কুহু কয়েকবার কল করেছিল। দীপ্র ছিল মিটিংয়ে। রিসিভ করতে পারেনি। যখন ফ্রী হলো। কল ব্যাক করল। মেয়েটি রিসিভ করল না। দীপ্র বুঝল ওর অভিমান হয়েছে। অভিমান ভাঙাতে খাবারের পাশাপাপাশি ফুল ও নিয়ে এলো। তবে এসে দেখা গেল সন্ধ্যা রাতেই মেয়েটি ঘুমিয়ে পড়েছে। ও ভেবেছিল ঘুমিয়ে নিক। পরে অভিমান ভাঙানো যাবে। তবে মনটাও শান্তি হয় না। ও কয়েক দফায় চিন্তা করে শেষমেশ মেয়েটির ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল। আলগোছে দরজা খুলতেই ঘুটঘুটে আঁধার নজরে এলো। দীপ্র ধীর পায়ে প্রবেশ করল। অন্ধকারে কিছু সময় থাকার পর ও খেয়াল করল কুহুর ছোট দেহটা দেখা যাচ্ছে। গুটিশুটি হয়ে শুয়েছে। দীপ্র ভাবল লাইট অন করবে। আবার কী মনে করে যেন করল না। সামনে এগোল। হাতে এক গুচ্ছ ফুল। শুধু গোলাপ নয়, গোলাপের পাশাপাশি আরো অনেক রকম ফুল। সুন্দর সেই ফুল গুলো যে কাউকেই আর্কষণ করবে। তবে দীপ্রর দৃষ্টিতে এই ফুলের থেকেও বেশি সুন্দর তার কুহু। তার হৃদয়ের রানী। তার জানপাখি। দীপ্র বড়ো করে দম নেয়। আরেকটু কাছে এগোয়। তারপর, আরো একটু। এবার হাত বাড়ালেই মেয়েটিকে ছোঁয়া যাবে। অন্ধকারে খুব বেশি স্পষ্ট নয় মুখশ্রী। তাই ও ঝোঁকে। দূরত্ব কমে। হাত বাড়িয়ে চুল গুলো স্পর্শ মাত্রই নরম হাত দুটো এগিয়ে আসে। গলা জড়িয়ে ধরে। দীপ্র থমকায়, চমকায়। সময় নেয় ঘটনা বুঝতে। কুহুর নাক ওর গলায় ঠেকেছে। দীপ্রর নিশ্বাস ভারী হয়। মেয়েটি আদুরে ভাবে বলে,”কতবার কল করলাম। একবার ও ধরলেন না। একবার ও না।”
আহারে, অভিমান। দীপ্রর হাত দুটো নামানো ছিল। এবার তা মেয়েটির পিঠে এসে ঠেকে। চেপে ধরে। কুহু ওর গলা থেকে মুখ তুলে। চায় মানুষটার দিকে। দীপ্র শুধায়,”জেগে ছিলি?”
“হুম। দেখছিলাম আপনি আসছেন।”
দেখছিল, অথচ আগে উঠে নি। ভারী শেয়ানা হয়েছে তো। কুহুটা আজকাল কেমন বাচ্চা হয়ে যায়। আদর পেতে চায়। অথচ কঠিন সময় গুলোতে মেয়েটির আরো একটি রূপ ও দেখেছিল। সেই সময়টা, সেই সময়টা আর না আসুক। দীপ্র পারবে না সামাল দিতে। একদমই পারবে না।
“আইসক্রিম এনেছেন?”
কুহুর প্রশ্ন। দীপ্রর ধ্যান ভাঙে। ও বলে,”এনেছি।”
“ফ্রীজে?”
“হুম।”
“নিয়ে আসি।”
বলে মেয়েটি পা বাড়াতেই ওর হাত আটকে ধরে দীপ্র। বলে,”পরে।”
এক কথাতেই মেয়েটি থেমে যায়। দীপ্র ভেবেছিল কুহু বেশ অভিমান করবে। হয়তো কথাও বলবে না। তবে তেমনটি হয়নি। ভালোই হয়েছে বরং। ও স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। আঙুল বাড়িয়ে মেয়েটির কপালে বেকিয়ে পড়া চুল গুলো কানের পিঠে এনে দেয়। কুহু অন্ধকারে ওভাবেই তাকিয়ে থাকে। আঁধারের এক বিশেষ অনুভূতি আছে। এই অনুভূতি, কেবল দুজন ভালোবাসার মানুষই উপভোগ করতে জানে। সহসাই কুহুর হাত ঠেকে বিছানায়। কিছু একটা বুঝে বলে,”এটা কী?”
হাত বাড়িয়ে তুলতেই ও বুঝে এগুলো ফুল। ও মড়িয়া হয়ে লাইট জ্বালিয়ে দেয়। এইখানে দীপ্র একটু হতাশই হয়। ভালোই তো লাগছিল। অন্ধকারের মোহ। ফুল গুলো এত সুন্দর হয়েছে যে কুহুর দুটো চোখেই দ্যুতি এসে পৌঁছায়।
“আমার জন্য এনেছেন?”
“তুই ছাড়া আর কেউ আছে এখানে?”
“না মানে, যদি অন্য কারো জন্য এনে থাকেন।”
“কার জন্য আনব?”
“যে কারো জন্যই তো আনতে পারেন।”
ও সুর বদল করতে গেলেই দীপ্র ভ্রু কুঞ্চিত করে ফেলে। বলে,”বাজে কথা না। আমার ক্ষুধা পেয়েছে। খেতে দে।”
“আমাকেই দিতে হবে?”
“হু।”
বলে পা বাড়ায় দীপ্র। কুহু ওর যাওয়ার পানে চেয়ে হাসে। ওর আসলেই অভিমান লাগছিল। পরে ভেবে চিন্তে বুঝেছে মানুষটা তো ওর ই। খুব ব্যস্ত না থাকলে, ওভাবে কল রিসিভ না করে পারত না।
কণা খবর পেয়েছে রাগীবের বিয়ে ঠিক হয়েছে। মেয়ে সুন্দরী, ম্যাচিউর, বড়ো ঘরের। ওর এত খারাপ লাগল। ও কতক্ষণ একা বসে কান্নাকাটি করল। তারপর ঠিক করল, এই মানুষটার জন্য আর কাঁদবে না। যে ওর অনুভূতি বুঝেনি, তার জন্য কেঁদে লাভ আছে? নেই তো। কণা নিজেকে ঠিক ঠাক করে বের হলো। খুশি মনে এসে দেখল দীপ্র ভাই বসে আছেন। কুহু খাবার গরম দিচ্ছে। কণা হৈ হৈ করে উঠল।
“এই কুঞ্জ।”
কুঞ্জটা খেলছিল। ডাক পেয়েই ছুটে এলো।
“বলো আপু।”
“বিয়ে বাড়ি এমন ম রা ম রা হলে চলে বল? আমাদের কিছু করা উচিত না?”
“কী করব?”
“নাচ-গান? তুই নাচবি, আমরা দেখব।”
এ কথায় কুঞ্জ বলল,”এ হে, আমি করব না। তুমি ভারী বিচ্ছু তো।”
“এখানে বিচ্ছুর কী হলো?”
“ওমা, মনে নেই? সেবার আমাকে নাচালে। তারপর ভিডিও করে রাখলে। ওটা তো এখনো ডিলিট করোনি। শুধু শুধু মজা নাও।”
“এবার আর করব না।”
“সত্যি?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে সবাইকে ডেকে আনি?”
“আচ্ছা যা।”
দীপ্রর খাবার খাবার খাওয়ার সময়টুকুতে কুঞ্জ গিয়ে সবাইকে বলে এলো। সবাই মানে সবাই। খাওয়া দাওয়া শেষ করে দীপ্র এসে বসল। কুহুকেও ইশারায় বসাল। ওরা বসতেই একে একে রাত্রি, আবির, হেরা এসে বসল। তারপর এলো দাদিজান ও। বৃদ্ধার শরীর খারাপ ছিল। তবে ছোট নাতি বলায় না এসে পারলেন না। দাদিজানকে পেয়ে দীপ্র বসাল ওদের মাঝে। বৃদ্ধা হেসে বললেন,”ওমা, আমারে মাঝে বসাইলা কেন? তোমাদের প্রেম করতে অসুবিধা হইব না?”
কুহুর কেমন লজ্জা লাগল। দীপ্র বলল,”আমার আসল প্রেমিকা তো আপনি দাদিজান। ও হচ্ছে সাইড প্রেমিকা।”
এ কথার জবাবে কুহু বলল,”আমিও বসে নেই যার তার প্রেমিকা হতে। আজ দাদাজান থাকলে আমিও দেখিয়ে দিতাম, প্রেমিক কাকে বলে।”
ওদের কথায় বৃদ্ধা হাসলেন। কুহুর গাল ছুঁয়ে বললেন,”তখন তো আমি চান্স দিতাম না তোরে।”
“কেন, কেন? কেন দিতেন না?”
“সব কিছুর ভাগ চলে। স্বামীর ভাগ কি চলে?”
কুহু হাসল। দাদিজানকে জড়িয়ে বলল,”বুড়ি তুমি যে আমার স্বামীকে নিয়ে বসে আছ।”
ফট করেই কথা খানা বলে ফেলল কুহু। বলে কেমন নিজেই লজ্জা পেল। দীপ্র চেয়েছিল ওর দিকে। নজরে নজর পড়তেই মেয়েটি দ্রুত নজর সরাল। দ্রুত সরতে সরতে বলল,”আমি সবার জন্য চা করে আনি।”
মেয়েটি পালিয়ে বাঁচল। বৃদ্ধা হাসলেন। দীপ্রর হাত চেপে ধরে বললেন,”তোমরা সবাই আমার খুব আদরের। আয়ানাটা যদি একটু বুঝত।”
আয়ানার বিষয়টা উঠতেই দীপ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল,”আয়ানাকে অনেক ছাড় দেয়া হয়েছে দাদিজান। আর পারব না।”
দাদিজান কিছু বললেন না। কীভাবে বলবেন? কোন মুখে বলবেন? সবাই যে তার আদরের।
কুঞ্জর হৈ হৈ, আর কুহুর সায়, সব মিলিয়ে পরিবেশটা কেমন মোহময় হয়ে গিয়েছে। আবিদা আর ইচ্ছে ছিল না আসার। তবে একটা দরকারে পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ছেলের এমন আনন্দ ওনার নজরে এল। বাচ্চাটার বয়স কত? একদমই তো ছোট। এই বয়সে তো আনন্দ করবেই। অথচ মা হয়ে ছেলেকে তিনি এতদিন আটকে রেখেছিলেন। তার কেমন কষ্ট হতে লাগল। কুহু-কণার ও খুব বেশি দোষ ছিল কী? না তো। তবে, তবে তিনি তো ওদের দোষী বলে এসেছেন সবসময়। সহসাই ওনার ভেতরটা কেমন অনুতপ্ত হলো। তিনি আর এলেন না। ফিরে গেলেন। স্বামী কাজ করছেন। গানের আওয়াজ কানে এসেছে। বিরক্তির মতন বললেন,”কী চলছে বাড়িতে?”
আবিদা নরম ভাবে বললেন,”কী আর চলবে? বিয়ের অনুষ্ঠান হবে। তার আগে বাচ্চারা একটু আনন্দ করছে। এই তো।”
স্ত্রীর এমন আচরণ বহুদিন দেখেননি আনোয়ার। তিনি চশমার ফাক দিয়ে নারীটিকে দেখলেন। বড়ো উদাস দেখাচ্ছে।
“আবিদা।”
আবিদা ছোট করে বললেন,”হুম?”
“কী হয়েছে তোমার? কেউ কিছু বলেছে?”
এ কথায় তিনি জবাব দিলেন না। বরং বললেন,”শোনো, আমার মনে হয় সব ঠিক করাই ভালোই। কুঞ্জ সবার সাথে মিশে শান্তি পায়। আর ওরা ও তো ওকে ভালোবাসে। শুধু শুধু আয়ানার জন্য…
কথা শেষ করার আগেই আয়ানার হাসি শোনা গেল। আয়ানা হাসতে হাসতে ঘরে প্রবেশ করে বলল,”বাহ। বেশ ভালো। এখনো তোমাদের নিজের মেয়ে পর হয়ে গেছে। তোমরা আসলে শুরু থেকে, শুরু থেকেই আমার সাথে চিট করে এসেছ। চিট করেছ।”
বলতে বলতে ও বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। আবিদা ডাকতে যেতেই আনোয়ার বলেন,”ওকে ওর মতন থাকতে দাও।”
“না। ওর মতন থাকতে দিলে চলবে না। ও সেদিন বলছিল, বলছিল যে কিছু একটা করবে। আমি আমলে নিই নি। এখন আমার ভয় হচ্ছে।”
আবিদা আর বসে থাকতে পারলেন না। ছুটলেন মেয়ের পিছু। আনোয়ার চশমা খুলে রাখলেন। এভাবে আর কতদিন? মেয়েটি এত অবুঝ পানা করছে। এতে তো লাভ হচ্ছেই না। বরং সম্পর্ক নষ্ট হচ্ছে। তিনি নিজেও সম্পর্কের বিষয়ে এত মড়িয়া না। তবে সমাজে তো চলতে হবে। আর নিজের রক্তের থেকে, বেশি আপন আর কেউ হয়?
চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি
Share On:
TAGS: প্রণয়ের রূপকথা, ফাতেমা তুজ নৌশি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৭
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫৩
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৬৭
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫৮
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩২
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫৫
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৮
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৮০