমাঈনের দেওয়া এটা বুঝতে নূরের সময় লাগেনি। আজ এই প্যাকেটের ভেতর কি আছে কে জানে। সময় নিলো না প্যাকেট খুলতে সে। তবে অবাক করা বিষয় হলো প্যাকেটের ভেতরে থাকা জিনিস পত্রগুলো। এটা সেই শাড়ি যেটা বিয়ের শপিং করতে গিয়ে নূরের পছন্দ হয়েছিল। ডার্ক গ্রিন কালার টা নূরের পছন্দ এবং এ নিয়ে অনুভবের সাথে আলোচনা করেছিল সেদিন। সিল্কের শাড়িটি নজড় কেড়েছিল নূরের। তবে শাড়ি তেমন না পড়ায় সে আনেনি, সাহারা জোর করলেও না।
শরীর কেঁপে উঠলো ওর, প্যাকেটের এক কোণে দুটো তাজা পদ্মফুল পড়ে আছে। আর একটা ছোট্ট চিরকুট। তাতে লেখা স্পেশাল গিফট ফরম আজমাঈন শিকদার।
দরজা খোলার শব্দে ওড়নার নিচে ফুল আর চিরকুট লুকিয়ে ফেলে। রেহানা কে দেখে গলা শুকিয়ে যায়। রেহানা মেয়ের এমন ভয় পাওয়ার কারণ বুঝলো না।পরে চোখ পড়লো খোলা প্যাকেটের দিকে। বলেন, ‘খুলেও ফেলেছো, এতো তাড়া!’
কি বলবে নূর, ভেবে পায়না কিছু। রেহানা ফের বলেন,’ছেলেটা তোমাকে কেন গিফট দিলো? এখানে আরো অনেকে আছে তাদের দিতে পারত। তোমাকে আলাদা করে দিলো কেন? কি চলছে তোমাদের মাঝে?’
নির্দোষ হয়েও এ কোন অজানা দোষ মাথায় নিবে নূর! সে দ্রুত মাথা নাড়ে,’এটা ওই ছেলেটা দেয়নি আম্মু!’
‘আমি তো তাই দেখলাম।’
নূর মাথা নিচু করে বলে,’তখন গেইটের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম, ওরা বলছিল আমাকে আলাদা করে কিছু দিতে। তাই মাম্মামের হাজবেন্ড আলাদা করে পাঠিয়েছে।’
এটা মিথ্যা কথা, যা আজমাঈন অনুভবকে বলে পাঠিয়েছে। আসল ঘটনা হলো ফয়েজ এই ব্যাপারে কিছুই জানে না। এজন্য নূর যে কথাগুলো বললো তা অনুভব বলেছে তাকে। তবে এসব কথা রেহানা বেগম তেমন বিশ্বাস করলো না। সে কড়া গলায় বললো, ‘তুমি যেভাবে বড় হয়েছ তাতে এইভাবে চলাফেরা তোমার সাথে যায় না। আগে তো ঠিকই রুমে দরজা বন্ধ করে বসে থাকতে। কোনভাবেই তোমাকে বাইরে নেওয়া যেত না। এখন ক’দিন ধরে হয়েছে কি? কখনো বিয়ের শপিং এ যাচ্ছ তো বিয়ের গেইট ধরতে যাচ্ছ। ওদিকে তোমার ভাবি সবাইক আঙ্গুল দিয়ে দেখাচ্ছে যে এই তোমার পর্দার নমুনা। কথা তো আমাকেই শুনতে হয়।’
এমন কটুক্তি শুনে মাথা আরো নিচু হয় নূরের। আরো বেশি ভেঙে পড়ে। রেহানা চলে যেতেই দরজা আটকে দেয়। মনমরা হয়ে খাটের উপর বসে কিছুক্ষণ ভাবে। তার এখন কি করা উচিৎ। খানিক বাদে সে ম্যাকবুক টা টেনে কাছে নেয়। কিবোর্ড দ্রুত চাপে, উদ্দেশ্য আজমাঈন কে মেইল করা।
চলবে,,,
Share On:
TAGS: ঈশিতা রহমান সানজিদা, পদ্মপ্রিয়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১০
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৬
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৮
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১৩
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১১
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ২
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৯
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৩
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১৪
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১