এক টুকরো মেঘ পর্ব ৬
পর্বঃ০৬
কলমেসোনালিকাআইজা
⚠️কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ⚠️
★
নামসান সিউল পাহাড় থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে এই রেসিডেন্সিয়াল এরিয়া ইয়ংসানের অবস্থান। এরিয়াটা পাহাড় থেকে সামান্যতম দুরত্বে হওয়ায় পাহাড়ি ঠান্ডা আবহাওয়া পূর্ণ রুপে গ্রাস করে নেয় শহর। সিউলের বুকে যখন শীতকাল চলে, তখন দ্বিগুণ ঠান্ডা হাওয়া আক্রমণ করে ইয়ংসানে। মাইনাসের নীচে তাপমাত্রা হওয়ায় কুঁচিকুঁচি তুষারে ঢাকা পড়ে রাস্তাঘাট। এসময় শহরের বাসিন্দারা স্যুট বুট ছাড়া বাইরে বের হওয়ার দুঃসাহস কখনোই দেখায় না। এখানে সাহসীকতা দেখাতে গেলে তীব্র ঠান্ডায় জমে বেঘোরে প্রাণ হারাতে হবে।
ঠান্ডায় জমে যাওয়া শহরের সেই নিয়ম ভঙ্গ করে নিজের ঘরের সাথে লাগোয়া বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে মেঘা। কাউচের উপর অবলীলায় পড়ে আছে একটা একাডেমিক বুক। পড়ার এক ফাঁকেই বইটা রেখে উঠে এসেছে বেলকনির শেষ প্রান্তে। ঘড়ির কাটা জানান দিচ্ছে এখন রাত সাড়ে বারোটা বাজে। সময়টা গভীর রাত হলেও চারিদিকে আলোর বিন্দু মাত্র কমতি নেই। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই পুরো সিউল শহর কৃত্রিম আলোয় সেজে ওঠে। তবে এই শহরের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন এবং আর্কষনীয় জিনিস হচ্ছে নামসান সিউল পাহাড়ের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা নামসান সিউল টাওয়ার। সন্ধ্যা নামলেই রঙবেরঙের আলোতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে টাওয়ারটা। প্রেমের বাড়ি থেকে নামসান টাওয়ারের দুরত্ব এক কিলোমিটারের মতো হওয়ায় রাতে টাওয়ারের আলোর ঝলকানি বাড়ি থেকে কিছুটা দেখা যায়। সিউলের এই বিখ্যাত টাওয়ার দর্শনে দর্শনার্থীর অভাব হয়না। যদিও মেঘা নামসান পাহাড় বা টাওয়ারে কোনোদিন যায়নি। তবে রাতের আধারে দূর থেকে ভেসে আসা টাওয়ারের অল্প স্বল্প আলোর ঝলকানি মেঘার মনকে বিমোহিত করলো। টাওয়ারটা স্বচক্ষে দেখার তীব্র বাসনা জেগে উঠলো মনে। কিন্তু সেটা দেখবে কিভাবে? প্রেমকে বললে কি ঘুরতে নিয়ে যাবে ওখানে? উহুম। কখনোই না। উল্টো দু চারটে থাপ্পড় লাগিয়ে দিতে পারে। বিচলিত মনকে ধরে রাখতে না পেরে ছটফটে পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো মেঘা। কোনোকিছু না ভেবে সোজা ছাঁদের সিঁড়ি ধরলো।
পাহাড় হতে বয়ে আসা কনকনে ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে হাজির হলো ছাঁদের শেষপ্রান্তে। তীব্র তুষারপাত নাকমুখ দিয়ে ঢুকে দম আটকে দিতে চাইলে যেনো। এই অসহনীয় ঠান্ডায় কোনোপ্রকার গরম পোষাক ছাড়াই ছাঁদে এসে হাজির হলো মেঘা। দুই হাতে নিজের বাহু দুটো আঁকড়ে ধরে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে গেলো ছাঁদের শেষ প্রান্তে। এখান থেকে টাওয়ারটা আরও একটু ভালো ভাবে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু দুরত্ব অনেক বেশি হওয়ায় ভিউটা পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। মেঘা কৌতুহলী নজরে উঁকিঝুঁকি মারলো সামনে। ঠিক এমন সময় টুংটাং শব্দে মেঘার ফোনটা বেজে উঠলো। ফোনের স্ক্রিনে নিলু নামটা ভেসে উঠতেই হাসিখুশি মুখটা চুপসে গেলো মেঘার। অতীতের সেই তিক্ত স্মৃতি ভেসে উঠলো চোখের পাতায়। নিজের বেস্টফ্রেন্ডের থেকে পাওয়া ধোঁকা নতুন রুপে বিষাক্ত সুচের মতো বিঁধল বুকে। ভেতরে জ্বলতে থাকা রাগের স্ফুলিঙ্গ তরতাজা করতে খট করেই ফোনটা রিসিভ করলো। মেঘা কিছু বলার আগেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো নিলুফার আক্রমণাত্বক কন্ঠস্বর,
—“তুই আমাকে কোনোদিনও শান্তি দিবি না, তাই না মেঘা?”
—“তোর শান্তির জন্যই তো দেশ ছেড়েছি।”
—“তাহলে আমার পিছু ছাড়ছিস না কেনো? কেনো আমার জীবন থেকে চলে যাচ্ছিস না? রায়হান তোকে রেখে আমাকে চুজ করেছে। বিকজ, তোর চেয়ে আমি সবদিক থেকেই বেটার।”
—“তোর গুনগান শোনাতে ফোন দিয়েছিস? আমি ইন্টারেস্টেড নই।”
—“যদি ইন্টারেস্টেড নাই হোস, তাহলে রায়হানের বাবাকে কেনো আমার নামে উল্টো পাল্টা বুঝিয়েছিস? কেনো নষ্ট করতে চাইছিস আমার আর রায়হানের সম্পর্ক? কি আছে তোর মধ্যে যায় জন্য রায়হান আমাকে রেখে তোকে বিয়ে করবে? তোর মতো আনফিট একটা মেয়েকে কোনো ছেলে বিয়ে তো দূরের কথা, এক রাতের বেডপার্টনার বানাতেও রুচিবোধ করবে না। অথচ আমাকে দেখ। এক দেখাতে যে কোনো ছেলের মাথা খারাপ হতে যথেষ্ট। ইউ আর নট স্যুইটেবল ফর রায়হান। এজন্যই তো রায়হান তোকে রেখে আমাকে চুজ করেছে। তোর কমতিটা ঠিক কোথায় বুঝতে পারছিস মেঘা? তোর অযোগ্যতা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার পরেও কোন সাহসে তুই আঙ্কেলের কানভাঙানি দিয়েছিস? এই তোর লজ্জা করে না?”
বান্ধবীর দ্বারা চরম অপমানে কান দুটো গরম হয়ে গেলো মেঘার। কান্নার দাপটে গলাটা ধরে এলো। রাগে, জেদে লাল হয়ে উঠলো নাকের ডগা। জবাব দেওয়ার জন্য মুখ খুলেও কিছু বলতে পারলো না। মূলত কথা বলার রুচিবোধ হারিয়ে গেছে। মেঘা বেশ বুঝতে পারছে এসব ওর বাবার কাজ। মেয়ের পক্ষ নিয়ে নিশ্চয়ই রায়হানের বাবাকে কিছু বলেছেন তিনি। সেই রাগটাই উল্টো পথে ঝাড়লো নিলুফা। গলগলিয়ে ঝড়তে থাকা অশ্রু কণা মুছে মেঘা কিছু বলতে যাবে তার আগেই নিলুফা তিরস্কার করে বলে উঠলো,
—“রায়হানের পিছু ছোটা বন্ধ কর। তোর চেহারার যা ছিরি। রায়হান তো দূরে থাক, কোনো ছেলেরই মুখে রুচবে না। আগে নিজের মধ্যে পরিবর্তন আন, তারপর নাহয় ছেলে পটানোর ধান্দা করিস।”
মেঘা আর কোনোকিছু শোনার মতো মনকে শক্ত রাখতে পারলো না। নিলুফার কথার মাঝপথেই খট করে ফোনটা কেটে দিলো। ভেতরের ক্ষতটা দগদগে ঘা হয়ে জ্বলে উঠলো। সিউলের বুকে তখন তীব্র তুষারপাতের মেলা চলছে। মাইনাসের নীচে তাপমাত্রা হওয়ায় চোখের পানিও জমে বরফ হয়ে যাচ্ছে। তবুও যেনো কোনো প্রকার ঠান্ডা মালুম হচ্ছে না শরীরে। বুকের ক্ষতটা বোধহয় এই ঠান্ডা আবহাওয়ার চেয়ে আরও বেশি যন্ত্রণাদায়ক। কালো আকাশের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে মেঘা বিড়বিড় করে আওড়াল,
—“এতটা কুৎসিত ভাবে আমাকে তৈরি করেছো খোদা? এতোটাই কুৎসিত যে আমার কাছের মানুষ গুলোও আমাকে নিয়ে উপহাস করছে? এতো অসুন্দর কোনো বানালে আমাকে? আর, বানিয়েই যখন ফেলেছো তখন, এই কুৎসিত চেহারার সৌন্দর্যে ডুবতে এক জোড়া চোখের মালিককেও দিয়ে দিতে। পুরো বিশ্বের কাছে অসুন্দর হলেও অন্তত এক জোড়া চোখে সুন্দরী হতাম। এটুকুতেই সন্তুষ্ট ছিলাম তো। কিন্তু তুমি তো আমাকে নিঃস্ব করে পাঠিয়ে দিলে খোদা। এ তোমার কেমন বিচার?”
অভিযোগ গুলো উড়ো চিঠি হয়ে উড়ে গেলো আকাশে। চারিদিক ছেয়ে গেলো নিস্তব্ধ নিরবতায়। গভীর রাতে নীরবে ছোঁড়া অভিযোগের চিঠিটা অদৃশ্য খামে হাওয়ায় ভাসতে লাগলো। মিনিট না গড়াতেই পেছন থেকে ভেসে এলো বাজখাঁই গলার ধমক,
—“কার অনুমতি নিয়ে ছাঁদে এসেছিস তুই?”
হঠাৎ ধমকে চমকে পেছন ফিরে চাইলো মেঘা। এতোক্ষণ ধরে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও প্রেমের আওয়াজ শুনে এবার স্বাভাবিক হলো মেয়েটা। অনুভুতিহীন দেহটা আবারও যেনো ঠান্ডা অনুভব করতে শুরু করলো। ইতিমধ্যে প্রেম লম্বা লম্বা কদম ফেলে মেঘার কাছাকাছি চলে এসেছে। ঠান্ডায় ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে মেঘা প্রেমের পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার দেখে নিলো। ছেলেটা নিজেও একটা পাতলা টিশার্ট আর থ্রিকোয়াটার প্যান্ট পড়ে আছে। লম্বা চুলগুলো পুরো কপালটাকে মোটা চাদরের মতো ঢেকে রেখেছে। ক্লিন সেভ গালটা পাথরের মতো শক্ত। মেঘার মতো প্রেম ঠকঠকিয়ে না কাঁপলেও ওর উজ্জ্বল ফর্সা পায়ের নখের নীলচে রঙই বলে দিচ্ছে এখানে ঠান্ডার পরিমাণ ঠিক কতটা। মেঘাকে চুপ থাকতে দেখে আবারও ধমকে উঠলো প্রেম,
—“মেঘা আন্সার মি। আই ক্যান্ট টলারেট ইওর সাইলেন্স।”
মনের কোণে জমে আছে অভিমানের পাহাড়। এই মুহুর্তে কারোর সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না মেঘার। মনটা তার খুবই বিষন্ন। তবুও মেঘা মিনমিন করে জবাব দিলো,
—“কি বলবো?”
—“ছাঁদে এসেছিস কার অনুমতি নিয়ে?”
—“ছাঁদে আসতে আবার কারো অনুমতি লাগবে নাকি?”
—“অফকোর্স লাগবে। আমার বাড়িতে থাকতে হলে প্রতিটা পদক্ষেপে আমার অনুমতি নেয়া লাগবে।”
—“পারবো না এতো নিয়ম মানতে।”
মেজাজ এতোক্ষণ ধরে নিয়ন্ত্রণে রাখলেও এবার যেনো রাগটা একটু বেশিই চড়ে গেলো প্রেমের। শক্ত চোখে তাকিয়ে দুকদম এগিয়ে এসে বলল,
—“লিসেন মেঘা। আমার বাড়িতে থাকতে হলে আমার প্রতিটা কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে। আদারওয়াইজ……… “
—“কি করবেন না হলে?”
—“ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেবো। আমার বাড়িতে মুখে মুখে তর্ক করা কোনো বেয়াদবের জায়গা নেই। মনমর্জি চলাফেরা করে ইচ্ছাকৃত ভাবে অসুস্থ হওয়া কোনো ষ্টুপিডের জায়গা নেই। এখানে শুধু আমার রুলস চলে। নাউ গো টু ইওর রুম। রাতের বেলা ছাঁদে তো দূরের কথা, বেলকনিতেও তোকে যেনো না দেখি।”
একের পর এক ছোঁড়া ধমক গুলো বেশ আত্মসম্মানে লাগলো মেঘার। অপমান বোধে মনটা বিষিয়ে উঠলো। ভাঙা মনটা আবারও যাতনার পিষ্টনে ফেলার অপরাধে প্রেমের প্রতি পুষে রাখা রাগটা তরতর করে কয়েক ধাপ বেড়ে গেলো। আর মাত্র হাতে গোনা কয়েকটা দিন। এখান থেকে চলে গেলে আর কোনোদিন এই অহংকারী বাজে লোকটার মুখদর্শন করবে না মেঘা। অসহ্য মানুষ।
অপমানটা কোনোমতে গিলে নিয়ে ঠান্ডায় ঠকঠকিয়ে কাঁপতে কাঁপতে নিজের ঘরে চলে গেলো মেঘা। ধুপধাপ ফেলা পায়ের আওয়াজে খানিকটা রাগেরও বহিঃপ্রকাশ ঘটালো। মেঘা চলে যাওয়ার পর মিনিট খানেক সময় সেই তুষারের মাঝেই দাঁড়িয়ে রইলো প্রেম। ঠান্ডায় শ্বেত চামড়া আরও ফ্যাকাশে রঙ ধারণ করেছে। ছেলেটা কি স্বেচ্ছায় এখানে দাঁড়িয়ে ঠান্ডা উপভোগ করছে? নাকি কোনো কারণবসত নিজেই নিজেকে শাস্তি দিচ্ছে?
–
ভোরের আকাশে সূর্যের আলো ফুটেছে বেশ কিছুক্ষণ আগে। শীতকাল হওয়ায় সূর্যের দেখা মেলেনা বললেই চলে। তবে সূর্যের মুখ দেখার জন্য বসে নেই শহরের কর্মব্যাস্ত মানুষ গুলো। ঘড়ির কাটা সকাল হওয়ার আভাস দিতেই সিউলের বুকে সফেদ বরফের চাদরে ঢাকা পড়ে থাকা রাস্তা ঘাট পরিস্কার করতে লেগে পড়েছে একদল। বাকিরা, স্যুট বুট লাগিয়ে ছুটছে নিজেদের অফিসের পথে।
আজ সকালেই হঠাৎ প্রেমের বন্ধুমহলের আগমন ঘটেছে প্রেমের বাড়িতে। দুইহাত ভর্তি খাবার নিয়ে ছুটে এসেছে সবাই। সুস্বাদু সব খাবার গুলো টেবিলে সার্ভ করছে এরিনা আর লিজা। শান্ত, রিক এবং প্রেম নিজেদের মতো চেয়ার টেনে বসে পড়েছে। খাবারগুলো টেবিলে সুন্দর করে সাজিয়ে দিয়ে লিজা এবং এরিনাও বসে পড়লো। তবে খাওয়া শুরু না করে সবাই একজোটে তাকালো কিচেনের দিকে। এরিনাদের আনা খাবারগুলোকে সম্পুর্ন উপেক্ষা করে নিজের জন্য নুডলস রান্না করছে মেঘা। মেয়েটার চোখ মুখ কেমন যেনো শুকিয়ে গেছে। নির্ঘুম রাত পার করার ফলে চোখের নিচেও কালো দাগ পড়েছে। সুন্দর মুখটার এই করুণ হাল আর কারো চোখে না পড়লেও এরিনার চোখে ঠিকই পড়েছে। সে চুপচাপ বোঝার চেষ্টা করছে মেঘার মনের ভাবগতি।
এরই মাঝে রান্না শেষ করে বড় বাটিতে নুডলস নিয়ে হাজির হলো মেঘা। আশেপাশে কোনোদিকে না তাকিয়ে যথারীতি প্রেমের পাশের চেয়ারটা টেনে বসে পড়লো। একটা বাটিতে নুডলস তুলে নিয়ে নিজের মতো চুপচাপ খাওয়া শুরু করলো। আঁড়চোখে একবার মেঘাকে পরখ করে নিয়ে প্রেম নিজেও খাওয়া শুরু করলো। তবে হঠাৎ করেই মেঘার অতিরিক্ত শান্ত হয়ে যাওয়া ভাবিয়ে তুললো সবাইকে। পরিস্থিতির মোড় ঘোরাতে রিক হাসিমুখে বলে উঠলো,
—“মেঘা কি এখন থেকে তোর সাথেই থাকবে প্রেম?”
—“রেখে দিলাম। এমনিতেও বাড়িতে কোনো সার্ভেন্ট নেই। বিশ্বস্ত একটা সার্ভেন্টের প্রয়োজন ছিলো আমার।” প্রেমের তৎক্ষনাৎ জবাব।
—“হোয়াট! মেয়েটাকে এভাবে বলছিস কেনো?”
—“তো কি করবো? জোরজবরদন্তি ঘাড়ে এসে জুটেছে। ওর যোগ্যতা সার্ভেন্ট হওয়া পর্যন্তই।”
প্রেমের বলা অপমানজনক কথাগুলোর বিপরীতে কোনো জবাব দিলো না মেঘা। সে এখনও শান্ত ভঙ্গিতে একাধারে খেয়ে যাচ্ছে। মেঘাকে মাত্রাতিরিক্ত চুপ হয়ে থাকতে দেখে এরিনা বলল,
—“নুডলসটা খুব বেশি টেস্টি হয়েছে বুঝি? তখন থেকে খেয়েই যাচ্ছো?”
মেঘা তবুও জবাব দিলো না। কেমন যেনো অস্বাভাবিক ভাবে খেয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে চোখ দুটো টকটকে লাল হয়ে গেছে। ওর এমন অদ্ভুত আচরণ দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকালো প্রেম। মেঘাকে কোনো রুপ জবাব দিতে না দেখে এরিনা খানিকটা এগিয়ে এসে বলল,
—“কি এমন টেস্টি নুডলস বানিয়েছো তুমি? আমিও একটু টেস্ট করি।”
বলেই চপস্টিক দিয়ে অল্প একটু নুডলস তুলে মুখে পুরে নিলো। মুহুর্তে চমকে উঠলো এরিনা। সঙ্গে সঙ্গে মুখের নুডলস ফেলে দিয়ে চিৎকার করে উঠলো,
–“আয়ায়া…ও, মাই গড। মাই মাউথ ইজ বার্নিং।”
চিৎকার করে বলে চেয়ারে বসেই দাপাদাপি শুরু করলো এরিনা। রিক তড়িঘড়ি করে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিলো এরিনার দিকে। মেঘা তখনও চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছে। মুখে কোনো কথা নেই। প্রেম এরিনাকে শান্ত করতে বলল,
—“ডোন্ট বি প্যানিক এরি। ও বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঝাল খোর।”
—“নো প্রেম। ইটস ঠু মাচ্ স্পাইসি।”
ইতিমধ্যে ঝালে চোখ দিয়ে পানি পড়তে শুরু করেছে এরিনার। বিদেশি বংশদ্ভূত শ্বেত কণ্যার সাদা নাক ঝালের চোটে টকটকে লাল রং ধারণ করেছে। কাঁধ সমান ছোটো চুলগুলো দুই হাতে খামচে ধরে ঝাল থেকে বাঁচার বৃথা চেষ্টা চালাচ্ছে। ঠিক সেই মুহুর্তে মেঘা সামনে রাখা চিলি ফ্লেক্সের কৌটা নিয়ে পুরোটাই নুডলসে ঢেলে নিলো। এরপর চোখ মুখ শক্ত করে আবারও খাওয়া শুরু করলো। এই পর্যায়ে চমকে উঠলো প্রেম। মেঘা যে অত্যাধিক জেদের বশে নিজেই নিজেকে কষ্ট দিচ্ছে সেটা বুঝতে আর বিন্দু মাত্র বাকি নেই। প্রেম হুট করেই মেঘার হাতটা ধরে বলল,
—“স্টপ মেঘা। ইউ জাস্ট হার্ট ইয়োরসেলফ।”
মেঘা ঝারি মেরে হাতটা ছাড়িয়ে নিলো। প্রেমের চোখে চোখ রেখে কাঠকাঠ কন্ঠে জবাব দিলো,
—“মাই লাইফ, মাই ডিসিশন। তাছাড়া আমি তো একটা উটকো ঝামেলা। আপনার নজরে সার্ভেন্ট বরাবর। তাহলে আমাকে নিয়ে চিন্তা কিসের?”
বলেই আবারও সেই ঝাল নুডলস খাওয়া শুরু করল। এই পর্যায়ে প্রেম নুডলসের বাটি কেড়ে নিয়ে ছুড়ে ফেলে দিলো দূরে। পড়ে না গেলেও ডাইনিং টেবিলের শেষ প্রান্তে গিয়ে আটকে গেলো বাটিটা। অত্যাধিক ঝালে লাল হয়ে আসা চোখ জোড়া প্রেমের চোখে স্হাপন করলো মেঘা। সঙ্গে সঙ্গে চোখ থেকে ঝরঝর করে পানি গড়িয়ে পড়ল। নাক ফুলিয়ে ধুপধাপ পা ফেলে চলে গেলো নিজের ঘরে। মেঘা ডাইনিং থেকে প্রস্হান নিতেই চারিদিক ভুতুড়ে ভঙ্গিতে শান্ত হয়ে গেলো। এই পর্যায়ে প্রেমকে মাত্রাতিরিক্ত শান্ত দেখালো। এমন দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতে প্রেমের এই শান্ত রুপ মোটেও স্বাভাবিক নয়। শান্ত নদীর মতো খানিকক্ষণ সময় চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে প্রেম হঠাৎ করেই ধপ করে বসে পড়লো চেয়ারে। ধীরে সুস্থে মেঘার রেখে যাওয়া অবশিষ্ট নুডলস নিয়ে খাওয়া শুরু করলো। মুহুর্তেই অতিরিক্ত ঝালে চোখ মুখ লাল হয়ে গেলো প্রেমের। এই তীব্র ঠান্ডার মাঝেও চুলে ঢেকে থাকা কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। খাওয়ার এক পর্যায়ে প্রেম পকেট থেকে ফোনটা বের করে কোনো একটা নাম্বারে ডায়াল করলো। রিসিভ হতেই কাঠকাঠ স্বরে বলল,
—“একটা বাস্টার্ডে*র ছবি পাঠাচ্ছি। আগামী এক মাস ওকে হসপিটালে দেখতে চাই। এন্ড মেক শিওর, ও যেনো নিজের পায়ে দাঁড়াতে না পারে।”
চলবে?
(অনেকদিন পর লিখলাম। সেটাও বড়ো একটা পর্ব। সবাই একটু শেয়ার করে দিও কেমন? আর ভালো মন্দ মন্তব্য জানিও প্রিয়রা।)
Share On:
TAGS: এক টুকরো মেঘ, সোনালিকা আইজা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
এক টুকরো মেঘ গল্পের লিংক
-
সুতোয় বাঁধা জীবন পর্ব ৬
-
এক টুকরো মেঘ পর্ব ৩
-
সুতোয় বাঁধা জীবন পর্ব ৭
-
সুতোয় বাঁধা জীবন পর্ব ৫
-
সুতোয় বাঁধা জীবন পর্ব ৮
-
সুতোয় বাঁধা জীবন পর্ব ২
-
এক টুকরো মেঘ পর্ব ১
-
এক টুকরো মেঘ পর্ব ২
-
সুতোয় বাঁধা জীবন পর্ব ৪