Golpo romantic golpo আদিল মির্জাস বিলাভড

আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৩৮


আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৩৮

বেতের চেয়ারে কুঁজো হয়ে বসে থাকা পাতলা গড়নের শরীরটা মৃদু কাঁপছে। দরজা খোলার শব্দ শুনেও মাথা তুলে তাকায় না ঝুমুর। একইরকম ভঙ্গিতে কেমন শূন্যে চেয়ে রয়। শান্ত ধীরে ধীরে একেকটা ভারী কদম ফেলে টেবিল ঘুরে এলো ভেতরে। ঘরের মোটা পর্দাগুলো দিয়ে ঢেকে আছে জানালা। বাতি বন্ধ। ঘরের কুচকুচে অন্ধকার অবশ্য কাটল দরজাটা খোলায়। করিডোরের জ্বলন্ত বাতির আলো এসে পৌঁছেছে খানিকটা। শান্ত চেয়ারের সামনে, ঠিক ফ্লোরে দু-হাঁটু মুড়ে বসে। ডাকে ঝুমুরের পছন্দের ডাকনামটিতেই। সম্মোহিত শোনায় –

‘প্রাণপাখি!’

সবসময় কাজে দেয়া এই সম্মোহনী ডাকে আজ সাড়া দেয় না মেয়েটা। পূর্বের ন্যায় নিষ্প্রাণ হয়ে থাকে। শান্ত আলতোভাবে ধরে গাল দুটো। মাথাটা উঁচু করে বোঝে, তার প্রাণ আতঙ্কে এইটুকুন হয়ে আছে। চোখদুটো টকটকে লাল, ভেজা। মাত্রাতিরিক্ত ভয় পেয়েছে যে তা বোঝা যাচ্ছে! পাবে না? ওর এমন বাজে পরিস্থিতি সম্পর্কে কোনোরকমে পরিচিতি নেই। এইধরণের পরিস্থিতি সচক্ষে দেখা যে এই প্রথম ওর। কখনো দেখেছে কীভাবে ব ন্দুক চলে? ওর সামনে সচরাচর শান্ত কখনো ব ন্দুক বের অবধি করেনি, চালানোতো বড্ড দূরের বিষয়। খসখসে আঙুলের ভাঁজ দিয়ে ঝুমুরের বিধ্বস্ত, ভয়ার্ত সারামুখ বুলিয়ে অবশেষে নিজের রুক্ষ ঠোঁট নামিয়ে ছোঁয়ায় নরম, উষ্ণ গালে ধীরে ধীরে কপালে। ঝুমুর স্তব্ধ চোখে শুধু তাকিয়ে থাকে। একটা শব্দ করে তবে প্রত্যুত্তরে যে পরমুহূর্তেই ঝাঁপিয়ে পড়ে শান্তর শক্ত, উত্তপ্ত বুকের ভাঁজে ভাঁজে। দু-হাতে গলাটা আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফিসফিস করে আওড়ে যায় দিশেহারা হয়ে –

‘আমি, আমি ভীষণ ভয় পেয়েছি। ভাবি…ভাবি আমার সামনে ওমন হিমালয়ের মতো না দাঁড়ালে হয়তো আমি.. আমি আর কখনো…’

শব্দ হয়, শান্তর ভেতরে হওয়া ভাঙচুরের শব্দ। মনে হয়, হৃদয়টা কেউ পাঁচ আঙুলে খামচে ধরেছে। ফলে গলগল করে ঝরছে তাজা লা ল র ক্ত। অন্যরকম এই ব্যথায় টনটন করে ওঠে পুরো দেহ। অদৃশ্যভাবে সামান্য কাঁপে ঝুমুরকে আগলে নেয়া পেশিবহুল হাত দুটো। যা কখনো বিপজ্জনক পরিস্থিতিতেও কাঁপে না। আর শুনতে পারল না ঝুমুরের বাদবাকি কথাগুলো। এইমুহূর্তে চলন্ত মুখ বন্ধ করাটা জরুরী। আর শান্ত তাই করল। সবেগে বন্ধ করে দেয় চোখের পানিতে ভেজা ঠোঁটজোড়া। ঠোঁটে ঠোঁট পিষে রেখেই শান্ত মৃদু কণ্ঠে বলে গেলো –

‘আমি আছি না? কিচ্ছু হতো না তোর। হতে দিতাম না আমি।’

উদভ্রান্তের মতো বলা কথাগুলো শুনে ঝুমুর শান্ত হয়। দৃষ্টিতে প্রাণ ফেরে কেমন। জলে ভাসা চোখদুটি তুলে অনেকক্ষণ দেখে শান্তর শক্তপোক্ত মুখখানা। ধীরে দু-হাত রাখে শান্তর ছাঁচা চোয়ালে। আদর করে দিয়ে, বলতে বলতে ফের ডুকরে ওঠে –

‘যখন হঠাৎ আক্র মণ হলো, একমুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল আমি বেঁচে ফিরতে পারব না। আপনাকে আর কখনো দেখার ভাগ্য হবে না। হবে না আপনার বউ হওয়ার নসিব। আমার কপালে নেই ব…’

শান্ত ঠোঁটে পিষ্টতা বাড়াল মুখটা বন্ধ করতে। অথচ ঝুমুর মাথা নাড়িয়ে বোঝায় মুখ বন্ধ করতে না। ওর আরও কথা আছে। কিন্তু তা শোনার মতো সামর্থ্য যে শান্তর নেই। মেয়েটি কি বুঝতে পারছে না? ওর যে হৃৎপিণ্ড কাঁপছে! ঝুমুর বলে যায় –

‘ওরা গু লি ছুড়ছিল। সবার দিকে। আমার দিকেও ছুঁড়েছে। আমার দিকে ছোড়া গু লিটা আমার গায়ে লাগেনি কারণ ত..তখন ভাবি চোখের পলকে আমাকে টেনে বটগাছের পেছনে লুকিয়েছেন। তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন সামনে। গু লি লাগলে তার গায়েই লাগতো জানেন? আমাদের বডিগার্ড তখুনি না এলে হয়ত…’

শান্ত আর শুনতে পারল না। উদভ্রান্তের মতো চোখমুখ বুজে ওকে পুনরায় শক্ত বুকে পিষে রাখল বুকের সাথে। কী ভীষণ জোরসে লাফাতে থাকল হৃৎপিণ্ড। অনুভব করতে পারল ঝুমুর। অনুভব করতে পারল শান্তর ভয়ার্ত হৃদয়। শক্তপোক্ত পুরুষটির এই রূপ ওকে আরও ভয়ার্ত করে তুলল। এই শান্তকে ছেড়ে ও যে ম রেও শান্তি পাবে না। ও আরও অনেক বছর বাঁচতে চায়। শান্তর স্ত্রী হয়ে বাঁচতে চায় দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ বছর। ঝুমুর আস্তে করে মাথাটা রাখল বুকে। আধোঘুমে ঢুলছে ওর শরীর। কথাগুলোও কেমন অস্পষ্ট শোনাল। তবে ঠিক বুঝতে পারল শান্ত –

‘আমিতো ভাবির কেউ না! আমাকে তার এতো গুরুত্ব দিয়ে আগলে রাখার কথা ছিলো না। অথচ তিনি বোধহয় আপনার কথা ভাবছিলেন। আপনার জন্য…’

শান্ত নিশ্চুপ হয়ে শুনল। ঝুমুরকে বুকে আগলে ঠিক ওভাবেই থাকল। তার দৃষ্টি ঝুমুরের ঘুমন্ত, নিষ্প্রাণ মুখে। ধীরে পাঁজাকোলে তুলে নিলো। পা বাড়াল বিছানার দিকে। শুইয়ে দিলো যত্নের সাথে। পাতলা কাঁথাটা শরীরে মেলে দিয়ে চেয়ার টেনে এনে বসল বিছানার কাছে। কতক্ষণ দেখল জানা নেই। সময়ের হিসেব নেই। তবে চোখের পাতায় ভাসল সেই ভয়া নক দৃশ্যটুকু। যা এখনো নাড়িয়ে দেয় শান্ত হৃৎপিণ্ড।

.

সবসময়ই আদিলের ধূসর চোখের দৃষ্টি এড়িয়ে বেড়ায় রোযা। কেনো যেন সে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারে না। এতো স্পষ্ট, তীক্ষ্ণ আর দৃঢ় হয় যে মনে হয় ওই দৃষ্টি ওর পুরো সত্ত্বায় নিজের সিলমোহর বসিয়েছে। এতো কি দেখে? রোযার মাঝেমধ্যে জিজ্ঞেস করে ফেলতে ইচ্ছে হয়। পরমুহূর্তেই সতর্ক হয়, প্রশ্নটি নিজের মধ্যে লুকোয়। ভারী নির্লজ্জ পুরুষ সে। কিছু একটা উল্টাপাল্টা বলে দেবে নিশ্চিত। কথাবার্তা যা ছিড়ি। আর কর্মকাণ্ড! ওসব সম্পর্কে রোযা ভাবতেও চায় না। তার মুখের খুব কাছে থাকা মুখটা সরাতে ছুঁতে হলো শক্ত চোয়াল খানা। খোঁচা দাঁড়ি বিঁধল তার হাতের নরম তালুতে। সুযোগ লুফে নিতে আদিল বরাবরই ওস্তাদ। ঘেঁষে গিয়ে তালুতে ডোবাল ঠোঁটজোড়া। সাথে সাথে কোমরে কনকনে ঠান্ডা কিছুর স্পর্শে রোযা শিউরে ওঠে। ধড়ফড়িয়ে একহাতে আদিলের চওড়া বুক ঠেলে, অন্যহাতে কোমরে থাকা হাতদুটো সরাতে গিয়ে বোঝে, চেইনের মতন কিছু তার উন্মুক্ত কোমরে শোভা পাচ্ছে এখন। বুঝতে আর বাকি রয় না জিনিসটা কী হতে পারে! ওটা তখুনি খুলে ফেলতে চাইল রোযা। তার চেয়েও দ্রুতো আদিল। এক হাতেই স্বাভাবিক শক্তিতেই আটকে রাখল হাত দুটো নিজের শক্তপোক্ত, উন্মুক্ত বুকের সাথে।

‘খুলবেন না। যতবার খুলবেন আমি ততবারই পরাব। ইউ ক্যান সি হু বেনিফিটস হিয়ার, রাইট?’

রোযা আগুন ঝরা চোখে তাকাল। অথচ আদিলের চোখ কোথায় তা দেখে লাজে শরীর কাঁটা দিয়ে উঠল। দু-হাত ছুটিয়ে ঢাকতে চাইল কোমর। অথচ আদিল তখন সম্মোহন হয়ে চেয়েই আছে। দৃষ্টিতে রাখঢাক নেই। কথাতে তো আরও নেই। তার র ক্তিম কান ছোঁয়া ঠোঁট জোড়া থেকে গলিয়ে তপ্ত শ্বাসপ্রশ্বাসের সাথে আসা গম্ভীর তবে নিম্ন স্বরে বলা কথাগুলোতে রোযা লাজে হাঁসফাঁস করে মাথাটা আরও সরিয়ে চোখ বুজে থাকল শক্ত করে।

‘পৃথিবীর অন্যতম উপভোগ্য সিনারি। উইথ এভরি ব্রেথ ইউ টেক, ইট ড্যান্সেস সো বিউটিফুলি —লিভিং মি ব্রেথলেস।’

কেমন অশ্লীলভাবে শ্বাস ফেলছে। বুকের ওঠানামার গতিও দ্রুতো। রোযা লাজ কাটিয়ে কটমট করে তাকাল। তীব্র লজ্জায় হাত দুটো ছাড়াতে মরিয়া হয়ে পড়ল। আদিল ভীষণ সন্তুষ্টি নিয়ে দেখল তার বুকের কাছে থাকা পাতলা গড়নের রোযার মুষড়ানোর ভঙ্গিমা। একপর্যায়ে আদিল বাঁধন ঢিল করল। রোযা দ্রুতো কোমর ঢাকল। খেয়াল হলো তার হাতে তখনো পিস্তলটা। গু লি থাকলে এখুনি লোকটাকে ও গু করে মে রে ফেলতো। অসভ্য, অভদ্র একটা! রোযা তাকাল হাতের পি স্তলটার দিকে। দ্রুতো মুখ ঘুরিয়ে ফেলল। ব্যাঙ্গাত্মক ভঙ্গিতেই বলল –

‘নিশ্চিত গু লি নেই। এইজন্যই হাতে দেয়ার সাহস করেছেন।’

আদিলের ধূসর চোখজোড়া রাতের কালো আকাশে ভাসা তারাদের মতন চিকচিক করে উঠল। ঠোঁটজোড়া অল্প ছড়ায়। বোঝায় তার কৌতুক ভঙ্গিমা। মাথাটা আরও নামিয়ে, বাঁকিয়ে রোযার সারামুখে চেয়ে ধরল তার বুক ঠেলতে থাকা নরম, চিকন হাতটা। ওই হাতের পিস্তলের মাথাটা বুকের ডান দিকে পিষিয়ে আওড়ায় –

‘গু লি করুন না তবে। পরিক্ষা করে নিন।’

রোযা সন্দেহ নিয়ে আড়চোখে তাকাল ধূসর চোখে। ডান ভ্রু তুলে মুখ বাঁকাল পরপরই। বললেই হচ্ছে? গু লি ভরতি পি স্তল দেবে তাকে? পি স্তলটা সরাল আদিলের বুক থেকে। চোখমুখ বাজেভাবে কুঁচকে বোঝাল ওর তীব্র অসন্তুষ্টি, অবিশ্বাস। অনির্দিষ্ট কোথাও একটা তাঁক করে অবহেলায় ট্রিগার প্রেস করতে নিয়েই বলল –

‘আপনি বোকা নাকি আমাকে বলদ ভেবেছেন বলুনতো? গু লি সহ পি স্তল আমাকে দেবার সাহস করবেন যেদিন আপনি পাগল হবে…’

অপ্রত্যাশিত গু লির ওমন ভয়ানক শব্দে রোযার কাঁধ কাঁপল সামান্য। কাঁপল হাতটাও। ধড়ফড়িয়ে প্রথমে তাকাল বিছানার দিকে। হৃদি ভীষণ লাইটস্লিপার, মৃদু শব্দতেও যার ঘুম ভাঙে…আজ এমন শব্দতেও ভাঙেনি। জ্বরটা কাটায়, শান্তির, বেশ গভীর ঘুম দিয়েছে বাচ্চাটা। রোযা বড়ো বড়ো চোখে যখন আদিলের দিকে তাকাল ততক্ষণে দুয়ার থেকে শান্তর দ্রুতো, সতর্ক প্রশ্ন শোনা গেলো –

‘বস? বস ইজ এভ্রিথিং ওকে? আর ইউ ওকে?’

গুলিটা গিয়ে বিঁধেছে পেছনের দেয়ালে। গর্তটা দেখে রোযার হতবিহ্বলতা আরও দ্বিগুণবেগে বাড়ল। ও তো ভেবেছিল গু লি নেই। এইজন্যই ওভাবে ট্রিগার প্রেস করেছে। ও যদি তখন সত্যি বুকে গু লিটা চালিয়ে দিতো, তাহলে! তাহলে কী হতো? রোযা বিষ্ময় নিয়ে তাকায় আদিলের বুকে। আদিল রোযার থতমত খাওয়া চুপসানো মুখে চেয়ে থেকেই প্রাণবন্ত কণ্ঠ তুলে বলে –

‘তোদের সিলি ম্যাডাম এই রাতবিরেত আমার সাথে পিস্ত ল-পিস্ত ল খেলছে। নাথিং এলস।’

শান্তর আর কোনো শব্দ শোনা গেলো না। রোযা অবশেষে চোখ রাঙাল। নিজেকে ছাড়াতে চাইলে অনুভব করল তার হাত থেকে আদিল পিস্ত লটা নিয়েছে। পি স্তলের মাথাটা ডুবিয়েছে পেটের নরম অংশে। দাবিয়ে রেখে মুখটা ভীষণ কাছে এনে আওড়াল –

‘গু লি করি ম্যাডাম?’

রোযার হৃৎপিণ্ড লাফাল। তবে ও তা বুঝতে দিলো না। তাকাল চোখের মণিতে। নির্ভয়ে বলতে চাইল –

‘করু…’

পরমুহূর্তেই ট্রিগার প্রেসের শব্দে ভয়ে রোযা চোখমুখ শক্ত করে বুজে ফেলল। যখন বুঝল পি স্তলে গুলি নেই মুখে আঁধার নামল। আদিলের কণ্ঠ ঘুটঘুটে অন্ধকারের থেকেও গভীর শোনাল –

‘আমি পাগলই। ইয়োর হাজব্যান্ড ইজ ম্যাড রোজ-আ। হি’জ ক্রেজি… ডোন্ট ইউ নো? ডোন্ট ইউ নো… ডোন্ট ইউ নো ফর হুম?’

রোযা স্তব্ধ হলো। নড়চড় করতে ভুলে বসল। এযাত্রায় আদিল স্বেচ্ছায় সরে এলো। এতক্ষণ যাবত কুঁজো হয়ে থাকাটা যেন ভীষণ পরিশ্রমের হয়ে গিয়েছে তার জন্যে। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কাঁধটা নাড়িয়ে-চাড়িয়ে সজাগ করতে চাইল যেন। ঘাড়টা এতোক্ষণ যাবত রোযার উচ্চতার সাথে মিলিয়ে বাঁকিয়ে রেখেছিল, টনটন করছে। ঘাড় বাঁকাতেই কেমন ফট ফট ফট শব্দ হলো ঘাড়ের হাড্ডির। পরমুহূর্তে পরনের প্যান্টে হাত দিতেই রোযা যা বোঝার বুঝল। সহসা ঘুরে গেলো ঘূর্ণিঝড়ের বেগে। দেয়ালে মুখ করে রেখেও দাঁতে দাঁত পিষল। অনেকটা সময়। উপলব্ধি করেছে আদিল সরে গিয়েছে। তারপরও ফিরতে পারছিল না। এতো নির্লজ্জ, অসভ্য একটা পুরুষ কীভাবে হয়? রোযা দম ফেলে যখন ফিরল চোখ বুজে নিলো। ফ্লোরে প্যান্টের সাথে আরেকটা জিনিসও রেখে গেছে। কী বেশরম! রোযা তাকাল না ওদিকে। বিড়বিড় করল –

‘লম্পট কোথাকার! গু লিটা অন্যদিকে না মেরে বুকের ভেতরে মা রা উচিত ছিলো।’

ও কতক্ষণ চুপ থেকে অবশেষে হতাশ হয়ে গলা তুলে ডাকল –

‘বাইরে কে আছেন?’

শান্তর জবাব এলো তৎক্ষণাৎ। যেন ও দাঁড়িয়েই ছিলো কোনো এক প্রয়োজনে।

‘ম্যাডাম, কোনো প্রয়োজন?’

রোযা দু-হাত দূরত্ব রেখেই এড়াল ফ্লোরে পড়া প্যান্ট, আত কালো-লালের মিশ্রিত ব্রিফস। একটা চাদর শরীরে জড়িয়ে নিয়ে তবেই বলল –

‘ভেতরে আসুন তো।’

শান্ত সন্দিহান হয়ে দৃষ্টি নুইয়ে প্রবেশ করতেই রোযা আদেশ করল কেমন –

‘এগুলো তুলে নিয়ে আপনার বসের মুখের ওপর ছুঁড়ে আসুন।’

শান্ত তাকাল ইশারা বুঝে। পরমুহূর্তেই ডান চোখটা পিটপিট করল। ইতস্তত করল। বসের মুখে ছুঁড়ে মার বে মানে! এই কেমন কথা? শান্তর মাথায় মাথা একটাই, ওকে? ওর একটা মাথা গে লে আরেকটা লাগাতে পারবে না। ম রবে, মারা পড়বে নির্ঘাত। রোযা যেন বুঝল ওর মনের কথাগুলো। মুখ কালো করে ফেলল –

‘ওহ, আপনা্রা তো আবার আপনার বসের দিকের লোকজন। মুখের ওপর ছুঁড়তে পারবেন না, দিয়ে আসতে পারবেন তো?’

শান্ত ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আস্তে করে বলে, ‘জি, ম্যাডাম।’

‘দয়া করুন, দিয়ে আসুন তবে।’

শান্ত দ্রুতো হাতেবফ্লোর থেকে ওসব তুলে নিলো। ছুটল ওয়াশরুমের দিকটায়। শাওয়ারের শব্দ শোনা যাচ্ছে। রোযা গিয়ে চুপচাপ বসে হৃদির পাশে। আজ মোটেও ঘুমোতে যাবে না আগে-আগে। ঘুম ধরলেও না। সুযোগ বুঝেই ওকে বিছানায় জাপ্টে ধরা হবে। পরে ওই শক্তির কাছে কিচ্ছুটি না সে। চেয়েও নিজেকে ছোটানো সম্ভব হয়ে ওঠে না। এবারে বিছানায় পা দুটো তুলে বসে রোযা। অনুভব করে কোমরের বন্দনির স্পর্শ! এতো শখ তাহলে নিজের কোমরে কেনো পরে না! রোযা রাগে কিড়মিড় করল। তবে হৃদির কপাল ছোঁয়া হাতের স্পর্শ নরম, ধীর। স্বাভাবিক তাপমাত্রা শরীরের। স্বস্তির এটা! ওর ফুলো গালে ঠোঁট ছুঁয়ে মাথাটা এলিয়ে দিলো হেডবোর্ডে। ক্রমশ ঘুমে চোখদুটো বুজে আসছে। অন্ধকার লাগছে আশপাশ। আকাশের বুকে তখন সূর্য ওঠার প্রস্তুতি চলছে। পাখির কিচিরমিচিরের ধ্বনি ভেসে বেড়াচ্ছে চতুর্দিক থেকে। অক্টোবরের উষ্ণ হাওয়ার স্পর্শে রোযার ঘুমটা গাঢ় হচ্ছে। চোখদুটো যেই পুরোপুরি বুজবে – তখুনি এক দমকা হাওয়া এসে ছুঁলো তাকে। দুটো শক্তপোক্ত হাত পাঁজাকোলে তুলে নিয়েছে তার শরীর। এমনভাবে নিয়েছেয মনে হয় তার শরীরে ওজন নেই। তুলোর বস্তা মাত্র। তাকে কোলে তোলা আদিলকে ব্যতিক্রম লাগছে তবে তা রোযা ধরতে পারল না। সে যে ছটফট করে নামতে ব্যাকুল তখনো। শরীর বিছানা ছুঁতেই রোযা সরে যেতে চাইল, পারল কোথায়? কোমরটা একহাত দ্বারা শিকলের মতো বেঁধে রাখল নিজের শক্তপোক্ত, উন্মুক্ত, ভেজা বুকের সাথে। রোযার নাকে ভেসে এলো অদ্ভুত সুবাস। মুষড়ে উঠতেই ঘাড়ে পড়ল তপ্ত শ্বাসপ্রশ্বাসের ক্রমাগত স্পর্শ। মনে হলো আগুনের ফুল্কি তা। কোমরে থাকা হাতটার স্পর্শ হঠাৎ এতটা উষ্ণ লাগল যে রোযা সতর্ক হলো। মনে হচ্ছে আগুনের হালকা তাপ লেগেছে শরীরে। বুকের উষ্ণতা বুঝে রোযা নড়েচড়ে ওঠে। ফিরে চাইতেই যে আশ্চর্য হয়।

আদিলের চোখদুটো বুজে আছে। মৃদু বুকের ওঠানামার গতি। লম্বা নাকটা কেমন লাল হয়ে আছে। রোযা দ্রুতো সরে আসে এই সুযোগে। হৃদির কাছ ঘেঁষে বসে থাকে কিছুক্ষণ। আড়চোখে দেখল আদিল নড়ছে না। শুধু ভ্রুদ্বয়ের মধ্যিখানের ভাঁজটা গাঢ় হচ্ছে। রোযা অনেকটা সময় নিয়ে অদূর থেকেই পর্যবেক্ষণ করল। ভাবল, ওপর পাশে গিয়ে শুয়ে পড়বে চুপচাপ। মাথা ঘামাবে না। প্রয়োজনও নেই তো। অথচ পারল না। ধ্যানজ্ঞান ফিরতেই লক্ষ্য করল ওর হাতটা আদিলের কপাল ছুঁয়েছে। পরক্ষণে উত্তপ্ততায় আশ্চর্য হয়েই সরিয়ে আনল হাতটা। যেন ছ্যাঁকা খেয়েছে। ভীষণ জ্বর যে গায়ে! রোযা দ্রুতো বিছানা ছেড়ে নামতে চাইলে হাতে টান পড়ল। তড়িৎ ফিরে তাকাল। আদিল চোখ মেলে তাকায়নি। ওভাবেই ওর হাতটা টেনে ধরে রেখেছে। চোখবুঁজে থেকেই বিড়বিড় করল –

‘স্লাইট ফেভার, চলে যাবে। ডোন্ট কল দেম। তুমি কাছে আসো।’

রোযা হাতটা ছাড়িয়ে নিতে পারল জোরপূর্বক। হয়তোবা আদিল দুর্বল বলেই! বিছানা থেকে নেমে গিয়ে বসল হৃদির পাশে। চেয়ে থাকল কোথাও একটা। পিনপতন নীরবতা বয়ে গেলো অনেকটা সময় যাবত। চেয়েও পারছে না শুয়ে পড়তে। এতো দ্বিধা কেনো কাজ করছে? খচখচানিটা আসলে কীজন্যে? কেনো করবেই বা? ওই লোকের যা ইচ্ছে হোক! জ্বরে পড়ে থাকুক। ওর কী! ও তো আছেই হৃদির জন্য। শুধুমাত্র হৃদি! সবকিছু মুখ বুঝে সহ্য করেছে বাচ্চাটার জন্যইতো। পরমুহূর্তেই চোখের পাতায় ভাসল গতরাতের দৃশ্যগুলো। ভাসল ওই অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্যটা। রোযা চোখ বুজে ফেলল শক্ত করে। ও মাথা ঘুরিয়ে তাকাল পুনরায়। তাকিয়েই থাকল। পরিশেষে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। উঠে দাঁড়াল দ্রুতো। রুমালটা ভিজিয়ে আনল চটজলদি। যখন কাছে এসে দাঁড়াল বিছানার, কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত হলো। তবে থামল না। কপালের চুলগুলো সরিয়ে রুমালটা ছড়িয়ে রাখল চওড়া কপালে। ভাঁজ করে রাখা কম্ফোর্টটা মেলে দিলো শরীরে। ফিরতে নিতেই হাতে শক্ত, উষ্ণ থাবা পড়ল। টেনে ধরেছে আদিল। রোযা ফিরে তাকাল। একজোড়া র ক্তিম চোখের দৃষ্টি ওর ওপরেই নিবদ্ধ। শিকারী তার শিকার পেয়েছে —ওমন দৃষ্টি। পিনপতন নীরবতা ভাঙল খসখসে, জ্বরে কাবু হওয়া আরও গভীর কণ্ঠস্বরে –

‘ইন দিস মোমেন্ট, ইফ আই ডাই …আই’ল ডাই উইদাউট রিগ্রেটস।’

.

শ্রবণশক্তি দুর্বল থাকে এসময়ে। রোযা অস্পষ্ট আশেপাশের কথাবার্তা শুনতে পারছিল। মৌমাছির মতন শোনা্ল শব্দগুলো। ঘুমটা পুরোপুরি ছুটতেই আড়মোড়া চোখ মেলে তাকাল। সোজা চোখ পড়ল হৃদির ওপরেই। গতরাতে পরিয়ে দেয়া পা-জামা স্যাট পরনে। এলোমেলো চুল নিয়ে বসে আছে সোফায়। হাতে ওর পুতুলটা। অন্য হাতে ট্যাবলেট। সম্ভবত ভিডিও কলে কথা বলছে। ওপাশ থেকে ভেসে আসা পুরুষালী কণ্ঠ ভীষণ শান্ত, তাতে পৃথিবী সমান আহ্লাদ –

‘আমার নানাভাই কতো লক্ষ্মী! মায়ের ওঠার অপেক্ষা করছে।’

কণ্ঠ শুনে রোযা তড়াক করে উঠে বসল। বিস্মিত সে। হৃদি তাকে উঠতে দেখেই লাফিয়ে নামল সোফা থেকে। চেঁচিয়ে ডেকে গেলো –

‘মম উঠেছে। মম…মা! মাম্মাম।’

হৃদি ট্যাবলেট নিয়ে ছোটো ছোটো পায়ে দৌড়ে এলো। রোযা হাত বাড়িয়ে দিতেই ঝাঁপিয়ে পড়ল বুকে। রোযা আগেই ওর মুখটা দু-হাতে ধরল, কপাল ছুঁলো। যখন বুঝল জ্বর নেই, তবেই শান্ত হলো। হৃদি বসল তার কোলে। ট্যাবলেট এগিয়ে ধরল তার মুখের সামনে। স্ক্রিনে আজিজুল সাহেব, নিপা বেগম আর রাজু। তিনজনের মাথা একসলেগে আছে। চেয়ে আছে সোজা। আজিজুল সাহেব মেয়েকে দেখেই চিন্তিত গলায় প্রশ্ন করলেন দ্রুতো –

‘এতো বেলা করে ঘুমাচ্ছো কেনো, মা? দুপুর হলো বলে! শরীর খারাপ?’

রোযার মন ভালো হয়ে গেলো। অদ্ভুত আনন্দে গলা রোধ হয়ে এলো যেন। নিজেকে স্বাভাবিক করতে সময় লাগল। হাসতে চেয়ে সাবলীলভাবে জানতে চাইল –

‘কীভাবে নাম্বার পেলে?’

হৃদি উজ্জ্বল চোখে চেয়েইছিলো। তাদের হয়ে নিজেই তোতাপাখির মতন জবাবে বলল –

‘আমি ড্যাডকে বলেছি, আই ওয়ানা টক টু মাই গ্র‍্যান্ডমাদার, গ্র‍্যান্ডফাদার, অ্যান্ড আঙ্কেল।’

নিপা বেগম হৈচৈ ফেলে বললেন পাশাপাশি, ‘জানিস না মা। আমরা তো থতমত খেয়েছি। রাজু বাবুকে দেখে সেই কী চিৎকার!’

রাজু ফটাফট মাথাটা এগিয়ে বলল, ‘আপু, প্রতিদিন কল করবে এখন থেকে। আমি বাবুকে রোজ দেখতে চাই। কী সুইট ও! ঢাকা কবে ফিরবে?’

মায়ের হয়ে হৃদিই উচ্ছ্বাস নিয়ে জানাল, ‘মামা, ইউ ডোন্ট হ্যাভ টু ওয়ারি। আমি কল করব রোজ রোজ। প্রমিইজ।’

রাজু উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ল। গদগদ হয়ে বলে গেলো, ‘ওলে ওলে, আমার পাখিটা। মামা তোমার অপেক্ষায় থাকবে কেমন?’

রোযা নিঃশব্দে হাসল। তখন সূর্যের ঝলমলে আলো এসে ছুঁয়েছে তাদের। মিঠা সেই রোদের স্পর্শ। রোযা অনেকক্ষণ আলাপ করল পরিবারের সাথে। ফোন সাথে নিয়ে, কথা বলতে বলতে হৃদিকে দাঁত ব্রাশ করিয়ে, ফ্রেশ করালো। মিষ্টি রঙের হাঁটু স্পর্শ করা হাতাকাঁটা ফ্রোক পরিয়েছে। ওপরে পাতলা সামনে বোতাম ওয়ালা সাদা রঙের ফুল হাতার গেঞ্জি। মাত্রই জ্বর ছেড়ে উঠল। ঠান্ডা লাগতে দেয়া যাবেই না। তার পিঠ সমান চুলগুলোতে ঝুঁটি করে দিলো, বিনুনি ওয়ালা ঝুঁটি। মেয়েকে পরিপাটি করে, দুপুরের খাবার খাওয়ানোর সময়টুকু জুড়ে রোযা কথা বলল মায়ের সাথে। হৃদিকে খাওয়ানো শেষ করতেই দরজায় করাঘাত পড়ে। শান্ত একটি কণ্ঠ ভেসে আসে –

‘ভাবি, আসব?’

রোযা চিনতে পারে। মায়ের সাথে কথা শেষ করে কল কেটে বলে –

‘আসো না, আসো.. আসো। তা আবার বলতে হয়!’

ঝুমুরের সাথে সুপ্তি এসেছে। ঝুমুরের আজ সংকোচ নেই। মেয়েটা আজ সুপ্তিকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। এসেই রোযাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। খানিক ভড়কাল রোযা। পরমুহূর্তেই হাসল –

‘কী হয়েছে? নিউ ব্রাইড, এভাবে ঘুরছে কেনো, হু? আজ না বিয়ে?’

সুপ্তি গতকালের ঘটনা পুরোপুরি এড়িয়ে গেলো। প্রফুল্লচিত্তে বলল, ‘ভাবি, ঝুমুর তোমাকে ছাড়া নাকি কিচ্ছু করবে না। তোমায় নিতে এসেছি। তোমার জন্য কী চমৎকার লেহেঙ্গা আনিয়েছে জানো? দেখে চোখ জুড়িয়ে গিয়েছে আমার।’

হৃদি দু-পা নাড়িয়ে ট্যাবলেটে কার্টুন দেখছে। বড়োদের এধরনের আলাপে আগ্রহ শূন্যতে ওর। রোযা একপলক মেয়ের দিকে চেয়ে বলে –

‘এখুনি যেতে হবে?’

সুপ্তি তাড়া দিলো, ‘এ-বাবা, ভাবি তুমি কী বলছো বলো তো? দুপুর পেরুচ্ছে যে। পার্লার থেকে টিম বুক করেছে ভাইয়া। তারা এসে ফেশিয়াল করাবে। তারপর সবাইকে পুরোপুরি রেডি করিয়ে দেবে। তার এই পৌঁছাবে বলে। চলো চলো!’

রোযা তখন একফাঁকে উঠোন দেখেছিল। বড়ো করে স্টেজ করানো হয়েছে। সম্ভবত সন্ধ্যায় বিয়ে পরানো হবে। আপাতত ভীষণ হট্টগোল করে খাওয়ানো হচ্ছে আত্মীয়স্বজন। রোযা উঠে দাঁড়াল ওদের সাথে। রোযাকে উঠতে দেখে হৃদি ট্যাবলেট ফেলে দ্রুতো নামল বিছানা থেকে। চটপট খপ করে ধরল হাতটা। সাথে যাবে, স্পষ্ট। অবশ্য রোযা ওকে একা রুমে রেখে কখনো যেতোও না।

.

সুপ্তি মুগ্ধ চোখে দেখল অদূরে দাঁড়ানো রোযাকে। রোযাত লেহেঙ্গাটা স্কাই ব্লু রঙের। ভীষণ প্লেইন একটা লেহেঙ্গা। শাড়ি স্টাইলে পরেছে। হালকা মেকওভার নিয়েছে। বড়ো চুলগুলোতে — রুপাঞ্জেলের সেই ফুলের সাহায্যে বানানো বিনুনি হেয়ারস্টাইলটা। কী দারুণ! নাকে পাটায় ছোটো পাথরের নোজপিনটা জ্বলজ্বল করছে। সুপ্তি বুকের কাছটা ডলে ঝুমুরের কানের কাছে মুখ নিয়ে চাপা গলায় আওড়ে গেলো –

‘গুঞ্জন শুনেছিলাম ভাবিকে জোরপূর্বক তুলে এনে বিয়ে করেছেন ভাইয়ার বস। আমার মনে হচ্ছে ঝুমুর, আমি ব্যাডা হলে এমন মেয়েকে নিজের করতে, আমিও জোর খাঁটিয়ে তুলে আনতাম।’

ঝুমুরকে তখনো মেক-আপ করানো হচ্ছে। ওর ভীষণ দেরি আছে সাজগোজ শেষ হতে। চোখবোজা অবস্থাতেই মৃদু হেসে সুপ্তির হাতে চড় মেরে বলে –

‘থাম বেয়াদব। ভাবি শুনলে খবর আছে তোর।’

রোযা তখন ঝুঁকে মেয়েকে শান্ত করতে ব্যস্ত। হৃদি অসহ্য হয়ে গিয়েছে এতোগুলো মানুষের মধ্যে। এখানে ওর আর ভালো লাগছে না। টানছে রোযার হাত –

‘মম, লেটস গো। মম…’

রোযা অসহায় হয়, ‘একটু পরে যাচ্ছি, মা। বাইরে এখন অনেক মানুষ যে।’

‘আমি ড্যাডের কাছে যাবো, মম। চলো না.. চলো না।’

রোযা কক্ষনো যাবে না। পাগল নাকি! বলল, ‘গার্ডের সাথে যাও, সোনা হু? ড্যাডের সাথে দেখা করে ফিরে এসো, কেমন?’

হৃদি জিদ করে গেলো সমানে, ‘উহুঁ, তোমাকে ছাড়া যাবো না।’

বাচ্চার মুখটা লাল হয়ে যাচ্ছে। সবার ভীড়ে ওর অস্বস্তি হচ্ছে বুঝে আর থাকতে পারল না রোযা। বেরুলো রুম ছেড়ে। সাথে সুপ্তি সহ ওর আরও দুজন কাজিন এলো। একটার নাম বোধহয় কাজল। সেদিন ছাঁদে যার সাথে দেখা হলো। ওই অদ্ভুত মেয়েটা! আজও তেমন একটা কথাবার্তা বলেনি মেয়েটা। রোযার থেকে বেশ দূরত্ব রাখে অথচ এখন পেছন পেছন আসার সে মানে পেলো না। তবে তেমন স্বীকৃতিও দিলো না। অজানার মতোই তার আচরণ।

শিকদার বাড়ির উঠোন জুড়ে অতিথি, গ্রামবাসীর যাতায়াত। রোযা রুম থেকে বেরিয়ে খেয়াল করল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে রাদিন, জাকির, রনি। জাকির বলে কণ্ঠ নামিয়ে –

‘ম্যাডাম, বাড়ির বাইরে অনেক মানুষ তো। স্যার বলেছেন বেরুতে না।’

রোযার মুখটা হা হয়ে এলো। সে একটা বিয়ে বাড়িতে এসেছে। বিয়ের জন্যই তৈরি হয়েছে। আর বেরুতেই পারবে না? তাহলে তৈরি হয়েছে কেনো? রাগে গা জ্বলে উঠল রীতিমতো। সবার সামনে রাগটা দমিয়ে আস্তে করে প্রশ্ন করল –

‘কোথায় আপনার স্যার?’

জাকির বুঝল না জানাবে কি-না। জানানো ঠিক হবে? ও ভাবতে ভাবতে স্বপন চট করে বলল –

‘স্যার, শুটিং প্র‍্যাকটিস করছে।’

রোযা হতবিহ্বল, ‘কোথায়?’

‘পেছনের ওই জঙ্গলে।’

হৃদি দ্রুতো বলল, ‘বডিগার্ড আঙ্কেল, মম আর আমি যাবো। নিয়ে চলো।’

রোযা নাকচ করে দ্রুতো, ‘তুমি যাও সোনা। মম অপেক্ষা করছি তোমার ফিরে আসার, কেমন? যাও।’

অথচ মেয়েটা জেদ ধরেছে তাকে ছাড়া যাবে না। অগত্যা রোযা হৃদিকে নিয়ে বাড়ির নিরিবিলি পেছনের দিক দিয়ে বেরিয়ে আসে। এপাশটা বডিগার্ড দিয়ে ভরতি। অদূর থেকে দেখা যাচ্ছে ওদের গার্ডের সীমানা। এখান থেকে গু লির শব্দও কানে ভাসছে কেমন! যতো এগুচ্ছে ততো দেখা যাচ্ছে আদিলের চওড়া কাঁধ। তখনো সূর্যটা আকাশের বুকে আছে। আর কিছুমুহূর্ত পর ডুববে সেটা। সূর্যের র ক্তিম আলো পড়েছে আদিলের ঘর্মাক্ত পিঠে। ঝলমলে আলো তার কাঁধের কুচকুচে কালো বাজপাখিটা কী জীবন্ত লাগছে! ঘেমেনেয়ে আদিল একাকার। একটা লুজ ট্রাউজার কোমরে ঝুলে আছে কোনোরকমে। রোযার মনে হলো ওটা যেকোনো সময়ে খুলে পড়ে যাবে। হৃদি উচ্ছ্বাস নিয়ে ডাকছে সমানে –

‘ড্যাড! ড্যাড!’

আদিল ফিরে তাকাল। তৎক্ষণাৎ দৃষ্টি পড়ল যেখানে আর যা দেখল তার প্রভাব বেশ বড়সড় পড়ল তার ওপর। পিস্ত লটা হাত ফসকে পড়ে গেলো। হৃদি তখন দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল বাবার ডান পা। চতুর চোখে আশপাশটা দেখছে। আদিল মেয়ের মাথা ছুঁয়ে দিচ্ছে ঠিক অথচ দৃষ্টি অদূরে দাঁড়িয়ে পড়া রোযার ওপর। রোযা আর কদম বাড়াচ্ছে না। দাঁড়িয়ে থাকল ওখানটায়। আদিল স্বাভাবিক হলো ফের। যেন কিছুই হয়নি। স্বপন পড়ে যাওয়া পি স্তল তুলে সরে দাঁড়িয়েছে। হৃদি বুলস-আই টার্গেটে দেখিয়ে বলে –

‘ড্যাড, আই ওয়ানা শুট।’

আদিল ডান ভ্রু তুলে তাকাল মেয়ের দিকে, ‘ইউ ওয়ান্ট টু?’

হৃদির মাথা দোলাল। আদিল হাত বাড়াতেই স্বপণ পি স্তল দিলো। আদিল দু-পায়ের পাতায় ভর দিয়ে বসল। হৃদি ঝাপিয়ে পড়ল বুকে। আদিল ওর গালে ঠোঁট ছুঁয়ে, সামনে দাঁড় করাল। ওর ছোটো দু-হাতে পি স্তল ধরিয়ে নিজেও একহাতে ধরে নিশানা তাঁক করে ট্রিগার প্রেস করল। গু লি সোজা বুলস-আই টার্গেটে বিঁধল। হৃদি উচ্ছ্বাস নিয়ে লাফাল। জ্বলজ্বলে চোখে চেয়ে মুগ্ধ হয়ে বলে গেলো –

‘ড্যাড, ইউ আর সো পাওয়ারফুল। মোস্ট পাওয়ারফুল ম্যান ইন দ্য ওয়ার্ল্ড।’

প্রত্যুত্তরে আদিল ঠোঁট ছুঁয়ে দেয় মাথায়। হৃদি কৌতূহল হয়ে এদিক-ওদিক ছুটছে। ওর পেছনে স্বপণ, রনিও ছুটছে। আদিল অবশেষে ঘুরে দেখল রোযা এক যায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে। নড়েচড় নেই। শুকনো গলায় ওখান থেকেই বলল –

‘আমি ফিরে যাচ্ছি, হৃদিকে পাঠিয়ে দিয়েন।’

অথচ রোযা কদম বাড়াতেও পারে না। আদিলের আদেশ পড়ে, ‘এদিকে এসো।’

‘কী দরকার?’

বিপরীতে আদিল শুধু শিকারী চোখে চেয়ে থাকল। আর একটা শব্দ ব্যয় করল না, নড়লও না। রোযা আশেপাশে গার্ড দেখে তপ্ত শ্বাস ফেলে কদম বাড়াল। কাছাকাছি আদতেই নজর পড়ল টেবিলে। কতোরকমের অ স্ত্র ওখানে! সোনালী রঙে রিভলভারের দিকে একপল তাকিয়ে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো। আদিল তার দিকে চেয়ে থেকেই ওই অস্ত্রে র নাম বলে। তার দিকে কদম বাড়াতে – বাড়াতে আওড়ায় –

‘ইউ ওয়ানা ট্রায়?’

রোযা আড়চোখে পুনরায় তাকাল অস্ত্রের দিকে। এরপর ওই সুন্দর নিশানা বোর্ডের দিকে। ওর আসলেই ইচ্ছে করছে ব ন্দুক চালাতে। আগ্রহ কাজ করছে জানার‍, ও কি পারবে ওই বুলস-আই টার্গেটে গু লি ছুঁড়তে? আদিল ইশারা করতেই রাদিন রিভলভারটা নিয়ে এলো। দু-হাতে মেলে ধরতেই তৎক্ষণাৎ রোযা নিলো না। কিঞ্চিৎ দ্বিধা পেরিয়ে অতঃপর নিলো। ভালোভাবে ধরতে পারল না। বেশ ভারী! এতো ওজন কেনো এতে? আদিল এসে দাঁড়াল রোযার পেছনে। গা ছুঁইছুঁই প্রায়। শক্তপোক্ত পুরুষালি হাত দুটো পেছন থেকে রিভলভার ধরাটা ঠিক করে দিয়েই ছেড়ে দিলো না। ক্রমশ মুখটা চুলে গুঁজল। ঘ্রাণ নিলো ড্রাগ নেবার মতো। রোযা ঘাড় নড়ায় সামান্য। ট্রিগার প্রেস করে। নিশানা বোর্ডের কোথাও গু লি লাগেনি। গাছে লেগেছে। রোযা হতবিহ্বল! মধ্যে না লাগুক, তাই বলে আশেপাশেও লাগবে না? পুনরায় চেষ্টা করল, ফলাফল শূন্য। অবশেষে আদিল আয়ত্তে নিলো পুরো ওকে সহ ওর হাতের রিভলভারকে। পেছন থেকে কেমন আষ্ঠেপৃষ্ঠে রোযাকে জড়িয়ে ধরল। থুতনি কাঁধে রেখে কানের কাছটায় এলোমেলো তপ্ত, ভারি শ্বাস ফেলে রোযার হাতের পিস্তলের নিশানা নিজের বডিগার্ডদের একজনের মাথার ওপরে থাকা অ্যাপেলের ওপর নিশানা বসাতেই রোযা চোখ বুজে আওড়ায় –

‘ওদের দিকে না।’

আদিল বাধ্য বড়ো। তার বড়ো দুহাতের মুঠোতে থাকা রোযার দুহাতে ধরা পিস্তলের নিশানা অন্যদিকে রাখে। সুদূর গাছটায় বসা জোড়া পাখির দিকে। রোযা এবারে চোখ রাঙায় –

‘ওখানে না।’

আদিল বড়ো করে শ্বাস টেনে নেয়। কানের কাছটায় ফের আওড়ায়, ‘গাছের পাতা? চলবে, আমার ম্যাডাম?’

রোযা তাকাল সুদূরে থাকা গাছের ওই একটুখানি পাতাগুলোর দিকে। কিছুটা সন্দেহ টেনেই বলে বসে, ‘পারবেন?’

ওত দূর যে! এতটুকু একটা পাতা! কীভাবে সম্ভব? আদিল নাকমুখ ঘষল রোযার ফর্সা, রক্তিম গালে। ছাচা চোয়ালের খোঁচায় রোযা চোখ কুঁচকে ফেলে। নড়েচড়ে ওঠে। শিরশির করে গা। আদিল আওড়ায়,

‘কী মনে হয় আপনার?’


চলবে ~~
® নাবিলা ইষ্ক।

[ ভালোবাসারা কিছুটা দেরি হয়ে গেলো কারণ আপনাদের ওই কাঙ্খিত অংশটুকু আজকের এই পর্বে আমি রাখতে চেয়েছিলাম। তাই ভীষণ কষ্ট হলেও সারারাত বসে লিখে এনেছি ওই অংশুটুকু। তিন হাজার সাতশো শব্দ সংখ্যা। অর্থাৎ চার হাজারের কাছাকাছি। ]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply