অসম্ভবরকমভালোবাসি_তোমায়
লেখিকাসুমিচৌধুরী
পর্ব ৪১
রিদির সেই চেনা কণ্ঠস্বর কানে আসতেই শুভ্র চমকে উঠল। ও মুহূর্তের মধ্যে হাতের সিগারেটটা নিচে ফেলে দিয়ে পায়ের নিচে পিষে দিল। ঈশান ছাড়া বাড়ির আর কেউ জানে না যে শুভ্র সিগারেট খায়। এদিকে রিদি শুভ্রকে এইভাবে অন্ধকারে সিগারেট খেতে দেখে যেন এক নতুন শুভ্রকে আবিষ্কার করল। ও কখনো কল্পনাও করেনি যে শুভ্র সিগারেট খেতে পারে। আজ এই দৃশ্য দেখে ও যেন নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছে না। শুভ্র বড় বড় শ্বাস ফেলে ব্যালকনির গ্রিলটা শক্ত করে খামচে ধরল। ও রিদির দিকে না তাকিয়েই বরফশীতল গলায় বলল।
“আমার এখন কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। গেট আউট।”
শুভ্রর কণ্ঠের সেই হাড়হিম করা সুর শুনে রিদির কলিজা কেঁপে উঠল। শুভ্র যে তার ওপর কতটা চরমভাবে রেগে আছে তার প্রমাণ এখন একদম স্পষ্ট। রিদি তবুও বুক বেঁধে সাহস করে দু-এক পা এগিয়ে গেল। ও খুব করুণ গলায় বলল।
“শুভ্র ভাই বিশ্বাস করুন তখন আমি কীভাবে মারলাম আমি নিজেও জানি না। আমি জাস্ট বুঝতে পারিনি হাতটা কীভাবে উঠে গেল। প্লিজ আপনি আমাকে মাফ করে দেন।”
শুভ্র এবার দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিস করে উঠল। ওর চোয়াল রাগে শক্ত হয়ে আসছে। ও আবারও বলল।
“তুই যাবি এখান থেকে। তোকে এখন আমার জাস্ট সহ্য হচ্ছে না। নতুন করে আর মার খেতে না চাইলে এখনই চলে যা এখান থেকে।”
রিদির বুকের ভেতরটা ভয়ে থরথর করে কাঁপছিল। কিন্তু শুভ্রর এই অবহেলা সহ্য করার চেয়ে ও মার খাওয়াকেই সহজ মনে করল। ও এবার সাহস করে প্রায় কেঁদে ওঠা ভাঙা কণ্ঠে বলল।
“যাবো না। মারতে চান তাহলে মারেন। যদি আমাকে মেরে আপনার বুকের ভেতরের রাগটা একটু কমে তাহলে মেরেই সব মিটিয়ে নিন। কিন্তু দয়া করে এইভাবে মুখ ফিরিয়ে রাগ করে থাকবেন না। আপনার এই চুপ থাকাটা আমি সহ্য করতে পারছি না।”
রিদির প্রতিটি শব্দ শুভ্রর বুকের ক্ষততে যেন নুনের ছিটে দিচ্ছিল। ওর ভেতরটা যেমন কষ্টে দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিল, তেমনই রাগে শরীর রি রি করে উঠছিল। শুভ্র কিছু না বলে নিজের নিচের ঠোঁটটা দাঁতে দাঁত চেপে কামড়ে ধরল। ও আপ্রাণ চেষ্টা করছে নিজের ভেতরের আগ্নেয়গিরিটাকে শান্ত করতে। শুভ্রকে এভাবে পাথরের মতো নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রিদির বুকের ভেতরটা পাথর হয়ে এল। ও খুব আলতো করে শুভ্রর কাঁধে হাত রেখে কান্নামাখা কণ্ঠে বলল।
“কথা বলবেন না? প্লিজ মাফ করে দিন না। আমি তো বলছি আমি নিজেও জানি না আমি কী করেছি। আপনি যখন আমাকে বললেন পরপুরুষের ছোঁয়া পেতে আমার ইচ্ছে করে, তখন আমার কেমন জানি লাগল আর হাতটা উঠে গেল। আচ্ছা শুভ্র ভাই আপনি এমন কেন? এই ভালো তো এই রাগ। আবার কখনো আমাকে কারও পাশে দেখতে পারেন না। এসব কেন করেন? ইউ ডোন্ট ইভেন লাভ মি। যাকে ভালোবাসেন না তার জন্য এমন পাগলামি কেন করেন?”
রিদির শেষ কথাগুলো শুনে শুভ্রর বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। ওর হৃদপিণ্ডের ঠিক মাঝখানটায় যেন কেউ ধারালো ছুরি চালিয়ে দিল। রিদি জানে না ও ঠিক কতটা ভালোবাসে তাকে। কিন্তু পরক্ষণেই শুভ্র নিজেকে শক্ত করে নিল। ওর চোখমুখ আবারও পাথরের মতো কঠিন হয়ে উঠল। হঠাৎ কোনো কথা না বলে ও রিদির হাতটা খপ করে ধরে ফেলল। রিদি কিছু বুঝে ওঠার আগেই ও রিদিকে হিড়হিড় করে টেনে রুমের দরজার বাইরে বের করে দিল। তারপর দরজার এপাশ থেকে চরম আক্ষেপে আর যন্ত্রণায় ফেটে পড়ে বলল।
“জাস্ট লিভ রিদি। তুই আমার সামনে আসিস না। তোকে দেখলে আমি নিজের রাগ কন্ট্রোল করতে পারছি না। আই ফিল লাইক কিলিং ইউ এন্ড দেন কিলিং মাইসেলফ!”
বলেই শুভ্র রিদির মুখের ওপর ঠাস করে দরজাটা লাগিয়ে দিল।দরজার এপাশে রিদি একদম নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ওর চোখ ফেটে টপ টপ করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। বুকের ভেতরটা কেউ যেন ধারালো কোনো অস্ত্র দিয়ে অবিরত কুঁচিকুঁচি করে কাটছে। রিদির মনে হচ্ছে ওর চারপাশের বাতাস ফুরিয়ে আসছে। দম বন্ধ করা এক যন্ত্রণায় নিশ্বাস নিতেও ওর ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। ওদিকে শুভ্র দরজাটা লাগিয়ে দিয়েই ওপাশে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল। দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে ও দুই হাতে নিজের মাথার চুলগুলো পাগলের মতো খামচে ধরল।
কষ্ট হচ্ছে। অসহ্য কষ্ট হচ্ছে ওর। রিদি তাকে মেরেছে,খুব অভিমান হয়েছে তার,রিদি তার কোনো কথা রাখে না,হাজার বার নিষেধ করার পরও ও রাসেলের সাথে কথা বলে। প্রিয় মানুষের দেওয়া আঘাত যে কতটা বিষাক্ত হতে পারে সেটা শুভ্র আজ প্রতিটা নিঃশ্বাসে টের পাচ্ছে। শুভ্র শক্ত সামর্থ্য পুরুষ মানুষ। চাইলেও ও রিদির মতো শব্দ করে ডুকরে কাঁদতে পারছে না। ও নিজের চুলগুলো আরও জোরে মুচড়ে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে মনে মনে বিড়বিড় করে উঠল।
“কেন পাগল বানাচ্ছিস তুই আমাকে? হোয়াই আর ইউ ডুইং দিস টু মি? আমাকে কি তুই রাস্তার পাগল বানানোর কোনো ধান্দা করেছিস? আই অ্যাম জাস্ট গোয়িং ক্রেজি রিদি। আই সোয়ার আমার ইচ্ছে করছে তোকে মেরে আমি নিজেও মরে যাই।”
রিদি কাঁপা হাতে চোখের লোনা জল মুছে অত্যন্ত বিধ্বস্ত অবস্থায় ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে নিজের রুমে চলে এল। ওর বুকের ভেতরটা চিনচিন ব্যথায় বারবার মুচড়ে উঠছে। ও রুমে ঢুকতেই শুভ্রা ওকে দেখে একদম আঁতকে উঠল। শুভ্রা বিছানা ছেড়ে উঠে এসে রিদির দিকে তাকিয়ে উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল।
“কিরে। এত রাতে কোথায় গিয়েছিলি তুই? আর তোর চোখ-মুখ এমন লাল কেন। চোখে পানি কেন রিদি। কি হয়েছে তোর?”
রিদি তড়িঘড়ি করে ওড়নার আঁচলে চোখের নোনা জলটুকু মুছে নিল। নিজেকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করে ও ধরা গলায় বলল।
“কিছু হয়নি রে। হঠাৎ চোখে কিছু একটা পড়েছে হয়তো।”
শুভ্রা ভ্রু কুঁচকে রিদির বিধ্বস্ত চেহারার দিকে তাকাল। ওর এই অজুহাত শুভ্রার কানে একদমই ধোপে টিকল না। ও কিছুটা সন্দিহান গলায় প্রশ্ন করল।
“কিন্তু তোর চোখ দুটো তো জবা ফুলের মতো লাল হয়ে আছে। সত্যি করে বল তো কি হয়েছে? কোনো ঝামেলা হয়েছে কি?”
রিদি এবার একটু বিরক্তির ভান করল যাতে শুভ্রা আর কথা না বাড়ায়। ও শুকনো গলায় বলল।
“আরে তুই শুধু শুধু জেরা করছিস কেন। বললাম তো কিছু হয়নি। এমনি ধুলোবালি লেগে চোখ জ্বালা করছে। আমার ভিষণ ঘুম পাচ্ছে রে। কাল সকালে কথা হবে। গুড নাইট সোনা।”
বলেই রিদি বিছানায় গিয়ে এক কোণে গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ল। শুভ্রাও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুমের লাইটটা অফ করে রিদির পাশে শুয়ে পড়ল। অন্ধকার ঘরে রিদির চোখে এক ফোঁটা ঘুম নেই। ওর বুকের ভেতরটা চিনচিন ব্যথায় বারবার দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে। দীর্ঘক্ষণ মনের সাথে লড়াই করতে করতে এক সময় ক্লান্তিতে ওর চোখের পাতা দুটো লেগে এল।
নিচ্ছিদ্র অন্ধকারে ঘেরা এক ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে রিদি আর শুভ্র। চারপাশটা কেমন হাড়হিম করা নিস্তব্ধ। রিদি ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে শুভ্রর কাছে বারবার ক্ষমা চাইছে। ও মিনতি করে বলছে।
“শুভ্র ভাই আমার ভুল হয়ে গেছে। প্লিজ আমাকে মাফ করে দিন। এভাবে দূরে সরিয়ে রাখবেন না।”
কিন্তু শুভ্র পাথরের মতো হিমশীতল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওর চোখে আজ কোনো মায়া নেই। রিদি মরিয়া হয়ে শুভ্রর হাত দুটো চেপে ধরে বলল।
“কেন এমন করেন আমার সাথে। আমায় একটু ভালোবাসলে কি খুব ক্ষতি হয়ে যায়। তাছাড়া আমাদের তো বিয়ে হয়েছে। আমি আপনার স্ত্রী। একজন স্ত্রীকে ভালোবাসা কি স্বামীর কর্তব্য নয়। তাহলে আপনি কেন বাসেন না আমাকে?”
শুভ্র তাচ্ছিল্যভরা এক নিষ্ঠুর হাসি হাসল। ওর সেই অবজ্ঞার হাসি রিদির বুকটা ফালাফালা করে দিচ্ছে। শুভ্র অত্যন্ত ঘৃণার স্বরে বলল।
“আই ডোন্ট লাভ আ চিপ গার্ল লাইক ইউ। হোয়াটেভার উই হ্যাড… ইটস গন নাউ। ডিভোর্স দেব তোকে আমি। আই জাস্ট হেট ইউ রিদি!”
শুভ্রর এই কথাগুলো শুনে রিদির মনে হলো কেউ ওর মাথায় আস্ত একটা পাহাড় তুলে আছাড় মারল। মনে হলো এক বিষাক্ত ছুরি কেউ ওর বুকের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে বারবার মোচড়াচ্ছে। অসহ্য যন্ত্রণায় রিদি গগনবিদারী এক চিৎকার করে উঠল।
“নাহহহহহহহহহহ!”
এক চিৎকারে রিদি বিছানায় ধড়ফড় করে উঠে বসল। ওর শরীর থরথর করে কাঁপছে। কপাল বেয়ে শীতল ঘাম ঝরছে। বুকটা ধুকপুক করে পাগলের মতো ওঠানামা করছে। রিদি অন্ধকার ঘরে চারপাশ তাকিয়ে দেখল সব নিস্তব্ধ। সে রুমে এবং বিছানায়৷ কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল ওর বুঝতে যে এতক্ষণ ও স্রেফ এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন দেখছিল। রিদির সেই বীভৎস চিৎকার শুনে শুভ্রার ঘুম ভেঙে গেল। সে আতঙ্কে ধড়ফড় করে উঠে বসে ধরা গলায় বলল।
“কি হয়েছে রিদি। এভাবে চিৎকার দিলি কেন তুই? কোনো খারাপ স্বপ্ন দেখেছিস?”
রিদি নিজেকে দ্রুত স্বাভাবিক করে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করল। ও কাঁপা গলায় উত্তর দিল।
“ওই- না আসলে। হ্যাঁ ভিষণ ভয় পেয়েছি একটা বাজে স্বপ্ন দেখে।”
চারদিকে তখন ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। শুভ্রা রিদির অবস্থা দেখে বিছানা থেকে নেমে রুমের লাইটটা অন করল। ও টেবিল থেকে পানির জগ নিয়ে এক গ্লাস পানি ভরে রিদির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল।
“নে। এক নিশ্বাসে সবটুকু খেয়ে ফেল। তারপর বড় বড় করে শ্বাস নে দেখবি ভয় একদম চলে যাবে।”
রিদি গ্লাসটা হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে সবটুকু পানি খেয়ে নিল এবং লম্বা লম্বা কয়েকটা শ্বাস ফেলল। শুভ্রা ওর পিঠে হাত রেখে নরম গলায় জিজ্ঞেস করল।
“এখন কেমন লাগছে?”
রিদি মাথা নেড়ে আলতো করে বলল।
“হুম। এখন একটু ভালো লাগছে।”
বলেই রিদি বিছানা থেকে উঠে পড়ল। ও আর শুয়ে থাকতে চাইল না। সোজা ওয়াশরুমে গিয়ে ওযু করে নিল। শুভ্রাও উঠে গিয়ে ওযু করে আসলো। দুই বান্ধবী মিলে অত্যন্ত শান্ত মনে ফজরের নামাজ আদায় করল। নামাজ শেষে তারা কিছুক্ষণ কোরআন তেলাওয়াত করল। এতে রিদির অস্থির মনটা কিছুটা হলেও শান্ত হলো। শুভ্রার চোখে তখনো রাজ্যের ঘুম লেগে আছে। তাই সে তেলাওয়াত শেষ করে আবার বিছানায় গা এলিয়ে দিল। কিন্তু রিদির চোখে এক ফোঁটা ঘুম নেই। ওর দম বন্ধ লাগছে। মনটা একটু হালকা করার জন্য ও ধীর পায়ে ছাদের দিকে রওনা হলো।
ছাদে পা রাখতেই রিদি একদম পাথরের মতো থমকে গেল। ওর বুকের ভেতরটা হঠাৎ প্রচণ্ড জোরে ধক করে উঠল। ছাদের একদম কিনারের দিকে শুভ্র বুক ডাউন দিচ্ছে। ওর পরনে কোনো শার্ট নেই। শুধু একটা শর্ট প্যান্ট। ভোরের আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে শুভ্রর পিঠের পেশি আর হাতের রগগুলো নীল হয়ে ফুলে উঠেছে। ঘামে ওর সারা পিঠ চিকচিক করছে। শুভ্র যেন নিজের ভেতরের সবটুকু রাগ আর যন্ত্রণা শরীরচর্চার মাধ্যমে উগড়ে দিতে চাইছে। ভোরের ওই শীতল হাওয়ায় শুভ্রর ঘামাক্ত শরীরের তেজ রিদির নজর কাড়ল। ও এক মুহূর্তের জন্য নড়াচড়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলল।
রিদির মাথায় হুট করে সেই দুঃস্বপ্নের কথাগুলো বাজতে লাগল। মুহূর্তেই আতঙ্কে ওর বুকটা দুরুদুরু করে কাঁপতে শুরু করল। স্বপ্নটা ও একদম ফজরের আজানের সময় দেখেছে। লোকে বলে ফজরের আজানের সময় দেখা স্বপ্ন নাকি বৃথা যায় না। কখনো কখনো তা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তব হয়ে যায়। তাহলে কি ওর কপালে ওই সর্বনাশা বিচ্ছেদই লেখা আছে। সত্যি কি শুভ্র ওকে ডিভোর্স দিয়ে চিরতরে পর করে দেবে। ভাবতেই রিদির বুকটা পাথরের মতো ভারী হয়ে এল। নিশ্বাস নিতেও দমবন্ধ করা এক কষ্ট হচ্ছে ওর। রিদির এই গভীর ভাবনার মাঝেই হঠাৎ কেউ ওর চোখের সামনে সজোরে তুড়ি বাজাল। রিদি চমকে উঠে তাকিয়ে দেখে শুভ্রা দাঁড়িয়ে আছে। শুভ্রা কিছুটা অবাক হয়ে বলল।
“কিরে। কোন রাজ্যে হারিয়ে গিয়েছিলি। কখন থেকে ডাকছি তোকে। কোনো সাড়া নেই কেন?”
রিদি যতটা সম্ভব নিজের কম্পিত কণ্ঠস্বর আর অস্থিরতা লুকিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বলল।
“ওহ তুই। সরি খেয়াল করিনি।”
বলেই রিদি ছাদের দিকে চোখ দিল। দেখল শুভ্র ঠিক এই দিক দিয়েই ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে। শুভ্রর সারা শরীর ঘামে চপচপ করছে। চোখগুলো লালচে আর ফোলা ফোলা। ঘামে ভেজা অবাধ্য চুলের গোছাগুলো কপালের ওপর লেপ্টে আছে। ওর শরীর থেকে যেন আগুনের হলকা বের হচ্ছে। শুভ্রকে দেখেই শুভ্রা হাসিমুখে বলে উঠল।
“ভাইয়া। শুভ সকাল। তুমি তো একদম ভিজে গেছ।”
শুভ্র একদম রিদির পাশ কাটিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে শীতল আর কর্কশ গলায় উত্তর দিল।
“ব্যায়াম করলে শরীর ঘামবেই। জানিস না ইডিয়ট?”
শুভ্র নামার সময় একবারের জন্যও রিদির দিকে চোখ তুলল না। ওর গায়ের তপ্ত ঘামের তীব্র ঘ্রাণ রিদির নাকে আছড়ে পড়ল। শুভ্রর ওই পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার সময়কার উপেক্ষা রিদির বুকের ক্ষতটাকে যেন আরও গভীর করে দিল। ওর মনের ভেতর তখন একটা প্রলয়ঙ্কারী ঝড় বয়ে যাচ্ছে। ওই স্বপ্নের রেশ আর শুভ্রর এই পাথরের মতো শীতল এড়িয়ে চলা ওকে যেন ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
সকালবেলা খাবারের টেবিলে এক গুমোট নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। সবাই যার যার মতো চুপচাপ খাবার খাচ্ছে। শুভ্রর মাঝে কোনো ভাবান্তর নেই। ও অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে নিজের খাবার খেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু রিদির অবস্থা একদমই ভিন্ন। ওর গলা দিয়ে এক দলা খাবারও নামছে না। ও বারবার আড়চোখে শুভ্রর দিকে তাকাচ্ছে। একটু মায়া কিংবা সামান্য একটু দৃষ্টির বিনিময় চাইছে ও। কিন্তু শুভ্র পাথরের মতো অটল। ও একবারের জন্যও রিদির দিকে চোখ তুলছে না। যেন রিদি সেখানে উপস্থিতই নেই। শুভ্রর এই নির্লিপ্ত আর অচেনা রূপ রিদি কিছুতেই মানতে পারছে না। ও ভেতর থেকে একদম শেষ হয়ে যাচ্ছে।
হঠাৎ খাওয়ার মাঝখানে শুভ্র প্লেট থেকে মাথা না তুলেই সোহান চৌধুরীর উদ্দেশ্যে বলল।
“আব্বু। কিছু কথা ছিল?”
সোহান চৌধুরী খেতে খেতে স্বাভাবিক গলায় বললেন।
“হ্যাঁ বল। কি বলবি?”
শুভ্র খুব নিস্পৃহভাবে জানাল।
“অফিসের একটা ডিলের জন্য আমাকে কাল ছয়টার ফ্লাইটে বাইরে যেতে হবে?”
কথাটা শোনা মাত্রই রিদির হাত প্লেটের ওপর থেমে গেল। বুকের ভেতরটা হঠাৎ প্রচণ্ড জোরে ধক করে উঠল। মনে হলো কোনো এক ভয়াবহ খবর কেউ ওর কানে ঢেলে দিয়ে গেল। সোহান চৌধুরী কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
“লোকেশন কোথায়?”
শুভ্র নির্লিপ্ত মুখে জবাব দিল।
“কুয়েত?”
সোহান চৌধুরী আবার প্রশ্ন করলেন।
“কত দিনের জন্য?”
শুভ্র এবারও কোনো আবেগ ছাড়াই বলল।
“সেটা বলতে পারব না। তবে আমার ফিরতে দেরি হবে।”
সোহান চৌধুরী খাওয়া থামিয়ে কিছুটা অবাক হয়ে বললেন।
“ফিরতে দেরি হবে মানে কী বলতে চাইছিস তুই?”
শুভ্র চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ওর চেহারায় এক ধরনের ক্লান্ত নির্লিপ্ততা। ও খুব নিচু কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল।
“আমি কিছুদিন একা থাকতে চাই।”
বলেই শুভ্র বাকি অর্ধেক খাবার পাতে ফেলে রেখে হাত ধুয়ে টেবিল থেকে উঠে চলে গেল। মুহূর্তের মধ্যে ডাইনিং টেবিলটা এক থমথমে নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল। রিদির মনে হচ্ছে শুভ্র তাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে আর কখনো ফিরবে না। শুভ্র যে তার ওপর অভিমান আর রাগ করেই দেশের বাইরে গিয়ে একা থাকতে চাইছে এটা এখন ওর কাছে একদম স্পষ্ট।
শুভ্রর এই অসহ্য আচরণ রিদি আর নিতে পারছে না। ওর বুকের ভেতরটা যেন কেউ জ্যান্ত ছিঁড়ে ফেলছে। বিষম কষ্টে ওর দম বন্ধ হয়ে আসছে, ভীষণ কান্না পাচ্ছে ওর। সবার সামনে এই কান্নার বেগ আটকে রাখাটা রিদির কাছে এখন জীবনের সবচেয়ে বড় লড়াই বলে মনে হচ্ছে। ও নিচু হয়ে প্লেটের দিকে তাকিয়ে রইল, যাতে কেউ ওর চোখের টলমল জলটুকু দেখতে না পায়। প্রতিটি সেকেন্ড যেন ওর কাছে এক একটা যুগের মতো দীর্ঘ মনে হতে লাগল।
রানিং…!
রানিং…!
Share On:
TAGS: অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায়, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬৩
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১৮
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১৬
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১২
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮০
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৩৮ (সারপ্রাইজ শুভ নববর্ষ)
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ২৫
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১১
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ২৯
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭৫