Golpo romantic golpo বাঁধন রূপের অধিকারী

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৫


#বাঁধন_রূপের_অধিকারী

#লেখিকা_সুমি_চৌধুরী

#পর্ব ৫

রূপা বাড়িতে পা রাখতেই রজনী রহমান তার কাদা মাখা ভূতুরে দশা দেখে কপালে হাত দিয়ে চিৎকার করে উঠলেন।

“এই দশা কেন তোর?”

রূপা চোরের মতো মুখ করে আমতা আমতা করে বলল।

“ওই মা ভুল করে পড়ে গিয়েছিলাম।”

“পড়ে গিয়েছিস মানে? তোর কি চোখ দুটো নেই? দেখে চলতে পারিস না?”

রজনী রহমানের কণ্ঠের ঝাঁজ যেন বেড়েই চলল। রূপা অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। সে ভালো করেই জানত বৃষ্টির দিনে এই কাদা মাখার মাশুল তাকে বকুনি দিয়েই দিতে হবে। ঠিক তখনই আহসান রহমান দোতলা থেকে নিচে নামলেন। রূপাকে ওভাবে কুঁকড়ে থাকতে দেখে তিনি রজনীর উদ্দেশ্যে মোলায়েম সুরে বললেন।

“আহ! ওকে বকছো কেন? কলেজ থেকে আসতে না আসতেই শুরু করে দিলে।”

“তো কী করব? দেখেন না বৃষ্টিতে ভিজে কী জঘন্য অবস্থা করেছে নিজের। আবার জ্বর আসলে আমার হবে মরণ।” রজনী রহমান গজগজ করতে করতে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন।

আহসান রহমান রূপার মাথায় হাত রেখে বললেন। “যাও মা ঘরে গিয়ে ঝটপট গোসল করে নাও। নাহলে কিন্তু শরীর খারাপ করবে।”

রূপা দ্রুত নিজের রুমে পালিয়ে এল। শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়েও তার মাথা থেকে সেই মায়াবী চোখ জোড়া সরছে না। গোসল সেরে ভেজা ড্রেসটা ব্যালকনিতে শুকাতে দিয়ে সে অবসন্ন শরীরে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। কিন্তু চোখ বন্ধ করতেই সেই রাস্তার ধারের পুরুষের বিধ্বংসী চাহনি তার চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠল। রূপা ধড়ফড় করে চোখ মেলে তাকাল। কী হচ্ছে এসব তার সাথে। কেন ওই ‘ভূত’ পুরুষের মায়াবী চাহনি তাকে তাড়া করে ফিরছে। সে নিজেকে শান্ত করে পুনরায় চোখ বন্ধ করল। কিন্তু বারবার ওই স্লিট করা ভ্রু আর নেশাতুর গভীর চোখ জোড়া তাকে সম্মোহিত করতে লাগল। রূপার ভেতরে এক অদ্ভুত ছটফটানি শুরু হলো। মনে হলো ওই চোখ জোড়া তার শিরায় শিরায় কোনো এক বিষাক্ত নেশা ধরিয়ে দিয়েছে। মুহূর্তেই তার সারা শরীর জ্বরে উত্তপ্ত হয়ে উঠল। সে অসংলগ্নভাবে বিড়বিড় করতে লাগল।

“ওই পুরুষটা খুব ভয়ংকর… ওই চোখ জোড়া বড় ভয়ংকর…”

এদিকে বাঁধন এসেছে শুনে খুশিতে প্রায় নাচতে নাচতে শান্তা তার রুমে ঢুকল। বাঁধন তখন বিছানায় আধশোয়া হয়ে ফোনে স্ক্রল করছিল। শান্তা দরজায় দাঁড়িয়ে আহ্লাদী গলায় ডাকল।

“বাঁধন ভাইয়া! কেমন আছেন?”

অচেনা এক মেয়েলি কণ্ঠস্বর শুনে বাঁধন ফোন থেকে চোখ সরিয়ে সামনে তাকাল। শান্তাকে চিনতে পেরে সে নির্লিপ্ত গলায় শুধাল।

“তুই শান্তা না?”

কিন্তু শান্তা তখন উত্তর দিতে ভুলে গেছে। তার সামনে ৬ ফুট ৩ ইঞ্চির এক জ্যান্ত গ্রিক দেবতা বসে আছে। জিম করা সেই সুঠাম দেহ আর পৌরুষদীপ্ত গাম্ভীর্য দেখে সে যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে। সে অপলক দৃষ্টিতে বাঁধনের দিকে তাকিয়ে রইল।

বাঁধন বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকাল। তার সেই স্লিট করা ভ্রু জোড়া কুঁচকে যাওয়ায় তাকে আরও ভয়ংকর সুন্দর দেখাল। সে অত্যন্ত কর্কশ আর গম্ভীর গলায় ধমক দিয়ে উঠল।

“চোখ নামা!”

শান্তা চমকে উঠে অবিশ্বাসের স্বরে বিড়বিড় করল।

“আপনি কি সত্যিই আমার চাচাতো ভাই?”

বাঁধনের মেজাজটা এবার বিগড়ে গেল। সে বিছানা থেকে নেমে টাওয়ালটা কাঁধে নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল। যাওয়ার সময় তাচ্ছিল্যের সাথে ছুড়ে দিল।

“তোর বাপ-ভাইকে গিয়ে জিজ্ঞেস কর আমি কে?”

শান্তা ঝড়ের বেগে দৌড়ে রূপার রুমে ঢুকল। সেখানে তখন রজনী রহমান রূপার কপালে ভেজা জলপট্টি দিচ্ছেন আর বিরতিহীনভাবে বকে চলেছেন। রূপার এই অবস্থা দেখে শান্তা অবাক হয়ে শুধাল।

“কী হয়েছে চাচি? ওর মাথায় পানি দিচ্ছ কেন?”

রজনী রহমান ক্ষোভ উগরে দিয়ে বললেন।

“সাধে কি আর দিচ্ছি। আবার জ্বর বাধিয়ে বসে আছে। কতবার বলেছি বৃষ্টিতে ভিজবি না কিন্তু আমার কথা কি ওর কানে যায়। আমি যখন মরে যাব তখন বুঝবে।”

রজনী রহমানের প্রতিটি শব্দে রূপার ওপর জমে থাকা রাগ স্পষ্ট ফুটে উঠছিল। রূপা তখনো চোখ বন্ধ করে পড়ে আছে। জ্বরে শরীর পুড়লেও তার মস্তিষ্কে কেবল সেই রাস্তার মোড়ে দেখা দেওয়া পুরুষটির রাজকীয় অবয়ব আর স্লিট করা ভ্রুর নিচে থাকা মায়াবী চোখ জোড়া ঘুরপাক খাচ্ছে। সে বারবার মাথা ঝাড়া দিয়ে সেই চিন্তা ঝেড়ে ফেলতে চাইছে কিন্তু এক অমোঘ আকর্ষণে বারবার সেই দৃশ্যই ফিরে আসছে। রজনী রহমান জলপট্টি দিয়ে কিছুক্ষণ পর গজগজ করতে করতে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। শান্তা এতক্ষণ পাশে চুপচাপ বসে ছিল। এবার সুযোগ পেয়ে রূপার গা ঘেঁষে বসল। রূপা উঠে আধশোয়া হতেই শান্তা উত্তেজনায় ফেটে পড়ল।

“রূপা! জানিস কী হয়েছে?”

রূপা জ্বরের ঘোরেই ভাঙা গলায় জিজ্ঞেস করল।

“কী হয়েছে?”

“আমি না একটু আগে বাঁধন ভাইয়ার সাথে দেখা করে আসলাম। ওহ খোদা কী হ্যান্ডসাম বিশ্বাস করবি না। আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছি না যে আমার চাচাতো ভাই এতটা সুন্দর হতে পারে। আমি তো এক দেখাতেই পুরো ক্রাশ খেয়ে গেছি রে।”

শান্তার মুখে ‘বাঁধন ভাইয়া’র কথা শুনে রূপার চোখ জোড়া বড় বড় হয়ে গেল। সকালে শুনেছিল তার বড় ভাই আসবে কিন্তু ওই দুর্ঘটনার পর জ্বরের তোড়ে সব ভুলে গিয়েছিল সে। সে কাঁপা কাঁপা শরীরে বিছানা থেকে নামতে গেলে শান্তা হাত ধরে থামাল।

“কোথায় যাচ্ছিস?”

“ভাইয়ার সাথে দেখা করতে। উফ আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম যে আজ বাঁধন ভাইয়া আসবে।”

“চল আমিও যাব।” শান্তাও তাল মেলালো।

রূপা আর শান্তা পা টিপে টিপে বাঁধনের রুমের দিকে এগোতে লাগল। কিন্তু রুম থেকে বের হতেই যমদূতের মতো সামনে পড়লেন রজনী রহমান। রূপাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি অগ্নিশর্মা হয়ে বললেন।

“কোথায় যাস? এই অবস্থায় তোকে না বলে গেলাম এক চুলও নড়বি না?”

রূপা মিনমিন করে বলল।

“আম্মু বাঁধন ভাই এসেছে আর আমি এখন পর্যন্ত একটা কথাও বলতে পারলাম না। উনাকে তো আমি কখনো দেখিনি তাই একটু কথা বলতে যাচ্ছি।”

রজনী রহমান চোখ রাঙিয়ে গর্জে উঠলেন।

“রুমে যা এখনই। যা বলছি।”

রূপা ভীষণ অবাক হয়ে বলল।

“এমন করছ কেন মা? ভাইয়ার সাথেই তো দেখা করব।”

“আমি না করেছি না। রুমে যা বলছি।”

রজনী রহমানের কণ্ঠে এক অদ্ভুত কঠোরতা। রূপা আবারও কিছু বলতে চাইলে রজনী রহমান আর সহ্য করলেন না। তিনি হেঁচকা টানে রূপাকে রুমে ঢুকিয়ে দিয়ে বাইরে থেকে সশব্দে দরজা আটকে দিলেন। রূপা স্তব্ধ হয়ে দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে রইল। তার মা কেন এমন অস্বাভাবিক আচরণ করল সেটা সে বুঝতে পারল না। পরে ভাবল হয়তো তার শরীর খুব খারাপ বলেই মা এমন কড়াকড়ি করছেন। একটু সুস্থ হলে নিশ্চয়ই দেখা করতে দেবেন।

রাতের বেলা ডাইনিং টেবিলে নেমে এল বাঁধন। পরনে অ্যাশ রঙের টি-শার্ট আর ছাই রঙের ট্রাউজার। চুলগুলো অবিন্যস্ত আর প্রচণ্ড ঘুমের কারণে চোখ দুটো একটু ফুলে ভারী হয়ে আছে। সে কারো দিকে না তাকিয়েই চুপচাপ নিজের জায়গায় বসে পড়ল। ডাইনিং টেবিলে পরিবারের সবাই উপস্থিত হলো কেবল রূপা ছাড়া। শান্তা নিজের সব লজ্জা বিসর্জন দিয়ে নির্লজ্জের মতো বাঁধনের দিকে তাকিয়ে আছে যেন এই সুপুরুষকে দেখাটাই তার জীবনের একমাত্র কাজ। কিন্তু বাঁধন সেদিকে ভ্রুক্ষেপও করল না। সম্পূর্ণ নীরব থেকে সে খাওয়া শুরু করল। খাওয়ার মাঝপথে আতিক রহমান বাঁধনের দিকে তাকিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করলেন।

“বাবা বাঁধন তুই তোর বাবার সাথে কথা বলিস না কেন?”

বাঁধন কোনো উত্তর দিল না। সে যেমন নীরব ছিল তেমনই নিস্পৃহ থেকে খেতে লাগল। আতিক রহমান কিছুটা ক্ষুব্ধ হয়ে পুনরায় বললেন।

“বড়রা কিছু জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিতে হয় এইটা কি তুই শিখিস নাই?”

বাঁধন এবার খাওয়া থামাল না তবে মাথা নিচু রেখেই অত্যন্ত ঠান্ডা আর ধারালো গলায় বলল।

“আমি এতিম। চৌদ্দ বছর আগে মা হারানোর সাথে সাথে আমার বাবাও হারিয়ে গেছে। তাই আশেপাশে আমার কোনো বাবা আছে বলে আমি মনে করি না।”

বাঁধনের এই তপ্ত বাক্য শুনে আতিক রহমান পুনরায় কিছু বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু আহসান রহমান হাতের ইশারায় তাঁকে থামিয়ে দিলেন। আহসান রহমান এবার সরাসরি বাঁধনের চোখের দিকে তাকিয়ে ব্যথিত অথচ শক্ত গলায় বললেন।

“আমি জানতাম তুই রাগী কিন্তু তুই যে এতটা অভিমানী আর ইগো নিয়ে চলিস তা আমার জানা ছিল না। এত রাগ তোর বাবার ওপর। বাবার অপরাধ কী সে শুধু আরেকটা বিয়ে করেছে এটাই। কিন্তু রজনী কি তোর সাথে কখনো খারাপ ব্যবহার করেছে যে তুই তাকে পর ভাবিস। রজনীর মাঝে কি তুই কখনো সৎ মায়ের কোনো আচরণ পেয়েছিস?”

কথাটা শেষ হতেই বাঁধনের হাতের আঙুলগুলো প্লেটের ওপর স্থির হয়ে গেল। সে কোনো উত্তর দিল না কোনো তর্কেও জড়াল না। সশব্দে চেয়ার ঠেলে উঠে গিয়ে হাত ধুয়ে কারো দিকে না তাকিয়েই গটগট করে সিঁড়ি বেয়ে নিজের রুমে চলে গেল। হাজি রহমান অত্যন্ত বিষণ্ণ মনে আহসানের দিকে তাকিয়ে বললেন।

“খাওয়ার মাঝে এসব কথা কেন বলতে গেলি। ছেলেটা না খেয়েই চলে গেল।”

আহসান রহমান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি প্রায় কেঁদে ফেলার মতো অবস্থায় হাজি রহমানের দিকে তাকিয়ে হাহাকার করে বললেন।

“বাবা আমি ওর বাবা হই। আমি কি ওকে দুই একটা প্রশ্নও করতে পারি না। ও আমার সাথে কথা বলছে না বাবা থাকা সত্ত্বেও নিজেকে এতিম বলছে। তার মানে আমাকেও ও পর করে দিচ্ছে। আমি একজন বাবা হয়ে এই অপমান সহ্য করি কীভাবে। এখন কি আমি বাবা হয়েও ছেলেকে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারব না। সেই অধিকারটুকুও কি ও আমাকে দেবে না।”

পাশ থেকে আকাশ খিলখিল করে হেসে উঠল। তার এই আকস্মিক বিদ্রূপাত্মক হাসির শব্দে বাড়ির সবাই স্তম্ভিত হয়ে অবাক চোখে তার দিকে তাকাল। হাজি রহমান ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে ধমকের সুরে বললেন।

“কী হয়েছে। তুই এইভাবে হাসছিস কেন?”

আকাশ প্লেটে হাত নাড়াতে নাড়াতে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল। “চাচুর কথা শুনে হাসি পাচ্ছে। চাচু কী বলল। সে ওর বাবা হয়। অথচ এই সেই বাবা যে চৌদ্দ বছর আগে নিজের জন্মদাতা ছেলেকে সামান্য কারণে পুলিশে দিতে চেয়েছিল। সেই ভয়েই তো দাদা ওকে দেশ ছেড়ে বাইরে পাঠিয়ে দিল। কেন হলো বাঁধনের জীবন এমন। কেন ওকে নিজের দেশ ছাড়তে হলো। কারণ ও রূপার মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিল। সবাই শুধু ওর রাগটাই দেখল কিন্তু সেদিন ও কেন এমনটা করেছিল তার কারণ একবারো কেউ জানতে চায়নি শুধু সবাই ওর রাগটাই দেখে নিল। মানুষ এমনি এমনি এমন চুপ হয়ে যায় না। ভেতর থেকে মানুষ যখন মরে যায় তখনই সে জ্যান্ত লাশের মতো হয়ে যায় আর সেটাই হয়েছে বাঁধনের সাথে। ও এখন নিজেকে নিজের মতো করে গুছিয়ে নিয়েছে ও একা থাকতে পছন্দ করে ও। তাই আপনাদের সবার উচিত ওকে এখন একটু ওর মতো থাকতে দেওয়া আর ওকে ওর মতো বাঁচতে দেওয়া।”

মুহূর্তেই আহসান রহমান একদম পাথরের মতো নিথর হয়ে গেলেন। আকাশের প্রতিটি কথা যেন বিষাক্ত তীরের মতো তাঁর বুকে বিঁধল। পুরো ডাইনিং টেবিল এক ভয়াবহ নীরবতায় ছেয়ে গেল। আহসান রহমান আর সেখানে বসে থাকতে পারলেন না। তিনি হাত ধুয়ে না খেয়েই ধীর পায়ে নিজের রুমে চলে গেলেন।

নিজের রুমের ব্যালকনিতে অস্থিরভাবে পায়চারি করছে শান্তা। তার মানে আকাশ ভাইয়া যা বলেছিল তা সত্যি। বাঁধন ভাইয়া সত্যিই রূপার মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিল। সে তো ভেবেছিল আকাশ ভাইয়া হয়তো মজা করছে কিন্তু আজ সে প্রমাণ পেল এটা কোনো গল্প নয় বরং এক ভয়াবহ বাস্তব। শান্তা আপনমনে বিড়বিড় করে বলতে লাগল।

“তার মানে কাকি রূপাকে এই কারণেই বাঁধন ভাইয়ার ছায়া পর্যন্ত মাড়াতে দিতে চাচ্ছে না। কারণ বাঁধন ভাইয়া রূপাকে দুচোখে সহ্য করতে পারে না। ইস কী রহস্যময় এক বাড়িতে বাস করি আমি। না জানি এই চার দেয়ালের মাঝে আরও কত রহস্য লুকিয়ে আছে যা এখনো সামনে আসা বাকি।”

আকাশ বাঁধনের রুমে ঢুকল। তাকে রুমে না পেয়ে সরাসরি ব্যালকনিতে চলে এল। বাঁধন তখন বুকে হাত ভাঁজ করে একদৃষ্টে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। আকাশ আলতো করে তার কাঁধে হাত রেখে নরম গলায় বলল।

“না খেয়ে চলে আসলি কেন?”

আকস্মিক ডাকে বাঁধন কিছুটা চমকে উঠল। সে তড়িঘড়ি করে চোখের পানি মুছে একটা লম্বা শ্বাস নিল। কিন্তু আকাশের তীক্ষ্ণ নজর এড়াতে পারল না সে। আকাশ সরাসরি জিজ্ঞেস করল।

“তুই কাঁদছিস?”

বাঁধন নিজেকে সামলে নিয়ে নির্লিপ্ত স্বরে বলল।

“আরে না এমনি চোখে হয়তো কিছু পড়েছে।”

আকাশ হাসল। সে বাঁধনের পাশে দাঁড়িয়ে বলল।

“তোর নেংটা কালের ভাই আর বন্ধু আমি। আমার কাছ থেকে লুকিয়ে লাভ নেই। তুই যে কাঁদছিস সেটা আমি ভালো করেই জানি। যাই হোক না খেয়ে চলে আসলি কেন। চল নিচে খেতে যাবি।”

বাঁধন মাথা নেড়ে অসম্মতি জানিয়ে বলল।

“না খাব না। খিদে নেই। তুই যা এখান থেকে আমার একা থাকতে ইচ্ছে করছে।”

আকাশ নাছোড়বান্দা। সে এক প্রকার জোর করতে লাগল। ওদের এই টানাটানির মাঝেই হঠাৎ পাশের ব্যালকনিতে কেউ এসে দাঁড়াল। আকাশ তখন বাঁধনের হাত টেনে ধরেছে আর বাঁধন সেটা ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। ঠিক সেই মুহূর্তে বাঁধনের নজর গেল পাশের ব্যালকনিতে। উল্টো দিকে ফিরে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে বেগুনি রঙের টি-শার্ট আর সাদা প্লাজু। তার পিঠ ছাপিয়ে হাঁটুর সমান লম্বা চুলগুলো হালকা বাতাসে ঢেউ খেলছে। বাঁধন কিছুটা অবাক হয়ে ভাবল তাদের বাড়িতে এই মেয়েটি কে। আকাশও সেদিকে তাকাল। বাঁধনকে ওই ব্যালকনির দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে সে নিচু স্বরে বলল।

“ওইটা রূপা। ওই যে ওখানে দাঁড়িয়ে আছে।”

মুহূর্তেই বাঁধনের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। অতীতের সেই অভিশপ্ত স্মৃতিগুলো যেন তপ্ত সিসার মতো তার মগজে চাড়া দিয়ে উঠল। তার চোখের সেই কোমলতা নিমিষেই কর্পূরের মতো উড়ে গিয়ে সেখানে জমা হলো একরাশ কাঠিন্য। সে অত্যন্ত গম্ভীর আর থমথমে গলায় বলল।

“চল খেতে যাব।”

এদিকে রূপার জ্বরে শরীরটা যেন ভেঙে আসছে আর সেই সঙ্গে অসহ্য মাথা ব্যথা। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করেও ঘুম আসছে না দেখে শরীরটা একটু জুড়োতে সে টলমল পায়ে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল। কিন্তু ঠান্ডা হাওয়ায় শরীর জুড়োলেও মনটা শান্ত হচ্ছে না। তার মাথায় তখন সেই রাস্তার ধারের সুপুরুষের চিন্তা যার তীক্ষ্ণ মায়াবী চোখ জোড়া আর স্লিট করা ভ্রু তাকে পুরো নেশায় ধরিয়ে দিয়েছে। আগে কখনো কোনো পুরুষের চাহনি তাকে এভাবে অস্থির করেনি। রূপা আপনমনে বিড়বিড় করতে লাগল।

“আবার যদি কখনো ওই ভূতের সাথে দেখা হয় তাহলে ঝাড়ু দিয়ে পিটাবো। ঘাড় মটকাবো ভালো কথা তা বলে অত সুন্দর রূপ নিয়ে কেন আসতে হলো। কী সাংঘাতিক চোখ রে বাবা। চোখ যদি এতটা সুন্দর হয় তাহলে উনার চেহারাটা কেমন হবে উফফ।”

বলতে বলতে রূপা নিজের কপালে একটা হালকা থাপ্পড় বসিয়ে দিয়ে বলল।

“দুর রূপা। যার চোখ এতটা মখমলের মতো মসৃণ অথচ আগ্নেয়গিরির মতো উত্তপ্ত তার চেহারা তো অবশ্যই সুন্দর হবে। চোখ দেখেই তোর এই অবস্থা চেহারা দেখলে তো তোকে রহমত বাড়িতে না পেয়ে পাবনা পাগলা গারদে পাওয়া যাবে।”

পরেদিন সকাল

“খুন হয়েছে।”

এই দুই শব্দের আর্তনাদ আর আতঙ্ক পুরো এলাকার বাতাসে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। মানুষের মুখে মুখে নানা কথা ছড়াচ্ছে। পুলিশ এসেছে ঠিকই কিন্তু আসল খুনি কে তার কোনো হদিস কেউ পাচ্ছে না। বাঁধনদের বাড়ি থেকে মাত্র তিনটা বাড়ি পরেই এই বীভৎস কাণ্ড ঘটেছে। খবর পাওয়া মাত্রই বাঁধন সেখানে পৌঁছাল কিন্তু দীর্ঘ চৌদ্দ বছর দেশের বাইরে থাকায় তাকে এই এলাকার কেউ চিনতে পারছে না। বাঁধন মুখে কালো মাস্ক পরে সেই বাড়িতে ঢুকল। ড্রয়িং রুমে তখন মানুষের তিল ধারণের জায়গা নেই। সেখানে আহসান রহমান আতিক রহমান হাজি রহমান আর আকাশও দাঁড়িয়ে আছে। মেঝেতে সাদা কাপড়ে ঢাকা একটি নিথর দেহ পড়ে আছে। লাশের সামনে দুজন যুবক মাথা নিচু করে বসে কাঁপছে আর কাঁদছে আর একজন পুলিশ অফিসার তাদের জেরা করছেন। বাঁধন নিঃশব্দে ভিড় ঠেলে লাশের দিকে এগোতে চাইল। কিন্তু তার গতিবিধি দেখে একজন পুলিশ কনস্টেবল পথ আটকে দিয়ে কর্কশ গলায় ধমক দিয়ে উঠল।

“বলছি না দূরে থাকেন। লাশের কাছে এখন যাওয়া যাবে না। আমাদের তদন্ত চলছে ডিস্টার্ব করবেন না।”

বাঁধন বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। সে শান্ত অথচ অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে পুলিশ কনস্টেবলকে বলল।

“জাস্ট দু মিনিট?”

পুলিশটি এবার বিরক্ত হয়ে গলার স্বর চড়িয়ে বলল।

“বলছি না লাশের কাছে যাওয়া যাবে না। কথা কানে যায় না?”

বাঁধন পিছু হটল না। সে কনস্টেবলের চোখের দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে প্রশ্ন করল।

“এইটা তো মার্ডার কেস। তো আপনারা কি বুঝেছেন যে খুনি ঠিক কীভাবে মেরেছে?”

বাঁধনের এমন পালটা প্রশ্নে পাশে থাকা পুলিশ অফিসারটি উৎসুক হয়ে এগিয়ে এলেন। তিনি বাঁধনের সামনাসামনি দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকে মেপে নিলেন। অফিসারটি কিছুটা সন্দেহের সুরে বললেন।

“এইটা পুলিশের কাজ পুলিশ সেটা করছে। সময় হলে সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হবে। তা মিস্টার আপনি কে?আর আপনি যে এত প্রশ্ন করছেন খুনটা আপনিই করেননি তো?”

রানিং…!Samiya Mim

নেক্সট

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply