Golpo কষ্টের গল্প পরগাছা

পরগাছা পর্ব ৩২


যবনিকা_পর্ব

ইসরাত_তন্বী

(অনুমতি বিহীন কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ)

(৪৮০০+ শব্দ সংখ্যার পর্ব। মেইন ফেইসবুক থেকে পড়ুন।)

প্রচলিত একখানা বাক্য আছে,
‘অদৃষ্টের লিখন খণ্ডন করার সাধ্য কারো নেই।’
কথাটা চিরন্তন সত্য বাক্য। আমরা মানবকুল ভাগ্য শব্দটা এড়িয়ে চলতে পারি না। ভাগ্যে যেটা থাকবে সেটা আমাদের মেনে নিতেই হবে। সেখানে দুঃখ থাকলে তাই সই। জীবন কারো কাছে পুষ্পের বাগিচা আবার কারো কাছে যুদ্ধের ময়দান।

বহমান নদীর মতো জীবন থেকে আড়াই মাস পেরিয়েছে। প্রত্যেকে নিজেদের মতো করে গুছিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে যে জীবন চলে না। শেখ পরিবার ধ্বংসের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। আয়েশা শেখ চেয়েছিলেন শেখ বংশ এখনো কয়েক প্রজন্ম টিকে থাকুক। তার জন্য নিষ্পাপ প্রাণ হত্যার মতো সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজ তিনি করেছিলেন। অথচ তার নাতির মাধ্যমেই বোধহয় এই বংশে ইতি পড়বে। রোকেয়া শেখ প্যারালাইসড হয়ে বিছানাবন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। সেদিন আরুষের সঙ্গে নগরে গিয়ে ডাক্তার দেখিয়েছিলেন। কিন্তু ভুলবশত ওনাকে ভুল চিকিৎসা দেওয়া হয়। তার মাসখানেক পর থেকে শরীরের বামদিকটা অচল হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে ডাক্তার দেখিয়ে আর কাজ হয়নি। সেই থেকে একাকী নিজের কক্ষে পড়ে থাকেন। দুজন মানুষ নিযুক্ত করা হয়েছে ওনার জন্য। তারা দুজন রোকেয়া শেখকে সবধরণের কাজে সাহায্য করেন। কিন্তু অন্যের উপর নির্ভরশীল জীবন যে বড়ো কঠিন। তারা কাজের বিনিময়ে মাইনে পাচ্ছে অথচ রোকেয়া শেখকে মুখ কালো করতে পিছপা হয় না। এইসব কথা অবশ্য ছেলের কানে দেন না তিনি। কেবল তাচ্ছিল্য হাসেন। একজীবনে করা পাপ তো আর কম নয়। তার বিনিময়ে এতটুকু প্রাপ্য। ইদানিং নিজের করা ভুলগুলো ওনাকে কুড়ে কুড়ে খায়। পৃথিবীর স্বল্প সময়ের ছোট জীবনে মেতে পরকাল ভুলতে বসেছিলেন। যেই জীবন অনন্ত কালের সেই জীবন নিয়ে ছিল না কোনো মাথাব্যথা। পার্থিব জীবনের ধন সম্পদের নিকট সব মিইয়ে এসেছিল। এর খেসারত কীভাবে দিবেন? মহান আল্লাহ কি ক্ষমা করবেন তাঁকে? তার করা ভুলের আদৌ কোনো ক্ষমা হয়?

রোকেয়া শেখ নিজের কক্ষে শুয়ে আছেন। দৃষ্টি নিবিষ্ট ছাদের দিকে। ভাবছেন অনেককিছুই। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে সবকিছু পরিবর্তন হয়ে গেল। একসময় বাড়িটা হৈ হুল্লোড়ে মেতে থাকত। মানুষে পরিপূর্ণ ছিল। অথচ এখন মৃত প্রায় বাড়িটা। সবাই ছুটছে একটুখানি ভালো থাকার আশায়। রোকেয়া শেখের পাশে মেঝেতে শুয়ে আছে শাবানা। কিশোরী শাবানা সারাদিন থাকেন রোকেয়া শেখের কাছেই। রাতে থাকেন মধ্যবয়স্ক একজন মহিলা। শাবানা ডাকল,
“বড়ো চাচি শুনছেন?”
রোকেয়া শেখ আলতো করে ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে দেখলেন। শাবানা ততক্ষণে উঠে বসেছে। বড়ো একটা শ্বাস ফেলে বলল,
“আজ আরুষ ভাইজান হজের জন্য ঢাকার উদ্দেশে বের হবেন। আসবেন অনেকগুলো মাস পরে। ঈদেও থাকবেন না আমাদের সাথে। আপনি খুশি তো বড়ো চাচি? আপনার পোলা হজ করবে। এমন ভাগ্য কয়জনের হয় বলুন তো?”
রোকেয়া শেখ মুচকি হাসলেন। কিন্তু চোখের কোণে জমা জলটুকু ঠিকই চিকচিক করছে। রয়ে সয়ে আস্তে করে প্রত্যুত্তর করলেন,
“আমার ছেলেটা খারাপ না রে শাবু। সে কেবল আমার অভিনয়ের কাছে অসহায় ছিল। আল্লাহ তাকে এই জীবনে উত্তম প্রতিদান দিক। আমার জন্য যা হারিয়েছে সেটা তো আর ফিরিয়ে দেওয়ার সাধ্য আমার নেই। তবে পরকালে সে তার অর্ধাঙ্গিনীকে নিয়ে উচ্চ স্থানে থাকুক এটাই চাই।”
শাবানা বড়ো আবেগী। কিশোরী বয়সের আবেগ বরাবরই ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকে। ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল মেয়েটা,
“আমি বাড়িতে যাওয়ার সময় মাঝেমধ্যেই ভাইজানকে মসজিদে বসে কাঁদতে দেখি বড়ো চাচি। আল্লাহ ভালো রাখুক ভাইজানকে।”
রোকেয়া শেখ বিড়বিড় করে আওড়ালেন,
“আমিন।”
ব্যস! দুজনের আর কেউ কোনো কথা বলল না। নীরবে পেরোল কিয়ৎসময়। খিড়কি গলিয়ে প্রবেশ করছে মুঠো মুঠো ঠাণ্ডা হাওয়া। রোকেয়া শেখ চোখ দুটো বুজে নিলেন। শাবানা ওড়নার একাংশ দিয়ে নিজের চোখ মুছল। পরপরই বিছানার একপাশ থেকে গামছা তুলে রোকেয়া শেখের সিক্ত বদন মুছে দিল। কিন্তু পরক্ষণেই আবার ভিজে গেল মুখখানা।
.

ভালোবাসা শব্দটা বড়ো স্বচ্ছ। এখানে কপটতার কোনো স্থান নেই। ভালোবাসায় রাগ, ঘৃণা, জেদ সব খাটলেও ছলচাতুরি খাটে না। কাউকে ঠকিয়ে কখনো ভালো থাকা যায় না। প্রকৃতি নীরবে এত বড়ো অন্যায় সয় না। একজন ঠকে যাওয়া মানুষের বুক চিরে বের হয়ে আসা দীর্ঘশ্বাসের ভার অনেক। সবাই এই ভার বইতে পারে না। চন্দ্রা নিজেও পারেনি। সে একাকী বেছে নিয়েছিল নিঃসঙ্গ জীবন। সম্পূর্ণরুপে নিজেকে ঘরবন্দি করেছিল। বন্ধ কক্ষে নিজের একজীবনের শেষ টুকু সাজিয়েছিল। সবসময় অতিরিক্ত হ্যালুসিনেশনে ভুগত। ভালোবাসার মৃত মানুষটার সাথে বদ্ধ ঘরে সে নিজের একটা সংসার সাজিয়েছিল। বাস করত নিজের সৃষ্ট দুনিয়ায়। যার ফলস্বরূপ সে এখন উন্মাদ প্রেমিকা নামে পরিচিত গ্রামে। সবসময় শেখ বাড়ির সামনের বড়ো বারান্দায় বসে থাকে। বড়ো চুলগুলো উস্কো খুস্কো দেখায়। ঠোঁটদুটো ফেটে চৌচির হয়ে থাকে। যেই শরীর একসময় যত্নে চকচক করত তা এখন অবহেলায় নোংরা দেখায়। বিড়বিড় করে সবসময় কী যেন জপে চলে চন্দ্রা। হাতের নখ দিয়ে মেঝেতে কিছু একটা এঁকে চলে। কখনো কখনো বা আঙ্গুল খয়ে রক্ত বেরিয়ে আসে। কিন্তু মেয়েটা সেসবে পাত্তা না দিয়ে একই কাজ করে চলে। মানুষ তাকে দেখলে দুরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা করে। কেউ কোনো কাজে শেখ বাড়িতে এলে ভয়ে ভয়ে থাকে। এই বুঝি অস্বাভাবিক আচরণ করা মেয়েটার সম্মুখে পড়ে গেল। গ্রামের বাচ্চারা শেখ বাড়ির বড়ো ফটকের সামনে এসে মেয়েটাকে দেখে আর হেসে গড়াগড়ি খায়। অথচ সেই সবে বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই চন্দ্রার। বহু আগেই সে ইহজাগতিক সবকিছু থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে।

চন্দ্রা প্রতিদিনের মতোই বারান্দায় বসে আছে। চুলগুলো মুখের উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। হাতের নখ দিয়ে মেঝে খুঁটতে ব্যস্ত। অদৃশ্য কিছু একটা লিখছে সেখানে। মুখ দিয়ে সবসময়ের মতোই উচ্চারিত হয়ে চলেছে ‘তাইমুর’ নামটা। সেই সময়ে বের হচ্ছিল আরুষ। শাহরিয়ারদের বাড়িতে যাবে দেখা করতে। বিকালে বেরোবে তো। চন্দ্রার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় স্বেচ্ছায় দাঁড়াল আরুষ। সম্মুখে পরিচিত দুটো জুতো স্থির থাকতে দেখল চন্দ্রা। মেঝে থেকে চোখ তুলে তাকাল। দেখল আরুষ দাঁড়িয়ে আছে। মুখমণ্ডলে এখন পরিবর্তন এসেছে ছেলেটার। গুঞ্জর করা শেষ আঘাতটা শুকিয়ে গেছে। সেবার রোকেয়া শেখের সাথে ঢাকাতে যেয়ে ডাক্তার দেখিয়ে ঔষধ খেয়ে ক্ষত শুকানো হয়েছে। কিন্তু তার চিহ্ন জন্মদাগের মতোই রয়ে গেছে। নিজের প্রতি করা অবহেলায় ডাক্তার বেশ বকা দিয়েছিলেন আরুষকে। চোখ নিয়ে এতটা অবহেলা করতে কাউকে তিনি দেখেননি এটাও জানিয়েছিলেন। আরও বলেছিলেন, চোখটা এরকমভাবে আর কিছু দিন থাকলে হয়ত ক্ষতস্থানে ক্যান্সারের জীবাণু জন্ম নিতে পারত। এতে আরুষ মুচকি হেসেছিল। আহামরি ভ্রুক্ষেপ করেনি। ডাক্তার আরুষের এমন নির্লিপ্ততা অবাক হয়েছিল বৈকি!
আরুষের দৃষ্টি সবসময়ের মতোই শান্ত। সবাই বলে চন্দ্রা মেয়েটা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে পাগল হয়েছে। অথচ আরুষ জানে চন্দ্রা মোটেও পাগলী নয়। সে তো কেবল তার কাল্পনিক সংসার জীবন নিয়ে ব্যস্ত। চন্দ্রা নিজেই শুধাল,
“এখনি চলে যাচ্ছেন?”
আরুষ দুদিকে মাথা নাড়ল। স্বভাবসুলভ গুরুগম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিল,
“উঁহু, বিকালে বেরোব। আগামীকাল বিকালে ফ্লাইট। আপনার সাথে হয়ত আর দেখা হবে না। কারণ ওই সময়ে আপনি কক্ষে থাকেন। দোয়া রাখবেন আমার জন্য। নিজের যত্ন নিবেন। অদিতি শিঘ্রই ফিরে আসবে। চিঠি পাঠিয়েছে আমাকে।”
চন্দ্রা জবাবে কিচ্ছুটি বলল না। একদৃষ্টে আরুষের দিকে চেয়ে রইল। গাল বেয়ে বারিধারা নামল। মেয়েটার মন চাইল অনেক কিছু বলতে। একটাবার ক্ষমা চাইতে। কিন্তু কোন মুখে চাইবে? অগত্য মুখ ফুটে একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারল না। আরুষ আর দাঁড়াল না। তার হাতে সময়ের বড্ড অভাব। এমনিতেই কাগজের ঝামেলা পোহাতে যেয়ে এইবার হজে যেতে পারবে না পারবে না করেও শেষ পর্যন্ত আল্লাহ সহায় হয়েছেন। এখন এই সুযোগ সে আর হারাতে চায় না। বড়ো বড়ো পা ফেলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই দৃষ্টি সীমার বাইরে চলে গেল। চন্দ্রা সিক্ত নেত্রযুগল নিয়ে দেখল সেই প্রস্থান। শব্দ করে তাচ্ছিল্য হাসল। এতক্ষণে বিড়বিড় করে আওড়াল,
“আমার চরিত্রের কোনো উপমা নেই। আমি অনুভূতির অন্তরালে থাকা শ্রেষ্ঠ প্রতারক।”
[সংগৃহীত]

.

বাংলাদেশে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে বেশ পরিচিত নীলগিরি পর্বত। যা বান্দরবান জেলায় অবস্থিত। এটি বান্দরবান শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে রুমা উপজেলার শৈতাল পাড়ায় অবস্থিত। চিম্বুক-থানচি সড়কের পাশে সুউচ্চ পর্বতের দেখা পাওয়া যায়। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২২০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। তাই একে ‘বাংলার দার্জিলিং’ ও বলা হয়। এখান থেকে মেঘেদের সাথে সাক্ষাৎ করা যায়।

নীলগিরি পাহাড়ের শৃঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে অদিতি এবং লাবণ্য চৌধুরী। দুজনের শরীরে জড়ানো সালোয়ার কামিজ। মাসখানেক ধরে তারা প্রকৃতি বিলাস করে চলেছে। কখনো সমুদ্র, কখনো ঘন অরণ্য কখনো বা পর্বত। শাশুড়ি বউমা স্বপ্নের মতোই সময় পার করছে। তারা অবশ্য শাশুড়ি-বউমা কম মা-মেয়ে বেশি। মাস খানেক সময় নিয়ে সবকিছু ঠিকঠাকভাবে গুছিয়ে অবশেষে তারা বেরিয়েছে দেশ ভ্রমণে। নীলগিরি পর্বত থেকে যতদূর চোখ যায় মেঘেদের ভেলা আর সবুজে মোড়ানো প্রকৃতি। চোখ এবং বুক দুটোরই প্রশান্তি এনে দিচ্ছে। অদিতি হাত উঠিয়ে সফেদ রঙা মেঘেদের ছুঁতে নিলেই সবটা মিলিয়ে যাচ্ছে। অদিতি মৃদু হেসে বুকভরে শ্বাস নিল। লাবণ্য চৌধুরী একদৃষ্টিতে তাকিয়ে অদিতির কার্যকলাপ দেখছে। এইপর্যায়ে ভদ্রমহিলা হেসে ফেললেন,
“তোমাকে এভাবেই মানায় অদিতি। সবসময় এরকমই প্রাণবন্ত থেকো। মা তোমাকে এভাবেই দেখতে চায়।”
অদিতি দূরের একটা পাহাড়ের চূড়ায় চেয়ে ছিল। লাবণ্য চৌধুরীর কথায় ওনার দিকে ফিরল। প্রথমে একটু হাসল তবে তা স্থায়ী হলো না। মুখটা ম্লান হয়ে উঠল। অদিতি বলল,
“সময় কত দ্রুত চলে যায় তাই না মা? এইত সেদিন বেরোলাম আমরা। এখন বাড়িতে ফেরার সময় চলে এল। আমাদের জীবনে স্বপ্নের মতো দিনগুলো এত সংক্ষিপ্ত কেন হয় মা?”
লাবণ্য চৌধুরীর মুখের হাসি বাড়ল। বললেন,
“সুখ আমাদের জীবনে সীমিত সময়ের জন্যই ধরা দেয়। তাই তো সুখের এত মর্যাদা। তবে দুঃখ নিও না। এইবার আমরা দার্জিলিং যাওয়ার প্রস্তুতি নেব। ইন শা আল্লাহ সামনে আমরা একসাথে চমৎকার আরও সময় কাটাব।”
অদিতি নীরবে কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখল পাশে দাঁড়ানো চমৎকার মনের রমণীকে। যার বাইরের আবরণের মতোই মনটা ভীষণ দারুণ। একজন মানুষ তার আচার আচরণে মুগ্ধ হতে বাধ্য। অদিতি কোনো কথা ছাড়া আচমকা জড়িয়ে ধরল লাবণ্য চৌধুরীকে। মুখে বলল,
“ভাগ্যিস এক জীবনে আপনাকে পেয়েছিলাম মা। নয়ত এভাবে কে আমার মন ভালো করত?”
লাবণ্য চৌধুরী থমকে দাঁড়িয়ে রইলেন। সবটা কল্পনাতীত মনে হলো ওনার নিকট। অত‌্যধিক খুশিতে চোখের কোণে পানি জমল। দুহাতে মেয়েটাকে নিজের বুকের মাঝে আঁকড়ে ধরলেন। হাস্যোজ্জ্বল কন্ঠস্বরে বেশ জোরেই বললেন,
“শুনছ পাহাড়েরা আমার মেয়ে আমাকে মা হিসেবে কবুল করেছে। এই খুশিতে আমার কি এখান থেকে ঝাঁপ দেওয়া উচিত?”
অদিতি রবীকে হারিয়ে এতদিনে প্রথমবারের মতো উচ্চস্বরে হেসে উঠল। হাসি টুকু সত্য, মন থেকে আসা। সঙ্গী হলেন লাবণ্য চৌধুরী। দুজনের হাসির শব্দে আশেপাশে থাকা মানুষেরা তাকাল। মুগ্ধ চোখে দেখে চলল। লোকে বলে, শাশুড়ি কখনো মা হয় না আর বউমা কখনো মেয়ে হয় না। আমরা মূলত আমাদের মনে ভুল ধারণা পোষণ করে থাকি। সবই হয়। তবে তা ব্যক্তি বিশেষে পরিবর্তন হয়। সবাই সব রুপে নিখুঁত হতে পারে না। আবার কেউ কেউ হয়েও থাকে। এরকম মানুষের সংখ্যা পৃথিবীর বুকে যৎসামান্য। এই সামান্য মানুষেরা আছে বলেই ধরণি এখনো এতটা সুন্দর, মনমুগ্ধকর আছে। অদিতিরা নতুন করে বাঁচতে শেখে। জীবনের নতুন অর্থ খুঁজে পায়।
.

শাহরিয়ার দুপুরের খাবার খেতে বসেছে। খাওয়া প্রায় শেষের দিকে। কমলিকা সাড়ে পাঁচ মাসের ফুলো পেটটা নিয়ে পাশেই বসে আছে। হাত পাখা দিয়ে বাতাস দিচ্ছে শাহরিয়ারকে। ববিতা শাহ্ পুকুরে গেছেন গোসল করতে। আগেকার মানুষ তিনি।‌ পুকুরের শীতল পানি ছাড়া অন্তরে স্বস্তি মেলে না। শাহরিয়ার মুখে এক লোকমা ভাত তুলে পাশে তাকাল। কমলিকাকে জিজ্ঞাসা করল,
“কখন খাবে তুমি আর মা? বেলা তো কম হয়নি।”
কমলিকা মুচকি হাসল। শাড়ির আঁচল উঠিয়ে শাহরিয়ার কপালে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘামের কণাগুলো মুছে দিল। মানুষটার গরম অত্যধিক। শীত গরম মানামানি নেই। জবাব দিল,
“মা এসে নামাজ পড়বে। তারপরই খেয়ে নেব একসাথে।”
শাহরিয়ার মাথা নেড়ে আচ্ছা বোঝাল। ফের শুধাল,
“শরীর কেমন আজ? সামনের সপ্তাহে ডাক্তারের কাছে যাব আবার।”
কমলিকা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল।‌ পনেরো দিন আগে না গিয়েছিল ডাক্তারের কাছে? তাহলে আবার এত তাড়াতাড়ি কেন! বড়ো একটা শ্বাস ফেলে বলল,
“বাচ্চা কাচ্ছা আর নিতাম না আমি। এইটাই শেষ। পুরুষ মানুষের এত ঢং দেখা যায় না। বাপের জন্মেও দেখিনি।”
শাহরিয়ার খেতে খেতে হেসে উঠল। সেভাবেই ভ্রু উঁচিয়ে প্রশ্ন করল,
“তোমার বাপের জন্মে তুমি জন্মেছিলে মেয়ে? জন্মালে তবে না দেখবে?”
কমলিকা কিছুক্ষণ হ্যাবলার মতো তাকিয়ে রইল। কথাটা ভুল বলেনি শাহরিয়ার। পরক্ষণে নিজেও হেসে ফেলল। তখন আসতে দেখা গেল আরুষকে। শাহরিয়ার এর খাওয়া শেষ। খেতে তার আহামরি সময় লাগে না। তাড়াতাড়ি হাত ধুয়ে নিল। গামছায় হাত মুছে ঘর থেকে নেমে গেল। আরুষ বাড়ির আঙিনায় আসতেই দুহাতে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরল। কেঁদে ফেলল ছেলেটা। এটা অবশ্য খুশির কান্না। আরুষের থেকে যেন শাহরিয়ার নিজেই বেশি খুশি। আরুষ হাসছে,
“আরে! আরে! কাঁদছিস তুই? মেয়েদের মতো ছিদকাঁদুনে কবে হলি দোস্ত?”
কান্নার দরুন শাহরিয়ার এর পিঠ কাঁপছে। বিগত এই আড়াই মাস শাহরিয়ার ছিল আরুষের নিত্যদিনের সঙ্গী। ছেলেটার সকল বিষাদ, ছোটাছুটির সাক্ষী সে। কত নির্ঘুম রাত দুই বন্ধু একসাথে নদীর চরে বসে কাটিয়েছে। একে অপরের সুখ দুঃখের সঙ্গী হয়েছে। যখন পাসপোর্টে ঝামেলার জন্য চিঠি এল তখন আরুষের মুখের দিকে তাকানো যেত না। ছেলেটা একপ্রকার হাল ছেড়ে দিয়েছিল। শাহরিয়ার নিজেকে সামলিয়ে বলল,
“অবশেষে তোর স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে দোস্ত। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার বড়ো একটা সুযোগ পাচ্ছিস।”
আরুষ হাসল। শাহরিয়ার পিঠে দুটো থাবা মারল,
“আল্লাহ উত্তম পরিকল্পনাকারী।”
শাহরিয়ার আরুষকে ছেড়ে দাঁড়াল। মাথা নেড়ে মৃদু হাসল,
“ভালোদের সাথে মহান আল্লাহ কখনোই অবিচার করেন না।”
একটু থেমে ফের বলল,
“চিঠিখানা দিন দশ আগেই পাঠিয়ে দিয়েছি। হয়ত এতক্ষণে গন্তব্যে পৌঁছে গেছে।”
আরুষ খুশি হলো‌। এই কথাটা জানার প্রয়োজন ছিল তার। ব্যস্ততার জন্য শোনা হয়ে ওঠেনি। কমলিকা ঘরের দাওয়ায় দাঁড়িয়ে ছলছল চোখে দুই বন্ধুর আলাপ আলোচনা দেখে চলল। সে এই ছোট্ট জীবনে এত চমৎকার বন্ধুত্ব কখনো দেখেনি। কে বলেছে স্বার্থ ছাড়া কোনো বন্ধুত্ব হয় না? তারা হয়ত আরুষ আর শাহরিয়ার এর বন্ধুত্ব দেখেনি।
.

দুপুর দুটো বেজে পাঁচ মিনিট। চৌধুরী নিবাসের পশ্চিম পাশে কাঠগোলাপের বড়ো একখানা বাগিচা আছে। চারপাশে নাম না জানা আরও অসংখ্য রকমের পুষ্পের দেখা মেলে সেখানে। ওখানে বসার জন্য সুন্দর জায়গাও করা আছে। নিজের অবসর সময় কাটানোর জন্য নিশিগন্ধ্যা চৌধুরী ওই স্থানটাই বেছে নিয়েছেন। আজও তার ব্যতিক্রম নয়। দুপুরের খাওয়া শেষ করে এসেই বসেছেন নিজের জন্য বরাদ্দকৃত চেয়ারটাতে। হাতে আজকের খবরের কাগজ। বিগত কয়েকদিন থেকে কোম্পানির কাজের চাপে তিনি একেবারেই ফুরসৎ পাচ্ছেন না। দেশ বিদেশের খবর জানার সুযোগ হচ্ছে না। বাবার সাথেও শেষ দেখা হয়েছে তিনদিন আগে। ভেবে রেখেছেন আজ রাতে বাবার নিবাসে যাবেন। ভাবনার মাঝেই কারোর উপস্থিতি অনুভব করলেন নিশিগন্ধ্যা চৌধুরী। তিনি জানেন কে আসতে পারে এই সময়ে।‌ কোনোপ্রকার অনুমতি বিহীন তার সান্নিধ্যে আসার মতো এতটুকু স্পর্ধা কার আছে। হাতের খবরের কাগজটা ভাজ করে সামনের গোল টেবিলে রাখলেন। হাসিমুখে পাশ ফিরে দেখলেন। ইশারায় একটা চেয়ার দেখিয়ে বললেন,
“বসো মা।”

পাশেই দাঁড়িয়ে আছে গুঞ্জরিকা। এখন বেশভুষায় একটু পরিবর্তন এসেছে বৈকি। তবে ইসলামের নির্ধারিত পর্দা থেকে সরে যায়নি। উলটো নিজেকে একটা গণ্ডিতে বেঁধে রেখেছে। কেবল পোশাক আশাকে একটু স্বচ্ছলতা এসেছে এইত। মেয়েটার অধরের কোণ ঘেঁষে মুচকি হাসির রেশ ছড়াল। বসল নিশিগন্ধ্যা চৌধুরীর মুখোমুখি অপর চেয়ারে। আড়াই মাস আগে সেই বিভৎস রাতে অসহায় গুঞ্জরিকাকে আশ্রয় দেওয়া মানুষটার সঙ্গ সে ত্যাগ করতে পারেনি। নিশিগন্ধ্যা চৌধুরীর মমতাময়ী ‘মা’ ডাক ফেরানোর সাধ্য তার হয়নি। থেকে গেছে তার আপনজন হয়ে এই সুবিশাল নিবাসে। তবে গুঞ্জরিকা শর্ত দিয়েছিল, সে নিজের উপার্জনের টাকায় চলবে। মুচকি হেসে সেটাও মেনে নিয়েছিলেন নিশিগন্ধ্যা চৌধুরী। দুহাতে আগলে বুকে আশ্রয় দিয়েছিলেন মেয়েটাকে। গুঞ্জরিকা যেহেতু শিক্ষিত ছিল তাই একটা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায় নিযুক্ত করেছিলেন তিনি। সেই বেতনেই গুঞ্জরিকা নিজের মতো চলে। এইত মাস খানেক আগে গুঞ্জরিকা ভীষণ জ্বরের কবলে পড়েছিল। সাতটা দিন হাসপাতালে ছুটোছুটি করলেন নিশিগন্ধ্যা চৌধুরী নিজেই। মেয়েটাকে মোটামুটি সুস্থ করে বাড়িতে আনলেন। নিজে তিনবেলা যত্ন করে সুস্থ করে তুললেন। তাঁর মতো একজন বড়ো মানুষ গুঞ্জরিকাকে চোখে হারায়। এতে অবশ্য বড্ড অবাক হয় গুঞ্জরিকা কিন্তু তা নিয়ে কখনো প্রশ্ন করা হয়ে ওঠেনি। কিচ্ছুটি জানার সুযোগ মেলেনি। সে কর্মরত কয়েকজন সহ হায়দার আলীর থেকে শুনেছে যে, তার মতো নিশিগন্ধ্যা চৌধুরীর এতটা নিকটে আজ অবধি কেউ যেতে পারেনি। ভীষণ অদ্ভুত লেগেছে বিষয়টা গুঞ্জরিকার নিকট।

নিশিগন্ধ্যা চৌধুরী একদৃষ্টে গুঞ্জরিকার দিকে তাকিয়ে রইলেন। মেয়েটার মাঝে কোনো হেলদোল না দেখে প্রশ্ন ছুঁড়লেন,
“কিছু বলবে মা?”
গুঞ্জরিকা ভাবনা চ্যুত হলো। একটু নড়ে চড়ে বসল। মুখের হাসি বজায় রেখে বলল,
“বড়ো মা কিছু বিষয় জানার ছিল।”
নিশিগন্ধ্যা চৌধুরী মাথা নাড়লেন। প্রশ্নগুলো সম্পর্কে তিনি অবগত। ঠিকই জানেন কী জিজ্ঞাসা করতে পারে সামনে বসা রমণী। তবুও হাসিমুখে অনুমতি দিলেন,
“অবশ্যই মা।”
গুঞ্জরিকা কিছুক্ষণ থমকে বসে রইল। একটু সময় নিয়ে শুধাল,
“কানাঘুষো থেকে শুনেছিলাম আপনার নাকি বিয়ে হয়েছিল বড়ো মা?”
প্রশ্নটা শোনা মাত্রই উত্তর দিলেন নিশিগন্ধ্যা চৌধুরী,
“ঠিক শুনেছ।”
গুঞ্জরিকা বেশ অবাক হলো। তার রেশ চোখ দুটোতে ছড়াল। সেভাবেই জানতে চাইল,
“তাহলে সেই সংসার কোথায় বড়ো মা? সব ছেড়ে আপনি এখানে কেন?”
নিশিগন্ধ্যা চৌধুরী অধর প্রসারিত করে হাসলেন। কিন্তু গুঞ্জরিকা খেয়াল করে দেখল সেই হাসিতে প্রাণ নেই। তবুও নিশ্চুপ রইল। উনি বললেন,
“ছয় মাসের সংসার ছিল আমার। স্বামীর মৃত্যুর পর জায়গা হয়নি শ্বশুর বাড়িতে।”
গুঞ্জরিকা আকাশ থেকে পড়ল। বুকটা ব্যথিত হলো। চোখ দুটো ভিজে এল। এত সম্পদ, এত ক্ষমতা, এত সৌন্দর্যও পারেনি একটা সংসারে জায়গা করে নিতে! হায়রে ভাগ্য! গুঞ্জরিকা কী বলবে ভেবে পেল না। তাই নীরবতাকেই প্রাধান্য দিল। গুঞ্জরিকার মনের মাঝে ঘোরপাক করতে থাকা প্রশ্নগুলো নিশিগন্ধ্যা চৌধুরী সহজেই বুঝলেন। ক্ষীণ হাসলেন,
“আমি বাবার পালিন কন্যা। যাকে তিনি এই সুবিশাল সাম্রাজ্যের রাজকন্যা বানিয়ে রেখেছেন সে তাঁর নিজের সন্তান নয়। বাবা আমাকে পেয়েছিলেন একটা লঞ্চ যাত্রায়। মৃত্যুযাত্রী আমিটাকে বাঁচিয়ে ছিলেন বাবা। বাবার কোনো সন্তান না থাকায় আমাকে নিজের মতো করে গড়ে নিলেন। আমি জানতাম মা, তুমি আসবে এই শহরে। তোমার অত্যধিক আত্মসম্মান কি-না! সেই আত্মসম্মানবোধ ঠিকই আনবে এখানে। আমি তোমার দূরের হয়েও খুব কাছের কেউ। তোমার অতীত বর্তমান সবটা সম্পর্কে আমি অবগত।”

কথাগুলো বলে নিজ থেকেই আঁখি জোড়া বুঁজে নিলেন নিশিগন্ধ্যা চৌধুরী। চেয়ারে মাথা এলিয়ে দিলেন। গুঞ্জরিকার গাল বেয়ে টপ টপ করে কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল। আকস্মিক এই কথাগুলো ঠিক হজম করতে পারল না। সুক্ষ্ম একটা বুকব্যথা অনুভব করল। আজ তার কাছে সবটা পানির মতোই খোলাসা। বড়ো মার উচ্চারিত শেষ বাক্যটা সবটা খোলাসা দিল বৈকি! গুঞ্জরিকা ইচ্ছে করেই আর কিছু বলল না। কিছুক্ষণ চুপচাপ ঠায় বসে রইল। অতঃপর বড়ো একটা শ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল। তৎক্ষণাৎ শান্ত নারী কণ্ঠে প্রশ্ন ভেসে এল,
“কোথায় যাচ্ছ?”
গুঞ্জরিকা ততক্ষণে নিজেকে সামলিয়ে নিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই জবাব দিল,
“আপনাকে ছেড়ে যাওয়ার জন্য আপনার সঙ্গ দেইনি বড়ো মা। একটু কাজ আছে তাই বাইরে যাচ্ছি। যথাসময়ে ফিরে আসব।”
নিশিগন্ধ্যা চৌধুরী তখনো নেত্র যুগল বুঁজে আছেন।‌ গুঞ্জরিকার উত্তরে চোখের পাতা মেলে তাকালেন। স্মিত হাসলেন। গুঞ্জরিকা হাসিমুখে বিদায় নিয়ে নিজের কাজে চলে গেল। তার কাজ সম্পর্কে অবগত বড়ো মা। ডাকঘরে মেয়েটার নামে বরাদ্দকৃত একটা চিঠি তিনদিন ধরে পড়ে আছে। সেটার সন্ধানেই বেরিয়েছে। কিন্তু ওই যে কিছু সময় সব মুখ ফুটে বলতে নেই। অপরপক্ষকে তারজন্য বরাদ্দকৃত জায়গাটুকু
দেওয়া উচিত। নয়ত সম্পর্কের সৌন্দর্য নষ্ট হয়।

.

১৯ দিনের ব্যবধানে সময় এগিয়েছে। চলছে জিলহজ মাস। আজকে মাসের দশতম দিন। পবিত্র ঈদুল আজহার দিন আজ। হজের সবচেয়ে ব্যস্ততম দিন। আজকের দিনের কার্যক্রমের মধ্যে পড়ে,
‘মুজদালিফা থেকে মিনা, বড়ো জামরায় (জামারাতুল আকাবা) পাথর নিক্ষেপ, কোরবানি, হলক বা কসর, তাওয়াফে ইফাদাহ ( ফরজ তাওয়াফ) ও সাঈ এবং মিনায় প্রত্যাবর্তন।’
আরুষ নিয়ম মেনে একনিষ্ঠভাবে তাওয়াফে ইফাদাহ ও সাঈ বাদে সকল কার্যক্রম পালন করেছে। আজ মিনায় অবস্থান করছে। আগামীকাল সকালে তাওয়াফের উদ্দেশে রওনা দেবে। আজ পায়ে হেঁটে ভোর থেকে সন্ধ্যা অবধি সকল কার্যক্রম পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পালন করেছে। যার দরুন ক্লান্তিতে শরীর আর সায় দিচ্ছে না। এশার নামাজ আদায় করে আরুষ বসেছে মাত্র। খাবার কিনে এনেছে সে। সেগুলো খেয়েই শুয়ে পড়ল আরুষ। ক্লান্ত থাকায় স্বল্প সময়েই ঘুমের দেশে পাড়ি জমাল।

ঈদুল আজহার দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ এগারো জিলহজ আজ। ফজরের নামাজ আদায় করে, সকালের নাস্তা সেরে, অন্যান্য মুসলিম হাজীদের সঙ্গে ছয়টা নাগাদ বের হলো আরুষ। তাওয়াফের জন্য প্রথম সারিতে দাঁড়াল। এক বার ঘুরে এসে পবিত্র কাবা শরীফ আলতো করে ছুঁয়ে দিল। প্রথম সারিতে থাকায় পবিত্র কাবা শরীফ ছুঁতে খুব একটা অসুবিধা হলো না। দুহাতে কাবা শরীফ ছুঁয়ে সেথায় মাথা ঠেকিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল আরুষ। জীবনে এই প্রথমবারের মতো মন খুলে কাঁদল ছেলেটা। কাঁদতে কাঁদতে আওড়াল,
“আমি তোমার গোনাহগার বান্দা মাবুদ। আমার পূর্বের সকল পাপ ধুয়ে মুছে সাফ করে দিও। কলুষিত মনটা স্বচ্ছ পানির মতো করে দিও। সকল প্রকার পাপ কাজ থেকে দূরে রেখো। তোমার পক্ষ থেকে হেদায়েত না দিয়ে কবরের বাসিন্দা করো না। আমার স্ত্রী, আমার গুঞ্জনকে আমার কাছে ফিরিয়ে আনার একটা সুযোগ দাও আল্লাহ। একমাত্র প্রকৃত হালাল সঙ্গী ছাড়া জান্নাতে একসাথে থাকা সম্ভব নয়। আল্লাহ, তুমি আমাকে আমার প্রিয়তমার সাথে জান্নাতে থাকার একটুকরো সুযোগ দিও।”
কান্নার দরুন পিঠ কাঁপছে আরুষের। ক্রন্দনরত গলায় সাইয়েদুল ইস্তেগফার পড়ল। ক্ষমা চাইল আল্লাহর দরবারে,

اَللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّىْ لآ إِلهَ إلاَّ أَنْتَ خَلَقْتَنِىْ وَأَنَا عَبْدُكَ وَأَنَا عَلى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ، أَعُوْذُبِكَ مِنْ شَرِّمَا صَنَعْتُ، أَبُوْءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَىَّ وَأَبُوْءُ بِذَنْبِىْ فَاغْفِرْلِىْ فَإِنَّهُ لاَ يَغْفِرُ الذُّنُوْبَ إِلاَّ أَنْتَ

বাংলা উচ্চারণ:
আল্লাহুম্মা আনতা রব্বি লা ইলাহা ইল্লা আনতা, খলাকতানি ওয়া আনা আবদুকা, ওয়া আনা আলা আহদিকা ওয়া ওয়াদিকা মাসতাতাতু, আউজুবিকা মিন শাররি মা সানাতু, আবুউ লাকা বিনিমাতিকা আলাইয়্যা, ওয়া আবুউ বি জাম্বি ফাগফিরলি, ফাইন্নাহু লা ইয়াগফিরুজ জুনুবা ইল্লা আনতা।

অর্থ:
হে আল্লাহ, তুমি আমার প্রতিপালক। তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তুমিই আমাকে সৃষ্টি করেছ। আমি তোমারই বান্দা। আমি আমার সাধ্যমতো তোমার প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকারের ওপর অটল আছি। আমি যা করেছি, তার অনিষ্ট থেকে তোমার কাছে আশ্রয় চাই। আমার ওপর তোমার দেওয়া নিয়ামতের কথা আমি স্বীকার করছি এবং আমি আমার পাপের কথাও স্বীকার করছি। অতএব, তুমি আমাকে ক্ষমা করো। কারণ, তুমি ছাড়া আর কেউ পাপ ক্ষমা করতে পারে না।

ইস্তেগফার সহ বেশ কয়েকবার তওবা পড়ল আরুষ। দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ সেভাবেই। বুকটা শান্তিতে ছেয়ে যাচ্ছে। এত শান্তি এই জীবনে আজ অবধি পায়নি আরুষ।‌ ইসলামের সঙ্গ বুঝি এতটা তৃপ্তিদায়ক হয়!
.

সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশের সময়ের ব্যবধান তিনঘণ্টা। অর্থাৎ বাংলাদেশের সময় তিনঘণ্টা এগিয়ে। সেই হিসেবে বাংলাদেশের ঘড়িতে এখন সকাল নয়টা বাজে। এদেশে আজ ভোররাত থেকেই মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। থামার কোনো নাম গন্ধ নেই। চারপাশের পরিবেশ দেখে মনে হচ্ছে সন্ধ্যা ছয়টা বাজে। আবছা আঁধারে নিমজ্জিত প্রকৃতি। অম্বর তার রোদন থামিয়েছে মাত্রই। গুঞ্জরিকার আজ বুকটা ভীষণ অস্থির লাগছে। তাই এই বৈরি আবহাওয়ায় হাঁটতে বের হলো।‌ হঠাৎ করেই কেন যেন মেয়েটার ঘরে মন দাঁড়াচ্ছিল না। অদৃশ্য কিছু একটা যেন তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। আজ শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন। আজকের এই বৃষ্টিমুখর দিনটা সে নিজের নামে বরাদ্দ করল। কারো বাঁধা নিষেধ মানবে না সে। রাখবে না কোনো পিছুটান।

গুঞ্জরিকা হাঁটতে হাঁটতে বেশখানিকটা দূরেই চলে এল। একাকী নির্জন রাস্তা ধরে হাঁটতে বেশ লাগছে। এই রাস্তাটা সবসময় এরকমই নীরব থাকে। আহামরি মানুষের চলাচল নেই। রাস্তার পাশের একটা কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে এসে দাঁড়াল গুঞ্জরিকা। কালো পিচের রাস্তা পেরিয়ে পাশের কর্দমাক্ত নরম মাটিতে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল মেয়েটা। একদৃষ্টে গাছের ডালে থাকা একজোড়া নাম না জানা পাখির দিকে তাকিয়ে রইল। ভীষণ সুন্দর একটা দৃশ্য চোখের পর্দায় ভাসল। ঠোঁটের কোণে উপছে পড়া খুশি ভিড় জমিয়েছে। আরিকাকে সঙ্গে নিয়ে আসেনি গুঞ্জরিকা। বিছানায় পাখা মেলে শুয়ে ছিল সে। তাই বিরক্ত করেনি। গাছের শাখায় বসে থাকা মেয়ে পাখিটার ভীষণ অভিমান হয়েছে। সে মুখ ফুলিয়ে অন্যদিকে ঘুরে বসে আছে। আর ছেলে পাখিটা তাকে মানানোর অনেক চেষ্টা করছে। এই পর্যায়ে মেয়ে পাখিটা ওই ডাল থেকে উড়ে অন্য ডালে যেয়ে বসল। ছেলে পাখিটাও ওখান থেকে উড়ে যেয়ে অর্ধাঙ্গিনীর পাশে বসল। সেখানে বসেও মানানোর চেষ্টা করল। কিন্তু মেয়ে পাখিটা মানল না। আবার জায়গা পরিবর্তন করল। এইসব দেখতেই গুঞ্জরিকার ঠোঁটের কোণে দৃশ্যমান স্নিগ্ধ হাসিটা বাড়ল। এটা যেন ওর আর শেখ বাবুর জীবনের মতোই জিবন্ত একখানা চিত্র। গুঞ্জরিকা পার্স ব্যাগ থেকে একটা চিঠি বের করল। যেটা গ্রাম থেকে আসা শেষ চিঠি। গুঞ্জরিকা এখানে স্থায়ী হয়ে শাহরিয়ার এর কাছে ডাকঘরের ঠিকানা দিয়ে চিঠি লিখেছিল।‌ তারপর প্রতিমাসে আরুষের থেকে একটা করে চিঠি আসে সেই ডাকঘরে। গুঞ্জরিকা ফিরতি কোনো চিঠি পাঠায় না অথচ চাতক পাখির মতোই অপেক্ষায় থাকে অপরপক্ষের একখানা চিঠির। যথাসময়ে নিজেই এসে ডাকঘর থেকে তুলে নিয়ে যায়। হাতে থাকা চিঠিটা আরুষ হজে যাওয়ার আগেই পাঠিয়েছিল। গুঞ্জরিকা সপ্তম বারের মতো সেটা চোখের সামনে মেলে ধরল। সেখানে লেখা,

গুঞ্জরিকা প্রামাণিক,
আলহামদুলিল্লাহ এইবার হজে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছেন আল্লাহ তায়ালা। পবিত্র কাবা শরীফ ছুঁয়ে মহান রব্বুল আলামীনের দরবারে তোমাকে চাইব। তোমার সম্পূর্ণ নাম থেকে ‘আমার গুঞ্জন’ সম্বোধন করার সময় ঠিক আসবে। আমি বিশ্বাস রাখি ঠিক আসবে……

গুঞ্জরিকা এটুকু পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে আওড়াল, “আলহামদুলিল্লাহ।”
ঠোঁটের কোণ থেকে আজ হাসি সরছে না মেয়েটার। আজ বড়ো আবেগী হয়ে পড়েছে সে। এই সবের মধ্যে কখন যে রাস্তার মাঝখানে এসে উপস্থিত হয়েছে টের পায়নি। একটা গাড়ির হর্নের শব্দে হুঁশ ফিরল কিন্তু ততক্ষণে অনেকখানি দেরি হয়ে গেছে। মেঘলা আকাশ বিধায় চারপাশ অন্ধকারে ছেয়ে হয়ে আছে। আলোর উপস্থিতি কম। দুটো স্বচ্ছ চোখের মণিতে প্রতিফলিত হলো বড়ো দুটো হেডলাইটের আলো। অতঃপর সেকেণ্ডের ব্যবধানে চলন্ত বড়ো একটা ট্রাকের ধাক্কায় শীর্ণ দেহখানা ছিটকে যেয়ে অনেকখানি দূরে পড়ল।‌ মাথাটা বাড়ি খেল পিচঢালা রাস্তায়। সেখানে রক্তের স্রোত বয়ে চলল। গুঞ্জরিকার বুকটা জোরে জোরে দুইবার ওঠানামা করে স্থির হয়ে গেল। ঠোঁট দুটো শেষ বারের মতো একটু নড়ল। ব্যথিত নেত্রজোড়া আস্তে ধীরে বুজে গেল। হাতের মুঠোটা আলগা হয়ে এল। এক দমকা বেনামি হাওয়া চিঠিখানা উড়িয়ে নিজের সঙ্গে নিয়ে গেল। দূর থেকে কিছু মানুষকে দৌড়ে আসতে দেখা গেল। ট্রাক গাড়িটা ততক্ষণে পাশ কাটিয়ে চলে গেছে। নয়ত ড্রাইভারকে বড়ো অঙ্কের টাকা জরিমানা দিতে হবে। এই সরু রাস্তায় বড়ো গাড়ি চালানো একপ্রকার নিষেধাজ্ঞা আছে।‌ তবুও কম সময়ে অন্যত্র যাওয়ার জন্য লোকচক্ষুর আড়ালে দুয়েকটা বড়ো গাড়ি যায় এভাবে। আকাশ ফুঁড়ে আবারও ঝমঝমিয়ে বর্ষণ নেমে এল। ভিজিয়ে দিল নিথর গুঞ্জরিকার সর্বাঙ্গ। ফর্সা আনন অধিকতর কোমল হয়ে উঠল। হাতখোপা করা কৃশলা মেলে রইল রাস্তায়। পানির সাথে এঁকেবেঁকে অদ্ভুত এক চিত্রের সৃষ্টি করল। বৃষ্টির ছন্দে রচিত হলো নতুন কিছু বাক্য,

“কিছু গল্প কখনো শেষ হয় না। মাঝপথে কেবল আমাদের থেমে যেতে হয় বাস্তবতার নিয়মে।”
.

জীবন থেকে পাঁচটা বসন্ত ফুরিয়েছে। একখানা চিঠি হাতে সেই বৃদ্ধ কৃষ্ণচূড়া বিটপীর নিচে দাঁড়িয়ে আছেন নিশিগন্ধ্যা চৌধুরী। অদ্ভুতভাবে আজও আকাশের মন ভার। এই বুঝি কান্নাকাটি জুড়ে ধরণি সিক্ত করে দিল। বইছে ঝড়ো হাওয়া। প্রতিবছর তিন মাস অন্তর অন্তর চারখানা খানা করে চিঠি আসে গ্রাম থেকে আরুষ শেখের পক্ষ হতে। নিয়ম করে সেগুলো তুলে নিজের কাছে রাখেন নিশিগন্ধ্যা চৌধুরী। অপরপক্ষ খুশিমনে অনেককিছুই লিখে থাকে সেখানে। নিশিগন্ধ্যা চৌধুরী সকল নিয়ম অমান্য করে প্রাণহীন দৃষ্টিতে নজর বোলান সেথায়। মনটা বিষন্ন হয়ে ওঠে।‌ একাকী নীরবে খুব কাঁদেন।‌ আজও মিনিট দুই পেরোতেই আসমান চিরে ঝুম বর্ষণ নামল। একটুও নড়লেন না নিশিগন্ধ্যা চৌধুরী। ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন। বিগত ছয় মাসে একটাও চিঠি আসেনি আরুষ শেখের পক্ষ থেকে। তাই তিনি বড়ো চিন্তিত।‌ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন গ্রামে যাওয়ার।‌ তাই আজ সাত সকালেই রওনা দিয়েছেন গ্রামের উদ্দেশে। আজ যেয়ে আজই ফিরবেন। পথিমধ্যে এই জায়গা পড়তেই গাড়ি থামিয়েছেন। এখানে মাঝেমধ্যেই আসেন নিশিগন্ধ্যা চৌধুরী।‌ এখানে এলে গুঞ্জরিকাকে গভীরভাবে অনুভব করতে পারেন। এই যে এখনো মনে হচ্ছে মেয়েটা তাঁর পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। মুচকি হেসে একচিত্তে তার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। হায়দার আলী গাড়ির ভেতর থেকে ছাতা হাতে বেরোতে নিলেই নিশিগন্ধ্যা চৌধুরী আঙ্গুলের ইশারায় থামিয়ে দিলেন। আধাঘণ্টা নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন। চোখদুটো রক্তিম হয়ে উঠেছে ওনার। মাথাটা বড্ড ভার অনুভূত হচ্ছে। বড়ো একটা শ্বাস ফেলে সেভাবেই গাড়িতে উঠে বসলেন।‌ হায়দার আলী কাঁদছেন। হঠাৎ ফুলের মতো উড়ে আসা মেয়েটা বড়ো মাকে জনমদুঃখী করে রেখে গেল। নিশিগন্ধ্যা চৌধুরী গাড়ির আসনে মাথা এলিয়ে দিলেন। ভাঙা কণ্ঠে আদেশ ছুঁড়লেন,
“চলুন।”
হুকুম পেতেই হায়দার আলী দ্রুত নিজের চোখ মুখ মুছে নিলেন। গাড়ি স্টার্ট দিলেন। গাড়িটা চলতে শুরু করল নিজ গন্তব্যে।
.

বিকাল চারটা নাগাদ নিশিগন্ধ্যা চৌধুরীর গাড়িটা এসে থামল শেখ বাড়ির বড়ো ফটকের সামনে। হায়দার আলী বের হয়ে এসে নিশিগন্ধ্যা চৌধুরীর পাশের দরজা খুলে দিলেন। উনি ভেতর থেকে নেমে দাঁড়ালেন। বাড়িটার দিকে তাকাতেই চোখের কোণে জল জমল। বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।‌ কতশত স্মৃতি জমে আছে এখানে। পাওয়া না পাওয়ার জীবনের সবচেয়ে সুখী ছিলেন এখানেই। বাড়ির বড়ো ফটকের লোহার গ্রিলে জং ধরে গেছে। খুলে খুলে পড়েও যাচ্ছে।‌ একসময়ের প্রাণবন্ত বাড়িটা এখন প্রাণহীন দেখাচ্ছে। শেওলা জমে দেওয়াল গুলো সবুজ হয়ে আছে। আচ্ছা, কেউ কি থাকে না এখানে? কে জানে! নিশিগন্ধ্যা চৌধুরী একঝলক চারপাশ দেখলেন। অতঃপর শ্লথগতিতে হেটে ফটকের নিকট এগিয়ে গেলেন। আলতো করে চাপ দিতেই ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ তুলে সেটা খুলে গেল। বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলেন। চারপাশে ঝোপঝাড় বেড়ে আগেকার সময়ের রাজা রানীদের ভুতুড়ে মহল মনে হচ্ছে। নিশিগন্ধ্যা চৌধুরী একটু এগিয়ে সামনে গেলেন। তৎক্ষণাৎ একটা উস্কো খুস্কো মুখ চোখের পর্দায় ভাসল। যদিও ভালোভাবে বোঝা যাচ্ছে না কিছুই। বাড়ির বড়ো বারান্দার একপাশে বসে আছে সে। নিশিগন্ধ্যা চৌধুরী পায়ে পায়ে সেদিকে অগ্রসর হলেন। মেয়েটার পাশে দাঁড়িয়ে জানতে চাইলেন,
“এটা কি আরুষ শেখের বাড়ি?”
চকিতে মুখটা ঘুরল ওনার দিকে। বদনখানা স্পষ্ট দেখতেই নিশিগন্ধ্যা চৌধুরীর সম্পূর্ণ শরীর শিউরে উঠল।‌ মাথাটা ঝিমঝিম করছে বড়ো। অপরপক্ষ কিছুক্ষণ ওনার দিকে চেয়ে জবাব দিল,
“জি।”
নতুন মানুষ দেখেও পালটা কোনো প্রশ্ন করল না? বড্ড অদ্ভুত তো! নিশিগন্ধ্যা চৌধুরী পুনরায় প্রশ্ন করলেন,
“আরুষ শেখ এখন কোথায় আছেন?”
এবারও অপরপক্ষ থেকে ঝড়ের গতিতে এক শব্দের উত্তর এল,
“কবরে।”
নিশিগন্ধ্যা চৌধুরীর কপালে ভাঁজের দেখা মিলল। ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন। বুঝলেন প্রশ্ন ব্যতীত উত্তর মিলবে না। বললেন,
“বুঝিনি তোমার কথা।”
অপরপক্ষ কিছু একটা মেঝেতে আঁকিবুঁকি করা অবস্থায় বলল,
“ছয়মাস আগে তৃতীয় বারের মতো হজে যেয়ে তাওয়াফের সময় মারা গেছেন আরুষ শেখ।”
নিশিগন্ধ্যা চৌধুরীর সম্পূর্ণ পৃথিবী দুলে উঠল। মাথা ঘুরে পড়ে যেতে নিলেই পাশের স্তম্ভ ধরে নিজেকে ধাতস্থ করলেন। নিজেকে পাপি হিসেবে গণ্য করা ছেলেটার এত নিদারুণ ভাগ্যে মন থেকে খুশিও হলেন। পরকালে অভাগা দুজন একসাথে থাকুক। জান্নাতে তাদের আবারও সাক্ষাৎ হোক। পৃথিবীর সকল বিচ্ছেদের যন্ত্রণা সেখানে অসীম সুখের বাহক হোক। ওনারা দুজন কেউ আর কোনো কথা বলল না। বেশ কিছুক্ষণ সময় পেরোল নীরবে নিভৃতে। নিশিগন্ধ্যা চৌধুরী শুধালেন,
“তোমার নাম কী মেয়ে?”
একটা নাম বিড়বিড় করতে করতেই প্রত্যুত্তর করল অপরপক্ষ,
“চন্দ্রা।”
মৃদুমন্দ গতিতে বয়ে চলা শীতল হাওয়া দুজনের শরীর স্পর্শ করে গেল। নিশিগন্ধ্যা চৌধুরীর নেত্র জোড়া ছলছল করে উঠল। জিজ্ঞাসা করলেন,
“এখানে তুমি একাই থাকো? আর কেউ থাকে না?”
চন্দ্রা বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। পায়চারী করতে লাগল। বলল,
“কেউ থাকে না। আমি আর আমার তাইমুর সাহেব থাকি। অদিতি ছিল কিন্তু সে পৃথিবী ভ্রমণে বেড়িয়েছে। মাঝেমধ্যে আসে সে।”
নিশিগন্ধ্যা চৌধুরী একটা প্রশ্নের উত্তর শুনতে মুখিয়ে আছেন। কোনো তাল বাহানা না করে সেটাই জানতে চাইলেন,
“তুমি এই পরিবারের কে হও?”
চন্দ্রা পুরো বারান্দা জুড়ে গুণে গুণে দশবার পায়চারি করে এসে নিশিগন্ধ্যা চৌধুরীর সম্মুখে থামল। বিড়বিড় করে আওড়াল,
“কেউ না।”

মেয়েটা যে নিজের মধ্যে থাকে না সেটা দিব্যি অনুভব করলেন নিশিগন্ধ্যা চৌধুরী। হয়ত সবার সাথেই এরকম ব্যবহার করে থাকে।‌ তীব্র এক চাপা কষ্ট অনুভূত হলো মনগহীনে। কিন্তু গুঞ্জরিকার নিষ্পাপ মুখটা মানসপটে ভাসতেই সেটুকু সহনীয় হয়ে এল। উনি বেশ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। পিছনে দাঁড়ানো হায়দার আলী এবং সম্মুখে দাঁড়ানো রমণীকে চমকে দিয়ে বলে বসলেন,
“কখনো যদি জানতাম আমার সন্তান হয়ে তুমি নিষ্পাপ মানুষের মন, প্রাণ হত্যার মতো পাপ কাজ করবে এমনকি কারোর সংসার ভাঙবে তাহলে এত সংগ্রাম করে তোমাকে পৃথিবীর আলো দেখাতাম না। হয় তোমার মুখে বিষ দিতাম নয়ত নিজের মুখে। তবুও তোমাকে এই পৃথিবীতে আসতে দিতাম না।”

চন্দ্রার চলন্ত পা দুটো থেমেছে। ঘাড়টা কাত করে নিষ্পাপ দৃষ্টিতে কিয়ৎসময় চেয়ে রইল।‌ অতঃপর ধপ করে নোংরা মেঝেতে বসে পড়ল।‌ শাড়ির আঁচল দিয়ে কিছু একটা লিখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। নিশিগন্ধ্যা চৌধুরীর গাল বেয়ে নীরবে টপ টপ করে পানি ঝরতে লাগল। চন্দ্রা বিড়বিড় করে আওড়াল,

       আমি শব্দহীন এক অভিমান
     যার ভাষা কখনো কেউ বোঝেনি

একটু থামল চন্দ্রা। মেঝেতে শুয়ে শাড়ির আঁচল দিয়ে নিজের মুখখানা ঢেকে ফেলল। অবচেতন মনে এইবার বেশ জোর গলায় বলল,
“আপনিও আমাকে বুঝবেন না। ফিরে যান। আমি বড়ো দুর্বোধ্য।”
মেয়ের শোকে নিশিগন্ধ্যা চৌধুরীর কষ্ট পাওয়ার কথা ছিল অথচ তিনি মলিন বদনে মুচকি হাসলেন। সেভাবেই বিড়বিড় করে আওড়ালেন,
“মেয়েরা একটা পরগাছার ন্যায়। বাইরে থেকে দেখতে ভীষণ সুন্দর, জীবন্ত। অথচ তাদের নিজের বলতে কিছু নেই। দিনশেষে তারা আশ্রয়স্থলের বিদায়ে নিজেদের গল্পের ইতি টানে।”

সমাপ্ত

নোট বার্তা:
১. #পরগাছা মলাট বই রুপে আসবে। এবং ফেসবুকেরটাই সংযোজন বিয়োজন করে আরও চমৎকারভাবে ইন শা আল্লাহ। বাকিটা অফিশিয়ালি প্রকাশনা এবং আমার পেইজ থেকে জানানো হবে।
২. পর্ব ২৮ থেকে আমি এডিট করেছি।‌ ভুল ছিল কিছু বিষয়। এবং পরবর্তীতে ভুল চোখে পড়লে এডিট করা হবে। যারা অন্যত্র পোস্ট করেছেন ঠিক করে নিবেন।
৩. গল্পের এন্ডিং যা ভেবেছি তাই লিখেছি। আপনাদের আবদার ও রেখেছি। তাদের মিল কোনো না কোনোভাবে হলো তো?
৪. ইয়া বড়ো পর্ব। মাইগ্রেনের যন্ত্রণা নিয়ে লিখেছি পর্বখানা। রিচেক নেই। ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আপনাদের সকলের গঠনমূলক মন্তব্যের আশায়। আজকে অন্তত নীরব পাঠকেরা সাড়া দিবেন। নিজেদের সর্বোচ্চ রেসপন্স রাখবেন রিয়্যাক্ট দিয়ে।
৫. আমার আপকামিং গল্প #ভেসেচলাআলকমেঘ। আমার লেখা প্রথম জুটি তিহান তরুকে নিয়ে লেখা হবে এটা। আগের প্লট সংযোজন করে, অনেকখানি পরিবর্তন করে, সিঙ্গেল মাদার টপিকস এবং দারুণ কিছু রহস্য নিয়ে ইন শা আল্লাহ শিঘ্রই আপনাদের সামনে উপস্থিত হবো। দোয়া রাখবেন আমার জন্য।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply