পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১৪
ঈশিতারহমানসানজিদা
‘একজন মুসলিম মেয়ে যখন পর্দা করে, নিজেকে হেফাজত করার চেষ্টা করে তখন তাকে সাপোর্ট করা উচিত। যেহেতু আমরা মুসলিম তাই আমাদের উচিত তাকে সম্মান করা। তার পর্দা যাতে ভেঙে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখা। নূর আপু পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, নিয়মিত কোরআন পড়ে। আল্লাহর রাস্তায় নিজেকে সপে দিয়েছে। আমাদের কি তা দেখে কিছু শেখা উচিত নয় কি? সে যখন নিজেকে আড়াল করে রাখতে চায় তখন কোন পুরুষের তাকে জোর করে দেখার অধিকার নেই। এটা মস্ত বড় পাপ। বড়লোক ঘরের মেয়ে হলেই যে চরিত্র খারাপ হয় না বরং অনেকেই নিজেকে সব পুরুষদের থেকে হেফাজতে রাখে তার উদাহরণ নূর আপু। এখন তুমি বলো কি চাও?’
ছোট্ট বোনটার এমন বড়বড় কথায় স্তব্ধ আজমাঈন। সে বুঝলো যে ভুল করছে। ড্রাইভিং লাইসেন্সে নূরের ছবি আছে। সেটা দেখলে নূরের নয় বরং আজমাঈনের বেশি গুনাহ হবে। মেয়েটিকে সম্মান করা উচিত। সে বোনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো,’থ্যাঙ্ক ইউ।’
আইশা হাফ ছাড়লো, যাক ভাই তার বুঝেছে। ওরা বোরকা নিয়ে ফেরার পর আজমাঈন আর সেদিকে এগোয় না। এবার সে নূরের অস্বস্তির মানে বোঝে। সবার থেকে আড়ালে থাকার কারণে হুটহাট করে অন্য পুরুষদের সাথে কথা বলতে পারে না নূর। এজন্য নিজেকে কেমন গুটিয়ে নেয়। এতদিন বাদে আজমাঈন তা উপলব্ধি করতে পারলো। এখন ওর আফসোস হচ্ছে খুব, মেয়েটা ওর আচরণে কেমন ফিল করেছে তা আল্লাহ ভালো জানে।
নিজেকে শুধরে নেওয়ার কথা ভাবলো আজমাঈন। দূর থেকে দেখলো নূরের প্রস্থান। পোশাক বদলে আর অপেক্ষা করে না নূর। তবে অবাক করা বিষয় আজমাঈন নিজেও পরিবার সহ ঢাকায় ফিরে আসে। অথচ আজমাঈন বন্ধুর বিয়েতে থাকতে চেয়েছিল। বিয়ের আগেও বলেছিল যে সবশেষে সে বাড়ি থেকে বের হবে। অথচ বাড়ির কাজের দোহাই দিয়ে আজমাঈন সবার আগে ফিরে যায়। ফয়েজের কথা শোনে না, কাজটা খুব গুরুত্বপূর্ণ এমন ভাব ধরে সে।
তবে ওর বাড়ির কাজ কয়েকদিন আগেই শেষ হয়েছিল এমনকি বিল পে করাও হয়ে গিয়েছে। এখন শুধু বাড়িতে ঢোকার পালা। ভাড়া বাসা ছেড়েও দিয়েছে। মিলাদের আয়োজন করার ইচ্ছা পোষণ করেছেন তাহমিনা। সব আত্মীয়দের দাওয়াত দিয়ে খাওয়াবে। এতে আজমাঈনের কোন রেসপন্স পাওয়া গেল না। সে তার হোটেলের কাজে ব্যস্ত হয়ে গিয়েছে। এবারও কাজটা নূরের হাতে পড়েছে। রাশেদ সাহেব মেয়েকে পাঠাবেন বলে দিয়েছেন। তবে যেহেতু এটা লাক্সারি হোটেলের কাজ তাই নূরকে এসে হয়তো থাকতে হতে পারে। বিশাল বড় হোটেলটির ফার্স্ট ফ্লোরে কমপক্ষে বিশটা রুম হবে। এর ইন্টেরিয়র ডিজাইন করতে সময় তো লাগবেই। মাসখানেক হাতে ধরে রাখতে হবে। ফার্স্ট ফ্লোরের ডিজাইন অনুযায়ী বাকি ফ্লোর গুলো করা হবে। কিন্তু নূরকে তো একা ছেড়ে দেওয়া যায়না। এজন্য রাশেদ সাহেব নিজেও আসবেন, সাথে ফারিন কেও রাখবেন। এতো বড় একটা প্রজেক্ট, ঠিকমতো কাজ করতে হবে। অফিসের আরো দু’জন এমপ্লয়িও থাকবে। আজমাঈন যেহেতু দেরি করতে চাইছে না তাই কাজ তাড়াতাড়ি শুরু করতে হবে। এমনিতেই বছর দুয়েক ধরে বিল্ডিং এর কাজ চলছে তাই আজমাঈন চাচ্ছে তাড়াতাড়ি ওপেনিং করতে।
সাহারা চলে গেছে সপ্তাহ খানেক, বউ ভাতের পরের দিন এসে অবশ্য দু’দিন থেকে গেছে। নারায়ণগঞ্জ শহরে এখন মেঘ মেঘ ভাব তবে বৃষ্টি কম হয়। ঝড় হয়েছিল দু’দিন আগে। সন্ধ্যা হলেই রাস্তাঘাট কেমন গুমট হয়ে আসে। মাঝে মাঝে আবার বৃষ্টি হয়। যদিও এখনও বর্ষাকাল পড়েনি। বৈশাখের মাঝামাঝি চলছে। নূর নিজের কিছু জামাকাপড়, বোরকা, জায়নামাজ, কোরআন গুছিয়ে ব্যাগে ভরছে। রেহানা নারাজ, মেয়েকে কিছুতেই একা ছাড়বেন না। রাশেদ সাহেব সাথে যাবেন এ কথাতেও তিনি সায় দিচ্ছেন না। মাস খানেক বা তার কম সময় লাগতে পারে প্রজেক্ট কমপ্লিট করতে। কিন্তু রেহানার কথা গুলো অযৌক্তিক। রাশেদ সাহেব বিরক্ত হয়ে বলেন,’যা বোঝ না তা নিয়ে কথা বাড়াবে না, ও কি দিনরাত ওখানে পড়ে থাকবে নাকি? যাবে দেখে শুনে প্রজেক্ট কমপ্লিট করবে তারপর বাসায় ফিরবে। প্রতিদিন যাওয়া আসা মিলিয়ে চার ঘণ্টা জার্নি করতে কষ্ট হবে দেখে আমিই বলেছি ওখানের ফ্ল্যাটে যাওয়ার জন্য। মেয়েটা নিজের পায়ে দাঁড়াচ্ছে তাতে যদি উৎসাহ দিতে না পারো তাহলে এভাবে কথাও বলো না। আমি রিকোয়েস্ট করছি।’
রাশেদ সাহেব নিজেও ব্যাগ গোছাচ্ছেন। রেহানা কথা না বলে গজরাতে গজরাতে বাইরে এলেন। অনুপমা সোফায় বসে ছিল। বলা বাহুল্য রেহানার উচ্চস্বরে বলা কথাগুলো কানে এসেছে। সে বলল,’কিছু মনে করবেন না মা, ভালোর জন্য বললে আবার খারাপ ভাবেন কিনা। আমার মেয়ে কিন্তু আপনার মেয়ের মতো না। ও তো বাইরে গিয়ে পড়াশোনা করেছে কত বন্ধুদের সাথে মিশেছে। কখনো বাড়ি ছেড়ে কি এতদিন অন্য কোথাও থেকেছে? সবচেয়ে বড় কথা নূর তো পর্দা করে, যথেষ্ট ধার্মিক। আমার ভাইদের সাথে কথাও বলে না, এখন যে বাইরে কাজের জন্য যাচ্ছে তখন তো এক গাদা পুরুষ মানুষের সাথে কথা বলতে হবে।’
রেহানা কথা বললেন না, এভাবে চললে তো বাইরের মানুষ কটুক্তি করবে। শ্বাশুড়ি কে চুপ থাকতে দেখে অনুপমা বলে,’তার চেয়ে ওকে বিয়ে দিয়ে দিন, আমার ভাবির কোন এক আত্মীয় আছে। ছেলে হাফেজ, আপনার মেয়ের সাথে মানাবে।’
রেহানা এবারও জবাব দেয় না। তবে অনুপমার প্রস্তাব মনে ধরেছে। আজীবন শ্বাশুড়ি বউমা তো ঝগড়া করে কাটিয়ে দিলেন। এখন হুট করেই সেই বউমার কথায় সায় দেওয়া ঠিক হবে না। এখন স্বামীকে কিছু বলা যাবে না। আগে ওরা কাজ শেষ করে ফিরুক তারপর কথা উঠানো যাবে।
বাড়ির বাইরে যাবে, তাও পনের বিশ দিনের জন্য। নূর মা’কে বলে আসতে যাবে বলে মনস্থির করলো। কিন্তু রাশেদ সাহেব বুঝে গেলেন। মেয়ের হাত টেনে ধরে বলেন,’ওর কাছে যাস না, সেই তো বকবক করে কতগুলো কথা শুনিয়ে দিবে। আরো আগেই তোর মায়ের মাথার তার সবকটা ছিঁড়ে গেছে। উল্টাপাল্টা কথা ছাড়া তো কিছু বলতে পারে না।’
নূরের নেকাব তোলা ছিলো। সে চমৎকার হাসলো, বাবা প্রায়ই মায়ের সম্পর্কে এমন কথা বলে থাকেন। মা যখন রেগে থাকেন তখন নূরকে তার কাছে যেতে দেয় না। এজন্য বাবা মেয়ে গাড়ি নিয়ে বের হয়। পথে ফারিনকে তুলে নেয়। বাকি দু’জন অন্য ফ্ল্যাটে চলে গেছে।
নূরের রুমের বারান্দা থেকে আজমাঈনের বিশাল হোটেল প্রাঙ্গণ স্পষ্ট দেখা যায়। সুইমিং পুলের কাজ চলছে তখনও। অনেক মিস্ত্রী কাজ করছে। ভেতরে রং এবং ফার্নিচার এর ডিজাইন গুলো নূর এবং তার সহযোগীরা মিলে সিলেক্ট করবে। নূরকে আলাদা রুম দেওয়া হয়েছে। রাশেদ সাহেব সপ্তাহ খানেক থাকবেন তারপর কয়েকদিন বাসায় থাকবেন। আগে মেয়েকে সব বুঝিয়ে দিবেন। রুমে এসে রেস্ট নিচ্ছেন তিনি। ফারিন ফ্রেশ হয়ে এলো। বললো,’স্যার, আজকেই কি আমরা হোটেল ভিজিট করব? তাহলে কাজটা তাড়াতাড়ি শুরু করতে পারব।’
‘আগে রেস্ট করো তারপর নাহয় যাওয়া যাবে। আমি যাব না বুঝেছ! এতদূর জার্নি করে ভালো লাগছেনা।’
‘আপনি না এলেও হতো স্যার, নূরকে আমিই দেখে রাখতাম।’
রাশেদ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। চোখের চশমা ঠিক করে বলেন,’বেঁচে থাকতে মেয়েটাকে ব্যবসায় পাকাপোক্ত করে যেতে চাই। ওর দিকটা কেউ তো দেখে না। আমি ছাড়া ওর কে আছে বলো? আমাকে ছাড়া দূরে কোথাও যেতে ভয় পায়। আগে ওর এই ভয়টা দূর করতে হবে।’
ফারিন হেঁসে বলে,’ওর জন্য একটা পারফেক্ট জীবন সঙ্গী দরকার। যে ওকে আপনার মতো করে বুঝবে। তাহলে আর কোন সমস্যা হবে না।’
‘তা তো দরকার, তার আগে ব্যবসা টা ওর নামে উইল করে দিতে হবে। এই কাজটা শেষ করে গিয়ে উকিলের সাথে কথা বলতে হবে। তুমি দেখো কেউ যেনো না জানে।’
ফারিন মাথা নাড়ে। মেয়েটা রাশেদ সাহেবের ডান হাত বলতে গেলে। নূরকে ব্যবসা সম্পর্কে সেই বুঝিয়েছে। তবে নূরের ডিজাইন এর জ্ঞান ভালো। এজন্য নূরকে একটু বেশিই পছন্দ করেন। বিকেলে বাকি এমপ্লয়িদের সাথে হোটেলের দিকে গেলো সবাই। রাশেদ সাহেব বাসায় আছেন। প্রাঙ্গণে পা রাখতেই হাওয়া এসে দোলা দিয়ে গেল। হোটেলের পেছনটা ফাঁকা। অনেকটা বিলের মতো, বর্ষাকালে পানি জমবে নিশ্চয়ই। তখন দেখতে আরো ভালো লাগবে। দরজার সামনে বিশাল কৃত্রিম ঝর্ণা, বড় একটা পদ্মফুল তৈরি করা হয়েছে। দেখতে সুন্দর লাগছে, শুধু তাই নয়, পানিতে তাজা পদ্মফুল ভাসছে। নূর একটু চমকে যায়।
একজন লোক এসে ওদের স্বাগত জানায়। বলে,’স্যার এখনও আসেনি, কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবেন। আপনাদের কোন অসুবিধা হয়নি তো আসতে?’
ফারিন বললো,’কোন সমস্যা হয়নি, আমারা ভেতরটা দেখব।’
সবাই জিনিসপত্র ব্যাগে করে নিয়ে এসেছে। একটা পরিপাটি গোছানো রুমে সবকিছু সাজানো হলো। বড় একটা নোটিশ বোর্ড ঝুলানো হয়েছে। মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্ট সেট করা। আগে রিসেপশন ঠিক করতে হবে। নূর ফারিনকে বললো,’যেহেতু বাংলাদেশি হোটেল এবং দেশ বিদেশের লোকজন আসবে এখানে থাকবে। তাদের কাছে আমাদের দেশটা হাইলাইট করার জন্য দেশীয় থিম ব্যবহার করলে বেশি ভালো হবে বলে আমি মনে করি।’
ফারিন মাথা ঝাঁকিয়ে বলে,’বেশ ভালো হবে, তোমার ধারণা শুনি একটু।’
‘রিসেপশন হবে নদীর আদলে তৈরি, অ্যাকুরিয়াম না রেখে সেখানে নদীর বৈচিত্র্য তুলে ধরলে বেটার হবে। রিসেপশনের চারিদিকে পানি থাকবে মাঝখানে থাকবে রিসেপশন। এখানে বেশ জায়গা আছে, এজন্য এই আইডিয়াটাই এলো। পানিতে নৌকা ভাসানো হলেও মন্দ হবে না।’
ফারিন হাসলো,’বুদ্ধিটা সুন্দর, তবে যার হোটেল এ পছন্দ করলেই হলো।’
‘ওনার পছন্দ বেশ, তবে যে টাকা দিয়ে বিল্ডিং তৈরি করেছেন তার চেয়েও দ্বিগুণ টাকা লাগবে ইন্টেরিয়র ডিজাইন করতে।’
‘মানি ডাজেন্ট ম্যাটার, আমি চাই কাজটা সুন্দর হোক। শহরের সবার চোখ ধাঁধিয়ে যাক। শিকদার হোটেলের নাম হোক।’
কন্ঠস্বর টা আজমাঈনের। নূরসহ সবাই পেছনে তাকায়। পকেটে হাত গুজে বুক টান করে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে তার ভেলভেট কালারের স্লিম ফিট ফরমাল শার্ট এবং গ্রে কালারের প্যান্ট। চোখে কালো রঙের সানগ্লাস। দেখে মনে হচ্ছে ক্যাজুয়াল ডেটে এসেছে। সেকেন্ডের ব্যবধানে নূর চোখ নামায়। মনে পড়ে যায় পুরোনো দিনের কথাগুলো। তবে আজমাঈন বেশ স্বাভাবিক, সাথে তার তিন চারজন লোক। তাদের উদ্দেশ্য বললো,’এখানে লাইট ফ্যানের আরো ভালো ব্যবস্থা করুন। ওনাদের যেনো কোন সমস্যা না হয়।’
আজমাঈন ফারিনের দিকে এগোয়,’যা যা দরকার হয় আমাকে জানাবেন।’
‘আমরা কিছু আইডিয়া দিব বিশেষ করে নূর দিবে। আপনি দেখে চুজ করবেন শুধু।’
আজমাঈন না সূচক মাথা নেড়ে বলে,’আমি কিছুই চুজ করব না। আপনাদের স্পেশাল ডিজাইনার যা ঠিক করবে তাই হবে। আমার থেকে তার চয়েজ বেশি সুন্দর।’
কথাটা মুখে বলার পরেও নূরের দিকে তাকায় না আজমাঈন। যেভাবে এসেছিল ঠিক সেভাবেই বাইরে চলে যায়। নূর মাথা নিচু করে ম্যাকবুক অন করে। রুম ঘুরে ঘুরে দেখে রঙ সিলেক্ট করে। ডিজাইনার বুক গুলো সাথে নিয়ে এসেছে। নূর বলে,’হোটেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো লাইটিং। এগুলোর দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। আমি আজ রাতে কয়েকটি ডিজাইন দিব, আপনারাও ঠিক করবেন।’
চারজন মিলে প্রায় ছয় ঘন্টা ধরে রং সিলেক্টের কাজ করলো। কোন ফার্নিচার রাখলে কোন রং টা ফুটবে এ নিয়ে যত আলোচনা। তবে এই ছয় ঘন্টা এনাফ নয়। অনেক রাত পর্যন্ত রুমে বসে বসেই কাজ করলো সে। ছোটখাটো একটা প্রজেক্ট তৈরি করে ফেললো।
অচেনা জায়গা, অচেনা সব মানুষ। তবুও আজ নূরের একটু ভালো লাগছে। বাড়িতে থাকলে রোজ একবার হলেও ভাবির মুখ ঝামটা দেওয়া দেখা লাগে। মায়ের বকা শোনা লাগে। আজ নিজেকে মুক্ত মনে হচ্ছে নূরের। নিজেকে ফুরফুরে লাগছে খুব। এশার নামাজ পড়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। এখান থেকে হোটেলের সুইমিং পুল দেখা যাচ্ছে। পানিতে টইটম্বুর পুলের ভেতরে কয়েকজন লোক লাফালাফি করছে। বিকেলে যখন গিয়েছিল তখন পুল খালি ছিলো। মনে হচ্ছে কিছুক্ষণ আগেই পানি ভর্তি করা হয়েছে। আজমাঈন পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। সবার হাসাহাসি এনজয় করছে সেও। নূর দূর থেকে স্পষ্ট সবকিছু দেখতে পেলো। একজন ইশারায় আজমাঈন কে নামতে বলতেছে আর সে বারবার না করছে।
নূরের খুব লোভ জাগলো এই পুলে নামার। ছোটবেলায় সাঁতার শিখেছিল বটে, এখন কি ভুলে গেছে? তা পরীক্ষা করে নেওয়া যেত। কিন্তু ওইযে মনের বাঁধা, যার কারণে সে একঘরে হয়ে গেছে। ওখানে কেউ না থাকলেও নামতে পারত না সে। তাই ওদের সাঁতার কাটা দেখতে লাগলো। আজমাঈন নিজের স্নিকার জোড়া খুলে নেমে পড়লো। ঝাঁপ দেওয়ায় পানি দুলে উঠলো। সবার সাথে প্রায় আধঘন্টা পানিতে ডুবানোর পর উঠে এলো। তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে হোটেলের মেইন দরজার সামনে এলো। পেছনে তাকাতেই এক বুক স্বপ্নের দেখা পেলো সে। এই হোটেলের স্বপ্ন স্কুল লাইফ থেকে দেখে আসছে আজমাঈন। ফয়েজের সাথে সেও অস্ট্রেলিয়ান আইটি কোম্পানিতে জব করতো। দু’বছর করার পর ছেড়েছে, বেশিদিন হয়নি। সেখান থেকে যা সঞ্চয় করেছে তার সব টাকা ঢেলেছে হোটেলের পেছনে। এছাড়াও বাপের সব পুঁজি এখানেই ব্যয় হয়েছে। ইন্টেরিয়র ডিজাইন করার জন্য আজমল শিকদারের জমি গুলো বিক্রি করে দিয়েছে। সেই টাকায় বাকি সব হবে। চোখ বন্ধ করে নিজের স্বপ্ন কে উড়তে দেয় আজমাঈন। ভীষণ ভালো লাগে ওর।
মাথা নিচু করে হেঁটে হেঁটে সামনে এগোয়, ভেজা শরীরে গাড়িতে বসে। সবকিছু নূর পর্যবেক্ষণ করে, বোঝে যে ছেলেটা অতোটা খারাপ নয়। হয়তো বোঝেনি যে ওর করা কাজে নূরের খারাপ লাগতে পারে। অন্ধকার বারান্দা থেকে ভেতরে আসতে আসতে মেঘের গর্জন কানে ভেসে আসে। কিছুক্ষণ আগেই সবকিছু ঠিকঠাক ছিলো, মুহূর্তেই সবকিছু পাল্টে গেল!! এর মধ্যে কাজ ঠিকঠাক হওয়া মুশকিল। ভেতরের কাজ করা গেলেও বাইরের কাজ করতে ঘাম ছুটবে সকলের।
নূর গুটি গুটি পায়ে রাশেদ সাহেবের রুমে গেল। ফিরতে দেরি হয়েছে বিধায় বাবার সাথে খাওয়া হয়নি। তিনি বই পড়ছেন। নূর জিজ্ঞেস করলো, ‘খেয়েছো?’
হাতের বইটা বন্ধ করে বলেন,’তোকে ফেলেই খেয়ে ফেলেছি আজ, ওষুধ খেতে হবে তো! ফারিন এসেছে?’
‘সে আবার কোথায় গেল?’
‘রাগ করিস না মা, প্রেসারের ওষুধ গুলো আনতে ভুলে গেছি। তুই শুনলে বকাবকি করবি তাই ফারিন গেল। এখন তোর কাছে ধরা পড়ে গেলাম।’
নূর মৃদু রাগ দেখায়,’এখন কেন পাঠালে, আকাশে মেঘ করেছে। বৃষ্টি নামবে বোধহয়।’ কথা শেষ হতে না হতেই চড়চড় শব্দ করে বৃষ্টি পড়তে লাগলো। নূর আঁতকে উঠে বলে,’দেখলে? এখন সে আসবে কিভাবে?’
কিছুক্ষণ বকাঝকা করলো নূর, ভাবলো ফারিন আসলেও আচ্ছা মতো বকা দিবে তাকে না জানানোর জন্য। রাশেদ সাহেব মেয়ের ভয়ে চুপ করে বসে রইলেন। আধঘন্টা বাদে কলিং বেল বাজলো। রাশেদ সাহেব বলেন,’ওইযে এসে গেছে বোধহয়। গিয়ে দেখ।’
মুখে রাগের লাল আভা ফুটিয়ে দ্রুত পায়ে এগোয় নূর। দরজা খোলার আগে বাইরে থাকা ব্যক্তি কে তা চেক করতে বেমালুম ভুলে যায়। ভেবেছে ফারিন এসেছে বুঝি।
আজমাঈনের পরনে এ্যাশ কালারের টিশার্ট এবং কালো রঙের ট্রাউজার। বাসা তার কাছেই, চট করেই চেঞ্জ করে এসেছে। কলিং বেল চেপে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ফোন চাপছে সে। দরজা খুলে গেল নিঃশব্দে, খেয়াল করলো না। চোখ তার ফোনের স্ক্রিনে তখনও। নূরের শরীর দিয়ে বিদ্যুৎ বয়ে গেল যেন, ঝাঁকি দিয়ে উঠলো সে। ভাগ্যিস আজমাঈন এখনো ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে। ঠাস করে দরজা আটকে দিল তৎক্ষণাৎ। মুখে জোরে হাওয়া এসে আছড়ে পড়তেই চোখ তোলে আজমাঈন। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ পেয়েছে সে, তার মানে কেউ দরজা খুলেছিল। সে তো ফারিন কে মেসেজ করে জানিয়েছে সে আসছে। ফারিন ওকে আসতে বলেছে, কেননা সে ফ্ল্যাটে থাকবে বলেছে। তাহলে দরজা বন্ধ করলো কে? নূর? ওর তো দরজা খোলার কথা না।
সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেল তখনই। নূরের ওড়না দরজার চিপায় আটকে আছে। বলা বাহুল্য যে সে অনেক বড় ওড়না পড়ে। মাথায় দুই প্যাঁচ দেওয়ার পরেও মাটিতে গড়াগড়ি খায়। বাতাসে ওড়নাটা কিছুটা বাইরে চলে আসে এবং দরজা আটকানোর কারণে চিপকে যায়। ল্যাভেন্ডার কালারের ওড়না বাতাসে দোল খাচ্ছে। আর বেচারি নূর ভেতরে ওড়না ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
তবে নূর কিন্তু আটকে গেছে, বিষয়টা ভেবে না হেসে পারে না আজমাঈন। মুখ টিপে হেসে পেছনে ঘুরে দাঁড়ায়। যতবার এই মেয়ের থেকে দূরে সরে যাওয়ার পাঁয়তারা করে ভাগ্য ততবার তাদের মুখোমুখি করে। তবে আজমাঈন ভাবে হয়তো কাকতালীয় ব্যাপার। হোটেলের কাজ শেষ হলে আর কাউকে এমন অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়তে হবে না।
চলবে,,,,,
Share On:
TAGS: ঈশিতা রহমান সানজিদা, পদ্মপ্রিয়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১৩
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৫
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১১
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১০
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৭
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১২
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৬
-
পদ্মপ্রিয়া গল্পের লিংক
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৯
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১