অবাধ্য_হৃৎস্পন্দন (৬১)
সোফিয়া_সাফা
ফিরে দেখা অতীত <৩>
সেদিন স্কুল থেকে ফিরে ড্রইংরুমে পা রাখতেই উদ্যানের শরীরটা রি রি করে উঠল। সামনেই সোফায় বসে আছেন পারভীন, তাঁর কোলে দেড় বছর বয়সী এক ছোট্ট মেয়ে।
উদ্যান কেবল বিষাক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল পারভীনের দিকে। পারভীন তার চোখে চোখ রাখতে পারলেন না। উদ্যানকে তিনি ছোটো বেলা থেকেই অনেক ভালোবাসতেন। সেই ছেলের চোখে নিজের প্রতি ক্ষোভ জমে থাকতে দেখাটা তার জন্যেও কষ্টের ছিল। তিনিই বা কী করবেন, একেবারে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পরেই তিনি বাপের বাড়ির শরণাপন্ন হয়েছেন। ফারহান তাকে আর মেয়েকে ফেলে রেখে কোথায় যে হারিয়ে গেছে, তার কোনো হদিস নেই।
উদ্যান কোনো কথা না বলে বেশ কিছুক্ষণ নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীর পায়ে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে দাদার কক্ষে ঢুকল।
“দাদাভাই, আপনার মেয়ে এই বাড়িতে কী করছে? ভালোয় ভালোয় ওনাকে চলে যেতে বলুন, নয়তো আমি পুলিশ ডাকতে বাধ্য হবো।”
দাদাভাই বিছানায় হেলান দিয়ে ছিলেন, নাতির কথা শুনে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলেন। “উদ্যান, ও যার সাথে পালিয়ে গিয়েছিল সে ওকে আর ওর মেয়েকে রেখে নিখোঁজ হয়ে গেছে। এই অবস্থায় কোথায় যেতে বলবো ওকে?”
“উনি কোথায় যাবেন সেটা উনি ঠিক করবেন, আমি না। কিন্তু এই বাড়িতে উনি থাকতে পারবেন না।”
দাদাভাই চোখে চশমা এঁটে বিছানা ছাড়লেন, “এই বাড়িতে কে থাকবে না থাকবে সেটা কর্তা হিসেবে আমি ঠিক করবো উদ্যান, তুমি নও।”
একথা শুনে উদ্যানের চাউনি তীক্ষ্ণ হলো। বেরিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়েও থমকে গেল। ঘাড় ঘুরিয়ে শান্ত গলায় বলল, “ঠিক আছে। তাহলে আমাকেও আইনের পথেই হাঁটতে হবে।”
“পারভীন তোমার মাকে জেনেশুনে মে’রে ফেলেনি! ওটা একটা দূর্ঘটনা ছিল। সেখানে আইন কী করবে ওর?”
“আইন কী করবে তাতো সাক্ষী-প্রমাণ এবং বিচারক ঠিক করবেন দাদাভাই, আপনি নন।”
দাদাভাই বুঝলেন রাগ দেখিয়ে বা ধমক দিয়ে উদ্যানকে দমানো যাবেনা। পরিশেষে তার শরীরেও খানজাদা বংশেরই রক্ত বইছে। তাই তিনি ভিন্ন পথ ধরলেন, সুর নরম করে উদ্যানকে নিজের কাছে টেনে নিলেন।
“দাদাভাই তুমি কি চাও আমি আবারও অসুস্থ হয়ে পড়ি?”
উদ্যান অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, “আমি সেটা চাইনা, ঠিক তেমনি আপনার খু’নি মেয়ে এই বাড়িতে থাকবে সেটাও মেনে নিতে পারবো না। আপনি বললনে না ওনার যাওয়ার জায়গা নেই? ঠিক আছে, আমি ওনার থাকার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। তো আপনি একটা কাজ করুন, জেলখানার সবচেয়ে বেস্ট সেলটা যেন ওনার জন্য বরাদ্দ থাকে সেটা নিশ্চিত করুন। এটুকু ‘কম্প্রোমাইজ’ আমি করতেই পারবো আপনার জন্য।”
দাদাভাই থমকে গেলেন। উদ্যান আবারও বলল, “আপনার মেয়েকে আমি আমার মা-বোনের কাছে পাঠাতে চাইছি না সেটার জন্য আপনার কৃতজ্ঞ থাকা উচিত দাদাভাই। তা না করে আপনি আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন?”
“আমি ভয় দেখাচ্ছি না তোমাকে। তুমিও খুব ভালো করেই জানো তোমার পিপিকে আমি কতোটা ভালোবাসি।”
“আসলে দাদাভাই, ভালোবাসা কাকে বলে আমি জানিনা। আমার কাছে দায়িত্ব, কর্তব্য আর গুরুত্ব আপনার তথাকথিত ভালোবাসা নামক স্নেহের চেয়েও অনেক উপরে।”
দাদাভাই কথা হারিয়ে ফেললেন। উদ্যান আলতো করে তার হাতটা সরিয়ে দিয়ে বলল, “সেই ভালোবাসা আমি বুঝতেও চাইনা যা মানুষকে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে দেয়। আপনি আপনার মেয়ের ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে গেছেন। দেখতে পাচ্ছেন না আমার কতোবড় ক্ষতি সে করেছে। আপনার মেয়ে যদি আমার ক্ষতিপূরণ দিতে পারে তবে হয়তো আমি তাকে ক্ষমা করতে পারবো। বলুন, পারবে কি সে ক্ষতিপূরণ দিতে?”
দাদাভাইয়ের চোখের কোণ ভিজে উঠল, গলাটা বুজে এল তার।
“দাদাভাই মানুষ মাত্রই তো ভুল হয়। ভুল আর জেনেশুনে করা অন্যায়কে কেন তুমি একই পাল্লায় মাপছো?”
“কারণ কিছু কিছু ভুল জেনেশুনে করা অন্যায়ের থেকেও বেশি ক্ষতিসাধন করে। সেইসব ভুলের মাশুল দেওয়া বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে।”
দাদাভাই কিছুক্ষণ চুপ থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর ধরা গলায় বললেন, “ঠিক আছে, আমি নিজেই তাহলে তোমার পিপিকে আইনের হাতে তুলে দেবো। কিন্তু তারপর যা যা ঘটবে, তার মাশুল দিতে তুমিও প্রস্তুত থেকো।”
উদ্যান এক জোড়া বরফশীতল চোখে তাকিয়ে রইল। দাদাভাই ফের বললেন, “তোমার পিপিকে যদি আবারও হারিয়ে ফেলতে হয়, আমি হয়তো সামলে উঠতে পারব না। ফুল দিদিভাই টাও অনাথ হয়ে যাবে তোমার মতো। তোমার তাও বাবা আছে, মাথার ওপর ছাদ আছ; ওর কিছুই থাকবে না।”
উদ্যানের চোখের মণি দুটো বিস্ময়ে সামান্য প্রসারিত হলো। ঠোঁট নেড়ে আওড়াল, “ফু…ল? কোন ফুলের কথা বলছেন?”
ফুলের প্রতি কৌতুহলী হয়ে পড়তে দেখে দাদাভাই সুযোগটা লুফে নিলেন।
“সেকি! তুমি জানো না, আমাদের বাড়িতে নতুন ফুল এসেছে?”
উদ্যান এবার গোলকধাঁধায় পড়ে গেল। সে নিচের ঠোঁটে জিভ বুলিয়ে না-সূচক মাথা নাড়ল। দাদাভাই সফল ভাবে তার মনোযোগ অন্যদিকে ঘোরাতে সক্ষম হলেন। তিনি উদ্যানের হাত ধরে একপ্রকার টেনে নিয়ে এলেন ড্রইংরুমে। উদ্যান দেখল, রেহানা, মাহবুবা সুলতানা আর তার ছেলে তাজরিদ–নামটা উদ্যানের দাদাভাই রেখেছেন। পারভীনকে ঘিরে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
দাদাভাই ভিড় ঠেলে গিয়ে বললেন, “আরে সরে দাঁড়াও, সরে দাঁড়াও সবাই। উদ্যান দাদাভাই বাড়িতে আসা ফুলকে দেখতে এসেছে।”
সবাই সরে যেতেই পারভীন অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। উদ্যানকে অজান্তেই তিনি ভয় পাচ্ছেন। উদ্যান কেমন যেন করে তাকায় তার দিকে। সেই তাকানো দেখে তার কলিজা শুকিয়ে যায়। উদ্যান চোখ দিয়ে তাকে অনুশোচনার আগুনে ঝলসে দিতে ব্যস্ত; ঠিক তখনই দাদাভাই পারভীনের কোল থেকে ছোট্ট বাচ্চাটাকে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে সরাসরি উদ্যানের হাতে ধরিয়ে দিলেন।
ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল উদ্যান। প্রথমত, বাচ্চা নেওয়ার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা তার নেই। দ্বিতীয়ত, সে ভাবতেও পারেনি, ফুলের নাম করে তার দাদাভাই বাচ্চা ধরিয়ে দেবেন।
সে কোনোমতে ফুলকে সামলে নিয়ে বিরক্তিতে কুঁচকে যাওয়া চোখে দাদাভাইয়ের দিকে তাকাল।
“দাদাভাই এটা আবার কোন ধরনের ফুল? আপনি বোকা বানাচ্ছেন আমায়?”
তার কথায় পারভীন একটা শুকনো ঢোক গিললেন। ভয় আর দ্বিধার মিশেলে মিনমিনিয়ে বললেন, “ওর নামই আমি ফুল রেখেছি।”
উদ্যান এবার নাক-মুখ কুঁচকে বিশ্রী এক ভঙ্গি করল। “উফ! কী বাজে নাম। আপনার পক্ষেই এমন উইয়ার্ড নাম রাখা সম্ভব।”
পারভীন তৎক্ষনাৎ কিছু একটা ভেবে নিয়ে বলে ফেললেন, “ওর ভালো নাম প্রিমরোজ! তোমার যদি ফুল নামটা একেবারেই পছন্দ না হয়, তবে ওটা বলেই ডেকো?”
উদ্যান ক্ষুব্ধ চোখে পারভীনের দিকে তাকাল, কারণ প্রিমরোজ তার পছন্দের ফুলের নাম। সেটা পারভীন ভালো করেই জানে। তবুও তিনি মেয়ের নাম প্রিমরোজ রেখে কী প্রুভ করতে চাইছেন? উদ্যান প্রতিক্রিয়া দেখাতেই যাবে কিন্তু তার আগেই এক আশ্চর্য কাণ্ড ঘটল। হঠাৎ সে অনুভব করল, তার শার্টের বুকের দিকটা গরম কোনো তরলে ভিজে উঠছে। মুহূর্তেই উদ্যানের মস্তিষ্ক যেন ফাঁকা হয়ে গেল। বাকিরাও বাকরুদ্ধ!
পারভীনের হাত-পা বরফ হয়ে এল। তিনি ছুটে যেতে চাইলেন, কিন্তু পারলেন না। পাদু’টো যেন অসার হয়ে মেঝেতেই গেথে রইল। তিনি ভাবলেন, উদ্যান হয়তো রাগের চোটে তার মেয়েকে কোনো একদিকে ছুড়ে মেরে দেবে।
কিন্তু উদ্যান তাকে যথেষ্ট সময় দিল। সে যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না ফুল নামের মেয়েটা তার সাদা শার্টটার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে।
ততক্ষণে পারভীন ঘোর কাটিয়ে তড়িঘড়ি করে মেয়েকে নিজের কোলে নিয়ে নিলেন। তারপর শাড়ির আঁচল দিয়ে উদ্যানের শার্ট মুছতে মুছতে কাঁপা স্বরে বললেন, “আ… আমি তোমার শার্ট এখনই ধুয়ে দেবো উদ্যান। দয়া করে রেগে যেয়ো না। বাচ্চা মেয়েতো বুঝতে পারেনি।”
বর্তমান!
“তোমার নিজেকে কন্ট্রোল করা উচিত ছিল ফুল। সেদিন বমি, তারপর আজ… ওহ সরি, আজ নয়। আমরা তো অতীতে ছিলাম। আচ্ছা তুমিই বলো প্রথম সাক্ষাতে কে এমন করে?” লুহানের বিড়বিড় করে বলা কথাটা শুনে ফুলের মাথাটা লজ্জায় আরও নুয়ে পড়ল। সে কান্নার নোনতা স্বাদটা গিলে নিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল, “আই অ্যাম সরি।”
উদ্যান ধীরস্থির ভাবে ঘাড়টা হালকা কাত করল।
“সরি… কী ডেঞ্জারাস একটা ওয়ার্ড, তাই না। ভুল, অন্যায়, পাপ; সবকিছু ধুয়ে ফেলার জন্য এই একটা শব্দই যথেষ্ট। তাই না, মিস্টেক?”
অতীত!
“সরি উদ্যান, বিশ্বাস করো আমি সেদিন তোমার মাকে ইচ্ছে করে ধাক্কা দিইনি। তুমি প্লিজ আমাকে বের হয়ে যেতে বোলো না।”
পারভীন সবার সামনে উদ্যানের কাছে ক্ষমা চাইলেন। প্রত্যুত্তরে উদ্যান বলল না কিছুই। চুপচাপ শুধু নিজের রুমে চলে গেল। বলার মতো কিছুই নেই তার। বাড়ির সবাই পারভীনের পক্ষে, এমনকি উদ্যানের বাবাও। তাশরিফ উদ্যানের পিছু পিছু তার রুম পর্যন্ত চলে এলেন। উদ্যান একনজর তাকিয়ে তার কোলে ফুলকে দেখে দৃষ্টি সরিয়ে নিল।
“উদ্যান, তোমার না খুব মন খারাপ ছিল বোন নেই বলে? এই দেখো, তোমার বোনের অভাব পূরণ করার লোক এসে গেছে।”
উদ্যান কথাগুলো শুনলো, তারপর স্টাডি টেবিলে বসে বই খুলতে খুলতে বলল, “আমার বোনের অভাব শুধুমাত্র আমার বোনই পূরণ করতে পারতো। আর কেউ পারবে না।”
তাশরিফের উৎসাহী মুখটা মুহূর্তেই চুপসে গেল। তিনি খুব আশা নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু ছেলেটা যে কোন লেভেলের একরোখা হয়েছে, তা তিনি হাড়ে হাড়ে টের পেলেন।
“উদ্যান, তুমি কি তাজরিদের মতো ফুলকেও ইগ্নোর করবে?” তাশরিফের গলায় এবার বিরক্তির সুর।
“ওহ-হো বাবা! আমার ইগ্নোর করা না করায় কী আসবে যাবে? আপনারা সবাই আছো না প্রায়োরিটি দেওয়ার জন্যে? উল্টো আমি তো দিন দিন আপনাদের বোঝায় পরিনত হচ্ছি। না পারছেন ফেলে দিতে, আর না পারছেন সহ্য করতে। আপনার বোনকে বলে দিয়েন সুযোগ পেলে যেন আমাকেও মে’রে ফেলে। তারপর আর কী একটা ‘সরি’ বলে দিলেই তো সব চুকেবুকে যাবে।”
ছেলের কথা বলার ধরন শুনে তাশরিফ রাগে গরগর করতে করতে বেরিয়ে গেলেন। সেই থেকে বাবা আর ছেলের মাঝখানে এক অদৃশ্য দেয়াল খাড়া হলো।
যা সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা গেল খাবার টেবিলে। আগে তাশরিফ ছেলেকে ডেকে তারপর খেতে বসতেন কিন্তু ইদানীং আর ডাকার প্রয়োজন বোধ করেন না।
দিন কাটে, মাস পেরোয়। এরই মধ্যে পারভীনের বাবা তার মেয়ের আবারও বিয়ে ঠিক করলেন; আগে যার সাথে ঠিক করা ছিল তার সাথে নয়। বরং অন্য আরেকজনের সাথে। পারভীন কোনোপ্রকারেই বিয়েতে রাজি হতে পারছিলেন না। কারণ তিনি তখনও ফারহানকে ভুলতে পারেন নি। বাবার জেদ আর নিজের অসহায়ত্বের মাঝে পড়ে তিনি দিশেহারা হয়ে উঠলেন।
মূলত তার বাবাও চাচ্ছিলেন জীবিত থাকাকালীন মেয়ের একটা গতি করে দিয়ে যেতে।
এরই মধ্যে পারভীন একদিন জেনে গেলেন যে, রেহানা আর ফারহান মিলে কীভাবে বর্ণপ্রিয়াকে সবার চোখে চরিত্রহীনা বানিয়েছিল। তাকে বিয়ে করাটাও তাদের যৌথ পরিকল্পনার অংশ ছিল। সবকিছু জানতে পেরে পারভীন ভয়ানক ডিপ্রেশনে তলিয়ে গেলেন। যে পাপবোধ তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল, তা থেকে মুক্তি পেতে এক নিঝুম রাতে তিনি আত্মহত্যার পথটাই বেছে নিলেন।
ভোরবেলা, নিজের মেয়ের নিথর দেহটা স্বচক্ষে সিলিংফ্যানের সাথে ঝুলতে দেখে উদ্যানের দাদাভাই সঙ্গে সঙ্গেই হার্ট অ্যাটাক করলেন। এতো বড় শোকের ধাক্কাটা তিনি সইতে পারলেন না।
মারা যাওয়ার আগে পারভীন ফারহান আর রেহানার সব কার্যকলাপ এক দীর্ঘ চিঠিতে লিখে রেখে গিয়েছিলেন। ঘটনাক্রমে সেই চিঠিটা সবার আগে উদ্যানের হাতে পড়ে। কিন্তু উদ্যান সেটা কাউকে না দেখিয়ে নিজের কাছেই রেখে দিল।
কারণ সে ভেতর থেকে এতোটাই খালি হয়ে গিয়েছিল যে মায়ের প্রতি কেউ সহানুভূতি দেখাক সেটাও সে চায়নি। অবশ্য সে চেয়েছিল তার মায়ের কথাটা রেখে তার বাবাকে সবটা খুলে বলতে কিন্তু সেটাও পারেনি। সে পারেনি সবটা জানিয়ে বাবাকে অনুশোচনার আগুনে পোড়াতে।
তার বাবা এমনিতেই ততক্ষণে বোন আর বাবাকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছিলেন। উদ্যান ভেবেছিল তার বাবা কিছুটা স্বাভাবিক হলে তারপরেই সে তাকে চিঠিটার ব্যাপারে জানাবে।
বর্তমান!
“থাম তেহ, ও জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে।” মেলোর কথায় উদ্যান মেঝে থেকে পানির বোতল টা তুলে নিল। ছিপি খুলতে খুলতে ফুলের উদ্দেশ্যে বলল, “হাহ! নিজের মায়ের মৃত্যুটা তোকে ঠিক থাকতে দিল না। তাইনা রে? কী করবো বল, মেইন টুইস্ট যে এখনো বাকি আছে।”
ঠান্ডা পানির অতর্কিত ঝাপটায় ফুল ধড়ফড় করে চোখ মেলল। পানির সংস্পর্শে আসতেই শরীরের ক্ষত গুলো চিনচিনিয়ে উঠল ব্যাথায়। দাঁতে দাঁত চেপে সে সেই তীব্র ব্যাথা সয়ে নিল।
“তাশরিফ খানজাদার সাথে কী হয়েছিল, সেটা তোকে জানতেই হবে। বুঝলি?”
ফুল কোনো কথা বলতে পারল না, শুধু যন্ত্রণাকাতর চোখে তাকিয়ে থেকে নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। যেন কান্না করার শক্তিটুকুও শরীর থেকে নিঃশেষ হয়ে গেছে।
অতীত!
উদ্যান তখন ক্লাস টেনে উঠেছে সবেমাত্র। ক্লাসে অনেক শিক্ষার্থী থাকলেও তার কোনো বন্ধু নেই। ‘ফার্স্ট বয়’ হওয়ায় অনেকেই তার সাথে বন্ধুত্ব করতে হাত বাড়ায়, কিন্তু উদ্যান সেই হাতগুলো অবলীলায় এড়িয়ে যায়। তার চারপাশে সে এমন এক অদৃশ্য দেয়াল তুলে রেখেছে, যা টপকানোর সাধ্য কারো নেই।
একদিন সন্ধ্যাবেলা।
তাশরিফ ফুলকে নিয়ে উদ্যানের রুমের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ তিনি আধখোলা দরজাটার ওপাশ থেকে লক্ষ্য করলেন, উদ্যান টেবিলের ওপর মাথা রেখে বসে আছে। সামনের জানলাটা অবারিত খোলা। যেখান দিয়ে সন্ধ্যার ঠান্ডা বাতাস আর মশারা দল বেঁধে এসে তার চারপাশে ভনভন করছে।
তাশরিফ অবাক হয়ে ভেতরে ঢুকলেন। ঘরের আলো জ্বালিয়ে তিনি জানলাটা বন্ধ করতে এগিয়ে গেলেন। ঠিক তখনই তার কোলে থাকা ছোট্ট ফুল টেবিলের ওপর থেকে একটা সাদা খাম খপ করে তুলে নিয়ে মুখে দিতে যাচ্ছিল, এমন সময় তাশরিফ ক্ষিপ্র হাতে খামটা কেড়ে নিলেন।
জানলাটা আটকে দিয়ে তিনি খামের ওপরের লেখাটার দিকে তাকালেন, লেখা ছিল; ‘Parents Invitation Letter’।
কৌতূহলী হয়ে ভেতরের চিঠিটা পড়তেই তাশরিফের কপাল কুঁচকে এল। আগামীকাল উদ্যানদের স্কুলে ‘পেরেন্টস মিটিং’। অথচ ছেলেটা তাকে এ বিষয়ে কিছুই জানায়নি।
তাশরিফের মুখের গড়ন শক্ত হয়ে উঠল। তিনি কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু উদ্যানের দিকে তাকাতেই তার গলার কাছে কথা আটকে গেল। উদ্যান জানলার দিকে নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে আছে। দৃশ্যটা দেখে তাশরিফের মেরুদণ্ড দিয়ে এক শীতল স্রোত বয়ে গেল। ছেলেটার চোখ দুটো খোলা, অথচ সেখানে কোনো অভিব্যক্তি নেই।
তিনি চোখের সামনে হাত নেড়ে দেখতে লাগলেন সে পলক ফেলছে কি না। তখনই তিনি শিউরে উঠে বুঝতে পারলেন; ছেলেটা আদতে জেগেই নেই, বরং চোখ খোলা রেখেই গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে।
তাশরিফ বিচলিত হয়ে উদ্যানের কাঁধ ধরে বেশ জোরেশোরে ঝাঁকুনি দিলেন, “উদ্যান! এই উদ্যান! এভাবে কেউ ঘুমায় নাকি? ওঠো!”
উদ্যানের ঘুম ভাঙল না। তার সেই টানাটানিতে ভয় পেয়ে ফুল হঠাৎ ফুপিয়ে কেঁদে উঠল। তার কান্নার তীক্ষ্ণ শব্দে ঘুমটা একটু হালকা হয়ে আসে উদ্যানের। কোনোমতে তাশরিফের হাতটা সরিয়ে দিয়ে সোজা হয়ে বসল সে।
“ওকে নিয়ে কেন এসেছেন এখানে?” বলতে বলতেই উদ্যান গাল চুলকাতে লাগল। মশারা ততক্ষণে সুযোগ পেয়ে তার ফ্যাকাশে মুখে অসংখ্য লালচে দাগ এঁকে দিয়েছে।
তাশরিফ ছেলের কথা কানে তুললেন না। হাতের চিঠিটা দেখিয়ে রুক্ষ স্বরে বললেন, “স্কুলে পেরেন্টস মিটিং আছে আমাকে জানাওনি কেন?”
উদ্যান আলস্য ভেঙে হাত টানটান করতে লাগল। এলোমেলো হয়ে ঘুমানোর কারণে হাত ব্যাথা করছে তার।
“আপনি তো সারাক্ষণই ব্যস্ত থাকেন অফিসের কাজে। তারপর যেটুকু সময় পান সেটুকু এই ডাইনীটার পেছনে খরচ করেন। আপনি কখন যাবেন? আমি স্যারকে বলে দেবো আপনি ব্যস্ত আছেন।”
“উদ্যান! তুমি আবারও ওকে ডাইনী বললে?”
“সরি বাবা।”
তাশরিফ এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন। উদ্যান একটা শব্দ শিখে নিয়েছে আর সেটা হলো ‘সরি’। জেনে-বুঝে হোক বা অজান্তেই হোক উদ্যানের দ্বারা কোনো ভুল হয়ে গেলেই সে খুব সুন্দর করে ‘সরি’ বলে দেয়।
“সরি না বলে ওকে ভালোভাবে ডাকো একবার।”
উদ্যান যেন একটু সিরিয়াস হলো। সে ফুলের খুব কাছাকাছি মুখ নিয়ে গেল। ফুল অদ্ভুতভাবে কান্না থামিয়ে দিয়ে মাড়ির নতুন গজানো দাঁতগুলো বের করে খিলখিল করে হেসে উঠল। উদ্যান ম্লান স্বরে ফিসফিস করল, “হেই মিস-টেক।”
তাশরিফ ফুলকে ছেলের থেকে দূরে সরিয়ে নিলেন। “আমি ভালোভাবে ডাকতে বলেছিলাম তোমায়।”
“সরি বাবা, এর চেয়ে আর ভালোভাবে ডাকতে পারবো না।”
তাশরিফ আর তর্কে গেলেন না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুধু বললেন, “শোনো, কাল আমিও তোমার যাথে স্কুলে যাবো।”
উদ্যান টেবিলের বইগুলো গোছাতে গোছাতে ছোট করে বলল, “ওকে, থ্যাংক ইউ।”
পরেরদিন উদ্যান আর তাশরিফ বাড়ি থেকে বেরোবেন তখনই ফুলের কান্নার শব্দ ভেসে এল। তাশরিফ থমকে দাঁড়ালেন। ফুলটা তার এতো পাগল হয়েছে যে তাকে ছাড়া কিছুই বোঝেনা। তাশরিফ নিজেও ভাগ্নীর জন্য পাগলপ্রায়। যেন সে তার মাঝেই নিজের মেয়েকে খুঁজে নিয়েছেন।
তাশরিফ আবারও ভেতরে ঢুকে পড়লে বিরক্তি নিয়ে উদ্যানও তার পিছু নিল। রেহানা তাশরিফকে দেখে কিছুটা অবাক হয়ে বললেন, “ভাইয়া, আপনি আবার ফিরে এলেন কেন? যান না, ও কিছুক্ষণ পর এমনিতেই শান্ত হয়ে যাবে।”
তাশরিফ তার কথায় কর্ণপাত না করে সোজা গিয়ে ফুলকে কোলে তুলে নিলেন। পরম মমতায় তার চোখের জল মুছে দিয়ে নিজের কাঁধের ওপর বাচ্চাটার মাথা রাখলেন। শান্ত স্বরে বললেন, “আমি তো অফিসে যাচ্ছি না। ওকেও নিয়ে যাই আমাদের সাথে।”
রেহানা থতমত খেয়ে আপত্তি তুললেন, “আরে ভাইয়া! ও শুধু শুধু বিরক্ত করবে আপনাকে। তার ওপর আপনি উদ্যানের সাথে যাচ্ছেন। ওকে নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না।”
“তাতে কী হয়েছে? প্রতিদিন মেয়েটাকে কাঁদাতে ভালো লাগে না আমার।”
রেহানা হালকা হেসে বললেন, “মেয়ে হয়ে যখন জন্মেছে তখন কান্নাটাকেও জীবনের একটা অংশ বানিয়ে নেওয়া উচিত। মা নেই, বাবা নেই কান্না এড়িয়ে বাঁচতে পারবে কি ভাইয়া? পরের বাড়িতেও তো যেতে হবে একদিন।”
ফুলের পিঠে আলতো করে চাপড় দিতে দিতে তাশরিফ আত্মবিশ্বাসের সাথে বললেন, “আমার বাড়ির ফুলকে আমি অন্য বাড়িতে যেতে দেবো ভাবলে কী করে? ফুল এই বাড়িতেই থাকবে।”
রেহানা বিস্মিত হয়ে চাইলেন, “কী বলছেন ভাইয়া? ও সারাজীবন এই বাড়িতে কীভাবে থাকবে?”
“অবাক হচ্ছো কেন? আমার ছেলে রাখবে ফুলকে।”
রেহানার চোখ কপালে উঠল, “ভাইয়া! আপনি কি সুস্থ মাথায় কথা বলছেন?”
“অবশ্যই, উদ্যানের মাকে আমাদের বাবা পছন্দ করে এনেছিলেন। আমিও ফুলকে আমার ছেলের জন্য পছন্দ করে ফেলেছি।”
রেহানা একটা শুকনো ঢোক গিললেন, শরীরটা যেন অবশ হয়ে আসছে তার।
“কিন্তু ভাইয়া, উদ্যান তো ওকে দুচোখে দেখতে পারেনা।”
“কেন দেখতে পারে না, তা তো জানোই। পারভীন যেই ভুলটা করেছিল তার মাশুল হিসেবে ওর মেয়েকে আমার ছেলের হাতে তুলে দিয়ে গেছে। আমি শুরুতে ভেবেছিলাম ওকে নিজের মেয়ে বানাবো। উদ্যান ওকে বোনের চোখে দেখবে। কিন্তু আমার ছেলে ওকে বোন হিসেবে স্বীকার করেনি। তাই বউ বানানো ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।”
রেহানার মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল, “যেই ছেলে বোন হিসেবে মেনে নেয় নি সেই ছেলে বউ হিসেবে মেনে নেবে?”
“না নিয়ে কী করবে? পারভীন ওকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দিয়ে গেছে। ও মা’রা যাওয়ার কিছুদিন আগে আমার কাছে গিয়ে বলেছিল, ‘ভাইয়া আমি চাই উদ্যানের হাতে ফুলকে তুলে দিতে।’ ওর একথা শুনে আমি খুব হেসেছিলাম। বলেছিলাম, ‘ছেলে তো নিজেকেই সামলাতে পারছেনা ফুলকে সামলাবে কী করে?’ ও বলেছিল, ‘আমার ফুলের জন্মই হয়েছে উদ্যানের জন্য, উদ্যান আমার কাছে ক্ষতিপূরণ চেয়েছে। বলেছে আমি ক্ষতিপূরণ দিতে পারলে তবেই ও আমাকে ক্ষমা করবে। যারা চলে গেছে তাদের তো আমি ফিরিয়ে দিতে পারব না। তার বদলে আমি আমার কলিজার টুকরোকে দিচ্ছি।’ আমি সেদিন ওর কথাটায় গুরুত্ব দিইনি। ভেবেছিলাম মজা করছে। কিন্তু আমিও এখন সেটাই চাই। আমার ছেলে ক্ষতিপূরণ না নিয়ে ক্ষান্ত হবে বলে মনে হয়না।”
তাশরিফ ফুলকে নিয়ে সামনে ফিরতেই দেখলেন, উদ্যান দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। তাদের চোখাচোখি হতেই উদ্যান চোখ নামিয়ে নিল। তাকে অপ্রস্তুত হয়ে পড়তে দেখে তাশরিফ মুচকি হাসলেন। বুঝতে পারলেন ছেলে ইতোমধ্যেই ক্ষতিপূরণ নেওয়ার মনস্তাপ করে ফেলেছে।
তিনি ফুলকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গাড়ির দিকে পা বাড়ালেন। উদ্যানও হাঁটা ধরতেই যাবে তখনই সে পেছনে ফিরে তাকাল। উদ্যানের চাউনি দেখে রেহানা ফাঁকা ঢোক গিললেন। উদ্যান ঘুরে এসে তার সামনে দাঁড়াল, “বাবাকে এখন বলে দেওয়াই যায় কী বলেন? আপনারও নিশ্চয়ই ভালো মানুষের মুখোশ পরে থাকতে কষ্ট হচ্ছে?”
রেহানার মুখটা বিবর্ণ হয়ে গেল। তোতলাতে তোতলাতে বললেন, “উদ্যান… আমি ফারহানের সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেছি বহু আগেই। ওর সাথে সম্পর্কে জড়ানোর জন্য আমি খুবই লজ্জিত। তুমি দয়া করে ভাইয়াকে কিছুই বোলো না।”
“সরি বাট আমার তাকে সব বলতেই হবে। মা নইলে রাগ করবেন। এটা ভাববেন না যে পারভীন খানজাদাকে কিছু বলেনি বলে বাবা আপনাকেও ছেড়ে দেবেন। আরে আপনি আর ফারহান আমহৃত তো ভুল করেন নি তাইনা? জেনেশুনেই আমার মায়ের ঘরে ভাড়াটে লোক পাঠিয়েছিলেন?”
অপরাধবোধ আর ভয়ে রেহানা নুইয়ে পড়লেন। উদ্যান দুপা পিছিয়ে উল্টো ঘুরে চলে গেল স্কুলের উদ্দেশ্যে। রেহানা ধরেই নিলেন আজই হয়তো এই বাড়িতে তার শেষ দিন।
গাড়িতে উঠে উদ্যান খেয়াল করল ফুল ঘুমিয়ে পড়েছে তার বাবার কোলে। তাশরিফ ফোনে ব্যবসায়িক কোনো কথা বলতে ব্যস্ত। এই ফাঁকে উদ্যান আঁড়চোখে একবার তাকাল ফুলের দিকে। মেয়েটার মাথায় রেশমের মতো লম্বা চুল, যা যত্ন করে দুপাশে ঝুঁটি করা। ঘুমের ঘোরে তার গোলাপি ঠোঁট দুটো ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছে। থুতনিতে একটা কালচে লাল দাগ; দুদিন আগে হাঁটতে হাঁটতে মুখ থুবড়ে পড়ে গিয়ে ব্যাথা পেয়েছিল মেয়েটা। তাশরিফ খবর পেয়েই সব কাজ রেখে ছুটে এসেছিলেন ডাক্তার নিয়ে।
“তোমার স্কুল ফ্রেন্ডদের সাথে আজ পরিচয় করিয়ে দিয়ো।” তাশরিফের কথায় ধ্যান ভাঙল উদ্যানের। সে চোখ সরিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, “আমার কোনো ফ্রেন্ড নেই।”
তাশরিফ হতাশ হয়ে বললেন, “তোমাকে বলেছিলাম কয়েকজন বন্ধু বানিয়ে নিতে। এখনো পারোনি?”
“আমি ইন্টারেস্টেড নই।”
তাশরিফ দ্বিরুক্তি করলেন না। উদ্যান বলল, “বাবা শুনুন।”
“হ্যাঁ।”
উদ্যান প্রায় নিঃশব্দে বলল, “আপনার সাথে কথা ছিল।”
“কোন ব্যাপারে?”
“মায়ের ব্যাপারে।”
“হুম বলো, শুনছি।”
উদ্যান বলতে গিয়েও ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে থেমে গেল। এই ড্রাইভার কাজে নতুন জয়েন হয়েছে। তাই উদ্যান চাইল না তার সামনে বলতে। সে ঠোঁটে জিভ বুলিয়ে বলল, “বাড়িতে ফিরে বলবো।”
পেরেন্টস মিটিং শেষে তাশরিফ উদ্যান ফুলকে নিয়ে স্কুল থেকে বেরিয়ে এলেন। পথিমধ্যে কতগুলো রঙবেরঙের বেলুন দেখে ফুল মাথা তুলে চাইল। এতোক্ষণ যাবত সে শান্তশিষ্ট বাচ্চা হয়ে থাকলেও এবার সে হাত বাড়িয়ে বায়না করতে লাগল, “মাম… বেলুন।”
তাশরিফ ফুলের গালে চুমু খেয়ে বললেন, “ফুলের বেলুন চাই?”
ফুল সজোরে মাথা নাড়ল। তাশরিফ পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করতে গিয়ে দেখলেন পকেট খালি। তাকে খোঁজাখুঁজি করতে দেখে উদ্যান প্রশ্ন করল, “পাচ্ছেন না?”
তাশরিফ বিচলিত হয়ে বললেন, “ফোনটাও পাচ্ছিনা। মনে হচ্ছে চেয়ারের ওপরেই রেখে এসেছি।”
উদ্যান আবারও স্কুলের ভেতরে রওনা হলো।
“আপনি দাঁড়ান, আমি গিয়ে খুঁজে আনছি।”
উদ্যান চলে যাওয়ার পর তাশরিফ পকেটে হাতড়াতে গিয়ে আনমনে ফুলকে কোল থেকে নামিয়ে দিলেন। তখনই ফুল দেখল সেই বেলুনওয়ালা চলে যাচ্ছে। ফুল ছুটে গেল সেই বেলুনওয়ালাকে ধরতে।
এদিকে ভালো করে খুঁজেও না পেয়ে হতাশ হলেন তাশরিফ। হঠাৎই মনে পড়ে গেল ফুলের কথা। তিনি আশেপাশে নজর বুলিয়ে ফুলকে দেখতে না পেয়ে সামনে তাকালেন। তখনই দেখলেন ফুল প্রায় মাঝরাস্তায় চলে গেছে। তিনি কোনো দিকে না তাকিয়েই ফুলকে আটকাতে চলে গেলেন। উদ্যানও ততক্ষণে মানিব্যাগ আর ফোন খুঁজে নিয়ে ফিরে এল।
তাদেরকে গেটের বাইরে খুঁজে না পেয়ে উদ্যান এগিয়ে আসতেই দেখল ফুল রাস্তার ওপাশে চলে গেলেও তাশরিফ কেবলই রাস্তায় পা রেখেছে অমনি একটা প্রাইভেট কার এসে চোখেরই পলকে ধাক্কা মেরে দিয়েছে তাকে।
উদ্যান কোনো শব্দ উচ্চারণ করার সময় টুকুও পেল না তার আগেই তাশরিফের শরীর টা ফুটবলের মতো ছিটকে পড়ল রাস্তার বিপরীত দিকে। পরপরই এক দানবীয় বাস তার পা দুটো পিষে দিয়ে চলে গেল। ফুলও দেখল পুরোটা, বাচ্চা মেয়েটা মামার কাছে দৌড়ে যেতে নেবে তার আগেই সেই বেলুনওয়ালা আটকালো তাকে।
আরও একবার উদ্যান অসহায় হয়ে পড়ল আজ। সে বাকিদের সহায়তায় তাশরিফকে অ্যাম্বুলেন্সে তুলল। বেলুন ওয়ালা তার কোলে ফুলকে বসিয়ে দিতেই উদ্যান কটমট চোখে তাকাল ছোট্ট ফুলের দিকে।
“আমার ইচ্ছে করছে তোকে রাস্তায় ফেলে রেখে চলে যেতে।” তার কথা শুনে ফুল দুহাতে আঁকড়ে ধরল তার গলা। “মাম ব্যাতা পেয়েচে।”
“হ্যাঁ তোর জন্যই পেয়েছে, তোর মা আমার মা-বোনকে মে’রে ফেলেছে। আর তুই এখন আমার বাপকে মে’রে ফেলতে চেয়েছিস।”
ফুল তার কথাগুলো একেবারেই বুঝতে পারল না। তার কান্নার শব্দে উদ্যানের মাথায় রক্ত উঠে গেল। সে তার হাত ছাড়িয়ে তাকে নিজের মুখোমুখি এনে শক্ত গলায় বলল, “আমার বাবার জন্য দোয়া কর। কারণ যতক্ষণ তার নিঃশ্বাস চলবে তুইও ততক্ষণই বেঁচে থাকবি।”
বর্তমান!
“ও আবারও জ্ঞান হারিয়েছে তেহ।” সোহমের কথায় উদ্যান পাশ ফিরে চাইল তার দিকে। কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে আবারও ফুলের মুখে পানি ঢেলে দিল। কিন্তু এবার আর ফুলের মাঝে প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেল না।
উদ্যান আর দেরি করল না। এক ঝটকায় ফুলকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। পানিশমেন্ট রুমের দরজা ঠেলে সে যখন বেরোতে যাবে, তখনই লুহানের প্রশ্ন তাকে থামিয়ে দিল।
“আঙ্কেলের কী হয়েছিল তারপর?”
উদ্যান থমকে দাঁড়াল। শক্ত হয়ে উঠল তার চোয়াল। সে সামনের দিকে তাকিয়েই যান্ত্রিক স্বরে বলল, “সেদিন ওনার পা দুটোর সাথে ওনার ভাগ্যটাও থেঁতলে গিয়েছিল। দীর্ঘদিনের জন্য কোমায় চলে গিয়েছিলেন তিনি। ওনার দুটো পা-ই পুরোপুরি প্যারালাইজড হয়ে গিয়েছিল, যা পরবর্তীতে ডাক্তাররা কেটে বাদ দিতে বাধ্য হয়েছেন।”
মেলো শিউরে উঠে জিজ্ঞেস করল, “বেঁচে আছেন তিনি এখনো?”
উদ্যান ভণিতা করে উত্তর দিল, “উত্তর তো তোদের চোখের সামনেই আছে।”
সোহম বুঝে নিয়ে বলল, “তার মানে ওনার নিঃশ্বাস এখনো সচল আছে। নইলে পেইনফুল বেঁচে থাকতো না। কি তাইতো?”
উদ্যান এবার নিরুত্তর রইল। লুহান আবারও প্রশ্ন ছুড়ল, “মেক্সিকো যাওয়ার পর তোর সাথে যা যা ঘটেছিল, সেগুলোও কি ফুলকে বলবি?”
উদ্যান কিছুটা রুক্ষ স্বরে বলল, “সেসব জেনে ও কী করবে? যেটুকু জানার প্রয়োজন ছিল জানিয়ে দিয়েছি। আর তোদেরও অনেক অভিযোগ ছিল, সবার ব্যাকস্টোরি আমি জানি কিন্তু আমারটা কেউ জানিস না। নে জানিয়ে দিলাম। বি হ্যাপি নাউ!”
লুহান মুখ বাঁকিয়ে আওড়াল, “হ্যাপি হবো? আদৌ হ্যাপি হওয়ার মতো কিছু ছিল কি?”
উদ্যান বেশ বিরক্ত হলো। সে ফুলকে নিয়ে সার্ভেন্ট রুমে ঢুকে তাকে বিছানায় শুইয়ে দিল।
“এতো অল্পতেই বেহুশ হয়ে গেলে আমার সবচেয়ে খারাপ রূপটা সহ্য করবি কীভাবে?” বিড়বিড় করতে করতেই উদ্যান পকেট থেকে ফোন বের করে ডাক্তারের নম্বর ডায়াল করল।
চলবে,,,
শব্দসংখ্যা: ৩৫৫০+
(অতীত আপাতত অফ রাখা হলো। কয়েক পর্ব বর্তমান নিয়েই লেখা হবে। তারপর না হয় আমরা বাকি অতীত টুকুও জেনে নেবো। আর হ্যাঁ মন্তব্য করুন!)
Share On:
TAGS: অবাধ্য হৃৎস্পন্দন, সোফিয়া সাফা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৪
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৯
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫৬
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫৮
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব (৪০ এর বর্ধিতাংশ)
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১১
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৬ (বর্ধিতাংশ)
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন গল্পের লিংক
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৭