Golpo romantic golpo আদিল মির্জাস বিলাভড

আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৩৭


আদিল মির্জা’স বিলাভড
— ৩৭

কাওসার আহমেদকে একরকম ধরেবেঁধে নিয়ে যাচ্ছেন জমিদার বাড়ির লোকজন। আরে বাবা, তাকে তৈরি হওয়ার সময়টুকু তো দেবে নাকি? তার পরনে লুঙ্গি, স্যান্ডোগেঞ্জি মাত্র। লুঙ্গির অবস্থা আবার শোচনীয়। বয়স তো তার কম হয়নি। ষাট ছুঁইছুঁই প্রায়। বৃষ্টির মধ্যে কাঁদামাটিতে কয়েককদম হেঁটেই হাঁপিয়ে উঠেছেন। এই বয়সে এতো দ্রুতো কি হাঁটা যায়? তিনি একমুহূর্তের জন্য দাঁড়ালেন জিরিয়ে নেবার জন্য। অথচ এতটুকুর ধৈর্য্যও নেই শহুরে মানুষজনের বোধহয়। স্বপণ তার হাত থেকে মেডিক্যাল বক্স নিতেই, রাদিন নির্বিকার মুখে ভদ্রলোককে নিজের চওড়া কাঁধে উঠিয়ে নিয়েছে। পরনের লুঙ্গি ধরে আর্তনাদ করে ওঠেন কাওসার সাহেব –

‘বাবা, আমার লুঙ্গি…’

তখুনি এসে থেমেছে কালো গাড়িটা। স্বপণ ড্রাইভিং সিটের পাশে উঠে বসতে বসতে তাড়া দেয় –

‘চল..চল…..’

রাদিন ভদ্রলোককে গাড়িতে তুলে নিজেও উঠে বসেছে। গাড়িটা ছোটে দ্রুতো বেগে। ঝুম বৃষ্টি পড়া নরম মাটির রাস্তা পিষে ছোটা গাড়িটা চোখের পলকে এসে পৌঁছেছে জমিদার বাড়ির ভেতর। নাসির শিকদার তার ভাইদের নিয়ে দাঁড়িয়েই ছিলেন দুয়ারের কাছে। রাদিন গাড়ি থেকে নেমে পুনরায় কাঁধে তুলতে চাইলে কাওসার আহমেদ ধড়ফড়িয়ে সরে বসেন। বাইরে চেয়ে ধরে আসা কণ্ঠে ডাকেন –

‘নাসির..নাসির এদিকে আহো তাড়াতাড়ি। এই কাদের তুমি পাঠাইছো। এমন গুন্ডামী করতেসে কেলা।’

স্বপণের থমথমে মুখে আঁধার নামল। রাদিন অবশ্য তা কানে তুলল না। পুনরায় ভদ্রলোককে কাঁধে তুলে নিয়েছে। কচ্ছপের মতো ওমন গুটিগুটি কদম ওর সহ্যই হচ্ছে না। দ্রুতো কদম বাড়িয়েছে বাড়ির দিকে। নাসির সাহেব হাতের ছাতাটা ছোটো ভাইয়ের হাতে ধরিয়ে নিজেও এগুতে এগুতে জানাল –

‘চাচা, ওরা অত্যন্ত চিন্তিত দেইখা এমন করতেসে। নাইলে এমন করে না, খুব ভালো, ভদ্র আছে। তোমাকে জানাইছিলাম না আমাগো বসের সম্পর্কে? তার বাচ্চার জ্বর। বুঝোই তো… বাচ্চা মানুষ, গুরুতর।’

কাওসার সাহেব কাঁধে ঝুলে থেকে চোখ রাঙালেন। দাঁতে দাঁত পিষে বলেন –

‘বুঝছি নাসির, বুঝছি। আমারে নামাইতে বলো। আমার পা-জোড়া এখনো ভালো আছে। দিব্যি হাঁটতে পারি।’

জব্বার সাহেব একবার তাকালেন শক্তপোক্ত মুখের রাদিনের দিকে তারপর স্বপণের দিকে। ইনিয়েবিনিয়ে আস্তে করে বলেন –

‘চাচা, আর একটুখানিইতো। থাকো কাঁধে। যে তোমারে নিসে তার সমস্যা না হইলে তোমার হইতেসে কেনো। শুয়ে থাকো। হাঁটতে হইতেসে না তোমার…এইডা ভালো না?’

কটমট করেন কাওসার সাহেব, ‘এতোই ভালোর হইলে তুমিই আইসা ওঠো। আহো।’

জব্বার সাহেব মুখ বন্ধ রাখলেন। আর কথা বাড়ালেন না। বড়ো ভাইয়ের পেছনে চলে এলেন। রাদিন সিঁড়ি ধরেছে। ওর চড়া প্রত্যেকটা সিঁড়ির ধাপ অনুভব করে সিঁটিয়ে যাচ্ছেন কাওসার সাহেব। তিনতলায় এসে তবেই তাকে নামানো হয়েছে। মাথাটা ঝিমঝিম করছে তার। স্বস্তির শ্বাস নেয়ার সময়ও পেলেন না। স্বপণ থমথমে মুখে তাড়া দিলেন –

‘আসুন, ডক্টর।’

কাওসার সাহেবের পিত্তি জ্বলে গেলো। কী সুন্দর ডাক!! তিনি চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে নিজেই প্রবেশ করলেন ভেতরে।

.

হৃদির চোখমুখ র ক্তিম। শুকনো ঠোঁটে কিছুক্ষণ আগেই তেল ছুঁইয়ে দিয়েছে রোয়া। ওর মাথার কাছটায় বসে বারবার কপাল ছুঁয়ে দিচ্ছে। যতবার ছুঁইছে ততবারই ওর হৃদয়টা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে। বাচ্চার এমন অবস্থার জন্য ও নিজেই দায়ী। ওকে নিয়ে বাড়ি থেকে না বেরুলে তো এসবের কিছু হতো না। সেমুহূর্তে হৃদি আধোআধো চোখ মেলে তাকাতে চেয়ে ডাকে –

‘মম..’

রোযার চোখ ভিজে ওঠে। মাথা নুইয়ে কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে আওড়ায় –

‘এইতো মা এখানেই সোনা।’

হৃদি দুর্বলভাবে ধরে রেখেছে রোযার হাত। জ্বরের মধ্যেও বিলাপ জুড়েছে –

‘ড্যাড, হোয়্যার ইজ ড্যাড…’

রোযা উত্তরের আশায় ভেজা চোখেই তাকাল দুয়ারের দিকে। রনি, জাকির নিজেদের মধ্যে চাওয়াচাওয়ি করে অবশেষে জাকির চোখ নুইয়ে রেখে ধীরে বলে –

‘বসের ফিরতে রাত হবে।’

ঘরভরতি লোকজন তখন। সবাই উঠে এসেছে দেখতে, খোঁজখবর নিতে এতগুলো সিঁড়ি বেয়ে উঠে এসেছেন স্বয়ং জাহানারা বেগম। চিন্তিত চোখে চেয়ে বসে আছেন সোফার এককোণে। এবারে নরম গলায় বলেন রোযার উদ্দেশ্যে –

‘শান্ত হও নাতবউ। কাওসার আইতেসে। ও এখানকার সবচেয়ে ভালো ডাক্তার। ঠিক হইয়া যাইব।’

রোযা প্রত্যুত্তরে কিছুই বলতে পারে না। হৃদিকে নিয়েই ব্যস্ত থাকল। কপালের ভেজা রুমালটা উল্টে দিলো। লালচে গাল ছুঁতেই, প্রবেশ করেন কাওসার সাহেব। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন নাসির শিকদার সহ তার ভাইয়েরা। রোযা দ্রুতো উঠে দাঁড়াতে চাইলে হৃদি গুঙিয়ে ওঠে। কাওসার সাহেব বাঁধ সাধেন তাতে –

‘উঠতে হইব না ম্যাডাম। বসে থাকুন আপনি। কাছে থাকুন।’

রোযা সালাম জানাল। বসে থাকল অগত্যা। কাওসার সাহেব অন্যপাশ দিয়ে গিয়ে বসলেন হৃদির কাছে। প্রথমে হাতের পিঠ দিয়ে হৃদির কপাল ছুঁয়ে দেখলেন। তারপর মেডিক্যাল ব্যাগ থেকে বের করলেন থার্মোমিটার। ওটাকে রোযার হাতে দিয়ে বললেন হৃদির আরমপিটে রাখতে। রোযা রাখে। কয়েক সেকেন্ড পরে থার্মোমিটার বের করে দিলে কাওসার সাহেব দেখে বলেন –

‘১০২ ডিগ্রি। জ্বর তো ভালোই। বৃষ্টিতে ভিজেছে?’

