Golpo কষ্টের গল্প পরগাছা

পরগাছা পর্ব ৩০


পরগাছা পর্ব ৩০

ইসরাত_তন্বী

(অনুমতি বিহীন কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ)

আজ আরুষ স্বেচ্ছায় এসেছে গুঞ্জরিকার কুঠিরে। চোখে মুখে তার উপচে পড়া খুশি ভীড় জমিয়েছে। অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু পাওয়ার আশায় বুকটা শব্দ তুলে লাফাচ্ছে। এত আনন্দ আজ আকাশে বাতাসে। অসময়ে কী যেন একট পাখি সুরেলা কণ্ঠে গান ধরেছে। হয়ত আরুষের খুশিটুকু উৎযাপনের সঙ্গী হতে চাইছে। সবশেষে সে পেরেছে তার গুঞ্জনের কথা রাখতে। সব ত্যাগ করে চিরতরে ফিরে এসেছে প্রিয়তমার নিকট। এখন নিশ্চয় আরুষকে ফিরিয়ে দেওয়ার দুঃসাহস করবে না ওই কঠিন মনের রমণী? নতুন করে একটা সুযোগ নিশ্চয় দেবে? হাসিমুখে বলবে, আমি জানতাম শেখ বাবু আপনি আসবেন। আমার কথা রেখে আমাকে নিতে আসবেন। জানেন তো? আপনার সঙ্গ ব্যতীত একাকী এখানে থাকতে আমার ভীষণ কষ্ট হয়।

আকাশকুসুম কল্পনা জল্পনার মাঝেই হাসিমুখে গুঞ্জরিকার কুঠিরের দিকে এগিয়ে চলেছে আরুষ। সাইকেলটা একটু দূরেই রেখে এসেছে। হঠাৎ করে এসে গুঞ্জরিকাকে চমকে দিতে চেয়েছে। অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ হয়ে কাটা চোখটাও বাঁধেনি আজ। ছোট গামছাটা পাঞ্জাবীর পকেটে নিয়েই ছুটে এসেছে। এতে অবশ্য ভালোই হয়েছে। এতদিনে ক্ষত চোখটা বাইরের আলো বাতাসের সংস্পর্শে এল। বেশ ভালো লাগছে আরুষের।

আরুষ পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে গুঞ্জরিকার কুঠিরের সম্মুখে দাঁড়াল। বেড়ার দরজাটা আলতো করে সরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। উঠানের মাঝখানে দাড়িয়ে বড়ো একটা শ্বাস ফেলল। ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলিয়ে ডাকল,
“গুঞ্জন, গুঞ্জন? কোথায় তুমি? আমি এসেছি গুঞ্জন।”
একবার ডেকে একটু থামল আরুষ। কিন্তু ফিরতি কোনো জবাব এল না। আরুষ একটুও অধৈর্য হলো না। যদিও এটা তার চরিত্রের বিপরীত। বারকয় ডেকে নিশ্চুপ রইল। সে শুনেছে আজ আড়তে কাজে যায়নি গুঞ্জরিকা। তাহলে নিশ্চয় বাড়িতেই আছে। হয়ত তীব্র অভিমানের জের ধরে উত্তর দিচ্ছে না। কিন্তু এই অভিমান যে শিঘ্রই ফুরোতে চলেছে সেটা কি জানে আরুষের গুঞ্জন?

পেরোল বেশকিছুক্ষণ। চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে আছে। থেকে থেকে কেবল পক্ষী কুলের ডাক ভেসে আসছে। ক্ষণে ক্ষণে শীতল হাওয়া এসে শরীর জুড়ে ঢেউ খেলে যাচ্ছে। সম্মুখে প্রবাহিত নদীর পানির কলকল ধ্বনি মস্তিষ্ক যেন আরও সতেজ করে তুলছে। এতক্ষণে আরুষের মনটা কেমন যেন বিষাদ হয়ে উঠল। অদ্ভুত রকমের অনুভূত হলো। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল কুঠিরের দিকে। দাওয়ায় উঠে ফের ডাকল,
“গুঞ্জন? শুনছ তুমি? সব অভিমান ভুলে একটাবার সামনে এসো। কথা দিচ্ছি তোমার সব অভিমান ভুলিয়ে দেব আজ।”
কিন্তু না এবারও কোনো জবাব এল না। আরুষ দুই কদম অগ্রসর হয়ে দরজায় আলতো করে হাত রাখল। অমনিই শব্দ তুলে দরজাটা খুলে গেল। আরুষের দৃষ্টি ঘরজুড়ে ভাসমান হলো। কাঙ্ক্ষিত একটা মুখ খুঁজে চলল। অথচ কেউ নেই। ঘরের ভেতরে সবকিছুই সুন্দরভাবে গোছানো আছে। হঠাৎ করেই আরুষ অনুভব করল সুক্ষ্ম একটা বুকব্যথা। হাস্যোজ্জ্বল মুখমণ্ডল ম্লান হয়ে উঠল। নজরে এল মেঝেতে বিছিয়ে রাখা মাদুরের একপাশে অযত্নে পড়ে থাকা একটা সফেদ রঙা পৃষ্ঠা। আরুষ উলটো ঘুরতে নিয়েও থামল। কী যেন ভেবে ঘরের ভেতর থেকে ওটা উঠিয়ে নিল। আলগোছে মেলে ধরল। চোখের পর্দায় ভাসল গুঞ্জরিকার লেখা কয়েকটা বাক্য,

শাহরিয়ার ভাইজান,
আমি জানি আপনি আসবেন এই কুঠিরে। তখন হয়ত আমি এখানে থাকব না। চলে যাব অনেক দূরে। যতটা দূরে গেলে আর কখনো আমার সন্ধান পাওয়া সম্ভব নয়। আপনি ওই মানুষটার সবচেয়ে কাছের একজন ভাইজান। আমার অনুরোধ, সবার মতো রাস্তা আপনি অন্তত বেছে নিবেন না। তাকে ঠকাবেন না। সে এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো বোকা। অথচ একজন পুরুষের হওয়ার কথা ছিল বিচক্ষণ। আমি তাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। তার পরিবারের সবাইকে ক্ষমা করে দিয়েছি। কারোর প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। এই কথাটা আরুষ শেখ অবধি পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব আপনার ভাইজান।

                                             ইতি 
                                      আপনার বোন

আরুষের পা দুটো ভেঙে এল। হাঁটু জোড়া ভেঙে মাটিতেই বসে পড়ল। অসাবধানতাবশত আবারও চোখটা আঘাত পেল দরজার কোনায়। এতদিনের ক্ষত অথচ একটুও শুকায়নি। একেবারে তরতাজা হয়ে আছে। খোঁচা লাগতেই গলগলিয়ে রক্ত বেরিয়ে এল। মুহুর্তেই গাল, গলা বেয়ে শুভ্র রঙা পাঞ্জাবী রক্তাক্ত করে ফেলল। চোখের কোণ ঘেঁষে পানি গড়িয়ে পড়ল। তাজা রক্তের সাথে মিশে রক্তলাল পানি মেঝেতে টপটপ করে ঝরে পড়ল। চিঠিখানার ওপর ও পড়ল রক্তের একাংশ। আরুষ মুঠো ঢিলে করতেই চিঠিখানা উড়ে গেল। অবলীলায় মেঝের একপাশে পড়ে রইল। এই পর্যায়ে আরুষ মাথা নেড়ে তাচ্ছিল্য হাসল। চোখের তীব্র যন্ত্রণায় অস্পষ্ট কণ্ঠে আওড়াল,
“এই একজীবনে আমার সঙ্গের সাথী কেউ হইল না।”
পরপরই উঠে দাঁড়াল‌। কয়েক কদম হাঁটতে যেয়ে অনুভব করল পা দুটো ভীষণ ভারী অনুভব হচ্ছে। এই জীবন ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। আলগোছে পাঞ্জাবীর পকেট হাতড়ে গামছা বের করল। কপাল সহ আঘাতপ্রাপ্ত চোখটা বেঁধে নিল। তবে তাতে রক্তের স্রোত বাঁধ মানল না। সবসময়ের মতোই এইসবে ভ্রুক্ষেপ নেই ছেলেটার। প্রস্থান করল ওখান থেকে। এসেছিল এক আকাশ সমান আশা নিয়ে অথচ ফিরতে হলো শূন্য হাতে।
.

গুঞ্জরিকা যখন লঞ্চ থেকে ঘাটে নেমে দাঁড়াল তখন সূর্যিমামার অবস্থান ঠিক মাথার উপরে। ঘাট থেকে মানুষের পিছু পিছু হেটে এসে একটা রাস্তায় উঠল। চারপাশ একনজর দেখল। অথচ কোথাও গ্রামের মতো শান্তি নেই, স্বস্তি নেই। চারপাশে বড়ো বড়ো দালানকোঠা দাঁড়িয়ে আছে পাথরের মতোই। রাস্তা দিয়ে চলাচল করছে হরেক রকমের যানবাহন। যার অধিকাংশই গুঞ্জরিকা কখনো নিজের চোখে দেখেনি। গাছপালা নেই পর্যাপ্ত। আচ্ছা কনক্রিটের শহরের মানুষগুলো অক্সিজেনের অভাবে মারা যায় না? কীভাবে থাকে এখানে? দুঃখ বিলাস কোথায় করে? প্রকৃতির সঙ্গ ব্যতীত কখনো দুঃখ বিলাস হয়ে থাকে? নাকি এদের দুঃখ নাই? গ্রামের মানুষদের যে বড়ো দুঃখ। গুঞ্জরিকা একটা দোকানের পাশে দাঁড়িয়েছে। মাথার উপর একটা বকুল গাছের ছায়া এসে পড়ছে। কিন্তু তাতে গরম কম অনুভূত হচ্ছে না। কাঁধে থাকা আরিকা বিরক্তিতে বলে উঠল,
“গরম, গরম।”
গুঞ্জরিকা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল ওর দিকে। একটু সেটে দাঁড়াল দোকানের দেওয়ালের সাথে। যেন আরিকার গরম খানিকটা কম লাগে। মাথাটা ভীষণ যন্ত্রণা করছে গুঞ্জরিকার। এই শহরের সবাই তো নিজেদের মতো চলাফেরা করে। কারোর দিকে ফিরেও দেখে না। গ্রাম গঞ্জের মানুষের মতো উদার নয় এরা। এখানে টিকে থাকা যে নিজের জন্য একটা বড়ো যুদ্ধ হতে চলেছে সেটা বুঝতে আর অবকাশ নেই। হঠাৎ করেই গুঞ্জরিকার ভীষণ পানির পিপাসা পেল। সাথে যা ছিল সবটা পথিমধ্যে শেষ হয়েছে। চারিদিকে পানির উৎস খুঁজে চলল। দেখল রাস্তার অপরপাশে একটা কল আছে। মেয়েটার ক্লান্ত আননে হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই তা মিলিয়ে গেল। এত বড়ো রাস্তা কীভাবে পার হবে সে? সবসময় তো যানবাহন চলতেই আছে। কিছু মিনিট থমকে দাঁড়িয়ে রইল গুঞ্জরিকা। অতঃপর আল্লাহর নাম নিয়ে বুকে সাহস জুগিয়ে সামনে হাঁটা ধরল।

গুঞ্জরিকা কাঁপতে থাকা বুক নিয়ে হেঁটে চলেছে। ‌ কিন্তু রাস্তার মাঝ বরাবর আসতেই একটা চলন্ত চার চাকার গাড়ি এসে ধাক্কা দিল। আরিকাকে বাঁচাতে যেয়ে গুঞ্জরিকা নিজে ছিটকে পড়ল রাস্তার একপাশে। মুখ থেকে ঘোমটা সরে গেল। তৎক্ষণাৎ ব্রেক কষে গাড়িটা থেমে গেল। গুঞ্জরিকা জোরাল আঘাত পেল মাথা, হাঁটু এবং হাতের কনুইয়ে। তবে তা সয়ে নেওয়ার ক্ষমতা তার আছে। নিজ থেকেই উঠে বসল। মাথাটা ধরে বসে রইল। আরিকা উড়ে পাশের একটা গাছের ডালে বসেছিল। মাকে উঠে বসতে দেখেই উড়ে এসে পুনরায় কাঁধে বসল। মাথায় ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,
“মা, মা।”
গুঞ্জরিকার আঘাতের যাতনা যেন মিইয়ে এল এই ডাকের কাছে। আলতো করে আরিকার গায়ে হাত বুলিয়ে দিল,
“ভয় নেই, আমি ঠিক আছি বাচ্চা।”
আরিকা খুশি হলো। তক্ষুনি গাড়ির দরজাটা খুলে গেল। গুঞ্জরিকা তাকাল সামনের দিকে। সরু হিল পরিহিত একজোড়া ফর্সা পা রাস্তায় দৃশ্যমান হলো। পরপরই একজন মধ্যবয়সী নারী বের হয়ে এল গাড়ি থেকে। লম্বা চওড়া শরীরে তার সাদা রঙের শাড়ি জড়ানো। কব্জি ছুই ছুই একটা কালো রঙের ব্লাউজ শাড়িটার সাথে মিলিয়ে পরেছে। হাঁটু সমান সুদীর্ঘ কৃশলা বিনুনি করে পিছনে ফেলে রাখা আছে। সেই বিনুনির ফাঁকে ফাঁকে ঠাঁই পেয়েছে টকটকে লাল গোলাপ। বাম হাতে একটা দামি ঘড়ি চকচক করছে। সামনে উপস্থিত নারীর সবকিছুতেই আভিজাত্যের ছোঁয়া লেপ্টে আছে। গুঞ্জরিকার হৃৎস্পন্দন থমকাল কিছু সময়ের জন্য। ভীষণ পরিচিত একটা মুখের আদলের সাথে মিল পেল। এতটা মিল আদৌ সম্ভব? তবে গুঞ্জরিকা শুনেছে এক চেহারার মানুষ পৃথিবীতে সাতজন থাকে নাকি। তাছাড়া ওনাকে দেখেই মনে হচ্ছে বড়ো ঘরের কেউ হবে। সেখানে কীভাবে কী! ধ্যাত কী সব ভাবছে। গুঞ্জরিকার একটু ভয় হলো। নিজেকে গুটিয়ে নিল। কিন্তু ওকে অবাক করে দিয়ে অপরপক্ষ থেকে ভেসে এল রিনরিনে নরম কণ্ঠের মিষ্টি আওয়াজ,
“ঠিক আছ মা? খুব বেশি আঘাত পেয়েছ কি?”
গুঞ্জরিকা দ্রুত দুদিকে মাথা নাড়ল। মাথায় ঘোমটা তুলে নিজের পুঁটলি ঠিকঠাকভাবে বেঁধে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। বলল,
“আমি ঠিক আছি।”
অপরপক্ষ ফের জানতে চাইল,
“এখানে নতুন নাকি তুমি?”
গুঞ্জরিকা মাথা নেড়ে বলল,
“জি, অনেকটা সেরকমই।”
অপরপক্ষ কিছুক্ষণ নীরব রইল। গুঞ্জরিকাকে একপলক উপর থেকে নিচ অবধি পর্যবেক্ষণ করল। ঠোঁটের কোণ ঘেঁষে মুচকি হাসির রেশ ছড়াল। হাতে থাকা পার্স ব্যাগ থেকে একটা এক হাজার টাকার নোট বের করে গুঞ্জরিকার দিকে এগিয়ে দিল,
“এটা রাখো। এখান থেকে সোজা মিনিট দশ হাঁটলেই একটা হাসপাতাল পাবে। ওখান থেকে ডাক্তার দেখিয়ে নিজের জন্য ঔষধ কিনে নিও।”
গুঞ্জরিকা সাথে সাথেই নাকচ করে দিল,
“ধন্যবাদ তবে এটার প্রয়োজন নেই। আমি এখানে কাজের জন্য এসেছি ভিক্ষা করে খেতে নয়। ওটা আপনি অসহায় কাউকে দিয়ে দিলে ভালো হবে।”
মুখের কথা শেষ করে ভদ্রমহিলার পাশ কাটিয়ে ওখান থেকে চলে গেল গুঞ্জরিকা। কলের দিকে হাঁটা ধরল। ভদ্র মহিলার গাড়ির ড্রাইভার সহ পিছনের গাড়িতে অবস্থান করা সকলে হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। এই অপরিচিত মেয়ের কী দুঃসাহস! কার সাথে এভাবে কথা বলল আদৌ জানে? তার চেয়ে বড়ো অবাক হলো এরকম প্রত্যাখ্যানের পরেও ভদ্রমহিলার অধরে লেপ্টে আছে স্নিগ্ধ মুচকি হাসি। কী আশ্চর্য!
.

যোহরের নামাজের পরে সবাই মসজিদ থেকে প্রস্থান করেছে। থেকে গেছে কেবল শেখ বংশের ছেলেটা। কুঠির থেকে শেখ বাড়িতে গিয়েছিল। নিজেকে পবিত্র করেই ছুটেছে এখানে। ইহজগতে এখন তার কাছে শান্তির স্থান বলতে আল্লাহর দরবার। যেখানে পদযুগল ছোয়ালে অদৃশ্য কোনো শক্তিতে মনটা একেবারে শান্ত হয়ে যায়। কিন্তু আজ যেন একটু ব্যতিক্রম হলো ছেলেটার ক্ষেত্রে। ঘন্টার ও বেশি সময় অবস্থান করছে মসজিদে কিন্তু একদণ্ড শান্তি পাচ্ছে না। হয়ত একনিষ্ঠভাবে মনোযোগ দিতে পারছে না এজন্যই এরকমটা হচ্ছে।

আরুষ নিয়ত বেঁধে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে আছে। পড়ছে সূরা। রুকুতে যাওয়ার সময় অনুভব করল শরীরের সব শক্তি ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে। তবুও অটল মনোভাব রেখে সিজদাহ এর জন্য বসতেই আপনা আপনিই হাঁটু জোড়া ভেঙে গেল। দেহটা অতিরিক্ত দূর্বল থাকার দরুন এমনটা হলো বৈকি। আরুষ সিজদাহতে লুটিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। পুরুষালী কান্নার আওয়াজ মসজিদের চারপাশ থেকে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। ছেলেটার কান্নার করুন শব্দে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। সব হারিয়ে নিঃস্ব ছেলেটার হৃদয়বিদারক কান্নার সুরে চারপাশের সবকিছু যেন স্তব্ধ হয়ে রইল। শাখা প্রশাখার নড়াচড়া থামিয়ে বৃক্ষের দলেরা স্থির হয়ে আছে। শোকের ছায়ায় সবকিছু মূর্ছা যাওয়ার উপক্রম।

শেখ বাড়িতে আরুষের জন্য অপেক্ষারত সকলে। রোকেয়া শেখ কোমরের অসহনীয় ব্যথায় কঁকিয়ে চলেছেন। একেবারে বিছানা বন্দি অবস্থা। তাছাড়া দূরের ঘাটে যেতে হবে। গরুর গাড়িও আস্তে ধীরে চালাতে হবে। দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। কিন্তু ছেলেটা কোথায় গেছে? কী করছে? গোছগাছের একটা বিষয় ও তো আছে। অপরদিকে আয়েশা শেখের অবস্থা যায় যায়। প্রতিবেশীরা কানাঘুষা করছে হয়ত আজকের রাতটা যাবে না। সালেহা শেখ কোরআন শরীফ পড়ছেন মায়ের পাশে বসে। অদিতি একবার মায়ের কক্ষ আরেকবার দাদীর কক্ষ এভাবেই ছোটাছুটি করছে। চন্দ্রা নিজেকে ঘরবন্দি করেছে। বের হয়নি সেই ঘটনার পরে। পরিবারের সাজানো গোছানো সবকিছু কেমন যেন ক্রমশ উলট পালট হয়ে যাচ্ছে। হয়ত নিয়তিতে এটাই ছিল।

আরুষ শেখ বাড়িতে ফিরল তিনটা নাগাদ। মায়ের করুণ অবস্থা দেখে সবাইকে জানাল আসরের আজানের আগেই বেরোতে হবে। রাস্তা ঘাটের বিষয় তো। হাতে সময় নিয়ে বেরোনোই উত্তম। নামাজ সে গাড়িতেই পড়ে নিবে। সেই মোতাবেক সবকিছু গোছানোতে লেগে পড়ল অদিতি এবং আসমান শেখ। আধাঘণ্টার মধ্যেই সবকিছু ঠিকঠাকভাবে গোছানো সম্পন্ন হলো। মেজবাহ ততক্ষণে গরুর গাড়ি এনে উপস্থিত করেছে। সদর দরজার ওপাশে অপেক্ষা করছে গাড়োয়ান। এইটা শেখদের নিজস্ব গরুর গাড়ি। রোকেয়া শেখকে আসমান শেখ এবং আরুষ ধরে এনে গাড়িতে শুইয়ে দিল। মেজবাহ একে একে প্রয়োজনীয় সবকিছু এনে গাড়িতে রাখল। আরুষ বাড়ির ভেতরে চলে গেল। রোকেয়া শেখের কাছে আসমান শেখ থাকল। মায়াভরা দৃষ্টিতে প্রিয়তমার নেতিয়ে পড়া মুখটা দেখে চলল। মনটা ভীষণ অস্থির লাগছে। মন চাইছে ছেলে বউয়ের সাথে যেতে কিন্তু মায়ের এই অবস্থায় সেটা কখনোই সম্ভব নয়। জীবনে এমন কঠিন সময় আসবে তিনি কখনোই ভাবেননি। ভাগ্য ওনার জন্য এতটা নির্দয় কেন হলো? আসমান শেখের গাল বেয়ে কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল। আলতো করে রোকেয়া শেখের ডান হাতটা ধরলেন। রোকেয়া শেখ ব্যথায় চোখ মুখ খিচে বন্ধ করে আছেন। চেয়েও পারলেন নেত্র যুগল মেলে তাকাতে। কেবল শক্ত করে স্বামীর হাতটা ধরে রাখলেন।

আরুষ শেষ বারের জন্য আয়েশা শেখকে দেখতে এল। এখন তো বেশ কিছুদিন দেখা হবে না দাদীর সাথে। আম্মাকে নিয়ে কতদিন নগরে থাকতে হবে কে জানে! দাদীকে সে বড়ো ভালোবাসে। আয়েশা শেখের কাছে তো আরুষ তার সবকিছু। পৃথিবীর সবাই একদিকে আর আরুষ দাদুভাই একদিকে। আরুষ শ্লথগতিতে এগিয়ে এসে আয়েশা শেখের পাশে দাঁড়াল। আয়েশা শেখের মুখের এক পাশের মাংশ পঁচে শেষ। আবার শরীরের কিছু জায়গাতেও চামড়া খসে পড়ছে। তাই আজ দুপুর নাগাদ মেঝেতে বিছানা করে ওনাকে নামিয়ে রাখা হয়েছে। আয়েশা শেখের পাশে বসল আরুষ। আলতো করে মাথার চুলের ভাঁজে আঙ্গুল ছোঁয়াল। পরপরই আয়েশা শেখের শীর্ণ ডান হাতটা নিজের দুহাতের মুঠোয় পুরে চুমু খেল। সেখানে মাথা রেখে নীরবে বসে রইল। নিস্তব্ধ কক্ষে কেবল শোনা যাচ্ছে সালেহা শেখের উচ্চারিত কোরআন তেলাওয়াত। আরুষের বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। দৃষ্টি তুলে তাকাল দাদীর মুখের দিকে। মানুষটা সবার ক্ষেত্রে খারাপ হলেও আরুষের ক্ষেত্রে ছিল পানির মতোই স্বচ্ছ। কিন্তু সেই স্বচ্ছতা এখন আর নেই। তার সন্তানের খুনি পরোক্ষভাবে এই মানুষটাও। তবুও এই শেষ বেলায় দাদী নামক মানুষটাকে মনে প্রাণে ঘৃণা করতে পারল না আরুষ। মুখটা এগিয়ে দাদীর কান বরাবর নিল। ফিসফিস করে বলল,
“দাদী শুনছেন? আমি এবং আপনার নাত বউ আপনাকে ক্ষমা করে দিয়েছি দাদী। আপনার আর ভয় নেই। আশা রাখি আমি ফিরে আসা অবধি আপনি থাকবেন।”
আরুষ কথাগুলো বলে থামল। আয়েশা শেখের চোখের পাতা আজ সারাদিনে এতক্ষণে একটু নড়ল। আরুষ ক্ষীণ হাসল। তারমানে দাদী শুনেছেন সবটা। শীর্ণ কুঁচকানো কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল ছেলেটা।

আরুষ বাইরে এসে গরুর গাড়িতে উঠে বসল। মেজবাহ যাবে ওদের সাথে। কারণ আরুষের একার পক্ষে সবটা সম্ভব নয়। রোকেয়া শেখ হাঁটতে পারলে একাই পারত সবটা। মেজবাহ আগে থেকেই গাড়িতে বসে আছে। অদিতি মায়ের একটা হাত ধরে ছিল। শব্দ খেয়ে চুমু খেল মায়ের হাতে। আস্তে ধীরে ছেড়ে দিল হাতটা। পিছিয়ে যেয়ে আসমান শেখের পাশে দাঁড়াল। আরুষ তাকাল ওনাদের দিকে। ছোট্ট করে বলল,
“নিজেদের খেয়াল রাখবেন।”
অদিতি প্রত্যুত্তর করল,
“তুমিও ভাইজান। সাবধানে যেও। আর অবশ্যই পৌঁছে চিঠি লিখবে। অপেক্ষায় থাকব।”
আরুষ মাথা নেড়ে আচ্ছা বোঝাল। ব্যস! গরুর গাড়ি চলতে শুরু করল গন্তব্যে। আসমান শেখ একদৃষ্টে তাকিয়ে দেখলেন ওদের প্রস্থান। আজ মনটা একটুও ভালো লাগছে না।

আরুষদের যাওয়া বড়ো জোর ঘণ্টা খানেক হবে এর মধ্যেই আয়েশা শেখ শরীর ছেড়ে দিয়েছেন। শেখ বাড়িতে হইচই পড়ে গেছে‌। কান্না কাটির শব্দে প্রতিবেশীরা সবাই ছুটে এসেছে। আল্লাহর নাম কানে দিচ্ছেন একজন বৃদ্ধা। পাশেই পরিবারের সকলে বসে আছে। সালেহা শেখ হাউমাউ করে কাঁদছেন। এই পর্যায়ে একটুখানি ঠোঁট নড়ল আয়েশা শেখের। শেষ বারের মতো অস্ফুট স্বরে ডাকল প্রিয় মানুষটাকে,
“আমার দাদুভাই।”
পরপরই চোখ দুটো উলটে গেল আয়েশা শেখের। শরীর জুড়ে বারকয় ঝাঁকুনি খেলে শান্ত হয়ে গেলেন। সারাজীবনের মতো আঁখিজোড়া বুজে গেল। বৃদ্ধা বুঝতে পারলেন সবটা। ফুঁপিয়ে উঠলেন। কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
“আর নাই। কেউ সুতো আনো জলদি।”
সালেহা শেখ হাত পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। ডাকলেন,
“আমার আম্মা গো।”
সারথী হাউমাউ করে কাঁদছে। অদিতি নিষ্প্রাণ চোখে তাকিয়ে আছে দাদীর মুখটার দিকে। একজন সুতো আনতেই দাদীর দুই পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি বেঁধে দিল একত্রে। আসমান শেখের চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। প্রাণটা বোধহয় এত কষ্ট সহ্য করে আরুষের ছোট্ট স্বীকারোক্তির জন্যই বাঁধা ছিল। হাহ্! মানবজীবন। বেঁচে থাকতে আমাদের কত বড়াই, কত অহংকার। অথচ এই পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যহীন হলো মানুষ।

চলবে

(নোটবার্তা: আসসালামুয়ালাইকুম পাঠক। আজ একটু বলি? গল্পটা কিন্তু শেষের পথে। বড়ো জোর আর দুই থেকে তিনটা পর্ব হবে। একেবারে জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি কিছু মানবজীবন দেখানোর ইচ্ছা ছিল। সাথে পৃথিবীর অলিতে গলিতে থাকা কিছু সুখ-দুঃখ, সংসারের কিছু টানাপোড়েন, কয়েক প্রকৃতির মানুষ এইত‌। সেই মোতাবেকই লিখছি। আপনাদের আবদার ছিল পঞ্চাশ থেকে ষাট পর্ব করার। অথচ আমি অযথা গল্প বাড়াতে পারি না। এইটা ইজিলি পঞ্চাশ পর্ব লেখা যাবে। এতে আমার ফলোয়ার্স বাড়বে কিন্তু আমি গল্পটার সৌন্দর্য নষ্ট করতে চাই না। আর এন্ডিং? ওটা দারুণ কিছু পাবেন ইন শা আল্লাহ। শেষের এই পর্ব গুলোতে একটু রেসপন্স করবেন কেমন? আজকের পর্বের ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আপনাদের গঠনমূলক মন্তব্য ও রেসপন্সের আশা রাখি।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply