লেখিকাসুমিচৌধুরী
অসম্ভবরকমভালোবাসি_তোমায় পর্ব ৪৯
পুরো ঘর এলোমেলো করে তাণ্ডব চালাচ্ছে শুভ্র। ডার্কের কড়া নেশায় মাথা ঝিমঝিম করছে। শিরায় শিরায় আগুনের মতো রাগ আর বুকে অসহ্য হাহাকার। কোনো কিছুতেই সে শান্তি পাচ্ছে না। পাগলের মতো হাত পা ছুড়ছে। মাথা একদম কাজ করছে না। ঘামে ভেজা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপালে লেপ্টে আছে। টানা তিন দিন ঘুম নেই। চোখগুলো ফুলে লাল টকটকে হয়ে আছে। মনে হচ্ছে এখনই রক্ত ঝরবে।
হঠাৎ ক্যাবিনেটের পার্সোনাল ড্রয়ারটা সজোরে টেনে খুলতেই একটা চকচকে ছবি ছিটকে সামনে এসে পড়ল। শুভ্র থমকে গেল। কাঁপা কাঁপা অসাড় হাতে ছবিটা ধুলোমাখা মেঝে থেকে তুলে ধরল। চোখের সামনে মুহূর্তে ভেসে উঠল রিদির স্কুল ড্রেস পরা সেই চেনা মুখটা। দুই পাশে লম্বা দুটো বেণি। মুখে সেই পরিচিত নিষ্পাপ মিষ্টি হাসি। এই পিকটা শুভ্রা তুলেছিল শুভ্রের ফোন দিয়ে। তখন ওরা ক্লাস টেনে পড়ে। ওদের এক ফ্রেন্ডের বার্থডে ছিল সেদিন। স্কুলেই ছোটখাটো সেলিব্রেশন হয়েছিল। শুভ্রার তখন নিজের ফোন ছিল না। তাই ও ভাইয়ের ফোনটা নিয়ে গিয়েছিল আর তখনই এই ছবিটা তুলেছিল।
সেদিনের কথা শুভ্রের স্পষ্ট মনে আছে। এই ছবিটা ফোনে দেখার পর সারা রাত ও ঘুমায়নি। শুধু একদৃষ্টে চেয়ে ছিল। পরদিনই ও দোকান থেকে ছবিটা প্রিন্ট করে বের করে নিয়ে এসেছিল। যাতে ফোন ছাড়াও বাস্তবে সব সময় রিদিকে চোখের সামনে দেখতে পারে। আজ এত দিন পর ধুলোমাখা সেই ছবিটা দেখে শুভ্রের মরা ফ্যাকাশে মুখে এক চিলতে বিষাদমাখা হাসি ফুটে উঠল।
কিন্তু সেই হাসি স্থায়ী হলো না। পরক্ষণেই বুকের বাম পাশে তীব্র একটা মোচড় দিয়ে উঠল। যেন কেউ ধারালো ছুরি দিয়ে কলিজাটা এফোঁড় ওফোঁড় করে দিল। শুভ্রের নিশ্বাস আটকে এল। সে কি তাহলে রিদিকে সত্যি সত্যি হারিয়ে ফেলল। তার এত বছরের জমানো পাহাড়সম ভালোবাসা কি এভাবে হেরে গেল। সে কি তার মনোমোহিনীকে পেয়েও পেল না।
এই দুঃসহ চিন্তাটা মাথায় আসতেই শুভ্র ছবিটা বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে মেঝেতে ধপ করে বসে পড়ল। দুই হাতে নিজের মাথার চুল খামচে ধরে জানোয়ারের মতো আর্তনাদ করে উঠল ও।
“না। না। রিদি আমার। ও শুধু আমার।”
শুভ্রের বুকের ভেতরের দহন আর যন্ত্রণা ক্রমেই বাড়ছে। শান্তিতে এক ফোঁটা নিশ্বাস নিতে পারছে না ও। দম বন্ধ হয়ে আসছে। হাতের ছবিটা শিথিল হয়ে মেঝেতে পড়ে গেল। মুহূর্তে রিদির হাসিমুখটা আবছা হয়ে পুরোপুরি শুভ্রের চোখের সামনে ভেসে উঠল। শুভ্র এক পলক সেই শূন্যতায় চেয়ে থেকে সজোরে চোখ বন্ধ করে নিল। এই ছবিটা এই স্মৃতিগুলো এখন ওকে বাঁচার বদলে আরও তিলে তিলে মারছে।
শুভ্র এই তীব্র যন্ত্রণা আর সহ্য করতে পারছে না। ভেতরটা যেন জীবন্ত কয়লার মতো পুড়ছে। সে পাগল হয়ে এদিক ওদিক তাকাতে লাগল। তার শূন্য চোখ দুটো হন্যে হয়ে কিছু একটা খুঁজছে। হঠাৎ তার চোখ গিয়ে আটকে গেল টেবিলের ওপর রাখা একটা বড় কাঁচের বোতলের দিকে। সেখানে স্পষ্ট লেখা আছে ট্রায়াজোলাম। শুভ্র একদম নিজের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে সেই বোতলের দিকে হাত বাড়াল। তারপর টলতে টলতে ওয়াশরুম থেকে পানি নিয়ে এসে পাগলের মতো পাঁচ ছয়টা করে ট্যাবলেট মুখে দিচ্ছে আর গিলছে। তার থামার কোনো নাম নেই। যেন এই বিষগুলো খেলেই বুকের ভেতরের দাউ দাউ করে জ্বলা আগুনটা নিভে যাবে।
খেতে খেতে সে পুরো বোতলটাই শেষ করে ফেলল। খালি বোতলটা হাত থেকে মেঝেতে পড়ে গড়াগড়ি খেতে লাগল। দশ পাতা ট্যাবলেট ছিল ওই এক বোতলে। কিন্তু শুভ্রের আচ্ছন্ন মস্তিষ্কে মনে হচ্ছে সে মাত্র কয়েকটা ট্যাবলেট খেয়েছে। সে আরও খাওয়ার জন্য আশেপাশে পাগলের মতো হাতড়াতে লাগল। কিন্তু আর কিছু পেল না। শরীরটা এবার নিস্তেজ হয়ে আসছে। হাল ছেড়ে দিয়ে সে ধপ করে সোফায় বসে পড়ল।
হাতে তার এখনো রিদির সেই স্কুল ড্রেস পরা ছবিটা ধরা। মাথাটা ভীষণভাবে ঘুরছে। চারদিকের সবকিছু কেমন ঝাপসা হয়ে আসছে। সে রিদির ছবিটার দিকে ঘোলাটে চোখে তাকাল। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটিয়ে মাথাটা সোফায় হেলিয়ে দিল। চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে অবশ হয়ে আসা দুর্বল কণ্ঠে এক বুক হাহাকার নিয়ে কাতর কণ্ঠে গেয়ে উঠল।
“বলো কিভাবে রবো”
“এভাবে”
“আমায় গোছাবে”
“কে দুহাতে”
“ফিরে আসো না”
“আর তো পারি না”
“বাঁচি চলো না”
“আবার এক সাথে”
শুভ্রর শরীরটা এখন আর তার নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই। ট্রায়াজোলামের ওই কড়া বিষগুলো রক্তে মিশে গিয়ে সরাসরি ওর মস্তিষ্কে আঘাত করছে। মাথাটা সোফায় হেলিয়ে দেওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ওর পুরো শরীর পাথরের মতো ভারি হয়ে এল। শুভ্র অনুভব করতে পারছে ওর পায়ের পাতা থেকে শুরু করে বুক পর্যন্ত এক অদ্ভুত শীতলতা বয়ে যাচ্ছে। নিশ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছে ও কিন্তু ফুসফুসটা যেন জমে গেছে। বাতাস টেনে নিতে কলিজায় প্রচণ্ড টান পড়ছে।
হঠাৎ শুভ্রর ভেতরটা এক ভয়াবহ মোচড় দিয়ে উঠল। পাকস্থলী থেকে উথাল পাথাল হয়ে এক দলা বিষাক্ত তরল ওর কণ্ঠনালী বেয়ে ওপরে উঠে আসছে। শুভ্র নিজেকে সামলানোর শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছে। ওর ঠোঁটের কোণ বেয়ে সাদা থকথকে ফেনা গড়িয়ে পড়তে লাগল। সেই সাদা ফেনা ওর চিবুক ভিড়িয়ে গলার দিকে বয়ে যাচ্ছে। ওর মুখটা যন্ত্রণায় কুঁচকে নীলচে বর্ণ ধারণ করছে। অক্সিজেনের অভাবে প্রতিটি কোষ যেন শেষবারের মতো আর্তনাদ করে উঠছে।
ওর হাতের আঙুলগুলো অবশ হয়ে এল। যে ছবিটা ও বুক দিয়ে আগলে রেখেছিল সেই ছবিটা ঘাম আর ধুলোমাখা হাতের মুঠো থেকে পিছলে মেঝেতে পড়ে গেল। শুভ্র ঝাপসা চোখে শেষবারের মতো মেঝের দিকে তাকাল। ছবির সেই হাসিমুখের রিদি যেন ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে। শুভ্রর চোখের পাতাগুলো এখন হাজার মনের ভারি লোহার মতো চেপে বসছে। ও চেঁচাতে চাইল “রিদি” বলে কিন্তু ওর গলা দিয়ে শুধু একটা ঘড়ঘড়ে অস্পষ্ট শব্দ বের হলো।
শুভ্রর শরীরটা সোফা থেকে ধীরে ধীরে গড়িয়ে মেঝের কার্পেটে আছড়ে পড়ল। ওর মাথাটা একপাশে ঝুলে আছে। ঠোঁটের কোণের সেই সাদা ফেনা এখন আরও বেশি ঘন হয়ে বের হচ্ছে। ওর শরীরটা একবার প্রচণ্ডভাবে কেঁপে উঠে নিথর হয়ে গেল। চোখ দুটো আধবোঁজা হয়ে স্থির হয়ে আছে। কোনো পলক নেই কোনো স্পন্দন নেই।
পুরো ঘরে এখন শুধু মৃত্যুশীতল নীরবতা। এক সময়ের অদম্য শুভ্র চৌধুরী আজ নিস্তেজ হয়ে মেঝেতে পড়ে আছে। ওর চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ঘুমের ওষুধের খালি পাতা আর সেই স্কুল জীবনের ছবিটা। যে ভালোবাসার জন্য ও এত দিন হাহাকার করেছে সেই ভালোবাসার যন্ত্রণার অবসান ঘটাতেই যেন সে চিরস্থায়ী অন্ধকারের গভীরে তলিয়ে যাচ্ছে।
রাত গভীর। বাইরে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে ডাক। বাড়ির সবাই একরাশ শোক বুকে নিয়ে কোনোমতে ঘুমানোর চেষ্টা করছে। সাহেরা চৌধুরীর চোখে এক বিন্দু ঘুম নেই। কেমন যেন তার মনটা বারবার কু ডাকছে। তিনি কয়েকবার শুভ্রের রুমের দরজায় আলতো করে নক করেছেন। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ পাননি। ভেবেছেন হয়তো ছেলেটা ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছে।
সেই গভীর রাতে পাগলের মতো বাড়িতে ঢুকল ঈশান। ক্লাব থেকে ফেরার পর তার মনটা একদম ভালো লাগছিল না। বুকের ভেতরটা কেমন জানি ছটফট করছিল। শুভ্রের খবর নেওয়ার জন্য সে ওর নাম্বারে গুনে গুনে ১০০ বার কল দিয়েছে। কিন্তু শুভ্র একটা কলও ধরেনি। সেই দুশ্চিন্তায় ঈশান আর স্থির থাকতে না পেরে সোজা শুভ্রদের বাড়িতে চলে আসল। সে ঝড়ের বেগে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে সরাসরি শুভ্রের রুমের সামনে এসে দাঁড়াল। দরজায় সজোরে ধাক্কা দিয়ে নক করতে করতে সে ডাকল।
“বস শুনতে পাচ্ছেন? আমি ঈশান?”
এভাবে অনেকক্ষণ ডাকল ঈশান। কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়া শব্দ নেই। কোনো পায়ের আওয়াজ নেই। ঈশানের ভীষণ ভয় লাগল। ওর মেরুদণ্ড দিয়ে এক শীতল স্রোত বয়ে গেল। সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে পাগলের মতো দরজায় লাথি বসাতে থাকল। কয়েকটা প্রচণ্ড লাথিতে কাঠের দরজাটা সশব্দে খুলে গেল। আর ভেতরে তাকাতেই ঈশানের চোখ দুটো বড় হয়ে গেল। শরীরের সব রক্ত যেন মুহূর্তেই হিম হয়ে বরফ হয়ে গেল। সে কলিজা ফাটানো এক চি-ৎ-কা-র দিয়ে উঠল।
“বসসসসসসসস।”
ঈশান সরাসরি দৌড়ে গিয়ে শুভ্রকে জাপটে ধরে অস্থির হয়ে চিৎকার করে উঠল।
“বস। বস। এইটা কী করেছেন আপনি? বস চোখ খুলুন। দোহাই লাগে আপনার।”
ঈশান পাগলের মতো চিৎকার শুরু করল। তার সেই গগনবিদারী চিৎকারে বাড়ির সবার কাঁচা ঘুম ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সবাই দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে দৌড়ে শুভ্রের রুমে ছুটে আসল। ঘরের মেঝেতে শুভ্রের ওই নিথর আর ফ্যাকাশে শরীরটা দেখে সাহেরা চৌধুরী রীতিমতো জ্ঞান হারানোর মতো ঢলে পড়লেন। শুভ্রা ওর ভাইয়ের মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে বুক ফাটা চিৎকার করে কান্না শুরু করে দিল। সোহান চৌধুরী দরজায় পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তার তীক্ষ্ণ মস্তিষ্কও যেন কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। এইটা কি সেই একগুঁয়ে গম্ভীর আর দাপুটে তার ছেলে। নাকি অন্য কেউ। সাহেরা চৌধুরী চি-ৎ-কা-র করে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে বলতে লাগলেন।
“ও আল্লাহ আমার ছেলেটারে মেরে ফেলল। ও আল্লাহ আমার ছেলের যদি কিছু হয় তাহলে আমি সোহান চৌধুরীকেও ছাড়বো না।”
ঈশানের নিজের কলিজা কাঁপছে। শুভ্র যে এত বড় একটা কাজ করে ফেলবে তা তারও কল্পনাতে ছিল না। একটা মানুষ কাউকে এতটা জানোয়ারের মতো ভালোবাসতে পারে তা আজ ঈশানের কাছেও অবিশ্বাস্য ঠেকছে। হঠাৎ ঈশানের চোখ গেল মেঝের এক কোণায় যেখানে রিদির ছবিটা পড়ে আছে। ঈশান কাঁপা হাতে ছবিটা তুলে ধরল। রিদির সেই নিষ্পাপ হাসিমাখা মুখটা ভেসে উঠল। সোহান চৌধুরীর চোখেও ছবিটা পড়ল। উপস্থিত সবার চোখেই তখন ওই একটা ছবি। একটা ছেলে একটা মেয়েকে কতটা পাগলের মতো ভালোবাসলে নিজেকে এভাবে বিষ দিয়ে নীল করে দিতে পারে তা আজ তারা নিজের চোখে দেখেও বিশ্বাস করতে পারছে না।
ঈশান আর এক মুহূর্ত দেরি না করে শুভ্রকে পাজাকোলা করে তুলে নিল। শুভ্রের তুলনায় ঈশানের শরীর রোগা পাতলা হলেও এখন যেন তার গায়ে অসুরের শক্তি ভর করেছে। এখন তার কাছে শুভ্রের জীবনটাই পৃথিবীর সবচেয়ে দামী সম্পদ। শুভ্রকে পাজাকোলা করে দৌড়ে গিয়ে গাড়িতে তুলল ঈশান। পাশে সাহেরা চৌধুরী আর শুভ্রা শুভ্রকে শক্ত করে ধরে বসে থাকলেন। সোহান চৌধুরীও কোনোমতে গাড়িতে উঠলেন। তিনি যেন জ্যান্ত এক বরফ খণ্ড হয়ে গেছেন। ঈশান উন্মাদের মতো স্টিয়ারিং চেপে ধরে গাড়ি চালাতে লাগল। রাত গভীর হওয়ায় রাস্তাঘাট একদম জনশূন্য। সাইলেন্সারের তীব্র শব্দে রাতের নিস্তব্ধতা চিরে গাড়িটা হাসপাতালের দিকে ছুটে চলল।
হাসপাতালের ইমারজেন্সিতে পৌঁছাতেই স্ট্রেচার নিয়ে কর্মীরা ছুটে এল। শুভ্রকে যখন স্ট্রেচারে তোলা হচ্ছিল তখন ওর হাতটা ঝুলে পড়ল। মুখটা নীলচে হয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে আর ঠোঁটের কোণ দিয়ে তখনো সেই সাদা ফেনা গড়িয়ে পড়ছে। ডাক্তাররা দ্রুত শুভ্রকে ইমারজেন্সি রুমে নিয়ে গেল। ভেতরে যেতেই ডাক্তার চেঁচিয়ে উঠলেন।
“কুইক। রাইলস টিউব আনো। স্টমাক ওয়াশ করতে হবে। পেশেন্টের পালস খুব লো।”
সাদা অ্যাপ্রন পরা ডাক্তাররা শুভ্রের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। লম্বা একটা মোটা প্লাস্টিক নল শুভ্রের মুখ দিয়ে গলার ভেতর ঢুকিয়ে দেওয়া হলো। অচেতন অবস্থাতেও শুভ্রের শরীরটা যন্ত্রণায় একবার কুঁকড়ে উঠল। নলের এক মাথা দিয়ে বিষাক্ত সাদাটে পানি আর ওষুধের অবশিষ্টাংশ বের হয়ে আসতে লাগল। প্রতিটি মুহূর্তে যেন যমরাজের সাথে শুভ্রের লড়াই চলছে।
হাসপাতালের বাইরের করিডোরে সাহেরা চৌধুরী সোহান চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে চি-ৎ-কা-র করছেন। তার কণ্ঠস্বর কান্নায় বুজে আসছে।
“আমার ছেলের যদি কিছু হয় তবে আমি কিন্তু আপনাকে ছাড়বো না। এখন কি শান্তি পাচ্ছেন আপনি। আপনার ছেলে আপনার কথা রেখেছে। চলে যাচ্ছে সে। এই কি দেখতে চেয়েছিলেন আপনি।”
সোহান চৌধুরী এতক্ষণ নিজেকে কঠোর রাখার চেষ্টা করলেও এখন আর পারলেন না। তিনি দুই হাতে নিজের বুকটা চেপে ধরে দেয়ালের সাথে হেলে পড়লেন। শরীরের সব শক্তি যেন নিমিষেই কর্পূরের মতো উবে গেছে। তিনি একজন বাবা। আর বাবা হয়ে নিজের সন্তানের এই মরণাপন্ন অবস্থা সহ্য করবেন কীভাবে। তিনি তো স্বপ্নেও বুঝতে পারেননি তার এই পাষাণ হৃদয়ের ছেলেটা ভালোবাসার কাছে এতটা নুয়ে পড়বে। এতটা দুর্বল হয়ে যাবে।
ঈশান এগিয়ে গিয়ে সোহান চৌধুরীকে আগলে ধরল। সে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করতে করতে বলল।
“আঙ্কেল প্লিজ প্রেসার নিবেন না আপনি। একটু শান্ত হোন। কিচ্ছু হবে না বসের। বস একদম ঠিক হয়ে যাবে। আপনি শুধু ভরসা রাখুন।”
‘
‘
গল্পের চাকা ঘুরে ২ দিন পার হয়ে গেল। শুভ্রের এখনো জ্ঞান ফেরেনি। ডাক্তাররা জানিয়েছেন শুভ্র ট্যাবলেট খাওয়ার পর প্রায় ২ ঘণ্টা ওই অবস্থায় পড়ে ছিল। যার জন্য ওষুধের প্রতিক্রিয়া রক্তে অনেক গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। শরীরের ভেতরে থাকা সেই বিষক্রিয়া পুরোপুরি পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত জ্ঞান ফিরবে না। তবে ডাক্তাররা আশা দিয়েছেন ২ বা ৩ দিনের মধ্যে পরিস্থিতি বদলাতে পারে। শুভ্রের মুখে এখন অক্সিজেন মাস্ক লাগানো। নিশ্বাস খুব ধীর। মাঝে মাঝে ওর চোখের পাপড়িগুলো খুব হালকা কেঁপে উঠছে। যেন ও এক গভীর অতল অন্ধকার থেকে আলোর দিকে আসার চেষ্টা করছে।
হঠাৎ ঘুমের ঘোরে শুভ্রের মনে হলো তার মাথায় কেউ খুব যত্ন করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। স্পর্শটা এতটাই মায়াবী আর চেনা যে শুভ্র সেটা ভেতর থেকে অনুভব করতে পারছে। কিন্তু ওষুধের সেই তীব্র ঘোরে সে কিছুতেই নিজের চোখ দুটো মেলতে পারছে না। হঠাৎ শুভ্রর কানের কাছে কারো ফুঁপিয়ে কান্নার একটা কোমল মেয়েলি কণ্ঠ ভেসে এল। কেউ একজন তার পাশে বসে অনবরত কেঁদে চলেছে। কান্নার সেই শব্দে যেন এক বুক আকুতি আর যন্ত্রণা মিশে আছে। শুভ্র স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে কেউ একজন ওর হাতটা নিজের দুহাতের তালুতে নিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে আছে। কিন্তু অবশ হয়ে থাকা শরীরের প্রতিটি স্নায়ু যেন ওকে টেনে ধরে রাখছে। ও ছটফট করছে ভেতর থেকে। কিন্তু বাইরে ও এক নিথর দেহ হয়েই পড়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর,,,,
এক ঝটকায় চোখ মেলল শুভ্র। বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করছে। মনে হচ্ছে দম আটকে মরে যাবে। “রিদি” বলে চিৎকার করে ডাক দিতে চাইল সে। কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। কণ্ঠনালীতে যেন এক দলা বিষাক্ত পাথর চেপে বসে আছে। তীব্র এক ব্যথায় শুভ্র কুঁকড়ে গেল। শব্দটা গলার ভেতরেই দমবন্ধ হয়ে আটকে রইল।
শুভ্র দেখল চারদিক অন্ধকার। হঠাৎ কেউ আলো জ্বালিয়ে দিল। চোখের মণি দুটো আলোর তীব্রতায় একটু কুঁচকে এল তার। শুভ্র দেখল সাহেরা চৌধুরী ওর মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন। সাহেরা চৌধুরী দ্রুত এগিয়ে এসে শুভ্রের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিলেন। কান্নামাখা গলায় বললেন।
“বাবা তোর জ্ঞান ফিরেছে। আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহর কাছে হাজার হাজার শুকরিয়া। এখন কেমন লাগছে বাবা। শরীর কি খুব খারাপ লাগছে।”
কিন্তু শুভ্রের মাথায় তখন একটাই চিন্তা এতক্ষণ ওর পাশে কেউ একজন ছিল। সেই মায়াবী হাতের স্পর্শ সেই কান্নার শব্দ সেটা তো কোনো স্বপ্ন ছিল না। ও স্পষ্ট অনুভব করতে পেরেছে রিদি ওর কাছেই ছিল। শুভ্র তার মাকে কিছু বলতে চাইল। হয়তো বলতে চাইছিল “আম্মু রিদি কোথায়? ও কি এসেছিল?” কিন্তু গলা দিয়ে ফিসফিসে একটা শব্দও বের হলো না।
শুভ্রের ছটফটানি দেখে সাহেরা চৌধুরী ঘাবড়ে গিয়ে বললেন।
“বাবা থাম। কথা বলার চেষ্টা করিস না। ডাক্তার জানিয়েছে তোর গলার অবস্থা খুব খারাপ। তুই ২০ থেকে ২৫ দিন আগে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারবি না। কথা বলতে গেলে প্রচুর কষ্ট হবে। আর জোর করে চেষ্টা করলে গলার স্থায়ী ক্ষতি হয়ে যাবে। বাবা একদম কথা বলার চেষ্টা করিস না।”
শুভ্র তবুও থামল না। ও পাগলের মতো ইশারায় বোঝাতে থাকল “আম্মু আমার রিদি কই?” ও হাত পা ছুড়ে বেড থেকে নামার চেষ্টা করতে লাগল। সাহেরা চৌধুরী ওর হাত দুটো চেপে ধরে আবার বললেন।
“বাবা আমার শান্ত হ। অসুস্থ শরীর নিয়ে এমন করিস না। শরীরটা আরও ভেঙে পড়বে। একটু শান্ত হ বাবা।”
কিন্তু শুভ্র কিছুতেই নিজেকে সামলাতে পারছে না। ও বারবার কথা বলার চেষ্টা করছে আর প্রতিবারই গলার ভেতরের সেই ক্ষতগুলোতে যেন কেউ জ্বলন্ত কয়লা ঘষে দিচ্ছে। যন্ত্রণায় আর তীব্র অভিমানে শুভ্রের চোখ দিয়ে টপ টপ করে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে সাহেরা চৌধুরী ডাক্তারকে ডাকলেন।
ডাক্তার এসে শুভ্রকে পরীক্ষা করে শান্ত হতে বললেন। কিন্তু শুভ্র তখন আচ্ছন্ন হয়ে আছে এক ঘোরের মধ্যে। ওর মন বারবার বলছে রিদি আশেপাশে কোথাও আছে। ও ঠিক এসেছিল। ওর গায়ের সেই চেনা ঘ্রাণটা যেন এখনো এই কেবিনের বাতাসে ভাসছে। শুভ্র চোখ দিয়ে সারা ঘর তন্নতন্ন করে খুঁজতে লাগল। যেন দেয়ালের আড়াল থেকে এখনই রিদি বেরিয়ে এসে ওর হাতটা ধরবে।
হঠাৎ দরজার ওপাশ থেকে কারো গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
“পাগলামি থামা শুভ্র।”
সোহান চৌধুরীর গলার আওয়াজ পাওয়া মাত্রই শুভ্র পাথরের মতো স্থির হয়ে গেল। ছটফটানি বন্ধ করে দিয়ে সে বড় বড় চোখে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। সোহান চৌধুরী কয়েক সেকেন্ড শুভ্রের ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে দরজার পেছনে থাকা কারো উদ্দেশ্যে বললেন।
“আয় মা।”
মুহূর্তে দরজার আড়াল থেকে ধীর পায়ে কেবিনে প্রবেশ করল রিদি। মাথাটা নিচু করে আছে সে। পরনে একদম সাদা রঙের একটা সাধারণ থ্রি পিস। রিদিকে দেখামাত্রই শুভ্রের চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে গেল। মাত্র কয়েক দিনেই মেয়েটা যেন শুকিয়ে অর্ধেক হয়ে গেছে। চোখের নিচে কালচে ছোপ সেই চঞ্চল ভাবটা একদম উধাও। রিদি একদম শান্ত পায়ে ভেতরে এসে দাঁড়াল। কিন্তু একবারের জন্যও সে মাথা তুলে শুভ্রের দিকে তাকাল না।
শুভ্র তৃষ্ণার্ত চোখে রিদির দিকে তাকিয়ে রইল। কতক্ষণ যে ও রিদির ওই মায়াবী মুখটার দিকে তাকিয়ে আছে তার কোনো হিসাব নেই। গত কয়েকটা দিন যে অগ্নিকুণ্ডে ও জ্বলছিল। এখন মনে হচ্ছে রিদির এই উপস্থিতিতে সেই অশান্তিগুলো বৃষ্টির মতো ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ তৃষ্ণার পর এক আঁজলা শীতল জল পেলে যেমন লাগে। শুভ্রের এখন ঠিক তেমনই লাগছে।
সোহান চৌধুরী শুভ্রের বেডের পাশে এসে দাঁড়ালেন। ছেলের ওই দিশেহারা চাহনি দেখে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে খুব শান্ত কিন্তু গম্ভীর গলায় বললেন।
“প্রথমত রিদির বিয়ে হয়নি। আর বিয়ে হয়েছে বলে কেন তোকে জানানো হয়েছিল সেসব তুই পুরোপুরি সুস্থ হলেই জানবি। তার আগে তোর বাবা হয়ে একটা কথা বলছি তুই দুনিয়ার সামনে যতই শক্তিশালী বা দাপুটে মানুষ থাকিস না কেন ভালোবাসার কাছে তুই বড্ড বেশি কাঁচা আর দুর্বল।”
শুভ্র এবার ফ্যালফ্যাল চোখে তার বাবার দিকে তাকাল। সোহান চৌধুরী তার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে আবার বললেন।
“মানে বুঝতে পারছিস না? রিদি কোনো মহাকাশ দূরে ছিল না। ও একদম আমাদের বাড়িতেই ছিল। শুভ্রার সাথেই শুভ্রার রুমে। অথচ তুই ঘরের কাছের জায়গায় না খুঁজে অন্ধ হয়ে সারা শহর খুঁজে বেরিয়েছিস। তোর জেদ আর রাগ তোকে এতটাই অন্ধ করে দিয়েছিল যে তুই নিজের ছায়াটাও দেখতে পাসনি।”
রানিং..!
Share On:
TAGS: অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায়, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১৯
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৪১
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৩২
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭৬
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৭
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৩৯
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮৬
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১৬
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭১
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ২৪