তিনি ব্যাগ থেকে স্টেথোস্কোপ বের করে ধীরে ধীরে হৃদির বুকে আর পিঠে শুনলেন। ভদ্রলোক যতক্ষণ দেখছিলেন রোযা সতর্ক চোখে চেয়েই থাকল। বলল –

‘হ্যাঁ। অনেকটা সময় ভেজা হয়েছে।’

কাওসার আহমেদ সামান্য হাসেনই। বলেন আড়চোখে চেয়ে –

‘শান্ত হোন। বৃষ্টিতে ভিজতে দিবেন না। সেরে যাবে ইনশাআল্লাহ।’

ঘুটঘুটে অন্ধকার সবটা। ঝমঝমিয়ে নামছে বিরামহীন বৃষ্টি। তাণ্ডব তোলা বাতাসে দুলছে বড়ো বড়ো গাছের মোটা ডালপালাগুলো। বজ্রপাতের শব্দে কাঁপছে গোটা গ্রাম। কাঁদামাটিতে ভেজা ইটের রাস্তা পিষে ছোটা গাড়িগুলোর যেন কোনো গন্তব্য নেই। গণহারে এতোগুলো গাড়ি এলোমেলো, ছোটোখাটো যেই গলির রাস্তা চষে ছোটে, ওইখানের ভূমি পর্যন্ত থরথর করে কেঁপে উঠছে। গাড়ির উচ্চশব্দ বৃষ্টির ভারি শব্দকেও হার মানাচ্ছে। ড্রাইভিংয়ে এলেন বসেছে। ওর ড্রাইভিং-য়ের হাত ভালো। ফাঁকা রাস্তায় ও যেন সাগরে পাওয়ারবোট চালাচ্ছে। গাড়িগুলো সর্বোচ্চ গতিতে ছুটে এসে পৌঁছেছে গ্রামের শেষমাথার এই মেইনরোডে। তার দৃষ্টির সামনে, রাস্তার মাথায় একগুচ্ছ গাড়ি তখনো ছুটছিলো। সেইসব গাড়িগুলোকে ওভারটেক করে সামনে চলে এলো এলেন। সাথে তাদের বাকিগুলো গাড়িও থেমেছে। মুহুর্তে জায়গাটুকু আটকে ফেলল সারিবদ্ধভাবে। গাড়ি থামতেই সঙ্গে সঙ্গে প্যাসেঞ্জার সিট থেকে আদিল বেরুলো। ঝমঝমিয়ে নামা বৃষ্টির ধারালো ফোঁটা গুলো অবিরাম পড়তে থাকল তার উদোম শরীরের ওপরে। পরনে সেই ঢোলা ফর্মাল প্যান্ট মাত্র। পায়ে জুতো নেই। সামনে একদৃষ্টিতে চেয়ে থেকে হাত দুটো ভরল প্যান্টের পকেটে। তার ডানে-বামে হিমালয়ের মতো দাঁড়িয়েছে শান্ত-এলেন। ওদের হাতে বড়ো রিভলভার। পেছনে সারিবদ্ধ ভাবে বাকি বডিগার্ডস। এতো এতো মানুষ, অথচ নীরবতা বয়ে গেলো কেমন। বৃষ্টির আওয়াজ ব্যতীত আর একটা শব্দও শোনা গেলো না।

বিপরীতে দাঁড়ানো গাড়িগুলোর মধ্যের গাড়ির প্যাসেঞ্জার সিটের দরজা খুলে ধরেছে হাসান। ছাতাটা ধরে রেখেছে গাড়ির সিলিং ছুঁয়ে। একজোড়া পেন্সিল হিল পরিহিত পা এসে ছুঁলো ভেজা রাস্তা। কনুইয়ের ওপর পর্যন্ত নগ্ন, ফর্সা পা জোড়া। ঋণা বেরিয়ে এলো ঠিক, অথচ ওর চোখজোড়ার দৃষ্টি গাড়িতে থাকা অবস্থাতেই একজনের ওপরে সেঁটে আছে। তৃষ্ণার্ত সেই দৃষ্টি যেন কয়েক বছর পর পানি পেয়েছে। চুল থেকে মুখ, মুখ থেকে বুক..পেট.. পুরো আদিলকে কয়েকবার দেখে অবশেষে কদম বাড়াল। এগুতে এগুতে বলা ঋণার প্রত্যেকটা বাক্যে আকুতি মেশানো –

‘তোমাকে লাস্ট কবে দেখেছি মনে করতে পারছি না।’

অথচ আদিল ওদিকে তাকাল না। বৃষ্টির আওয়াজ ভেদ করে শোনা গেলো তার গম্ভীর, নির্বিকার কণ্ঠ –

‘বলেছিলাম আমার সামনে পড়তে না। আমি ধরলে কিন্তু ছাড়ি না।’

ঋণার কণ্ঠ স্বাভাবিক বেশ, ‘ছাড়তে বলল কে?’

আদিলের গম্ভীর কণ্ঠে বলা শব্দটুকু কেমন কৌতুকময় শোনায়, ‘তাই?’

পরমুহূর্তেই তার হাতের ইশারায় পেছন থেকে সমানে গু লি ছোঁড়া হয়। মুহুর্তে, চোখের পলকে ঋণার পেছনের প্রত্যেকটা বডিগার্ডকে গু লি করা হয়। ষোলো জনের লা শ পড়ে রাস্তা জুড়ে। ঋণা টু-শব্দ করল না। তখনো চেয়ে আছে একই দৃষ্টিতে। কিছুক্ষণের জন্য থমকানো পা-জোড়া ফের কদম বাড়াতে থাকল। ছাতা ধরা হাসানের হাতটা মৃদু কাঁপে। দৃষ্টি তখনো নোয়ানো। ঋণা এসে দাঁড়াল লম্বাচওড়া আদিলের সামনে। ওত বড়ো হাইল হিল পরেই উচ্চতায় আদিলের বুক বরাবর। হাত বাড়াতে বাড়াতে কেমন করে বলল –

‘একইরকম আছো…যেমনটা সবসময় থাকো আমার স্বপ্নে। একটু ঘুরবে নাকি আমি পেছনে যাবো? তোমার ট্যাটুটা দেখি না অনেক বছর হয়ে যাচ্ছে। আই ইউজড টু লাভ দ্যাট।’

শান্তর মুখটা বেঁকে গেলো। একদলা থুথু জমল মুখে। অথচ ওপরে বেশ স্বাভাবিক থাকল। আদিলের নড়চড় নেই। একটা শব্দও বলল না। ঋণা ঘুরল, হাত উঠিয়ে থামাল হাসানকে। ওমন বডিফিটিং ছোটো ড্রেস পরা অবস্থায় ভিজতে ভিজতে দাঁড়াল এসে আদিলের পেছনে। বলে গেলো পিঠের দিকে তাকিয়ে –

‘এতো রাগ কার জন্য হচ্ছো? ওই মেয়ের জন্য? কী নাম যেন? রোযা…রোযা…হুম…বেঁচে গেলো এবারের মতো। ওকে মা রতে চেয়েছি…’

পরমুহূর্তেই ঋণার চোখমুখ শক্ত হয়। তাকায় ওর মৃ ত বডিগার্ডসদের দিকে। চিৎকার করে ওঠে, ‘বেশ করেছি। সো হোয়াট? কি করবে আমার? মা রবে? গায়ে হাত তুলবে?’
‘আই ডোন্ট নিড টু রেইজ আ হ্যান্ড—মাই সিগন্যাল ইজ ইনাফ… বুউউউম।’
হাসানের ফোন বাজল তখুনি। ফোন কানে ধরে যা শুনল তাতে ওর চোখমুখ নীল হয়ে এলো। দ্রুতো ঋণার কাছে বলল –
‘ধানমন্ডি, বসুন্ধরার ক্যাসিনোতে রেইড পড়েছে।’
ঋণার হাতের ফোন পড়ে যায়। ও অবিশ্বাস নিয়ে তাকাল আদিলের শক্তপোক্ত পিঠের দিকে। অথচ আদিল চেয়ে আছে শূন্যে। ডাকল এবেলায় –
‘শান্ত! কল হিম।’

শান্ত এগিয়ে এলো ঋণার অসন্তুষ্ট, নির্বাক দৃষ্টির সামনে। কল লাগিয়ে লাউডস্পিকারে দিলো। ফোনটা ধরল আদিলের মুখের সামনে। ফোনের ওপাশের থেকে আসা পুরুষালি কণ্ঠ থেমে থেমে অপ্রস্তুত শোনাল –

‘আদিল? আদিল মির্জা?’

আদিল ঘুরে দাঁড়াল, মুখোমুখি হলো। ঋণার চোখে চেয়েই বলে গেলো, ‘শার্প ব্রেইন, মিস্টার সওদাগর।’

‘কে- কেমন আছো? সম্পর্ক আর নেই তো কী হয়েছে? আমরা তো একসময় বিজনেস পার্টনার ছিলাম। সেই সুবাদে…’

আদিল শুনল না ওসব শ্রুতিমধুর প্যাঁচাল। বলে গেলো নিজের মতন –

‘বয়স হওয়ার সাথে সাথে আপনার বুদ্ধিজ্ঞানে জ্যাম পড়ে গেছে সওদাগর সাহেব। লাগার আগে দেখতে হয় না সামনে কে? তার পাল্টা আক্রমণ নেয়ার অ্যাবিলিটি আছে তো?’

আলমগীর সওদাগরের কণ্ঠ উচ্চ শোনাল এবারে। শান্ত নেই, ‘লিসেন আদিল! ইট ওয়াজ ঋণা… জানোইতো মেয়েটা তোমার পাগল। শিইই…শি লাভস ইউ। দ্যাটস ইট। আমা…’

‘আনুষ্ঠানিক ভাবে বিয়ে না করলেও, আপনারা তো ভালো করে জানেন, আম আ ম্যারিড ম্যান মিস্টার সওদাগর।’

‘অবশ্যই অবশ্যই। আদি…’

আদিল বলে গেলো, ‘আমার ওয়াইফ.. শি ইজ মাই জান। আমার জানে এতো বড়ো আঘাত করার পরও আমি কীভাবে হাত গুটিয়ে সহ্য করি বলুন?’

ফোনের ওপর পাশে আলমগীর সওদাগরের গায়ের পশম দাঁড়িয়ে গিয়েছে, ‘আদিল… আদিল উই উইল টক..আমরা সামনাসামনি…’

আদিল ‘চ’ সূচক শব্দ করল। বলল, ‘ওল দ্য বেস্ট সওদাগর সাহেব। আশা করি সামলে উঠতে পারবেন।’

আলমগীর সওদাগর কিছু বলবেন তার আগেই দ্রুতো গতিতে সামনে এসে দাঁড়াল তার পার্সোনাল বডিগার্ডস। ওদের বলা একেকটা বাক্যে তার পায়ের মাটি সরতে থাকল –

‘চারটা ট্রাকই ধরা পড়েছে, বস।’

‘ফ্যাক্টরিতে আগু ন লেগেছে।’

‘আম…আমাদের বাংলোতে পুলিশের রেইড পড়েছে।’

কোটিকোটি টাকার ড্রা গ, অস্ত্র ওখানে! আলমগীর সওদাগরের বিকট চিৎকার কানে বাজার পূর্বেই শান্ত আলগোছে কল কেটে দিলো। ঋণার হাত কাঁপছে, কাঁপছে শরীর! ও পাগলের মতো আদিলের কাছে আসতে চাইলে শান্ত দ্রুতো একটা পা বাড়িয়ে দিলো। পায়ে লেগে মুখ থুবড়ে পড়তে নিলে ওকে ধরল হাসান। ঋণা চিৎকার করে যাচ্ছে –

‘হাউ হাউ কুড ইউ? আদিইল…আদিল ইউ কান্ট ডু দিস টু মি। আদিল…’

ইতোমধ্যে আদিল গাড়িতে চড়ে বসেছে। দরজাটা লাগানো হলেও, কাঁচ নামানো। রাতের আঁধারের চেয়েও কেমন গভীর শোনাল –

‘স্টে অ্যাওয়ে ফ্রম মাই ফ্যামিলি, মিসেস চৌধুরী। দিস উইল বি মাই লাস্ট ওয়ার্নিং। দ্বিতীয় বার এমন কিছু হলে…সওদাগরের কোনো বংশ এই পৃথিবীতে থাকবে না।’

গাড়িটা ছুটে চলল। রাস্তায় হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল ঋণা। চোখ দিয়ে পানি নয় বরং আগু ন ঝরল যেন। মুষ্টিবদ্ধ হাত দুটো সমানে ঘুষি বসাল রাস্তায়। বিড়বিড় করে গেলো ও –

‘হাউ ক্যান ইউ ডু দিস টু মি?’

.

বিলাসবহুল এই ক্যাসিনো শহরের বুকে এক কালো অধ্যায়। যা সম্পর্কে সাধারণ মানুষেরা ধারণা নেই। নাম মাত্র শোনা। দেশের সব উচ্চবর্গীয় শ্রেণীর মানুষের যাতায়াত থাকে। কেউ আড়ালে আসে তো কেউ বুক ফুলিয়ে। প্রবেশের পথে গাড়ি আটকানোর সিকিউরিটির ধার না ধেরে যেই গাড়িগুলো শব্দ তুলে সোজা ঢুকল..তাতে হৈচৈ পড়ে গেলো পুরো সিকিউরিটি টিমের ওপর। অথচ আগন্তুকদের কেউ থামাতে পারে না। উল্টো তারা নিজেরাই বন্দি হয়। দরজাটা খোলা মাত্রই তীব্র গানের আওয়াজে কান ধরে গেলো –

‘ও লেইলা কি নাজরেঁ নাশিলি,
ও হার এক আদা হ্যায় রাঙ্গিলি…
অ্যাইসি সেক্সি চাল হ্যায় তৌবা,
হুস্ন সে মালামাল হ্যায় তৌবা…

উফ্ ইয়ে কামার লাচকিলি,
কেয়ামত হি কারদেগি।

ও লেইলা তেরি লে লেগি, তু লিখ কে লে লে,
হে হে হে…!
ও লেইলা তেরি লে লেগি, তু লিখ কে লে লে।’

স্টেজে তখন নাচ হচ্ছে। নিচ থেকে পুরুষরা মুখ হা করে মিলেমিশে হৈচৈ করছে। হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছে নারী দেহের উন্মুক্ত অংশ। দু-হাতে টাকা বিলাচ্ছে কাগজের মতো। মিনি স্কার্ট পরিহিত এক সুন্দরী নারীকে নিজের কোলে নিয়ে যে নাচছে তাকে দেখে শান্তর ভ্রু দুলে ওঠে। আগ্রহী চোখে দেখে ওই উচ্ছ্বাস। লাল-কালো কার্পেট পিষে আদিল প্রবেশ করতেই অনেকের উল্লাস থেমে যায়। তার বডিগার্ডস ততক্ষণে সামনের সবাইকে সরিয়ে দিয়েছে। ফাঁকা করেছে আশপাশটা। লাল সোফায় আদিল পায়ের ওপর পা তুলে বসল। শান্ত গানের তালে একটু দুলে বলল –

‘বস, যাবো নাকি?’

এলেন নাক কুঁচকাল, ‘জীবনের শেষ আনন্দটুকু গিলতে দে।’

স্টেজে নাচছিলো অনেকগুলো নারীই। একজন.. যার পরনে পাতলা স্কার্ট। স্কার্টের ফাঁকেফাঁকে সবটাই দেখা যাচ্ছিল। পানারী আশ্চর্যজনক ভাবে স্টেজ থেকে পাতলা, দৃশ্যমান কোমর হেলিয়েদুলিয়ে রহস্যময়ী ভঙ্গিতে আসছে এদিকেই। ঠিক এসে দাঁড়াল আদিলের মুখের সামনেই। কোমর বেঁকিয়ে কাছে আসতে চাইলেই আদিলের অধৈর্য্য কণ্ঠ ভেসে এলো –

‘এটাকে সরা।’

এটা!! সুন্দরী মেয়েটার চোখদুটো বড়ো বড়ো হয়ে এলো। বোধহয় এমন আচরণ এই প্রথম পেয়েছে। বেচারি সহ্য করতে পারল না। হতভম্ব হয়ে নড়েচড়ে পিছিয়ে এলো কয়েক কদম। এলেন আড়চোখে বসের মুখের দিকে চেয়ে ঠোঁটে ঠোঁট টিপল। বসের নারী বিষয়ক ধৈর্য্য শূন্যতে চলে গিয়েছে। অন্যদিকে মেয়েটাকে অবশ্য সরাতে হয়নি। ভয়ে নিজেই সরে গিয়েছে। অপরদিকে স্টেজে মেয়ে নিয়ে ফুর্তিতে মাতোয়ারা হওয়া রেওয়াজের দৃষ্টি হঠাৎই নিচে পড়ে। লাল সোফায় পায়ের ওপর তুলে বসে সিগারেট ধরানো সুঠাম দেহের ওপর পড়তেই থমকায় ও। হাত-পা মুহুর্তে আসাড় হয়ে আসে যেন। অন্যদিকে শান্ত দুলতে দুলতে কয়েকবার রিভলভার চালাতেই গান বন্ধ হয়। স্টেজের সুন্দরী মেয়েরা পালাতে ব্যস্ত। আপাতত রেওয়াজ একাই দাঁড়িয়ে আছে। বিষ্ময় বাড়াতে শান্ত ডাকল –

‘আসুন, এদিকে আসুন মিস্টার রেওয়াজ। কতকাল দেখা নেই। আওয়ার বস মিসেস ইউ সো মাচ।’

রেওয়াজের হাঁটু কাঁপল ঠকঠক করে। নিজেকে শান্ত করতে চাইল। তার হাত আছে কীভাবে জানল? কীভাবে সম্ভব? সওদাগর তো জীবনেও বলবে না। তাহলে? ভেতরে তাণ্ডব বইলেও, সম্মুখে রেওয়াজ হাসতে চেয়ে নামল স্টেজ থেকে। বিনয়ের সাথে এগুতে এগুতে বলল –

‘মির্জা সাহেব যে! কতকা…’

বাকিটুকু আর বলতে পারল না। নাই-বা আর কদম বাড়াতে পারল না। আদিল আচমকাই গু লি ছুঁড়েছে ডান পায়ে। তৎক্ষণাৎ পা ভেঙে বসে পড়ল বেচারা। অবিশ্বাস্য চোখে চেয়ে আর্তনাদ করে উঠল –

‘গুপ্তচর আছে সওদাগরের সাথে?’

আদিল ডান ভ্রু তুলল। উঠে এলো রেওয়াজের সামনে। জ্বলন্ত সিগারেটের মাথাটা কপালে ঠেসে ধরে আওড়াল সে –

‘তোরা যদি চলিস ডালে-ডালে…তবে আমি পাতায় পাতায়।’

রেওয়াজ চিৎকার করে ওঠে যন্ত্রণায়। অনুনয় বাদ দিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বলে গেলো –

‘আমার কিছু হলে কী জবাব দিবি?’

আদিল রিভলভারের মুখটা ঢুকিয়ে দিলো রেওয়াজের মুখের ভেতর। আওড়াল –

‘আদিল মির্জার কাছে জবাব চাইবে এমন কেউ এখনো জন্ম নেয়নি।’

মুহুর্তে গু লির শব্দে, র ক্তে ভেসে গেলো ক্যাসিনোর কারপেট।

ফজরের আজান পড়েছে। বৃষ্টি থেমেছে। তবে আকাশ তখনো ঘুটঘুটে অন্ধকার। ফোটেনি ভোরের আলো। নেই পাখিদের কিচিরমিচির। গাড়িগুলো সোজা প্রবেশ করেছে শিকদার বাড়ির ভেতর। তখন পুরো বাড়ির মানুষ ঘুমের ঘোরে। স্বপণ, রাদিন, রবিন সহ সবগুলো এসে দাঁড়িয়েছে গাড়ির সামনে। আদিল তাকাতেই রাদিন বলল –

‘ম্যাডাম ঠিকাছে। প্রিন্সেসের জ্বর কেটেছে। ঘুমুচ্ছে।’

আদিল ক্লান্ত ভঙ্গিতে কপাল ডলে প্রশ্ন করল, ‘ক্লান্ত, ধ্রুবের কী অবস্থা?’

‘লাইফ থ্রেটনিং না। তবে মাসখানেক হসপিটাইজড থাকতে হবে।’

আদিল কদম বাড়াল ভেতরে। পিছুপিছু শান্ত, এলেন সহ বাকিরাও বসবার ঘর পেরিয়ে ধরল সিঁড়ি। তিনতলার সবটা নীরব, শান্ত। বডিগার্ডস সব দাঁড়িয়ে পড়ল সিঁড়িগোড়ার মাথাতেই। আদিল প্রবেশ করল রুমে। বাতি জ্বালানো। রোযা বিছানার সাথে মাথা ঠেকিয়ে বসে আছে। ওর এক হাত ঘুমন্ত হৃদির বুকের ওপর। আদিল নিঃশব্দে এসে দাঁড়াল বিছানার পাশে। রোযার দিকে একপলক চেয়ে তাকাল ঘুমন্ত মেয়ের মুখের দিকে। অবশেষে ঝুঁকে মেয়ের কপাল ছুঁয়ে দেখল, পরপর কপালে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। ততক্ষণে রোযা নড়েচড়ে উঠেছে। এতো সামনে আদিলকে দেখে হকচকাল। ঘুমটা বোধহয় পুরোপুরি কাটেনি ওর। দু-ভ্রু কুঁচকে আওড়াল –

‘কোথায় ছিলেন?’

জিজ্ঞেস করতেই বোধহয় ওর ঘুম পুরোপুরি কেটেছে। বড়ো চোখে তাকাল আদিলের দিকে। আদিল ঝুঁকে আছে তখনো। কানে বাজতে থাকল প্রশ্নটা। সাথে মনে পড়ল ক্যাসিনোতে রেওয়াজকে বলা তার কথাটা। আদিল মির্জার কাছে কে জবাব চাইবে? এইতো…আছে একজন। হয়েছে একজন। আয়াত তালুকদার রোযা। আদিল নাকমুখে আওয়াজ তোলে –

‘হুম?’

রোযা আস্তে করে বিছানা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। দূরত্ব রাখল অনেকটা। আওড়াল –

‘হৃদি জ্বরের ঘোরে আপনায় খুঁজছিল..তাই।’

আদিল এগোয় দু-কদম। দৃষ্টি পড়ে রোযার ঠোঁটে তারপর কোমরে, ‘শুধু হৃদি? আপনি খোঁজেননি মিসেস মির্জা?’

রোযার কপালে ভাঁজ পড়ে। না তাকিয়েই আওড়ায়, ‘আমি কেনো খুঁজব?’

‘আপনাকে এতো ভালো লিপ সার্ভিস দিলাম যেহেতু, খুঁজবেন না? ওয়াজ মাই সার্ভিস আনস্যাটিসফ্যাক্টরি? হুম?’

রোযা চোখ রাঙিয়ে তাকাল। শাসাল চাপা গলায় –

‘আমাকে যদি আর স্পর্শ করেন…আমি গু লি করব আপনাকে।’

কাঁচা ঘুম ভাঙায় চোখদুটো তখনো লাল রোযার। সম্ভবত হৃদির জন্য কেঁদেছে। মুখটা ফুলোফুলো। ওই মুখে চেয়ে আদিল দ্রুতো এগুলো। ঠোঁট দুটো কতক্ষণ দেখল হিসেব নেই। দেয়ালের দু-পাশে রোযাকে আটকে নিখুঁত দৃষ্টি রাখল পাতলা কোমরটায়। পরমুহূর্তেই প্যান্টের পেছনে রাখা পি স্তলটা ধরিয়ে দিলো রোযার হাতে। ভাসা গলায় আওড়ায় –

‘ফিল ফ্রিই।’

রোযা চমকে তাকাতেই আদিলের মুখটা নেমে আসে, ‘তখন তাড়া ছিলো। কাজটা শেষ করি, হু? সাপোর্ট করুন…’


চলবে ~~
® নাবিলা ইষ্ক।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply