Golpo romantic golpo চেকমেট সিজন ২

চেকমেট সিজন ২ পর্ব ২০


চেকমেট_২ ||২০||

সারিকা_হোসাইন


“ঘড়িটা আমায় দিয়ে দাও প্রিয়ন্তী”

“নাহ দেবনা।এটা আমি চয়েস করে কিনেছি।

“তোমার আগে এটা আমি পছন্দ করেছি।

আগ্রাসী হয়ে জবাব দিলো রোদ।রোদের উচ্চ বাচ্যে ঠোঁট উল্টে হাসলো প্রিয়।সে নাটকীয় ভঙ্গিমায় বললো

“কিভাবে পছন্দ করেছো তুমি এই ঘড়ি?কোনো সেলস ম্যান জানে?তুমি ঘড়িটা হাত দিয়ে ধরে দেখেছো ?নাকি পেমেন্ট করেছো?বলো আমায়!

রোদ অবিশ্বাস্য নজরে প্রিয়ন্তীর পানে তাকিয়ে রইলো।মেয়ওতাকে যেন সে চিন্তেই পারছে না অথচ এক সময় তারা আত্মার আত্মা ছিলো।রোদ নিজের বিস্ময় দূরে ঠেলে দাঁত পিষে বললো

“আমি মনে মনে এটা চুজ করেছি এখানে এসেই।

প্রিয়ন্তী কাঁধ উচালো।বললো

“শুনো বোকা মেয়ে,মুখে না বললে মনের কথা পুরোই ভিত্তি হীন।মনের কথা মনেই যদি গোপন রাখো টা কেউ জানবে।এভাবেই আমার মতো কেউ না কেউ এসে নিয়ে যাবে তোমার অতীব পছন্দের বস্তু।মনের কথা মনে না রেখে তা প্রকাশ করবে ঠিক আছে?আসছি।

প্রিয়ন্তী চলে গেলো।রোদ অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে রইলো।কি নিষ্ঠুর দাপটে প্রিয় ছো মেরে নিয়ে গেলো ঘড়ি খানা।অথচ রোদ ভেবেছিলো ঘড়িটা প্রিয় তাকে দিয়ে যাবে।প্রিয়ন্তী চোখের আড়াল হতেই চোখের কোণে জমা জল ঝটপট মুছে রোদ সেলস ম্যান কে জিজ্ঞেস করলো

“এটা আর আছে?

সেলসম্যান মাথা নাড়িয়ে জবাব দিলো

“লাস্ট এডিশন,আর পাবেন না কোথাও।

নিজের চূড়ান্ত পতন মেনে নিয়ে মল ছেড়ে বেরিয়ে এলো রোদ।এরপর তিক্ত বেদনার্ত মন নিয়ে হোটেলে এসে নিজের লাগেজ গুছালো।কোনো মতে রাত টুকু পার হলেই ফিরে যাবে ক্যালিফোর্নিয়া।যেখানে মানসিক শান্তি আর আনন্দ খুঁজতে এসেছিলো সে,সেখানে এসেই যেন আরো সবচেয়ে বেশি ক্ষতবিক্ষত, যন্ত্রনায় কাতর হলো।
পরের দিন সকাল হতেই সকলের থেকে বিদায় নিয়ে রোদ এয়ারপোর্ট চলে এলো।এরপর যাত্রা করলো ক্যালিফোর্নিয়ার উদ্দেশ্যে।


প্রায় বাইশ ঘন্টা জার্নি করে রোদ নিজ বাড়িতে ফিরলো।রোদ যখন ঘরে ফিরলো তখন কেবল ভোর রাত।চুপকথা দরজা খুলে দিয়ে মেয়ের শুকনো মুখায়ব দেখে মনে ভেতরের হুতাশন আঁচ করার চেষ্টা করলেন।মায়ের গভীর দৃষ্টির পরখে রোদ স্মিত হাসলো।এরপর বললো

“খুব কষ্ট নিয়ে ফিরে এলাম মা।বুকের ভেতর জন্ত্রনা গুলো চিৎকার করে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে।কিন্তু আমি তাদের নিংড়াতে পারছি না।আমায় একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরবে?

প্রথম বারের ন্যয় মেয়ের মুখের সাবলীল স্বীকারোক্তিতে চুপকথা স্তব্ধ হয়ে রইলো।রোদ মায়ের শান্ত মূর্তির পানে তাকিয়ে কাতর গলায় আবারো বলে উঠলো

“প্লিজ মা,একটু জড়িয়ে ধরো না!

এবার আর চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না চুপকথা।শক্ত আলিঙ্গনে মেয়েকে জড়িয়ে মাথায় হাত বুলালো।হাতের ইশারায় বুঝলো

“সব ঠিক হয়ে যাবে।

মায়ের বাহুতে গড়িয়ে পরা চোখের জল লুকিয়ে রোদ বললো

“কিচ্ছু ঠিক হবে না মা,কিচ্ছু না।আমি সব শেষ করেছি নিজের হাতে।নিজের দোষে সব হারিয়ে ফেলেছি।অমন হীরে হারিয়ে গেলে কেউ খুঁজে দেয়না মা।সবাই লুফে নিতে চায়।

মনের যন্ত্রনা কিছুটা উগলাতে পেরে রোদের মনে হলো তার বুকের উপর জেঁকে বসা পাথরটা অনেকটাই যেন হালকা হয়ে গেলো।যেই শ্বাস টা কিছুক্ষন আগেও বন্ধ হয়ে আসছিল সেটা এখন স্বাভাবিক।রোদ মনে মনে একবার প্রিয়ন্তীর কথা গুলো আওড়ালো।সত্যিই মানুষ বুকে কথা চেপে রেখে ভালো থাকতে পারে না।মনের ভেতরের খুঁজ কেউ নেয় না।প্রিয়ন্তী যেনো পদে পদে জীবন সম্পর্কে রোদকে ছবক শিখিয়ে গেলো।ইশ যদি রোদ প্রিয়ন্তীর ছায়া তলে সারাটি জনম থাকতে পারতো!তবে বুদ্ধিমতী মেয়েটার থেকে আরো কতো কিছুই না শেখা যেত।

মনে নানাবিধ ভাবনা ভাবতে ভাবতে মায়ের বুকে ছোট শিশুর ন্যায় ঘুমিয়ে গেলো রোদ।চুপকথা মেয়ের ক্লান্ত পরিশ্রান্ত মুখের পানে তাকিয়ে হতাশ করে উঠলেন।মেয়ের ভেতরে কিসের তান্ডব বইছে তা টের পাচ্ছেন তিনি।চুপকথা জানেনা কি করে এই লন্ডভন্ড টাইফুনের ক্ষতি থেকে উত্তরণ করা যাবে।অবশেষে মনে মনে ভাবলো

“যেভাবেই হোক একবার শাহরানের সাথে যোগাযোগ করতে হবে।


পাঁচ বছর পর★★★★★

টিকটিক শব্দে ক্রমাগত বেজে চলেছে বেড সাইড টেবিলের উপর থাকা এলার্ম ঘড়িটা।বিছানায় চোখে মুখে ব্ল্যাংকেট জড়িয়ে গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন রোদ।এলার্মের কর্কশ ধ্বনি তাকে বেশ করে বিরক্ত করছে।সেই বিরক্তি কমাতে ব্ল্যাংকেটের নিচ থেকে হাত বের করে কোনো মতে এলার্ম বন্ধ করে পুনরায় ঘুমের অতলে পাড়ি জমাতে চাইলো।কিন্তু অবচেতন মস্তিষ্ক হঠাতই ধমকে বলে উঠলো

“আজ ম্যাথমেটিক্যাল ফিজিক্স এক্সাম আছে।প্রফেসর লিওন স্মিথ বড্ড খারুষ আর বদ মেজাজি।এক্সামে এটেন্ড না করলেই ঘচঘচ করে নম্বর কাটেন।

মুহূর্তেই রোদের চোখের সমস্ত ঘুম উবে গেলো।সে লাফিয়ে উঠলো ব্ল্যাংকেট এর ভেতর থেকে।এরপর ঝাঁপিয়ে বিছানা থেকে নেমে দৌড়ে ওয়াশরুমে গেলো।ফিরলো তিন মিনিটের মাথায়।গায়ে একটা লুজ শার্ট আর প্যান্ট জড়িয়ে চুল না বেঁধেই খাতা কলম নিয়ে ড্রয়িং রুমে এলো।রুদ্র ব্রেকফাস্ট করছে।পাখির বাসার ন্যয় চুল আর এলোমেলো ড্রেস আপে মেয়েকে দেখে নাক সিটকিয়ে রুদ্র বলে উঠলো

“এভাবে পাগল ছাগল সেজে যাচ্ছ কোথায়?

হাতের ঘড়িটা কোনো মতে কব্জিতে চাপিয়ে রোদ বলে উঠলো

“সিটি আছে।

সিটি আছে অথচ মেয়ে টাইম পার করে ফেলেছে ভেবেই রুদ্রের বিরক্তি কাজ করলো মেয়ের উপর।এমন পাংচুয়াল হীন মানুষ রুদ্রের দুই চক্ষের বিষ।কিন্তু মেয়েকে কোনো কিছু না বলেই রুদ্র খাবার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো।বললো

“চলো তোমায় পৌঁছে দেই।

মেঘ না চাইতে জল পেয়ে রোদের খসখসে ঠোঁটের কোণে খুশির ঝিলিক খেলা করলো।সে মাথা ঝাঁকিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেলো।পিছন পিছন এলো রুদ্র।

তারা বাবা মেয়ে মিলে যখন স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির গেইটে তখন ঘড়িতে আটটা বেজে বাইশ মিনিট।আর তিন মিনিট বাদে এক্সাম।রোদ কোনো মতে গাড়ি থেকে নেমে রুদ্রকে বিদায় জানিয়ে দৌড়ে ক্লাসে গিয়ে বসে হাঁপাতে লাগলো।এমন সময় লিওনা নামের এক মেয়ে এসে রোদ কে বলে উঠলো

“আজ এক্সাম হবে না।প্যারা নিও না।জাস্ট চিল।

এক্সাম হবে না শুনে রোদ নাক ফুলাল।সকালের এত দূর ঝাঁপ সবই যেন বৃথা মনে হলো।জট লাগা পাখির বাসার ন্যয় চুল গুলো একটা পেন্সিলে পেঁচিয়ে খোপা করে বলে উঠলো

“আচানক কি হলো?সূর্য কি আজ অন্য পাশে উঠেছে?যেই লেকচারার ঝড় বৃষ্টি,হ্যারিকেন কিচ্ছু তোয়াক্কা না করে ক্লাস করাতে চলে আসে সে নিবে না এক্সাম!অদ্ভুত না?

লিওনা হেসে ফেললো শব্দ করে।এরপর বললো

“নতুন লেকচারার এসেছে আজ।কাল থেকে উনিই নেবে আমাদের ক্লাস।

রোদ ভারী শ্বাস ফেলে বলে উঠলো

“আবার কোন খবিশের হাতে পড়ি কে জানে?

বলেই উঠে দাঁড়ালো।লিওনা অবাক হয়ে বলল

“সেকি উঠলে যে?কোথায় যাচ্ছ?

রোদ ভাবলেশ হয়ে বলল

“ঘুম কামাই করে দৌড় ঝাঁপ করে ভার্সিটি এলাম এক্সাম দিতে।এক্সাম যখন হবে না তখন থেকে কি লাভ?তারচে বাসায় গিয়ে ঘুমাই,আরাম লাগবে

“নতুন লেকচারার এর ক্লাস করবে না?

রোদ পাত্তা না দিয়ে হেঁটে হেঁটে চলে গেলো ক্লাসের বাইরে।যাওয়ার আগে পিছু ফিরে বলে উঠলো

“পুরো ক্লাস অহেতুক নাম পরিচয়ের বকবক শুনতে ইচ্ছে করছে না আপাতত।

লিওনা গলা উঁচিয়ে বলল

“হি ইজ টু মাচ হট

মধ্যমা আঙ্গুলি দিয়ে নিজের সানগ্লাস চোখে লাগিয়ে রোদ বলে উঠলো

“আই ডোন্ট কেয়ার।


নতুন লেকচারার ক্লাসে এসে কারো পরিচয় নিলো না,এমনকি নিজের পরিচয় পর্যন্ত দিলো না।লিওন স্মিথ শুধু ক্লাসে পৌঁছে বলে গেলো

“তোমাদের নতুন প্রভাষক।

ব্যাস পরিচয় এই টুকুই।

লিওন স্মিথ চলে যেতেই ইয়ং প্রফেসর নিজের শার্টের হাতের বোতাম খুলে কুনুই পর্যন্ত গুটিয়ে নিলো।এরপর চোখের চশমা খানা ঠিক করে বলে উঠলো

“আমার জানামতে আপনাদের আজ ক্লাস টেস্ট রয়েছে রাইট?

সকলেই ভাবলো নতুন প্রভাষক এক্সাম নিবে না।সেই খুশিতে গদগদ হয়ে সবাই বললো

“ইয়েস স্যার।

বাঁকা হাসলো নতুন লেকচারার।বোর্ডে ঘসঘস করে মার্কার দিয়ে মুহূর্তেই লিখে ফেললো কয়েকটি অংকের প্রশ্ন।এরপর বললো

“আ উইল গিভ ইউ থার্টি মিনিটস, ইউর টাইম স্টার্টস নাও”

মুহূর্তেই ক্লাস জুড়ে পিনপতন নীরবতা নেমে এলো।গমগমে ক্লাস রুম সহসাই ফিউনারেল ওকেশনে পরিণত হলো।সকলেই ফাঁকা ঢোক গিলে বোর্ডের পানে হা করে তাকিয়ে রইলো।এমন সময় ভেসে এলো আরেকটু ভয়ানক হুংকার।আঙ্গুল নাড়িয়ে নাড়িয়ে উক্ত প্রফেসর বলে উঠলো

“এনিওয়ান হু স্কোরস বিলো টুয়েন্টি,উইল হ্যাভ টু কন্টিনিউ টেকিং এক্সামস ফর দ্যা নেক্সট থ্রি ডেইজ স্ট্রেইট।

নতুন প্রফেসরের এহেন হুংকারে সকল স্টুডেন্ট এর মেরুদন্ড বেয়ে হীম স্রোত নামলো।মাথার ঘিলুতে যেসব পড়া ছিলো সব কোথায় যেন গায়েব হয়ে গেলো।
অতঃপর শুরু হলো সময়ের গণনা।খাতায় ঘসঘস,মাথা চুলকানো,নখ কামড়ানো ,আর ফিসফাস।

কিন্তু নতুন প্রফেসরের চোখ যেনো গুনে গুনে দশ বারোটা।সমস্ত কিছু তার নজর থেকে এড়াচ্ছে না।যাকে দেখছে ফিসফাস করতে তাকেই দাঁড় করিয়ে খাতা কেঁড়ে নিয়ে লাল কালি দিয়ে ফেইল লিখে দিচ্ছে।এসব দেখে ক্লাসের সবাই শঙ্কিত ভয়ার্ত।

লিওনা আঙ্গুল কামড়ে মনে মনে ভেবে চলেছে শুধু

“তুমি কাল শেষ রোদসী অরোরা।”

চলবে

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply