Golpo romantic golpo জাহানারা

জাহানারা পর্ব ৮০


জাহানারা

জান্নাত_মুন

পর্ব :৮০
🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ

🔞 সতর্কবার্তা:
এই গল্পে অ’কথ্য ভাষা এবং স”হিং’সতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সং’বে’দনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।

কয়েকদিন ঢাকাতেই আত্মগোপনে থেকে আজ রাত আটটায় পতেঙ্গায় এসে পৌঁছেছেন ইকবাল চৌধুরী। চট্টগ্রামে উনার বেশ ক’টি নিজস্ব বাড়ি এবং হোটেল রয়েছে। নিরাপত্তার জন্য সে-সবে আশ্রয় না নিয়ে বন্দরের নিকট একটি হোটেলে আশ্রয় নিয়েছেন। ইরহাম চৌধুরী এবং ইমরান মিলে এখানে উনার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে রেখেছে। এখন শুধু সুযোগের অপেক্ষায় আছেন। ইরহাম চৌধুরী আর ইমরান সব ব্যবস্থা করলেই বন্দর দিয়ে দেশ ছাড়বেন দুই ভাই। যদিও ইরহাম চৌধুরীর উপর সরাসরি কোনো অভিযোগ আসে নি এখন অব্ধি। কিন্তু মন্ত্রীর ছায়া সঙ্গী হিসেবে অভিযোগ আসতে কতক্ষণ। তাই ঝুঁকি নিতে চাইছেন না।

ইকবাল চৌধুরী ভোঁতা মুখ করে হোটেলের চারপাশে নজর বুলালেন। এমন একটি হোটেল ইরহাম কি করে যে বাঁচাই করল বুঝে আসছে না ইকবাল চৌধুরীর। তিনি আড়ালে তপ্তশ্বাস ছেড়ে তাঁর এসিস্ট্যান্ট মাহফুজ আহমেদের সাথে পা চালালেন। মাহফুজ ইকবাল চৌধুরীকে নিজ রুম অব্ধি পৌঁছে দিয়ে চলে যেতে লাগলেন। পিছন থেকে ইকবাল চৌধুরী ঢেকে উঠলেন,
–“ইরহাম আসবে কখন?”

–“এটা তো স্যার আমি জানি না। তবে ইরহাম স্যার আজ ভোরের আগেই দেশ ছাড়ার প্ল্যানিং করেছেন।”

ইকবাল চৌধুরী ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ ভেবে মাথা নাড়িয়ে মাহফুজকে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। মাহফুজ চলে যেতেই নিজ কামরায় ঢুকলেন। কিন্তু কপাটের পাল্লা টেনে ঘুরে তাকাতেই বিস্ময় আর এক হিমশীতল আতঙ্কে তার চোখের মণি স্থির হয়ে গেল। রুমের ভেতরে কাউচে বসে আছেন তিনজন প্রৌঢ় ব্যক্তি। তাদের পিছনে দাঁড়িয়ে আছে অ’স্ত্রধারী গার্ডস। ইকবাল চৌধুরী অস্ফুটে আওড়ালেন,
–“শাহ্’রা!”

কাউচে বসে থাকা তিনজন লোকের চেহারায় রহস্যময় হাসির উদয় হলো। লোক তিনজন ইকবাল চৌধুরীর অচেনা নয়। কারণ তাঁরা মানিক শাহ্’র তিন পুত্র, আলমগীর শাহ্, আমীর শাহ্, মিলন শাহ্। আলমগীর শাহ্ উঠে দাঁড়ালেন। হেসে ইকবাল চৌধুরীর উদ্দেশ্য বললেন,
–“বহুদিন পর দেখা, মন্ত্রী সাহেব।”

ইকবাল চৌধুরীর কপাল বেয়ে ঘাম ছুটছে। তিনি শুধালেন,“তোমরা এখানে! কি চাই?”

রুমের ভেতরটা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। আমীর শাহ্ বড় ভাইয়ের পাশে এসে দাঁড়িয়ে কৌতুক কণ্ঠে বললেন,“চৌধুরীদের সাথে কি শাহ্’দের চাওয়া-পাওয়ার সম্পর্ক, মন্ত্রী সাহেব?’’

ইকবাল চৌধুরী কোনো জুতসই উত্তর খুঁজে পেলেন না, তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। এবার কাউচ ছেড়ে আলস্য ভেঙে উঠে দাঁড়ালেন মিলন শাহ্। বড় ভাইয়ের বাঁ পাশে এসে দাঁড়িয়ে বিদ্রূপের হাসি হেসে বললেন,“চৌধুরীদের সাথে তো শাহ্দের শুধু লড়াই, হার-জিত আর কেঁড়ে নেওয়ার সম্পর্ক। কেন ভুলে গেলেন নাকি সব?”

ইকবাল চৌধুরী কথা বাড়াতে চাইলেন না। অজানা ভয়ে জড়সড় হয়ে আছেন। আশেপাশে এক নজর দৃষ্টি বুলিয়ে দেখলেন কেউ নেই এখানে তাঁর। ভয়ে পিছু পা হাঁটলেন তিনি। তাড়াতাড়ি দরজা খুলতে যাবেন তখনই দরজা খুলে ভেতর প্রবেশ করলেন মাহফুজ। ইকবাল চৌধুরী যেন একটু ভরসা পেলেন। তিনি কিছু বলতে যাবেন তার আগেই মাহফুজ হেসে জিজ্ঞেস করলেন,
–“কোথায় যাচ্ছিলেন স্যার?”

ইকবাল চৌধুরী চাপা স্বরে হিসহিসিয়ে বললেন,“শাহ্’রা এখানে কি করে এলো মাহফুজ?”

পিছন থেকে আলমগীর শাহ্ এগিয়ে আসতে আসতে সহাস্যে বললেন,“এটা আমাকে জিজ্ঞেস করলেই তো জানতে পারতে।”

ইকবাল চৌধুরী পিছনে ফিরলেন। আলমগীর শাহ্ ইকবাল চৌধুরীর কাঁধে হাত রেখে বললেন,“অনেকদিন ধরে তোমার সাথে একলা মিটিং করতে চাইছিলাম আমরা তিন ভাই মিলে। তো কদিন আগে মাহফুজ খবর দিল তুমি নাকি কু’ত্তার মতো পালিয়ে বেড়াচ্ছ। তাই তো মাহফুজকে বললাম এই সুযোগে তোমার সাথে মিটিং এর ব্যবস্থা করে দিতে।”

ইকবাল চৌধুরী ক্রোধে ফেটে পড়ে নিজের পিএ-র দিকে তাকালেন। কিন্তু মাহফুজের মধ্যে অনুশোচনার ছিটেফোঁটাও নেই। সে বরঞ্চ দৃষ্টি নত করে এক ধরনের উদ্ধত অহংকার নিয়ে সটান দাঁড়িয়ে রইল। ইকবাল চৌধুরী চোয়াল শক্ত করে চাপা স্বরে গর্জে উঠলেন,
–“বেইমান, এত বড় বেইমানি করলি। তোকে তো…”

বাক্য সম্পূর্ণ করতে পারলেন না তিনি। তার আগেই মিলন শাহ্ সহাস্যে বলে উঠলেন,“মানুষ বেইমানি করে ভালো মানুষের সাথে। আপনি কি ভালো মানুষ নাকি, মন্ত্রী সাহেব?”

ইকবাল চৌধুরী বাঁকা চোখে তাকালেন। তাঁকে ক্রোধিত হতে দেখে মিলন মজা পেলেন ভারী। ইকবাল চৌধুরী চড়া গলায় বললেন,“কেন এসেছ এখানে?”

আমীর শাহ্ বললেন, “আমরা আসি নি। তুমি নিজেই এসেছ আমাদের কাছে।”

–“কিহ্!”

ইকবাল চৌধুরী ভাবনায় ডুবে গেলেন। তার মানে এটা একটা সুনিপুণ মরণফাঁদ। মাহফুজ তাঁকে অন্য জায়গায় নিয়ে এসেছে! এখন তাহলে কি হবে! শাহ্’রা কি তাঁকে এমনি এমনি ছেড়ে দিবে! ইকবাল চৌধুরীর মনের ভয় বহিঃপ্রকাশ করলেন না। তিনি স্বাভাবিক গলায় বললেন,
–“আমাকে যেতে দাও তোমরা।”

আলমগীর শাহ্ কাঁধ দুলিয়ে হাসলেন। উনার দেখাদেখি বাকিরাও হাসল। ইকবাল বাঁকা চোখে পরিবেশটা লক্ষ্য করলেন। আলমগীর শাহ্ ইকবাল চৌধুরীর কাঁধ ধরে ভেতরে এগিয়ে যেতে যেতে বললেন,
–“তোমার সাথে তো এখনও মিটিং ই করলাম না। এখনই চলে গেলে কি করে হবে?”

ইকবাল চৌধুরী সরু চোখ করে শুধালেন,“কিসের মিটিং?”

–“এই যে আমার আব্বাজানকে মে’রে দিলে। আমার প্রাণের বড় ভাইকে মা’রলে। আমার আদরের টুকরো ছোট ভাইকে মা’রলে। অবশেষে আমার কলিজার বোনের জীবন শেষ করে দিলে। এবং তার জানাজা অব্ধি পড়িয়েছ, তোমারও তো কিছু প্রাপ্য।”

কিছু উত্তর দিতে পারল না ইকবাল চৌধুরী। মাথা নিচু করে রইলেন। বোধহয় কি ঘটতে চলছে আন্দাজ করতে পারছেন কিছুটা। তিনি নিচু স্বরে বলে উঠলেন,
–“আমি শেষবার আমার স্ত্রী’র সাথে কথা বলতে…”

কিন্তু বাক্যটা শেষ করার ফুরসতটুকুও তাকে দেওয়া হলো না। তার আগেই বন্ধ ঘরের নিস্তব্ধতা চিরে বিকট শব্দে গর্জে উঠল একটি আগ্নেয়াস্ত্র। তপ্ত বুলেটটি ইকবালের ডান কান ঘেঁষে ঢুকে বাম পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল নিমিষেই। আকস্মিক এই আঘাতে স্থবির হয়ে গেলেন তিনি। কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে নিজের দেহের ভার সইতে না পেরে ধপাস করে লুটিয়ে পড়লেন মেঝের ওপর। ধবধবে সাদা টাইলস মুহূর্তেই কালচে লাল রক্তে রঞ্জিত হয়ে উঠল। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার ঠিক আগ মুহূর্তে, আধবোজা চোখের ঝাপসা দৃষ্টিতে ইকবাল চৌধুরীর সামনে ভেসে উঠল এক মায়াবী রমণীর মুখ। তার রক্তশূন্য ফ্যাকাসে শুকনো অধরে স্মিথ হাসির রেখা ভেসে উঠল। তাঁর মন আনন্দে লাফিয়ে উঠে ডাকতে চাইল। বলতে চাইল,“আমার প্রিয় বেলিফুল, তুমি এসেছ? আমায় কেন একা ফেলে চলে গিয়েছিলে? আজ আর একা যেও না। তোমার সাথে আমাকে নিয়ে যাও।”

কিন্তু তার ‘বেলিফুল’ তাকে বুঝতে পারল না। বরং একরাশ ঘৃণাভরা দৃষ্টি ছুড়ে দিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল অন্যদিকে। ইকবালের বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যেতে লাগল। খুব কষ্ট হচ্ছে তাঁর। তাঁর খুব সখের নারী জেসমিন শেখ, তাঁর প্রিয় বেলি ফুল। সেই ফুলের চোখে তাঁর প্রতি ঘৃণা বারবার আহত করছে তাকে৷ বিগত ফেলে আসা বছরগুলোতেও ঠিক এভাবেই দগ্ধ হয়েছেন। হঠাতই তার চোখের সামনে থেকে সেই মায়াবী রমণী দূরে সরে যেতে শুরু করল, যেন ধীরলয়ে বিলীন হয়ে যাচ্ছে কুয়াশায়। ইকবালের দম বন্ধ হয়ে আসছে, নিশ্বাস ভারি হয়ে উঠছে প্রতি পলকে।
ঠিক তখন দূর থেকে অন্য আরেক রমণীর নিথর দৃষ্টি ইকবাল চৌধুরীর বুকের ভেতর যেন তীরের ফলার মতো বিঁধেছে। আহ্ কি কাতর সেই চাহনি! তাতে নেই কোনো অভিযোগ, নেই কোনো আনন্দ, নেই কোনো দুঃখ। যেন সম্পূর্ন জীবন্ত পুতুল। ইকবাল চৌধুরীর ঘোলাটে চোখের সামনে ধুলো জমা স্মৃতির সিন্দুকটা হঠাতই খুলে গেল। মনে পড়ল সেই কিশোরীটির কথা, যে প্রজাপতির মতো ডানা মেলে সারা বাড়ি চষে বেড়াত। কী মোহনীয় ছিল তার হাসির ঝংকার! আজও যেন সেই সুরের মূর্ছনা কানে বাজে। বিভ্রম কাটে। চোখের সামনে বেলিফুলের মতোই সেই রমণীও ক্রমশ ধোঁয়াশায় মিলিয়ে যেতে লাগল। অবচেতন মনে নিজের শেষ শক্তিটুকু উজাড় করে ইকবাল চৌধুরী অস্ফুটে আওড়ালেন,
–“নবু তোকে সত্যি ভালোবাসি রে। আমাকে তুই ক্ষ..”

‘ঠাসস!’—স্তব্ধতা খানখান করে দিয়ে গর্জে উঠল বন্দুকের নল। দ্বিতীয় বু’লেটটি মুহূর্তেই তার মস্তিষ্ক এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিল। চোখের সামনে থেকে মনের দুই রানীর প্রতিচ্ছবি মিলিয়ে যেতেই চিরতরে থমকে গেল ইকবালের দীর্ঘশ্বাস। নিথর হয়ে আসা দেহের আধবোজা চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু। জীবনের শেষ আর্তিটি আর পূর্ণ হলো না। তার সেই শেষ বাক্যটি অচিরেই অতল গহ্বরে হারিয়ে গেল। পৃথিবীর বুকে আর কোনোদিন বলা হবে না সেই অপ্রকাশিত কথা।
অবশেষে বিনাশ হলো এক পাপিষ্ঠের। অন্ধকার আর রক্তের ভিড়ে পৃথিবীর সব মানুষের অগোচরেই ঢাকা পড়ে রইল এই বিভীষিকাময় রহস্যের নীল পাণ্ডুলিপি।


হঠাৎ চোখের ওপর থেকে হাত সরিয়ে ধড়ফড় করে সোজা হয়ে বসলেন নাবিলা চৌধুরী। কপাল ঘেমে-নেয়ে একাকার। বুকের ভেতরটা তখনো হাপরের মতো ওঠানামা করছে। নিশ্চয়ই ভয়ানক কোনো স্বপ্ন দেখেছেন। তিনি আঁচল দিয়ে চোখমুখ মুছলেন।
অফিস থেকে কিছুক্ষণ আগেই বাসায় ফিরেছেন। শরীর আর মন দুটোই বেশ অবসন্ন ছিল। একটু জিরিয়ে নিতে সোফায় হেলান দিয়ে চোখের ওপর হাত রেখেছিলেন। ক্লান্তির ভারে কখন যে দুচোখের পাতা বুজে এসেছে, টেরই পাননি।

নাবিলা চৌধুরী ধীর পায়ে উঠে দাঁড়ালেন। আজকাল নিজেকে বড় বেশি ক্লান্ত আর দিশেহারা মনে হয় তার। সংসারের চাকা কোন দিকে ঘুরছে, সেদিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। এক অদ্ভুত উদাসীনতা গ্রাস করে নিয়েছে তাকে। চোখের সামনে বারবার ভেসে ওঠে মনিরার মুখ আর পুরোনো স্মৃতির মিছিল। কখনো বা রোকেয়া বেগমকে ঘিরে স্মৃতির মেঘ জমে ওঠে। মনের গহীনে এক অজানা আশঙ্কার বীজ দানা বাঁধছে। আগে তো কখনো এমন হয়নি! বোধহয় খুব কাছের মানুষগুলোকে এভাবে হুট করে চোখের সামনে হারিয়ে ফেলেছেন বলেই তার মনে হয়, তারা এখনো তার আশেপাশেই এক অদৃশ্য রুপে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
আর ঘুমালেই তো শুরু হয় বিচিত্র সব দুঃস্বপ্নের আনাগোনা। মনিরা এসে বারবার ডাকছে,“আপা আমার একা থাকতে ভালো লাগে না। খুব ভয় করে। আপনিও চলে আসুন না।”

এসব সাতপাঁচ ভাবতেই নাবিলা চৌধুরীর শিরদাঁড়া বেয়ে এক অদ্ভুত শীতল শিহরণ বয়ে গেল। ভয়ে দলা পাকিয়ে আসা এক দলা থুতু গিলে নিলেন তিনি। ঠিক তখনই কোথাও একটা খটখট শব্দ হতেই আঁতকে উঠে বলে উঠলেন,
–“ক..কে?”

কারো থেকে রা এল না। পুনরায় কপাল ঘামছে তাঁর। ধীরে ধীরে বেলকনির দিকে এগোতেই লক্ষ্য করলেন গাছ থেকে একটি বাঁদর লাফিয়ে অন্য গাছে চলে গেছে। নাবিলা চৌধুরী আটকে আসা নিশ্বাস ছাড়বেন, তক্ষুনি নজর আটকায় বাগানের কোণায় সদ্য কবরের পানে। সেখানে একটা লাইট ঝলঝল করছে৷ সেই সাথে কবরটিও স্পষ্ট হয়ে আছে। মনে হচ্ছে যেন কেউ ওখানে নতুন কোনো ঘর তুলেছে। শুধু তাই নয়, নাবিলার মনে হলো কবরের পাশে কেউ একজন ছায়ার মতো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই নাবিলা অনুভব করলেন, তার পেছনে কেউ একজন নিঃশব্দে এসে দাঁড়িয়েছে। এক অশুভ, শীতল ছায়া যেন তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে গ্রাস করতে চাইছে। আতঙ্কে চোখ বুজে চিৎকার করে উঠলেন তিনি। বুকের ভেতরটা কামারের হাপরের মতো অস্বাভাবিক ওঠানামা করছে, দম আটকে যেন এখনই প্রাণপাখি বেরিয়ে যাবে। কিন্তু তক্ষুনি পিছন থেকে দু’জন মেয়েলি কণ্ঠ ভেসে আসল,
–“ম্যাডাম আপনি ঠিক আছেন?”

মেইডদের চেনা কন্ঠ শুনে ধীরে ধীরে চোখ মেলেন নাবিলা চৌধুরী। ঘেমে একাকার তার মুখশ্রী। মেইড দুজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে নাবিলা চৌধুরীর উদ্দেশ্য বলল,
–“ম্যাডাম আপনার শরীর খারাপ করছে খুব? ডাক্তার ডাকব?”

নাবিলা চৌধুরী শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে রুমের ভেতর চলে আসলেন। মেয়েদেরকে বললেন,
–“আমি ঠিক আছি। তোমরা চৌধুরী ম্যানশনের আনাচে কানাচের সকল লাইট অন করে দাও। বাড়ির ভেতর একটা জায়গার লাইট যেন আজ সারারাত বন্ধ না হয়। আমি ইতির কাছে যাচ্ছি।”

নাবিলা চৌধুরী এক মুহূর্তের জন্যও নিজের ঘরে একা থাকার সাহস পেলেন না। পা বাড়িয়ে দ্রুত ইতির ঘরে চলে এলেন। ঘরে ঢুকে দেখলেন ইতি, পলি আর নোহা গোল হয়ে বসে গল্পে মেতে আছে। শাশুড়িকে ঘরে ঢুকতে দেখে পলি সসম্ভ্রমে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। নাবিলা চৌধুরী কোনো কথা না বাড়িয়ে বিছানায় উঠে মেয়ে ইতিকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। অবোধ শিশুর মতো ইতিও নিশ্চিন্তে মায়ের বুকের ওমে আশ্রয় নিল। নাবিলা চৌধুরী নোহা আর পলির উদ্দেশ্য বললেন,
–“রাত হয়েছে অনেক। তোমরা এখন নিজেদের ঘরে যাও।”

নোহা বয়না ধরে বলল,“এখন না মিমি। আরেকটু মজা..”

–“এখন রুমে যাও নোহা৷ সকালে যা করার করবে।”

নোহা গাল ফুলিয়ে ফোন নিয়ে চলে গেল৷ পলি ঠাঁই বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে রইল। নাবিলা চৌধুরী ভ্রু কুঁচকে কর্কশ কণ্ঠে বললেন,
–“কি হলো এখনো দাঁড়িয়ে কি করছ?”

আঙুলে শাড়ির আঁচল পেঁচাতে পেঁচাতে খুব নিচু স্বরে বলল,“মা ও বাড়িতে নেই। কখন আসবে জানি না। একা রুমে ভয় করে!”

নাবিলা চৌধুরীর চেহারা শীতল হল। তিনি মেয়েকে নিয়ে শুতে শুতে বললেন, “দরজা ক্লোজ করে এখানে শুয়ে পড়।”

পলি আর দ্বিতীয় বাক্য করল না। দ্রুত দরজা বন্ধ করে দিয়ে ইতির পাশে জায়গা করে নিল। আজ নিজের দুই পাশে মা আর ভাবিকে পেয়ে ইতি যেন হাতে চাঁদ পেল। সে একাই নানান গল্পের পসরা সাজিয়ে বসল। অন্যদিন হলে নাবিলা চৌধুরী নির্ঘাত ধমক দিয়ে তাকে চুপ করিয়ে দিতেন, কিন্তু আজ তার মধ্যে কোনো বিকার নেই। পলি ভীষণ অবাক হলো। বিয়ের পর থেকে সে শাশুড়িকে কখনোই এত নরম রূপে দেখেনি। আজ নাবিলা চৌধুরীকে তার কাছে সম্পূর্ণ এক ভিন্ন মানুষ বলে মনে হচ্ছে।
পলির বিস্ময় আরও বেড়ে গেল, যখন সে অনুভব করল নাবিলা চৌধুরী অতি আদরে তার বাহুতে হাত রাখলেন। অবাকের সীমা ছাড়িয়ে গেলেও পলি মুখে কিছু বলল না। একরাশ স্বস্তি নিয়ে ইতির গল্পের মাঝেই সে ঘুমের অতল রাজ্যে তলিয়ে গেল।

কিন্তু নাবিলা চৌধুরীর দুই চোখে তখনো ঘুমের লেশমাত্র নেই। মনিরার মৃত্যুর পর থেকেই ঘুম হয় কম। আজ বোধহয় ঘুম একেবারেই ছুটি নিয়েছে। তিনি চোখের পাতা বন্ধ করে রেখেই ইতি আর পলির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন।


সিআইডি সন্ধ্যা থেকে জুইকে খুঁজতে খুঁজতে এখন রাত দুইটা বেজে দশ। মীরা দেশেই ছিল। জুইয়ের নিখোঁজ হওয়ার খবর শুনে আমাদের সাহায্য করতে এসেছে। সিআইডি অফিসাররা ক্লান্ত হয়ে এখনো এদিক-ওদিক ছুটাছুটি করছে। মীরা আশেপাশের লোকাল সিসিটিভি ফুটেজ চেক করছে। জুইয়ের বাসার নিচের সিসিটিভিতে দেখা গেছে জুই যখন দোকান থেকে জিনিস কিনে পুনরায় বাসায় ফিরছিলো তখন একটা কালো গাড়ি আচমকা তুলে নিয়ে চলে যায়। মীরা সেই সূত্র ধরেই এগোচ্ছে।
আমি অস্থিরতায় গাড়ির সামনে পায়চারি করছি, প্রতিটি সেকেন্ড যেন এক একটি বছরের মতো দীর্ঘ মনে হচ্ছে। ইফান সেই তখন থেকে আমাকে শান্ত করার বৃথা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মাত্রাতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় শরীর আর সায় দিচ্ছে না, দু-দুবার মাথা ঘুরে পড়ে যেতে নিয়েও ইফানের কারণে রক্ষা পেলাম। সে শক্ত হাতে আমাকে ধরে ফেলেছিল।
ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ে আমি গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়ালাম। ইফান আলতো করে টেনে আমাকে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে উঠলো,
–“এত প্যানিক করে না। সব ঠিক হয়ে যাবে৷ আজ রাতেই খুঁজে বের করব জুইকে।”

উত্তর করলাম না আমি। ঠিক তখনই একটি গাড়ির টায়ার পোড়ানো ব্রেক কষার আওয়াজে চমকে সেদিকে তাকালাম। সিআইডি অফিসাররা তাড়াহুড়ো করে গাড়ি থেকে নেমে আমাদের দিকেই এগিয়ে আসছেন। জিতু ভাইয়া আমাকে জিজ্ঞেস করল,
–“কোথাও খোঁজ পাইনি। তুই কি কোন..”

মাথা নাড়িয়ে না করলাম আমি। হতাশ হয়ে কোমরে দু’হাত ধরে চোখ বন্ধ করল জিতু ভাইয়া। বাকি অফিসাররা গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আবিরকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। তক্ষুনি আরেকটি গাড়ি সজোরে ব্রেক কষল। সেদিকে দৃষ্টি রাখতেই মাহিনকে উদভ্রান্তের মতো গাড়ি থেকে নামতে দেখলাম। মাহিন কোনো দিক না তাকিয়ে মিরার নিকট গেল।
–“পেয়েছিস কোনো ক্লু?”

–“আই হ্যাভেন’ন রিসিভড এনি ইনফরমেশন ইয়েট।”

রাগের বেশ সজোরে গাড়িতে পাঞ্চ বসাল মাহিন। এক হাতে মাথার চুল খামচে ধরে বিড়াবিড়াল,“ইফ এনিথিং হ্যাপেন্স টু হার, আই’ল কিল দেম।”

ইফান চুপ হয়ে রইল৷ এতক্ষণ ধরে অনেক পাওয়ার, অনেক প্রতিপত্তি দেখানো হয়েছে, কিন্তু লাভ হলো শূন্য। শত্রুরা যে তাদের মতোই শক্তিশালী এবং চরম ধূর্ত, সেটা এখন দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। ইফান নিরবে কিছুটা সময় ভেবে পকেট থেকে ফোন বের করে নিল। মীরার দিকে ফোন এগিয়ে দিয়ে বলল,“ট্র্যাক দ্য লোকেশন।”

মীরা ইফানের ফোনের স্ক্রিনে তাকাতেই তার ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেল। একরাশ প্রশ্ন নিয়ে সে ইফানের চোখের দিকে তাকাতেই ইফান কেবল ইশারায় তাকে কাজ শুরু করতে বলল। মীরা আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করল না। প্রায় পাঁচ মিনিটের নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার পর সে জানাল,
–“সুইচড অফ। দ্য লাস্ট লোকেশন ওয়াজ উত্তরা চৌধুরী ম্যানশন।”

সকলের টনক নড়ে গেল। শুধু ভ্রুক্ষেপ হল না ইফানের। মীরার থেকে ফোনটি হাতে নিয়ে পুনরায় ভাবনায় ডুব দিল। কয়েক মিনিটের মধ্যে আবারও মীরার দিকে ফোনটি এগিয়ে গিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
–“দিস অলসো।”

মীরা স্ক্রিনে নজর রাখতেই যেন বিষম খেল! বিদ্যুদ্বেগে সে আবার ইফানের দিকে তাকাল। মাহিন ব্যাকুল হয়ে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল,
–“হুজ ফোন নাম্বার?”

মাহিন ফোনের স্ক্রিনে তাকানোর আগেই আড়াল করে নিল মীরা। উরুর উপর রাখা ল্যাপটপের কিবোর্ডে দ্রু হাত চালাতে চালাতে বলল,“আই’ম চেকিং।”

কয়েক মিনিটের মধ্যে মীরা বলে উঠলো,“ব্রো, ইউ’আর রাইট।”

ভাবমূর্তি বদলাল না ইফানের। মীরা ফের বলল,“বনানী ১১ নম্বর রোডের, ফ্রম দ্য নিউলি বিল্ট বার।”

আর কে কাকে পায়! সিআইডি অফিসাররা হুমরে গাড়িতে উঠে চলে গেল। মাহিন পাগলের মতো গাড়ি নিয়ে ছুটল। ইফান নিজ গাড়িতে উঠতে উঠতে আমাকে ডাকল,
–“হারি আপ অ্যান্ড গেট ইন দ্য কার।”

আমার উত্তর পেল না বরং হঠাৎ বাইকের ইঞ্জিনের গর্জন শুনে ইফান পেছনে তাকাতেই দেখল মীরার বাইক নিয়ে আমি বাতাসের গতিতে ওর চোখের সামনে দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছি। ইফানের চোয়াল দ্বিগুণ শক্ত হয়ে গেল। চেঁচিয়ে উঠল,
–“জারা, স্টপ, আই সেড। জারা..!”

চোখের সামনে থেকে বেরিয়ে যেতেই ইফান নিজ গাড়িতে সজোরে পাঞ্চ বসাল। ক্রোধে ফেটে পড়ে বিড়বিড়িয়ে আওড়ালো,“ইফ এনিথিং হ্যাপেন্স দিস টাইম, আই ওয়োন’ট ফরগিভ ইউ।”

মীরা সরে বসল। ইফান গাড়িতে উঠে এখান থেকে বেরিয়ে পড়ল তৎক্ষনাৎ।


এটি বনানীর একটি আধুনিক ও অত্যন্ত বিলাসবহুল বার। যা মূলত শহরের উচ্চবিত্তদের কাছে একটি প্রিমিয়াম জোন হিসেবে পরিচিত। বারটির ইন্টেরিয়র লাল ও নীল আলোর আবহে ডিজাইন করা হয়েছে, যা অত্যন্ত আকর্ষণীয় ঠেকছে। সারা লাউঞ্জ জুড়ে বাজছে লাউড স্পিকারে গান। সেই সাথে কোমর দোলাচ্ছে যুবক যুবতীরা। প্রত্যেকের হাতে উন্নত মানের দামি ককটেল কিংবা হুইস্কির গ্লাস লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তাদের উশৃংখল আচরণ এবং দেহের টালমাটাল বেগতিক দৃশ্য দেখে ভালোই বুঝা যাচ্ছে নেশায় বুদ হয়ে আছে প্রত্যেকে।

এলোমেলো পায়ে ছুটছে ফারিয়া। সিঁড়ি বেয়ে নামতেই নজরে পড়ল লাউঞ্জের জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন। এসব তাকে এক বিন্দু ভাবাল না। হাত-পা অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপছে তাঁর। কপাল বেয়ে ঘাম ছুটছে। চোখদুটো জলে টইটম্বুর। চোখের সামনে ভেসে উঠছে কিছুক্ষণ আগে সচোখে দেখা এক বিভৎস ঘটনা। দেহ চলতে সাঁয় দিচ্ছে না, কিন্তু তাঁকে এখন পালাতে হবে৷ যে করেই হোক পালাতে হবে।
ফারিয়া ভিড়ের মাঝখান দিয়েই আবার দৌড়াতে শুরু করল। কিন্তু উম্মত্ত মানুষের ভিড় ঠেলে সামনে এগোনো প্রায় অসম্ভব। ফারিয়া যখন মরিয়া হয়ে ধাক্কাধাক্কি করে বের হওয়ার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই এক যুবক শক্ত করে তার হাত চেপে ধরল। ফারিয়া পিছনে ফিরে তাকাতেই যুবকটি হেসে ফেলল। মাতাল কণ্ঠে বলে উঠল,
–“হ্যালো, সুইটি! উইল ইউ বি মাই ড্যান্স পার্টনার?

ফারিয়াকে কিছু বলতে না দিয়েই ছেলেটা হাত ধরে টানাটানি করতে লাগল। ফারিয়া নিজেকে ছাড়াতে আকুতি-মিনতি করছে। দানবীয় মিউজিক আর উন্মত্ত উল্লাসের ভিড়ে তার ক্ষীণ কণ্ঠস্বর কারও কান পর্যন্ত পৌঁছানোর সাধ্য নেই। উল্টো আরও বেশ কয়েকজন যুবক তাকে ঘিরে ধরে জঘন্য সব অঙ্গভঙ্গি আর কু-প্রস্তাব দিতে শুরু করল। ফারিয়ার হাত ধরে রাখা যুবকটি মেয়েটার কোমর জড়িয়ে ধরল। নিজেকে আজ ভীষণ অসহায় ঠেকছে ফারিয়ার। আপনা-আপনি চোখ বেয়ে পানি ঝরছে। নিজেকে ছাড়ানোর জন্য যখন জোরজবরদস্তির করছে তখনই পুরো লাউঞ্জ কেঁপে উঠল গুলির শব্দে। মূহুর্তেই হট্টগোল শুরু হল। ফারিয়ার সাথে জোরজবরদস্তি করতে থাকা ছেলেটা হঠাৎ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। ফারিয়া কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে সামনের দিকে তাকাতেই তার রক্ত হিম হয়ে গেল। কয়েক হাত দূরেই পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে এক বিশালদেহী পুরুষ। বারের মায়াবী লাল-নীল আলো যখন সেই লোকটির চোখের মণিতে পড়ল, মনে হলো সেখান থেকে আগুনের ফুলকি ঠিকরে বেরোচ্ছে। অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল ফারিয়ার। সে এক পা দু-পা পিছিয়ে দ্রুত ভিড় ঠেলে অন্ধকারের দিকে ছুটল। এই গোলকধাঁধায় সে কোথায় পালাচ্ছে, তার কোনো দিশা নেই। হঠাতই দূরে কারও পায়ের ভারি শব্দ কানে আসতেই সে আঁতকে উঠল। কোনো উপায় না পেয়ে দ্রুত দেয়ালের এক অন্ধকার আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে ফেলল সে।

কয়েক মুহূর্ত পর পায়ের সেই ভারী শব্দগুলো ফারিয়ার কানের একদম কাছে এসে আছড়ে পড়ল। শিকারি যেমন নিঃশব্দে বনের ভেতর শিকার খোঁজে, পা জোড়া ঠিক সেভাবেই কিছুক্ষণ এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়ালো। শেষমেশ কাউকে দেখতে না পেয়ে শব্দগুলো ধীরে ধীরে সামনের দিকে এগিয়ে মিলিয়ে গেল। ফারিয়া দীর্ঘক্ষণ সেখানে পাথরের মতো থ হয়ে বসে রইল। যখন নিশ্চিত হলো আশেপাশে আর কোনো প্রাণের স্পন্দন নেই, তখন সে অতি কষ্টে নিজের শরীরটা টেনে তুলে দাঁড়াল।
উঁকি দিয়ে দেখল আশেপাশ জনমানবশূন্য। এখনো থরথর করে কাঁপছে ভিতু মেয়েটার হাত পা। সারা চেহারা ঘামে ভেজা। সেই সাথে কিছু চুলও লেপ্টে আছে। ফারিয়া আশপাশে ভালো করে সতর্ক দৃষ্টি বুলিয়ে আড়াল থেকে বেরিয়ে আসল। কিছুক্ষণ আগে লাউঞ্জের কোলাহল এখানে আর নেই। একদম ফাঁকা এবং চারপাশ যেন অদ্ভুত অনামিশায় ডুবে আছে।

ফারিয়া সতর্কতার সাথে এক পা বাড়াতে যাবে, ঠিক তখনই তার কানের কাছে কারো তপ্ত নিঃশ্বাস এসে আছড়ে পড়ল। সেই উষ্ণ স্পর্শে ফারিয়ার শরীরের প্রতিটি রোমকূপ ভয়ে খাড়া হয়ে উঠল। ভেসে আসল অতিপরিচিত পুরুষালি হাস্কিস্বর,
–“হেই বিউটিফুল।”

কেউ যেন ফারিয়ার অন্তরাত্মা খামচে ধরেছে। তার দেহের অবশিষ্ট শক্তিও যেন লুপ পাচ্ছে। ফারিয়া ধীরে ধীরে চোখ বাকিয়ে তাকাল। তাঁর ঘাড়ের উপর ঝুঁকে থাকা লোকটির চোখে চোখ পড়তেই ফারিয়া সহসা জ্ঞান হারানোর মতো শরীর ছেড়ে দিল। তবে সে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ার আগেই পঙ্কজ ধরে ফেলল। পিছন থেকে মেয়েটাকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে সহাস্যে কানের কাছে হিসহিসিয়ে বলে উঠল,
–“হোয়াই আর ইউ সো স্কেয়ার্ড, বিউটিফুল, হোয়েন আই’ম হিয়ার?”

পঙ্কজের চমৎকার ঘোলাটে চোখ দুটো আজ ফারিয়ার কাছে ভীষণ ভয়ংকর লাগছে। কেমন লালচে পশুদের মতো হিং’স্র হয়ে আছে৷ ফারিয়ার ভীত দৃষ্টি দেখে অদ্ভুত হাসল পঙ্কজ। অতি সুদর্শন চেহারায় দারুণ মানাল সেই হাসি। কিন্তু ফারিয়ার নিকট বড্ড কুৎসিত লাগল। ঘৃণায় মুখ বিকৃত করল সে। পঙ্কজ ফারিয়ার কাঁধে মুখ গুঁজে জোরে তার শরীরের ঘ্রাণ নিল এবং সেখানে নিজের তপ্ত ঠোঁট ছোঁয়াল। তীব্র ঘিনঘিনানিতে ফারিয়ার সারা শরীর রি রি করে উঠল। সে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য ছটফট করে দূরে সরতে চাইল, কিন্তু তাতে পঙ্কজের হাতের লোহার মতো শক্ত বাঁধন আরও জোরালো হলো। ফারিয়া আক্রোশে বলে উঠল,
–“আমাকে ছাড়ুন আপনি। ঘৃণায় সারা শরীর জ্বলে যাচ্ছে আমার।”

মুখ তুলল পঙ্কজ। কপাল কুঁচকে এক হাতে ফারিয়ার গাল ঘুরিয়ে চুমু খেতে যাবে তখনই মুখ পুনরায় ফিরিয়ে নিল মেয়েটা। রিজেক্ট পেয়ে পঙ্কজের মাথার শিরাগুলো টগবগ করে উঠল মূহুর্তেই। কিন্তু হঠাৎই নিজেকে শান্ত করে অদ্ভুত হাসল পঙ্কজ। ফারিয়ার কানে ঠোঁট ছুঁইয়ে হাস্কিস্বরে হিসহিসিয়ে বলে উঠল,
–“সিরিয়াসলি! এইটুকু স্পর্শেই এত বেড ফিল করছ? তাহলে এত রাত কিভাবে আমার সাথে এডজাস্ট করেছ? কত রাত, কতভাবেই তো তোমার সারা দেহ ছুঁইয়েছি।”

নিজের প্রতি চরম ঘৃণায় চোখ খিঁচে নিল ফারিয়া। পঙ্কজ হাসল নিঃশব্দে। ফারিয়ার কানের কাছে একইভাবে বলে উঠল,
–“লেটস এনজয় দিস বিউটিফুল প্লেস অ্যান্ড দ্য লাভলি ওয়েদার টুগেদার।”

পঙ্কজ বাক্য শেষ করতে না করতেই ফারিয়া এক দুঃসাহসিক কাজ করে বসল। আচানক এক দলা থুথু ছুড়ে মারল পঙ্কজের চোখেমুখে। পঙ্কজ চোখ খিঁচে নিল। পর মূহুর্তে ফারিয়ার গলায় ঝুলে থাকা হাপ সিল্ক ওড়নাটা দিয়ে নির্লিপ্তভাবে চোখমুখ মুছে নিল। ফারিয়া ভেবেছিল এর জন্য পঙ্কজ অনেক রেগে যাবে। কিন্তু তা হল না। পঙ্কজ শান্ত কন্ঠে বলে উঠল,
–“ইউ’আর আ বিট টু বোল্ড, বিউটিফুল। শোয়িং দিস ফা”কিং মাচ ইজান’ট রাইট।”

পঙ্কজ থামল। সহাস্যে জুড়ে দিয়ে বলল,“জাস্ট আ সেকেন্ড। ডু ইউ ওয়ান্ট টু ফ্রেঞ্চ কিস?”

কুরুচিপূর্ণ কথা শুনে ঘৃণায় চোখ খিঁচে নিল ফারিয়া। চরম ক্রোধ আর আক্রোশে বলে উঠল,
–“ঘৃণা করি আপনাকে। ভাবলেই আমার ঘৃণা হচ্ছে আমি আপনার মতো এক জা”নোয়ার রে’পিস্টকে ভালোবেসেছিলাম। ছিঃ কি নোংরা আপনি।”

গা গুলিয়ে আসল ফারিয়ার। পঙ্কজ শান্ত চোখে মেয়েটার সরল মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে। ফারিয়া পঙ্কজের হাত ছাড়াতে চাইল। এতে পঙ্কজ আরও শক্ত করে কোমর জড়িয়ে ধরল। ফারিয়া গর্জে উঠল,
–“নোংরা লোক ছাড়ুন আমায়। আমি আপনার আসল রুপ সকলকে জানিয়ে দিব।”

পঙ্কজ আদুরে কণ্ঠে হিসহিসিয়ে বলে উঠল,“ডোন’ট মেক সাচ মিস্টেকস, বিউটিফুল। আই অ্যাকচুয়ালি লাইক ইউ আ বিট মোর দ্যান দ্য আদার্স বিকজ ইউ’আর আ সিলি অ্যান্ড ক্রেজি গার্ল।”

থেমে জুড়ে দিয়ে বলল,“বাট ইফ ইউ ডোন’ট লিসেন টু মি, আই ওয়োন’ট হ্যাভ এনিথিং এলস টু ডু আইদার। গট ইট বেইবি?”

ফারিয়া ঘৃণায় রেগে তৎক্ষনাৎ প্রত্যুত্তর করল,“অবশ্যই সবাইকে বলে দিব। আপনার মতো রে’পিস্টকে আমি কিছুতেই ছাড় দিব না। আর ভালোর মুখোশ পড়ে থাকা তোমার আআ..”

মাঝ পথেই থমকে গেল ফারিয়ার মুখের বাক্য। আচমকা গোঙ্গিয়ে ওঠতেই নাক-মুখ দিয়ে বেড়িয়ে আসল র’ক্ত। ফারিয়া ভেজা শান্ত চোখ জোড়া নিজের পেটের দিকে রাখল৷ সেখানে পঙ্কজ আচমকা ধারালো ছু’রি ঢুকিয়ে দিয়েছে। ছু’রিটা পঙ্কজ পেট থেকে বের করে নিল তৎক্ষনাৎ। হেলে পড়ল ফারিয়া। পঙ্কজ হঠাৎ কেমন যেন এলোমেলো হয়ে পড়ল৷ হাত খসে ছু’রিটা পড়ে গিয়ে ঝনঝন শব্দ তুলল। সে ফারিয়াকে নিয়ে ফ্লোরে বসে পড়ল৷ ব্যথাতুর নয়নে পলকহীন সামনের মানুষটির দিকে তাকিয়ে ফারিয়া। পঙ্কজ ঢোক গিলল। এই প্রথমবার তার এক অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। কি সেই অনুভূতি বুঝতে পারছে না। বুকের বাম পাশের যন্ত্রটি কেমন যেন দ্রুত গতিতে কম্পিত হচ্ছে। সে মেয়েটার মুখখানা দুহাতে পুরে, নাড়িয়ে উঠল। এলোমেলো বুলিতে আওড়াল,
–“আ..আই ডিডন’ট ওয়ান্ট টু ডু দিস। ইউ ফোর্সড মি।”

থেমে ফারিয়ার চেহারার উপর লেপ্টে থাকা চুলগুলো সরিয়ে উম্মাদের মতো বলে উঠল,“হোয়াট ইজ হ্যাপেনিং টু মি? আই ফিল কাইন্ড অফ ক্রেজি। ক্যান ইউ টেল মি হোয়াটস হ্যাপেনিং টু মি?”

তাচ্ছিল্য করে হাসল ফারিয়া। হালকা ঠোঁট নাড়িয়ে তরল গলায় বলল,“পাগলের মতো ভালোবেসেছিলাম আপনাকে। আপনার সুদর্শন চেহারা, আপনার অদ্ভুত চোখ আর ঠোঁটের হাসি আমার মনকে আমার থেকে কেঁড়ে নিয়েছিল। ভালোবেসে আমার মূল্যবান সম্পদও আপনাকে উৎসর্গ করেছিলাম। আর তার বিনিময়টা বুঝি এভাবে দিলেন। আমার থেকে আমার পেটের সন্তানকেই কেঁড়ে নিলেন।”

টনক নড়ে গেল পঙ্কজের। আবারও তাচ্ছিল্য করে হাসল ফারিয়া। নিজের জমে আসা দুর্বল হাতখানা নিজের ক্ষ’ত র’ক্তাক্ত পেটে রাখল। কোনো এক অস্তিত্বের সন্ধান চালাল। সেই হাত হালকা উঁচিয়ে চোখের সামনে ধরল। হাতে লেগে থাকা নিজের লাল তরল, নিজের অস্তিত্বের পানে চেয়ে থেকে ঠোঁট বাকিয়ে সহাস্যে নিভু কন্ঠে আওড়ালো,
– “বোধহয় পৃথিবীর সবচেয়ে নির্লজ্জ, নির্বোধ আর বোকা মেয়েটাই আমি। জীবনের অন্তিম লগ্নে এসেও নিজের ধ্বংসকারীকেই বেহায়ার মতো ভালোবাসার স্বীকারোক্তি দিচ্ছি।”

ফারিয়ার চেহারার উপর আরও ঝুঁকে পড়ল পঙ্কজ। দুজনের মুখ একদম কাছাকাছি তাই একে অপরের উপর নিশ্বাস আঁচড়ে পড়ছে। পঙ্কজ নিজের বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে ফারিয়ার চোখের কোণে জমে যাওয়া জল মুছিয়ে দিল। অতঃপর এক পলক ফারিয়ার পেটের দিকে তাকাল। সেখানে গভীর য’খম এবং র’ক্তা’ক্ত হয়ে আছে। পঙ্কজ সেখানে ছুঁইয়ে দিল। তাজা লাল র’ক্তে ভিজে উঠল তার হাত। এর আগেও বহুবার নিজের অনাগত সন্তানকে তাদের মাতৃগর্ভেই শেষ করে দিয়েছে সে। তাহলে আজ কি হলো তার! আজ কেন আফসোস হচ্ছে? পঙ্কজ ব্যথাতুর হেসে বিদ্রুপ করে বলল,
–“আই অ্যাম সাচ আ ব্যাড বয়। আই ওয়ার্নড ইউ মেনি টাইমস নট টু কাম ইনটু মাই লাইফ। সো হোয়াই ডিড ইউ কাম? গেছ তো তুমি নিজেই ভেঙে চুরমার হয়ে।”

বাক্যটি শেষ হতেই এই প্রথম পঙ্কজের চোখ বেয়ে এক ফোটা তপ্তজল বেরিয়ে এলো। যা ফারিয়ার গালে টপ করে এসে পড়ল। পঙ্কজ ফের বলে উঠলো,“আর দিলে তো আমার পাথরের হৃদয়েও মায়া লাগিয়ে।”

থেমে জুড়ে বলল,“কিন্তু পাথরে বর্ষণ হলেও বরফের মতো গলে না বিউটিফুল।”

বাক্য শেষ করে ফারিয়ার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিতেই ফারিহা গো’ঙ্গিয়ে উঠল,
–“আহ্!”

আচমকা ফারিয়ার পেটে পুনরায় ছু’রি ঢুকিয়ে দিল পঙ্কজ। চোখ বেয়ে পুনরায় পানি গড়িয়ে গেল মেয়েটার। শুধু দৃষ্টি সামনের জানো’য়া’রের মতো নি’র্দয় পা’ষণ্ড মানুষটির দিকে। পঙ্কজ ফারিয়ার কানে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,
–“ইফ দেয়ার ইজ রিইনকারনেশন, আই উইল বি বর্ন অ্যাগেইন ফর ইউ, বিকামিং জাস্ট দ্য ওয়ে ইউ লাইক।”

হঠাৎই বাইরে থেকে সিআইডি গাড়ির সাইরেন ভেসে আসল পঙ্কজের কানে। আর এক মূহুর্ত দেরি করল না সে। চলে যেতে গিয়েও পিছু ফিরে মেঝেতে র’ক্তা’ক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা মেয়েটার পানে তাকাল। চোখাচোখি হল দু’জনের। ব্য’থাতুর হাসল ফারিয়া।


আমরা সকলে দৌড়ে বারের ভেতর প্রবেশ করলাম। ততক্ষণে সেখানে হুলস্থুল পড়ে গেছে। গু’লি’বিদ্ধ হয়ে মেঝেতে পড়ে আছে এক যুবক। সিআইডি অফিসাররা সকলকে আটক করে নিল। আমি আশেপাশে খুঁজতে খুঁজতে অন্যদিকে চলে গেলাম। ইফান বারে ঢুকতেই দেখল আমি ছুটছি। সে পিছন থেকে চেঁচিয়ে ডাকল। কিন্তু তার কোনো ডাক আমার কান অব্ধি পৌঁছাতে পারল না। ইফানও ছুটল পিছু।

ছুটতে ছুটতে বারের একদম ভেতরের দিকের এক নির্জন লাউঞ্জে এসে পড়লাম। এখানে বারের সেই উন্মত্ত কোলাহল নেই, চারপাশটা একদম জনশূন্য। আমি ফিরে যেতে উদ্যত হয়েও হঠাৎ থমকে দাঁড়ালাম—কোথাও থেকে এক ক্ষীণ গোঙানির আওয়াজ ভেসে আসছে। আওয়াজের উৎস ধরে এগোতেই আমার রক্ত হিম হয়ে গেল। দেখলাম দূরে মেঝেতে র’ক্তে ভেসে যাচ্ছে এক নারীদেহ। এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল ওটা বুঝি জুই, কিন্তু দেহের গড়ন দেখে বুঝলাম জুই নয়। আমি ধীর পায়ে এগিয়ে গেলাম। সামনে হাঁটু গেড়ে বসতেই মেয়েটার চেহারা স্পষ্ট হলো। জড় পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে গেলাম আমি। ‘ফারিয়া’ অস্ফুটে আওড়ে চিৎকার করে উঠলাম,
–“এই মেয়ে ক..কি হয়েছে তোমার? এখানে কি করছ?”

নিভু নিভু চোখ মেলে তাকাল ফারিয়া। শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করার আগ মূহুর্তে চেনা একজনের মুখ দেখে মেয়েটার র’ক্তা’ক্ত ফ্যাকাসে চেহারায় আনন্দ খেলে গেল। বিড়বিড়িয়ে আওড়ালো,
–“মেডাম আপনি এসেছেন।”

আমার হাত যেন আজ চলছে না। কোনো মতে নিজেকে সামলে মেয়েটার গালে হাত রেখে উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,“এই কি হয়েছে তোমার? কে করল তোমার এই অবস্থা?”

–“প..ঙ্কজ।”

–“জারা।”

ইফানের কন্ঠ কানে আসতেই আমি চিৎকার করে ডেকে উঠলাম, “ইফান আমি এদিকে তাড়াতাড়ি আস প্লিজ।”

ফারিয়ার চোখ বন্ধ হয়ে এসেছে। আমাকে হাতের ইশারায় ছাদের দিকে দেখাচ্ছে। আমি বুঝলাম না সেই ইশারা। ওর গাল থাপড়ে বললাম,“কি বলতে চাইছ তুমি। উপরের ফ্লোরে কি আছে? এই মেয়ে একদম চোখ বন্ধ করবে না। তোমাকে এক্ষুনি হাসপাতালে নিয়ে যাব। তুমি সুস্থ হয়ে যাবে।”

ফের ব্যথাতুর হাসল মেয়েটা। নিভে আসা কণ্ঠে বললো,“ও নেই। আমি থেকে কি আর করব?”

–“কে নেই?”

ফারিয়া নিথর হাতটা টেনে নিজের র’ক্তা’ক্ত পেটের ওপর রাখল। আশ্চর্য হলাম আমি। বিস্ময়ে আওড়ালাম,“এ..এটা কবে হলো?”

–“আ..আপনার অবর্তমানে।”

–“কি হয়েছে এখানে?”

ছুটে আসল ইফান। ফারিয়াকে এই অবস্থায় দেখে আমার দিকে তাকাল। আমার কথা যেন আঁটকে আসছে। সেভাবেই বললাম,“ও..ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাও প্লিজ।”

ইফান সময় নষ্ট করল না। ফরিয়াকে কোলে নিতে যাবে তক্ষুনি ফারিয়া মাথা নাড়িয়ে অস্ফুটে আওড়াল,“আর সময় নেই।”

ইফান পুনরায় নিচে নামিয়ে দিল। কিছু একটা আঁচ করে নরম এবং কিছুটা উদ্বীগ্ন কণ্ঠে শুধালো,“কে করেছে এটা?”

ফারিয়া ইফানকে ইশারায় উপরে দেখাল। ইফান ছাঁদের দিকে তাকিয়ে শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল, “কি আছে উপরে?”

–“জু..ই..”

বলেই চিরকালের মতো স্থির হয়ে গেল ফারিয়ার নিশ্বাস। নিভে গেল একটি প্রাণের প্রদীপ। ইফান স্তব্ধ হয়ে ধীরে ধীরে আমার দিকে তাকাল। আমি তখন কাঁদছিলাম না। এক অসহ্য যন্ত্রণায় আমি যেন জীবন্ত পাথরে পরিণত হয়েছি। ইফান হাত বাড়িয়ে আমাকে ডাকল,
–“জারা আর ইউ ও..”

ইফান তার বাক্যটি শেষ করতে পারল না, আর তার বাড়িয়ে দেওয়া হাতটিও আমাকে স্পর্শ করার সুযোগ পেল না। তার আগেই আমি এখান থেকে ছুটে চলে গেলাম। ইফান চেঁচিয়ে ডাকতে ডাকতে আমার পিছু নিল।

আমাকে এভাবে উন্মত্তের মতো ছুটতে দেখে সিআইডির বাকি সদস্যরাও পিছু নিল। সবাইকে পেছনে ফেলে আমি ঝড়ের বেগে ওপরতলায় উঠে এলাম। খুঁজ করতেই একটা বন্ধ কামরা নজরে আসল। আমি দৌড়ে ভেতরে পা রাখতেই স্তব্ধ হয়ে থমকে দাঁড়ালাম।

চলবে,,,,,,,,,

যারা পড়েছেন সকলে রিয়েক্ট আর মন্তব্য করে জানাবেন কেমন হয়েছে। হ্যাপি রিডিং।💓

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply