অসম্ভবরকমভালোবাসি_তোমায়
লেখিকাসুমিচৌধুরী
পর্ব ৩৭
বার বার নাকের নিশ্বাসে সেই বিষাক্ত পাতার তীব্র গন্ধ শুভ্রের ফুসফুস অবধি পৌঁছে যাচ্ছে। অতিরিক্ত ঘুমের ঘোরে ও অবশ হয়ে পড়ে থাকায় প্রথমে টের পায়নি, কিন্তু শরীরের ভেতর এক বীভৎস অস্বস্তি দানা বাঁধছে। এদিকে রিদি দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে শ্বাস চেপে ধরে উঁকি দিচ্ছে। ও ভাবছিল শুভ্র হয়তো নাক সিঁটকে লাফিয়ে উঠবে, আর সেই মজার দৃশ্য দেখে ও প্রাণভরে হাসবে।
কিন্তু বেশকিছুক্ষণ পর অতিরিক্ত গন্ধ পেটের ভেতর গিয়ে পাকস্থলী ওলটপালট করে দিল। শুভ্রের তন্দ্রাটা ধীরে ধীরে যখন ভাঙল, তখন কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওর দম আটকে আসার উপক্রম হলো। কোনো কথা বা চি-ৎ-কা-র নয়, একদম ঘুমের ঘোরেই শুভ্র তোলপাড় করে ব-মি করে দিল। ওর শরীরটা ধনুকের মতো বেঁকে উঠল। ও অনেক কষ্টে বিছানায় উঠে বসল ঠিকই, কিন্তু সেই উথালপাথাল যেন থামছেই না। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে ওর ফর্সা মুখটা নীল হয়ে গেল।
এদিকে রিদি শুভ্রের এই ভয়াবহ অবস্থা দেখে একদম পাথর হয়ে গেল। ওর বুকের ভেতরটা যেন মুহূর্তেই হিম হয়ে গেছে। হাত-পা নাড়ানোর ক্ষমতাটুকুও ও হারিয়ে ফেলেছে। ও তো স্রেফ মজা করতে চেয়েছিল, কিন্তু সামনে যা হচ্ছে সেটা যে ওর কল্পনাকেও ছাড়িয়ে গেছে। ও বুঝতে পারছে না কী করবে।
অন্যদিকে সাহেরা চৌধুরী শুভ্র উঠছে না দেখে চিন্তিত মুখে ওর রুমের দিকে আসছিলেন। দরজার সামনে রিদিকে ওভাবে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি কিছু একটা বলতে যাবেন, ঠিক তখনই ভেতর থেকে বুক চিরে আসা সেই ব-মি করার শব্দটা তাঁর কানে গেল। সাহেরা চৌধুরী আর এক সেকেন্ড দেরি করলেন না। তিনি পাগলের মতো দৌড়ে শুভ্রের কাছে গিয়ে ওকে জাপটে ধরলেন। তাঁর দুই হাত শুভ্রের কাঁপুনিতে কেঁপে উঠছে। তিনি আর্তনাদ করে বলতে লাগলেন।
“শুভ্র। ওরে বাবা শুভ্র কী হয়েছে তোর? এত ব-মি করছিস কেন বাপ?”
শুভ্রের অবস্থা তখন বর্ণনাতীত। ও একটা কথা পর্যন্ত বলতে পারছে না। যতোবার ও বুক ভরে নিশ্বাস নিতে যাচ্ছে, ততোবার পেটের ভেতর জমে থাকা সেই নোনালি পাতার বিটকেল গন্ধটা ওর নাকে হানা দিচ্ছে। ওর চোখ দুটো যন্ত্রণায় উল্টে যাওয়ার মতো অবস্থা, মুখ দিয়ে অনর্গল শুধু ব-মি বেরিয়ে আসছে। শুভ্রের কপাল বেয়ে টপটপ করে ঘাম ঝরছে, যেন বৃষ্টির পানি।
শুভ্রের ওই ভয়াবহ অবস্থা দেখে সাহেরা চৌধুরী আর্ত চি-ৎ-কা-র শুরু করলেন। তাঁর সেই গগনবিদারী চি-ৎ-কা-র-এর শব্দে বাড়ির সবাই দিশেহারা হয়ে শুভ্রের ঘরের দিকে ছুটল। ঈশান, তুর্য, রিফাত সবাই পাগলের মতো রুমে ঢুকল। ঘরে ঢুকেই শুভ্রকে ওই অবস্থায় দেখে ওরা তিনজনেই তড়িঘড়ি করে ওকে জাপটে ধরল। কিন্তু শুভ্রের ব-মি থামছেই না, বরং ওর শরীরটা যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছে। ঈশান শুভ্রের পিঠ শক্ত করে ধরে অস্থির হয়ে বলল।
“বস। কী হয়েছে আপনার? হঠাৎ এত ব-মি আ…”
বাকিটুকু বলার আগেই ঈশানের চোখ গেল বালিশের পাশে ছড়িয়ে থাকা ওই নোনালি পাতাগুলোর দিকে। ঈশান হাত বাড়িয়ে একটা পাতা তুলে নিল। ওর বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। এই তো সেই নোনালি পাতা, যা রিদিকে সে কিছুক্ষণ আগে পুকুরপাড় থেকে তুলে দিল। কিন্তু এই পাতাগুলো এখানে কেন? ঈশানের ভাবনার মাঝেই শুভ্র বড় বড় নিশ্বাস নিতে গিয়ে বারবার ব-মি করছে। সোহান চৌধুরী পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝে কাঁপাকাঁপা হাতে তাড়াতাড়ি গ্রামের ডাক্তারকে কল দিলেন।
এদিকে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে রিদি নিজেকে আর ঠিক রাখতে পারল না। ও ফুঁপিয়ে কেঁদে দিল। সামান্য একটা মজা থেকে যে এত বড় একটা কাণ্ড হয়ে যাবে, সেটা ও স্বপ্নেও ভাবেনি। সকাল থেকে না খাওয়া, মনের ওপর প্রচণ্ড চাপ, আর তার ওপর এই বিরামহীন ব-মি শুভ্রের শরীর আর নিতে পারল না। হুট করেই ওর মাথাটা প্রচণ্ড জোরে ঘুরে উঠল। চোখের মণি দুটো একবার স্থির হয়ে পরক্ষণেই বুজে এল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে শুভ্র একদম শরীর ছেড়ে দিয়ে বিছানায় লুটিয়ে পড়ল।
শুভ্রা এতক্ষণ নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করলেও শুভ্রকে জ্ঞান হারাতে দেখে ও আর পারল না। ও চি-ৎ-কা-র করে কান্না শুরু করে দিল। সোহান চৌধুরীও নিজের একমাত্র ছেলের এই করুণ অবস্থা দেখে পাথর হয়ে গেলেন। তিনি দ্রুত শুভ্রের মাথার কাছে গিয়ে ওকে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে আকুল হয়ে বলতে লাগলেন।
“শুভ্র। এই শুভ্র, কথা বল। কী হয়েছে তোর? বাপ আমার, চোখ খোল।”
রিফাত শুভ্রের নাড়ি পরীক্ষা করে ধরা গলায় বলল।
“আঙ্কেল, শুভ্র জ্ঞান হারিয়েছে।”
সোহান চৌধুরী হাহাকার করে উঠলেন।
“হঠাৎ কী হলো? এত ব-মি কেন করছিল ও?”
এদিকে রিদি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। ওর চোখের সামনে চারপাশটা বনবন করে ঘুরছে, সব অন্ধকার হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে কেউ যেন ধারাল ছুরি দিয়ে ওর কলিজাটা কেটে নিয়ে যাচ্ছে। নিজের সামান্য এক শয়তানির কারণে শুভ্রের এই জীবন-মরণ দশা হবে, তা ভাবতেই রিদির দম বন্ধ হয়ে আসছে। ওর ভেতরটা যেন চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যে ডাক্তার আসলেন। তিনি শুভ্রের সবকিছু খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে সবার উদ্দেশ্যে বললেন।
“চিন্তার কিছু নেই। অতিরিক্ত কোনো উৎকট গন্ধে তার পেটের ভিতর দলা পাকিয়ে পুরো জায়গায় ছড়িয়ে গিয়েছিল। আর যখনই তিনি নিশ্বাস নিতে গিয়েছেন, সেই গন্ধের তীব্র ঘ্রাণ তার নাকে লেগেছে আর সেই গন্ধেই তিনি ব-মি করেছেন। আর তিনি সকাল থেকে কিছু খাননি, তার ওপর এত ব-মি-র জন্য শরীরটা অতিরিক্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে বলেই জ্ঞান হারিয়েছেন। চিন্তার কিছু নেই, ব-মি করার ফলে যা গন্ধ ভেতরে ছিল সব বের হয়ে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে জ্ঞান ফিরবে। আমি কিছু ঔষধ দিয়ে যাচ্ছি, জ্ঞান ফিরলে কিছু খাইয়ে দিয়ে ঔষধগুলো খাইয়ে দেবেন। আর হ্যাঁ এরকম গন্ধের থেকে উনাকে দূরে রাখবেন, এতে শরীরের জন্য উনার ক্ষতিকর।”
ডাক্তারের কথা শুনে সবাই একে অপরের দিকে তাকাল। গন্ধ? কিসের গন্ধ? ঠিক তখনই ঈশান গম্ভীর মুখে বলে উঠল।
“বসের বালিশের পাশে দেখেন। যেখানে পাতাগুলো পড়ে আছে, ওই পাতাগুলোর গন্ধের কথাই বলছেন ডাক্তার।”
ঈশানের কথা শুনে সবাই শুভ্রের বালিশের পাশে তাকাল। সেই নোনালি পাতাগুলো দেখে সবার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। এতক্ষণ উত্তেজনার চোটে তারা কেউ খেয়ালই করেনি। সাহেরা চৌধুরী বিস্ময় আর ক্ষোভ নিয়ে বললেন।
“নোনালি পাতা। কিন্তু এই পাতাগুলো শুভ্রের বালিশের পাশে কেন? আর এই পাতার গন্ধ তো শুভ্র সহ্যই করতে পারে না। কে রেখেছে এখানে?”
ঈশান এক পলক রিদির দিকে তাকাল। রিদি তখনো দরজার কোণে মাথা নিচু করে নীরবে কাঁদছে। ঈশান দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিছু একটা বলতে চাইল, কিন্তু তার আগেই রিদি ধরা গলায়, মাথা নিচু করেই সবার উদ্দেশ্যে বলল।
“আমি রেখেছি।”
কথাটা শোনামাত্র শুভ্রা চোখ কপালে তুলে চি-ৎ-কা-র করে উঠল।
“তুই রেখেছিস মানে?”
রিদি মাথা নিচু রেখে কাঁদতে কাঁদতে বলল।
“আমি মজা করে রেখেছি। ভেবেছি গন্ধে শুভ্র ভাইয়ের ঘুম ভাঙবে, কিন্তু এতটুকু হয়ে যাবে বুঝতে পারিনি।”
কথাটা শোনা মাত্রই রাবেয়া এহসান তড়িৎ গতিতে এগিয়ে এসে ঠাস করে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিলেন রিদির গালে। থাপ্পড়ের সেই তীব্র শব্দে পুরো ঘর যেন এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল। রাবেয়া এহসান রিদির দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে চি-ৎ-কা-র করে বললেন।
“এইটা কোন ধরনের মজা? তুই কি এখনো ছোট যে বড় ভাইয়ের সাথে এভাবে নোংরা মজা করতে যাস? দেখ তোর জন্য ছেলেটার কী দশা হয়েছে। দেখেছিস?”
রিদি কোনো পাল্টা জবাব দিল না, শুধু হিক্কা তুলে অবিরত কাঁদতে লাগল। রাবেয়া এহসান রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে রিদিকে আরও বকাঝকা করে মারতে গেলে ঈশান মাঝপথে এসে তাঁকে থামাল। ঈশান রাবেয়া এহসানকে অনেক বুঝিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগল। রিদি আর সেখানে এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। ওর মনে হলো এখানে আর কিছুক্ষণ থাকলে ও দম আটকে মারা যাবে। ও পাগলের মতো দৌড়ে নিজের রুমে চলে এল এবং সশব্দে দরজা বন্ধ করে দিল। দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে ও ফ্লোরে বসে পড়ল। হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়ল। যতোবারই ও চোখ বন্ধ করছে, ততোবারই শুভ্রের সেই ফ্যাকাশে আর অসহায় মুখটা ওর চোখের সামনে ভেসে উঠছে। জ্ঞান হারানো শুভ্রের সেই নিথর শরীরটা যেন রিদির কলিজায় তীরের মতো বিঁধছে। ও কাঁদতে কাঁদতে অস্ফুট স্বরে বলতে লাগল।
“শুভ্র ভাই, আমাকে মাফ করে দিন। আমি… আমি সত্যি জানতাম না এতটুকু হয়ে যাবে। আপনার এত কষ্ট হবে আমি ভাবিনি। আপনাকে এত কষ্ট দিতে চাইনি আমি। খোদা, তুমি আমার শুভ্র ভাইকে সুস্থ করে দাও।”
রিদির কান্নায় ঘরের দেয়ালগুলোও যেন আজ ভারি হয়ে উঠেছে। নিজের এই অবুঝপনার জন্য ও নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছে। গালের ওপর মায়ের হাতের আঙুলের ছাপ বসে গেছে, জ্বালা করছে প্রচণ্ড। কিন্তু সেই জ্বালার চেয়েও শুভ্রকে হারানোর আর তাকে কষ্ট দেওয়ার ভয়টা রিদির বুকের ভেতর অনেক বেশি রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে। ও দরজায় মাথা ঠুকতে লাগল।
ধীরে ধীরে সময় তার আপন গতিতে বয়ে গিয়ে রাতকে আমন্ত্রণ জানাল। শুভ্রের অনেক আগেই জ্ঞান ফিরেছে, এখন সে পুরোপুরি সুস্থ। বাড়ির সবাই একটু পর পর শুভ্রের ঘরে গিয়ে ওকে দেখে এসেছে, শুধু রিদি ছাড়া। আজ সারাদিন সে একবারের জন্যও নিজের রুম থেকে বের হয়নি। এক দানা দানাপানিও পেটে পড়েনি ওর। বাড়ির অনেকেই ওকে ডেকেছে, কিন্তু রিদি সবাইকে এক কথা বলে ফিরিয়ে দিয়েছে পরে খাবে। এভাবে করতে করতে দিন শেষ হয়ে ঘন রাত নেমে এল, তবুও রিদির ঘরের দরজা খুলল না।
এদিকে শুভ্র নিজের রুমের ব্যালকনিতে একা দাঁড়িয়ে আছে। ঈশানের কাছে ও সব শুনেছে যে রিদিই নোনালি পাতাগুলো রেখেছিল। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এটা শুনে শুভ্রের মনে বিন্দুমাত্র খারাপ লাগেনি বা রাগ হয়নি। কিন্তু এখন ওর মনে এক গভীর বিষণ্ণতা আর শূন্যতা দানা বেঁধেছে। সারাদিন সবাই ওর খোঁজ নিতে এসেছে, অথচ যার জন্য শুভ্র চাতক পাখির মতো চেয়ে ছিল, সেই মনোমোহিনী একটা বারও চোখের দেখা দিতে আসেনি। লোকে বলে ছেলেদের নাকি অভিমান থাকে না, কিন্তু শুভ্র আজ খুব অভিমান করেছে। প্রচণ্ড অভিমান।
রাত যতো বাড়ে, শুভ্রের অস্থিরতাও ততো পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে। তার মনটা ছটফট করছে রিদিকে একটিবার দেখার জন্য। সারাদিনের ওই নীরবতা আর দূরত্ব ও আর সহ্য করতে পারল না। অবশেষে শুভ্র নিজের ফোনটা হাতে নিল এবং রিদির হোয়াটসঅ্যাপে একটা মেসেজ লিখল।
“আঘাত দিয়েছিস, তখন আঘাত লাগেনি। কিন্তু আঘাত তো এখন লাগছে। আজ সারাদিন তুই একটি বার আমার সামনে আসলি না। বড্ড লাগছে রে বুকে।”
মেসেজটা পাঠিয়ে শুভ্র অপলক চোখে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। ও জানে রিদি জেগে আছে। ওর মন বলছে, রিদিও এই মুহূর্তে ওর মতোই কোনো এক যন্ত্রণায় পুড়ছে। শুভ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাতের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল।
এদিকে রিদি বালিশে মুখ গুঁজে উল্টো হয়ে শুয়ে আছে। আজ সারাদিনের অঝোর কান্নায় ওর চোখ দুটো ফুলে লাল হয়ে গেছে। প্রচণ্ড ভয় আর গ্লানিতে ও একবারের জন্যও শুভ্রের সামনে যাওয়ার সাহস সঞ্চয় করতে পারেনি। ও মনে মনে শুধু নিজেকেই ধিক্কার দিচ্ছে যে মুখ দিয়ে ও শুভ্রকে ভালোবাসে বলে দাবি করে, সেই মুখ নিয়ে ও কোন সাহসে গিয়ে দাঁড়াবে? কীভাবে পারল ও নিজের ভালোবাসার মানুষকে মৃত্যুর মুখ ঠেলে দিতে?
রিদির এই অন্তহীন দহনের মাঝেই বালিশের পাশে রাখা ফোনটা হঠাৎ ‘টোন টোন’ করে বেজে উঠল। একরাশ অনিচ্ছা সত্ত্বেও রিদি হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিল। কিন্তু স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই ওর হৃদপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। শুভ্রের প্রোফাইল পিকচার। শুভ্রের আইডি থেকেই মেসেজ এসেছে। রিদির বুকটা প্রচণ্ড জোরে ধক করে উঠল। ও কাঁপাকাঁপা হাতে তড়িঘড়ি করে লক খুলে মেসেজ অপশনে ঢুকল।
শুভ্রের পাঠানো ওই কয়েকটা লাইন পড়ার সাথে সাথেই রিদির চোখ দুটো আবার ছলছল করে উঠল। নিজেকে সাধারণ অপরাধী নয়, বরং এই পৃথিবীর চরম অপরাধী মনে হতে লাগল ওর। শুভ্রের ওই চাপা হাহাকার মেশানো শব্দগুলো রিদির ভেতরের সবটুকু বাঁধ ভেঙে দিল।
সে আর নিজেকে এক সেকেন্ডের জন্যও সামলাতে পারল না। তীরের মতো বিছানা ছেড়ে উঠে গিয়ে সশব্দে দরজা খুলে দৌড় লাগালো শুভ্রের রুমের দিকে। সোজা রুমে ঢুকে পাগলের মতো চারপাশটা দেখল। না, শুভ্র কোথাও নেই। এরপর ও হন্তদন্ত হয়ে ব্যালকনির দিকে ছুটল। ব্যালকনিতে পা রাখতেই ওর চোখের মণি স্থির হয়ে গেল। শুভ্র পকেটে দুই হাত ঢুকিয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে উল্টো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঝাপসা আলোয় শুভ্রের সেই দীর্ঘ আর শান্ত অবয়বটা দেখা যাচ্ছে।
শুভ্রকে এভাবে একদম সুস্থ আর নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রিদি এক বুক বড় বড় শান্তির নিশ্বাস ফেলল। মনে হলো ওর বুকের ওপর চেপে থাকা হিমালয় সমান পাথরটা এক নিমেষেই নেমে গেছে। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সব জড়তা আর লজ্জা একপাশে সরিয়ে রেখে, উল্টো দিক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শুভ্রকে পিছন থেকে দুই হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল ও। ওর কান্নায় আজ সারা দিনের জমে থাকা সব যন্ত্রণা আর হাহাকার যেন এক লহমায় আছড়ে পড়ল শুভ্রের পিঠে।
রিদির আকস্মিক স্পর্শে শুভ্রের পুরো শরীর এক মুহূর্তের জন্য ঝাকুঁনি দিয়ে উঠল। ও অনুভব করল, রিদির চোখের লোনা জলে ওর টি-শার্টের পেছনের অংশটুকু ভিজে পিঠের সাথে লেপ্টে যাচ্ছে। শুভ্র পাথরের মতো দাঁড়িয়ে না থেকে ধীরে ধীরে সামনের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। কান্নায় ভেঙে পড়া রিদির বিধ্বস্ত মুখের দিকে তাকিয়ে ও খুব শান্ত গলায় বলল।
“এইভাবে কাঁদছিস কেন? আমি কি তোকে কিছু বলেছি?”
রিদি কোনো কথা বলতে পারল না, শুধু হিক্কা তুলতে তুলতে না সূচক মাথা নাড়ল। শুভ্র পুনরায় জিজ্ঞেস করল।
“তাহলে কাঁদছিস কেন?”
রিদি এবারও নীরব। ওর চোখের পাপড়িগুলো জলে ভিজে একাকার হয়ে আছে, গাল বেয়ে অনবরত পানি গড়িয়ে পড়ছে। শুভ্র এবার দুই হাতে রিদির মাথাটা সোজা করে ধরল। পরম মমতায় আঙুল দিয়ে ওর চোখের পানি মুছে দিতে দিতে ধীর স্বরে বলল।
“ভয় পেয়েছিলি? যদি আমার কিছু হয়ে যায়?”
শুভ্রের এই মায়াবী কণ্ঠস্বর শুনে রিদি নিজেকে আর সামলাতে পারল না। সব বাঁধ ভেঙে গেল ওর। ও এক ঝটকায় শুভ্রকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে কাঁপা কাঁপা গলায় বলতে লাগল।
“আ-আমাকে আপনি মাফ করে দিন। আমি… আমি বিন্দুমাত্র বুঝতে পারিনি ওই গন্ধে আপনার এত বড় সমস্যা হয়ে যাবে। বিশ্বাস করুন শুভ্র ভাই, আপনি যখন মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন, তখন মনে হয়েছিল আমার পুরো পৃথিবীটাই চোখের সামনে অন্ধকার হয়ে আসছে। মনে হয়েছিল ভেতর থেকে কলিজাটা কেউ জ্যান্ত টেনে বের করে নিয়ে যাচ্ছে। আপনি আমাকে মাফ করে দিন। শাস্তি হিসেবে যা ইচ্ছে করেন মারেন, বকেন, সব আমি মাথা পেতে নেব। তবুও দয়া করে আমাকে মাফ করে দিন। আপনি যা বলবেন আমি তাই করব, কখনো আপনার কথার অবাধ্য হব না। তবুও আমি আপনাকে হারাতে পারব না। অনেক ভালোবাসি আপনাকে, খুব বেশিই ভালোবাসি।”
রিদির গলার সেই হাহাকার আর ভালোবাসার আর্তনাদ রাতের এই নিস্তব্ধ ব্যালকনিতে এক অদ্ভুত মায়ার চাদর বিছিয়ে দিল। শুভ্র স্তব্ধ হয়ে শুনল রিদির হৃদয়ের সবটুকু নিংড়ানো স্বীকারোক্তি। রিদি যেন আজ ওর বুকের ভেতর মুখ লুকিয়ে নিজের পুরো অস্তিত্বটাই শুভ্রের হাতে সঁপে দিল। ও শুভ্রকে আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল, যেন এই বাঁধন আলগা হলেই ও শুভ্রকে চিরতরে হারিয়ে ফেলবে।
শুভ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিদির চুলে মুখ ডুবিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল।
“এত ভালোবাসিস বলেই তো সারাদিন আমার সামনে আসলি না। আমি বেঁচে আছি নাকি ম…”
বাকিটুকু শেষ করার আগেই রিদি আরও শক্ত করে শুভ্রকে জড়িয়ে ধরল। ওর মুখ দিয়ে ‘মরে যাওয়া’-র মতো শব্দটা শুনতেই রিদির বুকটা কেঁপে উঠল। ও যেন আর সহ্য করতে পারছে না, শুভ্রকে একদম নিজের পাঁজরের সাথে মিশিয়ে ফেলে আরও জোরে কেঁদে দিল ও। শুভ্র এক বুক তপ্ত শ্বাস ছেড়ে রিদিকে নিজের দুই বাহুর ঘেরাটোপে বন্দী করে নিল। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বলল।
“কান্না থামা রিদি। আমার কিছু হয়নি। দেখ, আমি একদম ঠিক আছি তোর সামনেই দাঁড়িয়ে আছি।”
রিদি তবুও কান্না থামাল না। ওর অবুঝ মন যেন শুভ্রের ওই নিথর হয়ে যাওয়ার দৃশ্যটা কিছুতেই ভুলতে পারছে না। ও সমানে কেঁদেই চলল। রিদির এমন পাগলামি আর কান্নার তোড় দেখে শুভ্রের ঠোঁটের কোণে সেই চেনা বাঁকা হাসিটা ফুটে উঠল। ও রিদির কানের খুব কাছে নিজের ঠোঁট নিয়ে ফিসফিস করে বলল।
“সাধারণত কান্না দেখে মানুষের ই-মো-শ-নাল হওয়ার কথা, কিন্তু তোর এই কান্না দেখে আমার বাসর করার ইচ্ছে জাগছে। এখন বল তো, আমি কী করি?”
শুভ্রের এমন হুট করে বলা নির্লজ্জ কথা শুনে রিদির কান্নার বেগ মুহূর্তেই থমকে গেল। ওর সারা শরীরে যেন এক লহমায় বিদ্যুৎ খেলে গেল। কান্নায় ভেজা চোখ তুলেই ও থতমত খেয়ে শুভ্রের দিকে তাকাল। শুভ্রের চোখের সেই গভীর আর নেশাতুর দৃষ্টি দেখে রিদির গলার কাছে শব্দরা সব দলা পাকিয়ে গেল। ও যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছে না।
রিদি একদম থতমত খেয়ে কাঁপা গলায় বলল।
“বা-বাসর মানে?”
শুভ্র রিদিকে বাহুবন্ধনে আরও নিবিড় করে টেনে নিল। ওর কানের খুব কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল।
“এখন বা-সর রাত কী তাও বোঝাতে হবে তোকে? করে বুঝিয়ে দিবো নাকি?।”
শুভ্রের এমন সরাসরি আর সাহসী কথায় রিদি লজ্জায় একদম লাল হতে লাগল। ও ভাবতেও পারেনি শুভ্র এতটা নির্লজ্জ হতে পারে। সাধারণত এত গম্ভীর কোনো মানুষের মুখে এমন কথা শুনলে মনে হবে লোকটা নিশ্চয়ই পাগল হয়েছে, রিদির অবস্থাও ঠিক তাই। ও বড় বড় চোখ করে শুভ্রের দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল।
“আপনি ঠিক আছেন তো? শরীর কি বেশি খারাপ আপনার?”
শুভ্র এবার রিদির চোখের গভীরে তাকিয়ে বাঁকা হাসল। সে বলল।
“হ্যাঁ, আমি তো একদম ঠিক আছি। দেখতে পাচ্ছিস না? কেন তোর কি মনে হচ্ছে আমি অসুস্থ? আচ্ছা বিছানায় চল, বাসর করে বুঝিয়ে দিই আমি অসুস্থ নাকি সুস্থ।”
রিদি লজ্জায় এবার একদম টকটকে আপেলের মতো লাল হয়ে গেল। ওর বুকের ভেতরটা তখন ধকধক করছে। ও শুভ্রের বলিষ্ঠ বাহুর বাঁধন থেকে ছাড়া পাওয়ার বৃথা চেষ্টা করতে করতে মুখ লুকিয়ে বলল।
“ছিহ। কী নির্লজ্জ কথা আপনার। আপনি যে ভেতরে ভেতরে এমন নির্লজ্জ, আমি আগে জানতাম না।”
শুভ্র রিদির ছটফটানি দেখে হাতের বাঁধন আরও শক্ত করে নিল। ও রিদির কানের লতি ছুঁয়ে গাঢ় স্বরে বলল।
“নির্লজ্জের কী দেখেছিস? একবার শুধু তোকে পুরোপুরি নিজের করে পেয়ে নিই, তারপর দেখবি এই শুভ্র কী জিনিস। এই যে নোনালি পাতা দিয়ে আমার এই দশা করার ফল সেটা আমি অবশ্যই সুদে-আসলে তুলব। শুধু একটু ওয়েট কর।”
রানিং…!
Share On:
TAGS: অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায়, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৪৪
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭১
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৪৮
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১৭
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬০
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৪
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব সারপ্রাইজ
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ২৩
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬১
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭৬